গহীনে গরল

ফাহ্‌মিদা বারী

তাহের আলীর ছেলে মন্টু স্কুল থেকে ফেরার মুখেই চাচাকে দেখতে পেল। ক্ষেতের আল ধরে স্কুল থেকে ফেরে সে। রেলস্টেশন সামনেই পড়ে।

মন্টু দেখল তার চাচা জহির ট্রেন থেকে নেমে হাতের ব্যাগটা কুলির মাথায় তুলে দিচ্ছে। হাতে ইয়াব্বড় একটা মিষ্টির প্যাকেট। সেটা নিজের হাতে নিয়ে কুলির পেছনে পেছন চাচা বাড়ির দিকে যাচ্ছে। 

মন্টু খুশিতে তিন পাক নেচে হাতের বই খাতা ফেলেই চাচার দিকে ছুট দিল। চাচা যখন বাড়িতে আসে, মন্টু তার পিছে পিছে ঘোরে। শহরের গল্প শোনে। গল্পপাগল মন্টুর কাছে মনে হয়, তার চাচার মতো গল্প এই পুরো গ্রামে আর কেউ করতে পারে না।

জহির এবারে এমএ পাশ করে বাড়িতে আসছে। ভাইয়ের এই বিরাট সাফল্যে বড় ভাই তাহের আলী গাঁয়ের সবাইকে জিয়াফতের দাওয়াত দিয়েছে। কিন্তু সেই দাওয়াত আরো সাত দিন পরে। জহির ফোনে জানিয়েছে তার ফিরতে আরো পাঁচ ছয়দিন লাগবে। সেই হিসাব করেই তার বড় ভাই জিয়াফতের দিনক্ষণ পাকা করেছে। এখন হুট করে আগেভাগেই চাচাকে বাড়ি ফিরতে দেখে খুশিতে দিশা হারিয়ে ফেলেছে মন্টু।

তাহের আলী এই গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। অনেক সয়সম্পত্তি-জমাজমির মালিক সে। তার বাবা সিকান্দার আলী প্রায় একার পরিশ্রমেই এই বিশাল সম্পত্তি করে গিয়েছেন। বড় ছেলে তাহের ছোটবেলা থেকেই মজবুত পেটানো শরীরের অধিকারী। প্রচুর পরিশ্রম করতে পারে। বাবার সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজে হাত দিয়েছে। কিন্তু পড়ালেখা তাকে দিয়ে হয়নি। সিকান্দার আলী অভাবের সংসারেও ছেলেকে কৃষিকাজ করতে দিতেন না। জোর করে স্কুলে পাঠাতেন। কিন্তু পড়ালেখার সাথে যার জন্ম-জন্মান্তরের আড়ি, তাকে জোর করে পাঠালেই কী না পাঠালেই কী! শেষমেশ সিকান্দার আলী বুঝেছিলেন, এই ছেলেকে সময় থাকতেই জমিজিরাতের কাজে লাগিয়ে দিলেই ভালো। করে কর্মে খেতে পারবে। শুধু শিক্ষার আলো ঘরে ঢোকাতে পারেননি বলে অনেকদিন আফসোস ছিল মনে।

সেই আফসোস ঘুচেছে ছোট ছেলে জহিরকে দিয়ে। জহির বরাবরই গ্রামের স্কুলে প্রথম হত। গ্রাম থেকে স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করে সে শহরের কলেজে পড়তে গিয়েছে। সেখান থেকে এমএ পাশ করে আজ সে তার বাবার মনের সুপ্ত ইচ্ছা পূর্ণ করেছে। শুধু এই দিনটি দেখে যাওয়া সিকান্দার আলীর ভাগ্যে ছিল না।

জহির ছোট থাকতেই তাদের মা মারা গিয়েছিল। কলেজে যাওয়ার আগেই বাবাও সেই পথে যাত্রা করেছিল। বড় ভাই তাহের আর তাহেরের স্ত্রী হামিদা নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ আর মমতায় জহিরকে বড় করে তুলেছে। হামিদার নিজের সন্তান মন্টু আসার আগে জহিরকেই সে নিজের সন্তানের মতো মনে করত।

দূর থেকে ভাস্তেকে নাচতে নাচতে দৌড়ে আসতে দেখে জহির হা হা করে হেসে উঠল। জোরে চেঁচিয়ে বলল, ‘ঐ ছ্যাড়া আস্তে আয়! পড়বি তো!’

মন্টুও সমান বেগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওহ চাচা, তুমি যে আগেই চইলা আইছ!’

‘হ রে পাগলা, আইলাম! ক্যান তুই খুশি হস নাই?’

মন্টুর মুখচোখ উদ্ভাসিত। সে অনেকটা কাছে চলে এসেছে এখন। খুশিতে বত্রিশ পাটি বের করে বলল, ‘হইছি না আবার! তুমি এইবার ম্যালাদিন থাকবা তো?’

‘না রে! বেশিদিন থাকন যাইব না। কাজকামের বন্দোবস্ত করতে হইব না? দেখি আমার মতন ল্যাংড়ারে কেউ কাম দেয় কী না!’ বলেই স্ট্রেচারে হেলান দেওয়া নিজের দুর্বল পঙ্গুক্লিষ্ট পায়ের দিকে তাকাল জহির। ভাস্তে মন্টুও দুঃখী দুঃখী চোখে চাচার পায়ের দিকে একবার তাকাল। তার সবগুণে গুণান্বিত চাচার এই একটাই ঘাটতি। একটি পা ছোটবেলা থেকেই পঙ্গুত্বের শিকার, এটার জন্য সে নিজেও কম দুঃখিত নয়।

জন্মের পর থেকেই জহির দুর্বল। একেবারে ছোট বয়সেই পোলিওতে আক্রান্ত হয়। সেই অসুখে তার এক পা পঙ্গু হয়ে যায়। সিকান্দার আলী ধরেই নিয়েছিলেন, তার এই ছোট সন্তান বুঝি বাঁচবে না। ভারি কোনো কাজ করা তো দূর, সামান্য শারীরিক পরিশ্রমেই সে হাঁপিয়ে উঠত। তার ওপরে অল্প বয়সে মায়ের মৃত্যুর প্রভাব তার ওপরেই বেশি পড়েছিল।

কৃষিকাজ যে তাকে দিয়ে হবে না, এটা সিকান্দার আলী জানতেন। স্কুলে পাঠাতেও ভরসা হতো না। কিন্তু পাঁচ ছয় বছর বয়স হতে না হতেই জহির স্কুলে যাওয়ার জন্য আবদার শুরু করে। তিনি ভেবেছিলেন, হয়ত ছোট মানুষ একটু আধটু শখ হয়েছে। কিন্তু জহিরকে স্কুলে পাঠানোর পরে সিকান্দার আলীর বিস্ময়ের সীমা থাকে না। দুর্বল শরীরের মস্তিষ্কে যে এত মেধা লুকিয়ে আছে, এটা তাকে আনন্দে অধীর করে তোলে।

ক্লাস টু পড়ুয়া মন্টু নিজের ছোট্ট হাতটা চাচার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘চাচা, আমারে ধরবা?’

‘ক্যা রে? তর চাচা কি দুইদিন শহরে থাইকাই গেরামে হাঁটাহাঁটি করতে ভুইলা গ্যাছে নাকি?’

মন্টু নিজের অযাচিত মাতব্বরিতে লজ্জা পায়। কিন্তু দ্রুত সেটাকে ঢাকা দিয়ে বলে, ‘তুমার মিষ্টির প্যাকেটটা আমার হাতে দেও তাইলে!’

জহির আর আপত্তি করে না। হাসিমুখে ভাস্তের হাতে ‘বিক্রমপুরের মিষ্টি’র প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘ঐ ছ্যাড়া, তুই না ইস্কুল থেইকা আইতাছিলি! তর বই খাতা কই?’

মন্টু জিভ কেটে চোখ গোল গোল করে ফেলে। চাচা আসার খুশিতে বইখাতার কথা তার মাথাতেই ছিল না। এদিক সেদিকে ছুঁড়ে ফেলে সোজা দৌড় লাগিয়েছিল। এখন ওসব ছাড়া বাড়িতে গেলে মা পিটিয়ে সোজা করে দিবে। মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়েই সে সেগুলো খুঁজতে শুরু করে।

ভাইকে সময়ের কয়েকদিন আগেই আসতে দেখে তাহের আলী আর তার স্ত্রী হামিদাও খুশি হয়ে ওঠে। তাহের আলী ভাইকে দীর্ঘসময় আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখে বলে, ‘কত শুকাইছস! খাওন দাওন করস না ঠিকমত? ম্যালা পড়ছস! এইবার কয়েক মাস বাড়িত থাক। ভালা কইরা খাইয়া দাইয়া যাইস!’

হামিদা বানুও স্বামীর কথায় সায় দিয়ে বলে, ‘হ! এইবার অত তাত্তাড়ি যাইবার দিতাছে কেডা? কিছু কইলেও শুনন যাইব না!’

জহির ভাই-ভাবির স্নেহের জোরে কিছু বলার সুযোগ পায় না। সবে ‘না না ম্যালা কাম আছে…’ বলতে যাচ্ছিল, তাহের আলী জোর গলায় বলে ওঠে, ‘পরে শুনুম তর ম্যালা কামের গল্প! চ এইবার কিছু খাইবি। ভালা দিনে আইছস! তর ভাবি আইজ হাঁসের মাংস রান্না করছে!’

ভাইয়ের পাশ করার খুশিতে সাতদিন পরে দেওয়া জিয়াফতের তারিখ আগানো হয় না। আয়োজন সাত দিন পরেই হবে। পুরো গ্রামের মানুষকে খাওয়াবে তাহের আলী। প্রস্তুতির একটা ব্যাপারস্যাপার আছে।

গাঁয়ের সবচেয়ে ভালো গরুগুলো কাদের গোয়ালে আছে, তাহের আলী খোঁজ লাগায়। টাটকা শাকসবজি ফলমূলের অভাব নেই গাঁয়ে। এ তো আর শহর না যে, কয়েকদিনের পানি দেওয়া বাসি তরিতরকারি ফলমূল দিয়ে কাজ সারতে হবে! ভালো বাবুর্চির খোঁজেও নামতে হবে। পাশের গাঁয়ের বগা বাবুর্চির খুব নামডাক। তার হাতের রান্না খেয়ে নাকি দশ দিন ধরে লোকে হাত চাটতে থাকে। তবে তার বেজায় চাহিদা। তাকে ভাড়া করে আনার খরচ প্রচুর। কিন্তু সেসব দিকে তাহের আলী ফিরেও তাকায় না। দুইদিনের দুনিয়ায় টাকাপয়সা হাতের ময়লা বৈ তো নয়! তার ভাইয়ের এই বিরাট সাফল্যের কাছে সে সবকিছুকে তুচ্ছ করতে পারে। এই গাঁয়ে এত পড়ালেখা আর কয়জন করেছে? ওর বাবার স্বপ্নকে সত্যি করেছে জহির। এই খুশিতে শুধু নিজের গাঁ কেন, আরো দুই গাঁয়ের মানুষকে খাওয়াতেও সে কার্পণ্য করবে না।

খোঁজ-খবরের জন্য গাঁয়ের কয়েকজন ছেলে-ছোকরাকে কাজে লাগিয়ে দেয় তাহের। সুযোগ মতো গরুর মালিক চড়া দাম হাঁকায়। সবজি বিক্রেতারাও অনেকদিন বাদে মনের সুখে শাকসবজি বিক্রি করে। তাদের গাঁয়ের এত বড় জিয়াফত! এই তো সুযোগ দুই পয়সা কামিয়ে নেওয়ার! সবকিছু আগাম ব্যবস্থা করে রাখা হয়। কাজের সময় যাতে কোনোরকম টানাটানি না পড়ে।

আয়োজনের তোড়জোড় দেখেশুনে জহিরের চোখ কপালে ওঠে। ভীষণ লজ্জা পায় সে। ভাইকে কিছু বলতে পারে না। ভাবির কাছে গিয়ে বলে, ‘ও ভাবি, তুমি কিছু কও না? ভাইজান এইগুলান কী শুরু করছে? লোকে আড়ালে আবডালে হাসতাছে দ্যাখ গা!’

হামিদা বানু দেবরের লজ্জায় লাল্টু হয়ে যাওয়া চেহারা দ্যাখে আর মনে মনে হাসে। মুখে বলে, ‘তর ভাইজানরে কমু, একবারে বিয়ার খাওনডাও খাওয়ায় দিতে! এত লজ্জা পাওন তো ভালা ঠেকতাছে না! হক সাহেব তো মাইয়া দেওনের লাইগা এক পায়ে খাড়া! তর ভাইজানই এইডা সেইডা কইয়া ঘুরায় দেয়। তার নাকি মাইয়া পছন্দ না! তুই আইছস যখন, একবার নিজের চোখে দেইখা আয়। আমার তো হক সাহেবের মাইয়াডারে ভালাই লাগে।’

হঠাৎ করেই জহিরের মুখে আঁধার ঘনায়। এতক্ষণের হাসিখুশি আমেজটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হামিদা বানু অবাক হয়ে ভাবে, বেশি কিছু বলে ফেলল নাকি!

কিন্তু জহিরের পরের কথা শুনে সেই আশংকা দূর হয় তার। জহির থমথমে মুখে বলে, ‘বিয়ার কথা অখনই ভাবতাছি না ভাবি। তয় ভাইজানরে কইও, তার ভাইডাও এমুন কিছু রাজপুত্র না! ল্যাংড়া পোলারে কেউ বিয়া করবার চাইলে সেইডাই ম্যালা কিছু!’

‘চুপ থাক ছেমড়া! এই গেরামে তর মতো বিদ্যাবুদ্ধি কয়জনের আছে? আর মাশাআল্লাহ তুই দ্যাখতেও রাজপুত্রের মতন। দুই একটা খুঁত কার না আছে!’

জহির আর কথা বাড়ায় না। তার যখন মাত্র সাত বছর বয়স, তখন থেকেই হামিদা বানু এই সংসারের কর্ত্রী। নিজের মায়ের কথা এখন আর মনেও পড়ে না জহিরের। সেই জায়গায় সে কবে থেকে ভাবিকে বসিয়ে রেখেছে, নিজেও তা ভুলে গেছে! সেই ভাবি তার কোনো নিন্দামার্গ শুনতে চায় না। তাকে এসব কথা বলে লাভ নেই কোনো। তাদের চোখে সে হয়ত আসলেই রাজপুত্র।

মনে মনে হাসে জহির। হ্যাঁ, ল্যাংড়া রাজপুত্রই বটে!

আব্দুল হক যে তার একমাত্র মেয়ে রুখসানার জামাই হিসেবে মনে মনে জহিরকে আশা করে বসে আছেন, এই খবর কিন্তু ভুল না। আব্দুল হকের বাড়িতে এই নিয়ে নিত্য সভা বসে। তার স্ত্রী নিমরাজি হলেও মেয়ে এই প্রস্তাবের ঘোর বিরোধী। আব্দুল হক তাকে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্লান্ত হয়েছেন, তবু মেয়ে এক চুল নড়তে রাজি হয়নি। এই বিরোধিতার বড় কারণ হচ্ছে, এই গাঁয়েরই আরেক ছেলে সুলতান। সুলতান আর রুখসানার মধ্যে গভীর প্রেম। রুখসানা তার বাবাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, বিয়ে করলে সে সুলতানকেই করবে। আর তা না হলে বিষ খাবে!’

আব্দুল হকের স্ত্রী এই হুমকিতে ভালোই ভয় পেয়েছে। স্বামীকে বলেছে, ‘মাইয়া আমাগো একটাই। তুমি জিদ ধইরা থাকলে কী হইব? শ্যাষম্যাষ মাইয়া যদি সত্যি সত্যি বিষ খায়?’

আব্দুল হক স্ত্রীক বুঝিয়েছেন, ‘অমন পোলা এই গেরামে আর একটা দেখাইবার পারবা তুমি? ঐ সুলতান ওর কাছে কিছুই না! থাকার মধ্যে আছে খালি খোমা! পেটে না আছে বিদ্যাবুদ্ধি, না আছে পকেটে ট্যাকা! ঐ মাকাল ফলের কাছে মাইয়ারে দিলে মাইয়া তুমার এমনিতেও মরব, আমি কইলাম!’

আব্দুল হকের স্ত্রী তবু ভয়ে ভয়ে বলে, ‘কিন্তু জহিরের তো এক পা…’

আব্দুল হক এবারে অধৈর্য হয়ে বলে ওঠেন, ‘দ্যাখো রুখসানার মা, যা জানো না সেইডা নিয়া কথা কইবার যাইও না। জহিরের বাপ আমার ভালা বন্ধু আছিল। আমি সব জানি। বিষয়সম্পত্তি জহিরের বাপে যা দিয়া গ্যাছে, ওর লগে বিয়া দিলে মাইয়া তুমার রাজরাণী হইব।’ 

জহিরের আগমন উপলক্ষ্যে তাই পুরো গ্রাম জিয়াফতের আগাম সুবাসে ম ম করলেও সুলতানের মন ভালো নেই। টগবগে যৌবন তার তাগড়া শরীরে। নিজের চেহারাটা যে যথেষ্ট ভালো, এটা সে ভালোই জানে। শহরের ছেলেদের মতো সকাল-সন্ধ্যা ব্যায়াম করে শরীরের জেল্লা বহাল রাখে সে। উজ্জ্বল গম রঙ্গা দেহে যখন খালি গায়ে নদীতে সাঁতার কাটতে নামে, তরুণী মেয়েরা তখন একে অন্যের গা টিপে হাসাহাসি করে। কেউ কেউ রঙ্গ করে বলে, ‘ও সুলতান ভাই, তুমার শরীরের চামড়া দেখি আমাগো লাগান ঝকমক করতাছে! কুন সাবান লাগাও গায়ে? আমাগো কইবা?’

সুলতান এসব রঙ্গ রসিকতার জবাব দেয় না। সে তখন গায়ে সাবান ঘষতে ব্যস্ত রূপসী তন্বী রুখসানাকে আড়ে আড়ে দেখে। রুখসানাও তখন ব্যস্ততার ভান ধরে চোরা চোখে সুলতানের পেশীবহুল বাহু দেখে, রোমশ বুকের দিকে তাকায়। বুকের মধ্যে শিরশিরে কাঁপন জাগে তার।

দুজনের ভাব ভালোবাসার গল্পটা এখান থেকেই জমে ওঠে।

সেই সুলতান যে কী না এক কোপে কলাগাছ কেটে দু’টুকরা করে ফেলতে পারে, সে দুবলা ঘাসের মতো নড়বড়ে জহিরকে কেন পাত্তা দিবে? ল্যাংড়া জহিরের সাথে রুখসানার বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনে সে হেসেই খুন হয়। হাসতে হাসতে রুখসানাকে বলে, ‘তুমার বাপের কি চোখের মাথা গ্যাছে নাকি তুমি আমার লগে মস্করা করতাছো?’

রুখসানা গম্ভীর মুখে বলে, ‘তুমি হাসতেই থাকো! তুমার চোখের সামনে দিয়াই ঐ জহিরের লগে বাপজান আমার বিয়া দিয়া দিব! তুমি খাড়াইয়া খাড়াইয়া হাসতে থাইকো! এদ্দিন ধইরা কইতাছি বাপজানের কাছে আমারে বিয়ার প্রস্তাব দাও। তুমি কথা কানে লও না!’

সুলতান যে প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেনি তা নয়। কিন্তু রুখসানার বাবা আব্দুল হক গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। পড়াশুনায় ডাব্বা মারা সুলতানকে যে তিনি খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না, এটা সে জানে। সুলতান তাই মনে মনে রুখসানাকে পাওয়ার অন্য রাস্তা খুঁজতে থাকে। ভাগ্য ভালো থাকলে ঘটনা ঘটে যেতে কতক্ষণ!

জিয়াফতের দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। তাহের আলীর ব্যস্ততা বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। সে দুই হাতে জোগাড়যন্ত্র করে সামাল দিতে পারছে না। এদিকে জহির বাড়িতে আসার পর থেকেই বড় ভাইয়ের সাথে জরুরি কথা বলার সুযোগ খুঁজছিল। সেই সুযোগটাই সে পেয়ে উঠছে না।

একদিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরে তাহের আলী উঠানে চেয়ার নিয়ে বসেছে। আজ তার বউয়ের রান্না করা মুড়িঘণ্টটা জব্বর হয়েছে। খাওয়াটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। মুখে একটা পান দিয়ে চিবুতে চিবুতে সে আকাশের দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে ছিল। গরমটা সেই রকম পড়েছে। আষাঢ় মাসের আজ সাত দিন হতে চলল, অথচ বৃষ্টির দেখা নেই। পুরো আকাশ কেমন জানি থম মেরে আছে। একটা গাছের পাতারও নড়াচড়া নেই। আকাশে একটু যেন কালো মেঘের আভাস। মেঘের দল ইতিউতি অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করছে।

চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে চেয়ে থাকে তাহের আলী।

ভাইকে উঠানে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে জহির সেদিকে যায়। তাহের আলী ভাইকে দেখে হাসিমুখে বলে, ‘কী রে ভাই, খাইছস তো ঠিকমতো? তর শরীরটা এইবার বেশি খারাপ হইয়া গ্যাছে। ভালা কইরা খাইয়া দাইয়া মোটাতাজা হইয়া যা!’

জহির একটা মোড়া হাতে নিয়ে এসেছিল। সেটা ভাইয়ের সামনে পেতে বসতে বসতে বলে, ‘তুমি আছ খালি আমার খাওন দাওন লইয়া। এইদিকে আমি মরতাছি আমার জ্বালায়।’

তাহের আলী অবাক গলায় বলে, ‘তার মানে? এইডা কেমন কথা? তর আবার কীসের জ্বালা? শিগগির খুইলা ক দ্যাখি!’

জহির ইতস্তত করে বলে, ‘ভাইজান আমি আগেই ঠিক করছিলাম, পাশ কইরা চাকরিবাকরি করুম না। ব্যবসা করুম।’

‘কীসের ব্যবসা করবি? পারবি করতে? মাইনষে কিন্তু খুব খারাপ। সুযোগ পাইলেই এক্কেরে গু ঠকান ঠকাইয়া দিব!’

‘সেইডা নিয়া তুমি ভাইবো না ভাইজান। আমি লাইনঘাট ঠিক কইরাই রাখছি। আমি আর আমার আরেক বন্ধু মিলা কাপড়ের ব্যবসা করুম। পাইকারি দরে কিনা আইনা বেচুম। গঞ্জে একটা দোকান ঘর ভাড়া নিমু। আমার বন্ধু অর্ধেক মূলধন দিব, আমি দিমু অর্ধেক।

আমি যেহেতু বেশি দৌড়াদৌড়ি করবার পারুম না, তাই আমি বসুম দোকানে। জিনিসপাতি নিয়া আইব আমার বন্ধু। কেমন লাগে বুদ্ধিটা?’

তাহের আলী অবাক হয়ে ভাইয়ের কথাবার্তা শুনছিল। জহিরের কথা শেষ হতেই বলল, ‘তুই এত ঝামেলার কাম ক্যামনে করবি? আর এত কষ্ট করনের দরকারটা কী? এর চাইতে তুইও গেরামে চইলা আয়। তরে এইখানেই কিছু একটা কইরা দিই। লোকে আজকাল কত কী করে! মুরগির খামার দেয় শিক্ষিত পোলাপান। মাছের চাষ কইরা লাখপতি হয়। সেইরাম কিছু কর!’

‘না ভাইজান, আমি হাঁসমুরগির খামার দিমু না। গঞ্জেই আমার ব্যবসা দাঁড় করুম। সেইখান থিকা ভালা কিছু করবার পারলে হয়ত একদিন রাজধানীতে গিয়াও দোকান দিবার পারুম। তুমি না কইরো না!’

তাহের আলী আর কিছু না বলে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ভাই যখন ব্যবসা করার কথা ভেবেছে তখন করেই ছাড়বে, এটা সে জানে।

বিকেলের আগ দিয়ে আকাশ ঘন কালো হয়ে ওঠে। ঠাণ্ডা মিহি একটা বাতাস বইতে থাকে। গত কয়েকদিনের গা জ্বালানি গরমটা এক নিমেষেই উধাও হয়ে যায়।

জহির ঘর থেকে বের হয়ে ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে থাকে। মন্টু কোথায় যেন গিয়েছে। এই সুযোগে সে বের হয়েছে। মন্টু জানতে পারলে নির্ঘাত তার পিছু ধরত। বকবক করে মাথা ধরিয়ে দিত। জহিরের এখন একটু একা থাকতে ইচ্ছে করছে।

কচি ধানের ক্ষেতে নরম হাওয়া ইচ্ছেমত লুটোপুটি খাচ্ছে। চারপাশে কেমন একটা ঘরে ফেরার সুর। দূরে এক রাখাল ছেলে তার ছাগলের দলকে হাঁকাতে হাঁকাতে ঘরে নিয়ে চলেছে। গ্রামের এক কিশোরী বুঝি শাক তুলছিল ক্ষেতের মধ্যে। সে তার ঝাঁকাটাকে আঁচলে বেঁধে দ্রুত পায়ে ঘরে ফেরার পথ ধরেছে। ঈশাণ কোণের অন্ধকার এখন আরো ঘন হয়ে উঠেছে। দেখতে দেখতেই ঝমঝমিয়ে নেমে এলো বৃষ্টির ধারা। দুই একজন যারা আশেপাশে ছিল, তারা দৌড়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ক্ষেতের ওপাশে একটা বড় মেহগনি গাছের নিচে। তারা অবাক হয়ে দেখতে লাগল, পঙ্গু একজন মানুষ ঝুম বৃষ্টির মধ্যে নিশ্চিন্তমনে ভিজছে। জহিরকে গ্রামের প্রায় সবাই চেনে। তাহের আলীর পঙ্গু ভাই। একজন চুক চুক করে আফসোসের সুরে বলল, ‘আহারে! দৌড়াইয়া যে বাড়িত যাইব, সেই উপায় নাই। বেচারা!’

তারা জানে না, জহিরের বাড়িতে যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। আজ সে প্রাণভরে বৃষ্টিতে ভিজবে।

মেহগনি গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো অল্পক্ষণ পরেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাড়ির দিকে ছুট লাগাল। এই বৃষ্টি কখন থামবে ঠিক নেই। আকাশ রীতিমত ফুটো হয়ে ঝরছে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার কোনো মানে হয় না।

চারপাশটা এখন জনমানবশূন্য। শুধু একটানা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের সাথে কোলাজ করে ব্যাঙের ঘোঁত ঘোঁত ডাক অদ্ভুত একটা সমবেত সুরের জন্ম দিচ্ছিল।

অদূরেই ধানগাছের মধ্যে পুরো শরীর ডুবিয়ে বসে থাকা একজন মানুষও তখন জহিরের দিকে নজর রাখছিল। ধানক্ষেতের জল কাদা আর তুমুল বৃষ্টিতে মাখামাখি হয়ে অসীম ধৈর্যশীল লোকটি অপেক্ষা করছিল মোক্ষম সময়ের। চারপাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি যখন আকাশ ফাটিয়ে ঝরতে শুরু করল, লোকটা আশেপাশে আরেকবার সতর্ক চোখজোড়া বুলিয়ে নিল। তারপর লুঙ্গির গিঁটে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রটাকে খুব সন্তর্পণে বের করে আনল।

হামিদা বানু সন্ধ্যা থেকে চিতই পিঠা বানাতে শুরু করেছে। আজ হাঁসের মাংসের সাথে চিতই পিঠা খাওয়াবে জহিরকে। উঠানের এক মাথায় চারপাশ ঘিরে রাখা এক চিলতে পাকের ঘর। আজকের প্রবল বর্ষণে চারপাশ পানিতে থই থই করছে। এমনভাবে সারা রাত বৃষ্টি চললে চুলার পাড়েও পানি ঢুকে পড়বে। গাঁয়ের পল্লিবিদ্যুৎ এই আছে এই নেই। সেখানে আজকের ঝড় বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও বিদ্যুতের পোল উপড়ে পড়া অসম্ভব কিছু নয়। কাজেই বিদ্যুতের দেখা যে আগামী কয়েকদিন মিলবে না, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

তাহের আলী এইমাত্র বাজার থেকে ফিরেছে। বৃষ্টিতে আজ প্রচুর কই মাছ ধরা পড়েছে। এছাড়া পাঁচমিশালি মাছ তো আছেই! সবাই এত এত মাছ ধরেছে যে নিজেরা খেয়েও এত মাছ শেষ করা সম্ভব না। তাই ঝাঁকা ভরে বাজারে নিয়ে এসেছে বিক্রি করার জন্য। তাহের আলী বেশি করে কই মাছ কিনে এনে বাড়িতে এসে দেখে, তার স্ত্রী পিঠা বানাতে বসে হিমশিম খাচ্ছে। বারবার পানি ভেঙে ঘর থেকে এটা সেটা আনতে হচ্ছে। তাহের আলী আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখ কালো করে বলল, ‘বৃষ্টি থামলে কী হইব, আইজ সারা রাত বৃষ্টি হইব। আকাশ অখনো মেঘে সয়লাব!’

হামিদা বানু বলল, ‘জহির আইছে? ওর গলা পাইলাম না!’

‘কই গ্যাছে জহির? আমি তো এইমাত্র বাজার থিকা আইলাম! এই ঝুম বৃষ্টির মইধ্যে বাইরে গ্যাছে ক্যা?’

হামিদা বানু চিন্তিত হলো। ঘরের মধ্যে মন্টুকে দেখা যাচ্ছে। সে নিজেও কয়েকবার তার চাচার খোঁজ করেছে। রোজ এই সময় সে চাচার কাছে গল্প শুনতে বসে। আজ তো বৃষ্টির মধ্যে গল্প দারুণ জমত। অথচ আজই কী না চাচা বাড়িতে নেই!’

হামিদা বানু মুখ কালো করে বলল, ‘বৃষ্টির আগ দিয়া বাইরাইছে। আমি না করছিলাম। শুনল না। মোবাইলটাও ঘরে থুইয়া গ্যাছে। কোথাও আটকা পড়ল কী না কে জানে! একা একা জোরে আইতে গিয়া কোথাও পইড়া গ্যালে কী হইব! অচল মানুষ এইভাবে একা একা…’ কথাটা শুরু করেও শেষ করল না হামিদা বানু। তার দেওরের এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিষয়টা কখনো আলোচনা করা হয় না। এটা সবসময় ধামাচাপা দিয়েই রাখা হয়।

তাহের আলীও চিন্তিত মুখে বলল, ‘আর এট্টু দেখি! এরপর তো না আইলে বাইরে গিয়া দ্যাখতে হইব!’

সেদিন সন্ধ্যা অব্দি জহির ঘরে ফিরল না। সন্ধ্যার পরে তাকে খুঁজতে যাওয়াও সম্ভব হলো না। কারণ আবার আকাশ কাঁপিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘন ঘন বিদ্যুতের চমকে চারপাশ কিছুক্ষণ পর পর কেঁপে উঠছে। সেই সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে বাজ পড়ছে। এই মহা দুর্যোগে বাইরে বের হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

সেই রাতে কারোর চোখের পাতাই এক হলো না। তাহের আলী ভাইয়ের চিন্তায় সারারাত ছটফট করেই কাটাল। হামিদা বানু আর মন্টুও পুরো রাত নির্ঘুম পার করল। সবার একটাই চিন্তা। কী হলো জহিরের? অজানা কোনো বিপদে পড়ল না তো ছেলেটা?

পরদিন ভোর হতে না হতেই তাহের আলীর বাড়ির সদর দরজাতে দুমদাম আওয়াজ শোনা গেল। তাহের আলী আর তার স্ত্রী ধড়মড় করে উঠে বাইরে বের হয়ে দেখল, উঠানভরা থৈ থৈ পানি। সেই পানির মধ্যেই পুরো গ্রামের মানুষ বুঝি তাদের সদর দরজায় এসে জড়ো হয়েছে। সমানে চিৎকার শোনা যাচ্ছে, ‘ওহ তাহের আলী, বাড়িত আছ? শিগগির বাইরাইয়া আসো!’

তাহের আলী লুঙ্গি গুটিয়ে নিয়ে পানির মধ্যে নেমে পড়ল। হামিদা বানু ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়েই ছটফট করতে লাগল। চেঁচামেচি শুনে কাঁচা ঘুম থেকে উঠে মন্টুও চলে এসেছে। হামিদা বানুর মুখ শুকিয়ে গেছে। কেন জানি মনে হচ্ছে ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে দরজার ওপাশে।

সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো না। গ্রামবাসীদের কয়েকজন গতকাল রাতের বৃষ্টির পরে ধান ক্ষেতের অবস্থা দেখতে গিয়ে দেখে, ধান ক্ষেতের লণ্ডভণ্ড অবস্থা। এক রাতের বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষেত একেবারে ধুয়ে মুছে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই ক্ষতি কতদিনে সামলে ওঠা যাবে, সেটা নিয়ে আলাপ আলোচনায় মেতে ছিল সবাই। হঠাৎ একজন আবিষ্কার করে, ক্ষেতের এক জায়গার পানি কেমন জানি লাল হয়ে আছে।

কাছে যেতেই দেখা গেল ভয়াবহ এক জিনিস। ক্ষেতের জল কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে একটি মৃতদেহ। সেই মৃতদেহ আর কারো না, গাঁয়ের একমাত্র এমএ পাশ জহির আলীর!

তাহের আলী ‘ওহ আল্লাহ’ বলে একটা চিৎকার দিয়েই ছপ ছপ করে পানি ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির পেছনের ক্ষেতের দিকে ছুটে গেল। হামিদা বানুও ঘরে বসে থাকে না। পাগলের মতো সেও পানি ভেঙে স্বামীকে উদ্দেশ্য করেই এগুতে লাগল। চাচাপাগল মন্টুর দিকে কেউ তাকাল না। বাড়ির বারান্দায় হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে গেল মন্টু।

ধানক্ষেতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। জহিরের বুকে পিঠে অজস্র কাটা দাগ। দেখে মনে হচ্ছে একের পর এক ছুরির আঘাতে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সারা রাত পানিতে ডুবে থাকতে থাকতে মৃতদেহের সেই কাটা চিহ্নগুলো ফুলে ভেতরের মাংস বেরিয়ে এসেছে। পচন শুরু হয়েছে মৃতের দেহে।

তাহের কিছুক্ষণ নির্বাক চোখে ভাইয়ের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বিভ্রান্তের মতো হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে মৃতদেহের সামনে।

হামিদা বানু আদরের দেওরের এই করুণ পরিণতি দেখে আছারিবিছারি দিয়ে কাঁদতে লাগল। উপস্থিত অনেকেই চোখের পানি সামলাতে পারে না। গ্রামের সবাই জানত, এই পরিবারটি জহিরকে কত ভালোবাসত। ছোটবেলাতেই মাকে হারানো জহির বড়ভাই আর ভাবির আদর স্নেহে বড় হয়ে উঠেছে। সিকান্দার আলীর চোখের মণি ছিল জহির। গঞ্জে পড়াশুনা করত। গ্রামে আসত কালেভদ্রে। কে তার এমন শত্রু হয়ে উঠল যে এত পাশবিকভাবে তাকে হত্যা করল!

দুপুরের মধ্যেই পুরো গ্রাম তাহের আলীর বাড়িতে একেবারে ভেঙে পড়ল। বৃষ্টিতে পুরো গ্রাম লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। তবু জহিরের এই নির্মম মৃত্যু সবাইকে প্রচণ্ড নাড়া দেয়। মুখে মুখে একটাই কথা ফিরতে থাকে, জহিরকে কে খুন করল?

পুলিশ এসেছে সকালেই। লাশ পোষ্টমর্টেমের জন্য গঞ্জে পাঠানো হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করে যখন কাউকেই সন্দেহের তালিকায় ফেলা যাচ্ছে না, তখন গ্রামের স্কুলের প্রাক্তন প্রবীণ শিক্ষক আব্দুল হক এগিয়ে এলেন। তিনি পুলিশকে জানালেন, কে খুন করেছে এটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। পুলিশ তাকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কি কাউকে সন্দেহ করছেন?’

‘জি, আমার সন্দেহ হয়, এই গ্রামের সুলতানই জহিররে খুন করছে!’

সুলতান কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। আব্দুল হকের এই কথা শুনে সে চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘সব মিছা কথা! আমি কিছু করি নাই! এই বুড়ার মাথা খারাপ হইয়া গ্যাছে!’

পুলিশ হাত উঁচু করে সুলতানকে থামতে বলে। তারপর আব্দুল হককে আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘কেন আপনি সুলতানকে দোষী মনে করছেন? সে কেন জহিরকে খুন করবে?’

‘কারণ সে আমার মাইয়ারে বিয়া করতে চায়। আর আমি চাইতাম জহিররে আমার মাইয়ার জামাই করতে। এইটার জন্য সে জহিররে দ্যাখতে পারত না!’

সুলতান দাঁত মুখ খিঁচিয়ে আব্দুল হককে উদ্দেশ্য করে খিস্তি খেউর করতে থাকে। পুলিশ এবারে হুঙ্কার করে ওঠে, ‘বেশি চেঁচামেচি করলে এখনই পাকড়াও করে নিয়ে যাব বললাম!’

সুলতান গ্রামে মাস্তানি করে বেড়ায়। তার উদ্ধত চলাফেরা দেখে মনে মনে বিরক্ত অনেকেই। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সুলতানের বিপক্ষে যায়। তারা আব্দুল হককে সমর্থন করে বলে, ‘হ কথা ঠিক। সুলতান জহির ভাইরে দ্যাখবার পারত না। তার লগে রুখসানার বিয়া ঠিক করতাছে দেইখা সে জহির ভাইরে মনে মনে মারতে চাইত!’

‘আচ্ছা! তাহলে তো সন্দেহ তার দিকে ভালোমতোই যায়! বেশ! এই হিরোরে ভ্যানে তোলো। পুলিশের দুইটা বাড়ি খেয়ে দেখুক, কথা পেটেই রাখবে নাকি পেট থেকে বাহির করবে!’

সুলতানকে পুলিশ ভ্যানে তোলা হলো। সে হাত পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে তখনো বলেই চলেছে, ‘দেইখা লমু! সব কয়টারে দেইখা লমু! আমি কাউরে খুন টুন করি নাই! খুন করার দরকার কী আমার? এক চড় লাগাইলেই জহিরের বাচ্চা উলটাইয়া পড়ত! ভুল মানুষরে ধরতাছেন আপনারা! কইয়া দিলাম! আসল খুনি মনের আনন্দে ঘুইরা বেড়াইব…’

তাহের আলীর পরিবারে এক মহা শোক নেমে আসে। আর দুইদিন পরেই গ্রামের সবাইকে জিয়াফত খাওয়ানোর কথা ছিল। সেগুলো বন্ধ করতে হবে। যেসব জায়গায় জিনিসপাতি কেনার জন্য আগাম টাকা দেওয়া হয়েছে তাদেরকে না করে দিতে হবে। তাহের আলী হাত পা ছেড়ে দেয়। পাড়ার ছেলে-ছোকরাদের ডেকে বলে, ‘তরা যা পারিস কর। আমারে কিছু জিগাইস না!’

পোষ্টমর্টেম শেষে লাশ গ্রামে নিয়ে আসা হয়। ছুরিকাহত করে খুন করা হয়েছে। সামনে পিছনে মোট আট বার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে।

সিকান্দার আলীর কবরের পাশেই তার আদরের সন্তান জহিরকে কবর দেওয়া হয়।

হামিদা বানু সেদিনের পর থেকেই খুব বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। আগাগোড়াই সে কম কথা বলে। এখন তিন চারবারের ডাকে একবার সাড়া দেয়। তাহের আলী তাকে ঘাটায় না। সে জানে, জহিরকে হামিদা সন্তানের মতো স্নেহ করত। তার এরকম মৃত্যু মেনে নেওয়া হামিদার পক্ষে সহজ নয়।

পুলিশ দুইদিন পরেই সুলতানকে ছেড়ে দিয়েছে। তাকে ব্যাপক মারধর করেও কোনো কথাই বের করা যায়নি। এক পর্যায়ে পুলিশ বুঝতে পেরেছে এই খুনের সাথে সত্যি সত্যিই সুলতানের কোনো যোগাযোগ নেই।

আজকাল প্রায় রাতেই ঘুম হয় না তাহের আলীর। মাঝরাতে বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। কীসের যেন ফিসফাস কানে আসে অবিরত। কারা যেন দূর থেকে তাকে ডাকে। সেই ডাকে জহিরের গলাটাও যেন শুনতে পায় তাহের।

একা একা নিঃশব্দে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। আলগোছে দরজাটা ফাঁক করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। উঠোনের সাথে লাগানো দেওয়ালের দরজাটা খুলে ফেলে বাইরে উঁকি দেয়। আকাশে বিচ্ছিন্ন মেঘের দল চাঁদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। সেই আবছায়া আলোয় কেমন এক নিশি পাওয়া মানুষের মতো তাহের এগিয়ে যায় বাঁশ বাগানের কাছে। সাবধানী চোখে খুঁজে নেয় জায়গাটা। তারপর নিচু হয়ে খুব আলগোছে হাত দিয়ে খুঁড়ে ফেলে নরম মাটি। একটু পরেই হাতের সাথে ধাতব কিছুর স্পর্শ অনুভব করে। সাবধানে বের করে ফেলে জিনিসটা। একটা ধারালো ছুরি।

পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় সামনের পুকুরটার কাছে। দুই এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে ছুরিটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় পানিতে। ঝপ করে একটা শব্দ হয় শুধু। তারপর শব্দটা মিলিয়ে যায় অনন্ত অসীমে।

সিকান্দার আলী সম্পত্তির উইলটা করার পর থেকেই তাহের আলী তার বাপের সাথে কথা বলত না। শুধু পশ্চিমের ধানি জমি আর বসতভিটা বাদে যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি তার বাবা ছোট ছেলে জহিরের নামে লিখে দিয়েছে। এটা নিয়ে বাপের সাথে তাহের আলীর কথা কাটাকাটিও হয়েছে। সিকান্দার আলী ঠাণ্ডা মাথায় ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে।

‘তর একটা সংসার আছে! বউ-পোলা আছে। সবচেয়ে ভালো ধানি জমিটাই তো তরে দিতাছি। লগে এই বসতভিটা। আর ও তো দুর্বল। পড়ালেখা করতাছে, কিন্তু কাম কইরা যদি খাইতে না পারে? তখন ওর কী হইব? এই জমিগুলান থাকলে ওর একটা ভরসা থাকব!’

তাহের আলীর বাঁকা ঘাড় সোজা হয়নি। সে ঘাড় বেঁকিয়েই বলেছে, ‘তার চাইতে কও সে তোমার আদরের পোলা। পড়ালেখা করছে তাই তুমি খুশি হইয়া সবকিছু তারেই দিয়া দিতাছ! আমি মুক্ষু মানুষ, আমারে তুমি গোণায় ধরো না…’

বাপের মৃত্যু অব্দি তাহের আলী সোজা হয়নি। হামিদাকে বলেছে, ‘উইলের কথা জানি জহির জানবার না পারে! সে আমার ছোট ভাই, আমি তারে কোলে পিঠে বড় করছি। সে আমার কথার অবাধ্য হইব না! জমিজিরাত দিয়া ওর কী কাম? আমি ওরে সব কইরা দিমু! আমি যা দিমু ও খুশিমনেই লইব!’

কিন্তু উইলের কথা যে বাবা নিজেই জহিরকে জানিয়ে দিয়ে গেছে, এটা তাহের আলীর জানা ছিল না।

ঘটনার দিন দুপুরবেলায় তার আর জহিরের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। জহির কাপড়ের ব্যবসা করার কথা বলছিল। এক পর্যায়ে সে ভাইকে বলে, ‘ভাইজান, আমার এইবারে ম্যালা ট্যাকা লাগব।’

‘ম্যালা মানে কত ট্যাকা?’

‘প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ।’

‘পাঁচ-ছয় লাখ? এত ট্যাকা হুট কইরা কইলেই কি দেওন যায় নাকি? তাছাড়া এত বড় জিয়াফতের আয়োজন করতাছি… খরচাপাতির ব্যাপার আছে।’

‘জিয়াফত খাওয়াইতে কে কইছে? ঐ ট্যাকা আমারে দিয়া দাও। আমার ব্যবসায় লাগাই! তাছাড়া বাজান তো আমারে জমিজিরাত লিখা দিছে। সেই ভাগ আমারে দাও।’

এই কথায় তাহের আলীর মাথায় আগুন চড়ে যায়। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলে, ‘বাপজান তরে জমি লিখা দিছে সেইডা তরে কে কইছে?’

‘বাপজানই কইছে! বাপজান আমার কাছে কোনো কথাই গোপন করত না। যেই বছর বাপজানে মারা গেছে সেই বছর আমি যেইবার আইছিলাম, বাপজান কারে কী দিয়া যাইতাছে বেবাক কিছু আমারে খুইলা কইছে। আমারে উইলও দ্যাখাইছে। পশ্চিমের ধানি জামি আর এই বাড়িটা তোমারে দিছে। বাদবাকি সবকিছু তো আমার নামেই লিখা দিছে। আমি কি ভুল কিছু কইলাম? আমি তো মনে করছিলাম তুমি এইবার আমার সম্পত্তি আমারে বুঝাইয়া দিবা। কিন্তু তুমি তো এইটা নিয়া কিছুই কও না!’

তাহের আলী রাগে গজরাতে গজরাতে বলে,’ তর এত সাহস! তুই আমারে এইরাম কথা কস? আমি তরে ঠকাইছি কুনোদিন? বাপজানে আমারে ঠকাইছে। তুই আমারে ঠকাইছস! তরা দুইজনে মিলা আমারে ঠকাইছস!’

‘আমরা তোমারে ঠকাইছি? ক্যান? বাপজানে কিছু দেয়নি তুমারে? এই এত বড় বাড়িটার কোনো দাম নাই? পশ্চিমের অত বড় একটা ধানি জমি… তোমার সারা বছরের খোরাকি তো ঐ এক জমি থেইকাই আসে! আমি কি এইসবের খবর রাখি না মনে করছ তুমি?’

‘খুব বেশি খবর রাখছস মনে হইতাছে! আমি এই বাড়ির পিছে, জমিজিরাতের পিছে যে খাটাখাটনি করছি, তার তুলনায় বাপজান আমারে কিছুই দেয়নি! তুই পড়ালেখা করছস, বাপজানের কাছে সেইটাই বড় হইল! আমার খাটনির দাম এক পয়সাও না!’

‘তুমি তাইলে জিয়াফত খাওয়াইয়া আমারে সম্পত্তির ভাগ থেইকা বঞ্চিত করতে চাইছিলা! মনে করছিলা ঐটা কইরা আমারে ভুলাইয়া থুইবা! তোমার জারিজুরি আমি বুইঝা গেছি ভাইজান! কাজটা ভালা করো নাই তুমি!’

কথাটা বলেই জহির সেখান থেকে উঠে চলে যায়। তাহের আলী একা একা বেশ কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকে।

সেই ছোটবেলা থেকেই সে অকাতরে এই জমিগুলোতে তার শ্রম দিয়েছে। সে না থাকলে কি তার বাপজান একা এতকিছু করতে পারত? মায়ের মৃত্যুর পরে ছোটভাইকেও সে দেখেশুনে রেখেছে। সে আর তার বউ জহিরের কোনো চাহিদাই তো অপূর্ণ রাখেনি! তবু সম্পত্তিই তার কাছে বড় হয়ে গেল?

স্বামীর পিছে পিছে হামিদা বানুও ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ায়। তাহের মাটি খুঁড়ে ছুরিটা বের করতেই হামিদা সভয়ে পিছিয়ে আসে।

কোনোমতে ঘরে ঢুকে তড়াক করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মাথা অব্দি ঢেকে দেয় কাঁথা দিয়ে।

বাইরে নিশাচর প্রকৃতির সাথে সুর মিলিয়ে জেগে উঠেছে অশরীরীর দল। তাদের ফিসফাস ভেসে আসছে ইথারে ইথারে।

কাঁথার নিচে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হামিদা বানু তাদের ফিসফাস শুনতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments