খালেদ বাঙালির কবিতা : বাংলার সাহিত্যে অন্যে আধুনিকতা

আহমেদ দীন রুমি

এক.

বইয়ের নাম তাবসিরাতুল আতফাল। শিশুতোষ রচনা। লিখেছেন আবদুল হাই আখতার (১৮৪১-১৯২০ খ্রিস্টাব্দ)। লেখা হয়েছে পুত্রকে ফারসি ভাষা শেখানো ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী করার জন‌্য। উদ্যোগটা যে ব্যর্থ হয়নি; তার প্রমাণ সেই পুত্র। পরবর্তীতে পুত্রটি গড়ে উঠেন বিখ্যাত সাহিত্যিক হিসেবে। নাম স্মরণ করা হয় হিন্দুস্তানের বড় মজলিসে। লেখা প্রকাশিত হতে থাকে দিল্লি, আগ্রা ও লখনৌ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকায়। তার বেড়ে উঠা যেন ইংরেজ দার্শনিক ও তাত্ত্বিক স্টুয়ার্ট মিলের বেড়ে উঠাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। জেমস মিল কীভাবে পুত্র স্টুয়ার্ট মিলকে বড় করেছেন; তা ইউরোপীয় ইতিহাসে প্রশংসিত। অবশ্য আলেম ও ফকিহ আবদুল হাই আখতারের প্রচেষ্টা খুব বেশি কেউ জানে না। অথচ তার পুত্র বেড়ে উঠেছে বাংলার মাটি, পানি আর বাতাসে। পরবর্তী হিন্দুস্তানের সাহিত্যিক ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে খালেদ বাঙালি নামে।

খালেদ বাঙালির জন্ম ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১২ ফাল্গুন। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারে ১৮৯১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান কিশোরগঞ্জের বৌলাইয়ের সাহেব বাড়ির কৃতি সন্তান। পিতা আখতার ছিলেন বিখ‌্যাত সংস্কারক ও সুফি মওলানা কারামত আলি জৈনপুরীর শিষ্য। আরবি, ফারসি ও উর্দুতে লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। তার পাঁচটি বই এখনো টিকে আছে ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসেবে। তার এক পূর্বপুরুষ ফার্সি ভাষায় লিখেছেন মসনবিয়ে বিদ‌্যাসুন্দর। বাংলা ভাষাতে এই পরিবারের সবচেয়ে বড় অবদান প্রথিতযশা অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ। ফারসি মহাকাব‌্য শাহনামা অনুবাদের পাশাপাশি তিনি বাংলা ভাষায় বিপুল রচনা রেখেে গেছেন। খালেদ বাঙালির ছেলে জাহেদ সিদ্দীকি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের শব্দসৈনিক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এভাবে পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতির গতিপথ নির্ধারণে বৌলাইয়ের সাহেব বাড়ির ভূমিকাকে ঢাকার নওয়াব পরিবারের অবদানের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

খালেদ বাঙালির পিতৃপ্রদত্ত নাম মাহবুব-উর-রব সিদ্দীকি। তার কাব্যপ্রতিভার পেছনে বৌলাই বাড়ির পরিবেশই প্রধান অনুঘটক হয়ে ছিল। বৌলাই বাড়ির একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল উত্তর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। সাধারণত সন্তানদের পড়াশোনা করানোর জন্য দিল্লি, লখনৌ ও মুলতান থেকে শিক্ষক আনা হতো পূর্ব বাংলায়। খালেদ বাঙালির ক্ষেত্রেও সেটা ঘটেছিল। পরবর্তীতে তাকে শিক্ষার জন্য সশরীরে আগ্রা, এলাহাবাদ ও লখনৌ যেতে হয়। ক্রমে তিনি ফারসি, উর্দু ও আরবি ভাষা পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। লেখালেখির শুরুটাও সেদিক থেকে ছোটবেলা থেকেই। তবে পুরোদস্তুর লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন ১৯ বছর বয়সে। 

উর্দু ও ফার্সি—দুই ভাষাতে গদ্য ও পদ্য লেখায় মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন খালেদ বাঙালি। তিনি যে উর্দু কাব্য ও সাহিত্যে হিন্দুস্তানজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন, তার সূত্র ধরেই বন্ধুত্ব হয় সমকালীন অন্যান্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম আবদুল গফুর বিসমিল, সলিমুল্লাহ ফাহমি, হাকিম হাবিবুর রহমান, জিগর মুরাদাবাদী, মায়েল এলাহাবাদী, নিয়াজ ফতেহপুরী, খাজা মুহাম্মদ আদেল, খাজা মুহাম্মদ মুয়াজ্জম, ফিদা আলি খান, রেজা আলি ওয়াহশাত, বদরুজ্জামান বদর এবং দিলগির আকবরাবাদী। এছাড়া কুমিল্লার মোহাম্মদ হোসেন খসরু এবং ঢাকা আলিয়ার প্রিন্সিপাল আবু নসর ওয়াহিদের সঙ্গেও ছিল তার বন্ধুত্ব।

জীবনের প্রথম দিকে খালেদ অন্তর্মুখী স্বভাবের ছিলেন। এক বাঙালি অফিসারের অনুপ্রেরণায় তিনি সামনে আসেন। বৌলাইয়ে মুশায়েরার আয়োজন হতে থাকে। আর মুশায়েরার সূত্র ধরেই যোগাযোগ ছড়িয়ে পড়ে। তার মৃত্যুর পরেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে যেতে থাকে হিন্দুস্তানের নানা প্রান্তে।  অন্তত ৩০-৩৫ জন কবি বৌলাইয়ের মুশায়েরায় নিয়মিত হাজির থাকতেন। যারা আসতে পারতেন না, তারা লেখা পাঠাতেন। মুশায়েরা নিয়ে আলোচনা তুলে ধরেছেন মনিরউদ্দীন ইউসুফ তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন, আমার অভিজ্ঞতা’ বইয়ে। তিনি বলেছেন,

‘খালেদ বাঙালি তার দালানের পাশেই যে রং মহল তৈনি করেছিলেন, তা ছিল দেশীয় স্থাপত্যরীতির ছনের আটচালা। চাচার এই ঘরটিতেই মুশায়েরা অনুষ্ঠিত হতো। সারা ঘরে কাঠের পাটাতনের উপর কার্পেট বিছানো থাকতো ও সুদৃশ্য সব টেবিলের উপর সাজানো থাকতো তুরস্কের তৈরি বেলোয়াড়ি কাঁচের ছোট বড় বিভিন্ন পাত্র। তন্মধ্যে পানপাত্রও থাকতো এবং সময় ও সুযোগে সেগুলোর ব্যবহারও হতো।’

নিজে কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার বাইরে খালেদ পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন। আসলে খালেদের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক সফলতার একটি হলো ‘আখতার’ পত্রিকা। বৌলাই থেকে তিনি সাহিত্য সাময়িকীটি প্রকাশ করেন। গবেষকদের বড় অংশের দাবি, আখতার প্রকাশিত হয় ১৯২৪ সালে। তবে ২০২১ সালে আগ্রা থেকে প্রকাশিত নাক্কাদ পত্রিকায় তাকে আখতার পত্রিকার এডিটর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। সময় যেটাই হোক, সেই সময়ে কিশোরগঞ্জের মতো একটা অখ্যাত অঞ্চল থেকে উর্দু সাহিত্য পত্রিকা বের করা সাধারণ কোনো কথা ছিল না। পূর্ববঙ্গ থেকে ১৯০৬ সালে হাকিম হাবিবুর রহমানের সম্পাদনায় বের হয়েছিল আল মাশরেক। প্রথমে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হলেও পরে এটি সাপ্তাহিকে পরিণত হয়। দ্বিতীয় উর্দু পত্রিকা ছিল জাদু। ১৯২৩ সালে পত্রিকাটি খাজা মুহাম্মদ আদেলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো। সেদিক থেকে আখতার হয় দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় পত্রিকা; যা অনেকটা দুঃসাহসের মতো। সত্যি বলতে, আখতার ছিল সেই সময়ের পূর্ববাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক নিদর্শন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ও উর্দু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. জাফর আহমদ ভুঁইয়া বলেন, ‘আখতারের ঐ এক সংখ্যাকেই বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গের) মাটিতে উর্দু সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ এবং সোনালী অধ্যায় বলা যেতে পারে।’

খালেদ বাঙ্গালি জীবিত ছিলেন মাত্র ৫৪ বছর। পরলোক গমন করেন ১৯৪৪ সাল। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই তার লেখা প্রবন্ধের সংখ্যা ২৪, কবিতা ৪০ এবং গজল ১৫০ টির বেশি। তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো নাক্কাদ, আলমগীর, আদিব, জবান এবং জাদীদ উর্দু পত্রিকায়। এর বাইরে হিন্দুস্তানের নানা সাহিত্য পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার দুইটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি ছিল বলে জানা যায়। তবে সেগুলো কোথায় রয়েছে, তা কেউ জানেন না। তিনি একটি বইও সম্পাদনা করেছেন, যার পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। বইটির নাম রুকা’আতে পেদার ওয়া পেসার (পিতা ও পুত্রের মধ্যকার চিঠিপত্র)। মূলত খালেদ বাঙ্গালি ও তার পিতা আখতারের মধ্যকার চিঠির সংকলন।

 

দুই.

খালেদ বাঙালির অনেক কবিতাই নিখোঁজ। তারপরও যে কবিতাগুলো হাতে পৌঁছছে, তা দিয়েই একটা ধারণা স্পষ্ট হয়। সমকালীন কবিদের তুলনায় তার কবিতা ছিল স্বতন্ত্র। ভাষার দক্ষতা, বাগধারার ব্যবহার ও লেখার বিষয়বস্তু তাকে অন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। তিনি যে বাংলাপ্রভাবিত শব্দ উর্দু কাব্যে ব্যবহার করেছেন; তা খোদ উর্দুভাষারই পুর্ববঙ্গীয় স্বাতন্ত্র্যকে নির্দেশ করে। তিনি বহু উর্দু কবিতায় বাংলা শব্দকেই আত্মীকৃত করেছেন। পাশাপাশি রূপ নির্মাণ ও বিষয়বস্তু আকারে পূর্ব বাংলার পরিবেশ তো রয়েছে। তার বিখ্যাত রচনার মধ্যে রয়েছে ঢাকা এবং বাংলার বর্ষা। ঢাকা নিয়ে ১৯২৪ সালে তিনি প্রায় ৭০ লাইন দীর্ঘ এক কবিতা প্রকাশ করেন। নিঃসন্দেহে কবিতা লেখা হয়েছিল তার ঢের আগে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ঢাকা নগরীর বিশেষত্ব বর্ণনা করে নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। এত আগে ঢাকার উদ্দেশ্যে আর কোনো কবি কিছু লিখেছেন কি না, তা জানা যায় না। কবিতাটিতে তিনি বলেছেন,

‘প্রতিটি প্রকাশ হৃদয়গ্রাহী, প্রতি পলে ভরে মন,

মোগল যুগের নগরী গো, করো জীবন সঞ্চরণ,

পরিপাটি ওই পোশাকে বসানো আভিজাত্যের জরি

আচারে লুকানো এশীয় জাতির নিগূঢ় আখ্যায়িকা।

 

প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।।

এভাবে ঢাকার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি ঢাকার গৌরবময় ইতিহাসকে স্মরণ করেছেন একদিকে; অন্যদিকে ঢাকায় জন্ম নেয়া মহাপুরুষদের নৈকট্য অনুধাবনের কথা বলেছেন। ইতিহাসের বাঁক, বর্তমান জীবনের সৌন্দর্য এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে দৃঢ়তার সঙ্গে তুলে ধরেছেন তিনি। পঙক্তির ভেতরে যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উঠে এসেছে, তেমনি তুলে ধরা হয়েছে নাগরিক নন্দনবোধ। এক জায়গায় তিনি বলেছেন-

লালচে মাটির পথগুলো সেকি হোলি খেলবার দাগ?

নাকি বিকেলের লালচে আকাশ, না রঙধনুর রাগ?

নিষ্পাপ সব মুখগুলো যেন ফুটে আছে ফুল হয়ে

সত্যিই ঢাকা নগরী কি? নাকি মালির ফুলের ঝাঁকা?

 

প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।

এই যে অকপট চিত্রকল্প নির্মাণ, এটা খালেদের কবিতায় প্রায়ই দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। তবে সম্ভবত ঢাকা কবিতার শেষটা বিশেষভাবে লক্ষনীয়। ইতিহাস ও ভবিষ্যত সম্ভাবনার ব্যাখ্যা তুলে ধরার পর খালেদ নিজেকে ঢাকার স্তাবক হিসেবে তুলে ধরছেন। তার প্রতিশ্রুতি, উত্তর ভারতের বন্ধুমহলে কেউ যদি ঢাকাকে উপেক্ষা করতে চায়, তিনি তার প্রতিবাদ করবেন। তার কথাগুলো অনেকটা এমন—

বন্ধুর ভিড়ে থাকবো হাজির যত ভাবে, যত বার-

উঠবোই ফুঁসে ঢাকাকে সেখানে করা হলে অস্বীকার,

কেন উঠবো না? সত্য কথাকে গোপনে রাখবো কত?

বরং বলবো লাখো-কোটি বার চিৎকার করে একা—

 

প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।

বাংলার মানুষ ও মানুষের জীবন তার কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তার আরেকটি উদাহরণ হতে পারে বর্ষা কবিতাটি। বর্ষা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কম কবিতা নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বর্ষার দিনে’ কবিতায় মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রেম। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘বর্ষা-বিদায়’ বর্ষা নিয়ে হলেও তাতে বর্ষার পারিপার্শ্বিক চিত্রের চেয়ে তার চলে যাওয়াই প্রাধান্য পেয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ফররুখ আহমদ ও সুকুমার রায়ও লিখেছেন বর্ষা নিয়ে কবিতা। সুকুমারের লেখায় কবি নিজেই কেন্দ্রীয় চরিত্র। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলতে গেলে আকাশ ও বাতাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ফররুখ আহমদের কবিতা বর্ষা শিশুতোষ। সেদিক থেকে খালেদ বাঙালি যেভাবে বর্ষাকে চিত্রিত করেছেন, সেটা পূর্ব-বাংলার চিরকালীন বর্ষার রূপ। দীর্ঘ সে কবিতার কয়েক লাইনের বাংলা তরজমা করলে দাঁড়ায় এমন—

বাংলার ভূমি জুড়ে মেখে রাখা অসীম আবেগ

যেনবা লুকিয়ে তাতে বিচিত্র ও মায়াবী জগৎ;

অদূরে মেঘের নিচে হাসে ঘোর কালোরাত্রি এক

ভীত বসে মুখোমুখি বরষা ও আমি যুগপৎ।

….  …             ….     ….       

যৌবন ফিরেছে বাগে, পূর্ণ তাই কানায় কানায়

কুড়ি ও ফুলেরা যেন স্নান করে হয়েছে নির্মল,

বজ্রের চমক চলে, চারদিকে মেঘ ছেয়ে যায়

নারীর চুলের মতো দোল খায় তটিনীর জল।’

….  …         ….     ….        

আঁচলে জড়িয়ে ফুল মাতামাতি করো না বাতাস

বুকের ভেতরে আজ বিষাদের তপ্ত সাইমুম,

ভরা বরষার ভিড়ে মনে পূর্ণ দুঃখ হাহুতাশ

বন্ধু সব হিন্দুস্তানে, বাংলা জুড়ে শ্রাবণ মৌসুম।

নদীর পানিকে নারীর চুলের সঙ্গে তুলনা করার মতো আধুনিকতা খালেদ বাঙালি তৈরি করে ফেলেছিলেন নিজের কাব্যভাষায়। এই কবিতার সঙ্গে বিশেষ একটি ঘটনা রয়েছে। খালেদ যখন কবিতাটি আগ্রার নাক্কাদ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য পাঠান, তখন কবিতাটি পড়েই মুগ্ধতায় চেয়ার থেকে পরে যাওয়ার জোগার হয়েছিল দিলগিরের। দিলগির মানে দিলগির আকবরাবাদী। নাক্কাদ পত্রিকার সম্পাদক। তারপর সেটাই ঘটেছিল, যা ঘটার কথা। দিলগির আকবরাবাদী সোজা চলে আসলেন বাংলায়। কবিতার রচয়িতা খালেদ বাঙালির বাড়ি। কতেকটা বর্ষার প্রেমে পড়ে; আর কতেকটা কবির মুনশিয়ানায়। মুনশিয়ানা থাকবে না-ই বা কেন? বাস্তবিক জীবনেও বাংলার প্রতি তার মুগ্ধতা ছিল অপরিসীম। বিভিন্ন সময়েই তিনি বাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে প্রতিবিম্বিত করেছেন শব্দের বন্ধনীতে।

 

তিন.

কেবল প্রকৃতি না; খালেদের বর্ণনায় উঠে এসেছে মানুষ। মানুষের অভিব্যক্তি। মানুষের হাসি-কান্না। খালেদের শ্রেষ্ঠ রচনা সম্ভবত হাসিন সুগওয়ার তথা অপূর্ব বিলাপ। আধুনিক ঢংয়ে লেখাটি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের বিখ্যাত I wandered Lonely as a Cloud কবিতার সঙ্গে তুলনীয়। তবে এর স্বাতন্ত্র্য আখ্যানের বিস্তারে। কবিতার বুনন অনুসরণ করলে দেখা যায়, কবি ঘুম থকে অস্থির মন নিয়ে ওঠেন। বিছানা ছেড়ে উঠে সকালের প্রকৃতি দেখার পর কিছুটা প্রশান্ত হন। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে থমকে যান একটা উঁচু ঢিবির কাছে। নির্জন সেই ঢিবি মূলত একটা কবর। সেখানে একটা মোমবাতি জ্বালানো। সেখানেই দেখা যায় এক নারীকে। হাতে তার ফুল, চোখে পানি। দীর্ঘ সময় চুপচাপ থাকার পর তিনি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বিলাপ করেন। সে বিলাপের তুলনা নেই। এই কবিতা লেখারও দুই বছর পর তথা ১৯২৫ সালে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের লেখা কবর কবিতায় বিলাপ দেখা যায়; কিন্তু এই বিলাপ ভিন্ন। মৃত জীবনসঙ্গীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিরহী নারীর আর্তনাদকে বিশ্ব সাহিত্যের ধ্রুপদি কবিতার পাশে রেখে অনায়াসে পাঠ করা যেতে পারে। কবিতার সমাপ্তি টানছেন তিনি এভাবে—

‘এমনও দিন ছিল, যখন তার ঠাই ছিল আমার চৌকাঠ

আজ তার কবরের ধুলায় লুটায় আমার কপাল।

দুনিয়ার দ্বিচারিতা বিস্ময়কর,

চোখের পলকে বদলে গেল বাস্তবতা,

হে খালেদ, মিলনের রাতের কথা কি মনে পড়ে? 

যদিও সত্যিকার অর্থে জীবিত ছিলে না,

কিন্তু একটা অন্তর তো ছিল!’

খালেদ যে বছর জন্মগ্রহণ করেন, তার দুই দশক আগে মৃত‌্যুবরণ করেছেন মির্জা গালিব। মির্জা গালিব উনিশ শতকের উর্দু সাহিত‌্যের বাঁক বদলকারী কবি। নিজের সময়েই তিনি যে খ‌্যাতি অর্জন করতে পেরেছিলেন, তা অবিশ্বাস‌্য। বাংলার, বিশেষ করে ঢাকার সাহিত‌্যিকের সঙ্গে তার চিঠি চালাচালি হয়েছে।  খালেদ বাঙালির ওপর কি মির্জা গালিবের কোনো প্রভাব ছিল? এই প্রশ্ন উঠা অমূলক না। এর উত্তর নানাভাবেই দেয়া যেতে পারে। প্রথমত, খালেদের ভাষার ব‌্যবহার মির্জা গালিবের থেকে ভিন্ন। সত‌্যি বলতে বাংলার উর্দু যে উত্তর ভারতের উর্দু থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট‌্য গ্রহণ করছিল, তার বড় দলিল খালেদ। তবে তারপরও মির্জা গালিবের বিরহভাবনা খালেদকে প্রভাবিত করেছিল নিঃসন্দেহে। মির্জা গালিব লিখেছিলেন—

‘আমার কবরে কাঁদতে এসো না,

এসো না বলতে যে তুমি আমাকে ভালোবাসো।

যতদিন আমি বেঁচে আছি, কষ্টই দিয়ে যাও,

যখন চিরঘুমে শুয়ে পড়ব, তখন আর জাগাতে এসো না।’

গালিব বিরহী কবি। নিজের দুর্ভাগ‌্য আর দুর্ভাবনাকে তিনি সামনে এনেছেন পরিহাসের ছলে। তার বিরহেরই যেন প্রতিধ্বনি করেছেন খালেদ বাঙালির ‘ব্যথার প্রলাপ’ নামের কবিতায়। সেখানে তিনি প্রিয়তমার জন্য নিজের অপেক্ষার কথা বর্ণনা করছেন। তারপর তুলে ধরছেন মৃত্যুপরবর্তী দৃশ্য। সে দৃশ্য অনেকটা এরকম—

যেখানে সমাহিত থাকবে আমার নিশ্চল অনুভূতিহীন হৃদয় ও শরীর

সেখানে কোনো এক পূর্ণিমা রাতে

ছুটে আসবে আমার প্রেমিকা,

আসবে গভীর আবেগে ফাতেহা পড়ার জন্য।’

অন্তত বিরহের চিত্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে খালেদ বাঙালি গালিবের অনুগামী। যদিও সব সময় তিনি কবিতার ভেতরে একই গৎবাঁধা ধরনে আটকে থাকেননি। সমকালীন বাংলা ও ফার্সি ভাষার কবিদেরকেও যিনি ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন, তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। খালেদ রবীন্দ্রনাথকে পড়েছিলেন গভীরভাবে। তারা সমসাময়িকও ছিলেন অনেকটা। বলা হয়, রবীন্দ্রনাথের একটা লেখা তিনি অনুবাদও করেছিলেন। যা হোক, ছবি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত একটি গান রয়েছে। ‘তুমি কি কেবলই ছবি’ গানটির ভাষা ও ব্যঞ্জনার ভেতরে রয়েছে অব্যক্ত এক বেদনা। তিনি লিখেছিলেন—

তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা।

ওই-যে সুদূর নীহারিকা

যারা করে আছে ভিড়  

আকাশের নীড়,

ওই যারা দিনরাত্রি

আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী  

গ্রহ তারা রবি,

তুমি কি তাদের মতো সত্য নও।

খালেদ বাঙালিও একটি কবিতা লিখেছিলেন ছবিকে উপজীব‌্য করে। তার কবিতার নাম ‘কিসি কি তাসাউউর দেখ কার’ তথা কোনো এক ছবি দেখে। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো তার লেখায় প্রিয়-বিয়োগ মুখ্য হয়ে উঠেনি। বরং প্রাধান্য পেয়েছে প্রেমের গভীরতা। খালেদ বলেছেন—

সম্ভবত আমার অন্তরে একথাই প্রোথিত যে,

তোমার চেহারা ভিন্ন অন‌্য কোনো দিকে দৃষ্টি ফেরাবো না।

তাই কিছু সময় পর পর তোমার সঙ্গে কথা বলি

রসিকতা করি

তোমার বিস্মিত দৃষ্টি কেড়ে নেই।

কেবল একটাই কামনা, তুমি কিছু বলো

চাইলে আমার কণ্ঠস্বর নিয়ে হলেও কিছু বলো

আকাশে ও পাতালে যত সম্পদ আছে—

অকাতরে তোমাকে উৎসর্গ করে দেবো।

প্রেম প্রসঙ্গ আসলে ‘পেহলি ঝলক’ কবিতার কথা না আনলে সম্ভবত খালেদের সঙ্গে অন‌্যায় করা হবে। কবিতায় প্রথম দেখাতে প্রেমে পড়ার স্মৃতি রোমন্থন করা হয়েছে। কোনো এক সন্ধ্যায় কবি তার সেই প্রিয়তমাকে দেখেন এবং মুগ্ধ হয়ে পড়েন। কবিতাটি খালেদ শুরু করেছেন অনেকটা এভাবে—

সেদিন বন্ধু জানতে চাইলো, বলো তো খালেদ একটা বার—

অন্তর যারে দিয়েছিলে সঁপে, দেখেছো কখনো মুখটা তার?

ভার বুক নিয়ে দিলাম জবাব 

শুনে যেন মন করো না খারাপ

কোন অসময় পেয়েছি দিদার সে বড় করুণ কিসসা, হায়,

সত্যিই যদি আগ্রহ থাকে, মনোযোগ দাও সেই কথায়।

 

চার.

খালেদের পরিবার পারিবারিকভাবে তাসাউফের চর্চা করত। একই সময়ের উর্দু কবিতার সঙ্গে তাসাউফের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অবশ‌্য তাসাউফের যে স্বতস্ফূর্ত অভিব‌্যক্তি, তার সঙ্গে মিশে থাকে কবিতা ও সঙ্গীতের উপাদান। পরমাত্মাকে প্রিয়তম হিসেবে কবিতায় অঙ্কন করতে চাওয়াটা সুফি কবিতার প্রধান প্রবণতা। সিলসিলার প্রতিনিধিত্বকারী একজন হিসেবে খালেদ নিজের যোগ‌্যতা প্রমাণ করেছেন ভালোভাবেই। জাদিদ উর্দু পত্রিকার ১৯২৪ সালের সংখ্যায় তিনি গজল লিখেছেন, তার কবিতার ভাবার্থ অনেকটা এমন—

হৃদয়ের ক্ষতের আলো দিয়েই কাজ চালিয়ে নিই,

কোনো কোনো রাতে তো পূর্ণিমার চাঁদও ম্লান হয়ে যায়,

দূরে থেকেও আমি প্রতি মুহূর্তে থাকি তোমার সাথে,

শত্রু তো পাশে থেকেও হৃদয় থেকে বহু দূরে থাকে।

…       …

খোদার মহিমা দেখে আমি অভিভূত,

কোটি মানুষের ভিড়ে কেবল একজনই ‘মানসুর’ হয়ে ফাঁসিতে চড়ে।

সবকিছু দেখেও আমি সেই ভালোবাসার সমর্থক, খালিদ,

হৃদয় কারো প্রেমে এভাবেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।

মানসুর হাল্লাজ ছিলেন নবম শতাব্দীর পারস্যের একজন কিংবদন্তিতুল্য সুফি ও মরমী কবি। ৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যে জন্মগ্রহণকারী এ সুফি জুনায়েদ বাগদাদীর মতো প্রখ্যাত সুফিদের সান্নিধ্যে থেকে ইলমে তাসাউফ অর্জন করেন। পরবর্তীতে ভারত ও চীন ভ্রমণ করে আধ্যাত্মিক বাণী প্রচার করেন। তাঁর দর্শন ছিল স্রষ্টার প্রেমে নিজ সত্তাকে বিলীন করে দেওয়া, যা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর কাছে ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ মতপার্থক্যের জেরে ৯ বছর কারাবন্দি থাকার পর ৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আজও তাঁর জীবনকে সুফিবাদের ইতিহাসে পরম আত্মত্যাগ ও খোদাপ্রেমের প্রতীক হিসেবে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

খালেদ বাঙালিও বিভিন্ন সময়ে মানসুর হাল্লাজকে সামনে তুলে এনেছেন। তার একটি কবিতা শাহাদাতে মানসুর কা নাজারা তথা মানসুরের শাহাদতবরণের দৃশ‌্য। কবিতায় মনসুরেরর শাহাদতকালীন যে বিরহী চিত্র কবি খালেদ তৈরি করেছেন, তা কেবল পুথি সাহিত‌্যে বর্ণিত হোসাইনের শহিদ হওয়ার সঙ্গেই  তুলনীয়। কবিতার শুরু হয়েছে এভাবে—

প্রেমের অভিযোগে অভিযুক্ত স্বেচ্ছায় দাঁড়িয়েছে ফাঁসির মঞ্চে

সৃষ্টিকর্তা নিজে ব‌্যাকুল হলেন, একী হতে যাচ্ছে

আকাশ নাড়াচাড়া শুরু করে দিয়েছে, শুরু হয়েছে ভূমিকম্প

এ কোন মনীষীকে হত‌্যা করা হচ্ছে?

তাসাউফ খালেদের কবিতায় নানা সময়ে নানরূপে হাজির হয়েছে। তা তার অধিকাংশ কবিতার বিষয়বস্তু। আখতার পত্রিকা, নাক্কাদ, জাদু এবং জবানের মতো খ্যাতনামা পত্রিকাগুলোয় তিনি সুফিধারার অনেক কবিতা লিখেছেন। ‘জজবায়ে খালেদ’ বা খালেদের জজবা নামে একটা কবিতায় তিনি ঘোষণা করছেন—

সময়ের নিষ্ঠুরতায় হৃদয় এতটাই চুরমার হয়ে গেছে, খোদা

এখন কেউ ভালোবাসার কথা বললেও ফুঁপিয়ে উঠি

কোনো একদিন বুলবুলকে জিজ্ঞাসা করবো,

আমরা কি শরতে শান্তি পাবো?

নাকি অপেক্ষা করতে হবে বসন্তের সুখের জন্য?

যদি অপেক্ষার পথেই হাঁটতে হয়,

তারপরও চোখ তো তার দিকেই নিবন্ধ, যিনি পরম চালক

আমাদের ঠোঁটে দীর্ঘশ্বাস, হৃদয় জুড়ে আঘাতের ক্ষত;

কি দুঃসহ এ বন্দিদশা! আহা!

কোন অপরূপ দুনিয়া থেকে আমরা এখানে এসেছি?

আবার সেই চিরাচরিত সুফি বিষয়বস্তু। পরমাত্মার বিরহে জীবাত্মার আর্তনাদ। দুনিয়ার অর্থহীনতা ও নানা রকম কারচুপি। বিপরীতে খোদার কাছে আশ্রয় খুঁজে নেয়া। অন‌্যত্র তিনি বলেছেন—

​হে উন্মাদনা, আমায় কান্না থেকে রেহাই দাও,

আজ চোখ মোছার মতো আঁচলও নেই

কেউ যদি বোঝে, তবে সে কী বুঝবে?

অর্থাৎ, সেখানে ‘হ্যাঁ’ নেই, আবার ‘না’-ও নেই।

দুনিয়ার কাজ গুছিয়ে নাও হে খালিদ!

দ্বীনদার লোকেরাও আর নেই।

এর বাইরে ‘হজরত খিজির কি নসিহা জনাব মুসা আ. কো’ তথা মুসা আ. এর প্রতি হজরত খিজিরের উপদেশ কবিতাটির মতো আরো অনেক কবিতাই রয়েছে, যেগুলো মূলত সুফিভাব-নির্ভর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুফিভাবের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দার্শনিকতা। তার চূড়ান্ত উদাহরণ ‘ম্যাঁয় কৌন হো, ম্যাঁয় কিয়া হো’ অর্থাৎ আমি কে, আমি কি কবিতাটি। কবিতাটিতে তিনি লিখেছেন—

‘কেউ যেন আমায় না জিজ্ঞাসা করে—আমি কে, আমি কী?

প্রেমের পথে আমি এক ভ্রান্ত পথিক, উন্মাদ সত্তা।’

 

পাঁচ.

খালেদ বাঙালির মধ্যে প্রগতিশীলতার উপাদান দেখার পর কেউ কেউ সন্দিহান হতে পারেন নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে। বিষয়টি খুব স্পষ্ট। একই সঙ্গে তিনি বাংলা ও মুসলমানের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে বহন করে এগিয়ে গেছেন। ব‌্যক্তিজীবনে খালেদকে খুব বেশি ধার্মিক হিসেবে দেখা যায়নি। তারপরও তিনি জাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে বেখবর ছিলেন না। তার পয়লা নজির দেখা যায় ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায়। ঢাকা কবিতারও বছর খানেক আগে প্রকাশিত হয় ‘ঈদ মোবারক’। কবিতায় তিনি শুরুই করছেন এভাবে—

শুনছো বন্ধু সেই সুখবর? শুভ মুহূর্ত এসেছে ফের

আড়মোড়া ভেঙে দূরের আকাশে ঈদের হেলাল হয়েছে বের,

পৃথিবী নামের মহা-উদ্যানে বইছে আবার ফাগুন বায়,

প্রকৃতি আজ আরো মনোহর নয়া রঙ নয়া কারিশমায়।

কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তী পঙক্তিগুলোতেও সেভাবেই ধরা দিয়েছে কথাগুলো। তবে খালেদ আরেকটু এগিয়ে গেছেন, যেমনটা উমর খৈয়াম ও হাফিজের কথায় মেলে। তিনি বলছেন—

প্রতীক্ষাদের হলো অবসান, এসেছে সময় কোলাকুলির,

ছোট বড় শত ইচ্ছেরা এসে মন মসনদে করেছে ভিড়,

সুন্দরিদের বলে দাও কেউ আজকে নিকাব সরিয়ে দিক

বুক চেপে থাকা প্রেমিকেরা সেই সুযোগে দু’চোখ জুড়িয়ে নিক। 

এই যে কবিতার মধ্যে একই সঙ্গে ধর্ম, দেশ ও তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব করা, এটা খালেদের রচনা থেকে কখনো আলাদা হয়নি। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি তার যে দরদ, সেটা ফুটে উঠেছে তার অন্য কবিতায়। খেলাফতের পতন হবার পর বাংলা ও হিন্দুস্তানের মুসলমানরা অনেকটা হতাশ হয়ে পড়ে। কবি তেগ আনসারী এ সময় একটি কবিতা রচনা করলেন। কবিতাটি ছিল হতাশাব্যঞ্জক, বিভ্রান্তিকর। পুরো কবিতা ছিল বস্তুত ভয়ানক আত্মঘাতী। কবিতাটি পড়ে এর জবাবে খালেদ বাঙালি একটা কবিতা লেখেন। কবিতার নাম ‘কওমি হানাফি সে’ তথা হানাফি সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে। তিনি লিখেন—

‘খেলাফতের পতনে ইসলামের শরীর থেকে ধড় ছিন্ন হলো—

এটা তুমি কি বললে তেগ আনসারী?

সংযত করো নিজের জবান,

মুসলমান জাতি কি কখনও ভরসা করে থেকেছে—

কেবল খেলাফত ও তুরস্কের ওপর? 

হযরত মুহম্মদের অনুসারী যারা,

তারা কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না।’

এই পঙক্তিতে স্পষ্ট যে, খালেদ তুর্কির খেলাফতের পতনকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। পাঠ করতে চেয়েছেন নতুন করে উত্থানের সুযোগ হিসেবে। বিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবালের মতো খালেদ বাঙালিও মনে করেন খেলাফত না, মুসলমানদের পুনর্গঠন গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে এক মাহফিলে কবিতাটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে। এই কবিতায় কবি তৎকালীন উর্দু সাহিত‌্যের বড় বড় কবিদের সঙ্গে কাল্পনিক সাক্ষাৎকে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তাদের প্রতি রয়েছে বিশেষ মন্তব‌্য। কবিতার শেষ দিকে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া খালেদ ঘোষণা করেছেন—

দিল্লীকে রাজধানী করায় গর্বিত দিল্লীবাসী

লখনৌয়ের কবিরা মশগুল নারীর চুলের সৌন্দর্য নিয়ে

আমাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি

ক্ষত মনে করা হচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি-ধর্মকে

মিস্টার ও মৌলভির মধ্যে কোনো ফারাক নাই; 

ওরা যে নৌকায় পা দেয়, তা অচিরেই ডুবে যায়

চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতির ভার না সরালে

নিচে পড়ে থাকা নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে আনা যাবে না

এই যে দুঃখের তো কোনো পরিসীমা নাই।

 

চল এখন মদিনা যাই

আমরা হযরত মোহাম্মদের আশ্রয়প্রার্থী

অবশেষে খালেদ এ কথা বলে উঠে গেল—

এই সব কিছু নয়, ও সবও কিছু নয়

মোহাম্মদের আদর্শই আমাদের আদর্শ।

 

ছয়.

খালেদ বাঙালি যখন লেখালেখিতে এসেছেন, কাছাকাছি সময়েই বাংলা সাহিত্যেও নয়া স্রোত শুরু হয়েছে। বিশের দশকে কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীনের মতো কবিরা লিখছেন। ঢাকায় গঠিত হয়েছে মুসলিম সাহিত্য সমাজ। একইভাবে খালেদ যখন আখতার বের করছেন, তার কয়েক বছর পর ঢাকা থেকে বের হয়েছে শিখা পত্রিকা। এক বছর আগে কিংবা পরে ঢাকা থেকে বের হয়েছে আরো একটি উর্দু পত্রিকা জাদু। চরিত্রগতভাবেই বাংলার আবহ থেকে উর্দু আবহ ছিল ভিন্ন। বাংলাভাষী সাহিতিহ্যকদের বড় অংশ ছিলেন নবগঠিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী। তাদের প্রতিক্রিয়াও অনেক বেশি স্থানিক। সেদিক থেকে উর্দু পত্রিকার বড় অংশ ছিল পুরাতন অভিজাতদের। তাদের যোগাযোগের জাল ছড়িয়ে ছিল দিল্লি, আগ্রা, হায়দারাবাদ, পাটনা ও করাচি পর্যন্ত। ফলে এ সব পত্রিকার লেখকরাও ছিলেন হিন্দুস্থানের বিভিন্ন অংশে। খালেদ বাঙালির জীবন ও কর্মের ভেতরে সেটাই বিম্বিত হয়।  

বাংলায় ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদের কারণে খালেদ বাঙালির ইতিহাস মুছে গেছে বললেই চলে। অথচ বাংলা অঞ্চলে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ফার্সি, উর্দু ও অন্যান্য ভাষার বসবাস শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। তার চূড়ান্ত দলিল খালেদ বাঙালির অনবদ্য রচনাবলি। পূর্ববঙ্গীয় উর্দুর স্বতন্ত্র্য পরিচয় নির্মাণে তার যে ততপরতা; তা অতুলনীয়। সম্ভবত এ কারণেই তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘মাশরিকি বেঙ্গল মেঁ উর্দু’ গ্রন্থের লেখক ইকবাল আজিম বলেছিলেন, ‘খালেদ বাঙালিকে নিয়ে পূর্ব বাংলা যত গর্বই করুক না কেন, তা কম হয়ে যাবে।’

 

তথ্যসূত্র:

আজিম, ইকবাল। মাশরেকি বেঙ্গল মেঁ উর্দু। ঢাকা: মাশরিক কো-অপারেটিভ পাবলিকেশন, ১৯৫৪।

ভট্টাচার্য, শান্তিরঞ্জন। বেঙ্গল মেঁ উর্দু সাহাফাত কি তারিখ। কলকাতা: মাগরেবি বেঙ্গল উর্দু একাডেমি, ২০০৩।

খান, হালিম দাদ, সম্পাদক। বৌলাই বাড়ির ৪০০ বছর। ঢাকা: কালান্তর প্রকাশনী, ২০১৯।

রাশিদি, ওয়াফা। বেঙ্গল মেঁ উর্দু। দিল্লি : উর্দু পাবলিশিং হাউস, ১৯৫৫।

ইউসুফ, মনিরউদ্দীন। আমার জীবন, আমার অভিজ্ঞতা। ঢাকা: কালান্তর প্রকাশনী, ১৯৯২।

বিসমিল, আবদুল গফুর। “খালেদ বাঙালি কা উর্দু খুতুত।” খাওয়ার। ঢাকা।

কলিমুল্লাহ। “মাশরেকি বেঙ্গল কা এক কাদিম উর্দু জাদিদ।” মাহে নও। করাচি।

আখতার। উর্দু সাময়িকী। ময়মনসিংহ।

জাদু। উর্দু সাময়িকী। ঢাকা।

নাক্কাদ। উর্দু সাময়িকী। আগ্রা।

সাকি। উর্দু সাময়িকী। দিল্লি।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments