ইবরাহীম খলিলের কোরবানি

মাহমুদুর রহমান

১.

মোনাজাত শেষ করে সামনে তাকালেন মাওলানা শামসুল হক। সামনে বসে আছে আবেদিন, তার প্রিয় ছাত্র। মাগরিবের নামাজের পর আবেদিনের কাছ থেকে এলাকার বিভিন্ন খবর শোনেন শামসুল হক। শুনলেন, শাহজাহানপুর গোরস্তানে আজও দাফন হয়েছে চারটি শিশু। দুইজনের মৃত্যু হয়েছে হামে, একজন অ্যাকসিডেন্টে। আরেকজন, পৃথিবীর আলো ঠিকমতো দেখার আগেই হাসপাতালের বিছানায়, যেখানে তার সবচেয়ে সুরক্ষিত থাকার কথা। কোথাও শিশু ধর্ষণ হচ্ছে, কোথাও স্রেফ অবহেলায় খুন হয়ে যাচ্ছে। মাওলানা শামসুল হকের মনে হয়, জুম্মার শেষে তিনি মোনাজাতে যে ফিলিস্তিনের জন্য দোয়া করেন, সেখানকার চেয়ে তো তার দেশের শিশুরা কম অনিরাপদ না। অথচ তার কখনো সেকথা মনেই হয়নি।

মাওলানা শামসুল হক প্রথমবার, নিজ দেশের শিশুদের জন্য মোনাজাতের হাত তুললেন।

 

২.

কথা পুরোটা শোনার আগেই ইবরাহীমের ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল। হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিল হারুন। কথা শোনা যাচ্ছিল না ঠিকমতো। এই অবস্থাই হয়। গত কয়েকবছর হলো ফোরজি, ফাইভজি অনেক জি শুনছে মানুষ কিন্তু মাঝে মাঝেই ফোনে কথা ঠিকমতো শুনছে না। তবে ইবরাহীম এটুকু শুনল, তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যেতে বলল হারুন। ফোন কান থেকে সরাতে দেখল আরেক বিপত্তি। ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। চার্জ শেষ।

আসলে এতোক্ষণে হাসপাতালে পৌঁছেই যাওয়ার কথা ছিল ইবরাহীম খলিলের। গরু কিনতে গতকাল এতো দেরি হয়ে গেল, সকালে ঘুম ভাঙতেও দেরি হলো তাই। শাশুড়ি ডেকে না দিলে হয়ত আরও দেরি হতো। মান সম্মান নিয়ে টানাটানি।

হাজেরাকে আজকে রিলিজ দেয়ার কথা! ইবরাহীম খলিলের একটা ছেলে হয়েছে তিনদিন আগে। জন্মের পরপর ছেলেটাকে কোলে এনে দিয়েছিল এক আয়া। বুকের সঙ্গে একটা মাংসের দলা যেন চেপে ধরেছিল ইবরাহীম। কিন্তু তোয়ালে মোড়া ওইটুকু শরীর যে এতোটা জীবন্ত হতে পারে ইবরাহীম বুঝতে পারেনি।

কিন্তু সেই কচি প্রাণেই কীসের জন্য যেন ধাক্কা লাগল। রাতে শোনা গেল ছেলের শ্বাসকষ্ট বা এমন কিছু। তারপরই নিয়ে গেল আইসিইউতে। এরপর দুই রাত সেখানেই থাকল ছেলে। গতকাল রাতে অবশ্য বলেছে, সব ঠিক আছে। আজই সকালে মায়ের কাছে পাঠাবে, দুপুরের পর মা আর ছেলেকে ছেড়েও দেওয়া হবে। সেই কথা শুনেই গতকাল গরুর হাটে গিয়েছিল ইবরাহীম।

ইবরাহীমের বিয়ে হয়েছিল বৃষ্টি-ভাসানো এক সন্ধ্যায়। ইবরাহীমের বাবার ছিল কাঠের ব্যবসা। লোকটা ছিল কাঠের চেয়েও শুষ্ক। আর তার শাসনে থেকে ইবরাহীমের মধ্যেও সেই শুষ্কতার ছাপ পড়েছিল। প্রেম কী, সে বোঝেনি তার ত্রিশ বছর বয়সে। তারপর একদিন বাবার পছন্দে বিয়ে। মেয়ের নাম হাজেরা।

ঢাকার মধ্যম মানের স্কুলে পড়েছে ইবরাহীম। নিজের পুরনো ধাঁচের নামটা সে পছন্দ করত না। তবু নবীর নাম বলে কখনো কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে বৌয়ের নাম এমন মান্ধাতা আমলের হবে সেটা নিয়ে ইবরাহীমের খুঁতখুঁতানি ছিল। সেটা কেটে গিয়েছিল শান্তিনগরে হাজেরাদের বাসায় হাজেরাকে দেখতে গিয়ে। দুধে আলতা না, দুধে-হলুদ গায়ের রঙ হাজেরার। তবে রঙ না, কেন যেন হাজেরার ভ্রূ পছন্দ হয়েছিল ইবরাহীমের।

ইয়াকুব মুন্সি এই মেয়েকে পছন্দ করেছিলেন তিন কারণে। মেয়ে কেবল ন্যাশনাল ভার্সিটিতে অনার্সে পড়েছে, পাশ করেনি। তার অনার্স পাশ ছেলেকে কখনো মুখ তুলে চোখ তুলে কিছু বলবে না। মেয়ের বাপের ইট-বালু-সিমেন্টের ব্যবসা, সেটা কিছুদিন পরই ইবরাহীমের হাতে যাবে। আর মেয়ের নাম, হাজেরা। নিশ্চয়ই ইবরাহীম-হাজেরা মিলে মুন্সি পরিবারকে উপহার দেবে পরহেজগার উত্তরাধিকারী।

কিন্তু সেই দৃশ্য দেখে যেতে পারলেন না ইয়াকুব মুন্সী। বিয়ের প্রথম বছর কিছু বলেননি তিনি। দ্বিতীয় বছর বললেন ইবরাহীমের মা সালেহা। বলারই কথা। ছেলে বিয়ে করিয়েছেন, নাতির মুখ দেখবেন না! কিন্তু, হচ্ছিল না কিছু। চতুর্থ বছর ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় স্বামী-স্ত্রী। দৃশ্যত ইবরাহীমের কোনো সমস্যা ছিল না। তবু তার মনে একটা সন্দেহ ছিল। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা গেল কোনো সমস্যা আসলেই নেই। সবকিছু ঠিকঠাক হাজেরারও।

বিয়ের প্রায় পাঁচ বছর পর প্রথমবার গর্ভবতী হয়েছিল হাজেরা। কিন্তু বাচ্চাটা দুনিয়াতে আসতে পারেনি। মিসক্যারেজ হয়ে গিয়েছিল। তার একমাস পরই মারা যান ইয়াকুব মুন্সি।

তারপর আবার দুই বছরের অপেক্ষা। গত বছর খবরটা নিশ্চিত হওয়ার পরই কেজি দশেক মিষ্টি কিনে চার দোকান, আত্মীয় আর প্রতিবেশীদের দিয়েছিল ইবরাহীম। সাহেলা বেগম সেদিন থেকে নিয়মিত জায়নামাজে বসে দোয়া করেছেন পুত্র, পুত্রবধূ আর তাদের অনাগত সন্তানের জন্য। তারপর কত অপেক্ষা, যত্নআত্তি, নিয়মিত চেকআপ। তিনদিন আগে তারপর ছেলেটার জন্ম। ইবরাহীমের মনে এতো আনন্দ কখনো হয়নি।

ছেলেটা দারুণ সৌভাগ্য নিয়েও এসেছে। কোরবানির ঈদের আগে জন্ম। আর জন্মের পরই ইবরাহীমের পুরনো দুটো বড় বিল ছেড়ে দিল একটা কোম্পানি। আর ঈদের আগে পেয়ে গেল একটা বড় বায়না। ব্যবসা তার আগেও ভালোই চলছিল কিন্তু ছেলের জন্মের সাথে সাথেই এই দুটো ঘটনা তাকে আরও আনন্দিত করল। হাজেরাও বলল, ছেলেরই গুণ।

ইবরাহীম অবশ্য মনে করে, হাজেরারও গুণ। হাজেরা তার জীবনে আসার পর জীবন অন্য রকম হয়েছে। সেই অঝোর বৃষ্টির সন্ধ্যায় কোথাও একটা গান শুনেছিল ইবরাহীম—এমনো দিনে তারে বলা যায়। হাজেরা তাকে জানিয়েছিল, এটা রবীন্দ্রসংগীত। তারপর থেকে নিয়মিত গান শোনে ইবরাহীম। বৃষ্টি দেখে মুগ্ধ হয়। সন্ধ্যায় কখনো দোকান ছেড়ে কাছে পিঠে ফাঁকা জায়গায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যা দেখে। ছেলে আসার পর হয়ত আরও অনেক কিছু বদলে যাবে তার।

এর মধ্যে আইসিইউ এসে অবশ্য সব এলোমেলো করে দিয়েছিল। তবে ডাক্তাররা বলেছিল তেমন কোনো চিন্তার বিষয় নেই। কিন্তু নেই বললেই তো বাপের মন মানে না। সবকিছু ঠিক জানার আগ অবধি ঘুম হয়নি ইবরাহীমের। তারপর যখন শুনল ছেলে সুস্থ, সে ঠিক করেছিল একটা গরু একাই কোরবানি দেবে। সাথে ছেলের আকিকাও।

অবশ্য নামটাই এখনো ঠিক করতে পারল না। ছেলের খালারা জেদ করেছে তাদের পছন্দে নাম রাখতে হবে, এদিকে ছেলের দাদীও নাম নিয়ে বসে আছে।

বাসাবো থেকে মগবাজার যেতে যেতে এসবই ভাবছিল ইবরাহীম খলিল। তবে সে ঠিক করে রেখেছে ছেলের নাম রাখবে ইসমাইল। কেন যেন মন চাইছে নবীর ছেলের নামেই নামটা রাখতে। বাবা ইয়াকুব মুন্সির মতো খুব ধার্মিক না ইবরাহীম। চার ওয়াক্তের নামাজি সে। হাজেরাকে বিয়ে করার পর গান শোনা শুরু করেছে, বাবা মারা যাওয়ার পর সিনেমাও দেখে নিয়মিত। তবে সাধারণ ক্রেতাকে ঠকায় না। মাঝে মাঝে কর্পোরেট ক্লায়েন্টদের থেকে কিছু ব্যবসা করে, কমিশনেরও কিছু বিষয় আছে। এটুকু না করলে বাংলাদেশে ব্যবসা করে টিকে থাকা যাবে না।

ফোনের দিকে একবার তাকাল ইবরাহীম। পাওয়ার ব্যাংকে লাগানো ফোনে ১৫% চার্জ হয়েছে। দ্বীন হাসপাতালে ঢুকতে ঢুকতে ফোনটা অন করল সে। হারুনকে ফোন করতে হবে। কেননা এই হাসপাতালে ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ডে পুরুষ ঢুকতে দেয় না। কী অবস্থা না অবস্থা সেটা জানতে হবে, হারুন জানে।

তবে হারুনকে ফোন করতে হলো না। সে নিজেই এসে যেন আছড়ে পড়ল ইবরাহীমের গায়ে। বিলাপ করে বলল, ‘ভাইগ্না নাই, দুলাভাই। ভাইগ্না নাই।’

পুরো বিষয়টা উদ্ধার করতে ১৫ মিনিট লাগে ইবরাহীমের। হাসপাতালে গ্যাস লিক করে মারা গেছে নবজাতক শিশুরা। কেউ বলছে ছয়জন, কেউ বলছে আটজন, কেউ বলছে এগার। ইবরাহীম নিশ্চিত করতে পারে না আসলে কয়টি শিশু ছিল।

ইবরাহীমের পাশে এই সময় হন্তদন্ত হয়ে দাঁড়ায় এক লোক। সেও আছড়ে পড়ে ইবরাহীমের গায়ে। ইবরাহীম খলিল বুঝতে পারে না, লোকটা কে। কেন তার গায়ে পড়ে কাঁদছে। ইবরাহীমের মনে থাকে না, তিনদিন আগে আরিফ নামের এই লোকটাও তার মতো প্রথম পিতৃত্বের স্বাদ পেয়ে ইবরাহীমকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করেছিল।

কিন্তু এই দুই পিতা শোক আর ক্রোধ মিলিয়ে কিছুই করতে পারে না। হাসপাতালটা এক রকম বন্দিশালা। স্টাফের কাছে সবাই জিম্মি। অবশ্য এসব নিয়ে ভাবনাও আসে না ইবরাহীমের মনে। কোনো রকম ভাবনাই সে ভাবতে পারে না। তার চোখের সামনে ঘুরতে থাকে এক শিশুর মুখ।

ঝিমঝিম করা মাথা একটু স্থির হলে হাজেরার কথা মনে হয়। কোথায় সে? ছেলের খবর কি জানে? তখন ইবরাহীম শুধু তার নামকরণ না হওয়া ছেলেটাকে একবার চোখের দেখা দেখার তৃষ্ণা অনুভব করে। তার মনে পড়ে মরুর রাজা ইবরাহীমের কথা। তার ছেলেটা কোরবানি হয়নি শেষ অবধি। আল্লাহ স্বপ্নে তাকে বলেছিলেন প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে, তিনি দুইবার ভুল করে তৃতীয়বার সন্তানকে কোরবানি দিতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ তার আনুগত্যে খুশি হয়ে বেহেশত থেকে দুম্বা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ইসমাইল কোরবানি হয়নি। ইসমাইল বেঁচে ছিলেন।

কিন্তু সেই ইবরাহীমের উত্তরসূরি এই ইবরাহীমের, তার মতো আরো ইবরাহীম, খলিল, মাহবুব, আরিফ, মোহাম্মদের সন্তানরা বাসের চাকার নিচে, হামে, গুলিতে, ‘কর্তৃপক্ষের অবহেলায়’ প্রতিদিন কোরবানি হয়ে যায় কোনো রকম আগাম স্বপ্ন ছাড়াই।

ইবরাহীমের সচল হয়ে ওঠা ফোনটায় একের পর এক মেসেজ আসে; অভিনন্দন, ঈদ মোবারক…

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments