মিনা বাজার (নবম পর্ব)

মূল : আব্দুল হালিম শরর লখনভি

মাসুম বিন শাহাদাত

মিনা বাজার (অষ্টম পর্ব)

স্বামী জামাল খান

এরপর বাদশাহ রাজমহল থেকে বের হয়ে দরবারে আসেন। বারবার দরবারি আমিরদের দিকে তাকিয়ে লক্ষ করেন, জামাল খান আছে কি না। কিন্তু তাকে দেখা যায় না। মনে মনে বাদশাহ তার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেন। কিন্তু যখন অনেকক্ষণ হয়ে যায় এবং তার দেখা মেলে না, তখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘রিসালাদার জামাল খান আসেনি?’

উজিরে আজম চারদিকে তাকিয়ে জানান, ‘মনে হয় সে উপস্থিত হয়নি।’ তখন সঙ্গে সঙ্গে একজন বার্তাবাহক গিয়ে জামাল খানকে সংবাদ দেয়, ‘আপনাকে স্মরণ করা হয়েছে!’

জামাল খান সেই রাতেই তার স্ত্রীর প্রাসাদে যাওয়ার সংবাদ পায়। শওকত আরা গুলরুখের নির্দেশে তৎক্ষণাত বাড়িতে লোক পাঠিয়ে তার সংবাদ দিয়েছিল।

খবরটি শুনেই সে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে। সারারাত ধরে বিছানায় ছটফট করে, এপাশ-ওপাশ করে কাটায়। কখনো মনে হয়, আত্মহত্যা করবে। এই দুনিয়াকে আর নিজের মুখ দেখাবে না। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে, না; এত তাড়াহুড়ো করা ঠিক হবে না। এই নির্লজ্জ নারীকে শাস্তি দিয়ে তবেই আত্মহত্যা করব। পরে সে নিজের মনেই বলে, দেখি সে প্রাসাদ থেকে ফিরে আসে কি না? একবার মন বলে, সে আসুক, আমি তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেব। আবার মন বলে, এটাই ভালো হবে তার নির্লজ্জ মুখ আর দেখব না।

এসব ভাবনার দোলাচলে সারারাত কেটে যায়। ভোরে নামাজ পড়ে বসে আছে, এমন সময় প্রতিবেশী বন্ধু জানসেপার খান আসে। সে তুর্কমেনি বংশোদ্ভূত সেনাপতি এবং দরবারের সম্মানিত লোকদের একজন। সে এসে তার খোঁজখবর নেয়। একই সাথে জামাল খানের মুখের দিকে তাকালে চেহারায় রাত্রিজাগরণ ও অস্থিরতার স্পষ্ট ছাপ দেখতে পায়। জানসেপার খান জিজ্ঞেস করে, ‘ভালো আছো তো? মন-মেজাজ ঠিক আছে?’

‘এই তো বেঁচে আছি, কিন্তু জানি না কেন?’

‘কী এত দুঃখ, চোখেমুখে তীব্র হতাশার ছাপ?’

‘তা এই কারণে, কেন এখনো বেঁচে আছি!’

‘কিছু তো বলো, কেন জীবনের প্রতি এত অসন্তোষ?’

‘পুরো শহরে আমার লাঞ্ছনার খবর ছড়িয়ে গিয়েছে, অথচ তোমার কোনো খবরই নেই!’

‘আল্লাহর কসম, আমি কিছুই জানি না। বলো, যদি সত্যিই এমন কিছু হয়ে থাকে, তবে আমরাও তোমার সঙ্গে মরতে রাজি।’

জামাল খান অশ্রুসজল চোখে বলে, ‘আমার স্ত্রী রাতে মিনা বাজার থেকে বাদশাহর হেরেমে গিয়েছে।’ এ কথা শুনে জানসেপার খান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর জিজ্ঞেস করে, ‘সে কি নিজ থেকে গিয়েছে, নাকি বাদশাহ জোর করে ডেকে নিয়েছে?’

‘জোর করে ডেকে নিয়েছে।’

‘তোমার রাগ কি স্ত্রীর ওপর নাকি বাদশাহর ওপর?’

‘জাহাঁপনার ওপর কি রাগ করতে পারি? সব রাগ ওই বেহায়া নির্লজ্জের ওপর!’

‘তবে আগে তার দোষ প্রমাণ করো, তারপর নাহয় রাগ কোরো।’

‘ওর ইজ্জতে কলঙ্কের দাগ লেগেছে, এটাই ওর দোষ হিসেবে যথেষ্ট!’

‘তুমি এখন ক্রুদ্ধ ও প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে কথা বলছ। কিন্তু মানুষকে কখনোই ইনসাফ ত্যাগ করা উচিত নয়। একটু শান্ত হয়ে ধৈর্যের সাথে ভালো করে খোঁজ নাও, সে ওখানে কীভাবে গিয়েছে? কেন ডাকা হয়েছে? হেরেমে কেমন আর কী অবস্থায় ছিল? এসব জানার পর যা ভালো মনে হয় কোরো। খোদার কসম, আমি জানমাল দিয়ে তোমার পাশে থাকব।’

‘এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে আর কী লাভ? সে যে অবস্থায়ই থাকুক না কেন, সে এখন আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। এরপরও কি আমি তার নাপাক দেহখানা স্পর্শ করব?’

‘এটা তোমার অতি বাড়াবাড়ি। যদি মহামান্য রানি তাকে কোনো কাজে বা বিশেষ প্রয়োজনে ডেকে থাকেন, তাতে অসম্মানের কী আছে? কিংবা যদি বাদশাহই শুধু কথা বলার জন্য বা সম্মানজনক কাজের জন্য ডাকেন, তাতেও আপত্তি কীসের?

আমাদের ওখানে সকল সম্ভ্রান্ত লোকের স্ত্রীরা তাদের সর্দার ও অন্যান্য নারীর সাথে দেখাসাক্ষাৎ করতে পারে। খোদার কসম, তারা সবাই সম্ভ্রান্ত এবং হিন্দুস্তানি লোকদের চেয়েও অধিক সম্ভ্রান্তের অধিকারী।’

‘তোমাদের দেশে এমন হয়, কিন্তু আমাদের এখানে তো স্ত্রী অন্য কারও বাড়িতে গেলেই নিজের নাক কাটা যায়।’

‘সেটা তো কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে গেলে, অন্যথায় নারীরা কি কোথাও যাওয়া-আসা করে না? তোমার মর্যাদা কি নবির কন্যাদের মর্যাদার চেয়েও বেশি? খোদা নিজে ইনসাফ করেন, এবং সকল মুসলমানের কাছ থেকেও সর্বদা ইনসাফের দাবি করেন।’

এসব আলোচনা চলছিল, তখনই দরবারের বার্তাবাহক এসে সংবাদ দেয়, ‘জলদি চলুন, জাহাঁপনা আপনাকে স্মরণ করেছেন!’

জামাল খানের মনে তখন উত্তেজনাপূর্ণ চিন্তা বিরাজ করছে, সে দরবারে যেতে চাইছিল না, কিন্তু সে নিরুপায়। তাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন হতে দেখে জানসেপার খান বলে, ‘ভালোই হয়েছে জাহাঁপনা তোমাকে স্মরণ করেছেন। সবকিছু এখনই পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমিও তোমার সাথে যাচ্ছি। এই অসিলায় সালাম হয়ে যাবে।’

অবশেষে দুজনেই দরবারি পোশাক পরে, সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে রাজদরবারের উদ্দেশে রওনা হয়। সংবাদ পেয়েই তাদের দুজনকে ডাকা হয়। মুখোমুখি হতেই নকীব উচ্চস্বরে বলে ওঠে, ‘নেগাহ রৌশন!’ বাদশাহর দৃষ্টি পড়তেই দুজনে মাথা নত করে সম্মান জানায়। বাদশাহ সালামের জবাবে হাত তুলেন এবং সাদুল্লাহ খানের দিকে মনোনিবেশ করে মিনা বাজারের প্রশংসায় কিছু কথা বলেন।

এসবের মাঝেই তিনি জামাল খানের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘জামাল খান, গতকাল মিনা বাজারে তোমার স্ত্রীকে দেখেছি এবং খুব খুশি হয়েছি। তোমাকে আমি আমার দরবারের লোকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুদর্শন দেখে জামাল খান বলে সম্বোধন করেছিলাম।

তোমার সৌন্দর্যের তারিফ করার পর যখন দেখি তুমি এমন এক স্ত্রী পেয়েছ, যার সৌন্দর্য অতুলনীয়, তখন বোধহয় আমার সেই সম্বোধন সত্যিই যুক্তিসঙ্গত ছিল। আর পরে যখন জানতে পারি, তুমি তাকে ‘জামাল আরা’ উপাধি দিয়ে নিজের সুখের অংশীদার করেছ, তখন আমার আরও ভালো লাগে।’

তোমার স্ত্রী এত সুন্দরী, মিষ্টভাষী, বুদ্ধিমতী ও সুশীলা যে, মিনা বাজারে তার সাথে দুচার কথায় মুগ্ধ হয়ে পড়ি, তখন মনে হয় তাকে রানির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই, যেন সে-ও তার মিষ্টি কথা ও শিষ্টাচারে আপ্লুত হয়।’

তাকে প্রাসাদে ডেকে নেওয়ার কারণে তোমার মনে হয়তো কিছুটা উদ্বেগ কাজ করছে, তাই আমি তোমাকে আশ্বস্ত করছি, তার ইজ্জত-সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। তুমি জানো, প্রজাদের মধ্যে আমি কোনো নারীকে কুনজরে দেখি না। যেভাবে সকল আমিরের স্ত্রীরা রানির সঙ্গে দেখা করতে আসে, তেমনই তোমার স্ত্রীও তার মেহমান হয়েছে। সে তার প্রতি খুবই স্নেহশীল, দয়ালু। দস্তরখানে তার সঙ্গে আমার দেখা হলে, তার শিষ্টাচার ও পবিত্র কথায় আমি আরও মুগ্ধ হয়ে পড়ি।’

জামাল খান পুনরায় ঝুঁকে সালাম করে বলে, ‘এই নগণ্য বান্দার মাথা আকাশ ছুঁয়েছে, কিন্তু ওই দাসী এত সম্মানের যোগ্য নয় যে, তাকে এত উচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করতে হবে!’

‘এ থেকে বোঝা যায়, তুমি সেই পরীমুখী, হুরের মতো সুন্দরী নারীর কদর বুঝতে পারোনি। সে খুবই যোগ্য ও সুন্দরী। এত সুন্দর করে কথা বলে যে, মনটা ভরে যায়। যদি এখনো তার মূল্য বুঝতে না পারো, তবে এখন থেকেই তার মূল্য বুঝতে শেখো।’

‘ভবিষ্যতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রাখব এবং এই শিষ্টাচার শিক্ষার জন্য আমি মনেপ্রাণে মহান খসরুভক্তের প্রতি কৃতজ্ঞ।’

‘সে তিন দিন পর্যন্ত মহামান্য রানির অতিথি হিসেবে থাকবে এবং চতুর্থ দিন এক অমূল্য আমানতের মতো তাকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

বাদশাহর এই আদেশ শুনে জামাল খান শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করে। এরপর বাদশাহ তার দরবার ছেড়ে রাজমহলে চলে যান। সেখানে তিনি প্রথমে গুলরুখ বেগমকে ডেকে বলেন, ‘আমি তোমার স্বামীকে ডেকে এনে বলে দিয়েছি, তুমি মহামান্য রানির অতিথি। আর আমি তোমাকে তার সাথে দেখা করার জন্য ডেকে এনেছি। আমি তাকে সর্বদিক থেকে আশ্বস্ত করে বলেছি, চতুর্থ দিন তোমার আমানত তোমার বাড়িতে পৌঁছে যাবে।’

গুলরুখ বেগম মুখে কিছুই বলে না, তবে তার মুখভঙ্গিতে কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। রানি মমতাজ বেগমও সেখানে উপস্থিত হন, আর জিজ্ঞাসা করেন, ‘হযরত তাকে কী বললেন?’ বাদশাহ জামাল খানের সাথে বলা কথাগুলো তাকে শোনান। তা শুনে রানি জিজ্ঞাসা করেন, ‘সে কি নিজের মুখে এ কথা স্বীকার করেছে, তার প্রতি কোনো প্রকার সন্দেহ নেই?’

বাদশাহ হেসে বলেন, ‘যেভাবে সে এখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, ঠিক তেমনই জামাল খানও তার সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে।’

‘হ্যাঁ, আশ্বস্ত হওয়ার জন্য এটুকু যথেষ্ট।’

এবার খাবারের সময় হয়ে যায়। দস্তরখান বিছানো হয়। রানি ও গুলরুখ দুজনেই বাদশাহর সাথে বসে আহার করে। এবার বোধহয় গুলরুখ কিছুটা স্বস্তি বোধ করে। তিন দিন ধরে মহলে বেশ আনন্দেই কাটে। তার মিষ্টি আচরণ, শিষ্টাচার ও অর্থপূর্ণ কথা বাদশাহ ও রানি দুজনকেই আনন্দ দেয়।

মমতাজ বেগমের মনে যদি বাদশাহর প্রতি অনুরাগ ও গুলরুখের অতুলনীয় সৌন্দর্যের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাবনা জেগেও থাকে, সেটা একদম মুছে যায়। মনে মনে তিনি নিজ স্বামীর ধার্মিকতা, পবিত্রতা ও নির্মল দৃষ্টির প্রতি বিশ্বাসী ও কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

চতুর্থ দিন সকালে দরবারে যাওয়ার সময় বাদশাহ গুলরুখ বেগমকে পোশাক, উপহার ও মূল্যবান গহনা দিয়ে সম্মানের সাথে বিদায় জানান আর বলেন, ‘তোমার আগমনে খুব খুশি হয়েছি। যদিও তোমার কথা শুনে এখনো তৃপ্ত হতে পারিনি, তবুও আমার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তোমাকে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু এখন যেহেতু মহলে এসেছ, তাই মাঝে মাঝে রানির সাথে দেখা করতে এসো।’

‘দাসী নিয়মিত উপস্থিত থাকবে, আর এই দয়ার আশ্রয় কি ছেড়ে দিতে পারি?’

‘জামাল খান তোমার সাথে কীরূপ আচরণ করে আমাকে সেটাও জানিও!’

‘এখন তো আপনার আশ্রয়েই আছি, আর কার কাছে ফরিয়াদ নিয়ে যাব?’

বিদায়ী কথোপকথন শেষে বাদশাহ বাইরে চলে যান। আর গুলরুখ রানি মমতাজের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিমায় পালকিতে উঠে বসে। দুই পাশে দুজন পালকিবাহক পালকির পায়া ধরে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। চৌকিদার ও অগ্রদূতরা পথ পরিষ্কার করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

 

চলবে…

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments