সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’র নয়নচারা : দুর্ভিক্ষের ফুটপাতে বসে নদীপাড়ের স্মৃতি যাপন

অলাত এহ্সান

প্রায় পঁচাত্তর বছর আগে (১৯৪৯ সাল) প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসের শুরুতেই সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ লিখেছেন, ‘শস্যহীন জনবহুল এ-অঞ্চলের বাসিন্দাদের বেরিয়ে পড়বার ব্যাকুলতা ধোঁয়াটে আকাশকে পর্যন্ত যেন সদাসন্ত্রস্ত করে রাখে। ঘরে কিছু নেই। ভাগাভাগি, লুটপাট, আর স্থানবিশেষে খুনাখুনি করে সর্ব প্রচেষ্টার শেষ।’ যেন দেশভাগ-উত্তর দুর্ভিক্ষপীড়িত সময়ের  রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সাহিত্য প্রতিবেদন লিখছেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভূত-ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে, কোন প্রশ্ন কখনো কখনো অর্থনৈতিক সংকটকেই ছাপিয়ে যাবে, তার ইঙ্গিত দিয়ে ওই উপন্যাসেরই একটি বাক্য লিখেছেন, ‘শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধর্মের চেয়ে টুপি বেশি।’ যেমনটা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল ‘নয়নচারা’ গল্পেও, ‘আর দেহের সাথে জমির কোনো যোগাযোগ নেই, যে—হাওয়ায় তারা চঞ্চল কম্প্রমান, সে-হাওয়াও দিগন্ত থেকে উঠে-আসা সবুজ শস্য কাঁপানো সূক্ষ্ম অন্তরঙ্গ হাওয়া নয়: এ-হাওয়াকে সে চেনে না।’ ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর লেখায় ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য এমন অনেক ইঙ্গিত, প্রশ্ন রেখে যান। এই প্রশ্নকে আমরা এড়াতে পারি না।

এর প্রায় অর্ধশত বছর পর (১৯৮৯) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসের প্রথম বাক্যে লিখছেন, ‘পায়ের পাতা কাদায় একটুখানি গেঁথে যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলার রগ টানটান করে  যতোটা পারে উঁচুতে তাকিয়ে গাঢ় ছাই রঙের মেঘ তাড়াতে তমিজের বাপ কালো কুচকুচে হাত দুটো নাড়ছিলো, ওই জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করা দরকার।’

ইলিয়াসের দেখানো পায়ের নিচের ওই জায়গা কী? সেটা অর্থনীতি। যা আমরা দেখি না মনে করি, কিন্তু অস্বীকার করতে পারি না। ‍উপরন্তু এর ভেতরেই বাস করতে হয়। ফলে সাহিত্যের নানা আয়োজনে, চরিত্রায়নে এর প্রভাব বিচেনায় নেয়া জরুরি। একইভাবে আজকের দিনে সাহিত্যে জলবায়ু প্রসঙ্গটা প্রচণ্ডভাবে এসে যায়। আমরা যেসব সাহিত্য সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে দিই, তা চরিত্রায়নে অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কারণেই। একই কারণে আহমদ ছফার ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ উপন্যাসটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই আলোচনায় পরে আসছি।

আবার জগতে আমরা যেসব লেখাকে চিরায়ত বলে গ্রহণ করেছি, তার বিরাট গুণ হলো, ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে যে অবস্থা বা চরিত্রের তৈরি হয়েছে, পরবর্তীতে তাকে রূপান্তর করে পরিবর্তিত সময়কে চিনতে পারা। সেই বিচারে ওয়ালীউল্লাহ্’র ‘লালসালু’ উপন্যাসের মজিদ বা জমিলা চরিত্র দুটি সময়ের ‘কষ্ঠিপাথর’ হয়ে আছে।

কোনো কাকতালীয় ছাড়াই, আরেকটি ব্যাপারে এই দুই লেখককে পাশাপাশি পাঠ করতে পারি। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত ‘নয়নচারা’ বইয়ের নাম গল্পে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ লিখছেন, “ঘনায়মান কালো রাতে জনশূন্য প্রশস্ত রাস্তাটাকে ময়ূরাক্ষী নদী বলে কল্পনা করতে বেশ লাগে। কিন্তু মনের চরে যখন ঘুমের বন্যা আসে, তখন মনে হয় ওটা সত্যিই ময়ূরাক্ষী: রাতের নিস্তব্ধতায় তার কালো স্রোত কল-কল করে, দূরে আঁধারে ঢাকা তীররেখা নজরে পড়ে একটু-একটু, মধ্যজলে ভাসন্ত জেলেডিঙিগুলোর বিন্দু-বিন্দু লালচে আলো ঘন আঁধারেও সর্বংসহা আশার মতো মৃদু-মৃদু জ্বলে।” সময়টা দেশভাগের সন্ধিক্ষণ। দুর্ভিক্ষে পুড়ছে গোটা ভারত। সেই সময় বহু স্মৃতি নিয়ে গ্রাম থেকে উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতার ফুটপাতের আশ্রয় নেওয়া ক্ষুধা পীড়িত কিশোর আমু’র চোখে ভাসছে এই দৃশ্য। পেশা ও পাঠের সূত্রে অনেকটা সময় কলকাতায় থাকাকালে এসব তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন।

এর ত্রিশ বছর পর ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখছেন, “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেকদিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বইছে, ‘তাড়াতাড়ি করো বাহে, ঢাকার গাড়ি বুঝি ছাড়ি যায়।’ আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেওয়াল; অনেকদিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।”

সদ্য স্বাধীন দেশে নৈরাজ্য দেখে যুবক রঞ্জুর ঘোরলাগা মনোভাবের কথা লিখছেন ইলিয়াস। সময়টা এক নয়, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে গেছে দেশ। তারপরও দুটি দৃশ্যে, মনোভাবে দৃঢ় মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয় মোটেই। যেমন নয়নচারা গল্পের প্রথমে বাক্য ‘কালো রাত’, ‘প্রশস্ত রাস্তা’ ‘বেশ লাগে’ বিশেষণ বিশেষায়িত শব্দের মতো  ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পেও ‘মনোরম মনোটোনাস’ ‘সুন্দর বৃষ্টি’ শব্দগুলো মনোযোগী পাঠকের চোখে বাক্যরীতির নৈকট্যই ধরা পড়ে।

ফিরি অর্থনৈতিক বিষয় দিয়ে আলোচনা শুরুর আলাপে। কারণ ওয়ালীউল্লাহ্’র ‘নয়নচারা’ গল্পটা দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা। অর্থনীতিবিদেরা বহু গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, আধুনিক সময়ে দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক ব্যাপার নয়, বরং মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ। এই সময়ে দুর্ভিক্ষ যতটা না সম্পদের অভাবের কারণে, তার চেয়েও বেশি সম্পদ বন্টনের বৈষম্যের কারণেই দুর্যোগ ঘটে। বিশ্বরাজনীতি সচেতন লেখক ওয়ালীউল্লাহ্’র সেটা অজানা নয়। আজকের দিনে ভারসাম্যহীন বিশ্বব্যবস্থায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে শঙ্কা, আলোচনা তাই আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। তথ‍্যের খাতিরে এখানে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে, ওয়ালীউল্লাহ্ তাঁর কর্মজীবনের শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অ‍্যাম্বাসিতে কাজ করেছেন। ফলে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে জানাবোঝা তাঁর কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাহিত্যের স্বহৃদয়।

‘নয়নচারা’ গল্পে গ্রামের ঘরবাড়ির, নদীর, সহানুভূতির, শস্যের, ভরা পেটে নক্ষত্র দেখার স্মৃতি নিয়ে আসা কিশোর আমু শহরের বাস্তবতায়, ক্ষুধায়, দুরাচারের সঙ্গে বুঝে উঠতে চেষ্টা করে। যেন পকেট ভর্তি গ্রামের ওই সব ঐশ্বর্যমণ্ডিত স্মৃতি মুদ্রার মতো সঞ্চিত আছে তার। শহরের প্রতিটি বাস্তবতার সঙ্গে তা খরচ করে নিজের জন্য একটু আশ্রয় করে নিতে চাইছে। হালের সাইন্সফিকশনগুলো যেমন দেখায়, মানুষগুলো রোবটের মতো বৈদ্যুতিক চার্জ ছাড়া চলতেই পারে না, করুণ-কঠিন বাস্তবতায় আমুর অবস্থাও তাই। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘নক্ষত্রের তলে শুয়ে ঘুমায়েছে মন’ বলতে পারা আমু যেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য়ের মতো ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ দেখছে। তাতে কারও মনে আঘাত লাগলে আমুর জিজ্ঞাসা,  ‘জানো, সারা আকাশ আমি বিষাক্ত রুক্ষ জিহ্বা দিয়ে চাটব, চেটে-চেটে তেমনি নির্মমভাবে রক্ত ঝরাব সে-আকাশ দিয়ে—কে তুমি, তুমি কে?’ এই ‘তুমি’ কি কলাকৈবল্যে ভোগা মানুষকে বলছেন লেখক?

কিশোর আমুর কাছে তার গ্রামের একটা নদীর স্মৃতি আছে, ময়ূরাক্ষী। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার নদীটি ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত। ব্রাহ্মণী, দ্বারকা কোপাই, কুশকর্নী নদী ও বক্রেশ্বর নদ এর থেকেই তৈরি। ফলে নদীটা কখনো জলশূন্য ছিল না, পাড়ের মানুষগুলোও নদী কেন্দ্রিক জীবিকার ভেতর দিয়ে কখনো মাছ-ভাত ছাড়া ছিল না। সেই নদীর স্মৃতির ধারক আমু নিজেকে দেখে একটা রুক্ষ কালো পথের ধারে। স্মৃতি থেকে সে ‘ভাবছে যে এরই মধ্যে হয়তো-বা ডিঙির খোদল ভরে উঠেছে বড়-বড় চকচকে মাছে—যে-চকচকে মাছ আগামীকাল চকচকে পয়সা হয়ে ফিরে ভারি করে তুলবে জেলেদের ট্যাক।’

‘ট্যাক’ মানে কোমড়ে বাঁধার মতো কাপড়ের তৈরি টাকা রাখার ব্যাগ। অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েও পরে ছেড়ে দিয়ে ওয়ালীউল্লাহ্ যে অর্থনৈতিক-বাস্তবতার বিষয়ে সচেতন হবে, তা প্রায় প্রত্যাশিত। অতি মুনাফামুখিতা যে বাণিজ্যকে শেষ পর্যন্ত মানবঘাতি করে তুলবে, সেটা তাঁর রাজনৈতিক সচতনা থেকেই আসে। ফলে সাহিত্যের স্বহৃদতা নিয়ে তিনি বিদ্রুপ করেন, ‘ময়রার দোকানে মাছি বোঁ বোঁ করে। ময়রার চোখে কিন্তু নেই ননী-কোমলতা, সে-চোখময় পাশবিক হিংস্রতা। এত হিংস্রতা যে মনে হয় চারধারে ঘন অন্ধকারের মধ্যে দুটো ভয়ঙ্কর চোখ ধক্কক্ করে জ্বলছে।’

ইতিহাস বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যখন মার্কিন আমেরিকার শিল্পাঞ্চল, বন্দরগুলোয় লাখ লাখ শ্রমিক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে, একই সময়ে লাখ লাখ টন খাবার আমাজন নদীতে ফেলে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তবু অনাহারী মানুষকে দেয়া হচ্ছে না, পণ্যে চাহিদা কমে যাবে বলে। ওয়ালীউল্লাহ্’র তা অজানা ছিল না। আন মারীর সঙ্গে আলাপে সে সব কথা বলতেন। স্মৃতিকথা, সাক্ষাৎকারে তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সুস্থ্য-স্বাভাবিক জীবন যাপন বলতে হবে আমরা যা বুঝি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে গ্রাম-বাংলার প্রায় সবটা ভেঙে পড়েছিল। গ্রামের মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে ভীড় করে শহরে। ‘মানুষ’ শব্দটি যেসব মানবিক গুণাবলির ওপর নির্ভর করে, তার কিছুই থাকে না যুদ্ধকালীন দুর্ভিক্ষের দিনে। ফরাসি চিন্তক মিশেল ফুকো (১৫ অক্টোবর ১৯২৬–২৫ জুন ১৯৮৪) যাকে বলেছেন, মানুষ একটি ধারণা। সেই সব ধারণার ওপর ভিত্তি করেই আমরা তিন থেকে ছয় ফুট উচ্চতার প্রাণীকে মানুষ বলে ধরে নিই। ওয়ালীউল্লাহ্ বিয়ে করেছিলেন ফারসি নারী আন মারীকে। নিজেও ভালো ফরাসি জানতেন। পশ্চিমের সাহিত‍্য-দর্শন নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বেশ। সেই সুবাদে মিশেল ফুকোর দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে ভালোই পরিচিত ছিলেন ভাবা যায়। তবে তাঁর সময়টা অস্তিত্ববাদের উত্তুঙ্গ কাল। তাঁর লেখায় সেটাই দেখা গেছে।

গল্পের আমু তেমনি গ্রামে যাপন করা কতগুলো ধারণা দিয়ে শহর, মানুষকে বুঝতে চাইছে। তার কাছে, ‘আশ্চর্য কিন্তু একটা কথা: শহরের কুকুরের চোখে বৈরিতা নেই। (এখানে মানুষের চোখে, এবং দেশে কুকুরের চোখে বৈরিতা।)’ ফুটপাতে আমুকে মাড়িয়ে যাওয়া লোকটি অন্ধ না কি, ভেবেই আমু  ‘মনে-মনে হঠাৎ হাসল একচোট’, আত্মপ্রবোধের মতো প্রশ্ন করে, ‘অন্ধ না হলে অমন করবে কেন? দেখতে পেত না যে সে মানুষ?’ দীঘল কালো চুল মানেই তার কাছে ‘নয়নচারা গাঁয়ের মেয়ে ঝিরার মাথার ঘন কালো চুল।’ দানশীলা নারী মনে হতেই সে প্রশ্ন করে, ‘নয়নচারা গাঁয়ে কি মায়ের বাড়ি?’

যে পথের পাশে আমু পড়ে থাকে আরও অনেকের সঙ্গে, সেই পথে ঘরে পৌঁছানো যায় না। আর ঘর যদিও দেখা যায়, তবে কিছুতেই পৌঁছানো যাবে না সেখানে। ফলে নদী ভেবে যে পথের পাড়ে বসে আছে আমু একদিন ভেসে যাবে বলে, তার প্রশ্ন তৈরি হয়, ‘প্রশস্ত নদী তাকে নিয়ে যাবে ভাসিয়ে, দূরে বহুদূরে—কোথায় গো? যেখানে শান্তি—সেইখানে? কিন্তু সেই শান্তি কি বিস্তৃত বালুচরের শান্তি?’ কারণ সে নয়নচারা গ্রামে ঘাসের ওপর শুয়ে তারাগুলো দেখেছে, তার নিচে ছিল ঢালা মাঠ, ভাঙা মাটি, ঘাস, শস্য, আর ময়ূরাক্ষী। কিন্তু শহরের তারাগুলোর নিচে খাদ্য নেই, দয়ামায়া নেই, রয়েছে শুধু হিংসা-বিদ্বেষ নিষ্ঠুরতা, অসহ্য বৈরিতা। সেখানে ‘সে মরেছে, ও মরেছে; কে মরেছে বা কে মরছে সেটা কোনো প্রশ্ন নয়।’

দুর্ভিক্ষের বাস্তবতায় গল্পটা লেখা হলেও, গল্প জুড়ে বিভৎসতার চিত্রায়ণ নেই। এই যে না বলে সব বলে দেওয়া কলকাতার ‘কল্লোল যুগের’ গল্পে বিস্তার দেখা যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গায়ে হলুদ’ গল্পেও এটা আমরা পাই, একটা গ্রামের মানুষ সব মরে সাফ হয়ে যাচ্ছে দুর্ভিক্ষে, সেটা টের পাওয়া যাচ্ছে বিয়ের পালকি বওয়ার কাহার না আসার মধ্যদিয়ে। তবে ওয়ালীউল্লাহ্ বরং ঘটনার বর্ণনা নয়, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে সেই কাজটা করছেন। পাঠককে শরীর-মনে রি রি না করিয়েই মগজে মূল বিষয়টা ধরিয়ে দেওয়ার দারুণ কৌশল।

আজকের দিনে যখন বন্যা থেকে বাঁচতে বেড়িবাঁধ তৈরি, নদী পথগুলো বন্ধ করে সড়কে দামি গাড়ি চলার রাস্তা করে দেওয়া হয়, ভারসাম্যহীন এই বিশ্বে কোনো না কোনো অঞ্চল দুর্ভিক্ষের কবলে, আধুনিক শহরে যখন লাখে মানুষ প্রতিরাতে অনাহারেই ঘুমাতে যায়, অস্ত্রবাণিজ্য ও ভূরাজনীতির বিস্তারে কোনো না কোনো দেশে যুদ্ধ লেগেই আছে, তখন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ‘নয়নচারা’ গল্পটি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত হতে তাগিদ দেয়।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments