[1]মোহাম্মদ আতেশ তুরস্কের কোনিয়া শহরে ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আংকারা … Continue readingতহা আবদুর রহমান ১৯৪৪ সালে মরক্কোর জাদিদা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মরক্কো তখন ফরাসি উপনিবেশের অধীন, তহা যাকে ‘প্রতাবশালী সাংস্কৃতিক উপনিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শিক্ষাব্যবস্থায় তখন উপনিবেশিক প্রভাবের কারণে পুরোপুরি ফরাসি মডেলে শিক্ষিত তরুণদের সঙ্গে স্থানীয় ট্রাডিশনাল শিক্ষায় (مدارس الأعيان) বেড়ে ওঠা তরুণদের মধ্যে স্পষ্ট দূরত্ব এবং বিভাজন তৈরি হয়। কিন্তু তহা আবদুর রহমান তাঁর শৈশবের শিক্ষাপথে এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশের বাইরে থাকতে পেরেছিলেন—কারণ তাঁর বাবার নিজেরই ছিল একটি প্রথাগত ধর্মীয় মাদরাসা। তহা সেই মাদরাসাতে শৈশবের পড়াশোনা শেষ করেন, যেখানে কুরআন হিফজের পাশাপাশি ক্লাসিক ইলমি মতন পড়ানো ও মুখস্থ করানো হতো।
তহার বাবা তাঁকে স্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তোলার ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি শুধু ফিকহি হুকুম-আহকাম ও ক্লাসিক মতনগুলোই মুখস্থ করেননি, বরং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ ও নৈতিক জীবনচর্চার দিকনির্দেশনাও পেয়েছিলেন। এই শৈশবের শিক্ষা তাকে ফিকহি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করে। পরে তিনি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়—এই ধারাতেও পড়াশোনা সম্পন্ন করেন।
কাসাব্লাংকায় তিনি হাইস্কুলের পাঠ শেষ করেন। এরপর রাবাতের পঞ্চম মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি যুক্তিবিদ্যা নিয়ে গভীরভাবে মনোনিবেশ করেন। পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতিও তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল—কবিতাও লিখতেন। সেই সময়ে ‘আরব লেখক সংঘ’ নতুন সদস্য নেওয়ার জন্য একটি কবিতা প্রতিযোগিতা আয়োজন করলে তহা আবদুর রহমান একটি দীর্ঘ কাসিদা রচনা করে অংশ নেন এবং সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।
এরপর উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ফ্রান্সে পাড়ি জমান। ১৯৭২ সালে সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা-দর্শন (Philosophy of Language) বিভাগে প্রথম ডক্টরেট সম্পন্ন করেন—ভাষা ও দর্শন : অন্টোলজির ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামো শীর্ষক গবেষণাপত্রের মাধ্যমে। পরে ১৯৮৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান’ বিভাগ থেকে দ্বিতীয় ডক্টরেট অর্জন করেন, যার গবেষণাপত্র ছিল ডিডাক্টিভ ও ন্যাচারাল আর্গুমেন্টেশন এবং এর মডেলসমূহ।
তহার পেশাগত জীবন সূচনা হয় ১৯৭০ সালে। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করা রাবাতের পঞ্চম মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ‘সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান’ অনুষদে যুক্তিবিদ্যা ও ভাষা-দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তবে তাঁর শিক্ষকতা শুরুর সময় মাগরিব অঞ্চলের দুটি প্রভাবশালী ধারার—কমিউনিস্ট ও লিবারেল—মধ্যকার তীব্র আদর্শিক দ্বন্দ্ব একাডেমিয়াকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদ্ধতি ও মেথডোলজি মেনে চলতে চাওয়া যেকোনো চিন্তাকেই অনর্থক বৌদ্ধিক বিলাসিতা বা বুর্জোয়া আদর্শের সেবায় নিয়োজিত কাজ বলে বিবেচনা করা হতো। ফলে মার্কসবাদী বস্তুবাদী দ্বন্দ্বতত্ত্বকে ভিত্তি না করে পরিচালিত অধিকাংশ ক্লাস ও সেমিনার কঠোর সমালোচনার মুখে পড়ত—এমনকি অনেক সময় বয়কটও করা হতো।
তহা আবদুর রহমান এই প্রভাবশালী ও কট্টর মতাদর্শিক মনোভাবকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি চিন্তার নির্মাণে যৌক্তিক পদ্ধতি ও র্যাশনালিটির সরঞ্জামকে ভিত্তি করার আহ্বান জানান। বৈজ্ঞানিক ও বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ডে লজিক ও মেথডোলজির ভূমিকা কতটা জরুরি—এ কথা তিনি বারবার ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি আরো জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষাকর্ম ও তাত্ত্বিক আলোচনায় বিষয়বস্তুকে পদ্ধতি ও মেথডোলজির তুলনায় অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
তাঁর নিজের অবস্থানও ছিল পরিষ্কার। ফেনোমেনোলজিক্যাল পদ্ধতিগুলোর ব্যাপারে তিনি সংযত ও সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গি নেন; আর তাঁর গবেষণা ও রচিত গ্রন্থগুলোতে যে মত ও তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, সেগুলো দাঁড়িয়ে ছিল যুক্তিবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, যুক্তিদর্শন ও ভাষাদর্শন—এই ডিসিপ্লিনগুলোর সর্বশেষ অগ্রগতির উপর।
ফ্রান্সে দর্শনে তাখাসুস সম্পন্ন করা তহা আবদুর রহমান বিভিন্ন দার্শনিক ধারা থেকে প্রভাবিত হয়েছেন। বিশেষত তাঁর মূল বিশেষায়িত দুই ক্ষেত্র—লজিক ও ভাষাদর্শন—এই অঙ্গনের আধুনিক অগ্রগতি তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর ভাষা ও দর্শন : অন্টোলজির ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামো শীর্ষক ডক্টরাল গবেষণা পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট বোঝা যায়, যুক্তিবাদী পজিটিভিজমের দাবির প্রতি তিনি সতর্ক ও সংযত থাকলেও এনালিটিক দর্শনের পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা ও যুক্তিগত কঠোরতা সেখানে শক্তভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
শিক্ষকতা জীবনের শুরুতেই তিনি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ (Logicism)—এই দুই ধারার তীব্র বিরোধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন; কোনো পক্ষেই নিজেকে জড়াননি। চিন্তাজীবনের আরো প্রারম্ভে তিনি বুঝতে পারেন যে যুক্তিবাদী পজিটিভিজমের প্রকল্প মূলত ব্যর্থ হয়েছে। আর এই উপলব্ধিই তাঁকে স্বাভাবিক ভাষার দর্শনের দিকে আরো প্রবণ করে তুলে।
তহা যাদের থেকে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে আশআরী ধারার বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আলী সামী আন–নাশশার অন্যতম। পাঠদান ও রচনার উভয়ক্ষেত্রেই তিনি পদ্ধতি ও পদ্ধতিতত্ত্বকে সর্বাগ্রে রেখেছেন এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে চিন্তার এই দিকটিতে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত ইসলামী দর্শনের বীজ নিহিত রয়েছে প্রারম্ভিক যুগের সেইসব কালামবিদদের বৌদ্ধিক সাধনায়, যারা স্বকীয় ও মৌলিক পদ্ধতির অধিকারী ছিলেন। এই দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রতিফলন তহা আবদুর রহমানের দার্শনিক প্রকল্পগুলোতে অন্তর্লীনভাবে দেখা যায়। অন্যদিকে, মুসলিম পার্সোনালিজমের প্রবর্তক মরক্কোর দার্শনিক মুহাম্মদ আজীজ লাহবাবীর দিকনির্দেশনাও তহা আবদুর রহমানের দার্শনিক উদ্বেগ ও অনুসন্ধানে লক্ষণীয় প্রভাব ফেলেছে—বিশেষ করে লাহবাবীর মুসলমানদের দার্শনিক চিন্তায় সৃষ্টিশীলতা অর্জনের আহ্বান।
ইলমুল মানতেক তথা যুক্তিবিদ্যায় তহা আবদুর রহমানের ব্যুৎপত্তি যতই গভীর হচ্ছিল, ততই তাঁর এই উপলব্ধি দৃঢ় হয়ে উঠছিল যে শিক্ষা-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত আকল (বুদ্ধি) মূলত সীমিত ও অপ্রতুল। তাঁর দৃষ্টিতে এই আকল ছিল কেবল একটি টুল—যা বস্তুজগৎসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু এর বাইরে যেতে পারে না। একজন দর্শনচর্চাকারী হিসেবে তিনি এই সীমাবদ্ধতাগুলো পরীক্ষা করা এবং সম্ভব হলে অতিক্রম করার প্রয়োজন অনুভব করেন। সেই অনুভূতিই তাঁকে রুহানি জ্ঞানের কাঠামো অনুসন্ধানের দিকে প্রথম প্রেরণা দেয়। তিনি বুঝেছিলেন, শিক্ষালব্ধ ও টুলভিত্তিক আকলের সীমানা অতিক্রম করার সামর্থ্য যেই জ্ঞানের আছে—তার উৎস এখানেই।
এই সূত্র ধরেই তিনি এক মুর্শিদের তত্ত্বাবধানে সাইরে–সুলুকের পথে আগোনোর সিদ্ধান্ত নেন এবং রুহানিয়াতের অনুসন্ধান শুরু করেন। অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় তিনি মরক্কোর কাদিরি তরিকার শায়খদের অন্যতম হজরত সিদি হামজার হাতে বাইআত গ্রহণ করেন। এর মধ্য দিয়েই তাসাউফ তাঁর জন্য পাঠ্যজ্ঞান থেকে জীবন্ত অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়—একজন মুর্শিদের সান্নিধ্যে সরাসরি সাধনার অনুশীলন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর এদরাক (উপলব্ধি–জ্ঞান) আরো বিস্তৃত করে, এবং মহাবিশ্ব তাঁর সামনে আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। তিনি নিজেই এই সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে লিখেছেন :
“আমার আল-আমালুদ-দ্বীনি ওয়া তাজদীদুল আকল গ্রন্থটির সঙ্গে আমার সুফি অভিজ্ঞতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। (…) এই বইতে আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা দেখানো যে, রুহানি বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই আকল–ভিত্তিক জ্ঞানের বিরোধী নয়; বরং আকলকে আরো সমৃদ্ধ ও গভীর করতে পারে।”[2]তহা আবদুর রহমান, হিওয়ারাতুন মিন আজলিল-মুস্তাকবাল, ২০১১, পৃ. ১৩৮
আসলে তসাউফি অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। এই অভিজ্ঞতার ফলে তিনি যে রুহানি জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়া) অর্জন করেন এবং তাঁর বৌদ্ধিক জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তা তিনি এভাবে ব্যক্ত করেছেন :
“আগে আমি বস্তুর শুধু বাহ্যিক দিকেই নজর দিতাম; ভেতরের স্তরে যেতে পারতাম না। এখন আমি বস্তুর অন্তর্নিহিত অর্থ ও মূল্যগুলোকে একজন চিকিৎসকের সূক্ষ্ম নজর দিয়ে বিশ্লেষণ করি। সত্যি বলতে, আগে আমার কাছে দুনিয়া ছিল এমন এক বস্তুগত সমুদ্র—যা আমরা চাইলে ব্যবহার করতে পারি। আজ আমি দুনিয়াকে দেখি মানুষের হাতে অর্পিত এক আমানত হিসেবে।”[3]রেজোয়ান মরহুম, তহা আবদুর রহমান বিশেষ সংখ্যা, পৃ. ২৪
এই তাসাউফি অভিজ্ঞতার পর তহা আবদুর রহমান ইমাম গাজালির সমগ্র রচনাবলি অত্যন্ত মনোযোগ ও গভীরতার সঙ্গে পাঠ করেন। এর আগে তিনি মূলত গাজালির যুক্তিবিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থগুলোই অধ্যয়ন করেছিলেন; কিন্তু এবার তিনি গাজালির চিন্তাজগতের পূর্ণপরিসরে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন এবং তাঁর দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তবে তসাউফি অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে গাজালি তাঁর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেললেও, পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি নিজেকে গাজালির চেয়ে ইবনে আরাবির বেশি কাছাকাছি মনে করেন। তাঁর মতে, গাজালি এরিস্টটলীয় যুক্তিকে আকলের পরম মানদণ্ড হিসেবে ধরে নিয়ে এর প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য দেখিয়েছেন। অথচ তহা আবদুর রহমানের দৃষ্টিতে এরিস্টটলীয় যুক্তিকে আকলের পরম যুক্তি (absolute logic) হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে কোনো বাধ্যতামূলক যুক্তি তো নেইই—এমনকি ন্যূনতম প্ররোচনামূলক যুক্তিও অনুপস্থিত।
কর্মজীবনে তহা আবদুর রহমান ১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং ২০০৫ সালে এই পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এ দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মিশর, লিবিয়া ও ইরাকসহ আরববিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে, তহা আবদুর রহমান রাবাত-কেন্দ্রিক মরোক্কান লেখক সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্গুমেন্টেশন গবেষণা সমিতি এবং জার্মানির কোলোনে অবস্থিত দর্শন ও আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ত্রিপোলিভিত্তিক বিশ্ব ইসলামী দাওয়াত সংস্থার সাবেক সদস্য ছিলেন। বিশ্ব মুসলিম স্কলার ইউনিয়নের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য তিনি এবং ২০০৭ সাল থেকে একই সংগঠনের প্রকাশিত আল-উম্মাতুল ওয়াসাত সাময়িকীর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া তিনি ওমানভিত্তিক আরব দর্শন সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি।
এদিকে রাবাতে অবস্থিত চিন্তাবিদ ও গবেষকদের হিকমত ফোরাম-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মরক্কো রাজকীয় একাডেমির বিশেষজ্ঞ সদস্যদের একজন এবং বহু একাডেমিক সাময়িকীতে রিভিউয়ার ও পরামর্শক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
পুরস্কার ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে, ১৯৮৮ সালে ফি উসুলিল হিওয়ার ও তাজদিদে ইলমুল কালাম এবং ১৯৯৫ সালে তাজদিদুল মানহাজ ফি তাকভিমিত তুরাস গ্রন্থের জন্য তিনি মরক্কোর মানববিদ্যা পুরস্কার লাভ করেন। ২০০৬ সালে সুয়ালুল আখলাক : পাশ্চাত্য আধুনিকতার নৈতিক সমালোচনায় একটি অংশগ্রহণ গ্রন্থের জন্য তিনি ISESCO কর্তৃক ইসলামী গবেষণা পুরস্কারে ভূষিত হন। সর্বশেষ, ২০১৪ সালে তিনি ষষ্ঠ মুহাম্মদ ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা পুরস্কার লাভ করেন।
তহার চিন্তাধারা
দীর্ঘ চিন্তাশীল ও দার্শনিক জীবনজুড়ে তহা আবদুর রহমান নিরবচ্ছিন্ন বৌদ্ধিক সংযম ও গভীরতার সঙ্গে নানা বিষয়কে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যায়িত করেছেন। তাঁর এই সমালোচনামূলক অনুসন্ধান ও দার্শনিক বিশ্লেষণের অন্তর্নিহিত প্রেরণা—যেমনটা প্রতীয়মান হয়—হিসেবে কাজ করেছে এমন এক মৌলিক ও নান্দনিক চিন্তাপথ নির্মাণের তাড়না, যা নৈতিক সময়ের ধারক মুসলিম উম্মাহকে পরস্পরের প্রতি এবং সমগ্র মানবতার প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সক্ষম করে তুলবে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি মুসলিম সমাজের সমকালীন বাস্তবতায় উদ্ভূত সহিংসতা ফেনোমেনা থেকে নিয়ে পাশ্চাত্য আধুনিকতার অন্তর্নিহিত আত্মা পর্যন্ত বিস্তৃত বহুবিধ বিষয়ে চিন্তা করেছেন এবং সেই চিন্তাগুলোকে সুসংবদ্ধ দার্শনিক প্রকল্পের রূপ দিয়েছেন। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের বিচারে বিশেষভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে উঠেছে ‘আকলের স্বরূপ’, ‘আধুনিকতার আত্মা’, এবং ‘ঐতিহ্য পাঠের পদ্ধতি ও মৌলিক দার্শনিক সৃজন’—এই বিষয়সমূহ।
আকলের স্বরূপ
তহা আবদুর রহমান তাঁর প্রাথমিক রচনাগুলো থেকেই ‘আকল’ ধারণাটিকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন এবং পরবর্তী প্রতিটি গ্রন্থে এই আলোচনাকে ক্রমশ আরো গভীরতর করে একটি সুসংহত দার্শনিক প্রকল্পের রূপ দিয়েছেন। আকল-সংক্রান্ত এই অবিচ্ছিন্ন অনুসন্ধানের মূল প্রেরণা নিহিত রয়েছে তাঁর এই দৃঢ় বিশ্বাসে যে, ইসলামী দর্শনের স্থবিরতা থেকে গতিশীলতার দিকে অগ্রসর হওয়া এবং অনুকরণনির্ভর র্যাশনালিটি থেকে সরে এসে একটি মৌলিক ও স্বকীয় র্যাশনালিটিতে পৌঁছানো কেবল তখনই সম্ভব, যখন আকলকে নতুনভাবে এবং মৌলিক ভিত্তিতে পুনর্গঠন করা হবে।
প্রথমেই স্পষ্ট করে বলা দরকার, তহা আবদুর রহমানের দার্শনিক সমস্যায়ন-পদ্ধতি সেই ‘বুরহানী যুক্তি’র (Demonstrative logic) ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, যা যুক্তির একক ও একরূপ কাঠামোকেই জ্ঞান উৎপাদনের একমাত্র প্রক্রিয়া বলে গণ্য করে। বরং তিনি যুক্তির দর্শনের সাম্প্রতিক বিকাশ এবং ভাষাবিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে বিশেষত ডিসকোর্স বিশ্লেষণকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ তাঁর মতে, দর্শনের কাজ হলো বিভিন্ন স্তরের বক্তব্যের ভেতর দিয়ে সঞ্চালিত চিন্তাগত গতিশীলতাকে অনুসন্ধান করা। এই কারণেই বলা যায়, তিনি প্রথাগত দার্শনিক সমস্যায়ন-পদ্ধতি পরিত্যাগ করে একটি নতুন দার্শনিক সমস্যায়ন-পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন। তাঁর মতে, ‘দার্শনিক প্রশ্ন’ সক্রেটিসের মতো কেবল অনুসন্ধান নয়, আবার কান্টের মতো নিছক সমালোচনাও নয়। বরং ‘দার্শনিক প্রশ্ন’ নিজের বিষয়কে যেমন প্রশ্ন করে, তেমনি নিজের অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। অর্থাৎ, বিষয়কে যতটা অনুসন্ধান করে, নিজের ভিত্তিকেও ততটাই অনুসন্ধান করে। একইভাবে, বিষয়কে যতটা সমালোচনা করে, নিজের ভিত্তিকেও ততটাই সমালোচনা করে।[4]আল-হামরি, ২০১৯
এই প্রেক্ষিতে তহা আবদুর রহমান চিন্তার ইতিহাসে গড়ে ওঠা দুই ধরনের ‘আকল’ অবধারণার সমালোচনা করেন। এর একটি হলো অ্যারিস্টটলের আকল-তত্ত্ব, যা বিভিন্ন ইসলামী শাস্ত্রেও প্রভাব বিস্তার করেছে; অপরটি হলো দেকার্তের আকল-তত্ত্ব, যা আধুনিক দর্শনের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
তাঁর মতে, অ্যারিস্টটলের সংজ্ঞা—‘আকল হলো মানুষের মধ্যে বিদ্যমান এমন এক এসেন্স বা জওহর, যা তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র করে এবং জ্ঞান গ্রহণে সক্ষম করে তোলে’[5]আবদুর রহমান, ২০০০, পৃ. ৬২ —আকলকে স্বতন্ত্র অস্তিত্বসম্পন্ন বা স্বয়ম্ভু একটি ‘জওহর’ হিসেবে গণ্য করে। অথচ সঠিক হলো অন্যান্য কর্মের মতো আকলকেও একটি কর্ম, বরং এমন একটি কর্ম, যা মানুষের কর্তা-হওয়ার ক্ষমতা বা এজেন্সি এবং কর্তা হিসেবে তার বৈশিষ্ট্যগুলো সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। কারণ আকল মানুষের অন্যান্য সকল কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করে। যেমন, যে দেখে, সে যা দেখে তা চিন্তা করতে করতেই দেখে; যে শোনে, সে যা শোনে তা উপলব্ধি করতে করতেই শোনে।
এর পাশাপাশি আকলও কর্মের মতো কখনো সুন্দর, কখনো কুৎসিত হতে পারে। যখন তার অধিকারী আকলের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞানের পথে অগ্রসর হয়, তখন তা সুন্দর হয়; আর যখন সে সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে আকলকে সংশয়, খেয়ালখুশি ও কামনার ময়দানে ঠেলে দেয়, তখন তা কুৎসিত হয়ে ওঠে। একইভাবে আকলও কর্মের মতো রূপান্তর ও পরিবর্তন গ্রহণ করে; কেননা আকলগত ক্রিয়াকে পরিচালনা করা এবং তার ওপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব। তাছাড়া আরো একটি দিক হলো, উক্ত সংজ্ঞা মানুষকে পরস্পরবিচ্ছিন্ন অংশে বিভক্ত করে ফেলে; কারণ আকলকে ‘সত্তা’ বা ‘জওহর’ হিসেবে চিহ্নিত করা মানে তাকে মানুষের স্বরূপ নির্ধারণকারী অন্যান্য গুণ—যেমন ‘কর্ম’ ও ‘অভিজ্ঞতা’—থেকে আলাদা করে দেওয়া। ফলে যদি গ্রিক চিন্তার মতো আকলকে জওহর হিসেবে স্বীকার করা হয়, তবে কর্ম ও অভিজ্ঞতাকেও জওহর হিসেবে স্বীকার করতে হবে। এর পরিণতিতে মানুষের মধ্যে ‘চিন্তাশীল সত্তা’, ‘কর্মসম্পাদনকারী সত্তা’ ও ‘অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সত্তা’—এমন একাধিক সত্তার অস্তিত্ব মেনে নিতে হয়। অথচ এই ধরনের প্রতিপাদ্য বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; কেননা এটি মানুষের ঐক্যগত সত্তার বাস্তবতাকে[6]মানবসত্তার এই অখণ্ডতার ধারণা আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের একাধিক ধারায় … Continue reading লঙ্ঘন করে—যেখানে মানবগুণাবলি পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয় এবং মানবকর্মসমূহ একে অপরের মধ্যে প্রবেশ করে একটি অখণ্ড কার্য-সমগ্র নির্মাণ করে।
এদিকে দেকার্তের আকল-তত্ত্ব প্রসঙ্গে তহা আবদুর রহমান মনে করেন, দেকার্ত আকলকে এমন এক আধারে বিনির্মাণ করেছেন যেখানে আকলের পরিচয় নিহিত থাকে আধুনিক বিজ্ঞান, বিশেষত গণিতের কর্মপরিধির আলোকে নির্ধারিত বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিসমূহের প্রয়োগের মধ্যে।[7]সুয়ালুল আখলাক : ৬৪ আবদুর রহমান দেখান যে, এই সংজ্ঞায়নের কেন্দ্রস্থলে ‘বৈজ্ঞানিক-যৌক্তিক পদ্ধতি’কে(scientific rational method) স্থাপন করার ফলে আকল মূলত ‘আপেক্ষিকতা’র সংকটে নিপতিত হয়। এর তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, আকলের চিরায়ত ও সামষ্টিক নিয়মাবলি নিয়ে যে ‘মানতেক’ বা যুক্তিবিদ্যা আলোচনা করে, তার ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বিষয়বস্তুকে যদি গভীর ও সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যায় তা কোনো একক বা অপরিবর্তনীয় শাশ্বত নিয়মের সমষ্টি নয়। বরং যুক্তিবিদ্যা স্বয়ং বহুবিধ ও পরিবর্তনশীল নিয়ম ও স্বীকার্যের ওপর দণ্ডায়মান। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে আকলগত ব্যবস্থা ও তত্ত্বসমূহও হয়ে ওঠে বহুবিধ ও রূপান্তরশীল। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, এক যুক্তিব্যবস্থা বা তত্ত্বের মানদণ্ডে যা ধ্রুব ‘সত্য’ হিসেবে স্বীকৃত, অন্য কোনো ভিন্নতর যুক্তিকাঠামো বা তত্ত্বের বিচারে তা আর সত্য বলে গণ্য হয় না।
তহা আবদুর রহমানের ‘আকল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিনির্মাণের কেন্দ্রীয় ধারণাটি হলো—আকল কোনো স্থির সত্তা বা ‘জাত’ (essence) নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া বা ‘কর্ম’ (action)। দার্শনিক পরিভাষায় বলতে গেলে, আকল কোনো ‘জওহর’ বা স্বতন্ত্র অস্তিত্বসম্পন্ন সত্তা নয়, বরং তা একটি ‘আরাজ’ বা গুণবাচক বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনের ভাষ্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে আকলের যে অর্থ বর্ণিত হয়েছে তা গ্রিক দর্শনে প্রচলিত আকলের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই মূলভিত্তি রূপকার পাঠ্যসমূহে (foundational texts) আকলকে দেখা হয়েছে শ্রবণ, দর্শন, আস্বাদন কিংবা ঘ্রাণ গ্রহণের মতো একটি জীবন্ত কর্ম হিসেবে। আকল হলো মানুষের উপলব্ধিগত বা ‘ইদরাকি’ কর্মসমূহেরই একটি বিশেষ রূপ; আর কুরআনে একে ‘ফিকহ’ এবং ‘ইলম’ শব্দ দুটির সাথে সমার্থক হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। কোনো আরবি ভাষাতাত্ত্বিক যেমন আস্বাদন বা ঘ্রাণ গ্রহণকে স্বতন্ত্র ‘জাত’ বা সত্তা হিসেবে অভিহিত করেন না, তেমনি তাঁরা আকলকেও কোনো ‘সত্তা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেননি।
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, ইসলামের এই বুনিয়াদি পাঠ অনুসারে আকল কোনো ‘জওহর’ বা এমন কোনো বস্তু নয় যা নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় স্বয়ংসম্পূর্ণ বা অন্যের মুখাপেক্ষী নয়। আকলকে একটি ‘বস্তু’ হিসেবে বিচার করলে তা স্থবিরতায় পর্যবসিত হয়; অথচ বাস্তবতা হলো, আকলের মধ্যে এমন এক প্রাণময়তা, গতিশীলতা ও শক্তি নিহিত থাকে যা কোনো সীমাবদ্ধ ‘সত্তা’ বা ‘মাহিয়াত’ (quiddity) ধারণ করতে অক্ষম। তবে প্রশ্ন জাগে, এই যে উপলব্ধিগত কর্ম—তার উৎস কী? তহা আবদুর রহমানের মতে, কুরআনের উত্তর এখানে সুস্পষ্ট ও অকাট্য—আকলের উৎস হলো ‘কলব’ বা অন্তর। আকল মূলত অন্তরেরই এক বিশেষ কার্যাবলি; এটি অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি বিশিষ্ট কর্ম। পবিত্র কুরআনের সেই আয়াত— “তাদের কলব রয়েছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা ‘আকল’ করে না”[8]হজ, ২২:৪৬—এ বিষয়টিকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। এখানে আকল একটি সুস্পষ্ট কর্মপ্রক্রিয়া। শ্রবণ যেমন একটি কাজ যার যন্ত্র হলো কর্ণ, দর্শন যেমন একটি কাজ যার যন্ত্র হলো চক্ষু; আকলও তেমনি একটি সুনির্দিষ্ট কর্ম যার মাধ্যম বা যন্ত্র হলো ‘কলব’। উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআনের উনপঞ্চাশটি আয়াতের সবকটিতেই ‘আকল’ শব্দটি ‘ক্রিয়া’ বা ফেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, কোথাও একে বিশেষ্য বা এসেম হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।[9]আবদুর রহমান, সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ৬৪
এই আলোচনার সূত্র ধরে তহা আবদুর রহমান আকল ও বহুত্বের মাঝে এক নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাঁর মতে, আকল কোনো একক বা অখণ্ড সত্তা নয়, বরং তা বহুত্বকে ধারণ করে; এই অবস্থাকে তিনি ‘তাকাউসুর’ বা বহুত্বায়ন হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘কলব’ বা অন্তরকে আমরা সত্তা বা অনুষদ পড়ে—যা-ই বলি না কেন, তা কখনো এক অবস্থায় স্থির থাকে না। এটি নিরন্তর বিবর্তন ও পরিবর্তনের (তাকাল্লুব) মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। ফলত, অন্তরের নিজস্ব কর্ম হিসেবে ‘আকল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়াটিও অন্তরের মতোই পরিবর্তনশীল। অন্তরের এই ক্রমাগত রূপান্তরের কারণেই আকলের মধ্যে এক ধরনের বহুত্বের উদ্ভব ঘটে।
এই প্রেক্ষাপটে আবদুর রহমান মনে করেন, একক কোনো ‘আকল’ নয়, বরং আমাদের ‘আকলসমূহ’ বা বুদ্ধিবৃত্তির বহুমুখিতা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। এমনকি তাঁর মতে, সেই আকলই শ্রেষ্ঠ বা পূর্ণাঙ্গ, যার রূপান্তর ও বিবর্তিত হওয়ার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। কারণ, মানুষের অন্তরে প্রতিনিয়ত বিচিত্র সব অবস্থার উদয় ঘটে—যার কিছু ইন্দ্রিয়জাত (sensory), আবার কিছু আধ্যাত্মিক বা রুহানি। স্বাভাবিকভাবেই অন্তরের এই বিচিত্র দশাগুলো তার কর্মের উপরও প্রতিফলিত হয়। যেহেতু আকলগত ক্রিয়াসমূহ কলব থেকেই উৎসারিত হয়, তাই এই বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মের ভেতরেও কিছুটা আবেগ এবং কিছুটা আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ থাকে। অর্থাৎ, তহা আবদুর রহমানের ভাবনায় বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়ার মধ্যে ইন্দ্রিয়জাত অনুভব এবং রুহানি ব্যঞ্জনা একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে থাকে।
তহা আবদুর রহমানের চিন্তাকাঠামোয় ‘কলব’ বা অন্তর যখন আকলের একমাত্র উৎস এবং ফলত জ্ঞানেরও আধার হিসেবে পরিগণিত হয়, তখন এই প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে যে—কলব থেকে উৎসারিত এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ‘এপিস্টেমিক’ (জ্ঞানতাত্ত্বিক) ক্রিয়ার প্রকৃত স্বরূপ কী? তাঁর মতে, শ্রবণেন্দ্রিয় যেমন শব্দ গ্রহণ করে এবং চাক্ষুষ ইন্দ্রিয় যেমন রূপ বা আকৃতি গ্রহণ করে, তেমনি অন্তর থেকে নিঃসৃত ‘আকল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়া মূলত বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার পারস্পরিক সম্বন্ধ বা সংযোগসমূহকে (relationships) শনাক্ত করে। অন্তর মূলত বিভিন্ন সত্তার মাঝে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে তাদের একীভূত করার কাজ সম্পন্ন করে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ‘আকল করা’ বা বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করার অর্থ হলো—সত্তা ও বিষয়ের মাঝে সঠিক ও বৈধ সংযোগ স্থাপন করা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি আকলকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন : “আকল হলো বস্তুসমূহের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে কলবের মাধ্যমে উপলব্ধি করার নাম।”[10]আবদুর রহমান, সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ৭৩
বস্তুনিচয়ের মধ্যকার এই সংযোগের সম্ভাবনা যেহেতু অগণিত ও অসীম, তাই এই সংযোগ শনাক্তকারী ক্রিয়াটিও সমভাবে বহুমুখী ও অগণিত হওয়া আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে বিজ্ঞানের ইতিহাসও এই সত্যেরই সাক্ষ্য দেয়; কেননা মানবেতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যা ‘আকলি’ বা যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়েছে, তা সময়ের বিবর্তনে বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। অবস্থা এমন যে, ইতিহাসের এক পর্যায়ে যা যৌক্তিক ছিল, পরবর্তী ধাপে তা-ই আবার অযৌক্তিক বলে গণ্য হয়েছে। কেবল সামষ্টিক ইতিহাসেই নয়, বরং ব্যক্তির আত্মিক বিকাশের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনশীলতা সমানভাবে সত্য। একজন ব্যক্তি তাঁর জীবনের এক সন্ধিক্ষণে যা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত মনে করেন, জীবনের অন্য প্রান্তে এসে তাকেই হয়তো চরম যুক্তিহীন বলে সাব্যস্ত করেন। আকলের এই পরিবর্তনশীলতা কেবল কালগত (temporal) নয়, বরং তা স্থানগত বা প্রেক্ষাপটনির্ভরও (spatial) হতে পারে। কোনো একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে, জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে কিংবা সুনির্দিষ্ট কোনো যৌক্তিক কাঠামোতে যা ‘আকলি’ বা যৌক্তিক হিসেবে স্বীকৃত, অন্য কোনো ভিন্নতর পরিসরে তা-ই আবার অযৌক্তিক বলে বিবেচিত হতে পারে।
তহা আবদুর রহমানের মতে, এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য: আকলের সংজ্ঞায় যে সংযোগের কথা বলা হয়েছে, সে সম্পর্কে পাশ্চাত্য ও মুসলিমদের তাত্ত্বিক অবধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রিকদের দর্শনে এই সংযোগ ছিল সমগ্র মহাবিশ্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত; তারা বিশ্বাস করত যে, মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা বা ‘নিজাম’ মূলত আকলের মাধ্যমেই বিনির্মিত। তাদের কাছে বুদ্ধিবৃত্তিক এই শৃঙ্খলা ছিল পরস্পরসংলগ্ন বিভিন্ন সম্পর্কের এক সমন্বিত রূপ, যা একটি অখণ্ড ও মহাজাগতিক ব্যবস্থা গঠন করে। এভাবে গ্রিকরা মহাবিশ্বের পরতে পরতে আকলের এই ‘সংযুক্তিকামী’ রূপটিকেই স্বীকার করে নিয়েছিল।
পক্ষান্তরে, আধুনিক পাশ্চাত্যের তাত্ত্বিক কাঠামোতে আকলের কাজ মহাজাগতিক শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে বস্তুনিচয়কে পরস্পরের সাথে যুক্ত করা নয়; বরং সেখানে আকলের ভূমিকা হলো ‘উপকরণ’ (means) এবং ‘উদ্দেশ্য’ (ends)-এর মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করা। আধুনিক এই অবধারণায় যৌক্তিক সংযোগ স্থাপনের অর্থ হলো—যেকোনো অভীষ্ট লক্ষ্যের জন্য একটি উপযোগী মাধ্যম বা উসিলা খুঁজে বের করা। একেই মূলত ‘আরজি আকল’ বা ‘ইন্সট্রুমেন্টাল রিজন’ (instrumental reason) হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই যান্ত্রিক যৌক্তিকতা মূলত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের জন্য যথোপযুক্ত কৌশল উদ্ভাবন করার পেছনেই ব্যতিব্যস্ত থাকে; পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, যা একসময় ‘উদ্দেশ্য’ ছিল, একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর তা নিছক ‘উপকরণে’ পরিণত হয় এবং এই অন্তহীন প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ই কেবল একটি ‘উপকরণ’ বা উসিলায় রূপান্তরিত হয় এবং গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, সেখানে ‘গন্তব্য’ বা ‘উদ্দেশ্য’ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।[11]আবদুর রহমান, ২০০০
বিপরীতে, ইসলামি অবধারণায় আকলের ‘সংযুক্তিকামী’ রূপটি কেবল উপকরণ ও উদ্দেশ্যের মধ্যকার যান্ত্রিক সম্পর্ক হিসেবে প্রকাশ পায় না; বরং তা মূলত ‘উপকরণ’ (means) ও ‘মূল্যবোধ’ (values)-এর মধ্যকার এক গভীর যোগসূত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ মূল্যবোধ যেকোনো পার্থিব উপকরণ বা উসিলাকে এমন এক উচ্চতায় উন্নীত করে যা নিছক জড়বাদী বা বস্তুগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে যায়। একটি উপকরণ বাহ্যত বস্তুগত হওয়া সত্ত্বেও মূল্যবোধের সাথে এই নিবিড় সম্পর্কের কারণে তা এক অনন্য ‘আদর্শিক অর্থ’ (ideal meaning) লাভ করে। এই প্রেক্ষাপটে, উপকরণের উপর মূল্যবোধের যে প্রভাব—তাকে ‘উপকরণের মূল্যবোধায়ন’ (valorization of means) হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে।
এরই সূত্র ধরে বলা যায় যে, আকলের এই সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবধান অনেকটা আলো ও আধারের মধ্যকার পার্থিব বৈপরীত্যের মতো। কারণ পাশ্চাত্য অবধারণায় প্রতিটি মহৎ লক্ষ্য বা ‘উদ্দেশ্য’ শেষ পর্যন্ত তার উচ্চতর মর্যাদা হারিয়ে তুচ্ছ ‘উপকরণে’ পর্যবসিত হয়। অন্যদিকে, ইসলামি অবধারণায় প্রতিটি জাগতিক ‘উপকরণ’ তার বস্তুগত সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে এক উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্তবায় উন্নীত হয় এবং মূল্যবোধের স্তরে আসীন হয়। অর্থাৎ, যেখানে পাশ্চাত্য আকল সবকিছুকে ‘ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রে’ রূপান্তর করে, সেখানে ইসলামি আকল প্রতিটি যন্ত্র বা উপকরণকেই একটি ‘মূল্যবান অর্থে’ রূপান্তরিত করে। আর আকল বা বুদ্ধি-ধারণার এই বিনির্মাণ (deconstruction) ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তহা আবদুর রহমান তিন ধরনের যৌক্তিকতা বা র্যাশনালিটির অবতারণা করেছেন এবং তাদের পারস্পরিক পার্থক্য নিরূপণ করেছেন।
১. মুজাররাদ র্যাশনালিটি (বিমূর্ত আকল): প্রথমত তিনি ‘বিমূর্ত আকল’ (Abstract Rationality)-এর কথা বলেন। সাধারণ মানুষ এবং বিশেষত দার্শনিকদের ধারণা হলো—বিমূর্ত বুদ্ধি ইন্দ্রিয়জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আবদুর রহমান এই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দাবি করেন যে, এই বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরেও ইন্দ্রিয়জাত প্রভাব অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিদ্যমান। তাঁর মতে, বিমূর্ত আকল কেবল ইন্দ্রিয়লব্ধ ‘বিষয়বস্তু’ (content) থেকে মুক্ত হয়, কিন্তু ইন্দ্রিয়জাত ‘আকার’ বা কাঠামোকে (forms and shapes) সে নিজের ভেতরে হুবহু ধারণ করে। অর্থাৎ, এই র্যাশনালিটি এমন সব কাঠামো নিয়ে গঠিত যার উৎস মূলত ইন্দ্রিয়জগত। যুক্তিবিজ্ঞানের সকল ‘বুরহানি’ বা অকাট্য প্রমাণ এবং তর্কমূলক যুক্তির একটি অংশ এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত।
২. মুসাদ্দাদ র্যাশনালিটি (হেদায়েপ্রাপ্ত বা পথপ্রাপ্ত আকল): দ্বিতীয় প্রকার আকলকে তিনি ‘মুসাদ্দাদ আকল’ (Guided Rationality) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তির জন্ম হয় ব্যবহারিক আমল বা প্রায়োগিক কর্মের মধ্য দিয়ে—বিশেষত এমন সব কর্মের মাধ্যমে যা উদ্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহের উপযোগিতা সম্পর্কে মনে ‘একিন’ বা দৃঢ় নিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। তর্কমূলক বা আর্গুমেন্টেটিভ র্যাশনালিটির অবশিষ্ট অংশ এই স্তরের পর্যায়ভুক্ত।
৩. মুআইয়াদ র্যাশনালিটি (সমর্থিত আকল): তৃতীয় এবং সর্বোচ্চ স্তরটি হলো ‘মুআইয়াদ আকল’ (Supported/Empowered Rationality)। এই বুদ্ধিবৃত্তি কেবল তখনই জাগ্রত হয় যখন মানুষ আমল বা প্রায়োগিক সাধনায় নিজেকে পুরোপুরি নিমজ্জিত করে। এটি একদিকে যেমন অর্জিত লক্ষ্য ও মূল্যবোধের উপযোগিতা সম্পর্কে একিনি জ্ঞান দান করে, অন্যদিকে তেমনি লক্ষ্য অর্জনের ‘উসিলা’ বা উপকরণসমূহ যে কার্যকর ও সঠিক—সেটিও অকাট্যভাবে প্রমাণ করে।[12]আতেশ, ২০১৯
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | মোহাম্মদ আতেশ তুরস্কের কোনিয়া শহরে ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আংকারা ইউনিভার্সিটি ইসলামিক স্টাডিজ থেকে গ্রাজুয়েশন এবং উলুদা ইউনিভার্সিটি থেকে ইসলামী দর্শন শাখায় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তাঁর থিথিসের বিষয়বস্তু ছিল ‘তহা আবদুর রহমান ও আধুনিকতা’। |
|---|---|
| ↑2 | তহা আবদুর রহমান, হিওয়ারাতুন মিন আজলিল-মুস্তাকবাল, ২০১১, পৃ. ১৩৮ |
| ↑3 | রেজোয়ান মরহুম, তহা আবদুর রহমান বিশেষ সংখ্যা, পৃ. ২৪ |
| ↑4 | আল-হামরি, ২০১৯ |
| ↑5 | আবদুর রহমান, ২০০০, পৃ. ৬২ |
| ↑6 | মানবসত্তার এই অখণ্ডতার ধারণা আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের একাধিক ধারায় সমর্থিত। মনস্তত্ত্বের গেস্টাল্ট (Gestalt) মতবাদ অনুসারে, মানুষের মানসিক প্রক্রিয়াগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো অংশ নয়, বরং একটি সুসংগত ‘সমগ্রতা’। সমকালীন কগনিটিভ সায়েন্স (Cognitive Science) এবং এমবডিড কগনিশন (Embodied Cognition) তত্ত্বও আকলকে মস্তিস্কের একক কোনো সত্তা হিসেবে না দেখে শরীর, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের একটি সমন্বিত ক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এছাড়া, ফেনোমেনোলজি (Phenomenology) ধারার দার্শনিকরা (যেমন : মরিস মার্লো-পন্তি) যুক্তি দেন যে, মানুষের সংবেদন ও চিন্তা পরস্পর অবিভাজ্য। এই আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলো মানুষের ‘চিন্তাশীল সত্তা’ ও ‘কর্মসম্পাদনকারী সত্তা’র চিরাচরিত বিভাজনকে নাকচ করে মানুষের একটি অখণ্ড বাস্তবতাকে নির্দেশ করে। [তর্জমাকার] |
| ↑7 | সুয়ালুল আখলাক : ৬৪ |
| ↑8 | হজ, ২২:৪৬ |
| ↑9 | আবদুর রহমান, সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ৬৪ |
| ↑10 | আবদুর রহমান, সুয়ালুল আখলাক, পৃ. ৭৩ |
| ↑11 | আবদুর রহমান, ২০০০ |
| ↑12 | আতেশ, ২০১৯ |