আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী : ব্যক্তি ও মানস (প্রথম পর্ব)

কে এম হাবিবুল্লাহ

বিশ শতকের ঔপনিবেশিক বাংলার অস্থির ও বিপর্যস্ত প্রেক্ষাপটে যে কজন মনীষী মুসলমান সমাজের ধর্মীয় বোধ, নৈতিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় পুনর্জাগ্রত করতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অগ্রভাগে অবস্থান করেন আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী। তিনি ছিলেন একাধারে সংস্কারক, মুজাহিদ, আলেম ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক—যার ব্যক্তিত্বে মিলেছিল বংশগত ঐতিহ্য, প্রাতিষ্ঠানিক মেধা, ত্যাগী মানস এবং যুগ-সচেতন চিন্তার বিরল সমন্বয়। তার জীবনপথ শুধু একজন আলেমের আত্মগঠন নয়; বরং ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মুখে মুসলিম আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনের এক ঐতিহাসিক উপাখ্যান।

১৮৯৮ সালে বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত গ্রামে তার জন্ম। পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল গভীরভাবে ধর্মনিষ্ঠ ও সংগ্রামী। তার পূর্বপুরুষগণ আরবভূমি থেকে বাংলায় আগমন করে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। পারিবারিক বর্ণনায় জানা যায়, তাদের একজন বঙ্গবিজেতা ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অভিযাত্রীদলের সঙ্গী ছিলেন। পরবর্তী প্রজন্মেও এ পরিবার দ্বীনের দাওয়াত ও সংগ্রামে সক্রিয় ছিল। তার পিতামহ ও প্রপিতামহ বালাকোটের প্রান্তরে সাইয়্যেদ আহমদ শহীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং ‘গাজী’ উপাধি লাভ করেন। পিতা মুন্সী মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ছিলেন বিচক্ষণ আলেম, একইসঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এক দৃঢ় ব্যক্তিত্ব। ফলে জন্মসূত্রেই শামছুল হক ফরিদপুরীর চেতনায় মিশে যায় দায়িত্ববোধ, দ্বীনের প্রতি আনুগত্য এবং জাতিসত্তার প্রতি দায়শীলতা।

শৈশবে তার শিক্ষার সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে—কায়দা, আম্মাপাড়া, প্রাথমিক মাসআলা-মাসায়েল ইত্যাদির মাধ্যমে। তখন মুসলমানদের জন্য শিক্ষার সুযোগ ছিল অপ্রতুল; প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ছিল প্রায় সম্পূর্ণভাবে অন্য সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে। তবু পিতার দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার ফলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা হয় গ্রামের এক হিন্দু পণ্ডিতের পাঠশালায়, পূজামণ্ডপের পরিবেশে। জীবনীকাররা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন—যিনি একদিন শিরক-বিদআতের বিরুদ্ধে তাওহীদের পতাকা উড়াবেন, তার প্রাথমিক পাঠ শুরু হয়েছিল শিরকের পরিবেশেই। এই ঘটনাই তার জীবনের এক প্রতীকী সূচনা—অন্ধকারের মধ্য থেকে আলোর অভিযাত্রা।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধা, অসাধারণ অধ্যবসায় ও সুশৃঙ্খল চরিত্রের অধিকারী। ছাত্রজীবনের প্রতিটি স্তরে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় পাড়ি জমান এবং কলিকাতা আলিয়া মাদরাসার অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণির বৃত্তিপরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক অর্জন এবং মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান লাভ তার অসামান্য প্রতিভার প্রমাণ বহন করে। পরবর্তীতে পিতার নির্দেশে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর ছাত্রত্ব লাভ করেন। কিন্তু অন্তরে তার আকাঙ্ক্ষা ছিল কুরআন-সুন্নাহর গভীর জ্ঞান অর্জনের।

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তিনি এটিকে জীবনের মোড়-ফেরানো সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি দেওবন্দের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তার জীবনীকার এই যাত্রাকে “মনযিলে মকসুদে পদার্পণ” বলে আখ্যায়িত করেছেন। সত্যিই এটি ছিল তার জীবনের রিটার্নিং পয়েন্ট—যেখানে জাগতিক শিক্ষার অধ্যায় পেরিয়ে তিনি আত্মনিয়োগ করেন দ্বীনি ইলমের সাধনায়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইংরেজি শিক্ষায় তাঁর অংশগ্রহণ ছিল পিতার দূরদর্শিতার ফল। পিতা বিশ্বাস করতেন—ঔপনিবেশিক শক্তিকে পরাজিত করতে হলে তাদের জ্ঞানব্যবস্থা বুঝতে হবে। ইংরেজি শিক্ষা অর্জনের মধ্য দিয়ে শত্রুর কৌশল অনুধাবন করা সম্ভব হবে। কিন্তু শামছুল হক নিজে অন্তরে ছিলেন দ্বীনি ইলমের অনুরাগী। জাগতিক শিক্ষার ভেতর থেকেও তিনি কখনো সেক্যুলার চেতনা ধারণ করেননি; বরং আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা আয়ত্ত করে, ফিকহ ও অন্যান্য শাস্ত্রের কিতাব স্বশিক্ষায় অধ্যয়ন করে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। এ দ্বৈত অভিজ্ঞতা—জাগতিক ও দ্বীনি শিক্ষার সংযোগ—তার মানসগঠনে এক অনন্য ভারসাম্য সৃষ্টি করে।

দেওবন্দে যাওয়ার পর তিনি প্রথমে থানাভবনে হযরত আশরাফ আলি থানভির সান্নিধ্যে সময় কাটান। পরবর্তীতে সাহারানপুর মাদরাসায় কাফিয়া জামাতে ভর্তি হয়ে চার বছর অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে তিনি শুধু যাহেরি ইলমে দক্ষতা অর্জন করেননি; বরং আধ্যাত্মিক শুদ্ধির জন্য নিয়মিত থানভির খানকায় যাতায়াত করতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে হাজিরা দেওয়া ছিল তার নিত্য-অনুশীলন। এরপর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে শেষ দুই বছর অধ্যয়ন করেন এবং যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের সাহচর্য লাভ করেন।

তার উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী, আল্লামা এযায আলি, হুসাইন আহমদ মাদানি ও আশরাফ আলি থানভি। বিশেষত থানভি ও মাদানির প্রভাব তার চিন্তায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি নিজেই বলেছেন—এই দুই শায়েখ তার জীবনের পথপ্রদর্শক, মাথার তাজ। তাদের ছাড়া নিজের অস্তিত্ব কল্পনা করাও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। থানভির তাসাউফকেন্দ্রিক সংস্কারধারা এবং মাদানির রাজনৈতিক-সচেতন আজাদি চেতনা—এই দুই প্রবাহ তার ব্যক্তিত্বে মিলিত হয়ে এক সমন্বিত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করে।

উনবিংশ ও বিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে মুসলিম সমাজ রাজনৈতিক পরাজয়, সাংস্কৃতিক সংকট ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতায় জর্জরিত ছিল। ১৮৫৭ সালের ব্যর্থতার পর দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে ধর্মনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণের সূচনা হয়, তার ধারাবাহিকতায় শামছুল হক ফরিদপুরী নিজেকে গড়ে তোলেন। তিনি ছিলেন সেই বিপ্লবী সিলসিলার উত্তরসূরি—যেখানে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি, শাহ আব্দুল আজিজ, সাইয়্যেদ আহমদ শহীদ, কাসেম নানুতুভি প্রমুখের আত্মত্যাগী চেতনা প্রবাহিত হয়েছে।

বাংলার প্রেক্ষাপটে তিনি ছিলেন থানভির আধ্যাত্মিক সংস্কারমিশন ও মাদানির উদার রাজনৈতিক চেতনার সার্থক প্রতিনিধি। তার মানসে তাসাউফের পরিশুদ্ধতা ও সিয়াসতের সচেতনতা একসূত্রে গাঁথা ছিল। ফলে তিনি কেবল খানকাহভিত্তিক সাধক ছিলেন না; আবার কেবল রাজনৈতিক কর্মীও নন—বরং উভয়ের সমন্বয়ে গঠিত এক পূর্ণাঙ্গ আলেম-নেতা।

বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চতা ও ইলমি মর্যাদার বিচারে তাকে সমকালীন বহু মনীষীর সঙ্গে তুলনা করা যায়—যেমন মুফতি শফি উসমানি, শিব্বির আহমদ উসমানি, আবুল হাসান আলী নদভী, হাসান আল-বান্না, মাওলানা মওদুদি কিংবা সাইয়্যেদ কুতুব। তবে তার স্বাতন্ত্র্য ছিল বাংলার সামাজিক বাস্তবতায় ইসলামী সংস্কারকে প্রোথিত করার প্রচেষ্টায়। তিনি বাঙালি মুসলমানের হৃদয়ে তাওহীদের বোধ জাগ্রত করতে এবং বিদআত-অপসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে আজীবন নিরলস সাধনা করেছেন।

 

২.

দেওবন্দে অধ্যয়ন-সমাপ্তির পর আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরীর সামনে যখন হায়দারাবাদ সরকারের চিফ জাস্টিস পদে উচ্চবেতনের চাকরির প্রস্তাব আসে, তখন তা ছিল তার ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বিরাট সম্ভাবনার দ্বার। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—তার হৃদয় পড়ে আছে বাংলার অন্ধকারে নিমজ্জিত মুসলমানদের মাঝে। এই সিদ্ধান্ত তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং প্রমাণ করে, তিনি ব্যক্তিসাফল্যের চেয়ে জাতিসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তার এই আত্মত্যাগী মনোভাবই তাকে একজন সত্যিকারের মুজাদ্দিদে রূপান্তরিত করে।

মাওলানার কর্মময় জীবন প্রায় চল্লিশ বছরব্যাপী বিস্তৃত। প্রথম বিশ বছর তিনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় ও শিক্ষাগত অধঃপতন প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তী বিশ বছর তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনে নতুন বাস্তবতায় জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার প্রয়াস চালান। এই দীর্ঘ সময়কালে তিনি যে সংস্কারসাধনা পরিচালনা করেছেন, তা উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলায় মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনে মৌলিক ভূমিকা রাখে।

আল্লামা ফরিদপুরীর সংস্কারকর্মের প্রধান ভিত্তি ছিল ইসলামি শিক্ষা বিস্তার। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির পুনর্জাগরণ সম্ভব নয়। তাই তিনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, দ্বীনি শিক্ষার প্রসার এবং আলেম তৈরির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না; বরং সেগুলো ছিল নৈতিক চরিত্রগঠন ও সমাজসেবার প্রশিক্ষণকেন্দ্র। তিনি এমন এক আলেমসমাজ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যারা সমাজের নৈতিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।

শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনি চেতনা জাগ্রত করতে ব্যাপক ওয়াজ-নসিহত ও তাবলিগি কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তার ভাষণ ছিল যুক্তিনিষ্ঠ, আবেগময় এবং হৃদয়গ্রাহী। তিনি ধর্মকে কুসংস্কার ও অন্ধঅনুকরণ থেকে মুক্ত করে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ চেতনায় ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে তিনি ধর্মীয় সংস্কারের এক বাস্তবধর্মী ধারা সৃষ্টি করেন।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ঔপনিবেশিক প্রভাবে বাঙালি মুসলমান সমাজে যে আত্মহীনতা ও হীনমন্যতা জন্ম নিয়েছিল, তিনি তা দূর করতে ইসলামি সংস্কৃতির গৌরব ও ঐতিহ্য তুলে ধরেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইসলাম কেবল মসজিদকেন্দ্রিক ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সুশৃঙ্খল করে। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলমানদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও পরিচয়বোধ জাগ্রত করে।

রাজনৈতিক চেতনা বিকাশেও তার প্রভাব ছিল গভীর। যদিও তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না, তবুও তিনি মুসলমানদের ন্যায়, ইনসাফ ও স্বকীয়তার প্রশ্নে সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ব্রিটিশ শাসনের অবিচার ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। আবার পাকিস্তান আমলেও তিনি নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার অবস্থান ছিল নীতিনিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ।

তার সংস্কারকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক শুদ্ধি। তিনি মানুষকে আত্মসংযম, তাকওয়া ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছেন। তবে তার তাসাউফ ছিল শিরক-বিদআত ও কুসংস্কারমুক্ত। তিনি আধ্যাত্মিকতাকে কর্মমুখী ও সমাজমুখী করে তুলেছিলেন। ফলে তার দরবার ছিল কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলনের স্থান নয়; বরং তা ছিল নৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের কেন্দ্র।

নারীশিক্ষা ও পারিবারিক সংস্কারেও তার দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। তিনি নারীদের দ্বীনি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং পরিবারকে নৈতিকতার ভিত্তিতে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, পরিবারই জাতির মূল একক; পরিবার সুশৃঙ্খল হলে জাতিও সুশৃঙ্খল হবে। এই চিন্তা তার জাতিগঠনমূলক দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আল্লামা ফরিদপুরীর সংস্কারধারা ছিল সর্বজনীন। যদিও তার প্রত্যক্ষ কর্মক্ষেত্র ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজ, তার চিন্তার পরিধি ছিল সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্বমানবতা। তিনি মুসলমানদের ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহমর্মিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভক্ত ও দুর্বল মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাওয়াত ছিল মানবকল্যাণমুখী।

তার ব্যক্তিজীবন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে ও ত্যাগময়। তিনি বিলাসিতা বর্জন করে সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেছেন। এর ফলে মানুষ তার কথায় আস্থা রেখেছে। তার চরিত্রের সততা ও দৃঢ়তা তাকে জনমানসে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। তিনি কথার চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাস করতেন।

চল্লিশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা বাঙালি মুসলমান সমাজে যে পরিবর্তন সূচনা করে, তা ছিল স্থায়ী ও গভীর। শিক্ষা-প্রসার, নৈতিক পুনর্জাগরণ, ধর্মীয় সংস্কার ও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা—সব মিলিয়ে তিনি এক নতুন যুগের ভিত্তি স্থাপন করেন। তার কর্মফল পরবর্তী প্রজন্মের আলেম, চিন্তাবিদ ও সমাজসংস্কারকদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

 

৩.

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায়নি; এটি বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও মানসিক জগতে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার নামে এমন একটি শিক্ষানীতি চালু করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল এমন এক নতুন শ্রেণি তৈরি করা—যারা রক্তে ভারতীয় হলেও চিন্তা-চেতনায় হবে ইউরোপীয়। এই শিক্ষানৈতিক উপনিবেশবাদ মুসলিম সমাজকে তাদের আত্মপরিচয় ও তাওহীদি চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস ছিল।

এই পরিস্থিতি গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরীকে। তিনি মনে করতেন, ইংরেজরা ইসলাম ও মুসলিম জাতির যে বহু ক্ষতি করেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো “ধর্মহীন শিক্ষাধারা” মুসলমানদের মধ্যে প্রবর্তন করা। কারণ শিক্ষা মানুষের মনন ও মানস গঠন করে; আর মননই পরিচালনা করে জীবনের সকল কর্ম। ধর্মহীন শিক্ষা শেষ পর্যন্ত ধর্মদ্রোহিতার দিকে ধাবিত করে—এ ছিল তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। তাই তিনি উপলব্ধি করেন, মুসলিম জাতিসত্তার পুনর্জাগরণের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। এই সংস্কারকল্পে তিনি কার্যকর কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন—

শিক্ষানৈতিক উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান : ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা কেবল পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করেনি; এটি সমাজের চিন্তার কাঠামো বদলে দিয়েছিল। ধর্মীয় ভিত্তির পরিবর্তে সেক্যুলার মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই শিক্ষা মুসলিম সমাজে আত্মবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। আল্লামা ফরিদপুরী উপলব্ধি করেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা জাতির আত্মপরিচয়ের জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই তিনি এমন এক সার্বজনীন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যা হবে যুগোপযোগী, কিন্তু ঈমান ও তাওহীদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

গণমক্তব প্রতিষ্ঠা : নবজাগরণের বীজতলা : নবপ্রজন্মের মধ্যে ইসলামি শিক্ষার বীজ বপনের জন্য তিনি মক্তব ব্যবস্থাকে পুনর্জীবিত করেন। গ্রাম-গঞ্জে, শহরে-নগরে—যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই মক্তব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ ছিল এক সুদূরপ্রসারী জাতিগত পুনর্গঠনের পরিকল্পনা। কারণ মক্তব শুধু কুরআন শিক্ষা দেয় না; এটি শিশুমনে ঈমান, আখলাক ও মুসলিম পরিচয়ের ভিত্তি স্থাপন করে। এভাবে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানস গঠনের কাজ শুরু করেন শৈশব থেকেই।

প্রাথমিক শিক্ষার ইসলামীকরণ : মক্তবের পর প্রাথমিক শিক্ষাকেই তিনি মানসগঠনের দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করেন। তাই তিনি ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বিত পাঠ্যক্রম প্রবর্তনের চেষ্টা করেন। ক্বারী বেলায়েত সাহেব প্রবর্তিত ‘নূরানী পদ্ধতি’র পেছনে তার স্বপ্ন ও প্রেরণা কাজ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ক্বারী আব্দুল হক, আব্দুল মালেক প্রমুখের বিভিন্ন নূরানী ধারা তার পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়। এই উদ্যোগ প্রাথমিক পর্যায়ে কুরআন শিক্ষাকে সহজ, গতিশীল ও সর্বজনগ্রাহ্য করে তোলে।

মাদরাসা প্রতিষ্ঠা : এক নীরব বিপ্লব : একসময় মাদরাসা শিক্ষাই ছিল এদেশের প্রধান শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু ব্রিটিশ নীতির ফলে এর কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই সংকটে আল্লামা ফরিদপুরী এগিয়ে আসেন। তিনি দেশজুড়ে অসংখ্য মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একক ব্যক্তি হিসেবে এত বিপুলসংখ্যক মাদরাসা প্রতিষ্ঠার নজির বিরল। তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রচেষ্টায় যে মাদরাসা আন্দোলন গড়ে ওঠে, তা পরবর্তীকালে বাংলাদেশে হাজারো মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করে।

জাতীয় মানের জামেয়া প্রতিষ্ঠা : জাতির নেতৃত্বদানে সক্ষম আলেম তৈরির লক্ষ্যে তিনি কয়েকটি উচ্চমানের ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—আশরাফুল উলূম বড় কাটারা, জামিয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া লালবাগ, জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ এবং খাদেমুল ইসলাম গওহরডাঙ্গা। এসব প্রতিষ্ঠান কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এগুলো হয়ে ওঠে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। বিশেষত লালবাগ মাদরাসা স্বল্পসময়ে দেশ-বিদেশে খ্যাতি অর্জন করে এবং মুসলিম বিশ্বের একটি আদর্শ দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এখান থেকেই রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব বিকশিত হয়।

দরসে নিজামীর প্রকৃত রূপ উন্মোচন : দরসে নিজামী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তৎকালীন সমাজে নানা ভুল ধারণা ছিল। আল্লামা ফরিদপুরী ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে দেখান, দরসে নিজামী কেবল পুরনো ধাঁচের ধর্মীয় পাঠ নয়; এর মূল দর্শন হলো ‘মানকুলাত’ ও ‘মাকুলাত’-এর সমন্বয়। মানকুলাত বলতে কুরআন-হাদীসকেন্দ্রিক জ্ঞান, যা ঈমান ও ভক্তিকে দৃঢ় করে। আর মাকুলাত বলতে যুক্তি, দর্শন ও বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান, যা মানবমস্তিষ্ককে প্রখর করে।

তিনি বলেন, কেবল যুক্তিভিত্তিক জ্ঞান মানুষকে বিপথে নিতে পারে, আবার কেবল অন্ধভক্তিও গোমরাহির কারণ হতে পারে। তাই প্রয়োজন বিশ্বাস ও যুক্তির সমন্বয়। ইতিহাস, ভূগোল, গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান—এসব জ্ঞান অর্জন করতে হবে; তবে তা হতে হবে স্রষ্টামুখী। তার ভাষায়, “খোদামুখী বিজ্ঞানই বিজ্ঞান; নাস্তিকতার বিজ্ঞান ধৃষ্টতা ও অন্ধতা।”

সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার রূপকার : আল্লামা ফরিদপুরী কেবল তত্ত্ব দেননি; বাস্তবে তা প্রয়োগ করেছেন। তিনি বলতেন, “ধর্মহীন কর্মশিক্ষা এবং কর্মহীন ধর্মশিক্ষা উভয়টাই বেকার।” তার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাগুলোতে কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হতো। শিক্ষার্থীদের বক্তৃতা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা পরিচালনা—এসব ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। ফলে সেখানে কেবল পুঁথিগত আলেম নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বদানে সক্ষম মানুষ গড়ে উঠত।

আশরাফুল উলূম মাদরাসা এ ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত। এখানে কিরাত, হিফজ, আইন গবেষণা, দর্শনসহ বিভিন্ন বিভাগ ছিল। শিক্ষার্থীদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধও জাগ্রত করা হতো। এভাবে শিক্ষা হয়ে ওঠে ব্যক্তি ও সমাজগঠনের সমন্বিত প্রক্রিয়া।

মসজিদভিত্তিক কুরআন শিক্ষা : সর্বসাধারণের মধ্যে কুরআনের আলো পৌঁছে দিতে তিনি সারাদেশে মসজিদভিত্তিক কুরআন শিক্ষা ও তাফসিরের ক্লাস চালু করেন। এটি ছিল এক প্রকার গণশিক্ষা আন্দোলন। মসজিদকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ কুরআনের হেদায়াত লাভের সুযোগ পায়। ফলে ধর্মীয় জ্ঞান কেবল মাদরাসায় সীমাবদ্ধ না থেকে জনজীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরীর শিক্ষা সংস্কার ছিল কেবল প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কর্মসূচি নয়; এটি ছিল মুসলিম মানস পুনর্গঠনের এক সুদূরপ্রসারী আন্দোলন। ঔপনিবেশিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি যে সমন্বিত ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তার উদ্যোগে গড়ে ওঠা মক্তব, মাদরাসা ও জামেয়াগুলো পরবর্তী সময়ে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নবজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি বুঝেছিলেন—জাতির পুনর্জাগরণ শুরু হয় শিক্ষার মাধ্যমে। আর সেই শিক্ষা হতে হবে ঈমানভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর ও যুগোপযোগী। বিশ্বাস ও বিজ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা ও কর্ম—এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই তিনি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এক জাগ্রত মুসলিম মানস। তার শিক্ষা-দর্শন আজও আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল দিকনির্দেশনা হয়ে আছে।

চলবে…

বিজ্ঞাপন

guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Mahmud Hojaifa
Mahmud Hojaifa
2 months ago

আজকের এই সমাজে, রাষ্ট্রে, বিশ্বে শিক্ষালয়ের অভাব নেই। রাজনৈতিকদের অভাব নেই। তবুও সংকট সংশয় সমাজের মূল ব্যাধি যেন। অভাব শুধু ফরিদপুরীর মতো ব্যাক্তিত্বের। তাঁর মন-মানসের। শিক্ষা, দেশ ও উম্মাহকে নিয়ে সৎভাবুকের অভাব। এই জাতির মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি আদর্শ বিপ্লবের। আর সেই বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন একজন আদর্শবান বিপ্লবী। যার হাত ধরেই বাংলার জনপদে সুচিন্তা ফিরবে। ন্যায়ের রাজ্য গড়বে।

আমাদের গৌরবের ইতিহাস বিরল। তবে তার চর্চা কিম্বা অজানার কারণে আদর্শগত চিন্তায় পিছিয়ে। কাজেই, এসব নিয়ে পর্যালোচনা দরকার। লেখক ‘কে এম হাবিবুল্লাহ’র কলমে ফরিদপুরীর ব্যাক্তি ও মানসের পর্বটি সত্যিই প্রশংসনীয়,প্রয়োজনীয় এবং আশাজাগানীয়। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পর্ব নিয়ে তিনি আরও সুন্দর পর্ব উপহার দিবেন বলে আশাবাদী। আল্লাহ তাঁর ইলমে, কলমে বারাকাহ দান করুক। পাঠকের মানসে পরিবর্তন ঘটাক।

Raihanul Hoque
Raihanul Hoque
1 month ago

আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা লেখায় আরও বরকত দিন। হযরত ছদর ছাহেব হুযুর রহ. ছিলেন হযরত থানভী ও হযরত মাদানীর মিশেল। হযরতকে নিয়ে আরও গবেষণা, লেখা আশা করছি।