কবিতা কী, প্রশ্নটি আমাকে দীর্ঘকাল ভাবিয়েছে। বলা যায়, কবিতা লেখার প্রস্তুতিপর্বেই প্রশ্নটির একটি মীমাংসা আমি হাজির করতে চেয়েছি। কিন্তু কবিতা এতটাই নির্জন রহস্যে ঘেরা যে, তার স্বরূপ নিরূপণের কোনো গাণিতিক সূত্র আমাদের জানা নেই; আর্দ্র-আলতো স্পর্শের অনুভবে অবচেতনেই তাকে বুঝে নিতে হয়! এজন্যই হয়ত কবিতাকে মননশীল মনের আদিমতম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমার বিশ্বাস, ভাষার আগেই কবিতার জন্ম। ভাষা অর্জনের পূর্বেই মানুষের হৃদয়ে ঈপ্সিত-ভাবের আবেশ হয়ে সে বিরাজমান ছিল, পরবর্তীতে ভাষা লাভের পর তার কাঠামোগত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যদি তাই না হবে, তাহলে কবিতা যুগে যুগে মানুষের ভাষার সীমাকে প্রসারিত করল কীভাবে!
রহস্য, আবিষ্কারের নেশা মানুষকে সাধনার পথে তাড়িত করে। কোনো বস্তুকে ঘিরে রহস্য কেটে গেলে, তার আবেদন ফুরিয়ে যায়! কবিতার রহস্য হয়ে থাকার অসাধারণ ক্ষমতাই মূলত তাকে মানুষের মাঝে প্রজ্বলিত রেখেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জুড়ে। এই রহস্যময় গুপ্ত পরিচয়ই কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি। এজন্য কবিতা কী, প্রশ্নটির উত্তর সুনির্দিষ্টভাবে করা যায় না! এমনও হতে পারে, কবিতার আসলে কোনো একক পরিচয় নেই! কবিতা যেহেতু মানব অস্তিত্বের বিচিত্র উপকরণকে নিজের মধ্যে প্রযত্নে হাজির করে, সেহেতু তার বহিঃপ্রকাশ প্রত্যেকের কাছে নানা রকম হওয়াটাই অনুমেয়। কবিতা একটি বৃহৎ ব্যাপার। এজন্য কবিদের মাঝেই রয়েছে কবিতা নিয়ে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। প্রত্যেক কবি তার নিজের জীবনদর্শন, কাব্যচর্চা ও অভিজ্ঞতার আলোকে কবিতাকে নানাভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কেউ জোর দিয়েছেন অনুভূতির উপর, কেউ সৌন্দর্যের উপর, কারও মানদণ্ড কালোত্তীর্ণতার উপর।
কবিতার ডেফিনেশন খোঁজার এই প্রচেষ্টার মধ্যেই পড়া হলো ইমদাদুল হকের একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘মুনাজাত’। নামেই একটা নরম নিবেদন আছে—কবিতা যেন প্রার্থনার কাছাকাছি বা প্রার্থনা-ই। অতীতের অধিকাংশ কবিতা স্রষ্টার কাছে নিবেদিত আর্জি হিসেবেই তো রচিত হতো! ‘মুনাজাত’ নামটি হয়ত সেই প্রাচীন দস্তুরেরই ইশারা। ‘মুনাজাত’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতাই আমার ভালো লেগেছে, তবে এর মধ্যে চারটি কবিতা বিশেষভাবে আমার নজর কেড়েছে: ‘সকল প্রশংসা তাঁর’, ‘অনিবার্য দস্তুরে’, ‘বিনিময়’ ও ‘তুমি’। কবিতাগুলো পড়ে মনে হলো, ইমদাদুল হকের কাব্যভাষা যেন এক অনন্য স্বরের সন্ধান দিচ্ছে—যেখানে উচ্চকিত প্রতিবাদের পরিবর্তে ধীর, সংযত এবং গভীর এক অন্তর্জাগতিক প্রবাহ আমাদেরকে স্পর্শ করছে। তাঁর কবিতায় আত্ম-অন্বেষণ, জাগতিক নশ্বরতা এবং গভীর আত্মিক সমর্পণ সম্মিলিতভাবে গড়ে তুলেছে এক স্বতন্ত্র কাব্যবীক্ষা, যেখানে নিঃসঙ্গতা আছে, তবে তা মোটেও হতাশার নয়; বরং আত্মিক শক্তি, বিনয় এবং স্রষ্টানির্ভরতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত।
কবিতায় ইমদাদুল হকের শব্দচয়ন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একদিকে লোকজ, মাটির গন্ধমাখা শব্দ যেমন “মনিদুহা, কাচড়া আর চাত্রার বিল”, অন্যদিকে দার্শনিক শব্দবন্ধের মিশ্রণ, যা তাঁর কবিতাকে একইসঙ্গে মাটির কাছাকাছি এনেছে, পাশাপাশি ধ্রুপদী উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। শব্দের পোশাকি অলংকারের চেয়ে অর্থের দিকে তাঁর মনোযোগ অধিক নিবদ্ধ। ফলস্বরূপ, তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে গভীর ও চিন্তাশীল; তবে দুর্বোধ্য নয়। জটিল ভাবনাকেও তিনি সহজ বাক্যে, সংযত অলংকারে প্রকাশ করতে পারদর্শী। ইংরেজ কবি জন কীটস যেমন বলেছেন, ‘কবিতা মুগ্ধ করবে তার সূক্ষ্ম অপরিমেয়তায় (fine excess), একটিমাত্র ঝংকারে নয়। পাঠকের মনে হবে এ যেন তারই সর্বোত্তম চিন্তা, যা ক্রমশ ভেসে উঠছে তার স্মৃতিতে।’

ছবি: প্রচ্ছদ—মুনাজাত
ইমদাদুল হকের কাব্যে মূর্ত ও বিমূর্তের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ দেখা যায়। যেমন, “সকল প্রশংসা তাঁর” কবিতায় শুকিয়ে যাওয়া নদী ও বিলের চিত্রকল্পের মাধ্যমে তিনি মানুষের নিঃসঙ্গতা ও অবলম্বনহীন অসহায় অবস্থাকে মূর্ত করে তুলেছেন―“শুকিয়ে গেছে পৃথিবীর তাবৎ ভরসা ও আশ্রয়ের নদী।” এই দৃশ্য কেবল প্রাকৃতিক অবক্ষয়ের নয়, বরং মানব অস্তিত্বের গভীর শূন্যতার প্রতীক। তবে এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য—তিনি এই শূন্যতাকে হতাশায় পরিণত করছেন না মোটেই; বরং এক বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তর করছেন যেন। “আমাকে এই আমি করে তুলতে কেউ পরিচর্যা করেনি”—এই নিঃসঙ্গ ঘোষণা শেষ পর্যন্ত গিয়ে স্থির হয় স্রষ্টার প্রতি তার সবিনয়পূর্ণ সমর্পণে—“আছেন কেবল আমার মাবুদ।” আধুনিক অস্তিত্ববাদ যেখানে একাকীত্বকে প্রায়ই সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে, সেখানে ইমদাদুল হক একে পরিণত করেছেন বিশ্বাসের দৃঢ়তায়।
“অনিবার্য দস্তুরে” কবিতায় তাঁর দার্শনিক মনন আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমসাময়িকদের থেকে পিছিয়ে পড়ার যে ব্যক্তিগত আর্তি, এটাকে তিনি কোনো অভিযোগে রূপ দেন না; বরং এটাকে সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘কাছে’, ‘কাছাকাছি’, ‘পাশে’, ‘পাশাপাশি’—অনুপ্রাসের ব্যবহার কবিতার শুরুতে এক সুমধুর আবহ তৈরি করলেও দ্রুতই তা ভেঙে যায় দূরত্বের বাস্তবতায়। কিন্তু এই দূরত্ব তাঁর কাছে ব্যর্থতার কোনো চিহ্ন নয়; বরং, তা প্রকৃতিরই অনিবার্য গতির অংশ। ব্যক্তিগত স্থবিরতাকে তিনি প্রকৃতির দস্তুর হিসেবে মেনে নিয়ে স্বীয় আমিত্বকে বিসর্জন দিচ্ছেন। এই নির্লিপ্ততা (detachment) আধুনিক কবিতায় বিরল এবং উচ্চমার্গের দার্শনিক চেতনার পরিচায়ক।
কবিতাগুলোর মধ্যে “বিনিময়” সবচেয়ে বেশি চিত্রকল্পময় এবং দার্শনিক। কবিতার শুরুতেই—“পৌরাণিক ঈশ্বরের মতো ধীরে ধীরে উঠে এসেছ / অথই জলরাশি থেকে অস্তিত্বের নিখুঁত উপমায়”—চরণের মধ্য দিয়ে কবি এক বিশাল মহাজাগতিক ক্যানভাস নির্মাণ করেছেন। “বোতাম খোলা উদোম মাতৃ-বক্ষোরুহ”—এই পঙক্তি তাঁর কাব্যের সবচেয়ে সাহসী ও শক্তিশালী চিত্রকল্পগুলোর একটি। এটি কোনো কামজ ইঙ্গিত নয়; বরং প্রকৃতির অবারিত দাক্ষিণ্য; মাতৃত্বের প্রতীক। “বিনিময়” মূলত জীবনচক্রের এক দার্শনিক ব্যাখ্যা—মানুষ প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করে, আবার মৃত্যুর পর সেই প্রকৃতিতেই ফিরে গিয়ে তাকে উর্বর করে তোলে। এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কবি “নিমকের প্রগাঢ় বন্ধন” বলে চিহ্নিত করেছেন। বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে সত্য উন্মোচন করা গুণী সাহিত্যিকদের প্রধান কৌশল। যেমন চার্লস ডিকেন্সের ‘A Tale of Two Cities’ উপন্যাসে ব্যবহৃত বিখ্যাত অ্যান্টিথিসিস “It was the best of times, it was the worst of times” এর মাধ্যমে যুগের কোলাহল ও তার দ্বৈততা তুলে ধরেছেন, তেমনি ইমদাদুল হকের “অনাদি তবে অনন্তেরই নাম! অস্ত সে তো নতুন উদয়”—এই আপাত-বিরোধী শব্দযুগলেই জীবনের চক্রাকার গতির প্রকৃত রূপ নিহিত।
“তুমি” কবিতায় তাঁর কাব্যদর্শন এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এখানে ‘তুমি’ এক চূড়ান্ত সৌন্দর্যের প্রতীক, যা সব উপমা ও তুলনার ঊর্ধ্বে। তাই কবি ঘোষণা করলেন, “কবিতা তোমার দিলাম আজকে ছুটি”—এ যেন ভাষার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে এক আধ্যাত্মিক সমর্পণ। নজরুলের কবিতা ও গজলে প্রিয়তমা যেমন সকল উপমাকে অতিক্রম করে অনন্য হয়ে ওঠে, তেমনি ‘তুমি’ কবিতার ‘তুমি’ হয়ে ওঠে উপমান-উপমেয় তুলনার ঊর্ধ্বের এক পরম সত্তা। ইমদাদুল হকের কবিতার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘poetic stillness’—এক ধরনের স্থির প্রশান্তি। যেখানে আধুনিক কবিতায় প্রায়ই ক্ষোভ, বিদ্রোহ বা ভাঙনের উচ্চারণ দেখা যায়, সেখানে তাঁর কাব্যে আছে ধীর, গভীর এবং সংযত প্রবাহ। এই দিক থেকে তাঁর কবিতা জীবনানন্দ দাশের বিষণ্ণতার সঙ্গে তুলনীয় হলেও একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—জীবনানন্দের বিষাদ মানুষকে বিপন্ন করে, আর ইমদাদুল হকের বিষাদ মানুষকে স্রষ্টা বা প্রকৃতির নিয়মের দিকে ধাবিত করে এক ধরনের আত্মিক নিরাপত্তা দেয়।
কবির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের মতামত হলো, একজন কবির হৃদয়ে কল্পনা থাকবে এবং কল্পনার ভিতরে থাকবে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা। পাশাপাশি বিগত কবিতার ঐতিহ্য ও আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাকে সাহায্য করবে। ইমদাদুল হকের কাব্যে উল্লেখিত সকল বৈশিষ্ট্যই সক্রিয়ভাবে উপস্থিত। কবিতার তুরাস ও শাব্দিক রুচির সম্যক সমঝদারির ঝলকানি বিদ্যমান তাঁর সকল কবিতায়। সব মিলিয়ে, ইমদাদুল হকের কবিতায় কোনো উচ্চকিত চিৎকার নেই; আছে এক স্থির, গম্ভীর এবং আলোকিত নীরবতার সুর—যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরের ‘তুমি’-কে খুঁজে পেতে সাহায্য করে।