রাজনৈতিক ইসলাম কি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী? এই প্রশ্ন এখনকার বিশ্বে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিষয়টি অনেকের মতো ফরাসি চিন্তক অলিভিয়ে রয়-কেও ভাবিত করে। তিনি এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে আস্ত একটা বই লিখে ফেলেন। সেই বইটির নাম ‘দ্য ফেইলর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম’।
অলিভিয়ে রয় একজন স্বনামধন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক। দ্য ফেইলর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম তার বিখ্যাত বই। অলিভিয়ে তার এই গুরুত্বপূর্ণ বইতে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে উত্থিত ইসলামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর একটি গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী পাঠ আমাদের সামনে হাজির করেছেন। বইটিতে অলিভিয়ে দেখান যে, রাজনৈতিক ইসলাম রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারলেও আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজকে ইসলামী আদর্শে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কিন্তু কেন?
রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান এবং এর প্রত্যাশা ও বাস্তবতা নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে অলিভিয়ে দেখান যে, ১৯৭০–৮০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বে ইসলামপন্থি আন্দোলনগুলো এক নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ইরানের বিপ্লব, আফগান জিহাদ, আলজেরিয়ার ইসলামিস্ট উত্থান—সব মিলিয়ে অনেকের চোখে এটি ছিল ‘ইসলামী পুনর্জাগরণ’। কিন্তু অলিভিয়ে যুক্তি দেন, এই উত্থান মূলত আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরে একটি বিকল্প আদর্শিক ভাষা নির্মাণের চেষ্টা ছিল; তা ঐতিহাসিক খেলাফত বা মধ্যযুগীয় ইসলামী শাসনের সরল পুনরাবৃত্তি নয়।
অলিভিয়ে আরো দেখান, ইসলামপন্থিরা ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ গঠনের কথা বললেও, তাদের রাষ্ট্রচিন্তা আসলে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে ইসলামী রাজনীতির ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
বইটিতে অলিভিয়ে মূল যে যুক্তি তুলে ধরেন তা হলো আদর্শ ও কাঠামোর সংকট। তিনি বলেন, ইসলামিজম একটি শক্তিশালী নৈতিক ভাষ্য তৈরি করতে পেরেছে, কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মডেল হাজির করতে পারেনি। ইসলামিক অর্থনীতি, শরিয়াভিত্তিক শাসন, নৈতিক সমাজ—এসব ধারণা আকর্ষণীয় হলেও প্রশাসনিক বাস্তবতায় সেগুলো অস্পষ্ট ও প্রায়োগিকভাবে দুর্বল।
অলিভিয়ের মতে, ইসলামপন্থি আন্দোলনগুলো প্রায়ই মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত তরুণদের আকৃষ্ট করেছে। তারা জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার পর একটি বিকল্প আদর্শ খুঁজছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এলে ইসলামপন্থিরা একই রাষ্ট্রযন্ত্র, একই আমলাতন্ত্র এবং একই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরেই আটকে যায়। ফলে আদর্শিক পরিবর্তন কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ নিতে পারে না।
অলিভিয়ে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরেন, সেটি হলো নব্য-মৌলবাদ। অলিভিয়ে বলেন, রাজনৈতিক ইসলাম ব্যর্থ হওয়ার পর তা ‘নিও-ফান্ডামেন্টালিজম’-এ রূপ নেয়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে এসে ইসলামপন্থা ব্যক্তিগত নৈতিকতা, সামাজিক আচরণ ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর জোর দেয়।
এই পর্যায়ে ইসলামপন্থা আর বৃহৎ রাজনৈতিক বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে না; বরং সমাজে ইসলামী জীবনধারা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেয়। ফলে আন্দোলনটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতায় পরিণত হয়, যা রাজনৈতিক রূপান্তরের বদলে পরিচয়-রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে।
অলিভিয়ে এই প্রেক্ষিতে ইরান ও আফগানিস্তানের কেস স্টাডি নিয়ে আলোচনা করেন। অলিভিয়ে দেখান যে, ইরানের ইসলামি বিপ্লব রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে সফল হলেও, তা একটি জাতীয়-শিয়া কাঠামোর ভেতর সীমাবদ্ধ থাকে; বিশ্বব্যাপী সুন্নি আন্দোলনের ওপর তার প্রত্যাশিত প্রভাব পড়ে না।
অন্যদিকে আফগান জিহাদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় যে, ইসলামপন্থি শক্তি ঐতিহ্যগত উপজাতীয় সমাজের সঙ্গে আপস করে; একটি আধুনিক ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের বদলে স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। এই উদাহরণগুলো দিয়ে অলিভিয়ে দেখান যে, রাজনৈতিক ইসলাম আদর্শিকভাবে যত উচ্চকণ্ঠ, বাস্তবে ততটাই প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ।
কিন্তু এই ব্যর্থতার কারণ কী?
অলিভিয়ে অবশ্য ‘ব্যর্থতা’ বলতে পুরোপুরি বিলুপ্তিকে বোঝান না। বরং তিনি বোঝাতে চান, ইসলামিজম তার ঘোষিত বিপ্লবী লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ। এটি আধুনিকতার বিকল্প সভ্যতামূলক মডেল গড়তে পারেনি; বরং আধুনিকতার ভেতরেই নিজেকে পুনর্গঠিত করেছে।
এই ব্যর্থতা এক অর্থে ইসলামের নয়, বরং ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্রকল্পের। অলিভিয়ে দেখান, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল কাঠামোর মধ্যে কেবল নৈতিক ভাষ্য দিয়ে টেকসই শাসনব্যবস্থা নির্মাণ করা যায় না।
‘দ্য ফেইলর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম’ মূলত একটি চিন্তাজাগানিয়া বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ, যা আবেগ বা ভয়ের বদলে তথ্য, সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে ইসলামপন্থার উত্থান ও সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করে। অলিভিয়ের বক্তব্য প্ররোচনামূলক হলেও সরলীকৃত নয়। তিনি দেখান যে, রাজনৈতিক ইসলাম আধুনিকতার বিরুদ্ধে নয়; বরং আধুনিকতারই এক রূপান্তরিত সন্তান, যে তার নিজের প্রতিশ্রুত বিপ্লব পূরণে অপারগ হয়েছে।
এই বই তাই কেবল একটি মতাদর্শের সমালোচনা নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্র, ধর্ম ও পরিচয়ের জটিল সম্পর্কের এক গভীর অনুসন্ধান। মুসলিম বিশ্ব ও বৈশ্বিক রাজনীতি বোঝার ক্ষেত্রে বইটি এখনো প্রাসঙ্গিক; কারণ ‘ব্যর্থতা’র ভেতরেই অলিভিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রূপান্তরের ইঙ্গিত খুঁজে পান।
ভূমিকাতে অলিভিয়ে দেখান যে, কেন বিশ শতকের শেষভাগ ‘মুসলিম রাজনৈতিক বিপ্লব’ হিসেবে দেখা হয় কিন্তু বাস্তবে তা সফল হয়নি। ইসলাম অ্যান্ড পলিটিকস : ফ্রম ট্রাডিশন টু রিফর্মিজম অধ্যায়ে দেখান যে, ইসলাম ও রাজনীতি—ঐতিহ্য থেকে আধুনিক রূপান্তরের ধারা: কীভাবে ইসলামী রাজনীতি পুনর্গঠিত হলো এবং কেন আধুনিক রাজনৈতিক কাঠামোতে ব্যর্থ হচ্ছে।
দি কনসেপ্টস অব ইসলামিজম অধ্যায়ে অলিভিয়ে দেখান যে, রাজনীতিকরণের ধারণা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক লক্ষ্য কীভাবে মিশে যায় এবং এর সীমাবদ্ধতাগুলো কোথায়। দি সোশিওলজি অব ইসলামিজম অধ্যায়ে অলিভিয়ে দেখান যে, ইসলামিস্ট আন্দোলনের সামাজিক কাঠামো ও সমর্থক শ্রেণির প্রকৃতিটা কেমন। মধ্যবিত্ত বা নিরাশ যুব সমাজের প্রতিক্রিয়া কি কেবল রাষ্ট্রীয় অপারগতার?
পরের অধ্যায়, দি ইমপাসেস অব ইসলামিস্ট আইডিওলজি অধ্যায়ে অলিভিয়ে দেখান যে, ইসলামী রাজনীতির ব্যর্থ দার্শনিক বা নীতিগত পথের দিকটা। ইসলামিক কাঠামো বিরোধী আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে কীভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। পরবর্তী অধ্যায় মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে আলজেরিয়ার ‘এফআইএস’—এ অলিভিয়ে দেখান যে, রাজনৈতিক ইসলাম কীভাবে ক্লান্ত হয়ে “নিও-ফান্ডামেন্টালিজম” অর্থাৎ ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিধান কেন্দ্রিক হয়ে যায়।
দি ইসলামিস্ট নিউ ইন্টেলেকচুয়ালস অধ্যায়ে অলিভিয়ে নতুন ইসলামী বুদ্ধিজীবীরা কীভাবে ইসলামী রাজনীতিকে বিশুদ্ধ ধর্মীয় ব্যাখ্যার বদলে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছে, এবং কেন তা সীমাবদ্ধ। এর পরের অধ্যায়েই তিনি দেখান যে, কেন ইসলামিস্ট আন্দোলন কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়তে পারেনি; কেনই বা রাষ্ট্রগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রয়ে গেছে।
এর পরেই আলোচনা করেন, ইসলামিক অর্থনীতি প্রয়োগে প্রতিশ্রুত ফল না পাওয়ার বিষয়টি; এখানে তিনি দেখান যে, কেন ইসলামিক অর্থনৈতিক কাঠামো ব্যর্থ বা অপ্রতুল। পরের অধ্যায়ে অলিভিয়ে আফগানিস্তানের উদাহরণ টানেন। তিনি দেখান যে, জিহাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ট্রাডিশনাল সমাজকাঠামোকে বদলের পরিবর্তে প্রাত্যহিক জীবনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান বিপ্লব ও শিয়া মুসলিম রাজনীতির আলোচনা করতে গিয়ে অলিভিয়ে দেখান যে, কেন তারা ধর্মীয় রিভোলিউশন রাজনৈতিক কাঠামোতে সফল হলেও আন্তর্জাতিক বা অঞ্চলীয় প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়।
এ ছাড়া ইরানের পররাষ্ট্র নীতিতে শিয়া প্রভাবের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক ইসলামের আন্তর্জাতিক দিকের ব্যর্থতা নিয়েও কথা বলেন অলিভিয়ে।
অলিভিয়ে জোর দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক ইসলামের ভবিষ্যৎ ‘গ্রে বা ধূসর এলাকা’ হিসেবে দেখা উচিত; কেননা এটি রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজের মিশ্র যোগসূত্রে প্রবাহিত।
অলিভিয়ের এই বইটি একটি সময়োপযোগী, গভীর ও সাহসী বিশ্লেষণ যা রাজনৈতিক ইসলামকে একটি বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করে। কিছু সমালোচক অবশ্য মনে করেন অলিভিয়ে অত্যন্ত ব্যপ্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছেন; বাস্তবে ইসলামিস্ট গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলেও, ঐ সময়ের পরেই বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই বইটি রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে ব্যতিক্রমী, চিন্তাশক্তিশালী এবং সমগ্র দিক দিয়ে একটি মধ্যপন্থি; সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে, যা ছাত্র, গবেষক, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পাঠকের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
দ্য ফেইলর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম বইটিতে দেখানো হয় যে, রাজনৈতিক ইসলামের ব্যর্থতা শুধুমাত্র নেতাদের ব্যর্থতায় নয় বরং আইডিয়োলজি, কাঠামো, রাষ্ট্র এবং সমাজের সম্পর্কের জটিলতার মধ্যেও এর কারণগুলো নিহিত।
‘দ্য ফেইলর অফ পলিটিক্যাল ইসলাম’ বইটি মূলে ফরাসিতে লেখা হয়েছে। প্রথম প্রকাশও হয়েছে ফ্রান্সে। পরে এটি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। ইংরেজিতে অনুবাদ করেন ক্যারল ভোল্ক।