কানা দাজ্জাল

মূল : ইনতেজার হুসেইন

মহসিন ​টেলিফোন রেখে দিয়ে বারান্দা থেকে উঠোনে নামল। আব্বাজানের মোড়ার সামনে পড়ে থাকা চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।

হুকোয় সুখটান দিতে দিতে আব্বাজান তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাবা, কিছু জানতে পারলে?’

‘না আব্বাজান, ঘটনার মোড় কোনদিকে ঘুরছে এখনো ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দুই রকম খবরই পাওয়া যাচ্ছে।’

সামনে টেবিলে রাখা টেলিফোনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়ল সে। কী একটা ভাবতে ভাবতে সুইচ ঘোরাতে লাগল। তারপর রেডিও বন্ধ করে দিয়ে বলল, ‘বারোটা বাজলেই সব খোলাসা হয়ে যাবে… আচ্ছা আব্বাজান, আপনি তো আরবি বোঝেন, তাই না?’

‘বেটা, এই শহরগুলোতে আমি প্রচুর সফর করেছি। আরবি বুঝব না মানে?’

হুকোর লম্বা নলটি একপাশে সরিয়ে রেখে আব্বাজান বলতে লাগলেন, ‘ওটা ছিল দুনিয়ার সফরের শেষ মঞ্জিল।’

‘জি আব্বাজান?’ মহসিনের দৃষ্টিতে বৃহদাকার প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

আব্বাজান খানিক ভেবে বললেন, ‘যখন আমাদের হুজুর সা. মেরাজের জন্য তাশরিফ নিয়ে যাচ্ছিলেন…’

আম্মাজান পালঙ্কে বসে সুপারি কাটছিলেন, হঠাৎ তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। হাত থেকে সরতা থালায় রাখলেন। একমুঠ আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন। আব্বাজানের চোখও ছলছল করে উঠল। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘের মতো ভারী কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, ‘হুজুর সা. পাহাড়, সমুদ্র আর মরুভূমি পেরিয়ে মসজিদে আকসায় গিয়ে অবস্থান করলেন। হযরত জিবরাইল আ. আরজ করলেন, ‘হযরত, এবার সামনে চলুন!’ 

নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায়?’

তিনি বললেন, ‘হুজুর, জমিনের সফর শেষ। এটিই ছিল শেষ সীমানা। এখন আপনার সামনে সমাগত ঊর্ধ্বজগতের সফর।’

নবীজি ঊর্ধ্বে আরোহণ করলেন। প্রথম আসমান, দ্বিতীয় আসমান, তৃতীয় আসমান পেরিয়ে… সেখানে হযরত ঈসা আ.-এর সাথে মুসাফাহা করলেন নবীজি। তারপর আরও উপরে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত আরশে মুয়াল্লার এতটা কাছে পৌঁছালেন, যা মাত্র ধনুকের দুই প্রান্ত সমান দূরত্বে ছিল।’

​আব্বাজান চুপ হয়ে গেলেন। হুকোর নলটি আবার মুখে নিলেন। আম্মাজান তখনো কেঁদে চলেছেন। তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে চুপ হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই বলতে শুরু করলেন, ‘ত্রিপোলিতে যুদ্ধ চলছিল তখন। এখনের মতোই সময়টা ছিল গ্রীষ্মকাল।’

মহসিনের দিকে একনজর তাকিয়ে বললেন, ‘বেটা, এ তোমার জন্মেরও আগের কথা। তখন আমার গর্ভের তিনমাস চলে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার প্রতি বড় রহম করেছিলেন—শাশুড়ি আম্মা আমার জন্য সোনার বালা বানিয়ে দিলেন। তখনই ত্রিপোলিতে লড়াই শুরু হলো। সব মুসলমান দলবেঁধে বেরিয়ে এলো। জাফর আলী মৌলভি এলেন, খেলাফত আন্দোলনের লোকেরা এলেন। তাঁরা বললেন, ‘মা-বোনেরা, মুসলমানদের ওপর বড় কঠিন সময় নেমে এসেছে, আপনারা নিজেদের অলঙ্কারাদি দান করুন।’

‘কাঁদতে কাঁদতে নিজের বালাজোড়া খুলে মৌলভি সাহেবের হাতে দিয়ে দিলাম এবং এরপর মাসের পর মাস আমি মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে থাকতাম।’

​আম্মাজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিনশেষে টুপ করে রাত্রি নামার মতো করে চুপ হয়ে গেলেন। আব্বাজানের দিকে তাকালেন, নিঃশব্দে হুকো টেনে যাচ্ছিলেন তিনি।

মহসিনের মনে হলো, আম্মাজান এখন শান্ত হয়েছেন। হয়তো আর কোনো কথা বলবেন না তিনি। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণ করে আম্মাজান আবার বলা শুরু করলেন, ‘আল্লাহর রাসুলের নামে কত বরকত! পরের বছর ঠিক গ্রীষ্মকালেই তোমার বাপজানের চাকরি হয়ে গেল। আমি আগের চেয়েও ভারি আর মোটা বালা বানিয়ে নিলাম।’ নিজের কবজির দিকে ইশারা করলেন, ‘এই তো সেগুলো, এখনো আছে।’

তারপর তিনি সরতা হাতে নিয়ে সুপারি কাটতে লাগলেন। ‘বাবা, জাফর আলী মৌলভি এখন কোথায় থাকেন?’

‘আম্মাজান! তিনি তো ইন্তেকাল করেছেন।’

‘আর খেলাফত আন্দোলনের সেই মৌলভি?’

‘তিনিও আল্লাহর জিম্মায় চলে গেছেন আম্মা।’

‘আচ্ছা! সেজন্যই তো বলি, এখন আর এয়ানত নিতে আসেন না কেন।’

​আব্বাজান বুকভরা শ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, ‘কিছু কবর তো আমরা হিন্দুস্তানেই ফেলে এসেছি। একটি কবর এদিকে ছিল… সেও আর নেই… মহসিন, তুমি কি ‘রইসুল আহরার’কে দেখেছিলে?’

‘রইসুল আহরার?’ গভীর চিন্তায় পড়ে গেল মহসিন।

‘জি না আব্বাজান।’

‘তুমি দেখবেই বা কোথায়, সে মুরুব্বিরাও তো ওখানেই দাফন হয়ে আছেন।’

আরেক দফা ভেবে আব্বাজান বলতে লাগলেন, ‘জানি না কারা কারা সেখানে দাফন হয়ে আছে। আজব এক জনপদ সেটি। আমি যখন সেখানে যেতাম, অদ্ভুত শান্তি পেতাম, মনে হতো যেন আমি আম্বিয়া কেরামদের মজমায়… তারপর আমি মদিনা মুনাওয়ারায় গেলাম। সুবহানআল্লাহ! সুবহানআল্লাহ! কী প্রশান্তির এক মাকাম!’

​মহসিন একবার আব্বাজানের দিকে তাকাল, তারপর আম্মাজানের দিকে। দুজনের চোখেই অশ্রু টলমল করছে। আব্বাজান বলতে লাগলেন, ‘গম্বুজে খজরার কবুতরগুলো… সব সাদা কবুতর। সাদা বোরাকের মতো। কোনোটিই বিষ্ঠা ত্যাগ করে না। আল্লাহু আকবর! পাখিরা পর্যন্ত এত সম্মান করে।’

মহসিন কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘তাহলে আব্বাজান, ওরা বিষ্ঠা ত্যাগ করে কোথায়?’

‘করেই না’

​‘করেই না? এ কেমন কথা?’ মহসিনের মনে কেমন দোলাচল জাগল। সে আবার প্রশ্ন করল, ‘আচ্ছা তাহলে অতশত কবুতর সেখানে বসে থাকে কেন?’

‘কেন বসে? বেটা তুমি জানো না কেন বসে? দুনিয়া ফিতনার আবাস, শয়তানের ঘর। সবদিকে শয়তান, শুধু এটিই নিরাপদ জায়গা।’

আম্মাজান সুপারি কাটার সরতা রেখে দিয়ে বলতে লাগলেন, ‘গম্বুজ শরিফকে কখনও খালি দেখেছ কি?’

আব্বাজান বললেন, ‘পুরো স্বপ্নটা বর্ণনা করো!’

আম্মাজান এমনভাবে বলতে লাগলেন যেন তিনি মনে করার চেষ্টা করছেন, ‘পুরো স্বপ্ন তো আমার মনে নেই, তবে কোনো কোনো কথা মনে আছে। যেমন আমি তোমাদের সাথে জিয়ারতের জন্য গিয়েছি, চারদিকে মানুষের ঢল নেমেছে আর সাদা সাদা কবুতরগুলো মসজিদে নববির উঠোনে আর গম্বুজ শরিফের দেয়ালে বসে আছে। তারপর জানি না কী হলো, আর কিছু মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে যে আমি একা দাঁড়িয়ে বলছি, কবুতরগুলো কোথায় গেল? একটি কবুতরও নেই, উঠোনেও নেই, গম্বুজ শরিফের দেয়ালেও নেই। গম্বুজ শরিফ একদম খালি পড়ে আছে আর আমি হন্যে হয়ে তোমাদের খুঁজছি। এমন সময় আমার ঘুম ভেঙে গেল।’

​আম্মাজান কথা বলতে বলতে চুপ হয়ে গেলেন। আব্বাজান হুকোর নলটি টানলেন। কলকির তামাকের টিকেগুলো চিমটি দিয়ে একটু খুঁচিয়ে দিয়ে নল মুখে নিলেন এবং হুকো টানতে টানতে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন। মনে হচ্ছিল আব্বাজান এখন একদম চুপ হয়ে গেছেন এবং আর কিছুই বলবেন না, কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি হুকো টানতে টানতেই বললেন, ‘বেটা, এ কি সত্যি যে সেই জেনারেলের একটি চোখ নেই?’

‘জি, এ কথা সত্য।’

‘আর এটাও কি সত্য যে সে সেই চোখের ওপর সবসময় একটি পর্দা দিয়ে রাখে?’

‘জি।’

আব্বাজান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘এসবই দাজ্জালের লক্ষণ।’

আম্মাজান আঁতকে উঠলেন, ‘খোদা না করুক, এমন কথা মুখ দিয়ে বের করো না।’

‘আমি কী করব, সারা দুনিয়ার মানুষের মুখেই তো একই কথা। লক্ষণ তো সেগুলোই।’

‘আরে, ওসব আলামত তো তখনকার যখন কিয়ামত ঘনিয়ে আসবে।’

‘মহসিনের মা! আব্বাজান হুকোর নল একপাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত বেদনাহত কণ্ঠে বললেন, ‘কিয়ামত আসতে আর বাকিই বা কী আছে বলো?’

আব্বাজানের এই বাক্যের প্রভাব এমন হলো যে আম্মাজান আবার কাঁদতে শুরু করলেন। তারপর তিনি চোখ মুছে মহসিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মহসিন, দাদিমার কথা মনে আছে কিছু?’

‘ভালো করেই মনে আছে।’

​‘যখন গলি দিয়ে হিন্দুদের কোনো শোভাযাত্রা বা বিয়ের বরযাত্রী যেত, তখন আম্মাজান চিৎকার করে বলতেন, ‘যেও না। দাজ্জালের সওয়ারি যাচ্ছে।’ 

‘আরে আম্মাজান, এ তো হিন্দুদের বরযাত্রী।’

‘বউমা, দাজ্জাল একদিন এভাবেই আসবে। সাথে ঢোল-তবলা বাজবে আর সে নিজে গাধার পিঠে চড়ে থাকবে। বাজনার শব্দ শুনে মানুষ এমন পাগল হবে যে তার পেছনে পেছনে দৌড়াতে শুরু করবে।’

‘আম্মা, এর মধ্যে পাগলামির কী আছে? কোথায় বাজনা আর কোথায় উন্মাদনা?’

‘বউমা, সাজসজ্জা অনেক বেশি মোহনীয় হবে। সেই বছর দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। এমন দুর্ভিক্ষ হবে যে মানুষজন হাহাকার করবে আর দাজ্জালের গাধার পেছনে পেছনে মণকে মণ রুটি বোঝাই থাকবে। রুটি বের করার সময় সে নিজের কান থেকে ময়লা বের করবে, আর মানুষ ভাববে যে ওটা বুঝি হালুয়া। সেই হালুয়া আর রুটির লোভে মানুষ তার পেছনে ছুটবে।’

​শুনতে শুনতে মহসিন ফিক করে হেসে ফেলল। আম্মাজান তার এই হাসিকে ভালোভাবে নিলেন না। ‘বেটা, আমি কি ঠাট্টা করছি? আমার কথা তো তুমি সবসময় হেসেই উড়িয়ে দাও। আর এইটা তো তোমার দাদি বলতেন। তিনি কবরে শুয়েও হয়তো ভাবছেন যে নাতিটি কত বড় অভাগা যে মরা দাদির কথায় হাসছে।’

সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, ‘না আম্মাজান, আমি হাসছি একারণে যে মানুষ কানের ময়লাকে হালুয়া মনে করবে। বিষয়টা ভারি অদ্ভুত ঠেকল আমার কাছে।’

আব্বাজান এতক্ষণ একটানা হুকো টানছিলেন। মহসিনের কথা শুনে তিনি নলটি পাশে রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘বেটা, তোমাদের মতো নতুন প্রজন্মের কাছে এটা হাসির খোরাক হতে পারে কিন্তু এগুলোর গভীরে লুকিয়ে আছে উপদেশ। আমাদের রাসুল সা. এবং ইমামগণ সব আগে থেকেই বলে গেছেন যে সামনে কী হতে চলেছে। আমি এটা ভেবে অবাক হই যে ক’দিন আগ পর্যন্ত রুটি কত সস্তা ছিল আর এখন রিজিক কতটা সংকীর্ণ হয়ে গেছে… মহসিনের মা, তোমার কি মনে আছে যখন আব্বাজান জীবিত ছিলেন তখন গমের দাম কত ছিল?’

আম্মাজান তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘হ্যাঁ মনে আছে। আব্বাজান মাসের এক তারিখে আড়াই টাকা নিয়ে মান্ডিতে যেতেন এবং কুলি দিয়ে গমের বস্তা মাথায় করে নিয়ে আসতেন।’

আব্বাজান ফের বললেন, ‘বেটা, এই তো সেদিনকার কথা। এখন আড়াই টাকায় এক চিমটি গমও পাওয়া যায় না। খোদা যেন মিথ্যে না বলায়, আমার তো তাই মনে হয়। এখন যখন আমেরিকা থেকে গম আসা শুরু হয়েছে, আমাদের ওপর বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। আমেরিকা আমাদের গম দেয় না, যা দেয় তা হলো তার কানের ময়লা।’

আব্বাজানের কণ্ঠে কিছুটা তিক্ততা চলে এসেছিল। ‘দাজ্জালের কানের ময়লা’-এর সাথে আব্বাজানের এই তুলনা কিছুটা বেমানান ঠেকলেও তিনি সেসময় বেশ উত্তেজিত ছিলেন বলে পাশ কেটে গেল মহসিন। হঠাৎ আব্বাজনের কণ্ঠে করুণ সুর ফুটে উঠল, ‘মুসলমানরা ঘোর বিপদে আছে রে বেটা।’ কিছুক্ষণ নিরব থেকে আবার বলা শুরু করলেন, ‘রেওয়ায়েতে এসেছে, দাজ্জাল যখন আসবে তখন মুসলমানদের চুনচুন করে বেছে বেছে হত্যা করবে। সবশেষে মাত্র তিনশ তেরোজন মুসলমান বাকি থাকবে।’

‘মাত্র তিনশ তেরোজন?’ মহসিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‘হ্যাঁ, মাত্র তিনশ তেরোজন। অনেকেই মারা যাবে, আবার অনেকেই দাজ্জালের গাধার পেছনে দৌড়াবে। শুধু তিনশ তেরোজনই টিকে থাকবে।’

আব্বাজান আবার একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘খোদা মুসলমানদের ওপর রহম করুন!’ তিনি আবারও হুকো টানতে লাগলেন। মহসিন খেয়াল করে দেখল আব্বাজান চোখ বুজে আছেন। সে চেয়ার থেকে উঠে ধীরপায়ে বারান্দার দিকে পা বাড়াল। আম্মাজান পেছন থেকে ডাকলেন, ‘বেটা, সংবাদপত্র অফিসে একবার টেলিফোন করো না!’

সে টেলিফোনের ডায়াল ঘোরাল। হ্যালো—আড়াই থেকে তিন মিনিট কথা হলো। তারপর ফিরে এসে চেয়ার টেনে বসল। আব্বাজান গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোনো খবর পেলে?’

‘যুদ্ধবিরতি হয়ে গেছে।’

‘মুসলমানরা কি অস্ত্র ফেলে দিয়েছে?’

‘জি, এমনই মনে হচ্ছে।’

আব্বাজানের মাথা ঝুঁকে পড়ল। তিনি নিচু হয়ে একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘যেখানে আমাদের হুজুর সা. বিজয়ী হয়েছিলেন, সেখানে আমরা পরাজিত হলাম।’

এরপর তিনি একদম চুপসে গেলেন। কলকি থেকে তামাকের টিকেগুলো সরিয়ে আলাদা রাখলেন এবং নিজের বিছানা ঠিকঠাক করে টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন।

আম্মাজান সমানতালে সরতা দিয়ে সুপারি কাটছেন। অবাক করার বিষয় ছিল, তিনি কাঁদলেন না এবং একটা কথাও বললেন না। এরপর তিনি সরতা থালায় রেখে সুপারির পাত্রটি আটকে ফেললেন। জায়নামাজটি ভাঁজ করে একপাশে রাখলেন। উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাতমুখ ধুলেন, কিছু দোয়া পড়ে ফুঁ দিলেন এবং তিনবার তালি বাজালেন। তারপর নিজের বিছানায় গিয়ে একপাশ হয়ে শুয়ে পড়লেন।

​মহসিনের চোখে ঘুম ছিল না। সে এমনভাবে বসে ছিল যেন একগাদা স্তূপ, একটু আলগা করলেই এলোমেলো ছড়িয়ে পড়বে। সামনে টেবিলে রাখা রেডিওর সুইচ ঘোরাতে লাগল। একটার পর একটা পরিবর্তন করছিল। কোনোটাই ঠিকমতো ধরছিল না, শুধু শাঁ শাঁ আওয়াজ আসছিল। সে না বুঝেই সুইচ ঘোরাচ্ছিল। সম্ভবত কোনো বিশেষ রেডিওস্টেশন তার লক্ষ্য ছিল না, শুধু হাত ঘুরিয়ে যাচ্ছিল যাতে তার বিরক্তি কাটে। রেডিও বন্ধ করে সে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

কিছুতেই তার চোখে ঘুম আসছিল না। সে কয়েকবার চোখ বন্ধ করল। চোখ বন্ধ করতেই ভয়ংকর সব দৃশ্য সামনে আসতে লাগল। চোখ খুলে তারাঘেরা বিশাল আসমানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারাভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো যেন একটা অপ্রশস্ত মিহিপথ বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে এবং সেই পথের ধুলোয় তারাগুলো পিষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এই ছায়াপথ এবং ছায়াপথের কল্পনা থেকে তার দাদিমার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলতেন, ‘এগুলো আমাদের হুজুর সা.-এর ঘোড়ার খুরের ধুলো।’

‘আসমানে কি ঘোড়া গিয়েছিল?’ মহসিনের ছিল একগাদা সরল প্রশ্ন।

‘হ্যাঁ বেটা, মেরাজ শরিফ তো হয়েছিল সাত আসমানের ওপরে। হুজুর সা. ঘোড়ায় চড়েই আসমানগুলো পার হয়েছিলেন…’

‘যেখান থেকে আমাদের হুজুর সা. আরোহণ করেছিলেন সেখানে আমরা পরাজিত হয়েছি।’ এবার আব্বাজানের এই বাক্যটি মনে পড়ে গেল। তারপর সে দাদিমাকে ভুলে আব্বাজানের কথাগুলো একে একে মনে করতে লাগল। দাজ্জালের কান, কানের ময়লা, গাধা, আমেরিকা, গম। আব্বাজান কেমন অদ্ভুতভাবে সব গুলিয়ে ফেলেন। কোথায় কোথাকার সূত্র মেলান, ঠিকঠিকানা নেই। কথা হয় বর্তমান সময়ের আর তিনি সেটাকে অতীতের কোনো সময়ের সাথে নিয়ে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। অবশ্য এই অনুভূতির মাঝে আব্বাজানের ছায়া তার ওপরও ঘুরপাক খাচ্ছিল এবং অতীত-বর্তমান তার কল্পনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

​অতীত আর বর্তমানকে সে অনেক কষ্টে আলাদা করল এবং সিদ্ধান্ত নিল যে, এই যুদ্ধ বর্তমান সময়ের যুদ্ধ, বাস্তবের যুদ্ধ। আমি আম্বিয়া কেরামদের মাঝে নই, বরং আজকের মানুষের মাঝে শ্বাস নিচ্ছি। আমি বর্তমান সময়ে বাস করছি। আব্বাজান আর আম্মাজান অতীতে বাস করছেন। কানা দাজ্জাল—আসলে সেই অতীতের এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ, যে ভবিষ্যতে আব্বাজান আর আম্মাজান বাস করছেন। তাহলে আমার সময়ের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নটি বেশ জটিল। তবে সে স্থির করল যেহেতু বর্তমান সময়টাই গোলমেলে হয়ে আছে, তাই ভবিষ্যতও গোলমেলে হওয়াটা স্বাভাবিক। অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এটুকু ভাবার পর সে অনুভব করল যে রাত বেশ গড়িয়েছে। এখন তার ঘুমিয়ে পড়া উচিত এবং সে তার চোখ দুটো বুজে নিল।

​চোখ বন্ধ করে সে অনেকক্ষণ শুয়ে রইল এবং তার মনে হতে লাগল, সে এবার ঘুমাচ্ছে। আব্বাজান ধীরে করে খাঁকারি দিয়ে গলা পরিষ্কার করলেন। তারপর সজোরে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মহসিন অবাক হয়ে ভাবল, আব্বাজান কি তবে এখনও ঘুমাননি? শোয়ার পর থেকেই হয়তো তিনি এভাবেই শুয়ে আছেন। আর আম্মাজান? সে অনুভব করল, তিনি বারবার পাশ ফিরছেন। কথা আর স্মৃতিগুলো তার কল্পনায় আবার খইয়ের মতো ফুটে উঠল। আব্বাজান আজব সব কথা বলেন। কোথায় কীসের সূত্র যে মেলান! কানের ময়লা, কানা দাজ্জাল, গাধা, গম, আমেরিকা। তার কল্পনায় অতীত আর বর্তমান আবার এক হয়ে যেতে লাগল।

মহসিন, তোর কি দাদিমার কথা মনে আছে?—মায়ের এই কথাটুকু আবার মনে পড়ল এবং সে অবাক হয়ে ভাবল, কত বছর কেটে গেছে! কিন্তু দাদিমা, দাদুজান আর নিজের শৈশব—সবকিছুই মনে আছে। প্রতিটি কথা মনে আছে। হিন্দুদের বিয়েতে বরযাত্রী আসার সময় সেই দিনগুলোতে কতই না হট্টগোল হত। ওদিক থেকে ঢোল-তবলার আওয়াজ এলো আর সে সেটা শুনে দৌড়ে গেল এবং দাদিমা ঘাবড়ে গিয়ে তাকে ধরলেন এবং দরজা বন্ধ করে দিলেন। ‘ওরে হতভাগা, মরতে যাস না। ওটা তো দাজ্জালের লস্কর!’

সফেদ দাড়ি এবং ভারী শরীরের সেই মানুষটিকে মহসিনের দাদুজান চকির ওপর নিজের কাছে বসিয়েছিলেন। তারপর দাজ্জালের প্রতিটি লক্ষণের বর্ণনা দিয়ে তাকে বুঝিয়েছিলেন, ‘আর তারপর আমাদের ইমাম…’

এটুকু বলেই তিনি তাঁর মাথা নিচু করলেন। দাদিজান ঝুঁকে ​পড়ে সালাম করলেন এবং অবস্থা এমন হলো যে তিনি কুঁকড়ে গেলেন।

‘তাহলে কি আপনি আবারও আত্মপ্রকাশ করবেন?’ দামিমা বললেন সেই আধ্যাত্মিক পুরুষকে।

তখন তাঁর চোখে জল এসে গেল, ‘হকের দাওয়াত দিলেও মুসলমানরা হকের সাক্ষ্য দেবে না। মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন লোক হবে। রেওয়ায়েতে এসেছে যে তারা হবে মাত্র তিনশ তেরোজন।’

​দাদিমা বললেন, ‘দুনিয়ায় না লাখো-কোটি মুসলমান! তারা কি ইমামের আওয়াজ শুনবে না?’

‘সবাই শুনবে। তাঁর আওয়াজ পুরো দুনিয়ায় শোনা যাবে। কিন্তু মুসলমানরা তখন থাকবে কোথায়? বেশিরভাগ তো শহীদ হয়ে যাবে। অনেকে দাজ্জালের গাধার পেছনে ছুটবে। শুধু সেই তিনশ তেরোজনই থাকবে যারা হকের সাক্ষ্য দেবে। শুধু তাদের নিয়েই তিনি এগিয়ে যাবেন।’

সে পাশ ফিরল এবং ঠাহর করার কোশেশ করল, আমি কি অতীতে নাকি ভবিষ্যতে? বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ, ঘুম, নির্ঘুম, স্বপ্ন—সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। সে জেগেও ছিল আবার ঘুমাচ্ছিলও। অথবা সে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছিল। তিনশ তেরোজন—এ কি আমাদের অতীত নাকি ভবিষ্যৎ? যা শুরু হয়েছিল তা কি শেষও এভাবেই হবে? যেখানে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম সেখানেই কি এখন পরাজিত হচ্ছি? কানা দাজ্জাল, ঢোল-তবলা, কানের ময়লা, গাধা, আমেরিকার গম—আমি কি বর্তমানে আছি নাকি অতীতে? সে এভাবেই ভাবছিল। যখন সে চোখ খুলল তখন সে ভাবল, আমি কি ঘুমাচ্ছিলাম? সে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশের আলো এবার ফিকে হয়ে আসছে। তারাও অনেক কমে গেছে। তবে কিছু তারা এখনও সেখানেই আছে যেখানে ছিল। আর সেই ছায়াপথ যার ওপর নক্ষত্রের ধুলোবালি ছড়ানো ছিল। সে ভাবল, ছায়াপথ হয়তো রাতে আলোকোজ্জ্বল থাকে আর সকাল হতে হতে নিভে যায়। তবে কি আযান হয়ে গেছে? সে বুঝতে পারল না আযান হয়েছে কি না। কিন্তু দূর থেকে কোনো এক বাড়ির মোরগের ডাক শোনা গেল। সে পাশ ফিরতেই দেখল আব্বাজান জায়নামাজ বিছিয়ে সেজদায় পড়ে আছেন। আম্মাজানের পালঙ্ক খালি পড়ে আছে এবং তিনি জায়নামাজ বিছিয়ে হাতে তসবিহ নিয়ে চোখ বুজে বসে আছেন।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments