ছোটগল্পে নজরুল ছিলেন স্বতন্ত্র

মাহমুদুর রহমান

বাংলা সাহিত্যের আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন কাজী নজরুল ইসলাম। কাব্যে তার অবদান অনস্বীকার্য ও অবিসংবাদিত। গানের ক্ষেত্রেও তা-ই। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ নিয়ে বিতর্কও উঠে গেল একদফা। অবশ্য তা নজরুলের গানের জন্য নয়, বরং সে গান অস্কারজয়ী সংগীতকার এআর রহমান যেভাবে নতুন করে সংগীতায়োজন করেছিলেন, তা নিয়েই তর্ক। অবশ্য এসব নতুন। পুরনো আরও অনেক তর্ক আছে আর তার মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে নজরুলের ছোটগল্প ও উপন্যাস। অনেকেরই প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা ও মত থাকে গদ্য সাহিত্যের এই দুই ধারায় নজরুলের কাজ নিয়ে। এ লেখা অবশ্য নজরুলের উপন্যাস নিয়ে তেমন কোনো আলাপে যাবে না কেননা লেখার লক্ষ্য কাজী নজরুল ইসলামের লেখা গল্প। আরও স্পষ্ট করে বললে, কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ছোটগল্পকে নতুন করে দেখা।

ছোটগল্প গদ্য সাহিত্যের আধুনিকতম ধারার একটি। মিচেল ক্লার্কের মতে[1]Mitchell, Lee Clark (2019-04-04). More Time: Contemporary Short Stories and Late Style (1 ed.). Oxford University Press. ছোটগল্প হচ্ছে উপন্যাসের একটি ছোট রূপ যেখানে প্লট অনুসারে কাহিনী এগিয়ে যায় এবং একটা পরিণতি পায়। এদিকে এডগার অ্যালান পো বলেছেন[2]Poe, Edgar Allan (1984). Edgar Allan Poe: Essays and Reviews. Library of America. pp. 569–77 একটি ছোট গল্পের মূল বৈশিষ্ট্য হলো একটি এক বসায় পড়া যাবে। অর্থাৎ, ছোট গল্প একটি কাহিনী যার আকার ছোট এবং অল্প কথায় তা শেষ হবে। ছোট গল্প সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যের সমালোচকরা প্রথমেই রবীন্দ্রনাথের কাছে যান। তার ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা,/ ছোট ছোট দুঃখ কথা/ নিতান্ত সহজ সরল’ দিয়েই কম-বেশি সবাই ছোটগল্পকে সংজ্ঞায়িত করেন। তার সঙ্গে আরও যুক্ত হয় এ কবিতারই আরেকটি লাইন—শেষ হইয়াও হইল না শেষ।

এ লাইনের কাছে ফেরার আরেকটি কারণ আছে। কেননা ইউরোপে, বিশেষত ইংল্যান্ড ও অন্যান্য অঞ্চলে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ছোটগল্পের যাত্রা হলেও বাংলা সাহিত্যে এর যাত্রা সত্যিকার অর্থে উনবিংশ শতাব্দীতে। আর সেক্ষেত্রেও কাণ্ডারি হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প লেখার চেষ্টা আগেও হয়েছিল কিন্তু সার্থক ছোটগল্প রচিত হয় বিশ্বকবির কলমেই। সে কারণে তিনি কোনো না কোনোভাবে ছোটগল্পের মানদণ্ড হয়ে উঠেছিলেন। তার পথ ধরে আরও অনেকে ছোটগল্প লিখেছেন আর সেখানেও রবীন্দ্রনাথের ছাপ স্পষ্ট। নজরুলের ছোটগল্প নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এ গৌড়চন্দ্রিকা করতে হলো কেননা এ বিষয়গুলো লেখার মূল আলোচনায়ও আসবে।

কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প প্রকাশ হয়েছে এক এক করে এবং পরে তা গ্রন্থবদ্ধ হয়। এর প্রতিটি গল্প সময় অনুসারে পড়লে বোঝা যায় গল্পের নানা পরিবর্তন হয়েছে সময়ের সঙ্গে। তার প্রথম দিকের গল্পের সঙ্গে পরবর্তী সময়ের গল্পের গঠনরীতি, বক্তব্য ও ভাষার পার্থক্য রয়েছে। নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র’[3]ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। শুরু হয়েছে ‘ব্যথার দান’ দিয়ে। ছয়টি গল্পের সংকলন ব্যথার দান নজরুলের প্রথমদিকের লেখা। এর নামগল্পও ব্যথার দান। গল্পটি বলে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক সৈনিক তার নানা কথা বলছে। এর সঙ্গে আছে আরও কয়েকটি চরিত্র। তারাও উত্তম পুরুষে নিজের গল্প বলে।

ব্যথার দানের আরেকটি গল্প ‘হেনা’ এবং এটিও ব্যথার দান অনুসরণ করেই রচিত। দুই গল্পের গঠন ও কথনভঙ্গি একই রকম। নজরুল এ দুটো গল্পই রচনা করেছেন যুদ্ধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রেমিকের মানস মিলিয়ে। সেখানে আছে তার সিগনেচার কিছু বিষয়। যেমন আরবি-ফারসি শব্দ ও নামের ব্যবহার।

নজরুল তার সৈনিক জীবনে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি তা এখন অনেকেরই জানা। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া সৈনিক নজরুলের মধ্যে যুদ্ধ প্রভাব ফেলেছিল। সেই প্রভাবই তার প্রথম গল্পগ্রন্থে দেখা যায়। সে কারণে ব্যথার দানের নজরুল রোমান্টিক। এখন এই রোমান্টিক শব্দের সহজ অর্থ অনেকের কাছেই ‘প্রেম বিষয়ক’ কিন্তু এ লেখায় রোমান্টিক মূলত ভাব ও কল্পনাপ্রবণ এক গল্পকারের কথা বলছে। ভার্দুন, ট্রেঞ্চ, গোলেস্তান, আফ্রিকা—সবই নজরুলের কল্পনাপ্রবণ মনের ফল। এর সঙ্গে ভাবাবেগ যুক্ত করে তিনি কমেন্টারির ঢঙে কয়েকজনের কথা লিখেছেন। এর মধ্যে কাহিনী আছে তবে বক্তব্যই বেশি।

কাজী নজরুল ইসলামের গল্প বিশ্লেষণের আগে, তার গল্প পড়তে গিয়ে প্রথমেই সচেতন পাঠকের মনে হবে ছোটগল্পের একটি শর্ত—আখ্যানভাগ—এতে গাঢ়ভাবে অনুসৃত না। কেননা পরবর্তী সময়ে ছোটগল্প তার গঠনে গুরুত্ব দিয়েছে আখ্যানভাগের ওপর। ছোটগল্পে একটা নিরেট কাহিনী থাকে। কাহিনী ধরেই সে চরিত্রদের দেখায়। কিন্তু নজরুলের গল্পে কাহিনী যেন একটা পর্দার অপর দিকে। ফলে কাহিনী গড়ে ওঠারও সুযোগ পায় না। আধুনিক ছোটগল্পের নিরিখে তাই প্রথমেই মনে হয় নজরুলের ছোটগল্প পিছিয়ে পড়ল।

পিছিয়ে তিনি পড়েছেন কিনা সে সিদ্ধান্ত বা বিতর্কের দিকে পরে যাওয়া যাবে। এর আগে আরও কয়েকটি বিষয় দেখে নেয়া প্রয়োজন।

কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প মোট ১৯টি। গল্পগুলো তিনটি সংকলনে প্রকাশিত। এর মধ্যে ‘ব্যথার দান’ ১৯২২ সালে, ‘রিক্তের বেদন’ ১৯২৪ সালে এবং ‘শিউলিমালা’ ১৯৩২ সালে (বাংলা ১৩৩৮) প্রকাশিত। অর্থাৎ প্রথম দুটির মধ্যে সময়ের ফারাক ২ বছর এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয়ের ফারাক ৬ বছর। এ ছয় বছরে নজরুলের লেখার ধারায় বদল এসেছিল। ফলে গল্প বলার ধরন, গল্পের গঠন, ভাষা ও বিষয়বস্তুতে দেখা যায় ভিন্নতা।

ছোটগল্পকার নজরুল ইসলামের প্রথম দিকের গল্পের চরিত্র ও বিষয়ে ব্যক্তি নজরুলের অভিজ্ঞতার প্রভাব আছে। যেমন ব্যথার দানের দারার কথাই ধরা যাক। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক। তার কথা ও অন্যান্য ভাবের মধ্যে নজরুলকে পাঠক খুঁজে পাবেন। অন্তত নজরুলকে যারা চেনেন। বোহেমিয়ান ছিলেন নজরুল নিজে এবং তার মধ্যে আবার নারীর প্রতি ভাবপ্রবণতা ছিল। সেটা ব্যক্তি নজরুলের মধ্যে পাওয়া যায়। গল্পের দারা সে রকমই এক চরিত্র। এর সঙ্গে আসা যুদ্ধ অভিজ্ঞতার বিষয় তো বলার অপেক্ষাই রাখে না যে তা নজরুল মানসকে উপস্থাপন করে!

একই কথা খাটে হেনার ক্ষেত্রেও। দুটি গল্পকেই অনেক সমালোচক ‘প্রায় আত্মজৈবনিক’ রচনা বলে চিহ্নিত করতে চান। তবে শেষ অবধি এ দুই গল্পে দেশপ্রেম প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু ‘বাদল-বরিষণে’, ‘ঘুমের ঘোরে’, ‘অতৃপ্ত কামনা’ ও ‘রাজবন্দীর চিঠি’ পুরোপুরিই প্রেমের গল্প।

কিন্তু প্রেম হোক বা দ্রোহ, কাজী নজরুল ইসলামের গল্পে আছে উপমা ও ভাব প্রবণতা। তিনি যে গল্পই বলেন না কেন, সেখানে কাব্যের একটা ছোঁয়াচ পাওয়া যায়। হেনায় পাই, ‘পাহাড় কেটে নির্ঝরটা তেমনি বইছে, কেবল যার মেহেদী-রাঙানো পদ-রেখা এখনো ওর পাথরের বুকে লেখা র’য়েছে, সেই হেনা আর নেই। এখানে ছোট-খাটো কত জিনিস প’ড়ে র’য়েছে, যাতে তার কোমল হাতের ছোঁওয়ার গন্ধ এখনও পাচ্ছি।’[4]ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। পৃষ্ঠা-৩১

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় প্রেম ও আবেগের আতিশয্য নিয়ে আজকাল অনেকে (আধুনিক সাহিত্য পড়া পাঠককুল) নানা রকম সমালোচনা করেন। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে তার গদ্যে আবেগের স্পর্শ থাকলেও কাব্য ততটা নেই। কিন্তু নজরুলের তা আছে। আধুনিক ছোটগল্পের একটা বড় অংশই এই ভাবপ্রবণতা বা কাব্যিক ভাব থেকে দূরে। বিশেষত কাফকা, কামুদের লেখায় দেখা যায় তারা নির্লিপ্ত থাকতে পছন্দ করেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সমুদ্রের স্বাদ’ কিংবা ‘আত্মহত্যার অধিকার’ স্মরণ করা যায়। তার লেখাতে সিস্টেমের প্রতি কটাক্ষ এমনকি কষাঘাত আছে কিন্তু হাহাকার সেখানে গদ্যে নেই, আছে বক্তব্যে। কিন্তু নজরুল তার গদ্যেও হাহাকার রেখেছেন।

কিন্তু নজরুলের গল্প এতে করে অগল্প হয়ে যায় এমন না। বিশেষত মনে রাখা প্রয়োজন নজরুল যখন গল্প লিখতে শুরু করেছেন তখন বাংলা ছোটগল্পের উন্মেষকাল। এছাড়া নজরুল পুরদস্তুর একজন কবি। উপরন্তু গীতিকার। ফলে তার লেখা ‘লিরিক্যাল’ হওয়ারই কথা। সেই লিরিক থেকে বর্ণনার দিকেও এসেছিলেন নজরুল।

নজরুলের পরবর্তী কালের গল্পে বর্ণনা ও গল্প এগিয়ে নেয়ার যাত্রা স্পষ্ট। উদাহরণ হিসেবে ‘জিনের বাদশা’র দিকে তাকানো যাক। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘তার বিলাসিতার টাকা যখন তার মা একদিন বন্ধ কর্‌লে এবং বাবার কাছে চেয়েও তার বাবা যখন ওরই বদলে গড়পড়তা হিসেব করে তার পৃষ্ঠে বেশ কিছু ক’ষে দিলে পাঁচনী দিয়ে, তখন সে বাড়ি থেকে পালিয়েও গেল না, কাঁদলেও না, কারুর কাছে কোনো অনুযোগও করলে না। সেইদিন রাত্রে চুন্নু ব্যাপারীর বাড়িতে লেগে গেল। আল্লা-রাখা সেই আগুনে সিগারেট ধরিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ধুম্র উদগীরণ কর্‌তে কর্‌তে যা বলে উঠল তার মানে — আজ দিয়াশলাই কিন্‌বার পয়সা ছিল না, ভাগ্যিস ধরে তাদের আগুন লেগেছিল তাই সিগারেটটা ধরানো গেল।’[5]ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। … Continue reading

বর্ণনার এ অংশ যথেষ্ট নির্লিপ্ত এবং ঋজু গদ্যের উদাহরণ হিসেবে নেয়া যায়। ‘জিনের বাদশা’ গল্পটি নজরুলের ছোটগল্পের মধ্যে নানা কারণেই বিশেষ ও প্রয়োজনীয় কিন্তু প্রথমেই কিছু জায়গায় নজর পড়ে বা মনোযোগ আকর্ষিত হয় এবং মনে হয় তিনি নিজের শুরুর দিকের ভাষা থেকে অনেকটাই সরে গিয়ে গল্পের নতুন আঙ্গিকের দিকে এগিয়েছিলেন। আল্লা-রাখার সিগারেট ধরিয়ে এই নির্লিপ্ত ধুম্র সেবনের ব্যাপারটা কামুর মার্সেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়ত যায় না কিন্তু পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখক এমন গল্প লিখেছেন যেখানে এমন চরিত্র ও তাদের কার্যকলাপের বর্ণনা পাওয়া যায়।

কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প নিয়ে জনপ্রিয় ধারায় একটা আলোচনা আছে—তার গল্প অনেক পিছিয়ে পড়া বা গল্প যুগের শুরুর দিকের প্রভাব আছে। এখন কথা হলো তা থাকারই কথা। কেননা নজরুল লিখেছিলেনই সেই সময় যখন বাংলা ছোটগল্প ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’ করছে। প্রতিযুক্তি একটা এবং স্বভাবতই তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদাহরণ হয়ে। রবীন্দ্রনাথ তো ঠিকই সেই সময় আধুনিক ছোটগল্প লিখে ফেলেছেন।

এখানে বেশ কিছু কথা বিবেচনায় নেয়ার আছে। প্রথমত, একজন লেখক বা সাহিত্যিক তার পারিপার্শ্ব থেকে লেখার রসদ সংগ্রহ করে। এমনকি ব্যাকরণটাই। নজরুল যে পরিমণ্ডলে ছিলেন সেখানে তিনি যা দেখেছেন তাকেই গল্পে এনেছেন। নজরুল যখন লেখা শুরু করেছেন ততদিনে কবিগুরু ভূয়োদর্শী। সেই সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির কল্যাণে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপের সাহিত্যের অনেক কিছুই জানতেন যা নজরুলের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কেবল রবীন্দ্রনাথই নন, তার পরিমণ্ডলে যারা ছিলেন তারাও গল্পের সেই আধুনিকতার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাই তাদের ছোটগল্প লিখতে যেমন কোনো সমস্যা হয়নি তেমনি ব্যাকরণগত দিক থেকেও তারা ছিলেন পটু। তবুও উনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদে লেখা অনেক সাহিত্যিকের ছোটগল্পই কিন্তু ব্যাকরণের বিচারে সার্থক ছোটগল্প হয়ে ওঠে না।

অন্যদিকে নজরুল বেড়ে উঠেছিলেন অনেকটাই আধুনিক সাহিত্যের বাইরে। সেখানে তার সঙ্গী ছিল লোকগান, লোকগল্প। কিন্তু যুদ্ধে যাওয়ার কারণেই হয়ত তার মধ্যে একটা রক্ত গরম করা ভাবের উদয় হয়েছিল। সেই সঙ্গে লেটোর দল ও অন্যান্য কারণে তার মধ্যে ছিল কবিত্ব। আর নজরুলের পরবর্তী জীবনের দিকে তাকালেও দেখা যায় প্রেমিক সত্তা তার মধ্যে ছিল। সেটা যদি না-ও থাকত, আমাদের কারও অজানা না, যে কোনো গল্পকারের প্রথম জীবনে গল্পে প্রেম ও ভাবপ্রবণতা বেশি থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তা-ই ছিল। কিন্তু যে সময় থেকে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন পরিমণ্ডল, পত্রিকা ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করলেন, তার গল্প বলা ও ভাষা বদলে যেতে শুরু করে।

কাজী নজরুল ইসলামের গল্পে এরপর আসতে শুরু করে মানুষ, প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, লোকাচার ও সংস্কৃতি। ‘ব্যথার দান’ থেকে ‘রিক্তের বেদন’ খানিকটা আলাদা। তবে ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ আবার সেই বাঙালি পল্টনের কাছে নিয়ে যায়। নজরুল একটি নোট দিয়ে বলেছেন পল্টনের এক ‘বখাটে’ যুবকের গল্প কিন্তু অনেকে মনে করেন গল্পটা নজরুলের নিজেরই। তাই এখানেও প্রথমদিকের গল্পের মতো আবেগ ও ভাষার ধারা পাওয়া যায়। কিন্তু গল্পের ধারা বদলে যাওয়া ‘মেহের নেগার’, ‘সাঁঝের তারা’, ‘রাক্ষুসী’তে স্পষ্ট।

নানা সময়ে অনেক সমালোচক বা সাধারণ পাঠকও বলে থাকেন কাজী নজরুল ইসলামের সেরা গল্প রাক্ষুসী। এ গল্পে তিনি এক নারীর জবানিতে গল্প বলেছেন। সেই নারীর গল্পটাই বলেছেন। কেন বা কেমন করে তার জীবন বদলে গেল সেই গল্প। একালে এমন নানা গল্প দেখা যায় কিন্তু নজরুল লিখেছিলেন একদম মাটির কাছের গল্প। সে নারী আজকের ওটিটির কর্পোরেট নারী নন। খেটে খাওয়া পরিবারের এক প্রান্তিক নারী। নজরুলের রাক্ষুসী খুব ভিন্ন ধারার গল্প হয়ত না কিন্তু তার লেখার গুণে আর বক্তব্যের কারণে তা বিশেষ হয়ে উঠেছে। এর বাইরে আছে ভাষা। যে বর্গের নারীর গল্প তিনি লিখেছেন তার কথা বলার ধারা ও ভাষা মিলিয়ে রাক্ষুসী আলাদা হয়ে উঠেছে।

এ গল্পে এসেছে নিম্নবর্গের দাম্পত্য সম্পর্কের কথা। পুরুষ সেখানে কেমন, নারীর চোখে পাই তার কথা। নজরুলের এ গল্পে পাই, ‘তুই ত বরাবরই জানতিস্‌ দিনি, আমাদের পাঁচুর বাপ ছিল বরাবরকার সিদেসাধা মানুষ, সে হের-ফের বা কথার প্যাঁচ বুঝ্‌ত না। নাকটা সোজাসুজি না দেখিয়ে হাতটা পিঠের দিক দিয়ে বাঁকিয়ে এসে দেখানোটা তার মগজে আদৌ ঢুকত না। কত আঁটকুড়ে নদী-ভরাই যে ওকে দিয়ে বিনি পয়সার বেগার খাটিয়ে নেত, হাত হ’তে পয়সা ভুলিয়ে নেতম তার আর সংখ্যা নাই!’[6]ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। … Continue reading

এ জাতের পুরুষ আজও দেখা যায়। তারা মাতাল হয়ে বৌ পেটায়। এখন হয়ত সংখ্যা কমেছে বা বদলেছে এর ধরন। এখন নারীরা প্রতিবাদও করে। কিন্তু সেকালে তারা মেনে নিত খুব সহজে। মনে করত এ-ই তাদের ধর্ম। বলার চেষ্টা করা হচ্ছে সেকালের নারীর সেই ভাবধারা তুলে এনেছিলেন নজরুল। লেখায় আরও পাই, ‘ওর আর একটা বদ্‌-অভ্যেস ছিল, ও বড্ড মদ খেত। কতদিন বলেছি ‘তুমি মদ খাও ক্ষতি নাই, দেখো তোমায় মদে যেন না খায়!’ কিন্তু সে তা শুন্‌ত না; একটু ফাঁক পেলেই যা রোজগার কর্‌ত তা সব শুঁড়ির পায়ে ঢেলে আস্‌ত। যাক, ওরকম দুচারটে বদ্‌-অভ্যাস পুরুষ মানুষের থেকেই থাকে—ওতে তেমন আস্‌ত যেত না…’[7]

প্রান্তিক মানুষের জীবনের এই বিষয়গুলো ছিল সেকালের সহজ সত্য। সে বিষয়ও খুব সাবলীলভাবেই লিখেছেন নজরুল। এ গল্পের কোনো কথা, সংলাপ বা দর্শনই তাই আরোপিত মনে হয় না। এ জীবন ও বাস্তবতা নজরুল নিজে দেখেছেন। তার উপস্থাপনাও এ কারণে যথেষ্ট স্পষ্ট। এর বাইরেও অন্য ধারার গল্পে আবার ভাষা খানিক বদলেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।

শিউলিমালা আরেকটি চর্চিত গল্প। এ গল্পে নজরুলের নিরীক্ষার খানিকটা নমুনা পাওয়া যায়। গল্পের শুরুর লাইনটাই খেয়াল করা যাক—মিস্টার আজহার কলকাতায় নাম-করা তরুণ ব্যারিস্টার। শুরুতেই মিস্টার এবং লাইনটা নতুন ধারার গদ্যের পরিচয় দেয়। নজরুল যেখানে অনেক গল্পেই উর্দু, ফারসিঘেঁষা শব্দ ব্যবহার করেছেন এ গল্প সেখান থেকে ভিন্ন। পুরো গল্পে তার ভাষার ব্যবহার আধুনিক। খানিকটা রবীন্দ্রনাথ বা কলকাতার সাহিত্যের ছাঁচ পাওয়া যায়—

এমন সময় মালি শিউলিফুলের একজোড়া চমৎকার গোড়ে মালা টেবিলের উপরে রেখে চলে গেল। অজিত গম্ভীরভাবে মালা দুটি ব্র্যাকেটে ঝুলিয়ে রাখতেই হেসে উঠল। অজিত অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে অভিনয় করার সুরে বলে উঠল ‘‘হে ব্র্যাকেট-সুন্দরী! আজি এই শুক্লা শারদীয়া নিশিতে এই সেঁউতি মালার—”[8]ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। … Continue reading

এ ধারার লেখা বিংশ শতকের তৃতীয় চতুর্থ দশকে খুব পরিচিত। অর্থাৎ নজরুল ইসলাম তার পারিপার্শ্ব ও সাহিত্যে কী হচ্ছে তা নিয়ে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। নজরুল কোনো অবস্থাতেই পিছিয়ে ছিলেন না একজন গল্পকার হিসেবে—চাই সে বিষয় বাছাই হোক বা ভাষার বিচার। খুব বেশি গল্প তিনি লিখে যেতে পারেননি বা সময় পাননি। কিন্তু যে সময়ে ও যত গল্প তিনি লিখেছিলেন তার মধ্যে আছে নজরুলের পারিপার্শ্ব ও সময়। সেই সঙ্গে এই অল্প গল্পের ভুবনেই তিনি করে গেছেন নানা নিরীক্ষা। আরও সময় পেলে তিনি যে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা ছোটগল্পকার হতে পারতেন তাতে সন্দেহ নেই। তবে ছোট-বড় বা সার্থক-নিরর্থকের তর্ক তুলে রেখে বলা যায় ছোটগল্পকার হিসেবেও নজরুল স্বতন্ত্র।

 

অন্যান্য তথ্যসূত্র: 

১. ফজল, আবুল (২০০৮) নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাহবুবুল হক সম্পাদিত। সময় প্রকাশন। 

২. খান, সাদাত উল্লাহ। সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব : নজরুলের ছোটগল্প। কালি ও কলম। 

৩. তাসাউফ, বাসার (২০১৮)। নজরুলের গল্পের বৈশিষ্ট্য। দৈনিক ইনকিলাব।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 Mitchell, Lee Clark (2019-04-04). More Time: Contemporary Short Stories and Late Style (1 ed.). Oxford University Press.
2 Poe, Edgar Allan (1984). Edgar Allan Poe: Essays and Reviews. Library of America. pp. 569–77
3 ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট।
4 ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। পৃষ্ঠা-৩১
5 ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। পৃষ্ঠা-১৮২
6 ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। পৃষ্ঠা-১৩৩
7
8 ইসলাম, কাজী নজরুল (২০১২) নজরুলের ছোটগল্প সমগ্র। নজরুল ইনস্টিটিউট। পৃষ্ঠা-২১৩

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments