দ্বিখণ্ডিত দ্বিধা

ইসরাত জাহান

গুনে গুনে আটষট্টি দিন, এই দীর্ঘ ও স্যাঁতস্যাতে দিনগুলোর অতলে হারিয়ে গেছে অনেকগুলো সাপ্তাহিক ছুটি, কর্মব্যস্ত নয়তো অলস মুহূর্ত। এরই মাঝে হয়তো নতুন কোনো সম্পর্কের গিঁট বেঁধেছে। নয়তো গাঁথুনি ছিড়েছে মায়াহীন কায়া নির্ভর মেকি ইশকের। মৌসুমি বায়ুর হম্বিতম্বিতে নির্মল আকাশে কোথাও না কোথাও মেঘ জমেছে। মাঝে কয়টা দিন নিরবিচ্ছিন্ন বৃষ্টি ছিল। কোথাও ছিল হালকা মেঘের নানান অবয়বের চিত্রপট। ওরা পৃথিবীর পানে তাকিয়ে ছিল, পাখিদের ডেকেছিল সাঁঝবেলায়। এমনই এক ধূসর ধূলো ওড়া বিষন্ন দুপুরে লতা ওর দ্বিখণ্ডিত ঘরটায় ফেরে।

ফুলঝুরি স্মৃতিগুলোর লতাকে ঘিনঘিনে সময়ের বাঁক নিয়ে ফেলে। যা ভাবলে ওর অস্বস্তি হয়। গায়ে গায়ে সর্পিল হয়ে ঘুরে বেড়ায় যেন। অনেকটা বোঝাপড়া, অনেকটা সাহস নিয়ে ওর এই ফিরে আসা। অতীতের পতঙ্গময় জীবনের স্মৃতিগুলো ঝুলে আছে বাড়ির আনাচকানাচে। অযত্নে ধূলো জমে আছে প্রতিটি রুমে। উঁকি দেওয়ার ছলে বেহায়া মনটা অতীতের  টুকরো টুকরো নিস্প্রভ স্মৃতিগুলোর ভাঁজ খোলে। ঝাড়পোছের ইচ্ছে-পারদটা ক্রমশ উর্ধ্বমুখী হলেও শরীরকে মনে হয় পাতাহীন বির্বণ গাছ। পায়ে-পায়ে হেঁটে এসে কাব্যের বিছানায় নিজেকে আছড়ে ফেলে। এই বিছানাটা কিছুটা গোছানো। হয়তো সেদিন ঘর থেকে বের হবার আগে গুছিয়ে ছিল। লতা চার দেয়ালের মাঝে প্রলেপ পড়া ধূলোর উৎস খুঁজে পায় না। ঘোলা হয়ে আসা চশমাটা বেডসাইড টেবিলের উপরে রেখে একটু কাত হয় শোয় লতা। কাত হবার ফুরসুতে চোখ চলে যায় ঘড়ির দিকে, মনে মনে ভেবেছিল অনেকটাক্ষণ। বাস্তবতায় মাত্র পনেরো মিনিট পার হয়েছে। দুধ সাদা সিলিংয়ে প্রচন্ড গতিতে ঘোরা ফ্যানটাকে ক্রুদ্ধ  মনে হয়। বাতাসটাও ক্লিশে, অনেকটা গা-ছাড়া ভাব। আবারও সেই ঘুনঘুনে অস্বস্তিটা গায়ে গায়ে ঘুরে বেড়ায়। আগে এমনটা ছিল না। আয়েশি এসি ছাড়া কত রাত এই বাতাসেই ঘুমিয়েছে লতা। মনে হতো ঝিরঝিরে এক মিষ্টি ছোঁয়ায় শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। আজ কেন এমন! সব তো আগের মতোই আছে। ঘরের দেয়াল, চাদর, পর্দা, এমনকি ময়লা ফেলার ঝুড়িটাও। শুধু মনের ভাঁজে ঘুনঘুনে দ্বিধাটা তেড়েফুঁড়ে বের হতে চায়। হাজারও ভাবনায় অস্থির লতা নিজের সাথে নিজে কথা বলে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বে সাথে।

‘এই যা, বিদ্যুৎটাও চলে গেলো।’ কিছুটা কাতর-স্বরে বলে লতা। 

এই বাসার আইপিএস নষ্ট অনেক দিন। শূন্য ঘরে অপ্রয়োজনীয় ছিল। তাই ঠিক করা হয়নি। ফ্যানের  ঘূর্ণি ধীরে ধীরে কমে আসে, শান্ত ফ্যানটা যেন লতাকে জিজ্ঞেস করে—

‘কোথায় ছিলে এতটা দিন?’

লতা নির্বিকার তাকিয়ে থাকে।

জুলাই মাসের নির্মেদ রোদ। দূরের এক নক্ষত্রের তেজে অতিষ্ঠ চারপাশটার দম নেওয়া প্রাণগুলো। ঝলসানো রোদের সাথে আগুনের হলকা। সেই কমলা রংয়ের তেজী কড়কড়ে রোদ্দুরের হলকায় অতিষ্ঠ এই শহরে জীবনের তাগিদে বেঁচে থাকা মানুষগুলোর শীতলতা খুঁজে বেড়ায়।

লতা অনেকটা সময় উষ্ণতার দাপট সহ্য করে বিছানায় এলিয়ে থাকে। ঘামে প্যাঁচপ্যাঁচে হয়ে থাকা গলাটা আঁচল দিয়ে মোছে।

‘না, আর শুয়ে থাকা যায় না।’

চোখেমুখে বিরক্তির রেশ নিয়ে অভ্যাসবশত উঠে বসে। দুই পা বাড়িয়ে বারান্দার থাইটা খোলার চেষ্টা করে। পরিচ্ছন্নতার অভাবে থাইয়ের দরজাটা জড় হয়ে আছে। অনেকক্ষণ ত্রুটিহীন চেষ্টার পরে দরজাটা অনেকটা ‘খুল যা ছিমছিম’ এর মতো খুলে যায়।

অমনি,

শুকনো একটা গন্ধ এসে লতাকে আচ্ছন্ন করে। ডান পা-টা বাড়িয়ে আবারও পিছিয়ে আসে, কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। পুরোনো কিছু কথা স্মরণে আসে। যদিও আসার আগে পণ করে এসেছিল, ‘পুরোনো কাসুন্দি আর নতুন করে ঘাটবে না’ কিন্তু পারে না। মনটা বড্ড হ্যাংলা। কুড়মুড়িয়ে আগের প্যানপ্যানা মায়াগুলো বুকের ঠিক মাঝখানে শক্ত কিছুর অস্তিত্বকে জানান দেয়। বুকে চাপ বাড়ে, ফিরে আসে। কিছুক্ষণ বসে। তারপরে আবারও বেহায়া মনের পীড়াপীড়িতে উঠে দাঁড়ায়।

কিছুটা সর্তকতার জন্য একটু আড়চোখে ওদিকটায় তাকায়। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়র কল্যাণে অনুভব করে ওদিকটায় আজ কেউ ওর অপেক্ষায় বসে নেই। ভেতরে ভেতরে এক স্বস্তির সুখ ওকে আচ্ছন্ন করে। নিজের সেই জেদ ও প্রতিজ্ঞার প্রতিটি বাক্য স্মরণে আসে। 

‘আর কখনো ওই মুখটা স্মরণে আনব না।’ ভেতরে ভেতরে মরমে মরে।

আড়চোখে দেখে, ওপাশের  কালো গ্রীলের কারুকাজে বেশ অযত্নের ধূলোর প্রলেপ পড়ে আছে, এইদিকেও কম নয়। লতা ধূলো পড়া গ্রীলে হাত রাখে। একটা সময় এটা ছিল ওর একান্ত আপন আলয়। পড়ন্ত দুপুরের অলস মুহূর্তের সঙ্গী স্বজনদের দেখা পায় নেতিয়ে আসা সূর্যের আলোয়। রেখে যাওয়া সবকিছু আগের মতোই পড়ে আছে এখানে ওখানে। ওপাশের বারান্দার দুই কর্নারে পড়ে আছে বির্বণ, সঙীন, মরা বাগানবিলাসের দুটো গাছ। সবুজ গাছ দুটোতে আগে হলুদ ও বেগুনী ফুলের গুচ্ছ হেলে থাকত। আজও একটি শুকনো ডালে দুটো ফুল গ্রীল ভেদ করে আকাশের পানে  তাকিয়ে আছে। যেন প্রাথর্না করছে এক ঘটি জলের। লতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ওপাশের গাছ  দুটোর দিকে। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় পেটমোটা টব দুটোকে। লতার মলিন মুখটা দেখে ওরা হয়তো বলে, আমরা ভালো নেই।  বির্বণ বাগানবিলাস গাছ দুটো লতাকে অসহায় করে তোলে। ভেতরে ভেতরে তাড়পায় লতা।

‘মায়াকান্না দেখাতে আসছে, আসার আগে  মানিপ্ল্যানের ঝাড়টার সাথে বাগানবিলাসের পেটমোটা টব দুটো নিয়ে এলে কী এমন ক্ষতি হতো।’ নিজের ব্যাকুল মনটাকে বকে লতা। মনে মনে ফরহাদকে গালাগাল করে।

তৃষ্ণার্ত গাছদুটো লতাকে অস্থির করে তোলে। তাইতো, সময়জ্ঞান ভুলে অস্থির ছেলেকে ফোন করার জন্য উদগ্রীব হয়। ফোনটা হাতে নিয়ে বোঝে সময়টা অসময়।  ছেলে এখন গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। মায়ের এই ভ্যানভ্যানে মায়াকান্নায় বিরক্ত হবে। তাছাড়া এই নিয়ে কথা বলার তো কিছু নেই। লতা নিজের ইচ্ছেতেই সবকিছু ছেড়ে এসেছিল। ও প্রান্তের মানুষটি কখনো বলেনি ছেড়ে যাও। আর বলবে কেন! ফরহাদ তো চাইত, লতা তার জীবনে পুতুলের মতো থাকুক। পুতুলকে যেভাবে খুশি সেভাবে রাখা যায়। যখন খুশি কোলে নেওয়া যায়, যখন খুশি ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া যায়। পুতুলের কী, ও তো জড় পদার্থ। প্রতিবাদবিহীন থাকতে থাকতে একটা সময় লতাও নিজেকে জড় বস্তু মনে করত। আপাত দৃষ্টিতে বাহিরের মানুষ মনে করত ওরা সুখী।

তাই আর যখন সবাই শুনল, যৌথ সাতাশটি বসন্ত দিনগুলো এখন শুধুই ওদের জন্য তখন অনেকে আফসোস করল। আর সম্পর্কটি জরাগ্রস্ত হবার জন্য সবাই নিষ্ঠুর ও দাপুটে ফরহাদকে দায়ী করল। সবাই জানে লতা অনেক শান্ত ও লক্ষ্ণী নারী। আসলেই তাই ছিল। নিজেকে স্বামীর মনের মতো উপযুক্ত করতে করতে লতা ভুলেই গিয়েছিল, ওর যে ঝাল ঝাল শুটকি পছন্দ না। গলা খিচুড়ি পছন্দ না। এখনও কড়া রোদে গাছের ছায়ায় বসে পা দুলিয়ে আকাশ দেখা পছন্দ করে, গরুর ঝোলে পরোটা সাথে আঙুল ভিজেয়ে সেই আঙুল চেটেপুটে খেতে ইচ্ছে করে। এমন আর অনেক উলটাপালটা ইচ্ছে লতাকে ছাড়তে হয়েছিল ফরহাদের মতো করে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য।

আর ফরহাদ!

হয়তো ভালোবাসত, কোনো এককালে লতা। যাই করত তা-ই নিয়ে গর্বিত হতো। তারপরে লতা গর্বিত হয়, এখনো। ফরহাদকে  সকলেই চেনে সফল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে। আরো আছে, পরোপকারী, নিরহংকারী মানুষ। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে অনেককিছু বদলছে, মানুষ তো বদলায়, মানুষের সেই ক্ষমতা আছে। মানুষ জানে কীভাবে বদলাতে হয়। তাইতো ফরহাদ ধীরে ধীরে প্রেমিক থেকে  স্বামী হয়ে যায়, স্বামী থেকে প্রভু হয়ে ওঠে। আর লতা দিনে দিনে কাচবন্দী পুতুল হয়ে যায়। যেনতেন পুতুল না। বারবি ডল। এই  বারবি ডল হতেও কত যে কসরত করতে হয়েছিল লতাকে। ফরহাদের ভারিক্কি শরীর পছন্দ ছিল না।  ব্যায়াম, ইয়োগা, মন ভরে খেতে বসলেই কানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটি কথা বাজত,

‘কী! চালের দাম কমে গেলো নাকি? বেশি খাচ্ছো।’

এই কথাগুলো আবার ফরহাদ কখনো নিভৃত বলত না, ভরা মজলিসে হাসতে হাসতে বলত, অন্যরাও ঠাট্টা ছলে হাসতে হাসতে লতাকে জিজ্ঞেস করত। লতা মুচকি হেসে গা ঝেড়ে অন্য আয়োজনে মন দিত। ‘অপদস্ত’ শব্দটির সাথে পরিচয় ছিল না হয়তো লতার। আর থাকলেই বা কি! লতা তো এই জীবন,  এই বিয়ে নিজের ইচ্ছতেই বেছে নিয়েছিল।

মায়ের সাথে কত রাগ, কান্না, ঝগড়া, সবশেষে মা-মেয়ের অভিমান। সবকিছু মিটে যায়। লতার বিয়ের পরে অনেকটা দিন মায়ের সাথে অভিমান করে বাবার বাড়ি যায়নি। অবশ্য সেকারণে মামারা মনে মনে অনেকটা খুশি হয়েছিল, বোনের তুলে দেওয়া একটি পাথর অন্তত গা ঝেড়ে পড়ে গেছে। বাহিরে অবশ্য বেশ কপট রাগ দেখেয়েছিল তারা সেইসময়। মামীদের ঠোঁটের কোনে তাচ্ছিল্যের হাসি। যা আজও চোখের জলে টলমল হয়ে ভাসে। লজ্জায় কারো দিকে তাকাতে পারত না। চারপাশের মানুষের নানা আপত্তি পায়ে ঠেলে বিয়ে করেছিল ওরা, অল্প দিনের জানাশোনায়। সেই জানাশোনার শুরুটা শুরু হয় এক পৌষের সুরমা সন্ধ্যায়, সাবরীনার বন্ধুর বাসায় ঘরোয়া গানের আসরে। লতা গিয়েছিল ওর প্রিয় বন্ধু সাবরীনার সাথে।

 ‘এই যা, ইশ!’

সাবরীনার কথা মনে পড়তেই আচমকা জিহ্বা কাটে লতা। আসার আগে সাবরীনাকে বলা উচিত ছিল।

ঘরের নিরব আয়নাটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে এলোমেলো চুলগুলো কানের পিছনে গুঁজে নিজেকে দেখে।  সারা ঘরময় এক পা দুই পা হেঁটে হেঁটে নিজের ভুলোমনের গল্প আসবাবপত্রগুলোকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। 

লতা ওর এই বাড়ির মায়া কাটাতে পারে না, এত ঝড়, আপস এন্ড ডাউন। তারপরও আজ এখানেই ফিরে আসে। সবাই বলেছিল, ফরহাদ যখন ওখানে আছে, তুমি অন্য কোথাও থাকো। ছিল এতটা দিন। আর পারল না। সেজন্য লতাকে অনেক গালমন্দ করবে।

সাবরীনা লতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সেই কলেজে ভর্তির প্রথম দিন থেকে। আজ সাবরীনার লতাকে নিয়ে ঘুরতে যাবার কথা, কিন্তু মনভোলা লতা বন্ধুর বাড়ি না গিয়ে এখানে এসে বসে আছে। ঘুরতে যাবার  উপলক্ষ্যটা অবশ্য বিশেষ ছিল, সাবরীনা নতুন গাড়ি কিনেছে, ড্রাইভিংটাও রপ্ত করেছে। আজ আবার  সাবরীনার ছুটির দিন, তাই তো গতসপ্তাহে বলে রেখেছিল, দুই বন্ধু দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে, আর এদিকে লতা সব ভুলে অযথাই এই ঘরটায় ফিরে এসেছে। না এলে কী এমন হতো, ঘরটা তো অনেকদিন একাই আছে, আর এই ঘরটা তো আর সেই আগের ঘর নেই,  যেখানে কাব্য চিৎকার করে বলত, মামনি আমার নাশতা কই, ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে আজও…

লতা চারপাশের দেয়ালে ঝুলে থাকা মুখগুলো দেখে, ওরা কী সুন্দর তাকিয়ে আছে, লতার কানে কানে এসে বলে, মেয়ে তোমার জীবনটাই ভুল। ভুল করে গেলে সারাজীবন, এখন মধ্য চল্লিশে এসে জীবনের সবথেকে বড় ভুলটা করলে, এখন মাসুল গুনে যাও বাকিটা জীবন। লতার মনে হয় ওর গলার চারপাশে একটা সুতার মতো চিকন কিছু প্রচন্ড আক্রশে গলাটাকে বেঁধে ফেলেছে, এফোঁড়ওফোঁড় করে  ছিঁড়ে ফেলছে দুই প্রান্ত। শ্বাসরুদ্ধ হয় লতার। এমনই হতো, যখন ফরহাদ ওর গলাটা ডেবে দিত নেশার ঘোরে। পুরোনো সেই মুহূর্তগুলো ফ্রেমবন্দী হয়ে আছে লতার মননে। তাই প্রচন্ড কান্নায় মুখাবয়বের মানচিত্র খানিকটা পালটে যায়।

বনশ্রীর এই বাড়িটায় ফেরার আগে সাবরীনাকে ফোন করা উচিত ছিল, এখন হয়তো অনেক কথা শোনাবে সাবরীনা। অবশ্য ওর এই বন্ধুর সেই অধিকার আছে। কেননা অসহায় সেই মুহূর্তে একমাত্র সাবরীনাই পাশে ছিল। আশ্রয়, অর্থ, পরামর্শক হয়ে। সেইরাতে যদি সাবরীনা শক্ত ঢাল হয়ে না দাঁড়াত পাশে, ওর নামের মতোই নড়বড়ে লতা কোথায় ভেসে যেত। নিজের আত্মসন্মান বিসর্জন দিয়ে আবার ফিরতে হত ফরহাদের কাছে।  

ফরহাদের কাছে আবার ফিরে এলে কী হতো? লতা নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করে।

প্রথমেই মনে হয়, ওর বাগানবিলাস গাছ দুটো সজীব থাকত। বির্বণ বাগানবিলাস গাছ দুটো ওকে অসহায় করে দিচ্ছে একটু একটু করে। এই ঘরের ধূলো পড়া ফার্নিচারগুলো চকচকে গাল নিয়ে হাসত। ওদের  বত্রিশ স্কয়ার ফিটের বিশাল বড় ফ্ল্যাটটাকে সৌন্দর্য ও কাঠামো হারাতে হত না। ওদের ডিভোর্সের পরে এই ঘরটার মাঝে একটা দেয়াল ওঠে যায়।  একমাত্র সন্তানের জন্য কেনা সম্পত্তি ওরা দুজনে স্বার্থের জন্য ভাগবাটোয়ারা করে। দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায় এই ফ্ল্যাটটা।

ওর সাতাশ বছরের সঙ্গী। সে কেমন আছে? রোজ কি ঠিক মতো ঔষধ খায়? চশমাটা কে পরিস্কার করে এখন? লতার মনের মধ্যে অনেক জিজ্ঞাসা এসে ওকে অস্থির  করে তোলে। উতলা লতা সবকিছু ভুলে, ফেলে আসা দরজায় আবারও কড়া নাড়ে। ওর মন বলে ফরহাদ খুব অসুস্থ, পাশের ঘরে হয়তো মরার মতো পড়ে আছে। আজকাল নিঃসঙ্গ মানুষগুলো একলা ঘরে মরে পড়ে থাকে। পত্রিকায় পড়েছে দুইদিন আগে। মনের ভেতরে নানান শংকা ঘুরপাক খায়। আজ হঠাৎ ফরহাদের জন্য এত মায়া কোথা থেকে এলো। লতা বুঝতে পারে না। 

টিকটিক করে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায়। দুপুর নেতিয়ে বিকেল ছুঁয়ে সন্ধ্যা হয়। লতা দ্বিখণ্ডিত দরজায় অপেক্ষা করে, রেখে যাওয়া বির্বণ বাগানবিলাস দুটোর  জন্য। 

 

১২. ০৭. ২০২৬ 

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments