‘না আল্লাহ! আমার খুব লজ্জা করছে।’
‘আরে, এতে আবার লজ্জার কী আছে? আমি কি নিজের কাপড় খুলছি না?’
‘উঁ।’ চুমকি লজ্জা পেল।
‘এখন কি আনাবিকে বলব, কাপড় খুলে দিতে?’ শাহজাদি পাশা, যার রক্তে রক্তে মিশে আছে হুকুম চালানোর অভ্যাস, চিৎকার করে বলে উঠল।
চুমকি কিছুটা ভয়ে আর কিছুটা লজ্জায় নিজের ছোট ছোট হাতে প্রথমে তার কুর্তা, তারপর পাজামা খুলল। এরপর শাহজাদি পাশার নির্দেশে সুগন্ধে ভরা টবে তার সাথেই ঝাঁপিয়ে পড়ল।
গোসল শেষ হলে শাহজাদি পাশা এমন মমতার সাথে, যাতে অহংকার ও কর্তৃত্বের গভীর ছাপ ছিল, মুচকি হেসে বলল, ‘এবার বল তো, তুই কোন কাপড় পরবি?’
‘কাপড়?’ চুমকি খুব ধীরস্থিরভাবে বলল, ‘এই তো, আমার এই নীল কুর্তা-পাজামা।’
‘এটাই?’ শাহজাদি পাশা অবাক হয়ে উচ্চস্বরে নাক কুঁচকে বলল, ‘এত নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত কাপড়? তাহলে গোসল করে লাভ কী হলো?’
চুমকি উত্তর দেওয়ার বদলে উলটো তার দিকে একটা প্রশ্ন ছুুঁড়ে দিল, ‘আপনি কী পরছেন পাশা?’
‘আমি?’ শাহজাদি পাশা বেশ তৃপ্তি ও গর্বের সাথে বলল, ‘আমার বিসমিল্লাহর সময়ের সেই ঝকঝকে জোড়াটা, যা দাদিমা বানিয়ে দিয়েছিলেন, ওইটাই। কিন্তু তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস?’
চুমকি এক মুহূর্তের জন্য ভাবনায় পড়ে গেল, তারপর হেসে বলল, আমি ভাবছিলাম…’ বলতে বলতে থেমে গেল।
‘কী ভাবছিলি?’ শাহজাদি পাশা প্রচণ্ড কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
ঠিক তখনি ওপাশ থেকে আনাবির জোর চিৎকার শোনা গেল, ‘ও পাশা, আমি এখানে ঘামে ভিজে একাকার, আর তুমি কিনা এই নির্বোধ মেয়েটার সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছ? তাড়াতাড়ি বের হও, নইলে বড় পাশাকে গিয়ে বলে দেব!’
চুমকি নিজের ভেবে রাখা কথাটা ঝটপট বলে ফেলল, ‘পাশা, আমি ভাবছিলাম— যদি কখনো আপনি আর আমি অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাই, তাহলে তো আমি আপনার কাপড়ও পরতে পারব, তাই না?’
‘আমার কাপড়? তোর মানে কি ওসব কাপড় যা আমার সিন্দুক ভরে রাখা?’
চুমকি কিছুটা ভয় পেয়ে মাথা নাড়ল।
শাহজাদি পাশা হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল। তুই কী এক পাগল মেয়ে! মনে রাখিস, তুই একজন চাকরানি! তুই তো আমার ব্যবহৃত কাপড় পরছিস। আর সারাজীবন আমার কাপড় পরে যাবি।’
এরপর শাহজাদি পাশা পরম মমতায়, যাতে অহংকার ও ঘৃণা বেশি এবং আন্তরিকতা কম, নিজের মাত্রই গোসলের জন্য খুলে রাখা কাপড় জোড়া তুলে চুমকির দিকে ছুড়ে দিল।
‘এই নে, ব্যবহৃত কাপড়টি পরে নে। আমার কাছে তো অনেক কাপড় আছে।’
চুমকি রেগে গেল, ‘আমি কেন এটা পরব? আপনিই পরুন না আমার এই জোড়াটা!’ সে নিজের সেই নোংড়া কাপড় জোড়ার দিকে ইশারা করল।
শাহজাদি পাশা রাগে চিৎকার করে উঠল, ‘আনাবি, আনাবি…!’
আনাবি দরজা ধাক্কা দিল। দরজাটা সামান্য ভেজানো ছিল, তা হাট হয়ে খুলে গেল, ‘আচ্ছা, তো আপনারা দুজন এখনো নগ্ন হয়েই দাঁড়িয়ে আছেন!’ আনাবি নাকে আঙুল ঠেকিয়ে, কৃত্রিম রাগত স্বরে বলল।
শাহজাদি পাশা ঝটপট স্ট্যান্ডে ঝোলানো নরম গোলাপি তোয়ালেটা নিয়ে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিল। চুমকি ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। আনাবি তার মেয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আর তুই, পাশা বংশের হাম্মামে কেন মরতে এলি?’
‘শাহজাদি পাশাই বলেছিলেন, ‘তুইও আমার সাথে গোসল কর।’
আনাবি ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন, কেউ দেখেছে কি না। তারপর তাকে দ্রুত সেখান থেকে বাইরে টেনে এনে বলল, ‘জলদি গিয়ে চাকরদের ঘরে ঢোক। নইলে ঠান্ডা লাগলে মরে যাবি।’
‘এখন আর এই চটচটে নোংরা কাপড় পরতে হবে না। ওই লাল সিন্দুকে শাহজাদি পাশা পরশু তার একটা কুর্তা- পাজামা দিয়েছিল, ওটা গিয়ে পরে নে।’
‘না!’ নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা সাত বছরের ছোট্ট মেয়েটা গভীর দুঃখের সাথে থেমে থেমে বলল, ‘আম্মি, আমরা আর শাহজাদি যদি সমানই হই, তবে তিনি কেন আমার ব্যবহৃত পোশাক পরেন না?’
‘দাঁড়া, আমি মাকে গিয়ে বলছি, চুমকি আমাকে এমন কথা বলেছে!’
আনাবি ভয় পেয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, ‘আরে পাশা, ও তো হারামজাদি, একদম পাগল হয়ে গেছে। ওর মতো পাগলের কথা কি তোমার মাকে গিয়ে বলবে? ওর সাথে খেলবে না, কথাও বলবে না। ওর নামে জুতা মারো।’
শাহজাদি পাশাকে পোশাক পরিয়ে, চুল বেঁধে, খাওয়া-দাওয়া করিয়ে সব কাজ থেকে যখন আনাবি অবসর পেল, তখন তার ঘরে গিয়ে দেখল চুমকি তখনও নগ্ন অবস্থায় কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আসা মাত্রই সে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে মেয়েকে দমাদম মারতে শুরু করল—
‘যার নুন খাস তার সাথেই ঝগড়া করিস? হারামজাদি কোথাকার! এখনি যদি বড় সরকার বের করে দেন, তবে কোথায় গিয়ে মরবি? এত নখরা কীসের?’
আনাবির কাছে এটা পরম সৌভাগ্যের বিষয়, সে শাহজাদি পাশাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নিযুক্ত হয়েছিল। তার খাওয়া-দাওয়ার মানও ছিল ঠিক বেগম সাহেবাদের মতোই। কারণ শেষ পর্যন্ত সে তো নবাব সাহেবের একমাত্র সন্তানকে নিজের বুকের দুধ খাওয়াত। তার জামা-কাপড়েরও কোনো অভাব ছিল না। কারণ দুধমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাটা ছিল বাধ্যতামূলক। আর সব থেকে বড় সুযোগ তো ছিল এই, তার নিজের মেয়ে শাহজাদি পাশার অজস্র ব্যবহৃত পোশাক পেত। পোশাক পাওয়া তো ছিল ধরাবাঁধা নিয়ম; এমনকি অনেক সময় রুপোর গয়না আর খেলনাও দিয়ে দেওয়া হতো।
আর এদিকে এই পাজি মেয়েটা যত বড় হচ্ছিল আর জ্ঞান বাড়ছিল, ততই এক গোঁ ধরে বসছিল, ‘আমি কেন পাশার ব্যবহৃত পোশাক পরব?’ মাঝেমধ্যে তো আয়না দেখে বেশ বুদ্ধিমানদের মতো বলত, ‘আম্মি, আমি তো পাশার চেয়েও বেশি সুন্দরী, তাই না? তাহলে তো তারই আমার ব্যবহৃত পোশাক পরা উচিত!’
আনাবি সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকত। বড় লোক তো বড় লোকই! যদি কেউ জানতে পারে, হতভাগা দাইমার মেয়ে এমন সব কথা বলে, তবে কি তাদের নাক-কান কেটে বের করে দেবে না? এমনিতে দুধ খাওয়ানোর দিন তো অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এটা তো জমিদার বাড়ির রীতি, দাইমাদের শেষ পর্যন্ত রাখা হতো। কিন্তু দোষ ক্ষমাযোগ্য হলে তবেই ক্ষমা পাওয়া যায়। এমন আচরণ কেন? আনাবি চুমকির কান মলে দিয়ে তাকে বোঝাল, ‘আজকের পর যদি আর একটা কথা বলিস, তবে মনে রাখিস! সারাজীবন তোকে পাশার ব্যবহৃত পোশাক পরেই কাটাতে হবে। বুঝেছিস, গাধার বাচ্চা!’
গাধার বাচ্চাটি সেই সময়ের মতো মুখ বুজে রইল, কিন্তু তার মনে যেন লাভার উদগিরণ হতে শুরু করল।
তেরো বছর বয়সে শাহজাদি পাশা প্রথমবার প্রাপ্তবয়স্ক হলো। অষ্টম দিনে যখন গুলপোশি অনুষ্ঠান হলো, তখন মা এমন এক ঝকঝকে পোশাক বানিয়ে দিলেন যে, চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। বিভিন্ন স্থানে সোনার ঘুঙুরের জোড়া লাগানো হয়েছিল, যাতে পাশা যখন হাঁটবে, তখন যেন ঝুনঝুন শব্দ হয়। জমিদার বাড়ির রীতি অনুযায়ী, সেই অতিমূল্যবান পোশাকটিও ব্যবহৃত জিনিস হিসেবে দান করে দেওয়া হলো।
আনাবি খুব খুশি হয়ে সেই উপহার নিয়ে ফিরলে চুমকি যে তার বয়সের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান আর সংবেদনশীল হয়ে উঠেছিল, সে দুঃখের সাথে বলল, ‘আম্মি, নিরুপায় হয়ে কোনো কিছু নেওয়া আলাদা কথা, কিন্তু আপনি এমন সব জিনিস নিয়ে অন্তত খুশি হবেন না।’
‘আরে বেটি, সে ফিসফিস করে বলল, এই পোশাকটি যদি বানাতে বসিস, তবে দুশো কলদার (রুপোর টাকা) কোথায় যাবে তার ঠিক নেই। আমরা কপালগুণে ভালো যে, এমন জমিদার বাড়িতে ঠাঁই পেয়েছি।
‘আম্মি।’ চুমকি খুব দুঃখের সাথে বলল, আমার খুব ইচ্ছে করে, আমিও যেন কোনোদিন পাশাকে আমার ব্যবহৃত পোশাক দিতে পারি!’
আনাবি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। ‘আরে, তুই তো এখন বড় হয়েছিস, একটু তো বুদ্ধি খাটা! এসব উল্টোপাল্টা কথা কেউ শুনে ফেললে আমি কী করব, মা? অন্তত আমার এই বুড়ো বয়সের সাদা চুলের দিকে তাকিয়ে একটু দয়া কর!’
মাকে কাঁদতে দেখে চুমকি চুপ হয়ে গেল।
মৌলবি সাহেব দুজনেরই একসাথে কুরআন শরিফ আর উর্দু কায়দা শুরু করেছিলেন। পাশার চেয়ে চুমকিই বেশি দ্রুত শিখছিল। দুজনেই যখন প্রথমবার কুরআন খতম করল, তখন বড় পাশা খুব উদারতা দেখিয়ে চুমকির জন্যও হালকা কাপড়ের একটি নতুন পোশাক বানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও পরে পাশার সেই দামী আর ভারী পোশাকটিও ব্যবহৃত জিনিস হিসেবে পেয়েছিল, কিন্তু ওই নতুন সাধারণ পোশাকটিই ছিল তার কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়। সেই পোশাকটি পরলে সে কোনো অপমান বোধ করত না। হালকা জাফরানি রঙের সেই সুতির পোশাকটি ছিল তার কাছে হাজারো ঝকঝকে দামী ব্যবহৃত পোশাকের চেয়ে দামী।
শাহজাদি পাশা এখন পড়াশোনা শেষ করে পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেছে, তাই তার বিয়ের চিন্তা-ভাবনা চলছে। জমিদার বাড়ি স্বর্ণকার, দর্জি ও ব্যবসায়ীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। চুমকি শুধু এটাই ভেবে যাচ্ছিল, সে বিয়ের এত বড় আয়োজনের দিনেও নিজের সেই পোশাকটিই পরবে, যা কারও ব্যবহৃত নয়।
বড় পাশা সত্যিই খুব দয়ালু ছিলেন। চাকর-বাকরদের তিনি নিজের সন্তানের মতোই আগলে রাখতেন। তাই তিনি শাহজাদি পাশার সাথে সাথে চুমকির বিয়ের ব্যাপারেও বেশ চিন্তিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত নবাব সাহেবকে বলে-কয়ে তার জন্যও একটি উপযুক্ত পাত্র খুঁজে বের করলেন। ভাবলেন, শাহজাদি পাশার বিয়ের পর সেই রেশ থাকতে না থাকতেই চুমকির বিয়েটাও দিয়ে দেবেন।
যেদিন শাহজাদি পাশার বিয়ের মাত্র একদিন বাকি এবং জমিদার বাড়ি মেহমানদের ভিড়ে গমগম করছিল, আর মেয়েদের দল পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছিল, সেদিন সখীদের আড্ডার মাঝে বসে থাকা শাহজাদি পাশা পায়ে মেহেদি লাগাতে লাগাতে চুমকিকে বলতে লাগল, ‘তুই যখন শ্বশুরবাড়ি যাবি, তখন তোর পায়ে আমি মেহেদি লাগিয়ে দেব।’
‘ওমা, খোদা না করুক!’ আনাবি আদর মাখা স্বরে বলল, ওর পা আপনার শত্রুরা ছোঁবে। আপনি যে এ কথা বলেছেন এটাই অনেক। শুধু এই দোয়া করবেন পাশা, যেন আপনার হবু বরের মতোই কোনো শরিফ ছেলে ওর কপালে জোটে।’
‘কিন্তু ওর বিয়েটা হচ্ছে কবে?’ কোনো এক সখী হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল।
শাহজাদি পাশা তার সেই ছোটবেলার মতো অহংকার মেশানো হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার এত এত ‘ব্যবহৃত’ জিনিস বের হলে তবেই ওর যৌতুক হবে বুঝে নাও।’
ব্যবহৃত…ব্যবহৃত…ব্যবহৃত। হাজার হাজার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সূঁচের খোঁচা যেন চুমকির হৃদয়ে বিঁধে গেল। সে তার চোখের পানি লুকিয়ে নিঃশব্দে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
সন্ধ্যা হতেই মেয়েরা আবার ঢোলক নিয়ে বসে পড়ল। একের পর এক আজেবাজে গান গেয়ে যাচ্ছিল। গতকাল সারা রাত জেগে অনুষ্ঠান হয়েছিল, আজ আবারও হবে। ওপাশে উঠানে সারিবদ্ধভাবে চুলা জ্বলছে, বাবুর্চিরা নানা পদের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত। পুরো জমিদার বাড়ি রাতের বেলাও দিনের মতো কর্মব্যস্ততা আর আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল।
চুমকির অশ্রুসিক্ত সৌন্দর্য সেই কমলা রঙের পোশাকে যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এই পোশাকটি ছিল এমন অমূল্য, যা তাকে হীনম্মন্যতার পাতাল থেকে তুলে আরশের উচ্চতায় বসিয়ে দিয়েছিল। কারণ এই পোশাকটি কারও ব্যবহৃত ছিল না। একদম নতুন কাপড় দিয়ে সেলাই করা জোড়া, যা সে সারাজীবনে একবারই পেয়েছিল। নতুবা তার পুরোটা জীবন তো শাহজাদি পাশার ব্যবহৃত পোশাক পরেই কেটেছে। আর এখন যেহেতু তার যৌতুকও পুরোপুরি অন্যের দেওয়া দানের জিনিসের ওপরই নির্ভর করছে, তাই জীবনের বাকি সময়টাও তাকে সেগুলো ব্যবহার করেই কাটাতে হবে।
‘কিন্তু পাশা, একজন সৈয়দ-কন্যা কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা তুমিও দেখে নিও। আমাকে তুমি একটার পর একটা পুরোনো জিনিস ব্যবহার দিয়েছ না?এবার দেখো…
মিষ্টির থালা নিয়ে সে বরপক্ষের কোঠিতে প্রবেশ করল। চারদিকে উজ্জ্বল আলোকসজ্জা। এখানেও ঠিক তেমনই হইচই, যেমনটি কনেপক্ষের মহলে। পরদিনই যেহেতু বিয়ের অনুষ্ঠান।
এত বড় কোঠি আর মানুষের কোলাহলের মাঝে কেউ তাকে লক্ষ্যই করল না। সে লোকদের জিজ্ঞাসা করতে করতে সোজা বরের কামরায় গিয়ে পৌঁছাল। হলুদ আর মেহেদির আচার-অনুষ্ঠানে ক্লান্ত বর নিজের পালঙ্কে গা এলিয়ে দিয়েছিল। পর্দার নড়াচড়ায় মাথা ঘুরিয়ে দেখামাত্রই বরের চোখ একদম স্থির হয়ে গেল।
হাঁটু পর্যন্ত লম্বা জাফরানি কুর্তা, সরু পায়ে সেঁটে থাকা চুড়িদার পাজামা। হালকা রুপার কাজ করা জাফরানি ওড়না। কান্নাভেজা অশ্রুসিক্ত গোলাপী চোখ। ছোট হাতার কুর্তায় উঁকি দেওয়া মসৃণ কমনীয় হাত। চুলে বেলি ফুলের গয়না জড়ানো আর ঠোঁটে প্রাণঘাতী হাসি।
এসব হয়তো সাধারণই ছিল, কিন্তু একজন পুরুষ যার গত কয়েকটা রাত কেটেছে কোনো নারীর কল্পনায়, সে বিয়ের আগের রাতে খুব বিপজ্জনক হয়ে ওঠে; সে যতই ভদ্র হোক না কেন।
রাত হলো পাপের আমন্ত্রণ।
আর নির্জনতা হলো পাপের প্ররোচনা।
চুমকি তার দিকে এমনভাবে তাকাল, সে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। চুমকি জেনেবুঝেই মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়াল। সে ছটফট করে নিজের জায়গা থেকে উঠে ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখের কোণ দিয়ে চুমকি তার দিকে এমনভাবে তাকাল, সে যেন একেবারে ধসে পড়ল।
‘তোমার নাম কী?’ ঢোক গিলে সে জিজ্ঞেস করল।
‘চুমকি।’ এক ঝলক হাসি তার মিষ্টি মুখটাকে চাঁদের মতো উজ্জ্বল করে দিল।
‘সত্যিই তোমার মাঝে যে চমক, তাতে তোমার নাম চুমকি হওয়াই সার্থক।’
সে ভয়ে ভয়ে নিজের হাত চুমকির কাঁধের ওপর রাখল। খাঁটি পুরুষালি স্বরে, যারা কোনো মেয়েকে পটানোর আগে অযথাই এদিক-সেদিকের কথা বলে থাকে, কাঁপতে কাঁপতে কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে তার হাত ধরে বলল, ‘এই থালায় কী আছে?’
চুমকি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই তার সাহস বাড়িয়ে দিল, ‘আপনার জন্য মিষ্টি নিয়ে এসেছি, রাত জাগার অনুষ্ঠানে ছিলেন না?’ সে তাকে তলোয়ার ছাড়াই পুরোপুরি ঘায়েল করে বলল, ‘মিষ্টি মুখ করার জন্য এনেছি।’ এ বলে মুচকি হাসল।
‘আমরা মিষ্টিটিষ্টি দিয়ে মুখ মিঠা করার পক্ষপাতী নই। আমরা তো…হ্যাঁ…সে ঠোঁটের সুধা পান করে মুখ মিঠা করার জন্য নিজের ঠোট জোড়া এগিয়ে দিল। চুমকি তখন তার বাহুবন্দি হয়ে ধরা দিল, তার পবিত্রতা লুণ্ঠন করতে, নিজে বিলীন হতে এবং তাকে সর্বস্বান্ত করতে।
বিয়ের পর বিদায় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন জমিদার বাড়ির রীতি অনুযায়ী শাহজাদি পাশা যখন তার বাসর রাতে ব্যবহৃত জোড়াটি খেলার সখি, দায়মার মেয়েকে দিতে গেল, তখন চুমকি মুচকি হেসে বলল, পাশা…আমি…আমি…সারাজীবন আপনার ব্যবহৃত পোশাক পরে এসেছি, কিন্তু এখন থেকে আপনিও…
এরপর পাগলের মতো হাসতে লাগল, আমার ব্যবহৃত জিনিস এখন জীবনভর আপনিও…তার হাসি আর থামছিলই না। সবাই এটাই ভেবে নিল, শৈশব থেকে একসাথে খেলা বান্ধবীর বিচ্ছেদের শোকে চুমকি সাময়িকভাবে পাগল হয়ে গেছে।