পঞ্চেন্দ্রিয়র কথা তো আমরা সকলেই জানি; গন্ধ, স্বাদ, শোনা, দেখা ও স্পর্শ; এই মিলে পঞ্চেন্দ্রিয় অর্থাৎ পাঁচ ইন্দ্রিয়। লেখক ডায়ান অ্যাকারম্যানের বিখ্যাত বই ‘আ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ দ্য সেন্সেস’ এই পঞ্চেন্দ্রিয়কে নিয়েই লেখা। নাম শুনলে হয়তো পাঠ্যপুস্তক ঘরানার বই মনে হতে পারে, তবে আদতে তা না। অ্যাকারম্যান এই পাঁচ ইন্দ্রিয়কে কেন্দ্র করে ইতিহাস, বিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটি বিস্তৃত মানবিক আখ্যান নির্মাণ করেছেন। সহজ ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় তার এই নির্মাণে প্রতিটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে একেকটি ইন্দ্রিয়ের জীবনী। বইটি পাঠে একজন পাঠক অনুভব করবেন যে মানুষের অনুভূতির সৌন্দর্য কতো বিস্ময়করভাবে বিন্যস্ত।
ডায়ান অ্যাকারম্যান একজন কবি, প্রাবন্ধিক ও নন-ফিকশন লেখক, যিনি বিজ্ঞান, প্রকৃতি, মানব অনুভূতি ও দর্শনকে কাব্যিক ভাষায় মিলিয়ে লেখার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রকৃতি, ইন্দ্রিয়, মানবমন, বিজ্ঞান, স্মৃতি, নৈতিকতা, ইতিহাস তার লেখার বিষয়। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ পৃথিবীকে প্রথমে বোঝে তার ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে; অর্থাৎ পঞ্চেন্দ্রিয়র মাধ্যমে। তার লেখালেখিতে এই দর্শনই কেন্দ্র। এটি তার লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত বই। বইটি মানবইন্দ্রিয় নিয়ে এক অসাধারণ সাহিত্যিক-দার্শনিক অনুসন্ধান। তিনি আমাদের শেখান, পৃথিবীকে বুঝতে হলে শুধু জ্ঞান নয়, প্রয়োজন অনুভব।
অ্যাকারম্যান পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজিতে স্নাতক এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি চারুকলায়ও স্নাতকোত্তর করেন। পরে পিএইচডি অর্জন করেন। তার পিএইচডি গবেষণা কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ কার্ল সাগান। তিনি কলম্বিয়া এবং কর্নেলসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। অ্যাকারম্যান জাতীয়তায় আমেরিকান, জেন্ডারে নারী।
অ্যাকারম্যান বইটি শুরু করেন ঘ্রাণ দিয়ে, কারণ মানুষের স্মৃতির সাথে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত ইন্দ্রিয় হলো ঘ্রাণ বা গন্ধ। গন্ধ সরাসরি মস্তিষ্কের লিমবিক সিস্টেমে আঘাত করে, যেখানে স্মৃতি ও আবেগ বাস করে। একটি গন্ধ মুহূর্তের মধ্যে মানুষকে শৈশবে, প্রেমে, যুদ্ধক্ষেত্রে বা শোকের দিনে ফিরিয়ে নিতে পারে। সভ্যতার ইতিহাসে গন্ধের ভূমিকা আছে; যেমন, প্রাচীন মিশরে সুগন্ধি ব্যবহার; মধ্যযুগে দুর্গন্ধ ও রোগ; আধুনিক সমাজে ডিওডোরেন্ট ও ওডোর কন্ট্রোল। অ্যাকারম্যান দেখান, আধুনিক সভ্যতা গন্ধকে ‘দমন’ করতে চায়, কিন্তু গন্ধ আসলে মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি গোপন মানচিত্র। গন্ধের স্মৃতি ও অবচেতন থাকে। অ্যাকারম্যান আমাদের স্মৃতির সাথে গন্ধের সম্পর্ক বোঝাতে চেয়েছেন; কেন কিছু ঘ্রাণ আমাদের অতীতের সাথে সম্পর্কিত অনুভূতিকে উস্কে দেয়? তিনি শুধু বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেননি; গন্ধের সাথে মানুষের আবেগ, সামাজিক প্রথা ও ইতিহাসের জটিল সম্পর্কও তুলে ধরেছেন।
এর পরে রয়েছে স্বাদ। স্বাদ কেবল জিহ্বার ব্যাপার নয়—এটি রাজনীতি, শ্রেণি ও সংস্কৃতির ইতিহাস। স্বাদ জন্মগত নয়; এটি সংস্কৃতিনির্ভর। মিষ্টি, নোনতা, তিতা, টক—এই চার রসের সাথে যুক্ত আছে বিবর্তনের ইতিহাস। উপনিবেশবাদ ও মসলা-বাণিজ্য মানুষের স্বাদবোধকে বদলে দিয়েছে। কেন দুর্ভিক্ষের সমাজে চর্বি ও চিনি আকাঙ্ক্ষিত? কেন ধর্মীয় বিধিনিষেধ খাবারকে পবিত্র বা অপবিত্র করে তোলে? খাবার কেন সামাজিক বন্ধনের ভাষা? ইত্যাদি প্রশ্ন আছে। অ্যাকারম্যান এখানে স্বাদকে ব্যাখ্যা করেন ক্ষমতা ও কামনার ভাষা হিসেবে।
অ্যাকারম্যান স্বাদের দুনিয়াকে শুধুমাত্র রসনার একটি শারীরিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন না; বরং তা সামাজিক রীতিনীতি, খাদ্যসংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাথে যুক্ত করেন। কীভাবে আমাদের স্বাদ আমাদের পরিচয় গড়ে তোলে, কীভাবে খাবার আমাদের সমাজ ও সম্পর্কের অংশবিশেষ—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন তিনি। এখানে স্বাদ হয়ে ওঠে জীবনের আনন্দ, আবেগ ও সম্পর্কের এক সদস্য। অ্যাকারম্যান দেখান কীভাবে খাদ্য কোনো সমাজের ইতিহাস, ধর্মীয় রীতি, আবেগ ও সম্পর্কের কাঠামোতে গভীর ভূমিকা রাখে। এটি কেবল দৈনিক আহারের অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি মানবপরিচয়ের একটি প্রগতিশীল বস্তু।
শোনা বা শ্রবণ পর্বে আমরা দেখতে পাই শব্দের মাধ্যমে আবেগ ও স্মৃতির টানাপোড়েন। শ্রবণ বা হিয়ারিং সম্পর্কে অ্যাকারম্যান শুধু শব্দের বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করেন না; মানুষের জীবনে তিনি শব্দ ও সুরের প্রভাবের উপর আলোকপাত করেন। শব্দ আমাদের আবেগকে কীভাবে জাগ্রত করে, সংগীত আমাদের মস্তিষ্ক ও অনুভূতিতে কীভাবে গভীর প্রভাব ফেলে—এসব ব্যাখ্যার মধ্যে দিয়ে পাঠক খুঁজে পান শব্দের ভিন্ন ভিন্ন স্তর। তিনি দেখান কীভাবে আবহ সংগীত, প্রকৃতির নীরবতা, কথ্য ভাষা—এসব আমাদের অন্তর্দৃষ্টি, অনুভূতি ও মনস্তত্ত্বকে স্পর্শ করে। শব্দ আমাদের সতর্ক করে, শান্ত করে, প্রেমে ফেলে, আতঙ্কিত করে। মানুষের আগে শব্দ ছিল—ভাষা পরে এসেছে। নীরবতাও এক ধরনের শব্দ। মায়ের কণ্ঠ শিশুর জন্য প্রথম নিরাপত্তা; সংগীত কেন যুদ্ধ, প্রার্থনা ও শোকের সাথে জড়িত। অ্যাকারম্যান বলেন, “আমরা শব্দ শুনি না—আমরা শব্দের ভেতর বাস করি।”
এর পরে রয়েছে দেখা বা দর্শন অর্থাৎ চোখ ও চেতনার যে খেলা তা বর্ণনা করা হয়েছে এই পর্বে। চোখ, আলো ও রঙ—এসব সম্পর্কে অ্যাকারম্যান পাঠককে সাধারণ বিজ্ঞানের বাইরে নিয়ে যান। তিনি দর্শনের অর্থাৎ ভিশনের বিজ্ঞানকে সংবেদনশীলতা ও অনুভূতির সাথে মিলিয়ে একটি অদ্ভুত সুন্দর ক্যানভাস তৈরি করেন। প্রচলিত ধারণা যে, শুধুমাত্র চোখের মাধ্যমে আমরা দেখি; কিন্তু অ্যাকারম্যান দেখান প্রত্যেক দৃশ্য আমাদের অনুভুতির গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে পারে—তার ভাষা যেকোনো দৃশ্যকে মনের আয়নায় পরিণত করে। প্রশ্ন তোলেন, দেখা মানে কি বিশ্বাস?
এই অধ্যায়টি বইটির অন্যতম গভীর ও দার্শনিক অংশ। চোখ কেবল আলো গ্রহণ করে; দেখে মস্তিষ্ক। আমরা যা দেখি, তার বেশিরভাগই অনুমান। রঙ, আলো ও দৃষ্টিভ্রম—সবই সাংস্কৃতিক ও জৈবিক। অন্ধ মানুষের দৃষ্টির ধারণা; শিল্পকলায় দৃষ্টির রাজনীতি; কেন ‘যা দেখি তা সত্য’ সবসময় সত্য নয়; অ্যাকারম্যান দেখান, দৃষ্টি আমাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী কিন্তু সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ইন্দ্রিয়।
দর্শনের পরের পর্ব স্পর্শ। এই পর্বে সম্পর্ক, অনুভূতি ও সংযোগের ক্ষেত্রে স্পর্শের ভূমিকা বর্ণনা করা হয়েছে। অ্যাকারম্যান দেখান যে, স্পর্শ বা টাচ মানব সম্পর্কের কাঠামোতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি স্পর্শকে ব্যাখ্যা করেন কেবল শারীরিক যোগাযোগ হিসেবে নয়; এটি মানুষের আবেগদায়ক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবেও। সবচেয়ে প্রাথমিক, সবচেয়ে মানবিক এই অধ্যায়টি বইটির আবেগগত কেন্দ্র। স্পর্শই প্রথম ইন্দ্রিয় যা আমরা মাতৃগর্ভে অনুভব করি। স্পর্শ ছাড়া মানুষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ভালোবাসা, সহানুভূতি, নির্যাতন—সবই স্পর্শের ভাষায় লেখা। শিশুদের স্পর্শ-বঞ্চনা ও মানসিক বিকাশ; যৌনতা ও সামাজিক নিষেধ; যুদ্ধ ও নির্যাতনে স্পর্শের ভূমিকা ইত্যাদি অনেককিছুই তুলে আনা হয়েছে। অ্যাকারম্যান স্পর্শকে বলেন “ইন্দ্রিয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী”।
আগেই বলেছি, অ্যাকারম্যান একজন কবি; তার ভাষা বৈজ্ঞানিক রচনার মতো কাঠখোট্টা নয়; বরং লেখায় এমন এক সরল রূপ আছে যা পাঠকের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। পাঠক বইটা পড়ার সময় বাস্তব দুনিয়ার গন্ধ, রং, শব্দ ও অনুভূতিতে ডুবে যেতে পারেন।
অ্যাকারম্যান শুধু অনুভূতি নিয়ে কথা বলেন নাই; তিনি শত শত বৈজ্ঞানিক তথ্য, গবেষণা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উপাখ্যানকে অভিজ্ঞতার সাথে মিশিয়ে একটি সমন্বিত রূপ তৈরি করেছেন। এতে বিজ্ঞান রয়েছে, কিন্তু একই সাথে রয়েছে কবিতার মতো আবেগ ও সৌন্দর্য।
মানবজীবনে সংবেদনশীলতার গুরুত্ব যে কতখানি তা বোঝা যায় এই বই পাঠে। বইটি নিঃসন্দেহে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেবে। আজকের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিগত সমাজে আমাদের অনেক সময় নিজের শরীর ও অনুভূতির প্রতি যত্ন থাকে না। অ্যাকারম্যান আমাদের পুনরায় শেখান অনুভব করতে—দেখতে, শোনাতে, স্পর্শ করতে, গন্ধ নিতে ও স্বাদ নিতে। এটি একটি জীবনচেতনা বা লাইফ-অ্যাফার্মিং বই—একটি আত্ম-অনুসন্ধানের যাত্রা; যেখানে পাঠক তার পরিবেশ ও নিজেকে আরো গভীরভাবে বুঝতে পারে। ইন্দ্রিয়ের জগৎকে বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে।
অ্যাকারম্যানের ‘আ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ দ্য সেন্সেস’ বইটি এক কথায় অনন্য অন্বেষণ; বইটি মানবজীবনের অনুভূতিসম্পন্ন অভিজ্ঞতার গভীরে পাঠককে নিয়ে যায়। এটি শুধুমাত্র ইন্দ্রিয়ের বই নয়; এটি এক অনুভূতি-ভিত্তিক চিন্তার দৃষ্টিকোণ, যা পাঠকের মনকে নতুন দিক দেখায়—কীভাবে সংবেদন দিয়ে আমরা পৃথিবীকে অনুভব করি এবং পৃথিবী আমাদের অনুভবকে কী করে স্পর্শ করে। এটি এমন একটি বই যা জীবনের সৌন্দর্য, অনুভূতি ও বিজ্ঞানকে এক সাথে অনুভব করায়।
কথা আছে ইন্দ্রিয়ের রাজনীতি ও আধুনিকতা নিয়েও। বই জুড়ে ছড়িয়ে আছে কিছু গভীর ভাবনা; প্রযুক্তি কীভাবে আমাদের ইন্দ্রিয়কে ভোঁতা করছে; আধুনিক মানুষ কেন কম অনুভব করে; ইন্দ্রিয় হারানো মানে শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, অস্তিত্বগত ক্ষতি; অ্যাকারম্যান বারবার প্রশ্ন তোলেন: আমরা কি সত্যিই অনুভব করি, না শুধু প্রতিক্রিয়া দেখাই?
‘আ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ দ্য সেন্সেস’ বইটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। বইটি আমাদের শেখায়, মানুষ হওয়া মানে শুধু চিন্তায় এগোনো নয়; বরং অনুভবেও এগোনো। সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে, ইন্দ্রিয় তত অবহেলিত হচ্ছে। অ্যাকারম্যান মনে করেন অনুভব শিখতে পারলে জীবন গভীর হয়। সেই হিসেবে বইটির পাঠ যেন আরো বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠার অনুশীলন।
ডায়ান অ্যাকারম্যান রচিত ‘আ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অফ দ্য সেন্সেস’ বইটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৯০ সালে নিউ ইয়র্কের র্যানডম হাউজ থেকে।
সূত্র : A natural history of the senses by Diane Ackerman
এভাবে ভাবিনি তো আগে! আসলেই— দিনদিন ইদ্রিয় ভোতা হয়ে যাচ্ছে আমাদের। ধার দেওয়ার জন্য সময় বের করা দরকার।