ফি বছর রমজান শেষ হয় আর সোহরাব ভয়ে ভয়ে থাকে, এই বুঝি কোন এক মাদরাসা থেকে ফরমান আসে, আর তাকে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে হয়। দাওরায়ে হাদিস শেষ করেছে সেই কবে, আঠারোতে। এরপর যারা পড়াশোনা শুরু করেছে, তারাও এখন দাওরা শেষ করবে, কিন্তু সোহরাবের বাবার ভাষায় তার কোন গতি হলো না। প্রায়শই কোনো অলস দুপুরে, যখন তার হাতে তেমন কাজ নাই, বসে বসে আফসোস করেন, বড় পুত্রটা একরকম উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। কোন মাদরাসার শিক্ষকতা না করে সামাজিকভাবে অচ্ছ্যুত হয়ে পড়ছে। ওর প্রাক্তন শিক্ষকদের সাথে তার প্রায়ই দেখা হয়, আর তারা জিজ্ঞাসা করেন, সোহরাব কোথায় পড়ায়, কী পড়ায়। কিন্তু রশিদ সাহেবের আর জবাব দেয়ার মুখ থাকে না। কন্যাপক্ষের প্রশ্নের মুখে বলার জন্য হলেও যেন সোহরাব কোন মাদরাসায় শিক্ষকতা শুরু করে, এই হচ্ছে তার দাবি।
এইসব পিয়ার প্রেশারে পড়ে সোহরাবের ত্রিশঙ্কু দশা। মাদরাসার শিক্ষকতা, যাকে আদর করে খেদমত বলা হয়, এ জিনিস তার দুই চোখের বিষ না হলেও, ঠিক পছন্দসই নয়। ছোটবেলা থেকে সোহরাবের চোখে মাদরাসা-শিক্ষক বলতে অনেকটা শ্যাম রাখি না কূল রাখি ধরনের একটা চরিত্র ভেসে ওঠে। অভাবে ক্লিষ্ট, ভোর থেকে রাত এগারটা অবদি অবিরাম পরিশ্রম, হাতে লাঠি এইরকম একটা দৃশ্যে নিজেকে ঠিক মানাতে পারে না সোহরাব। অবশ্যি ঘরভর্তি গোল গোল কৌতূহলী চোখ, উঁচু মসনদ, সামনে ইয়া বড় কিতাব, মাইক, শানশওকতওয়ালা চেহারা, এইসব দেখে আবার মনে চায় হওয়া যেত বড় মাদরাসার হুজুর। কিন্তু দাঁড়ি পাকার আগে ওসবের আশা নেই। এদিকে বাসায় নিত্যদিন নতুন নতুন মেয়ের প্রস্তাব আসছে, আর সোহরাবের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে তাদের উদ্দেশ্যে সিভি পাঠাতে হচ্ছে, যেখানে পেশার জায়গায় একজন আলেমের জন্য বেমানান এক পেশার নাম দেখে তাদের মুখে ভেসে উঠছে কোয়েশ্চেন মার্ক, এই ছেলে আদতে আলেম তো!
সব ভেবে সোহরাব এই দফা সিদ্ধান্ত নিল মাদরাসায় পড়াতেই হবে, সে যে করেই হোক। নাহলে কন্যাপক্ষের সামনে আর ইজ্জত থাকছে না। বলতে দেরি, রশিদ সাহেব পরদিনই এক মাদরাসায় ব্যবস্থা করে ফেললেন। নতুন বছর শুরু হচ্ছে, হয়তো তাদের নতুন শিক্ষক দরকার ছিল, কিংবা ছিল না। কিন্তু তার পুত্র সোহরাবের ঘাড়ে একটা মাদরাসা শিক্ষক ট্যাগের দরকার ছিল খুব।
আলেম পিতার আলেম পুত্র, ইন্টারভিউ হল যৎসামান্য, কেবল বলা হলো আরবিতে একটা দরখাস্ত লিখে দাও। উপস্থিত সেই দরখাস্তই হয়ে গেল যোগ্যতার নির্ণায়ক। ফেরার সময় মুহতামিম ছাহেব আমতা আমতা করে বলে দিলেন, ‘ভাতিজাকে ডেইলি ক্লাস নিতে হইব, নাগা করন যাইত না, আপনি যতই না না করেন, মাস শেষে তো আমারে কিছু না কিছু দিতেই অইব।’ সোহরাব মনে মনে প্রমাদ গুনল, বাড়ি থেকে একশ টাকার গাড়িভাড়া দূরত্বে যে প্রতিষ্ঠান, সেখানে পড়াতে হবে কোনো বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে সোহরাব কল্পনায় দেখতে পেল, সে-ও তার শিক্ষকদের মতো এলাকার ধনবান ব্যবসায়ীদের কাছে হাতে পায়ে ধরছে, ভাই মাদরাসায় ছেলেপেলেদের জন্য কিছু দান করেন, আর সেই বড়লোক প্রতিবেশি বিরক্তি চেপে তার হাতে পাঁচশ টাকার নোট গুজে দিচ্ছেন। একটা প্রবল বিতৃষ্ণা নিয়ে সোহরাব বাবাকে বলল, ‘এ চাকুরি আমি করব না আব্বা!’
এইসব দিনগুলো বড় হতাশার। একটা ছাত্র মাদরাসা থেকে পাশ করে বেরোতে বেরোতে বাইশ থেকে ছাব্বিশ বছর। এরপর আর নতুন করে কোনো কিছু শুরু থেকে শেখার সুযোগ নেই। যাদের পারিবারিক সামর্থ্য আছে, পিতা আল্লামা শাইখুল হাদিস দা.বা., তাদের কথা আলাদা। তারা আজহারে যায়, ফিরে এসে বাবার পরিচিতিতে বড় প্রতিষ্ঠানে পড়ায়, ভালো মসজিদের ইমামতি করে, মাসশেষে একটা স্বাস্থ্যবান এমাউন্ট পকেটে ঢোকে। যাদের গলা ভালো, সাহস আছে, তারা একটা দামি ফোন কিনে ইউটিউব চ্যানেল খোলে। সেখানে সুন্দর করে ওয়াজ ছাড়লে ধীরে ধীরে একসময় দাওয়াত পাওয়া যায়। শীতকালীন ওয়াজের সিজনে একটা বাড়তি উপরি ইনকাম। আর যাদের কোনো গতি নেই, তারা এইরকম প্রান্তিক কোনো প্রতিষ্ঠানে জুটে যায়, ডাল আলুভর্তা খায়, সারাদিন ছাত্র পড়ায়, মাস শেষে দশ হাজার বেতন পকেটে ঢুকলেও অনেক। সোহরাবের মতো যারা দিনদুনিয়ার খবর রাখে, তারা জানে ইউনিভার্সিটিপড়ুয়া একটা ছেলে পার্টটাইম ইন্টার্নশিপ করলেও এর চেয়ে ভালো ইনকাম করে। দেশের আর দশটা সমবয়সি তরুণের কথা ভেবে সোহরাবের মনে জন্ম নেয় প্রবল একটা ঘুষি, কিন্তু ওটা বসিয়ে দেয়ার মতো কাউকে সামনে খুঁজে পাওয়া যায় না।
শৈশব থেকে শুনে এসেছে দ্বীনি ইলম হচ্ছে নিয়ামত। জেনারেল ছাত্ররা পড়াশোনা শেষে বেকার ঘোরে, মাদরাসার ছাত্ররা কিছু না কিছু করে। খতমে বুখারির অনুষ্ঠানে বড় বড় হুজুর এসে শুনিয়ে গেছেন, সাধারণ মানুষ সপ্তাহে একদিন ভালোমন্দ খায়, আর মাদরাসার হুজুররা সপ্তাহে দুই তিন দিন দাওয়াত থাকে, গরু-খাসি খেয়ে ফুরোনো যায় না। এইসব বয়ান শুনেছে আর সোহরাব হেসেছে। দ্বীনি ইলম শিখছি দ্বীন মানার জন্য, কুরআন হাদিস মতো চলার জন্য। লোকে আমায় দাওয়াত খাওয়াবে, এই আশায় তো শিখিনি। যখন ছাত্র ছিল, খুব বড় বড় বয়ান দেয়া যেত, সারাজীবন পড়াশোনা করব, গবেষণা করব, বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক, আলেম হব। বাস্তব জীবনে যখন দুই বছরেও কোনো একটা গতি হলো না, মসজিদ মাদরাসা ছাড়া, তখন গিয়ে সোহরাবের কানে পানি ঢুকল। আরে সে তো কিছুই পারে না!
ছোটবেলা থেকে মাদরাসায় পড়েছে। খুব সুবোধ ধরনের বালক ছিল, দৌড়ে পেস বল করে যে ব্যাটসম্যানকে খাবি খাওয়াবে, অমন জোর তার কোনো কালেই ছিল না। সারাজীবন শহরে মানুষ, ফলে খেতখামার কি জিনিস জানে না। ব্যবসায় করবে বলে শুনেছে অনেকের কাছে, কিন্তু কী তার পদ্ধতি, কোথায় কীভাবে কীসের ব্যবসায় করবে, কোনো হদিসই তার জানা নেই। ছোটবেলা থেকে সে নিজ চেষ্টায় শিখেছে এই এক জিনিস, লেখালেখি। মুজতবা, রবীন্দ্রনাথ, বুলবুল সরওয়ার, হুমায়ূন আহমেদ ভেজে খেয়ে এখন অবসর সময়ে বসে বসে ছোটগল্প লেখে। ও জিনিস ছাপাতে গেলে হাতে পায়ে ধরতে হয়, পয়সা দেবে কে? কেউ একজন বলল ফ্রিল্যান্সিং করা যায়, কিন্তু তার জন্য ইংরিজি জানতে হয়। সোহরাব তো ইয়েস, নো, ভেরিগুড থেকে খুব বেশি কিছু জানে না। কোনো এক সুদূর অতীতে ফেসবুকে কিছু আরববন্ধু জুটিয়েছিল, তাদেরকে আরবিতে মেসেজ দিত, আরবি গান শুনত, ভিনদেশি ভাষা বলতে সম্বল কেবল এই। এই যোগ্যতা দিয়ে কোন কাজ জুটানো মুশকিল।
এলাকায় যে দোকানে ফ্লেক্সিলোড, ফটোকপি করে, সে ছেলে ফাযিলের ছাত্র। হাদিস নিয়ে পড়ছে। মাঝে মধ্যে কাস্টমার না থাকলে ছেলেটা সীগা, তরজমা এইসব জিজ্ঞেস করে। কথায় কথায় শুনল, দুই লাখ টাকা দিয়ে এই দোকানটা করেছে। এখন মাসে তিরিশ চল্লিশ হাজার থাকে। সন্ধ্যায় কিছু খেতে মনে চাইলে একটু এগিয়ে একটা ক্যাফে হয়েছে সেখানে যায় সোহরাব। দুই বন্ধুর দোকান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের স্টুডেন্ট। দিনে ক্লাস করে, সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যবসায় দেখে। চা, কফি, চটপটি, লেমোনেড, ফুচকা এইসব আর কি। এইসব দেখেটেখে সে একদিন সাহস করে রাতে খাবার পর মাওলানা আবদুর রশিদ কাসেমির পাশে বসে মিনমিন করে বলে, ‘আব্বা আমি একটা ব্যবসায় করতে চাই।’
‘ব্যাবসা, কীসের ব্যবসা?’
‘ফটোকপি কম্পিউটারের ব্যবসায়।’
‘তুই হইলি আলেম মানুষ, করবি কম্পিউটারের ব্যবসা, সারাদিন বেটা নাই বেটি নাই আইসা ভিড় কইরা থাকবে। এইসব তোরে মানায়?’
মুখ ভার করে সোহরাব উঠে আসে ওইখান থেকে। এই এক সমস্যা, হইছ হুজুর, মসজিদ মাদরাসার বাইরে এক পা ফেলছ কি ঈমান আমল সব গেল। জেনারেল ছেলেপেলে যা ইচ্ছা করতে পারে, কেউ তাদের জিজ্ঞেস করে না, তুমি যে ফুচকা বানাও, তোমারে মানায়? কিন্তু সোহরাব ছাপমারা মৌলবি, সে মাদরাসায় না পড়ালে জগৎ থেমে যাবে, বঙ্গোপসাগরে চর পড়ে যাবে, সাপের পা গজাবে এবং বিন লাদেন ও জর্জ ডব্লু বুশ এক টেবিলে ডিনার করবে।
এইসব ভাবতে ভাবতে সোহরাব একেকদিন সারারাত জেগে থাকে। সে হতে চায় সাহিত্যিক, হুমায়ূন আহমেদের মতো খ্যাতিবান, কিন্তু তার কলমে অত দক্ষতা নেই। আচ্ছা লেখালেখি চলুক, পাশাপাশি কিছু করি, তেমন কোনো সুযোগ নেই। একটা স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে আছে, হাত খরচটা আসে, ওটা এতটাই রদ্দি, সে নিজেই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। কিন্তু কী করবে? কোথায় আছে এমন সুযোগ, যা তার স্বপ্নের কাছাকাছি নিয়ে যাবে, পর্যাপ্ত পয়সা হবে, আবার অবসরও থাকবে, ইনকাম করতে গিয়ে সম্মান খোয়াতে হবে না, সে জানে না!
যৌবনের শুরুতে ভেবেছিল হবে বিশ্ববিখ্যাত কেউ, বয়স হতে হতে দেখা গেল বিখ্যাত কেউ হওয়া তো দূরে থাকুক, উল্লেখযোগ্য কিছু হতে গেলেও জান কয়লা হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সে যেতে পারে বাঁধাধরা পথে, তৈরি রাস্তায় গিয়ে হয়ে থাকতে পারে খুব সাদামাটা কেউ। অন্য সবাই তাই করে। কিন্তু যার হৃদয়ে আছে সৃষ্টির পিপাসা, সুন্দরের প্রতি প্রেম, নতুনের আশা, সম্মানের পিয়াস, তার ঐ বাঁধাধরা পথে এগুতে গেলে হতাশায় প্রাণ নিভে আসবে। চলে যাবে হয়তো জীবন, কিন্তু সৃষ্টির উচ্ছ্বাসহীন সে জীবন, পরাজিতের চলে যাওয়ার মত।
সোহরাব এখন প্রতিদিন সকাল নয়টায় পড়িমড়ি দৌঁড়ে কুরআন তরজমার ক্লাসে ঢোকে, ঘড়ি নয়টার কাটা পেরিয়েছে আরও মিনিট দশেক আগে। আজকে সে ঘড়ির সঙ্গে দৌড়ে পারেনি, জীবনের মতো ঘড়ির কাটার সঙ্গেও সে তাল মেলাতে পারেনি, হেরে গেছে।
গল্পটা ভালো লেগেছে ।অনেকটা আমার সাথে মিলে।যদিও আমি এখনো দাওরা শেষ করিনি ।