চলতি বছরে নভেম্বরের শুরুতে অনুষ্ঠিত আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সিটি নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে যখন জোহরান মামদানির বিজয় সংবাদ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলিমদের মধ্যে একটা আনন্দবার্তা নিয়ে এলো তখনই জোহরানের বাবা ও মার পরিচয়টা মিডিয়ায় বেশি বেশি করে উঠে আসতে দেখা গেল। মা মীরা নায়ার বিখ্যাত সিনেমাপরিচালক আর বাবা মাহমুদ মামদানি বিখ্যাত লেখক। এই লেখাটি অবশ্য জোহরানকে নিয়ে নয়, তার বাবাকে নিয়ে। স্পেশালি তার বাবার একটি বইকে নিয়ে। জন্মসূত্রে জোহরানের মুসলিম ইস্যুটা যখন সারাবিশ্বে সামনে আসছিল তখনই মনে হলো তার বাবা মাহমুদ মামদানির একটা গুরুত্বপূর্ণ বই আছে, বইটা বিখ্যাত ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ নামে; সেই বইটা নিয়ে একটা পরিচিতিটাইপ রিভিউ লেখা যেতে পারে। বইটার নাম অবশ্য আরেকটু বড় ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম : আমেরিকা, দা কোল্ড ওয়ার, অ্যান্ড দা রুটস অব টেরর’। এক বাক্যে বলতে গেলে, বইটি মূলত নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্বের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ।
বইটা নিয়ে আলোচনা করার আগে এর লেখক মাহমুদ মামদানি সম্পর্কে একটা পরিচিতি তুলে ধরা যেতে পারে; এতে করে লেখক সম্পর্কে একটা ধারণা পেতে সুবিধা হবে। মাহমুদ মামদানি বিশ্ববিখ্যাত আফ্রিকান বুদ্ধিজীবী, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক চিন্তক। আফ্রিকান হলেও তার জন্ম ১৯৪৬ সালে, ব্রিটিশ ভারতের বোম্বে। তবে বোম্বে জন্মালেও তিনি মূলত উগান্ডার নাগরিক। বাবা-মার সাথে ছোট বেলাতেই উগান্ডায় চলে যান। মামদানি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আফ্রিকান স্টাডিজের অধ্যাপক। আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র ম্যাকারেরি ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল রিসার্চ এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি উগান্ডার কাম্পালা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হার্ভার্ড ও লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকসে অধ্যয়ন করেছেন। কর্মজীবনে শিক্ষকতা করেছেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউনিভার্সিটি অব কেপ টাউন, দারুস সালাম, ও মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয়েও।

লেখক : মাহমুদ মামদানি
মামদানি উপনিবেশবাদ, পোস্টকলোনিয়াল রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক হিংসার ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন। মামদানি লেখেন যে ‘গুড মুসলিম’ ও ‘ব্যাড মুসলিম’ নামে দুইটি ক্যাটেগরি বানানোটা পশ্চিমা রাজনীতি। তিনি যুক্তি দেন যে, ইসলামী রাজনৈতিক আন্দোলন ও জঙ্গিবাদ মূলত আধুনিক রাজনীতির ফল, কোনোভাবেই এটা সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় কারণে ঘটে নাই।
গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম বইতে তিনি যুক্তি দেন যে, ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইসলাম থেকে নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের কোল্ড ওয়ার সময়কার রাজনীতির ফল।
বইটি আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিকে কঠোরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মামদানি বলেন, এটি শুধু সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়—অনেক ক্ষেত্রে এটা জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক রাষ্ট্র ও শক্তির কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ফল। তিনি বলেন যে, এই হিংসা বিষয়টা ‘আধুনিক রাজনৈতিক অবস্থা’ এবং ‘রাজনৈতিক বাদানুবাদ’ থেকে উৎপন্ন—সংস্কৃতিগত বা ধর্মীয় ‘খারাপ ঐতিহ্যের’ ফলে এটা ঘটে নাই। কোল্ড ওয়ারের সময়কার যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, এবং সেই যুদ্ধকে পরিচালনার জন্য মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকার জায়গাগুলো ব্যবহার করা—যা রাজনৈতিক ইসলাম ও পরবর্তী সন্ত্রাসবাদীদের উত্থানে ভূমিকা রাখে।
মামদানি বলেন, সন্ত্রাসী শক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে, সেটাকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতার প্রসঙ্গে দেখা জরুরি।
জনপ্রিয় ধারণা যেমন ‘ইসলামই সন্ত্রাসের উৎস’ অথবা ‘ধর্মীয় ফ্যানাটিসিজম’ দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা যায়—এসব ধারণাকে মামদানি চ্যালেঞ্জ করেন এবং বলেন যে, বিশ্লেষণ এইভাবে করলে বাস্তব রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও ইতিহাস অস্পষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ‘ওয়ার অন টেরর’ মধ্যপ্রাচ্য-নিয়ন্ত্রণ, মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা হস্তক্ষেপ ইত্যাদিতে। এটি মুসলিমদের রাজনৈতিক পরিচয়, পশ্চিমা হস্তক্ষেপ, এবং আধুনিক রাষ্ট্র ও শক্তি কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় চিন্তার খোলনলচে হিসেবে কাজ করে।
‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ বইতে আমরা দেখি যে, এই বাইনারি কখন কীভাবে কাজ করে। লেখক দেখান যে, এই বিভাজন পশ্চিমা নীতি, মিডিয়া এবং রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে। বিশেষভাবে, তিনি দেখান যে, আফগানিস্তানে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ ও ১৯৭০-৮০ দশকে পশ্চিমা রাজনীতির ‘ভালো বনাম খারাপ’ তত্ত্ব এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল যেখানে রাজনৈতিক ইসলাম একটি শক্তিশালী শক্তি হিসেবে উঠে আসে।
কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, মামদানি একটু বেশি করেই যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাজনৈতিক মনোবলের অধীনে দেখিয়েছেন, কখনো কখনো তার যুক্তি-প্রমাণ খাঁটি না-হওয়ার মন্তব্যও আছে। বইটিতে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কিছু জটিল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে, তাই যারা বিষয়টি গভীরভাবে না জানেন, তাদের জন্য কিছু অংশ কঠিন মনে হতে পারে। একাধিক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা স্থানীয় পার্থক্য ও অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত না করতে পারার সমালোচনাও আছে।
বইটি প্রথম প্রকাশ হয় ২০০৪ সালে। লেখা হয়েছে ইংরেজিতে। বাংলা অনুবাদ আমার নজরে আসেনি, তবে বাংলাদেশের অনলাইন বই বিপণন প্রতিষ্ঠান রকমারি-তে ইংরেজি সংস্করণ পাওয়া যেতে দেখেছি। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই বইয়ের বিষয়বস্তু প্রাসঙ্গিক। কেননা এখানে আছে ইসলাম, রাজনৈতিক রাষ্ট্র, পশ্চিমা হস্তক্ষেপ, সশস্ত্র উত্তেজনা ইত্যাদি।
মাহমুদ মামদানি নিজেকে ক্রিটিকেল হিস্টোরিয়ান বলেন। তিনি পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ থেকে আফ্রিকার ইতিহাস বোঝার বিরোধিতা করেন। আফ্রিকার ঔপনিবেশিক ইতিহাস, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনীতি, জাতিগত পরিচয়, উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রব্যবস্থা তার চিন্তার জায়গা। তাঁর লেখায় উপনিবেশ, ধর্ম, জাতি, নাগরিকত্ব ও সহিংসতা—এই বিষয়গুলো বারবার ফিরে আসে। তিনি মানবিকতার রাজনীতি, স্মৃতি ও ন্যায়ের প্রশ্নে গভীরভাবে কাজ করেছেন। মাহমুদ মামদানি একাধারে আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিমা একাডেমিয়ার সেতুবন্ধনকারী একজন চিন্তাবিদ। তার কাজ আমাদের দেখায় যে, ‘ইতিহাস’ শুধু অতীত নয়, বরং বর্তমানের রাজনৈতিক বোঝাপড়ারও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বইয়ের প্রচ্ছদ
লেখাটা দারুণ!