​গালিবের সঙ্গে এক বিকেল

লেখক : সৈয়দ মুহাম্মদ আশরাফ

মাসুম বিন শাহাদাত

সৈয়দ মোহাম্মদ আশরাফ সমকালীন উর্দু সাহিত্যের এক কিংবদন্তি। ১৯৫৭ সালে উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক মারহেরা শরিফে তার জন্ম। সুফি ঐতিহ্য ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তার চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। তাই প্রথাগত কাঠামো ভেঙে তিনি নির্মাণ করেন নতুন এক কাঠামো। তার লেখায় রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার অসামান্য। পশুপাখির আচরণের মাধ্যমে তিনি মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও ক্ষমতার লড়াই ফুটিয়ে তোলেন। ​‘ডার সে বিছুড়ে’ এবং ‘বাদে সবা কা ইন্তেজার’ তার বড় অর্জন। দ্বিতীয় গ্রন্থটির জন্য তিনি ‘সাহিত্য একাডেমি’ পুরস্কার লাভ করেন। তবে তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয় তার কালজয়ী উপন্যাস ‘নম্বরদার কা নীলা’ (ঠাকুরের নীলগাই)। বর্তমানে তার সাহিত্যকর্ম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সমাজ ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা তাকে সমকালীনদের মধ্যে বিশিষ্ট করে রেখেছে।


​সৈয়দ মকবুল আলম জুড়িগাড়ির বলদগুলো খোলবার ব্যবস্থা করলেন আর গাড়োয়ানকে একটি রৌপ্যমুদ্রা দিয়ে বললেন, ‘এটি তোমার দুপুরের খাবার, বলদের খোরাক ও গুড়ের খরচা।’

পেঁপের চাটনির বয়াম ও চৌসা আমের ঝাঁপি চাকর নিজের মাথায় তুলে নিল। চাঁদনী চকের পাশের সেই ভেজা জমি থেকে বল্লিমারান, তারপর গলি কাসিম জান পর্যন্ত পথ কোন দিকে আর দূরত্ব কতটুকু—মারহেরা থেকে রওনা হওয়ার সময় চৌধুরী আব্দুল গফুর এটি এতবার বুঝিয়েছেন, একেবারে মুখস্থ হয়ে গেছে।

বৃদ্ধ চাকর ভেতরে খবর দিলে, সঙ্গে সঙ্গেই ডাক পড়ল। দালানের মতো লম্বা আয়তকার কামরার পালঙ্কে শুয়ে থাকা লোকটি ওঠার চেষ্টা করলেন, সফলও হলেন। সে সময় তাঁর মাথায় টুপি ছিল না, কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য তখনও বিলীন হয়নি।

‘আদাব, তসলিমাত!’ সৈয়দ মকবুল আলম কিছুটা ঝুঁকে উচ্চৈঃস্বরে বললেন; যেন তার সন্দেহ, বার্ধক্যের কারণে গালিবের শ্রবণশক্তি হয়তো দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু তিনি অবাক হলেন, তার উচ্চৈঃস্বরের কারণে মুখের অভিব্যক্তিতে তিনি সামান্য বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

সৈয়দ মকবুল আলম কিছুটা লজ্জিত বোধ করলেন। তবে সেই জড়তা দ্রুতই কেটে গেল, যখন গালিব তার দুই হাত নিজের লম্বা আঙুল বিশিষ্ট হাতে আঁকড়ে ধরে নিজের কপালে ছোঁয়ালেন।

‘সাহেবজাদা মিঞা, মুর্শিদের খবর বলো।’

‘আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছেন। তবে বিদায় নেওয়ার সময় বলেছেন, ‘তোমার চাচাকে গিয়ে বোলো, তিনি তো সবসময় আগামীর ওয়াদা দিয়ে ভুলিয়ে রাখেন, আর আমরাও মুখ বুঝে মেনে নিই, মারহেরার আম আর কুল খেতে আমাদের কাছে তো কোনোদিন এলেন না!’

​‘বসো তো, বাবা!’ গালিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর সংক্ষিপ্ত নীরবতার পর বললেন, সেসব বিস্তারিত পরে হবে। এবার বলো, দুপুরের খাবার কতক্ষণ পর খাবে?’

​‘চাচাজান, ঘর থেকে শুকনো খাবার বেঁধে বেরিয়েছি। শেষবার যখন খেয়েছি, তখন আধখানা পথ দুর্গের ছায়ায় চলে এসেছে। আল্লাহর কসম! একদম খিদে নেই।

​চাকর যখন আমের ঝাঁপি আর পেঁপের চাটনির বয়াম এনে রাখল, সৈয়দ মকবুল আলম দেখলেন, পালঙ্কের ছায়ায় ডান পাশে একটি চৌকি রাখা এবং তার সাথে লাগোয়া পিকদানও। তিনি এটাও খেয়াল করলেন, বালিশের পাশে দিস্তা কাগজ ও কলম-দোয়াত রাখা। একটি কাগজের কিছু অংশে কিছু লেখাও ছিল। লেখাটি ছিল একটানা, তাই হয়তো কবিতা নয়, কাউকে চিঠি লিখতে শুরু করেছিলেন।

​সামনে ছোট একটি কাঠের সিন্দুকও, যাতে তামা বা পিতলের তালা দেওয়া। সৈয়দ মকবুল আলম মনে মনে হাসলেন। এই সিন্দুকে কী থাকতে পারে, তা তিনি চৌধুরী আব্দুল গফুরের কাছ থেকে আগেই শুনেছেন।

​‘চৌধুরী আব্দুল গফুর চিঠি মারফতে জানিয়েছিলেন তুমি আসছো, কিন্তু তোমার আসার তারিখ ছিল আগামীকাল। আজ তোমার আগমনের আশা করিনি, বাবা!’

​‘চাচাজান, প্রথমে ইচ্ছে ছিল কোল-এ থেমে এক আত্মীয়র সঙ্গে দেখা করব, তারপর বজনে বন্ধুর বাড়িতে এক রাত কাটাব। কিন্তু আপনার সান্নিধ্যের এমন তীব্র বাসনা ছিল, দুটো পরিকল্পনাই ফেরা পর্যন্ত মুলতবি করলাম এবং কোথাও না থেমে সোজা দিল্লি চলে এলাম। ঘুমটাও জুড়ি গাড়ির দুলুনিতেই সেরে নিয়েছি।

‘আমাদের দেখে হয়তো তোমার সব ভ্রম ভেঙে গেছে। খুবই হতাশ হয়েছো, তাই না? ​গালিব হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলেন।

​‘আস্তাগফিরুল্লাহ! চাচাজান, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন নিজ বংশের কোনো মুরুব্বিকে দেখছি।’ এ বলে সৈয়দ মকবুল আলম তাঁর হাঁটু ছুঁয়ে সালাম করলেন।

​‘গোনাহগার করো না, সৈয়দজাদা!’

‘​শ্রদ্ধেয় আব্বাজান আপনার খেদমতে এই নগণ্য উপহারগুলো পাঠিয়েছেন। আমাদের বাগানের চৌসা আম, যা দুদিন পর পেকে খাওয়ার উপযোগী হবে। আর আছে পেঁপের চাটনি, যা আমাদের জনপদের অতিপ্রাচীন এক সওগাত। যে ব্যক্তি এটি তৈরি করেন, তিনি চৌধুরী আব্দুল গফুর সরওয়ার মারহেরাভি সাহেবের প্রতিবেশী। বছরের বারো মাসই তিনি এই চাটনি তৈরি করেন।

​‘আল্লাহ! মুর্শিদের পাঠানো আম দেখে মনটা বাগবাগ হয়ে গেল। আর মারহেরার পেঁপের চাটনির সুখ্যাতি তো আগেই শুনেছি। আজ রাতেই এই বয়াম খোলা হবে। তবে ওষুধের মতো অল্প করে খাব, যাতে পির ও মুর্শিদের এই উপহার দীর্ঘকাল পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকে।’

​সৈয়দ মকবুল আলম মুচকি হেসে মৃদুস্বরে বললেন, ‘আমের সাথে ‘বাগবাগ’ শব্দের ব্যবহার আর চাটনির বয়ামের প্রসঙ্গে ‘ওষুধ’ শব্দের প্রয়োগ, সুবহানাল্লাহ! ফিরে গিয়ে যখন এ দুটো বাক্য কাউকে শোনাব, তখন তারা অবশ্যই বিশ্বাস করবে, আমি হযরত আসাদুল্লাহ খাঁ গালিবের চরণের কাছে বসে এসেছি।’

​গালিবের চেহারায় কিছুটা রক্তিম আভা ফুটে উঠল। তিনি মৃদু হাসিমাখা স্নেহভরা দৃষ্টিতে এই তরুণ মুসাফিরের দিকে তাকালেন, যিনি মারহেরার প্রখ্যাত সুফি জাইদি সাদাত বংশের প্রদীপ, হযরত সাহেব আলমের সাহেবজাদা, যাকে তিনি চিঠিপত্রে ‘পির ও মুর্শিদ’ বলে সম্বোধন করতেন। গালিব এটাও জানতেন, সৈয়দ মকবুল আলমের কাব্য ও সাহিত্যের প্রতি খুব অনুরাগ। সে নিজেও কবিতা লেখে।

​সৈয়দ মকবুল আলম এবার চারপাশ খুঁটিয়ে দেখলেন। খিলানগুলোতে পর্দা ঝুলছিল, তাই দালানের ভেতরে থাকা বস্তু বা ব্যক্তিদের ভালোভাবে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, কেউ ভেতরে ঢোকার সময় পর্দা একটু সরে যাবে, আর আলো আসবে। মকবুল আলম গালিবের অবয়ব আর কাগজের লেখাটি তখনি দেখে নিয়েছিলোন, যখন চাকর আমের ঝাঁপি নিয়ে ভেতরে ঢুকেছিল। আর গালিবও মকবুল আলমের শারীরিক গড়নটি দেখে নিয়েছিলেন, যখন তার চাকর পাত্রে করে ফালসার শরবত আর মচমচে নিমকপাড়া নিয়ে ভেতরে আসছিল। 

​সৈয়দ মকবুল আলমের মাথাটি বড়, মুখায়ব দীর্ঘাকার, উজ্জ্বল চোখ ও প্রশস্ত ললাট। ঠোঁট দুটি পাতলা আর গোলাপি; ছোট কালো দাড়ি আর ঘন গোঁফ। শরীর ছিপছিপে, কিন্তু বুক চওড়া। গায়ের উপরিভাগে কিছুটা মোটা মসলিনের আংরাখা, যার ধরন দিল্লির পোশাক থেকে ভিন্ন। আংরাখার নিচে বুকের কাছে আকাশী রঙের পাতলা কুর্তা, যা ছিল আবহাওয়ার সাথে বেশ মানানসই। 

সৈয়দ মকবুল আলম গালিবের পালঙ্কের পাশেই একটি পরিপাটি মোড়ায় বসে ছিলেন, তাই গালিব দেখতে পাননি, তার পাজামাটি সাদা না ডোরাকাটা। তাছাড়া গালিব খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মকবুল আলমের অবয়ব পর্যবেক্ষণ করতেও চাচ্ছিলেন না; কেবল একঝলক দেখে নেন। গালিব যখন তাকে সম্বোধন করতেন, তখন মকবুল আলমের চোখের দিকে তাকাতেন; আর মকবুল আলম যখন গালিবের কথার উত্তর দিতেন, তখন গালিব তার ঠোঁটের দিকে চোখ স্থির করে রাখতেন। কথোপকথনের সময় বক্তার চোখ ও ঠোঁট দেখার এই কৌশল গালিব নিজেই নিজেকে শিখিয়েছেন।

​‘সাহেবজাদা, একটা কথা বলো তো, হযরত সাহেব আলমের নুরানি চেহারা আর তোমার চেহারার মধ্যে কি মিল নেই? আমি চৌধুরী আব্দুল গফুরকে বারবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পির ও মুর্শিদের দৈহিক গড়ন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম।’

​সৈয়দ মকবুল আলম মৃদু হেসে বললেন, ‘আত্মীয়স্বজন অনেকেই বলেন, আমি তাঁর অবয়বই পেয়েছি। তবে তিনি উচ্চতায় আমার চেয়েও দীর্ঘ।’

​‘তুমি কি নিজে গভীরভাবে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল নিরীক্ষণ করোনি?’ গালিব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

​‘দেখেছি চাচাজান, কিন্তু এতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারি না, যাতে তাঁর চেহারার সাথে নিজের আকৃতি মিলিয়ে দেখতে পারি।’

​এ কথা শুনে গালিব অনেকক্ষণ যাবৎ সৈয়দ মকবুল আলমের ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

‘চাচাজান, কোনো নতুন কবিতা নিয়ে কি ভাবছিলেন?’ ​সৈয়দ মকবুল আলম কাগজের দিস্তার দিকে ইশারা করেন।

​‘আহমদ হোসেন মিনাকে চিঠি লিখছিলাম। তবে একটি মসনবি শুরু করেছি। আপাতত শুধু মতলা (সূচনা কবিতাংশ) লিখেছি।’

‘আমার এমন নসিব কোথায়, আপনার পবিত্র জবান থেকে সেই মতলা শুনতে পাব!’ ​সৈয়দ মকবুল আলম মাথা নিচু করে বলেন। তার কথা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এটি একটি সশ্রদ্ধ আবদার।

​গালিব মুচকি হাসলেন।

​‘এই কাঙাল ফকিরের তোমাকে দেওয়ার মতো কী বা আছে? আচ্ছা, শোনো—

আগে ও নাসিম-এ-নওবাহারি

পিছে ইয়ে গুবার-এ-খাকসারি

সামনে ওই বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়া, পেছনে এই বিনয়ের ধুলোবালি।

​‘সুবহানাল্লাহ! চাচাজান, কী সহজ অথচ চমৎকারভাবে অন্ত্যমিল রক্ষা করেছেন। বন্ধুদের যখন এই মতলা শোনাব, তখন তারা আমাকে এ কারণে হিংসে করবে, আমি সরাসরি হযরতের যবান থেকে এটি শুনেছি। ​ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দিলে আমার মনে একটি খটকা আসছে, যদি অনুমতি দেন তবে তা প্রকাশ করি!’

‘​নিঃসংকোচে বলো, সাহেবজাদা মিঞা। তবে একথা বলার সময় গালিবের চেহারার রঙ কিছুটা বদলে গেল।

‘​চাচাজানা, ঋতু ও সময়ের বিচারে এই কবিতার শব্দ ও অর্থের মাঝে সামঞ্জস্যতা নেই। যখন বসন্তের আগমন ঘটে, আর ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস বয়, ধরিত্রী থাকে সিক্ত, তখন ধুলোর নামনিশানাও থাকে না। অর্থাৎ ধুলো ওড়া তো অসম্ভব। আমার দ্বিতীয় সংকোচ হলো, এই কবিতা আপনার মেজাজের সাথেও খাপ খাচ্ছে না। আপনিই তো বলেছিলেন—

উল্টে ফির আয়ে দোর-এ-কাবা অগর ওয়া না হুয়া

কাবার দরজা যদি না-ই খোলে, তবে উল্টো পথেই ফিরে আসব।

‘যে ব্যক্তি কাবার দরজা থেকে উল্টো পায়ে ফিরে আসতে পারেন, তিনি কেন বিনয়ের ধুলো হতে যাবেন?’ এ কথা বলে সৈয়দ মকবুল আলম মাথা নিচু করে নিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ সেভাবেই রইলেন, যেন তিনি আর কখনোই মাথা তুলবেন না।

​গালিব তার আপাদমস্তক নিরিখ করতে থাকলেন এবং বুঝতে পারলেন, এই তরুণ আপনজম তার ওপর আপত্তি তুলে এখন নিজেই মনে মনে ব্যথিত হচ্ছে।

​গালিব খুবই প্রফুল্ল কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তুমি সত্য বলেছো। তুমি মারহেরার বাসিন্দা, যা চারপাশ থেকে খেত-খামার, বাগান ও বনজঙ্গলে ঘেরা। ঋতুর আসা-যাওয়া এবং তার বিচিত্র রূপ সম্পর্কে তোমার যে অগাধ জ্ঞান, তা আমার হবে কী করে? আমি তো জন্মেছি এক বড় শহরে। কৈশোরেই আগ্রা থেকে দিল্লিতে চলে এসেছি, সেটাও এক বিশাল শহর। এরপর যা-ও সফর করেছি, তা কলকাতা ভ্রমণের সময়। আর সেই পথের সবকটি ধাপই ছিল শহর : লখনৌ, বান্দা, এলাহাবাদ, বেনারস। রামপুরে যখন থাকলাম, সেটিও লোকালয়ের একেবারে মাঝখানে। তোমরা মফস্বলের শরিফ লোকেরা আমাদের মতো শহরবাসীর চেয়ে ঋতু ও ফসল সম্পর্কে বেশি জানো।’

​সৈয়দ মকবুল আলম মাথা নিচু করেই বসে রইলেন।

‘​আচ্ছা, এবার মাথা তোলো; আর আমাকে বলো তো, এই একই ভাব যদি তুমি প্রকাশ করতে, তাহলে কী বলতে?’

​‘একই ছন্দে?’

​‘হ্যাঁ। এটি খুবই সাবলীল ছন্দ। তবে তোমার ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু মূল ভাবটি যেন অক্ষুন্ন থাকে।’ 

গালিব পরম মমতায় হাসলেন।

​সৈয়দ মকবুল আলম কিছুক্ষণ এভাবেই মাথা নিচু করে বসে রইলেন, তারপর দৃষ্টি অবনত রেখেই ধীর স্বরে বললেন—

​আগে ও নিহাল-এ-কদ-কশিদা

পিছে ইয়ে গুল-এ-খিজা-রসিদা

সামনে ওই দীর্ঘদেহী বৃক্ষসম প্রিয়তম, আর পেছনে এই হেমন্তের ঝরা ফুল।

গালিবের চেহারায় খুশির আভা ছড়িয়ে পড়ল। তিনি কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে সৈয়দ মকবুল আলমের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় পুরে বসে রইলেন।

​‘আল্লাহ! এ বিষয়ে তোমার কবিতা আমার চেয়েও উৎকৃষ্ট। একেবারে উপযুক্ত  শব্দচয়ন। ‘আগে ও’-এর বিপরীতে ‘পিছে ইয়ে’, ‘নিহাল’-এর বিপরীতে ‘গুল’, আর ‘কদ-কশিদা’-এর বদলে ‘খিজা-রসিদা’। শব্দের গভীরতা এমন, যেন কোনো কাসিদার তাশবিব (সূচনা) বলছো। 

‘আল্লাহ নজরবন্দি থেকে রক্ষা করুন! হ্যাঁ, একটা খুঁত এতেও আছে। এই কবিতায় ‘নিহাল’ শব্দটি বৃক্ষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত নিহাল বলতে সেই চারাগাছকে বোঝায়, যা এখনও তরুণ। ফলে কোনো সমালোচক বলতেই পারেন, কচি চারাগাছ আবার কদ-কশিদা বা দীর্ঘদেহী হয় কী করে? তবে আমি এই কবিতায় মুগ্ধ। বাহ্, কী চমৎকার বলেছো, তাও আবার উপস্থিত বুদ্ধিমত্তায়। বেঁচে থাকো, বাবা!’

​সৈয়দ মকবুল আলম উঠে দাঁড়িয়ে সাতবার কদমবুসি করলেন।

​‘বোসো, সাহেবজাদা।’ গালিব আলতো করে তার আংরাখার প্রান্ত ধরে বললেন, ‘নাও, এ কাগজে পঙক্তি দুটি লিখে দাও।’

​সৈয়দ মকবুল আলম কাগজটি নিয়ে তার কলম দিয়েই পঙক্তি দুটি লিখে দিলেন।

​গালিব একপলক সেদিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘তোমার হস্তাক্ষর খুব সুন্দর, সাহেবজাদা! তোমার শ্রদ্ধেয় পিতার চিঠির পাঠোদ্ধার করতে তো প্রায়ই চৌধুরী আব্দুল গফুরকে সেটি আবার মারহেরায় ফেরত পাঠিয়ে নতুন করে লিখিয়ে আনতে হয়। তবে এ কথা যেন মুর্শিদের কানে না পৌঁছায়; খবরদার!’

​‘জি, ঠিকই বলেছেন। আব্বাজানের দিনলিপি পড়া তো আরও কঠিন কাজ। তিনি অবশ্য অনায়াসেই পড়তে পারেন, কিন্তু আমাদের পড়তে খুব কষ্ট হয়।’

‘তুমি একটি কথা জিজ্ঞেস করেছিলে, কেন আমি মারহেরা সফরে যাই না। আল্লাহর কসম! আমার খুব ইচ্ছে করে ওই পুণ্যভূমি দর্শন করতে এবং ওখানকার ধূলিকণাকে চোখের সুরমা বানাতে। কয়েকবার নিজের চিঠিপত্রে এ আকাঙ্ক্ষার কথা ব্যক্তও করেছি, আমি মারহেরা যাব। মুর্শিদের পাশে বসে কিছু খোশগল্প হবে, কিছু মান-অভিমান হবে। চৌধুরী আব্দুল গফুর সরদার মারহেরাভি সাহেবেরও একসময় খুব পীড়াপীড়ি ছিল। এখন তো বার্ধক্যজনিত কারণে সেই প্রশ্নই ওঠে না। যখন শরীরে জোর ছিল, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির প্রতি ভরসা ছিল, তখনও সবসময় এটাই ভেবেছি, যদি মারহেরা যাই তবে মুর্শিদের খানকায় অবস্থান করব। তিনি থাকতে তো আর চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে ওঠা যায় না! কিন্তু সেখানে কীভাবে যাওয়া সম্ভব হতো? ওখানে খানকায় তো মদ পাওয়া যায় না, এদিকে আমার সন্ধ্যায় সুরাপান ছাড়া চলে না!

সৈয়দ মকবুল আলম মৃদু স্বরে হাসলেন। ‘চাচাজান, আপনি তো নিজের এবং  আব্বাজানের জন্মসালটিও একটি কবিতার সুরে বেঁধেছিলেন।’

​গালিব হাসলেন। মনে হলো তিনি যেন কোনো পুরোনো স্মৃতিতে হারিয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘তোমার আব্বাজান লিখেছিলেন, তার জন্মসাল ১২১১ হিজরি। আর ‘তারিখ’ শব্দের সংখ্যাগণনা হিসেবে ১২১১ হিজরি সালটি বেরিয়ে আসে। আমি তোমার বাবার চেয়ে এক বছরের ছোট, অর্থাৎ আমার জন্মসাল এক বছর বেশি। তখন আমি একটি কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলাম—

​হাতেফ-এ-গাইব শব মে ইউঁ চিখা

উনকি ‘তারিখ’, মেরা ‘তারিখ’

রাতে গায়েবি কোনো আওয়াজ উঠল,

তার জন্ম-তারিখই আমার তারিখ। 

এবার সৈয়দ মকবুল আলমের হাসির শব্দ কিছুটা জোরালো হলো। গালিব নিজেও হাসছিলেন। মকবুল আলম অনুভব করলেন, মসনবির কবিতা নিয়ে যে সামান্য অস্বস্তি ছিল, তা কেটে গেছে।

​​গালিব তাকে মৃদু স্বরে বলছিলেন, ‘এই তো কয়েক মাস আগে আমি মুর্শিদকে চিঠিতে লিখেছিলাম, তাঁর জন্য একটি কবিতা লিখে রেখেছি—

রশক-এ-উর্ফি ও ফখর-এ-তালিব মুর্দ আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব মুর্দ

উর্ফির ঈর্ষা আর তালিবের গর্ব— আসাদুল্লাহ খাঁ গালিব মৃত্যুবরণ করেছে।

​এই কাজের জন্য মনে মনে দুজনকে ঠিক করেছিলাম। একজন নবাব মোস্তফা খাঁ, তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যজন নবাব জিয়াউদ্দিন খাঁ, তিনি প্রায়ই অসুস্থ থাকেন। তাই এখন আমি আমার পির ও মুর্শিদের কাছে এই অনুগ্রহ প্রত্যাশী, সময় হলে তিনি যেন এই কবিতাটিকে বন্ধ ধরে একটি ‘তারকিব বন্দ’ লিখে দেন। সাহেবজাদা মিঞা, বাবাকে এই কথাটি একটু মনে করিয়ে দিও। এভাবে দেখলে, জন্মসাল আর মৃত্যুসালের শ্লোক—উভয় ক্ষেত্রেই আমি মুর্শিদের করুণার ঋণী হয়ে থাকব।’

​‘আল্লাহ আপনাকে হাজার বছরের দীর্ঘায়ু দান করুন!’ সৈয়দ মকবুল আলম নিচুস্বরে বললেন।

​গালিব তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবৃত্তি করলেন—

​হো চুকিঁ গালিব বলায়েঁ সব তমাম 

এক মর্গ-এ-নাগাহানি অউর হ্যায়

গালিবের ওপর যত বিপদ আসার ছিল সব এসে গেছে;

এখন শুধু অতর্কিত এক মৃত্যুর অপেক্ষা।

​এরপর আরও কিছু কথা হয়েছিল। শ্রবণ আর দৃষ্টিশক্তি যতটুকু মনে রাখতে পেরেছে, সে অনুযায়ী সৈয়দ মকবুল আলম উঠে দাঁড়ালেন এবং ঝুঁকে গালিবের দুই হাত নিজের মাথায় ঠেকিয়ে বিদায়ের অনুমতি চাইলেন। গালিব সৈয়দ মকবুল আলমের মাথাটি দুই হাতে ধরে নিজের দিকে টেনে নিলেন এবং তার কপালে দুইবার চুম্বন করলেন।

সৈয়দ ​মকবুল আলম গালিবকে জানান, তিনি এখান থেকে হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগাহে যাওয়ার সংকল্প করেছেন। রাতে সেখানেই থাকবেন। ভোরে ফজর নামাজের পর রওনা দেবেন মারহেরার উদ্দেশে। গালিব বলেছিলেন, ‘হযরত নিজামুদ্দিন ও খসরুর দরবারে আমার সালাম পৌঁছে দিও। আর সম্ভব হলে মাস ছয়েক বা বছরখানেক পর আরও একবার এসে আমাদের সাথে দেখা করে যেও।’ গালিব আরও বলেন ‘দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে না পারার কারণ শুধুই শারীরিক অক্ষমতা। আল্লাহ তোমার সফরকে সহজ করুন!’

কিন্তু শ্রবণ আর দৃষ্টিশক্তি যে কথাটি সংরক্ষণ করতে পারেনি তা হলো, সৈয়দ মকবুল আলম চলে যাওয়ার পর গালিব দীর্ঘক্ষণ সেই কাগজের টুকরোটি দেখছিলেন, আর ভাবছিলেন, বহু বছর আগে একটি আরবি শব্দ ব্যবহার করার পর মনে যে অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল, আজ ঠিক তেমনই এক অনুভূতি কাজ করছে। আমার মুর্শিদজাদা সৈয়দ মকবুল আলম অস্তিত্বের এই রহস্যঘেরা ঘরে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে—আমি কি মসনবিতে সংশোধিত নতুন কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করব, নাকি করব না? আর আমি কি কোনোভাবেই নিজের সেই আদি কবিতাটিকে ভুলে যেতে পারি?

​যখন আসরের সময় পেরিয়ে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হলো, তখন চাকর এসে সামনে দাঁড়াল। সিন্দুক থেকে টম হার্ট বোতলটি বের করা হলো। গালিব পর পর এমনভাবে দুই চুমুক পান করলেন, যেন মদের পরিমাণের তুলনায় দ্বিগুণ গোলাপজল মেশানো। কাগজের সেই টুকরোটি তখনও ছিল গালিবের হাতেই। 

চাকর কলকেতে তামাক দিয়ে চলে গেল। টম হার্টের নেশা তখন চড়তে শুরু করেছে, কিন্তু কলকের অঙ্গারের ওপর যখন সেই কাগজের টুকরোটি রাখলেন এবং তা পোড়ার মৃদু শব্দ আর ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠল, তখন সেই আধো-অন্ধকার ঘরের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে তিনি যে উজ্জ্বল অবয়বটি স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন এবং চেতনার সমস্ত শক্তি দিয়ে যাকে অনুভব করলেন, তা ছিল স্বয়ং গালিবের অহং।

গালিব তার মৃদু কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে কলমটি তুলে নিলেন এবং তা ডান হাতে খুব শক্ত করে চেপে ধরলেন।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments