কাকে সবচেয়ে বেশি চেনে মানুষ? বন্ধু, স্বজন, আত্মীয়, সঙ্গী… প্রতিদিন যাদের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা তাদের বাহির হয়তো পরিচিত, কিন্তু প্রত্যেকের দুঃখ, বেদনা, আবেগ? সেইসব কি চেনে মানুষ! অপর বাদ থাকুক, নিজেকেই সে কতটুকু চেনে। প্রতিদিন বেঁচে থাকার তাগিদে যে ছুটে চলা, সদা যে লড়াই, তারপরে নিজেকে একান্ত আপন করে নিয়ে বসবার সুযোগ কোথায় আধুনিক মানুষের। সে জাগে, খায়, কাজ করে, ঘুমায়, জাগে, খায়, কাজ করে, ঘুমায়… একান্ত নিজের করে পাওয়ার যে সকল উপাদান, তা সে নিজের অজান্তেই হারিয়ে ফেলতে বসেছে। তার জীবনের মানে হয়তো হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল ক’তাড়া মুদ্রা। তার প্রেম মানে কিছু ছবি তোলা, দুয়েকটি তীব্র রাত কাটিয়ে ফের আলাদা হয়ে যাওয়া। তার বিনোদন মানে বোবা স্ক্রিনে তাকিয়ে নির্বোধভাবে নেমে যাওয়া নিচের দিকে। কী আছে আরও, আরও চটকদার, চোখে ধাঁধা লাগানো?
জাহিদুর রহিমের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কথারা আমার মন’ চেয়েছে মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, কিন্তু অচেনা এইসব আপন-আঁধারের কোণে কোণে আলো ফেলতে। অবোধ মানুষের সদা ছুটে চলা জীবনের মোড়ে মোড়ে যে লাইটপোস্ট—অজ্ঞানতার কুয়াশায় যেগুলো প্রায়শই নিভে আসা—তার দিকে দৃষ্টি ফেরাতে। ছোটবড় ছাব্বিশটি প্রবন্ধের বিষয়গুলো এক ঝটকায় দেখে এলে এ সম্পর্কে আরেকটু নিশ্চিত হওয়া যায়। শব্দ, পরিচয়, শূন্যতা, দূরত্ব, অভিমান ইত্যাদি বিষয় যেমন ব্যক্তির একান্ত নিজের দিকে নির্দেশ করে, তেমন শিল্প, সাফল্য, প্রেম ইত্যাদি বিষয় দেখিয়ে দেয় তার চেয়ে বড় পরিসরে ব্যক্তির যে বিচরণ—সমাজকে। এছাড়া বিস্তারিত পরিসরে লেখা যুদ্ধ, মুদ্রা, শিল্পকলা ও রাষ্ট্র বিষয়ে লেখাগুলো আমাদের ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের বিরাট পরিসরে মানুষকে দেখতে সহায়তা করে।
মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখবোধ অসীম। তার সদা বাড়তে থাকা উৎকণ্ঠা, চাহিদার জোয়ারে বেড়ে ওঠা অপ্রাপ্তির ক্ষোভ, অপরের দৃশ্যত ভালো থাকা তাকে ঢেকে দেয় এক আত্মপীড়নের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি, বক্ষলগ্না সুন্দরী যেমন তাকে না-পাওয়ার বেদনায় ঢেকে নেয়, তেমনি তার দুঃখবোধ ছেয়ে আসে একান্ত ভেতর থেকে, যে বেদনার রং আলাদা, যার ভাষা ভিন্ন, যার ব্যাকরণ ভিন্ন। খুব রোদ বয়ে যাওয়া সকালবেলায় ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে একান্তে বসে থাকবার শান্তি, গভীর রাতে লেখার খাতা মনোরম একটি কবিতায় খচিত করবার যে সুখ, আর সেটা না পাওয়ার বেদনা কি কম!

ছবি: প্রচ্ছদ— কথারা আমার মন
কিন্তু এই না-পাওয়ার মুক্তি কোথায়? আঠারো নম্বর প্রবন্ধে জাহিদুর রহিম লিখেছেন, ‘শান্তি লুকিয়ে থাকে আত্মায়।’ যদিও মানুষ সদা মুক্তি খোঁজে বাহিরে, কাঞ্চনে ও নারীতে। আপনি একাই বাঁচো—এই হয়ে ওঠে মানুষের নিয়তি। কিন্তু, ‘মানুষের এই নিজেকে নিয়ে বাঁচা, এই আত্মসর্বস্বতা মানুষের ভেতরে লোভ আর ঘৃণার জন্ম দেয়। লোভ মুদ্রার, লোভ মুনাফার, লোভ ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রতি; আর তা থেকেই আসে ব্যক্তিবাদ।’
নিজের মাঝে নিমজ্জিত ব্যক্তি কূপমণ্ডূক, আবদ্ধ। নিজস্ব চাহিদার বেড়াজালে নিজেকে আটকে রাখা মানুষের মুক্তির দরজা কিন্তু মানুষই। অপর মানুষ। নিজের চাওয়াকে পেছনে ফেলে অন্যের প্রেমে নত হয় যে মানুষ, আনত সে-ই এগিয়ে যায় মুক্তির পথে। অন্যকে জানবার যে আগ্রহ তা-ই তাকে জানিয়ে দেয় একান্ত নিজের কথা।
যদিও এই এগিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, তাতে প্রত্যাখ্যানের ভয় থাকে, খারিজ হয়ে যাওয়ার উৎকণ্ঠা থাকে। চাইতে গিয়ে হারিয়ে ফেলবার ভয়ে আধুনিক মানুষ এগোয় না, নিজে সেধে কথা বলতে সংকোচে ভোগে, রিজার্ভড থাকে। সাগরের ওপার হতে আমদানি করা সভ্যতার ছাঁচে ঢালাই হয়ে গিয়ে নিজের চারপাশে তুলে নেয় এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। যার ভেতরটায় সে কখনো পরিবারের মৃদুমন্দ হাওয়া ঢুকতে দেয় না। সঙ্গীর থেকেও সদা আড়াল করে রেখে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখে তার সাধের প্রাইভেসিকে। ‘কিন্তু তোমার বিকাশের স্বার্থেই তোমাকে অরক্ষিত হতে হবে—অগণন হতে হবে—ছিঁড়ে দেখতে হবে সংযোগের পথে আটকানো তোমার খোলস।’ অপরের সঙ্গে যোগাযোগের এই প্রেরণাই মানুষকে সামাজিক করে তোলে, নিজ থেকে বেরিয়ে সকলের হয়ে উঠতে পথ দেখায়।
ব্যক্তিকে বিরাট ক্যানভাসে দেখতে চেয়েছেন জাহিদুর রহিম তিনটি প্রবন্ধে। যার প্রথমটি যুদ্ধ—গত শতকে ঘটে যাওয়া মানবেতিহাসের সবচেয়ে ভয়ানক স্মৃতি যে দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ, তার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখাতে চেয়েছেন, এইসব যুদ্ধ কেবলই কিছু মানুষের নির্বোধ কার্যকলাপ। ‘পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে কোনোটাই আদর্শকেন্দ্রিক যুদ্ধ ছিল না। সবটাই স্বার্থের আর ক্ষমতার যুদ্ধ, এমনকি খুব ফালতু কারণেও অনেক বড় যুদ্ধ হয়, যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।’
অবশ্য বিজয়ীর লেখা ইতিহাসে—সেটা সাধারণত বিজয়ীদের হাতেই লিখিত হয়—যুদ্ধকে খুব মহান কোনো জিনিস হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে, পুরো একটি সৈন্যবাহিনী স্রেফ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে নেপোলিয়ন হয়েছে গ্রেট, একটি সাম্রাজ্যকে নিজেদের মাঝে বণ্টন করে নেওয়া মিত্রবাহিনী হয় গ্রেট, তারাই আবার নুরেমবার্গ ট্রায়াল গঠন করে এমন অপরাধীদের বিচার করে, যে অপরাধে তারাও সমান অপরাধী। এইসব ‘মহান’ মানুষের গল্প পড়ে নতুন নতুন ‘মহান’ জন্ম হয়। ‘কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটাই একটা ইলিউশন, কারণ গ্রেট হয়ে আলেকজান্ডারকে ছোঁয়ার ধান্দায় জুলিয়াস সিজার খেয়াল করে না যে সে ভুলে আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি পুড়িয়ে মানব সভ্যতাকে হাজার বছর পিছিয়ে দিচ্ছে আর নেপোলিয়নও টের পায় না যে তার গ্রেট হওয়ার বাতুলতার চেয়ে তুন্দ্রার শীতে তার সৈন্যদের না খেয়ে মরা অনেক বেশি ঘৃণ্য।’
দ্বিতীয় প্রবন্ধটি হলো রাষ্ট্র বিষয়ক। যেখানে তিনি ঠিক অ্যানার্কিস্ট না হলেও আধুনিক রাষ্ট্র যে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে খর্ব করে একরকম উন্মুক্ত কারাগার তৈরি করছে, তার বিরোধী তিনি। রাষ্ট্র মূলত তৈরি হয়েছিল মানুষকে রক্ষার জন্য, কিংবা মানুষ তার নিরাপত্তা রক্ষায় নিজেরা যে সমস্ত সাধারণ নীতিতে একমত হয়েছিল, সেটাই রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি। স্বার্থের পাহারাদার হিসেবে সৃষ্টি যে প্রতিষ্ঠানের তা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠবে, এবং অধিকারের সীমা বিস্তার করবে সেটা একরকম অনুমিতই। কনফুসিয়াস, সার্ত্রে, কার্ল মার্কসের সাহায্যে তিনি এই মতকেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, ‘রাষ্ট্র হচ্ছে ক্রমে ক্রমে গড়ে ওঠা এমন একটি অস্তিত্ব, যার প্রধান কাজ রাজ্যের মানুষদের বিবেক।