টিভি ক্যামেরার সামনে দাড়ালি আমার গলা দিয়ে কোনো কথা দূরে থাক, অক্ষরই বের হইত না! সারা শরীর কাপতি কাপতি কানটান গরম হইয়ে যেইত। লেকের ধারে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের একটা মাইয়ে কী সুন্দর সাহসের সাথে মতিন আংকেলের ইন্টারভিউ নিতিছে। মতিন আংকেল বোধ হয় এই প্রথম কোনো মিডিয়ার সামনে দাড়াই কথা কচ্ছেন। কিন্তু তার মদ্যি কোনো আমতা আমতা ভাবের ছিটেফোটাও দ্যাখলাম না! কিরাকম দিব্যি পটু চালায়ে যাচ্ছেন। আমরা ক্যামেরার পিছনে দাড়াই দাড়াই এই সাইডে শুনছি দেখতিছি। আমরা মানে আমিসহ আর হাউসে পড়া জনাবিশেক লোক, রাস্তার দু-একজন টোকাই, রাস্তায় ভিকখে করে এমন কয়জন। টিভি ক্যামেরার সাক্ষাৎকার নেচ্ছে যে মেয়েডা ওর প্রায় গায়ের উপর লোহার গুড়োর মতো চুম্বকের কী রাকম টানে হুমড়ি খেয়ে আইসে পড়তেছে!
কী যে হারাই ফেলা জিনিস তারা পাওয়ার আশায় ইরাকম করে বুঝিনে! টিভির রিপোর্টার মেয়েটার ভাবভঙ্গি আর সওয়ালের দিকেই খেয়াল বেশি। মতিন আংকেল কী কী জবাব দেচ্ছেন তার দিকি কোনো খিয়ালই নেই! আমিও যে কিছুডা এই নিশার মদ্যি আটকা পইড়ে গেছি তা না স্বীকার করলি মিছা কথাই বলা হয়! সত্যি কথা বলতি আমি বাপরেও ডরাই নে!
কী আর কবো! এ দিকি মাছের চারের গন্ধে মৌ মৌ আমাগের মন। লেকের মাছগুলিন ফুর্তিতে যিরাকম চাট দেয় আমিও পারলে চাট দিই। সোজাসাপটা কথায় কতি গেলি, মেয়েটা সুন্দর। জিন্সপ্যান্ট পরা, ঠোঁটে কোনো লিপস্টিক লাগায়নি মনে হচ্ছে আমাদের মতোই কেউ। কিন্তুক আমাগের চোখে মেয়েডা তারার মতো জ্বলজ্বলে একটা ফুল।
যদিও মাছের ছিপ ধরে পানির ধারে চিয়ারে বইসে থাকার কথা ছিল আমার। আমি উইঠে আলাম মতিন আংকেল কী বলে টিভির ক্যামেরার সামনে তা শোনার জন্যি! যদিও আংকেল আমারে আগেই কয়েছিলেন, তওফিক তুমি সামলাও এ দিকে। আমি একটু ওদের সাথে কথাবর্তা বলি।
এতক্ষণ আমরা তওফিকের মুখেই মতিন সরকার ও একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেয়ার আগ মুহূর্তের পুরা পরিস্থিতির একটি অংশের কিছু ভাষ্য শুনলাম। তওফিক মতিন সরকারের মৎস শিকারের কাজে প্রায় সাত বছর ধরে সহযোগী হিসাবে কাজ করে আসছে। তার কথা খাঁটি বটে! তবে গোছায়ে ঠিকঠাক মতো কথা বলতে পারে না। পরেরটা আগে, আগেরটা পরে বলে। কানে একটু কম শোনে। তাই কারো কোনো কিছু না শুনলে নিজের মনে যা সত্য বলে মনে হয় তা দিয়ে গ্যাপ ফিল করে। তবে সে বেশ অনুভুতিপ্রবণ। অন্যের কাজের গুরুত্ব বেশি দেয়। নিজের কাজ হয়ত নাই তেমন কিছু। তাই আলসামি জিনিসটা তার ভিতর বাসা বাঁধে নাই।
তওফিক মনে করে এইসব শৌখিন মাছধরা নিয়ে আবার রিপোর্ট করার কী আছে! আজকাল প্রাইভেট চ্যানেলগুলা যা কিছু বিষয় না আলবাল আজাইরা কিছু বানায়ে বিষয় করে তুলছে। কন্টেন্টের যেন ভীষণ অভাব পড়ে গেছে। লোকজন এইসব ছ্যাবড়াই বেশি খায়। কেন যে তারা মূল্যবান সময়টা নষ্ট করে। এহেন বিনোদন কাউকেই সুস্থ রাখতে পারে না!
তাই সে গল্পের বই পড়ে। আর ফেইসবুক গ্রুপগুলোয় দেশের কোথায় কোথায় মৎস শিকার হচ্ছে তার খবরটুকুই রাখে। সেই গ্রুপগুলোর উল্লেখ করার মতো ঘটনাগুলোই সে শুধু মতিন সরকারকে জানায়। মানে তওফিকের দুনিয়ার এরিয়া খু্ব ছোট। রাজ্যের সব কিছু জানতেই হবে কাউকে তা সে মনে করে না। পড়ালেখা ডিগ্রি পর্যন্ত । যতদিনই সে মতিন আংকেলের সাথে যায় মাছ ধরতে ছয়শ করে টাকা পায়। বড় মাছ মিললে বকশিসসহ পনেরশ টাকা। সবচেয়ে বড় মাছটা শিকারের আশায় বুক বেঁধে আছে তারা দুজন। চরিত্রের দিক থেকে দুজনের অনেক মিল। আসলে এক সাথে দুটা মানুষ চলতে ফিরতে এক সাথে থাকতে থাকতে কেন জানি একে অপরের আয়না হয়ে ওঠে।
মতিন সরকার মনে করে মাছ শিকারীর সহযোগীকেও তার অস্তিত্ব টিকেয়ে রাখার একটা জেদ থাকতে হবে। তাকে পারিবারিক ও আর্থিক অনেক যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে। এই যন্ত্রণা তার মনের মধ্যে ধারণ করতে হবে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। অন্য পেশায় গেলে অনেক টাকা পাওয়া যেত! ইশ! কেন যে এই পেশায় আসলাম এই আক্ষেপ থাকা চলবে না। এই ধরনের সংহত মানুষই এই লাইনে ফিট। মানে তাকে জেহাদ করতে হয় নিজের সাথেই নিজের। কারণ বাইরের সব লোভকে পরাজিত করার মতো নৈতিক শক্তি অর্জন করতে হয় একজন শৌখিন মৎস-শিকারীকে। আর এটাই তার একটা গোপন আধ্যাত্মিকতা। মতিন সরকারের মতে তাই একই সাথে এটা একটা সংগ্রাম ও সাধনা।
মতিন সরকার সত্যিই একজন প্রকৃত শিষ্যই পেয়েছে বলতে হয়।
এ কাজে যোগদানের আগে মতিন সরকার তওফিকের দুই পর্বে পরীক্ষা নিয়েছিল। মৌখিক ও প্রাকটিক্যাল। বিয়ের রাতেই বিড়াল মেরে নিয়েছিল সে। লেনদেন সবকিছু খোলাখুলিই আলাপ করে নিয়েছে তওফিকের সাথে। এর আগে যারা মতিন সরকারের সাথে সহযোগী হিসাবে ছিল তাদের সাথেও সে এইরকম সব খুলে বলে নিয়েছিল। ফলে কেউ কেউ দশ বছরও টিকে গেছে। আসলে যারা মাছ ধরার নেশার ভিতর থাকে এদের মনটা বড় না হলে এ পেশাই তাকে দূরে ঠেলে দেয়।
গত কয়েক বছর দেশের হাজার জায়গায় তারা মাছ শিকারে গিয়েছে। পাবনা ক্যাডেট কলেজ সংলগ্ন রাজু ভায়ের পুকুর থেকে রাজশাহীর দানব ভাই ফিশিং জোন, পদ্মা মেঘনা যমুনা শৌখিন মৎস্য শিকারী পরিবারের সাথে মাছ ধরা, বগুড়ার জালশুকা খাউড়া ব্রিজ এলাকাতে গেছে। কত হাওড়-বাওড়-পুকুর নদী ছাড়াও কত না জায়গায় যেতে হয়েছে। এ সুবাদে পুরো বাংলাদেশ ঘোরার আর বাদ নাই তওফিকের। যখন যা দরকার হয় তওফিক আজকাল মাছ ধরার যাবতীয় সামগ্রী কিনে অনলাইনে। এ জন্যে মতিন সরকার তওফিককে যুগোপযোগী যুবক মনে করে।
একবার ইচ্ছা করে তাকে আড়ালে রেখে মতিন সরকার পঞ্চাশ হাজার টাকার মাছ ধরার টিকিট কেটেছিল। মাছ ধরার এ লটারির টিকিটের টাকা যে কীভাবে জোগাড় করেছিল তা তার মাথায় আজও আসে না। তবে সব টাকাই তো মতিন সরকারের বাবার রেখে যাওয়া পাঁচতলা বাড়ির ভাড়া থেকেই আসে। মতিন সরকার তওফিককে সেদিন সঙ্গে না নিলেও তা পরে স্বীকার করে। তাতেই তওফিকের মনে পরম শান্তি। ওস্তাদ তাকে সবই বলে। গোপন করে না। অবশ্য তাকে আপন মনে করেই বলে। কখনো তওফিক সরাসরি ‘ওস্তাদ’ বলে সম্বোধন করে নাই। তবে মনে মনে ওস্তাদই মানে। ‘আংকেল’ ডাকই তার ভালো লাগে।
তওফিক আজও পুরা ভেবে পায় না মতিন সরকারের মতো একজন জানাশুনা জ্ঞানীলোক এই শখের পেশা বেছে নিল কেন। উত্তরে কিছু আজব জিনিস যদিও উঠে আসে। তাতে তওফিকের মনে হয়, কেন যে বাবারা ছেলেদের তার নিজের মতো সংগ্রামটা করতে দেয় না! বাবাদের বেশি ভক্তি করলে ছেলেদের কপালে এমনই হয়। বাবাদের জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে কেন ছেলেদের যে তাদের মনের মতো ছেলে হতে হয়! তওফিক ভাবে, তার বাবা একজন গ্রাম্য চাষা ছিল। সে চাষার পরিবার থেকে গ্রাম জীবন ছেড়ে শহরে এসেছে। তার নিজের ইচ্ছামতো এই জীবন বেছে নিয়েছে। কিন্তু মতিন আংকেল কেন তা পারলেন না! এই আক্ষেপ করা ছাড়া তওফিকের মতিন আংকেলকে নিয়ে আর কিছুই বলার নাই।
অবশ্য কেন পারল না তার একটু পাঠকদের না জানালে মতিন সরকারের কর্মকাণ্ডকে বুঝে উঠা কঠিন হবে। সে এক বিশাল কিসসা বটে!
মতিন সরকারের বাবা আসিফ সরকার তার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে একবার বিনা অপরাধে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হয়। ছাত্রজীবনে আসিফ সরকা কোনো দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না। তখনকার দিনে প্রথা ছিল মিলিটারি বাহিনীর ব্যাকে দেশে যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসত তারা বিরোধীদলীয় রাজনীতির লোকদের কিংবা ছাত্রদের মিথ্যা মামলায় জড়ায়ে জেলে ভরে রাখত। যাকে সবাই দমন-পীড়ন নীতি বলে। তো সরকারি দল দেখাত বিরোধীদলের সব মানুষ সন্ত্রাসী, দেশের শত্রু, দেশের উন্নয়ন চায় না। তখন মব ও সংগ্রামী জনতার পার্থক্য নিয়ে নানা বিতর্ক হতো। পত্রিকাগুলো সরকারের চামচা বাহিনীতে পরিণত হয়ে পড়ত। বিরোধীদলীয় লোকজন জনগণের কোনো মর্যদা পাওয়ার এখনও যোগ্য হয়ে উঠে নাই! এ রকম বয়ান তৈয়ার করা হতো। শুধু সরকারি দলের লোকজনই জনগণ অন্তত তারা পশু নয়। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই কত কিছিমের লোক যে চামচিকা বাদুড়ের মতো সরকারে থাকা মন্ত্রী এমপিদের আঁকড়ে ঝোলার চেষ্টা করত। লুটপাট কায়েমের খায়েশে কত কিসিমের কদমবুচি করার চল ছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা যেত না। চারদিকে দলকানা লোকের অভাব হতো না! দেশে জোর গলায় কথা বলার মতো বুদ্ধিজীবীই ছিল না। এসব বুঝতে অবশ্য আসিফ সরকারের দলীয় রাজনীতি করা লাগে নাই। তো ক্ষমতায় নতুন সরকার আসলে একবার আসিফ সরকারকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে রাষ্ট্রের সন্দেহ আইনে গ্রেফতার করে। তাকে থানায় নিয়ে পুলিশ তার নামে অস্ত্র, বিস্ফোরক মামলা, পুলিশের উপর হামলা ও কাজে বাধাদানসহ আরও ৫টা মিথ্যা মামলা বসায়। রিমান্ডে পর্যন্ত এনেছিল তাকে। তার পক্ষে পরে সরকারি দলের উকিল লড়তে হয়েছিল। পঁচিশ দিন হাজতবাসের পর একে একে ধরা পড়া একই মামলায় ত্রিশ জন আসামীর সবাই জামিন পায়। সেদিন মতিন আংকেলের বাবার মনে হয় যে ইস! ভাগ্যিস, খোদাতালা পুলিশের ডানা দেয় নাই, তা না হইলে কত মানুষকে উড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরে নিয়ে থানায় মিথ্যা মামলা বসাইতো! আসিফ সরকার তার জীবনের সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা ছেলে মতিনকে কিসসা আকারে বলে। বলে যে, শোনো জেলখানা অনেক ভালো থানার সেলের চাইতে। কত নিরাপরাধকে পুলিশ থানার সেলের ভিতর প্রচণ্ড মারধর করে। তাদের চিৎকারে আল্লাহর আরশ ফেটে যাওয়ার দশা হয়! শোনা যায় পয়সা দিলে তদবির করলে পুলিশ কম মারধর করে। যাই হোক আসিফ সরকার তার মামলার কথা সারা জীবন গোপন রাখছিল। মানইজ্জত বাঁচাতে সে বাবা-মা পাড়া পড়সি এটাকে হয়রানি মামলা বা রাজনৈতিক মামলা বলে চালিয়েছে। কারণ সমাজে মহল্লায় তখনও মানুষ হাজতখাটা মানুষদেরকেও অপরাধী হিসাবে ভাবত। এ মামলায় আসিফ সরকারকে তার জীবনের পাঁচটা বছর আদালতে হাজিরা দিতে হয়। তারপর সেই মামলা থেকে নাজাত পায়। সাক্ষী না পাওয়ার অজুহাতে আদালতের জজেরা মামলা মাসের পর মাস পিছায়ে দিত। উকিলরা মনে মনে হাসত আর মজা নিত। যত মামলা পিছায় ততই তাদের ইনকাম। এরেই বলে, কারো পৌষমাস কারো সর্বনাশ!
আসিফ সরকার ছেলেকে ভালোবাসে। তার জীবনের যত গ্লানি তা যেন তার ছেলের জীবনে রিপিট না হয় তার জন্য বিশাল একটা বাঁধ বেঁধে দেয়। একবার ট্যাক্স অফিসে কিছু নোংরা ঘুষখোরের কাণ্ড দেখানোর জন্য আসিফ সরকার ছেলে মতিন সরকারকে সঙ্গে নিয়ে যায়। মতিন সরকার ট্যাক্স অফিসের পুরানা ফাইলের ময়লা স্তূপের মতো পড়ে থাকতে দেখে ভয় পেয়ে যায়। নাকে মাস্ক পরা উচিত ছিল তাদের, সে বাবাকে বলে।
রাষ্ট্র যে কিছু কুমির, বাঘ, শুয়োর, সাপ, ভিমরুল, ছারপোকা, কাউয়া, পাগলা কুত্তা পোষে তার কথা একে একে আসিফ সরকার তা ছেলেরে বুঝিয়ে দেন। ছেলে মতিন সরকার তাতে বাপের কথায় একশতে একশ ঈমান আনে। আর বাবা ছেলের চোখের দিকে তাকায়ে তার ঈমানের জোর টের পায়। ব্যুরোক্রাসির প্রতি ছেলের এক চোটে ঘেন্না এনে দিতে পেরেছে বলে নিজেকে সে সার্থক পিতা মনে করে।
এইভাবে ছোটবেলা থেকেই বাপের চোখ দিয়ে রাষ্ট্রকে আয়ত্ত করেছিল মতিন সরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্সে দুটো ফার্স্ট ক্লাস পেয়েও সে সরকারের পুলিশ, প্রশাসন, কর, অডিট ক্যাডারে চাকরি করার কথা মুখেও কোনো দিন আনে নাই।
জীবনের ময়দানে একই লোক কখনো শিকারি, কখনো শিকার—কথাটা আসিফ সরকার প্রায় বলতেন খাবার টেবিলে বসলে। ছোট বোন আম্বিয়া বাপের এহেন দার্শনিক মার্কা কথা শুনে তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝত না। তবু সে এইটুকু বুঝত, বাবা বোধহয় গুরুতর কিছু তাদেরকে বোঝাতে চাইতেছেন। ফলে মতিন সরকারের কাছে তাদের ছোট খাবার টেবিলের জায়গাটা যেন একটা মিনি কনফারেন্স রুম লাগত। বাবা মারা যাওয়ার আগে ছেলে মতিন সরকারের নামে বাড়িটা লিখে দেয়। মেয়ে আম্বিয়াকে ক্যাশ টাকা দিয়ে ভাগাভাগি ফয়সালা করে। আম্বিয়া একটু চাপা স্বভাবের। তারা দুই ভাই-বোন এক জায়গায় বসলে বাবার পুরানা দিনের কত কথাটথা নিয়ে আলাপ করে। সেদিন মতিন সরকারের জন্মদিনে ঘরোয়া দাওয়াতে মতিন সরকার তার এক বন্ধুর খুব বেশি প্রশংসা করতেছিল। উপস্থিত আম্বিয়া মতিন সরকারকে স্মরণ করায়ে দেয় যে মানুষকে যতটুকু দেখো, তার উপর দাঁড়িয়ে প্রশংসা বা নিন্দা কর না। কারণ তোমার দেখার বাইরেও মানুষটির আরেকটি জীবন থাকতে পারে। বাবার এই কথাটা সে আরও আরও অনেক জায়গায় বলেছে। বাবার কথা মতিন সরকারকে স্মরণ করায়ে দেওয়ার জন্য বোনের উপর সে খুশি হয়। জন্মদিনের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বোনকে সবার সামনে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে। তাতে অবশ্য অনেকের চোখ টাটায়।
যাই হোক, আমাদের মতিন সরকার তার বাবার জীবনের ছায়াতলে পাটি বিছায়ে বাকি জীবন পার করে দিতে চায়। কোনো চাকরি-বাকরি যেহেতু নেয় নাই, তাকে বেছে নিতে হয়েছে মাছ ধরার মতো একটা পেশা। এটাকে শখের পেশা না বলে অবলম্বন বলাই ভালো। বাড়িভাড়ার আয়ের বিশাল একটা অংশই ব্যয় হয় মাছেদের সাথে এক গোপন খেলা খেলতে।
মাছ ধরার জায়গা নির্বাচন, টিকিট কাটা, হুইল ছিপ, মাছের চার, টোপ ও যাবতীয় সরঞ্জাম গোছানো, রিকশায় বা গাড়িতে উঠানো, বড়-ছোট যাই হোক মাছ ধরা পড়লে প্রথমে খেলার জন্য মতিন সরকারকে ছিপটা আগায়ে দেয়া, তারপর নেটে করে পানি থেকে উপরে উঠানো, তারপর ছবি তোলা। তারপর ধরাপড়া মাছটা কত কেজি হতে পারে তা আন্দাজ করা, ঐ দিনের সব চাইতে বড় মাছ কিনা তার ঘোষণা দেয়া, খুব বড় মাছ হলে সবাইকে ডেকে সেই জ্যান্ত মাছের সাথে গ্রুপ ছবি তোলা—এইটাও একটা বড় নেশা। এইসব ফাইফরমাস ধারার কাজকাম তওফিকের কোনোভাবেই কষ্টের মনে হয় না।
তওফিক হাফপ্যান্ট পরে থাকে মাছ ধরার সময়। মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য ওড়োমশ মাখে সারা পা জুড়ে। এই তো পাঁচ মাস আগে গ্রিনরোডে বেকায়দায় একটা রিকশা তার গায়ের উপর উঠায়ে দেয়। তার পা ভেঙে গেলো। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল সে। তার ভাঙা হাড় জোড়া লাগতে যত টাকা লেগেছে পুরোটাই শিকারী কল্যাণ তহবিল থেকে চাঁদা তুলে দেয়া হয়েছে। শৌখিন মাছ ধরে যারা এরা সবাই নিজেদেরকে ভালোই চেনে। বলা যায় দেশজুড়ে আছে এদের বিশাল একটা কমিউনিটি। শৌখিন মাছ শিকারীরা মাসে একশ টাকা কল্যাণ তহবিলে জমা করে। যখনই এই কমিনিটির কেউ বিপদে পড়ে তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে।
কাহিনির এ পর্যায়ে এসে কিছু জিনিস স্বীকার করতে অসুবিধা নাই। প্রথমত সবার মনে এই প্রশ্ন আসতে পারা স্বাভাবিক যে দিন শেষে বড়শিতে যে মাছ ধরা পড়ে তা কী বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়? তা কী খাওয়া হয়? এর সরাসরি উত্তর হলো : হা/না। কেউ কোনোদিন নেয় নাই তার নাম মতিন সরকার। মৎস্য শিকারীরা যখন পুকুর বা নদী বা লেকের থেকে চলে যায় তখন তওফিকের ডাক পড়ে। মতিন সরকার পানিতে ডুবানো জালের খালুই থেকে দিনের ধরাপড়া সব মাছ একটা একটা করে নিজ হাতে নিয়ে প্রতিটি মাছের মুখে চুমু খেয়ে পানিতে ছেড়ে দেয়। আর তওফিক ডাঙা থেকে খিলখিল হাসে আর হাততালি দিতে থাকে। মাছগুলি আবার নিজ নিজ ঘরে ফিরে যায় সন্ধ্যায়। এই খবরটা পুরাই গোপন। একমাত্র তওফিকই জানে। তওফিককে বলা হয়েছে এই খবর কোনোদিন যেন কেউ না জানে। তওফিক খোদার কসম কেটে বলে, আংকেল আমার জান যাবে তবু এই খবর কারো কাছে পাচার হবে না। একবার বিশাল একটা কাছিম ধরা পড়েছিল তাদের ছিপে, তা ডাঙ্গায় তুলতে তাদের পোনে তিন ঘণ্টা লেগেছিল। কাছিমটার বয়স আটশ বছর। সেই কচ্ছপটা তারা সরকারের চিড়িয়াখানার প্রাণিজাদুঘরে দিয়ে দেয়। সেই কাছিম কোলে করে পত্রিকায় মতিন সরকারের ছবি আসে। পাশে তওফিকও দাঁড়িয়ে ছিল। এর থেকে বেশি আর কী পাওয়ার আছে তওফিকের এই ছোট জীবনে!
একবার পাঁচশ কেজি ওজনের একটা বড় কাতল মাছ ধরা পড়ে তাদের ছিপে। তখন তওফিক চিৎকার করে ওঠে যে মতিন আংকেল আমাদের আর মাছ ধরতে হবে না এ জীবনে! কারণ আপনার স্বপ্নের বড় মাছটা ধরা পড়েছে। নিজের চিৎকারে নিজেরই ঘুম ভেঙে দেখে যে আসলে মাছটা স্বপ্নের মধ্যে ধরা দিয়েছে। স্বপ্নে মাছ শিকার তওফিক অনেকবারই করেছে। কতবার যে মেছো ভূতের পাল্লায়ও পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই! মাছ ধরার এ জগতে যারা আসে তারা প্রকৃতির ভিতর থাকতে থাকতে কেন জানি মানববিদ্বেষী হয়ে ওঠে বলে তওফিকের মনে হয় এতদিনে। লোকজনকে সে কম সহ্য করতে পারে আজকাল। এই জিনিসটা তার ভিতর গত তিন বছর ধরে প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য যে টিভির রিপোর্টার এই মেয়েটার প্রতি তবে তেমন কোনো বিকর্ষণ কাজ করছে না। তওফিকের বারবার মনে হচ্ছে মেয়েটা মতিন আংকেলকে আরও দশটা প্রশ্ন বেশি করুক যাতে আরেকটু সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকা যায়। মাছ শিকারের মতো এটাও অজানা একটা নেশা কিনা তওফিক নিজেকে প্রশ্ন করে। নিজের সমালোচনা পদে পদে করতে চায় তওফিক! এ ধরনের লোকদের জীবনে ফূর্তিটা কম থাকে—এ খবর আমাদের জানা থাকার কথা।
বহুদিন পর তওফিক একটা অলৌকিক আনন্দ-ঘোরের ভিতর দাঁড়িয়ে মতিন সরকারের ইন্টারভিউ দেখছে।
মনে হচ্ছে সত্যিকার গান হলে তার সুর সত্যিকার বাঁশিতে তুলতে দেরি হয় না! মতিন সরকার সেই মানের খাঁটি বাঁশি যেন।
মতিন সরকারের মনের কষ্টটা তওফিক জানে। রাতে তাকে আন্টির ঘরেই ঘুমাতে হয়। আন্টির সাথে একই খাটে শুতে হয় উল্টো দিক মাথা দিয়ে। কারণ তাতে আন্টির নাক ডাকা কিছুটা কম জোরে শোনা যায়। যদিও সারারাত এপাশ ওপাশ করে তবে শেষ রাতের দিকে মতিন আংকেলের ঠিকই ঘুম এসে যায়।
মতিন সরকার এ জীবনে যত মাছ ধরেছে সেগুলো না ছেড়ে যদি বাসায় নিয়ে যেত তাহলেও আন্টি তার ছন্নছাড়াগিরিকে মেনে মাথায় তুলে রাখত। মতিন সরকার আন্টিকে সান্ত্বনা দেয় যে তার জীবনের উপর কোনো লানত আছে হয়ত! তা না হলে তার জীবনটা সবার মতো না হয়ে এমন হলো কেন!
নিরন্তর স্বপ্ন দেখে গেছে একদিন বিশাল একটা মাছ পাবে মতিন সরকার। সারা দুনিয়ার মানুষ তাকে চিনবে। সেই মাছের আশায় সবুর করার জন্য তওফিক ও তার আন্টিকে সান্ত্বনা দেয় মতিন সরকার।
আন্টির জীবনটা কোনো এক অজানা হতাশায় ভরা। সবাই অনুমান করে এমন একটা মানুষকে তার জীবনের সাথে সেলাই করে দেয়া হয়েছে হয়ত সে জন্যই তার হাই ডায়াবেটিস আর প্রেসার, হার্টের আরও কত রোগশোকের সমস্যা। মাঝে মাঝে আন্টি তওফিককে ডাকে। দু-একটা সুখ-দুখের কথা বলে। এসব কথা সে মতিন সরকারের কাছে পাড়তে সাহস পায় না। এই গতকালই তো আন্টি তওফিককে ডেকে বসায়ে চা আর পুলি পিঠা খাওয়ালো। মনটা বেজাড় করে বলল, মানুষ দুনিয়াতে খালি হাতে আসছে যাবেও খালি হাতে। এই কথা আমি মানি না। মানুষ দুনিয়াতে খালি হাতে আসে না। সে সঙ্গে নিয়ে আসে বিশাল একটা নিয়ামত। সে সেই নিয়ামতটা হারায় দিনে দিনে। অবশ্য কেউ কেউ ধরে রাখতে পারে। সেটা কী জানো তওফিক?
তওফিক আন্টির কথার ভাজ খুলতে পারে নাই। তাই এই ভাব কথার উত্তরে সে বলে, কী সেটা আন্টি?
শিশুর সরলতা। আমরা অনেকেই এই নেয়ামতটাই হারাই।
তওফিক আগ্রহ নিয়ে আন্টির কথার তল থেকে আরও গূঢ় তত্ত্বটা বার করার চেষ্টা করে। সে ফের প্রশ্ন করে। ঐ নেয়ামতকে ধরে রাখার উপায় কী?
আন্টি উত্তর দেয়, সরল পথে চলা।
তওফিক বলে, আন্টি এই জটিল দুনিয়ায় সরল পথ কোনে পাবেন?
আন্টি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, সরল পথের আরাধনা না থাকলে তা কি তোমার কাছে গায়ে পড়ে ধরা দিবে!
তওফিক এই কথার প্রতিক্রিয়া দেবার মতো হিম্মত রাখে না। তাই সে হেসে বলে, হয়ত মতিন আংকেলই সেই পথে আছেন। একবার ভেবে দেইখ্যেন!
আন্টি আর তওফিকের সাথে কথা বাড়ায় না।
২.
লেকের পাড়ে ক্রমশ লোকের ভিড় বেড়েই চলেছে। বড় মাছ ধরা পড়লেও অবশ্য এত লোকজনের ভিড় হয় না। এ যেন কোনো মৎস্য-সুন্দরী কন্যা জালে ধরা পড়েছে। বিনা টিকিটে সুন্দর কিছু দেখার বিনোদন কেউ যেন বেহাত হতে দিতে চাচ্ছে না। টিভির রিপোর্টার মেয়েটা অনেকগুলো প্রশ্ন করে। ক্যামেরার আশে-পাশে দেরিতে হাজির হওয়ায় তওফিকও অনেকগুলো প্রশ্ন-উত্তর মিস করেছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো লোকজনের ভিড়ের কারণে সাক্ষাৎকারটা জমে উঠেছে। যেকোনো বিষয়ই বিষয় হয়ে উঠতে দর্শক-শ্রোতা লাগে। দর্শকের অভাবে অনেক গুরুতর বিষয়ই ঘটনা হয়ে উঠে না। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে মতিন সরকারের সাক্ষাৎকার। তওফিকের মনোযোগটা পুরাই এখন সেইদিকে।
কতদিন ধরে শখের মাছ ধরছেন?
ত্রিশ বছর।
কত টাকা লাগে এই লেকে মাছ ধরার টিকিট কাটতে?
দুই দিনের টিকিট কাটলে পাঁচ হাজার টাকা, এক দিনের জন্য তিন হাজার টাকা।
আপনার এই মাছ ধরাটা নেশা না পেশা?
তা বলতে পারেন নেশা ও পেশা।
এই নেশার ভিতর কি বিশুদ্ধ কোনো আনন্দ পান?
আপনি কী ইঙ্গিত করছেন আমি বুঝেছি। দেখেন আপনার মতো একদিন এক হুজুর আমাকে বলেছিলেন, মাছ ধরা আর জুয়া খেলা একই কাজ। কারণ এটা জুয়ার মতোই নেশা। এইটা তো হার-জিতের খেলা। সার্কাসে দড়ির ওপর সাইকেল চালাতে দেখছেন, কিন্তু পড়ে যেতে দেখছেন কখনও? হুজুর আমাকে জিগাস করে। আমি উত্তর দিই, না। বুঝলেন, দর্শকরা তখন জুয়া খেলে তাদেরকে নিয়ে। সার্কাসের প্লেয়ারদের জীবন-মরণ রিস্ক আছে জেনেও দর্শকরা সার্কাস দেখতে যায়। তারা না গেলে তো সার্কাসের অ্যাক্রোব্যাটরা রোপ ওয়াকাররা খেলত না এইভাবে। উত্তরে আমি বলি, মাঝে মাঝে বড় মাছ ধরা পড়লে আমি দাঁড়ায়ে পড়ি। ধীরে ধীরে, মানসিক একটা উত্তেজনার ভিতর সুতা টানি। বিশ্বকাপে গোলপোস্টে যেমন গোল দেয়ার আগ মুহূর্তে দর্শকের ভিতর শোরগোল আবেগ কাজ করে সেইরকম। বড়শিতে উথাল-পাথাল মাছ খেলাই আস্তে আস্তে। খেলতে খেলতে কখনও পেছনে তাকাইলে দেখি ১৫/২০ জন দর্শক জড়ো হয়ে গেছে। তাদের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় যেন তারাও আমার সাথে সুতা টানতেছে মাছটা ডাঙ্গায় না উঠানো পর্যন্ত।
ওদের কেউ কেউ বলে, চল যাই। সাথের লোক বলে, ধুর হ বেয়াক্কল, বেরসিক, মাছের চেহারাডা না দেইখ্যা গেলে আমার আজকার সবই বেহুদা হইয়া যাইব! এইটা কী বিশুদ্ধ আনন্দ না!
আপনাকে যদি কেউ এসে বলে দশ কেজি ওজনের মাছ আপনার বাসায় পৌঁছায় দিব প্রতিদিন। আপনি এই বড়শিতে মাছ ধরা ছেড়ে দিবেন?
আপনি ছাড়বেন। আমি ছাড়ব না।
যদি আপনার বাসায় এক ট্র্যাক টাকা দিয়ে কেউ বলে, আপনি মাছ ধরা ছাড়বেন?
আমি তো ছাড়ব না। আপনি ছাড়বেন হয়ত। আপনাদের কাছে টাকা ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো। আমার কাছে না।
হ্যাঁ, কেউ হয়ত ফতোয়া দিয়ে আমাদের শৌখিন মাছ ধরা বন্ধ করে দিতে পারে কাল থেকে!
কখনও কখনও বড় একটা কাতলা মাছ না পেয়ে একটা ছোট তেলাপিয়া পান, তাতে মেজাজ খারাপ হয় না আপনার?
না। ছোট ছোট বিজয়গুলো যেমন বড় বিজয়ের আশা দেখায় তেমনি ছোট মাছগুলা ধরা হইল বড় মাছ ধরার সিঁড়ি। আনন্দ কখনও ক্ষীণ হয়, কখনও তীব্র হয়, কখনও কোনোদিন কোনো মাছই পাইনি ভাবছি কাল পাবো তো অবশ্যই!
সেই ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত মাছ ধরেন, ক্লান্ত হন না?
শরীর ক্লান্ত হলেও মনটা অবশ হয় না! কেন শুনেন নাই একযুগ ধরে বড়শি ফেলে বসে ছিল রজকীনির জন্য চন্ডীদাস। একটা স্বপ্নের বড় মাছের জন্য কী আমরা দুই বেলা, দুই দিন, দুই সপ্তাহ, দুই বছর, আজীবন অপেক্ষা করতে পারি না!
সত্যি করে বলেন তো মাছ ধরার ভিতর শারীরিক মজাটা পান কিনা?
ধরেন মাছ বড়শিটা গিললো। ওর মুখে বড়শিটা আটকে গেল। ও যন্ত্রণায় ছটফট করে ছুটতে থাকে। আমার তখন দয়া হয় ওর প্রতি। ধীরে ধীরে পানিতে খেলাইতে থাকি। আর ওরে তখন আস্তে আস্তে আমার নাগালে নিয়ে আসি। তারপর অনেক যত্নে বড়শি খুলি। আর পানিতে ডুবানো জালের খালুইতে রাখি। মাছটার সাথে আরও আরও মাছ থাকে। তখন তারা সারাদিন পানিতেই নতুন জালের ঘরে খেলতে থাকে।
আমার মুঠোর ভিতর ধরা মাছটার পুরা শরীর, আমার চোখের ভিতর ওর পুরা রঙটা পানির নিচ থেকে উপরে আসে যখন তখন আমার ভেতর সন্তান জন্ম দানকারী মায়ের মতো আনন্দ হয়। আমার তৃপ্তির সমান যেন আমি উঁচা হয়ে উঠি।
জাল দিয়ে মাছ ধরা আর বড়শিতে মাছ ধরার তফাত কোথায়?
জালে মাছ ধরে যারা এরা তো বেরসিক। পেটের জ্বালায় মাছ ধরে। বলেন, এতগুলা মাছ ধরে জালে তারপর তারা বিক্রি করে না হয় খায়। আমি তো খেলা করতে নামি মাছের সাথে। খেলা করি মাছের মওত আর নিজ মওতের সাথে। তারা তো কতল করতে নামে। মাছের সাথে যদি খেলায় করি সে তো আমার সাথি। আমার বন্ধু । আপনি কি আপনার দোস্তকে হত্যা করতে পারবেন? বাজারে বিক্রি করে দিতে পারবেন? দিন শেষে আমার রাহু থেকে তাদেরে মুক্ত করি।
দিন শেষে আপনারা তো একই?
কীভাবে। আমার স্বপ্নের ভেতর একটা বড় মাছ থাকে। আমার স্বপ্নের মাছটা যেন ওই ছোট ছোট মাছগুলিকে বড়শি গিলতে পাঠায়, আমাকে অধীর না হতে মেসেজ পাঠায় সে। আমি ঠিকই বুঝি। স্বপ্নের সেই মাছটাকেই মূলত ধরতে যাই প্রতিদিন। বলতে পারেন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চিত ও রোমাঞ্চকর।
হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন বলল, থামাও। তাকিয়ে দেখি মতিন আংকেলের ছোট ছেলে রায়হান।
সে হাঁপাতে হাঁপাতে চড়া গলায় বলে, আব্বু তুমি এইখানে নাটক করতেছ! আম্মার হার্ট এটাক করেছে। ল্যাব এইডে। ভাইয়া আম্মার কাছে। আর তোমার মোবাইল বন্ধ কেন?
মতিন সরকার এ খবর শোনা মাত্রই সব ফেলে ছেলের সাথে রিকশায় উঠল। তওফিককে বলল, তুই এই দিকে সামলা। আমি গেলাম।
মূল কাহিনি হলো—মতিন সরকার এই ‘মহতী টিভি’র সুন্দরী রিপোর্টার মেয়েটিকে আগেই টাকা দিয়ে রাজি করিয়েছে যে তার একটা ইন্টারভিউ নিতে। আর তা তাদের টিভিতে প্রচার করতে। প্রচারের সময় ড্রয়িং রুমে মতিন সরকার ও তার স্ত্রী এক সাথে সোফা সেটে বসবে। পায়ের উপর পা রেখে আরামে টিভিতে দেয়া তার সাক্ষাৎকারটি দেখতে দেখতে বলবে, দেখ তুমি যে আমাকে সারা জীবন মাছ ধরা নিয়ে কমপ্লেইন দিয়ে গেলে তা ঠিক না। যদি কাজটা খারাপই হতো তাহলে কী তারা আমার এত সুন্দর একটা সাক্ষাৎকার নিত!
এই সাক্ষাৎকারটা নেয়ার দুইদিন আগেই এ বিষয়ে যে পরিকল্পনা হয় তা তওফিককে মতিন সরকার খুলে বলেছিল। তওফিকের কাছে তাই পুরো ঘটনাটা আকস্মিক না। আন্টির জন্য এ মুহূর্তে তার মায়া হচ্ছে।
লেকে পাতা তিনটা ছিপই তড়িঘড়ি তুলে নিচ্ছে তওফিক। ছিপের হুইল ঘোরাতে ঘোরতে অস্থির সে ভাবতেছে, আন্টিই এখন বাঁচে কিনা! যদি উনি নাই বাঁচেন মতিন আংকেলের নেয়া সাক্ষাৎকার টিভিতে প্রচারেরই বা পরে কী দরকার হবে!