দারুল উলুম দেওবন্দ কী? আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের শেষরাত্রির দুআ’র ফল, হক্কানী আলেমদের আত্মবিসর্জন ও আত্মত্যাগের চেতনার বহিঃপ্রকাশ, ইসলামের মুজাহিদিনদের সংগ্রাম ও ইখলাসের বিশিষ্ট প্রতীক, ইলম ও মারেফাতের সুন্দর সমন্বয়, উপমহাদেশের মুসলমানদের জাতীয় জীবনের সিরাতে মুস্তাকিম, ধর্মনিরপেক্ষতার এই যুগে প্রাচীনতা ও মূল্যবোধ এবং ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির রক্ষক ও বাহক।
দারুল উলুম দেওবন্দ কী? ইসলামি ইতিহাসের প্রথম মাদরাসা ‘সুফফাহ’র স্মৃতিচিহ্ন ও স্থিরচিত্র, যার ভিত্তি রাখা হয়েছে তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ ও পরম করুণাময় আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাদের অনুভূতির উপর─যারা না কখনো কোন নবাব ও আমিরদের দিকে তাকিয়েছেন এবং না কোনো শাসক ও মন্ত্রীদের ত্রাসকে পাত্তা দিয়েছেন; যাদের সমগ্র অস্তিত্ব নিজের পুত্র-কন্যাদেরকে দেয় আল্লাহর প্রতি ভরসা, খোদায়ী মারেফাতের দাওয়াত ও শিক্ষা।
দারুল উলুম দেওবন্দ কী? উপমহাদেশের একমাত্র ইসলামি সেনানিবাস, যা ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিটি ফেতনার বিরুদ্ধে কার্যকর ও সফলভাবে লড়াই করেছে; চাই এই ফেতনা আর্য সমাজ দ্বারা উত্থাপিত হোক, বা শুদ্ধি অভিযানের নামে; চাই খ্রিস্টান যাজকদের মাধ্যমে হোক, বা ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠা কাদিয়ানীর মাধ্যমে; চাই এই ফিতনা রেজাখানী ও প্রকৃতিবাদের শিরোনামে আবির্ভূত হোক, বা সাবায়ী ও নাসেবীর পোশাকে!
দারুল উলুম দেওবন্দ কী? এমন স্বাধীন দীক্ষাকেন্দ্র, যা হিন্দুস্তানী মুসলমানদের দান করেছে ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’এর মতো দৃঢ় প্রত্যয়ী, সাহসী, সুপরিকল্পনা ও সুচিন্তার অধিকার দল, যা ব্রিটিশ সরকারকে সেসময়ও চ্যালেঞ্জ করেছিলো যখন তাদের শাসনাধীন ভূখণ্ডে সূর্য অস্তমিত হতো না এবং সময়ের এই মহাশক্তির বিরুদ্ধে সেসময়ও যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো, যখন অন্যান্যরা ছিলো এই নতুন প্রভুকে নিয়ে আনন্দ ও খুশিতে মত্ত।
ইতিহাস প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে শক্তি ও ক্ষমতার ত্রিমুখী নৃত্য নাচিয়েছিলো এবং যতক্ষণ না প্রিয় দেশের প্রতিটি ইঞ্চি এই সাদা-কালো মনের দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছিলো নিজেদের প্রচেষ্টা, ত্যাগ ও কুরবানী।
প্রতিষ্ঠার পটভূমি
দিল্লির পতনের পর মুসলমানদের ধর্ম, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নৃশংসতার পাহাড় চূর্ণ করা হয়। দীনি ইলম ও তার রক্ষক উলামায়ে কেরামকে হিন্দুস্তানের মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য অতিক্রম করা হয় আগ্রাসন ও নির্যাতনের সমস্ত সীমা। হিন্দুস্তানের জমিন─ যা তারা শত শত বছর ধরে শাসন করেছিলো─তার সমস্ত বিশালতা সত্ত্বেও তাদের জন্য করে ফেলা হয় সঙ্কুচিত। মুসলিম উচ্চবিত্ত ও সর্দারদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাদের বানিয়ে দেওয়া হয় অসহায়। মোটকথা, জুলুম নির্যাতনের যত প্রকার হতে পারে, সমস্ত প্রকার প্রয়োগ করা হয় মুসলমানদের উপর। কিন্তু বিধ্বস্ত জাতির মধ্যে তখনও জীবনীশক্তি অবশিষ্ট ছিলো। সবকিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু জীবিত ছিলো ইসলামি আমল-আখলাক। সম্পদ ও শাসনক্ষমতা হস্তগত করেছিলো লুণ্ঠনকারী ব্রিটিশ বেনিয়ারা। কিন্তু ধর্মীয় অখণ্ডতা ও সম্মান ছিলো সুরক্ষিত। এজন্য সকল বর্বর কর্মকান্ডের পরও যখন ধর্ম ও দেশের প্রতি তাদের আনুগত্য বদলানো গেলো না, তখন দেশের ক্ষমতা দখলকারী নির্মম লুটপাটকারীরা নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার আরেকটি কৌশল প্রস্তাব করে, যার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে মৌলভী মুহাম্মদ তুফায়েল আলীগের কলমে─
‘১৮৭০ সালে মুসলমানদের ব্যাপারে ভারত সরকারের কৌশল (নীতি) পরিবর্তিত হয়। ধরে নেওয়া হয়, মুসলমানদের দমন ও ধ্বংস করে তাদেরকে সাম্রাজ্যের প্রতি কল্যাণকর ও অনুগত করা যাবে না। এজন্য উল্লেখিত বছরে ভারত সরকার মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত করে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।’ [1]রৌশনে মুস্তাকবিল: ১২৫
এই কৌশলের পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিলো? তা ভালোভাবে বুঝতে এবং এই নীতির প্রকৃত সত্যে পৌঁছতে হলে আমাদের আরও পেছনে ফিরে যেতে হবে─অর্থাৎ, ১৮৩৪ সালের কমিটির কার্যধারা পরীক্ষা করতে হবে, যা এজন্য গঠন করা হয়েছিলো যে, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের প্রাচ্য ভাষায় শিক্ষা দেওয়া হবে নাকি ইংরেজি ভাষায়? ৭ মার্চ, ১৮৩৫ সালে এই কমিটির বৈঠক লর্ড ম্যাকোলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়; যেখানে লর্ড ম্যাকোলের অগ্রাধিকার ভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা দানের বিষয়টি। এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মন্তব্য করে মরহুম মৌলভী মুহাম্মদ তুফায়েল আলীগ লিখেছেন─
‘এই সিদ্ধান্তটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। লর্ড ম্যাকোলে এটি দ্বারা ভারতকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন বলেও কথিত আছে। কিন্তু যে বিষয়গুলো এই সিদ্ধান্তকে অনুপ্রাণিত করেছিলো, তার মধ্যে একটি ছিলো ঘোষিত আর একটি ছিলো গোপনীয়। ঘোষিত মতামতটি ছিলো, যা তিনি তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘আমাদের অবশ্যই এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে হবে, যারা হবে আমাদের ও আমাদের লক্ষ লক্ষ প্রজাদের মধ্যকার অনুবাদক। একইসাথে তারা হবে এমন একটি প্রজন্ম, যারা রক্তে ও বর্ণে হবে হিন্দুস্তানী, কিন্তু আগ্রহ ও মতামত এবং কথাবার্তা ও চিন্তাচেতনায় হবে ইংরেজ।’ [2]রৌশনে মুস্তাকবিল: ১৫০
লর্ড ম্যাকোলের সত্যিকারের আবেগ ও গোপন মতামত, যা তার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে ছিল, তা প্রকাশ পেয়েছিলো তার পিতাকে লেখা একটি চিঠিতে; যেখানে তিনি লিখেছেন─
‘এই শিক্ষার প্রভাব হিন্দুদের উপর অনেক বেশি পড়বে। ইংরেজি জানা একজন হিন্দু কখনই তার ধর্মের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারবে না। তাদের কিছু হয়তো কল্যাণ চিন্তা করে হিন্দু থেকে যাবে, কিন্তু অধিকাংশই হয় ধর্মত্যাগী হবে, বা খ্রিষ্টান হয়ে যাবে। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষা সংক্রান্ত আমাদের প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী ত্রিশ বছর পর বাঙলা’য় একজন মূর্তিপূজকও অবশিষ্ট থাকবে না।’ [3]রৌশনে মুস্তাকবিল: ১৫১
স্পষ্টতই, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সুস্পষ্ট নীতি এটাই ছিলো, এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা পড়ে ভারতীয়রা চিন্তাচেতনায় হবে ইংরেজ বা ইংরেজদের প্রতি অন্তত সৎ ও অনুগত নাগরিক। মি. ইনফিনস্টিন নিজের স্মৃতিকথায় লিখেছেন─
‘আমি প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে পাদ্রিদের উৎসাহিত করবো। যদিও আমি ধর্মীয় বিষয়ে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকার জন্য গভর্নরের সাথে একমত─যতক্ষণ না ভারতীয় জনগণ খ্রিস্টানদের সম্পর্কে অভিযোগ না করে, ততক্ষণ তাদের শিক্ষা প্রদানের ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। যদি শিক্ষা দ্বারা তাদের চিন্তাচেতনায় এমন পরিবর্তন না আসে যে, তারা তাদের ধর্মকে অনর্থক মনে করবে। তবুও অন্তত এর দ্বারা তারা (ইংরেজদের প্রতি) বেশি সৎ ও অনুগত নাগরিক হবে।’ [4]রৌশনে মুস্তাকবিল: ৯৫
কীভাবে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মুসলমানদের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত ও দীনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিলো, তার বর্ণনা দিয়েছেন স্যার উইলিয়াম হান্টার তার ‘আমাদের ভারতীয় মুসলমান’ গ্রন্থে। বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি মুসলমানদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও তাদের অসুবিধা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখেন─
‘সরকারের বিরুদ্ধে মুসলমানদের অনেক অভিযোগ রয়েছে। একটি অভিযোগ হচ্ছে, সরকার তাদের জন্য সমস্ত সাধারণ পদের চাকরি গ্রহণের পথও বন্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরকার এমন শিক্ষাব্যবস্থা জারি করেছে, যাতে তাদের জাতির জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। তৃতীয়ত, কাজী তথা বিচারকের পদ বাতিল করে দেওয়াতে হাজার হাজার পরিবার─যারা ফিকহ ও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত ছিলো─ অসহায় ও দরিদ্র হয়ে পড়ে। চতুর্থত, তাদের জন্য ওয়াকফকৃত জমিনের ফসলাদি─যা তাদের লেখাপড়ার জন্য খরচ করা উচিত ছিলো─ভুল জায়গায় খরচ করা হতে থাকে।’
ড. হান্টার এই অভিযোগগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং তুলে ধরেছেন মুসলমানদের দুর্দশার ফিরিস্তি। [5]মাওজে কাউসার: ৭৪
এটাই ছিলো দেশ ও মুসলিম জাতির অবস্থা যে, সুলতান ও সালতানাত হয়ে উঠেছিলো পুরোনো দিনের কিচ্ছা-কাহিনি; পদ-পদবি পরিণত হয়েছিলো স্বপ্নে, ধন-সম্পদের ভাণ্ডারগুলোর পাহারা ছিলো দারিদ্র্যদের এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয় নেতৃবৃন্দকে দেওয়া হয়েছিলো মৃত্যুদণ্ড অথবা বন্দী করা হয়েছিলো কারাগারের বা আন্দামান দ্বীপে। সৌভাগ্যবশত তাদের কয়েকজন বেঁচে যায়, যারা দেশান্তরিত হয় অথবা বাধ্য হয় আত্মগোপন-জীবনযাপন করতে। অসহায় এই পৃথিবীতে দেশ ও জাতির জন্য যদি কোনো সহায় থেকে থাকে, তাহলে তা ছিলো ঈমান ও বিশ্বাসের সহায়। কিন্তু এখন এর উপর আঘাত হানার জন্যও লুটেরারা গোপন পরিকল্পনা করছিলো। আর মুসলিম জাতির আকুতি যেন ছিলো এটাই─
‘সময়ের আবর্তন যেন এটাও ছিনিয়ে না নেয় তোমার স্মরণই তো একমাত্র সহায়’
ওয়ালীউল্লাহী’ আন্দোলনের কেন্দ্র─ ‘মাদরাসায়ে শাহ আব্দুল আজিজ, দিল্লি’; যেখান থেকে উম্মাহ পেতো ইলম ও মারেফাত এবং ইচ্ছাশক্তি ও সাহসের পাঠ─ধ্বংস করে ফেলা হয়েছিলো। অথচ ওয়ালীউল্লাহী আন্দোলনের শিরায় রক্ত পৌঁছতো এই মাদরাসা থেকেই। শাহ ওয়ালীউল্লাহ, শাহ আব্দুল আজিজ, শাহ মুহাম্মদ ইসহাক এবং অবশেষে শাহ আব্দুল গনি মুজাদ্দেদী এই মাদ্রাসাকেই বানিয়েছিলেন তাদের সংস্কার ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানে বসেই আঞ্জাম দিয়েছিলেন উম্মাহর ইলমী ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতি ও উৎকর্ষের খেদমত।
সালতানাতের পতন ও দিল্লির ধ্বংসের পর এই ধারা বাধাগ্রস্ত হয়। মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি বলেন, ‘শাহ মুহাম্মদ ইসহাক-এর কেন্দ্রীয় সংগঠন─যা এখন হিজাজে অবস্থিত ছিলো এবং আমীর হাজী ইমদাদুল্লাহর নির্দেশনায় হিন্দুস্তানে কাজ করে যাচ্ছিলো─সিদ্ধান্ত দিলো, দিল্লির প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘ইমাম আবদুল আজিজের মাদ্রাসার আদলে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হবে। মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি রহ. এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য সাত বছর চেষ্টা করেন। অতঃপর ১৫ মহররম ১২৮৩ অর্থাৎ ৩০ মে ১৮৬৬ সালে, দিল্লির পতনের ৯ বছর পর দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।’
মাওলানা সিন্ধি আরও বলেন, ‘দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি কোন সাময়িক আবেগ বা ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণার উপর নয়, বরং এর প্রতিষ্ঠা বাস্তবায়িত হয়েছে একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও একটি গোষ্ঠীর চিন্তাভাবনার অধীনে। এ কথার সমর্থন পাওয়া যায় এই ঘটনা থেকে যে, দারুল উলুম প্রতিষ্ঠার পর ড. শাহ রফিউদ্দিন দেওবন্দি বায়তুল্লাহ’র হজ্জের জন্য মক্কায় আসেন। সেখানে তিনি সাইয়্যিদুনা হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ রহ.কে অনুরোধ করেন যে, আমরা দেওবন্দে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি, এর জন্য দোয়া করুন! এ সময় হযরত হাজী সাহেব বললেন,
‘সুবহানাল্লাহ! আপনি বলছেন যে, ‘আমরা একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছি’, আপনার কি জানা নেই যে, তাহাজ্জুদের সময় কত কপাল সেজদায় পড়ে আবেদন-নিবেদন জানিয়েছে যে, হে আল্লাহ! হিন্দুস্তানে ইসলামের বিদ্যমানতা ও সুরক্ষার উপায় তৈরি করে দিন! এই মাদ্রাসা তো সেই রোনাজারীর ফল। দেওবন্দের সৌভাগ্য যে, এই দৌলত তার জমিনে উদগত হয়েছে। [6]উলামায়ে হক: ১:৭১
এটাই হলো ‘মাদরাসায়ে আরবি ইসলামি দেওবন্দ’ তথা উম্মুল মাদারিস দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক পটভূমি। এখান থেকে এটা স্পষ্ট যে, দারুল উলুম দেওবন্দ আসলে সেই সুসংবাদপ্রাপ্ত গাছের একটি তরতাজা ও সবুজ শাখা, যা ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি নিজের ফয়েজ ও বরকতময় হাতে স্থাপন করেছিলেন, যাতে শিরক, বিদআত, অজ্ঞতা ও পাপের বিষ থেকে সুরক্ষিত হয়ে এর প্রাণসঞ্চারী ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে লাভ করতে পারে জীবনের সতেজতা ও শক্তি।
کعبہ را ویراں مکن اے عشق کا نجا یک نفس
گاہ گہہ وا ماندگان راہ منزل می کنند
উসূল ও উদ্দেশ্য
দারুল উলুম দেওবন্দ ও এর আওতাধীন দেওবন্দের অন্যান্য মাদ্রাসার উসূল ও উদ্দেশ্যগুলো হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি ‘আসাসি উসূলে হাশতেগানাহ’ শিরোনামে লিখে দিয়েছেন, যা ‘দারুল উলুম’ পত্রিকায় (১৩৪৭ হিজরি) প্রকাশিত হয়েছিলো। মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মিয়াঁ দেওবন্দি তার নিজের ভাষায় এই উসূল ও উদ্দেশ্যগুলোকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এভাবে,
‘এই উসূলগুলোর উপর ভিত্তি করে এটা সহজেই বলা যেতে পারে যে, দারুল উলুম ও এ ধরণের অন্যান্য মাদরাসার উদ্দেশ্যগুলো হলো─ (ক) মুক্তমনে প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘হকের কালেমা’র ঘোষণা দেওয়া। কোন লোভনীয় প্রস্তাব, ক্ষমতাবানের চাপ বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা এতে বাধা হতে পারবে না।
(খ) সাধারণ মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক আরও বেশি হওয়া উচিত, যাতে সম্পর্কটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুসলমানদের মধ্যে একটি শৃঙ্খলা তৈরি করে, যা তাদেরকে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রকৃত রূপের উপর রাখতে সহায়ক হয় এবং এভাবে ইসলামি আকিদা ও সভ্যতা সর্বদা, অন্তত সেসময় পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে, যতক্ষণ এই কেন্দ্রটি তার সঠিক নীতি ও উদ্দেশ্যের উপর থাকবে অবিচল। সেইসাথে তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ ও জনগণের পক্ষ থেকে স্বপ্রোণদিত হয়ে এর প্রয়োজন পূরণ করা মাদ্রাসাকে ইসলামি গৌরবের উপর বজায় রাখবে। এছাড়া বাধ্যতামূলক অনুদান বা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যেন এতে কিছুতেই প্রবেশ না করে। বরং যেন একটি জাতীয় সম্পর্ক তৈরি হয়, যা একে অপরকে নির্ভরশীল করে রাখবে এবং এভাবেই হতে থাকবে একে অপরের উন্নতি ও সংশোধন। (উপরের ক ও খ জানতে দেখুন, উসূলে হাশতেগানাহ’র ৬, ৭, ৮ নং উসূল)
(গ) কর্মী, সেবক ও উপকার লাভকারীগণ সমস্ত প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে ওয়ালীউল্লাহী মাসলাকের উপর কঠোরভাবে চলবে। যে সকল বিষয়ের উপর সমস্ত ইসলামি বিশ্ব একমত, সেগুলো শক্তিশালী সুন্নাহ, পূর্বসূরীদের মাসলাকের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সিরাতে মুস্তাকিম ও বিশুদ্ধতার মানদণ্ড। (দেখুন, ৪ নং উসূল)
(ঘ) স্বৈরাচার ও অত্যাচারের (যা শুধু শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মুসলমানদের ধ্বংসের জন্য দায়ী) বিরুদ্ধে পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে জাতীয় ও সামষ্টিক অবস্থানে থেকে কাজ করার উদাহরণ মুসলমানদের সামনে উপস্থাপন করা। ( এ বিষয়ে ৩ নং উসূলে কিছু নিয়মকানুনের প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে ) [7]উলামায়ে হক: ১: ৫৪-৫৬
মোটকথা, এই উসূল ও উদ্দেশ্যগুলো জানাচ্ছ, ইলম ও মারেফাতের এই কেন্দ্রটি এজন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, এ থেকে দীনের প্রকৃত ও মুখলিস খাদেম এবং ইসলামের সাহসী সৈনিকরা প্রস্তুত হয়, যারা হবে ইসলামি আকিদা ও নিদর্শন এবং দীনের আখলাক ও ঐতিহ্যের দাঈ ও নকীব। তারা ইসলাম ও মুসলমানদেরকে রক্ষা করবে বাতিল শক্তির ফেতনা থেকে। এজন্য এর শিক্ষা ও দীক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রাখা হয়েছে ইমামুল হিন্দ মুহাদ্দিস দেহলভির দাওয়াত ও সংস্কার আন্দোলনের উপর।
সনদ ও সূত্রপরম্পরা
দারুল উলুম দেওবন্দের সনদ ও সূত্রপরম্পরা মুসনাদে হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.-এর মধ্য দিয়ে মিলিত হয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে। দারুল উলুম ও দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের জামাতের সর্বোচ্চ পূর্বপুরুষ হলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.; যার ইলমী ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানহাজ ও পন্থার উপর তৈরি হয়েছে দারুল উলুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও দেওবন্দি চিন্তাধারা। এজন্য আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া, দেওবন্দি চিন্তাধারা কোন নব্য-প্রসূত বিষয় নয়, বরং ইলমী, দীনি ও রাজনৈতিক বিধি ও বিষয়সমূহে দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম মুসনাদে হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ’র মাধ্যমে সালাফে-সালেহীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
উপমহাদেশে যখন মুসলমানদের শাসনক্ষমতার উপর আক্রমণ চালায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তখন আল্লাহ তাআলা ইসলামি শিক্ষা, ধর্মীয় আহকাম ও মুসলিম সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বাঁচাতে শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি ও তার পুত্র ও নাতিদেরকে দৃশ্যপটে আনেন। এই বুজুর্গদের সামনে দুটি লক্ষ্য ছিলো: (১) কীভাবে মুসলমানদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া উত্তরাধিকার (শাসনক্ষমতা) ফিরিয়ে নেওয়া যায় (২) এবং রাজনৈতিক অবক্ষয়ের এই সময়ে ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মীয় আহকামের পতনোম্মুখ প্রাচীরকে কীভাবে সহায়তা করা যায়। প্রথম লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মুহাদ্দিসে দেহলভি অর্থনৈতিক বিপ্লব, সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জাতির জন্য জিহাদের পথ দেখিয়েছিলেন। এই উভয় বিষয়কে স্পষ্ট করার উদ্দেশ্যে তিনি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, মুসাফ্ফা ওয়া মুসওয়া, ইযালাতুল খফা’র মতো উচ্চ স্তরের গ্রন্থ রচনা করেছেন। আর তার নাতি শাহ ইসমাইল দেহলভি বেরিয়ে পড়েছেন হযরত সৈয়দ আহমদ শহিদ দেহলভি ও হযরত শাহ আব্দুল হাই বাঠানভীর সাথে জিহাদের ময়দানে।
দ্বিতীয় লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য এই মুহাদ্দিসিনে দিল্লি কোরআন ও হাদিস শিক্ষা দিয়ে এবং ইসলামি ইলম ও শাস্ত্রের প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে ইসলামি কর্মকাণ্ড ও নৈতিকতার নড়বড়ে প্রাচীরকে সহায়তা দান করেছিলেন। ঠিক সেসময় যখন সৈয়দ আহমদ শহিদ তার সাহসী সৈন্যদের নিয়ে জিহাদের ময়দানে শৌর্যবির্য প্রদর্শন করছিলেন তখনই হজরত শাহ আবদুল আজিজের নাতি-পুতি, ছাত্র ও উত্তরসূরিরা দিল্লির শিক্ষা-দীক্ষার মসনদে উচ্চকিত করছিলেন ‘আল্লাহ তাআলা বলেন’ ‘আল্লাহর রাসুল বলেন’এর ধ্বনি।
দারুল উলুম দেওবন্দ সেই জ্ঞান ও চিন্তাধারার উত্তরাধিকারী এবং দিল্লির মুহাদ্দিসদের সেই পরিবারের সাথে যুক্ত। আজ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের শক্তিশালী কেন্দ্র হলো এই দারুল উলুম এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম।
সালাফের সনদ ও সূত্রপরম্পরার অনিবার্য প্রভাব
যারা সালাফের সনদ নিয়ে ইলম ও আমলের প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, তাদের জন্য সালাফদের রক্ষা করা অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। তারা প্রত্যেক যুগে পূর্বসূরিদের সাধারণ চরিত্রকে নিখুঁত রাখতে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এটাকে প্রদীপ হিসেবে উপস্থাপন করতে থাকেন; অন্যথায় ইসলাম একটি অবিচ্ছিন্ন বাস্তবতা এবং একটি জীবন্ত ধর্ম হয়ে থাকতে পারবে না।
দারুল উলুম ও দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম সাহাবাদের থেকে নিয়ে মুহাদ্দিসিনে দিল্লি পর্যন্ত ইসলামের সূত্রপরম্পরার প্রতিটি অংশের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বস্ত। তারা সালাফে-সালেহীনের অনুসরণে এতোটাই পাবন্দ যে, ছোট্ট থেকে ছোট্ট বিদআতকেও দীন হিসেবে উপস্থাপিত হতে দেননি। ইসলামের সনদ ও দ্বীনের ধারাবাহিকতাকে ক্ষুণ্নকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে ভিন্নমত পোষণ করেছেন দারুল উলুম ও উলামায়ে দেওবন্দ। এটা এজন্য নয় যে, তারা মতবিরোধ পছন্দ করেন বা কোন সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিলো, বরং শুধু এজন্য যে, ইসলাম যেই বরকতময় ও বিশুদ্ধ সনদ ও সূত্রপরম্পরার মাধ্যমে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে, তার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। সেসব সম্প্রদায়ের নাস্তিকতা বা বেদআতী ধ্যান-ধারণার খণ্ডন ও ধ্বংস এজন্য আবশ্যক ছিলো যে, এ ছাড়া ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও টিকে থাকার কোনো উপায় ছিলো না। কিন্তু তাদের এই প্রত্যাখ্যানও ছিলো নীতিগত এবং যুক্তির ধরনটিও ছিলো উত্তম, যা শিক্ষা দিয়েছে পবিত্র কোরআন নিজেই─
وجادلهم بالتي هي أحسن
খতমে নবুয়তের আকিদার সুরক্ষা
ইসলামের এই মহান মৌলিক আকিদাকে আক্রমণ করা হয়েছে। ইংরেজদের মদদপুষ্ট নবুওয়াতের দাবিদাররা ইউরোপ ও আফ্রিকায় ধর্মপ্রচারের মিশনের সুন্দর শিরোনামে মুসলমানদের ধর্মত্যাগের আমন্ত্রণ জানায়। দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম এই ধর্মত্যাগের ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করেন মুসলমানদের। দারুল উলুমের মুরুব্বি হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী তাঁর খলিফা হযরত মাওলানা আশরাফ আলী ও শায়েখ মেহের আলী শাহ গোলারভিকে নির্দেশ দেন তা দমনের। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের ছাত্র আল্লামা আনোয়ার শাহ মুহাদ্দিসে কাশ্মিরি, শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ মুহাদ্দিস উসমানী, মুনাযিরুল ইসলাম মাওলানা মুর্তজা হাসান চাঁদপুরি, মুনাযেরে ইসলাম মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরি, মাওলানা মুহাম্মদ আলম অমৃতসরি, অতঃপর হযরত কাশ্মিরির ছাত্রদের মধ্যে মাওলানা সৈয়দ বদরে আলম মিরাঠি, মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী দেওবন্দি, মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস মুহাদ্দিস কান্ধলভি, মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ মুহাদ্দিস বানুরি প্রমুখ বিজ্ঞ উলামায়ে দেওবন্দ দৃশ্যপটে আসেন। তারা নিজেদের সর্বোচ্চ ইলমী লেখনী, কার্যকরী বক্তৃতা ও বিপুল বিতর্কের মাধ্যমে ইংরেজদের ছায়াতলে বেড়ে উঠা নবুওয়াতের প্রতারণাকে এমনভাবে উন্মোচন করেন এবং প্রতিটি ফ্রন্টে এত সফলতা লাভ করেন যে, তাকে তার জন্মস্থান লন্ডনেই বন্দী থাকতে হয়।
উলামায়ে দেওবন্দের বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দের তত্ত্বাবধানে ‘খতমে নবুওয়াত’ আকিদার সুরক্ষা ও হেফাজতের এই খেদমত আজও পূর্ণ শক্তির সাথে অব্যাহত রয়েছে।
সাহাবায়ে কেরামের সম্মানের সুরক্ষা
সাহাবায়ে কেরামের সম্মানের সুরক্ষা ও তাদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের খণ্ডনে দারুল উলুমের মুরুব্বি উলামায়ে কেরাম ও তাদের উত্তরসূরিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি রহ. রচনা করেছেন ‘হাদিয়ায়ে শিয়া’, ‘আজভিবায়ে আরবাইন’ ইত্যাদি। হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি লিখেছেন ‘হিদায়াতুশ শিয়া’। হযরত মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরি লিখেছেন ‘মুতরাকাতুল কারামাহ’ ও ‘হেদায়াতুর রশীদ’। এই বিষয়ে মুহাদ্দিসিনে দিল্লির ইলমী ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করা হয়েছে, যা প্রকাশ পেয়েছে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ.এর ‘ইযালাতুল খাফা’, ‘কুররাতুল আইনাইন’ এবং হযরত শাহ আব্দুল আজিজের ‘তোহফায়ে ইসনা আশরিয়া’ গ্রন্থগুলোতে।
অতঃপর আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের ইমাম মাওলানা আব্দুল শাকূর ফারুকী লাখনৌভি রহ. সারা জীবন সাহাবাদের প্রতিরক্ষার এই মহান খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতিটি কোণ সম্পর্কে এত বেশি তথ্য সংগ্রহ করেন যে, এখন সম্ভবত এর চেয়ে বেশি করা কঠিন। এছাড়াও হযরত শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানি রহ. সাহাবাদের অবস্থান নিয়ে সফল প্রবন্ধ লিখেছেন। যখন সময়ের রাজনৈতিক ঝড় ইসলামের কাফেলার সামনের সারিতে আক্রমণ করে বসে তখন হযরত মাদানি রহ. সাহাবাদের ‘মি’য়ারে হক’ হওয়া নিয়ে সেই বিতর্কগুলো উপস্থাপন করেন, যা বর্তমান সময়ের গর্ব ও অহংকার। এই বুজুর্গগণ ছাড়াও মাওলানা বেলায়েত হুসাইন, মাওলানা মুহাম্মদ শফী সানগাতরভি, আল্লামা দোস্ত মুহাম্মদ কোরেশি, মাওলানা লুৎফুল্লাহ জালান্ধরি, মাওলানা কাজী মাজহার হুসাইন, মাওলানা মুহম্মদ মনযূর নোমানী, মাওলানা আবদুল সাত্তার তুওয়ানসভি প্রমুখ দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম এই বিষয়ে আঞ্জাম দিয়েছেন মূল্যবান খেদমত।
শিরক ও বিদআত
সুন্নাহ’র অনুসরণ ও হাদিসের অস্বীকারকারী দল ‘মারকাযে মিল্লাত’ নাম দিয়ে একটি নতুন পরিভাষা তৈরি করে এটিকে কোরআনের তাফসির ও ব্যাখ্যা করার কর্তৃত্ব অর্পণ করে বলে, ‘এই মারকায চাইলে সময়ের দাবী ও আকাঙ্খা অনুযায়ী যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে─ নবীজীর হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত, উম্মাহর ঐক্যমত বিবেচনা না করেই।’
আরেকটি দল হলো, যারা নবীর প্রতি মৌখিক ভালোবাসার খুব দাবিদার। তারা নিজেদের ছাড়া ইসলামের অন্য সকল শ্রেণীকে হত্যার উপযুক্ত এবং বিশ্বের সকল কাফের ও মুশরিকের চেয়েও নিকৃষ্ট মনে করে। কিন্তু বাস্তবে তাদের অবস্থা এই যে, তারা শরীয়তের উজ্জ্বল চেহারাকে বিকৃত করে দ্বীনের মধ্যে নতুন নতুন জিনিস যোগ করতে থাকে এবং মনগড়া চিন্তাকে শরীয়ত বলে ঘোষণা করে। অথচ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধরনের প্রথাকে বিদআত ঘোষণা করেছেন এবং নিজের প্রতিটি বক্তব্যে বর্ণনা করেছেন এর কুফল। নবিজির ﷺ সাহাবিগণ থেকে নিয়ে আজ অবধি হক্কানী উলামায়ে কেরাম তাদের তাবলীগী কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত করেছেন বিদআত নির্মূল করতে। কেননা এ থেকেই শিরকের শুরু।
মুহাদ্দিসিনে দিল্লির উত্তরসূরিরা অর্থাৎ দেওবন্দি উলামায়ে কেরামও এ ব্যাপারে অনেক কাজ করেছেন। সৈয়দ আহমদ শহিদ এ ব্যাপারে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আর দারুল উলুম দেওবন্দের মুরুব্বিগণ─হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি, হযরত মাওলানা খলিল আহমদ মুহাদ্দিস সাহারানপুরি, হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভি প্রমুখ শিরক ও বিদআত নির্মূলে আঞ্জাম দিয়েছেন অবিস্মরণীয় খেদমত। সাম্প্রতিক অতীতে মাওলানা হুসাইন আলী বাছারওয়ান, মাওলানা মুর্তজা হাসান চাঁদপুরি, মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নোমানী, মাওলানা সরফরাজ খান সফদার প্রমুখ এই ফ্রন্টে পালন করেছেন অত্যন্ত সফল দায়িত্ব। আর আজও দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম এই বেদআতিদের নির্মূলে রয়েছেন সক্রিয়।
দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের ইলমী কেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দের ইতিহাসের সাথে পরিচিত ব্যক্তিমাত্রই জানেন, এর সন্তানরা ইসলামের সুন্নাতের সমর্থক এবং বিদআত থেকে অনেক দূরে। আর সহীহ সনদ ও সূত্রপরম্পরা বর্ণিত নয় এমন কোনো আমলকে তারা ইসলামের নাম দিতে পারে না। কেননা তাদের অবস্থান হলো ইসলামের সুন্নাতের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের। তাদের মতে, আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত হলো, যারা ইসলামের প্রতিষ্ঠিত সুন্নাতের সাথে যুক্ত, যারা সাহাবায়ে কেরামের পদচিহ্ন অনুসরণ করে দ্বীনের পথ অন্বেষণ করে এবং বিদআত প্রচার করে না। তারা বিশ্বাস করেন, বিদআতের দ্বার উন্মুক্ত রাখলে অবশ্যই মুসলমানদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও বিচ্ছেদ সৃষ্টি হবে। কেননা প্রতিটি দলের নিজস্ব বিদআত থাকবে। শুধু সুন্নতই হলো এমন, যা সমস্ত মুসলমানকে এক সূত্রে গেঁথে রাখতে পারে─বানিয়ে দিতে পারে এক জাতি। এজন্য বিদআতের প্রতিরোধে দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের এই পদক্ষেপ কোনো নেতিবাচক দাবি নয়, বরং ইসলামের রাজপথের প্রতি আন্তরিক নিষ্ঠা।
দারুল উলুম দেওবন্দের উলামায়ে কেরামের মাসলাক
মুহাদ্দিসিনে দিল্লি ও তাদের ইলম ও মারেফাতের ঝর্নায় সিক্ত দারুল উলুম ও দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম নিজেদের মাসলাক ও দীনি অভিমুখের দিক থেকে পরিপূর্ণভাবে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত। তারা নব্য কোন আহলে সুন্নাত নন। বরং তাদের সনদ ও সূত্রপরম্পরা নবিজির ﷺ সঙ্গে সংযুক্ত। এজন্য মাসলাকের দিক থেকে তারা কোন নব্য-সম্প্রদায় বা পরবর্তীতে সৃষ্ট নয়। বরং তারা সেই প্রাচীন আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত, যা শীর্ষ থেকে অবিচ্ছিন্ন সূত্র ও ধারাবাহিকতায় চলে আসছে একের পর এক।
দারুল উলুম দেওবন্দের উলামায়ে কেরামের এই মধ্যপন্থী মাসলাক বোঝার জন্য আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত’র শব্দগুলো বিবেচনা করতে হবে। এই শব্দগুলো দুই অংশে বিভক্ত: এক. সুন্নাহ, যা উসূল, নীতি ও পথ বোঝায়। দুই. জামায়াত, যা বোঝায় ব্যক্তি ও পথের সঙ্গী। আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের এই যৌগিক শব্দ থেকে এটা সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট যে, এই ধর্মে ব্যক্তিত্ব ছাড়া উসূল ও নীতি আর উসূল ও নীতি ছাড়া ব্যক্তিত্ব গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা উসূলগুলো এই ব্যক্তিত্বের পথ ধরেই এসে থাকে। এজন্য উসূলগুলো নেওয়া আর ব্যক্তিত্বকে ছেড়ে দেওয়া কোন যুক্তিসঙ্গত মাসলাক হতে পারে না।
ما أنا عليه وأصحابي অর্থাৎ ‘আমি ও আমার সাহাবিরা যার উপর রয়েছি’ হাদিসে ৭২ ফেরকা থেকে নাজাতপ্রাপ্ত দল চিহ্নিত করতে গিয়ে আল্লাহর রসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুটি বিষয়কে সত্যের মাপকাঠি বলে ঘোষণা করেছেন। ما أنا দ্বারা ইঙ্গিত হলো সুন্নত অর্থাৎ, নববি পথ বা দীনের নিয়মনীতির প্রতি। আর و اصحابي দ্বারা ইঙ্গিত জামাত অর্থাৎ নির্বাচিত ব্যক্তিদের প্রতি। বরং মুসনাদে আহমাদ ও সুনানে আবু দাউদ গ্রন্থে اصحابي এর জায়গায় الجماعة শব্দটি স্পষ্টভাবে এসেছে।
এজন্য সকল সাহাবি, তাবেয়ি, মুজাহিদিন ফকিহ, মুহাদ্দিসিন ইমাম ও রাসেখীন আলেমদের মহানুভবতা, ভালোবাসা, আদব, সম্মান ও অনুসরণ এই মাসলাকের রত্নসম; কেননা সকল ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব কেবল নবিজির ﷺ সঙ্গে সম্পর্কের কারণেই অস্তিত্ব লাভ করে। অতঃপর ইসলামি বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা, যোগ্যতা, খোদাপ্রদত্ত অন্তর্দৃষ্টির দিক থেকে ইলমের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইমাম ও নেতাদের জন্ম হয়েছে এবং তাদের স্মরণ করা হয়েছে ইমাম ও মুজতাহিদ হিসেবে। যেমন মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ। হাদিসের ইমামদের মধ্যে ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিজি, ইমাম নাসাঈ প্রমুখ। ফিকহে গভীরতার ক্ষেত্রে ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান, ইমাম খালাল, ইমাম মুযনী, ইমাম ইবনে রজব প্রমুখ। তাসাওউফ ও ইখলাসের ক্ষেত্রে ইমামদের মধ্যে উয়াইস কারনী, ফুদাইযল ইবনে আয়াজ প্রমুখ। হেকমতের ইমামদের মধ্যে ইমাম রাজি, ইমাম গাজ্জালি প্রমুখ। কালামের ইমামদের মধ্যে আবুল হাসান আশআরি, আবু মনসুর মাতুরিদি প্রমুখসহ অন্যান্য শ্রেণীর ইলমী ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের স্তরভেদে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা দারুল উলুম দেওবন্দের মাসলাকের অন্তর্ভুক্ত।
অতঃপর এই সমস্ত দীনি শাখার উসূল ও নীতির সারকথা দুটি জিনিস: আকিদা ও আমল। আবার সকল আকিদার ভিত্তি ‘তাওহীদ’। আর সমস্ত আমলের মধ্যে বুনিয়াদি আমল হলো ‘সুন্নাহর অনুসরণ’।
তাওহীদ
দারুল উলুম দেওবন্দের মাসলাকে ‘তাওহীদের আকিদা’র উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যাতে এতে কোনো শিরক বা শিরক আবশ্যককারী কোন জিনিস যোগ না হয় এবং এতে অংশগ্রহণ না করে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ। একইসাথে আল্লাহওয়ালা ও কামেল ব্যক্তিদের সম্মান প্রদর্শন করাকে তাওহীদের পরিপন্থী মনে করা─এই মাসলাকের নীতি নয়।
খাতামুল আম্বিয়া সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ ﷺ
উলামায়ে দারুল উলুম দেওবন্দের আকিদা হলো, সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম নবী। কিন্তু একইসাথে তারা তাঁর মানুষ হওয়ারও বিশ্বাসী। তারা নবিজির ﷺ উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করার জন্য দাসত্বের সীমা অতিক্রম করে উপাস্যের সীমায় পৌঁছে যাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন। তারা মনে করেন, নবিজির ﷺ আনুগত্য করা ফরয, কিন্তু তার ইবাদত করা নাজায়েয।
দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরজখী জীবনে তাঁর শারীরিক জীবন সম্পর্কে বিশ্বাসী। কিন্তু তারা সেখানে তাঁর ধর্মীয় বিধিবিধান পালনকে বিশ্বাস করেন না। তারা স্বীকার করেন, নবিজির ﷺ ইলম ও জ্ঞান সমগ্র মহাবিশ্বের জ্ঞানের চেয়েও বহুগুণ বেশি, কিন্তু এগুলো তাঁর সত্তাগতভাবে হওয়া এবং তাঁর সমস্ত কিছুকে পরিবেষ্টন করে রাখার প্রতি তারা বিশ্বাসী নয়।
সাহাবায়ে কেরাম
উলামায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ সকল সাহাবির মাহাত্ম্য বর্ণনা করে থাকেন; অবশ্য তাদের মধ্যে মর্যাদার স্তরের ভিন্নতার কারণে মাহাত্ম্যেও তারতম্য আসে। কিন্তু সাহাবি হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এজন্য পার্থক্য নেই ভালোবাসা ও ভক্তিতেও।
‘সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বস্ত’ (الصحابة كلهم عدول)─এটা এই মাসলাকের বুনিয়াদ। সাহাবায়ে কেরামের যুগ ‘কল্যাণের যুগ’ এবং তারা হলেন সমগ্র উম্মতের জন্য সত্যের মাপকাঠি (মি’য়ারে হক)। যদিও উলামায়ে দেওবন্দ তাদের মাসুম─নিষ্পাপ─মনে করেন না, কিন্তু তাদের সম্পর্কে কুধারণা, মন্দ বলাও জায়েয মনে করেন না। বরং সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে এ ধরনের ‘আচরণ’কে তারা দেখেন ‘হক থেকে বিচ্যুতি’ হিসেবে।
দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের মতে, সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক মতভিন্নতার মধ্যে সঠিক-বেঠিক আছে, কিন্তু হক-বাতিল ও আনুগত্য-নাফরমানি নেই। এজন্য তাদের কাউকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানানো জায়েয হবে না।
উম্মতের সালেহীন (নেককার বান্দাগণ)
উলামায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ উম্মতের সালেহীন ও আল্লাহর ওলীদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে প্রয়োজনীয় মনে করেন। কিন্তু তারা ভালবাসা ও শ্রদ্ধাকে কখনোই এই অর্থে নেন না যে, তারা বা তাদের কবর সিজদা ও তাওয়াফ এবং মান্নত ও কুরবানীর ক্ষেত্র!
তারা (নেককার) কবরবাসীদের থেকে ফয়েজ ও বরকত লাভে বিশ্বাসী, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়ার নয়। তারা কবরের কাছে উপস্থিত হওয়াকে অনুমোদন দেন, কিন্তু সেটাকে ঈদগাহ বানানোকে জায়েজ মনে করেন না। তারা (কবরবাসীকে) সওয়াব পৌঁছানোকে উত্তম ও মৃতের হক মনে করেন, কিন্তু এগুলোর প্রদর্শনী করতে তারা বলেন না।
তারা উত্তম চরিত্রগঠণ, আত্মশুদ্ধি ও ইবাদতে ইহসানের শক্তি গড়ে তোলার জন্য আল্লাহওয়ালাদের হাতে বাইয়াত ও তাদের সাহচর্য অবলম্বন করাকে সঠিক এবং ইহসানের নীতি ও নির্দেশাবলীকে অভিজ্ঞতার আলোকে উপকারী, বরং সাধারণদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জরুরি মনে করেন। এটাকে তারা শরীয়ত থেকে পৃথক পথ মনে করেন না, বরং বিশ্বাস করেন, এটা শরিয়তেরই বাতেনী ও আখলাকী অংশ।
ফিকহ ও ফকিহ
যেমনটি আগেই বলা হয়েছে, দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম শরিয়া আহকামের ইজতিহাদী ও শাখাগত মাসআলায় হানাফি ফিকহ অনুসরণ করে থাকেন; বরং উপমহাদেশের প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মুসলমানদের মধ্যে নব্বই শতাংশেরও বেশি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের এটাই মাসলাক। কিন্তু নিজেদের এই মাযহাব ও মাসলাককে ঢাল বানিয়ে অন্য মাযহাবকে বাতিল বলা বা মাযহাবের ইমামদের সমালোচনা করাকে বৈধ বলে মনে করে না তারা। কেননা এটা হক ও বাতিলের সংঘাত নয়, বরং উত্তম-সর্বোত্তম এবং সঠিক ও বেঠিক হওয়ার মতভিন্নতা। শাখাগত মাসআলায় ইমামদের ইজতিহাদে মতবিরোধ হওয়া একটি অনিবার্য বাস্তবতা। আর শরীয়তের দৃষ্টিতে এ পার্থক্য প্রকৃত অর্থে কোনো পার্থক্যই নয়। পবিত্র কোরআনে বলছে,
شَرَعَ لَكُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِۦ نُوحًۭا وَٱلَّذِىٓ أَوْحَيْنَآ إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِۦٓ إِبْرَٰهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰٓ ۖ أَنْ أَقِيمُوا۟ ٱلدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا۟ فِيهِ ۚ
অর্থাৎ, তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই বিধি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন, যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নুহকে। আর সেই (বিধি ব্যবস্থাই) তোমাকে ওয়াহীর মাধ্যমে দিলাম, যার হুকুম দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মুসা ও ঈসাকে- তা এই যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করো আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না। [8]সূরা শুরা: ১৩
এটা স্পষ্ট যে, হজরত নুহ আ.-এর সময় থেকে ঈসা আ.-এর যুগ পর্যন্ত শরিয়ত ও মানহাজের মধ্যে প্রকাশ্য মতানৈক্য ছিলো, তথাপি পবিত্র কোরআন এটাকে এক ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেছে। শরীয়তের শাখাগত বিষয়ে পারস্পরিক মতানৈক্য ধর্মের ঐক্য বিরোধী মনে করছে না কোরআন। যদি এই শাখাগত ভিন্নতা বিভক্তি ও মতানৈক্যের সীমার আওতায় আসে তাহলে ‘ولا تتفرقوا فيه অর্থাৎ, তাতে বিভক্তি সৃষ্টি করো না’ বলা কীভাবে সঠিক হতে পারে?
এজন্য ঐশী শরিয়তগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে একই ধর্ম বলা হয়েছে এবং যারা তাতে বিশ্বাস করে তারা সকলেই ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের একই সম্পর্কের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ, তাদের মধ্যে দলাদলি ও বিভক্তি নেই─ এ কারণেই তারা ‘و كانوا شيعا অর্থাৎ, তারাই দলে দলে বিভক্ত’ সীমার আওতায় আসেনি। ঠিক একইভাবে ইসলাম ধর্মের মধ্যেও শাখাগত ছোটখাটো মতভেদ তার ঐক্য ও একতাকে বিঘ্নিত করতে পারে না।
ইজতিহাদের ক্ষেত্রগুলোতে ইজতিহাদকারীদের ইজতিহাদও দ্বীনের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি। তাহলে এটাকে ধর্মের মধ্যে বিভক্তি কীভাবে বলা যায়? বাকি থাকলো মুজতাহিদগণের মধ্যে বিশেষ একজন মুজতাহিদের অনুসরণ ও অনুকরণের কথা; তো দীনি ব্যাপারে আত্ম-স্বাধীনতা এড়ানো এবং স্বেচ্ছাচারিতা থেকে দূরে থাকার জন্য উম্মতের অধিকাংশের মতে এটাই সর্বোত্তম পন্থা, যার জরুরত ও উপকারিতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাকলীদ তথা নির্দিষ্ট এক ইমামের অনুকরণের ক্ষেত্রে এটাই উলামায়ে দেওবন্দের কর্মপন্থা। তারা কোন ইমাম ও মুজতাহিদ বা তার ফিকহের কোন অংশকে উপহাস করা বা বেআদবের সহিত খণ্ডন ও সমালোচনা করাকে দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য ক্ষতি মনে করে। তাদের মতে, এই ইজতিহাদগুলো হলো শরীয়তের শাখাগত মাসআলায়, মূল মাসআলায় নয় যে, নিজেদের ফিকহকে কামড়ে ধরে অন্যদের খণ্ডন বা ফাসেক, পথভ্রষ্ট বলবে। অবশ্য নিজেদের গৃহীত ফিকহকে প্রাধান্য দেওয়াতে কোন সমস্যা নেই।
উল্লিখিত বিষয়ে উলামায়ে দেওবন্দের মাসলাক ও কর্মপন্থা সম্পর্কে তাদের রচিত গ্রন্থে (হাদিসের ব্যাখ্যা, তাফসির, ফিকহ ও কালাম ইত্যাদি) আলোচিত হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
উলামায়ে দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাগত ভারসাম্য
দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম ধর্মকে বোঝা ও বোঝানোর ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতিতে বিশ্বাসী নন, যা অতীত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। কেননা এটা অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক নয়, বরং একটি নতুন পন্থা। আবার এমন সীমালঙ্ঘনকেও সমর্থন করে না, যা রুসুম-রেওয়াজ ও বাপ-দাদার অনুকরণের নামে ইসলামের মধ্যে প্রবেশ করায় সর্বপ্রকারের বিদআত ও কুসংস্কার। যে আমলগুলোতে সূত্রপরম্পরা নেই এবং সেই সূত্রপরম্পরা খাইরুল কুরুনের সাথে যুক্ত নয়, সেই আমলগুলো ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। তারা এমন তাকলীদের পুরোপুরি সমর্থক, যা কোরআন ও হাদিস থেকে উৎসারিত হয়ে ইসলামি ফিকহ নামে চলে আসছে। পবিত্র কোরআনে পূর্বপুরুষদের তাকলীদের নিন্দা করার কারণ হলো, তাদের পূর্বপুরুষরা জ্ঞানী ও হেদায়েতপ্রাপ্ত ছিলো না।
পূর্ববর্তী ইমাম ও ইসলামের ফকিহগণ─যারা ছিলেন ইলম ও হেদায়েতের আলোয় আলোকিত─তাদের অনুসরণ করা শুধু এতটুকু নয় যে, তা নিন্দনীয়ই নয়, বরং এটা কাম্যও। আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, শুধু আম্বিয়া আলাইহিস সালামের প্রতি নয়─সিদ্দীক, শহিদ ও নেককারদের পথে চলা ও পরিচালিত হওয়ার জন্য প্রত্যেক নামাজে আল্লাহর কাছে দুআ করা; কেননা এটাই সীরাতে মুস্তাকিম তথা সঠিক পথ।
এই মধ্যপন্থী ও ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ অবলম্বনের কারণে দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম মাযহাবহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা থেকে সুরক্ষিত রয়েছেন। শিরক ও বিদআতের অন্ধকার তাদের টেনে নিতে পারেনি পথভ্রষ্টতার দিকে।
ফিকহের মধ্যে হাদিস ও সুন্নাতের সংযোজন
উপমহাদেশের কমবেশি নব্বই শতাংশ মুসলমান হানাফি ফিকহের অনুসারী। হানাফি ফিকহ হলো ইমাম আবু হানিফার ইজতিহাদ, তার ছাত্রদের ইখরাজ ও আসহাবে তারজীহের সিদ্ধান্তের সংকলনের নাম। এটা স্পষ্ট যে, এত আলোচনা ও গবেষণার পরও ফিকাহের কোনো মাসআলা শরিয়তের নীতিবিরুদ্ধে থাকতে পারে না। কিন্তু এই কর্মপদ্ধতির এটাও একটি দিক ছিলো যে, আমলকারীদের দৃষ্টি সর্বদা ইমাম ও ফকিহদের মাসআলা উদঘাটন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতো। যদিও সে আমলটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের আমলের পরিপন্থী হতো না, কিন্তু এতে আমলকারীদের অন্তর অনুভব করতো না পুরোপুরি প্রশান্তি। দারুল উলুম দেওবন্দের একটি বড় ঐতিহাসিক কৃতিত্ব যে, সে আমল ও ইবাদতকে তাদের মূল উৎসের সাথে যুক্ত করেছে। হাদিসের কিতাবাদি খোলা হয়েছে। নিবিড়ভাবে যাচাই করা হয়েছে হাদিস-বর্ণনাকারীদের। হাদিসের অর্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে গভীরভাবে। যদিও দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের এই আলোচনা ও গবেষণা-প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফিকহের কোন গ্রহণযোগ্য ফতোয়া শরীয়তের নীতিগুলোর সাথে সাংঘর্ষিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি, কিন্তু এই গবেষণাকর্ম (যা জাহেরী সম্প্রদায়ের ছাড়াছাড়ি ও বেদআতিদের বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত ও পবিত্র; সালাফে-সালেহীনের নির্ধারিত পদ্ধতির উপর প্রতিষ্ঠিত) এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয় যে, যে মাসআলাগুলো ফিকহ মনে করে মানা হতো, তা এখন আলো ছড়াচ্ছিলো সুন্নাতের নামে। এই আমলগুলোতে হাদিস অনুসরণের আনন্দ অনুভূত হতে থাকে, যা সম্ভব ছিলো না এই চিন্তাগত পরিবর্তন ব্যতীত।
দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম শুধুই উপমহাদেশের মুসলমানদেরকে সুন্নাহ সম্পর্কে সচেতন করেননি, বরং মিশর ও সিরিয়ার মতো অন্যান্য ইসলামি দেশও তাদের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। দেওবন্দি চিন্তাধারায় এটাই হলো নসুসু তথা কোরআন ও হাদিস বোঝার পছন্দনীয় পদ্ধতি। তাদের রচনাবলী যেমন, ফায়জুল-বারী শরহে বুখারি, আল-লামেউদ দুরারি শরহে বুখারি, ফাতহুল মুলহিম শরহে সহীহ মুসলিম, আল-কাউকাবুদ দুররি শরহে জামে তিরমিজি, মাআরিফুস-সুনান শরহে জামে তিরমিজি, আল-বাজলুল মাজহুদ শরহে সুনানে আবি দাউদ, আউজাযুল-মাসালিক শরহে মুআত্তা ইমাম মালেক, আমানিল-আহবার শরহ মাআনিল আছার লিত-তাহাবী, ইলাউস সুনান, তারজুমানুস সুন্নাহ, মাআরিফুল-হাদিস ইত্যাদিতে দেখা যেতে পারে তাদের এই পছন্দনীয় পদ্ধতি।
মুরতাদ হওয়ার ফেতনা ও ইসলামের সুরক্ষার লক্ষ্যে দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাসন্তান উলামায়ে কেরামের প্রশংসনীয় পদক্ষেপ
উপমহাদেশে ১৮৫৭ সালের রাজনৈতিক বিপ্লবের পর মুহাদ্দিসিনে দিল্লির অনুসারী দারুল উলুম দেওবন্দের মুরুব্বিগণ নিজেদের ইলমী ও দীনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে এই সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন যে, ক্ষমতার ছায়ায় যখন আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনগুলো বিকাশ লাভ করে, তখন দীনি ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের জমিনও কেঁপে উঠে। এ সম্পর্কে আমাদের সামনে রয়েছে উসমানীয় তুর্কিদের উদাহরণ। তুর্কিজাতি পশ্চিমা সভ্যতার ঝড়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে মোস্তফা কামালের নেতৃত্বে তার অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; যার ফলশ্রুতিতে তুর্কিদের ইসলামি সভ্যতা বিলীন হয়ে যায় পশ্চিমা সভ্যতায়। ফলে আরও একটি মহান ইসলামি সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায় ভূপৃষ্ঠ থেকে।
এটা ছিলো ইসলামি সভ্যতার জন্য অত্যন্ত সংকটময় একটি সময়। ইতিহাসের এই অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে দারুল উলুম দেওবন্দের মুরুব্বিগণের সামনে সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিলো পাশ্চাত্যের এই ঝড় থেকে ইসলামি সভ্যতাকে রক্ষা করা আর মুসলমানদের দ্বীনকে হেফাজত করে তাদেরকে মুরতাদ হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো। এই উদ্দেশ্যে তারা অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টিতে এমন প্রতিটি ময়দান নির্ধারণ করেন, যেখান থেকে মুসলমানদের উপর বুদ্ধিবৃত্তিক ও কর্মগত আক্রমণ হতে পারতো। অতঃপর তারা নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতার শেষটুকু দিয়ে হেকমত ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিহত করেন এই আক্রমণগুলো।
প্রথম ময়দান
অবিভক্ত ভারতের সিংহভাগ মুসলমানই এমন, যাদের পূর্বপুরুষরা একসময় হিন্দু ছিলেন। ব্রিটিশরা রাজনৈতিক ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ লাভের পর এখানকার হিন্দুদের উসকানি দিয়েছিলো যে, ‘এই মুসলমানরা─যারা এক সময় তোমাদের জাতির অংশ ছিলো─তোমাদের নিজেদের সংখ্যাগত শক্তি বাড়াতে তাদের আবারো হিন্দু বানানোর চেষ্টা করো।’ অতঃপর ইংরেজদের গুপ্ত সহায়তায় আর্য সমাজের মাধ্যমে পূর্ণ শক্তিতে শুরু হয় মুসলমানদের ধর্মান্তরিত করার আন্দোলন।
ইসলামের বিরুদ্ধে এই বুদ্ধিবৃত্তিক ময়দানে দারুল উলুম দেওবন্দ পরিস্থিতিকে ভয় না পেয়ে সফলভাবে ইসলামকে রক্ষা করেছে। বক্তৃতা, লেখনী, বিতর্ক এবং ইলমী ও দীনি প্রভাব এই ধর্মত্যাগের আন্দোলনকে অগ্রসর হতে বাধা দেয়। বিশেষ করে দেওবন্দি উলামায়ে কেরামের ইমাম ও নেতা হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি এ ব্যাপারে আঞ্জাম দেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী খেদমত। উপমহাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের একজন নগন্য ছাত্রও হযরতের এসব খেদমত সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত।
ভারত বিভক্তির অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে যখন উপমহাদেশের বেশিরভাগ অংশ রক্তের নদীতে নিমজ্জিত হয়েছিলো, তখনকার সেই ভয়ানক সময়েও ‘শুদ্ধি সংগঠন’ নামে গড়ে উঠে মুসলমানদের মুরতাদ বানানোর আন্দোলন। এ সময়েও দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম তৎকালীন রক্তাক্ত দৃশ্যের প্রতি উদাসীন হয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং মহান আল্লাহর সাহায্য ও সহযোগিতায় মুসলমানদের রক্ষা করেন এই ধর্মত্যাগের প্লাবন থেকে।
দ্বিতীয় ময়দান
ভারতে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর খ্রিস্টান মিশনারিরা উপমহাদেশে প্রবেশ করে এই ধারণা নিয়ে যে, তারা বিজয়ী জাতি। আর বিজিত জনগণ সহজেই বিজয়ী জাতির সংস্কৃতিকে মেনে নেয়। তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করে মুসলমানদের হৃদয় ও মন থেকে ইসলামের সংস্কৃতির ছাপ মুছে ফেলতে; অন্তত হালকা করতে, যাতে পরবর্তীতে সময়ে তা ক্ষয়ে যায়। এতে তারা যদি খ্রিস্টান না হয়, তাহলে এতটুকু হবে যে, তারা মুসলমানও থাকবে না।
এই ময়দানে দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার মুরুব্বিগণ সমস্ত শক্তি দিয়ে খ্রিস্টান মিশনারি ও ধর্মপ্রচারকদের মোকাবিলা করেন। শুধু জ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেননি, বরং খ্রিস্টীয় সভ্যতা ও তাদের ধর্মীয় উৎসের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে হযরত মাওলানা রহমতুল্লাহ কিরনভি রহ.এর বিশাল খেদমত সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত আছে ইলম ও জ্ঞানের জগত।
তৃতীয় ময়দান
এই খ্রিস্টানাইজেশন স্কিমের অধীনে সারা দেশে প্রচুর পরিমাণে ইংরেজি স্কুল স্থাপন করা হয়। ইসলামি মাদ্রাসাগুলোকে দুর্বল করার জন্য রুদ্ধ করা হয় তাদের জাগতিক উন্নতির সকল পথ। এ ময়দানে প্রয়োজন ছিলো কোরআন-হাদিসের সঠিক শিক্ষা এবং ইসলামের মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশের জন্য সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে আরবি মাদরাসাগুলোকে সর্বশক্তি দিয়ে চালু রাখা। এছাড়াও দরকার ছিলো আধুনিক আরবি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা এবং চেষ্টা করা যেন ইসলামের নামে কোনো ‘অপরিচিত’ বিষয় ইসলামে প্রবেশ না করে। আধুনিক সমসাময়িক ধ্যান-ধারণা যেন সালাফে সালেহীনের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত চিন্তা ও আমলকে দুর্বল করতে না পারে─তার প্রতি খেয়াল রাখা।
এই ময়দানেও দারুল উলুম ও তার আকাবির উলামায়ে কেরাম তাদের পূর্ণ দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দেন। হিন্দুস্তানে আরবি মাদ্রাসাগুলোর মাধ্যমে জ্বেলে দেন দীনি ইলমের প্রদীপ। তারা এই বিষয়ের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেন যে, উপমহাদেশে যেন ইসলাম নিজস্ব রূপে অবশিষ্ট থাকে। এ ময়দানে হযরত হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবি, তার বিশিষ্ট বন্ধু মুহাদ্দিস মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি, হযরত মাওলানা খলিল আহমদ মুহাদ্দিস সাহরানপুরি, হযরত শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি এবং স্বাধীনতার পর মাওলানা মুহাম্মদ হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ. প্রমুখ পালন করেন সফল ভূমিকা।
দারুল উলুম জাতিকে কী দিয়েছে
১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাহ্যত ব্যর্থ হওয়া ভগ্নহৃদয় মুসলমানদের দীনি ও জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করেছে দারুল উলুম দেওবন্দ। ওয়ালীউল্লাহী মানহাজের উপর ব্যাপকভাবে প্রসার করেছে দীনি শিক্ষা। দমন করেছে ইসলাম বিরোধী আন্দোলন। উপমহাদেশ ও অন্যান্য দেশে মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের মাধ্যমে উচ্চকিত করেছে ‘আল্লাহ তাআলা বলেন’ ‘আল্লাহর রাসুল বলেন’র আওয়াজ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অত্যাচারী শক্তিকে সমূলে উৎখাত করে স্বাধীন করেছে ভারতবর্ষ। ইসলাম ও ইসলামের নবীর উপর অন্যায় হামলার জবাব দিয়েছে। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, কালাম ও সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছে। রক্ষা করেছে সাহাবাদের মহানুভবতা ও পূর্বপুরুষদের সম্মান। খতমে নবুওয়াত আকিদা অস্বীকারকারীদের প্রতিরোধ করেছে সফলভাবে। বিদআতের অন্ধকারে জ্বালিয়েছে সুন্নাহর মশাল। ভবিষ্যত-কর্মের জন্য জন্ম দিয়েছে শত শত মুজাহিদ, আলেম, মুহাদ্দিস, মুতকাল্লিম, ফকিহ, পীর, ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, খতিব, ডাক্তার, তার্কিক, সাংবাদিক, সুফী, ক্বারী, হাফেজ ও রাজনীতিবিদ।
তথ্যসূত্র: