তারানায়ে হিন্দি থেকে তারানায়ে মিল্লি : ইকবালের জাতীয়তাবাদী চিন্তার সুলুক সন্ধান

আবুল কাসেম আদিল

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বৈশ্বিক ও ভারতীয় রাজনীতি যখন চরম উত্তাল, তখন এখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ‘জাতীয়তাবাদ’। উপমহাদেশে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পতন-ঘণ্টা বাজছিল, ঠিক সেই সংবেদনশীল সময়ে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা আবুল আলা মওদুদি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদসহ এই উপমহাদেশের সব ঘরানার মনীষীরা এই তত্ত্বীয় তর্কে অবতীর্ণ হন।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক আবর্তের মধ্যে দাঁড়িয়ে গভীর প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করেন কবি ও দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল। ভৌগোলিক সীমানা কিংবা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করেছিলেন ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব ও ধর্মীয় দর্শনের আলোকে।

ইকবালের রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এতে একটি সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক বিবর্তন পরিদৃষ্ট হয়। প্রাথমিক জীবনে তিনি অঞ্চলভিত্তিক স্বাদেশিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বজনীন উম্মাহ-তত্ত্বে স্থির হন এবং ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে মানবসমাজ বিভক্তকারী এক নব্য মূর্তিপূজা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ‘স্বদেশপূজা’ ও ‘স্বদেশপ্রেম’-এর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করেন।

ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের সমালোচনা

আল্লামা ইকবালের রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের কঠোর সমালোচনা। ইউরোপীয় মডেলে জাতি গঠনের প্রাথমিক উপাদান ধরা হয় নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, ভাষা, বর্ণ এবং সংস্কৃতিকে। ইকবাল এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত গঠনপ্রক্রিয়া, মনস্তাত্ত্বিক রূপ এবং বৈশ্বিক প্রভাবকে সুগভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে উন্মোচিত করেছেন।

ইকবালের মতে, পশ্চিমের উদ্ভাবিত এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ কেবল একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় ধারণা নয়; বরং এটি একটি নব্য মূর্তিপূজা। প্রাচীনকালে মানুষ পাথর খোদাই করে মূর্তি বানাত, আর আধুনিক সভ্যতা মাটির রাজনৈতিক সীমানাকে উপাস্যের আসনে বসিয়েছে।

তিনি তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘ওয়াতানিয়াত’-এ এই সত্য উন্মোচন করে বলেন, ‘মুসলমানও তৈরি করে নিয়েছে স্বীয় কাবাগৃহ / আধুনিক সভ্যতার নতুন ‘আজর’ আবার গড়ে তুলেছে নতুন সব মূর্তি!’

ইকবালের মতে রাজনৈতিক উপাস্যগুলোর মধ্যে ‘স্বদেশ’ বা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদই সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক মূর্তি, যা মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়। (ওয়াতানিয়াত, বাঙ্গে দারা)

প্রত্যেক জাতি যখন নিজ জাতির স্বার্থকে সর্বোচ্চ ও পরম সত্য ধরে নিয়ে সর্বজনীন নীতি ও মানবিক নৈতিকতার ওপরে স্থান দেওয়া হয়, তখন তা চরম আগ্রাসনে রূপ নেয়। ইকবাল প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, বাণিজ্যের নামে ঔপনিবেশিক আধিপত্য। তিনি দেখেন, দুর্গত ও দুর্বল জাতিগুলোর ওপর জুলুমের মূল কারণই ছিল পশ্চিমা ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা।

এই রাজনৈতিক অন্ধত্বের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করে ইকবাল বলেন—

বিশ্বের জাতিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুন জ্বলে তো এই কারণেই,

বাণিজ্যের ছলে দেশ জয়ের লালসা জাগে তো এই কারণেই।

রাজনীতি অসৎ হয়ে পড়ে তো এই কারণেই,

দুর্বলের গৃহ ছারখার ও ধ্বংস হয় তো এই কারণেই। (ওয়াতানিয়াত, বাঙ্গে দারা)

ইকবাল জাতীয়তাবাদকে আখ্যা দিয়েছেন, আঞ্চলিক বন্দিদশা বলে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘জাতীয়তাবাদ যদি একত্ববাদী বিশ্বাসকে ছাপিয়ে ভূখণ্ডের বন্দিদশায় রূপ নেয়, তবে মানুষের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায়।’

ইকবাল তাত্ত্বিকভাবে দেখিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংহতি বিনষ্ট করা এবং বিশেষত মুসলিম বিশ্বকে রাজনৈতিকভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করার জন্য ইউরোপ এই ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ইকবাল বলেন, ‘মানুষে মানুষে বিভাজনের ছকে ফেলাই তো পাশ্চাত্যের দর্শনের মূল / ইসলামের একমাত্র উদ্দেশ্য—আদম সন্তানদের ঐক্য।’ (মক্কা আওর জেনেভা, যরবে কালীম)

তিনি প্রমাণ হিসেবে মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের রাজনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, নবুয়তের মূল লক্ষ্য ছিল তাওহীদ ও শরীয়াহভিত্তিক এক বিশ্বজনীন মানবসমাজ গড়ে তোলা, কোনো আরব জাতীয়তাবাদ গড়ে তোলা নয়। ভৌগোলিক ঐক্যের নামে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করা মানে সেই মুহাম্মাদী দ্বীনি সৌধেরই ভিটেমাটি ধ্বংস করা। তাঁর ভাষায়: ‘নব্য সভ্যতার গড়া এই নতুন মূর্তি / এ তো মুহাম্মাদী দ্বীন-সৌধের ধ্বংসের সর্বনেশে শক্তি!’ (ওয়াতানিয়াত, বাঙ্গে দারা)

মোদ্দা কথা, ইকবালের চিন্তায় ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের স্বরূপ হলো, এটি একটি বস্তুবাদী, বর্ণভিত্তিক, সংকীর্ণ এবং শোষণে ভরা রাজনৈতিক দর্শন। এটি মানুষকে আধ্যাত্মিক ও সর্বজনীন মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভৌগোলিক শৃঙ্খলে বন্দি করে ফেলে। ইকবাল এই রাজনৈতিক দর্শনকে চূড়ান্তভাবে খণ্ডন করে সর্বজনীন মানবিক ও আদর্শিক ঐক্যের বিকল্প রূপরেখা পেশ করেছেন।

ইকবালের চিন্তার বিবর্তন : তারানায়ে হিন্দি থেকে তারানায়ে মিল্লি

আল্লামা ইকবালের জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশ হঠাৎ করে ঘটেনি; বরং তাঁর কাব্য ও চিন্তা পরিক্রমায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট তাত্ত্বিক বিবর্তন দৃশ্যমান। প্রাথমিক জীবনের ভৌগোলিক স্বদেশপ্রেম, ইউরোপ ভ্রমণের মাধ্যমে প্রাপ্ত উপলব্ধি এবং পরবর্তীতে ইসলামি বিশ্বজনীনতায় উপনীত হওয়া—এই রূপান্তরটি ছিল মূলত এক পরম আত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক সফর।

কাব্যজীবনের সূচনালগ্নে ইকবাল ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের বহু সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং আঞ্চলিক স্বাদেশিকতার প্রতি গভীর অনুরাগী। আধুনিক জাতীয়তাবাদের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রত্যক্ষ করার পূর্বে তিনি ভারতীয় ভৌগোলিক ভূখণ্ডের একতা ও তার মাটিকে অত্যন্ত পবিত্র জ্ঞান করতেন। এই কালপর্বেই তিনি লিখেছেন বিখ্যাত ‘তারানায়ে হিন্দি’। ইকবাল উপমহাদেশের সর্বজনীন ভারতীয় পরিচয়ের জয়গান গেয়ে লিখেছিলেন, ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তাঁ হামারা / হাম বুলবুলেঁ হেঁ ইসকি, ইয়ে গুলসিতাঁ হামারা।’

এই কাল পর্বে তিনি আরো লিখেছেন, ‘মাটির মূর্তির মধ্যে তুমি ভেবেছ ঈশ্বর বিদ্যমান / আমার কাছে তো স্বদেশের ধূলিকণাও দেবতা!’ (নয়া শিওয়ালা, বাঙ্গে দারা)

এছাড়াও ‘হিন্দুস্তানি বাচ্চূঁ কা গীত’ এবং ‘তাসবীরে দর্দ’ কবিতার মাধ্যমে তাঁর তৎকালীন ভৌগোলিক ভারতীয় স্বদেশপ্রেম উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছিল।

পরবর্তীতে ইকবাল যখন উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে অবস্থান করেন, তখন পশ্চিমা রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার অন্তর্নিহিত রূপ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। তিনি উপলব্ধি করতে শুরু করেন, ইউরোপীয় ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ প্রকৃতপক্ষে মানবজাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করার একটি সূক্ষ্ম কৌশল এবং এটি সর্বজনীন মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধের পরিপন্থী।

ইউরোপ থেকে ভারতে ফিরে আসার পর এই তাত্ত্বিক উপলব্ধি তাঁর মনে আরো গভীর হতে থাকে। পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া, ব্রিটিশ-সমর্থিত আরব বিদ্রোহ এবং অটোমান খিলাফতের পতন প্রত্যক্ষ করে ইকবাল শতভাগ নিশ্চিত হন, মুসলিম বিশ্বের এই রাজনৈতিক সংঘাত ও বিপর্যয়ের মূলে রয়েছে জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ।

এসব বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করে ইকবাল তাঁর চিন্তাধারাকে পুনর্মূল্যায়ন করেন এবং চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেন: ‘এই আধুনিক উপাস্যগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ দেশ / যার পরিধানে জড়ানো ধর্মের কাফন!’ (ওয়াতানিয়াত, বাঙ্গে দারা) তিনি বোঝাতে চান, জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে দেশই উপাস্য হয়ে ওঠে। দেশের গায়ে ধর্মের পোশাক দ্বারা তিনি বোঝাতে চান, ধর্মের আচ্ছাদন পরিধান করে দেশই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত ধর্ম।

চিন্তার রূপান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়ে ইকবাল ভৌগোলিক সীমানার শৃঙ্খল চিরতরে চূর্ণ করে বিশ্বজনীন উম্মাহ ও ইসলামি ‘মিল্লাতের’ পতাকাবাহী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বুঝতে পারেন, ভৌগোলিক পরিচয় কোনো স্থায়ী বা পরম সত্তা হতে পারে না। তিনি রচনা করেন তাঁর কালজয়ী ‘তারানায়ে মিল্লি’। এই কবিতায় তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের পরিবর্তে সমগ্র বিশ্বকে একজন মুমিনের ঠিকানা হিসেবে ঘোষণা করেন:

চীন ও আরব আমাদের, হিন্দুস্তানও আমাদের,

আমরা যে মুসলিম, নিখিল ধরণীই আমাদের দেশ!

একত্ববাদের সুমহান আমানত গচ্ছিত আছে আমাদের বক্ষে,

সহজ নয় মুছে ফেলা আমাদের নাম ও নিশানা!

(তারানায়ে মিল্লি, বাঙ্গে দারা)

তিনি আরো স্পষ্ট ভাষায় কাল ও স্থানের সীমানা পেরিয়ে মুমিনের অসীম ও বিশ্বজনীন অবস্থানের রূপ প্রকাশ করে বলেন, ‘খোদার প্রেমে বিভোর দরবেশ না প্রাচ্যের, না পাশ্চাত্যের / আমার বাড়ি দিল্লিও নয়, ইসফাহান নয়, সমরকন্দও নয়।’ (বালে জিবরীল)

ইকবাল তাঁর কাব্যের মাধ্যমে সমগ্র উম্মাহকে বর্ণ, রক্ত ও ভৌগোলিক মূর্তি ভেঙে একক তাওহীদি আদর্শে একাকার হওয়ার উদাত্ত ডাক দেন—‘রক্ত ও বর্ণভেদের মূর্তি ভেঙে বিলীন হয়ে যাও মিল্লাতে / থাকবে না আর তূরানি, ইরানি বা আফগানি।’ (তুলূয়ে ইসলাম, বাঙ্গে দারা)

তিনি আরো লেখেন—

স্বার্থপরতা খণ্ডবিখণ্ড করেছে মানবজাতিকে,

তুমি হয়ে ওঠো ভ্রাতৃত্বের রূপ, ভালোবাসার ভাষা।

এ ভারতীয়, সে খুরাসানি, কেউ বা আফগান, আবার কেউ তূরানি—

ওহে কূলহারা নাবিক, এবার গর্জে উঠে হয়ে যাও সীমাহীন মহাসমুদ্র!

(তুলূয়ে ইসলাম, বাঙ্গে দারা)

আরো লেখেন—

একত্ববাদের সুমহান শক্তিতে বলীয়ান তোর বাহু,

ইসলামই তোর স্বদেশ, তুই মোস্তফার পথের পদাতিক।

সুপ্রাচীন মহিমার দৃশ্য দে দেখিয়ে,

ওহে মোস্তফার অনুসারী, ধুলোয় মিশিয়ে দে এই মূর্তিকে!

(ওয়াতানিয়াত, বাঙ্গে দারা)

ইকবালের চিন্তার এই বিবর্তন ভারতীয় স্বাদেশিকতা বা ভৌগোলিক সীমানাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করে এক বিশ্বজনীন আদর্শিক ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে ধাবিত হয়। যে সফর শুরু হয়েছিল ‘তারানায়ে হিন্দি’ থেকে, তা ‘তারানায়ে মিল্লি’-তে গিয়ে শেষ হয়।

স্বদেশপ্রেম বনাম স্বদেশপূজা

আল্লামা ইকবালের জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত দর্শনে স্বদেশপ্রেম এবং স্বদেশপূজার সূক্ষ্ম অথচ মৌলিক তাত্ত্বিক পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি। ইকবাল স্বদেশপূজার প্রখর বিরোধী হলেও, জন্মভূমির প্রতি মানুষের সহজাত অনুরাগের কখনোই বিরোধী ছিলেন না।

ইকবালের মতে, ‘স্বদেশপ্রেম’ হলো, নিজ জন্মভূমি, পরিবেশ ও অধিবাসীদের প্রতি মানুষের প্রাকৃতিক ও আত্মিক টান। তবে ইকবালের কাছে এই ভালোবাসা কেবল অন্ধ আবেগ নয়; বরং সংকটকালে নিজ দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক নৈতিক দায়িত্ব। ‘শুয়ায়ে উমিদ’ (আশার আলোকরশ্মি) কবিতায় একটি আলোকরশ্মি প্রাচ্যের নিস্তেজ পরিবেশ ছেড়ে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এই রূপকের মাধ্যমে কবি জন্মভূমির প্রতি নিজের গভীর দায়বদ্ধতা ও আশাবাদী অনুভূতিরই প্রকাশ ঘটিয়েছেন:

ছাড়ব না আমি ভারতের এই আঁধার আকাশ,

যতক্ষণ না ঘোর নিদ্রা থেকে জেগে ওঠে মানবকুল!

প্রাচ্যের সকল আশার কেন্দ্রবিন্দু তো এই পবিত্র মাটি,

ইকবালের চোখের জলে সিঞ্চিত যে পুণ্য ভূমি!

(শুয়ায়ে উমিদ, যরবে কালীম)

আল্লামা ইকবাল পুত্র জাভেদের উদ্দেশে লেখা কবিতায় নিজ দেশের মাটিকে মর্যাদা দিতে এবং স্বাবলম্বী হতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমা কাঁচশিল্পীদের অনুগ্রহ কুড়িও না / ভারতের এই কাদা-মাটি থেকেই বানিয়ে নাও নিজের পানপাত্র।’ (জাভেদ কে নাম, বালে জিবরীল)

অন্যদিকে, ‘স্বদেশপূজা’ হলো যখন স্বদেশ বা ভূখণ্ডকে একটি পরম রাজনৈতিক তত্ত্ব বানিয়ে ফেলা হয় এবং তাকে দ্বীন, নৈতিকতা ও বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের ওপরে স্থান দিয়ে উপাস্যের আসনে বসানো হয়।

ইকবাল তাঁর এক বক্তৃতায় দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের মধ্যকার তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট করে বলেন, ‘আধুনিক রাজনৈতিক সাহিত্যে স্বদেশ-এর ধারণাটি কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বদেশ হলো, মানবসমাজ পুনর্গঠনের একটি মৌলিক আদর্শ এবং সেই বিচারে এটি একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব। যেহেতু ইসলামও মানবসমাজ ও যৌথ জীবন পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ ঐশ্বরিক জীবনবিধান, তাই ‘স্বদেশ’ শব্দটিকে যখন কোনো রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তা সরাসরি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।’ (মাওযূয়াতে খুতূবাতে ইকবাল, ইকবাল অ্যাকাডেমি, পাকিস্তান)

অন্ধ স্বাদেশিকতার এই চতুর রূপ উন্মোচিত করার জন্য ইকবাল তাঁর বিখ্যাত ‘ওয়াতানিয়াত’ কবিতার উপ-শিরোনাম দিয়েছিলেন: ‘রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে স্বদেশ’ (ওয়াতান বহাইসিয়াত এক সিয়াসী তাসাব্বুর কে)।

ইকবালের সামগ্রিক দর্শনে স্বদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসায় কোনো বাধা নেই, এটিই দেশপ্রেম। কিন্তু দেশকে আদর্শিক সত্তা বা রাজনৈতিক খোদা বানিয়ে সর্বজনীন সততা ও মানবিকতাকে উপেক্ষা করাই হলো স্বদেশপূজা। ইকবাল এই রাজনৈতিক সংজ্ঞায়নকেই নব্য সভ্যতার মূর্তিপূজা বলে অভিহিত করেছিলেন।

মিল্লাত ও ইসলামি জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ভিত্তি

সংঘাতময় ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের বিকল্প হিসেবে আল্লামা ইকবাল একটি সুসংহত ও বিশ্বজনীন কাঠামোর প্রস্তাব করেন, যা ‘মিল্লাত’ বা সর্বজনীন উম্মাহর ধারণা নামে পরিচিত। ইকবালের মতে, মুসলিম জাতির অস্তিত্ব মাটি, বংশ বা ভাষার মতো কোনো পার্থিব সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং তা তাওহীদি আকিদা ও সুনির্দিষ্ট এক আদর্শিক দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

ইকবালের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো তাওহীদ। পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ যেখানে ভূখণ্ডের প্রাচীর তুলে মানুষকে বিভক্ত করে, সেখানে ইকবালের ‘মিল্লাত’ তাওহীদের এক সুতায় বিশ্ব মুসলিমকে একীভূত করে।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদত্ত ইকবালের বিখ্যাত স্মারক বক্তৃতা ‘মিল্লাতে বায়জা পর এক ইমরানি নজর’ (ইসলামি মিল্লাতের সমাজতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ)-এ এই দর্শনের সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ ফুটে ওঠে। উক্ত বক্তৃতায় পাশ্চাত্য সমাজ আর ইসলামি সমাজের মৌলিক বৈপরীত্য চিহ্নিত করে ইকবাল বলেছিলেন:

‘পাশ্চাত্য মানুষের কাছে মাটি বা জন্মভূমি হলো তাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রতীক ও ঐক্যসূত্র; আর একজন মুসলিমের কাছে তার আকিদা ও ঈমানের ধারণাই হলো জাতীয় অস্তিত্বের পরম কেন্দ্রবিন্দু।’ (মিল্লাতে বায়জা পর এক নজর, মাকালাতে ইকবাল)

তবে এই আদর্শিক ঐক্য থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে মুসলিম বিশ্বের অনৈক্য ইকবালকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাঁর বিখ্যাত ‘জাওয়াবে শিকওয়াহ’ কবিতায় এই ক্ষোভ ও আক্ষেপ ফুটিয়ে তুলে তিনি লেখেন:

এই জাতির লাভ-ক্ষতি, জয়-পরাজয় সবই এক,

সবার নবী এক, দ্বীন এক, ঈমানের স্তম্ভও এক!

একই কাবা, একই আল্লাহ, আর সবার গ্রন্থও এক কুরআন—

আফসোসের বিষয়, এই মুসলিমরা এক হতে পারল না!

(জাওয়াবে শিকওয়াহ)

অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দ্বিজাতিতত্ত্ব

উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের অখণ্ড ভারতের প্রস্তাব এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের যে দ্বন্দ্ব ছিল, ইকবাল সেখানে নিজস্ব দার্শনিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

তৎকালীন অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক মডেলে ‘এক ভূখণ্ড, এক জাতি’-তত্ত্বের মাধ্যমে যে রূপরেখা দেয়া হচ্ছিল, ইকবাল তা পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর মতে, বহু-জাতি ও বহু-সংস্কৃতির ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল ভৌগোলিক পরিচয়ে একক জাতি গঠন করা হলে তা রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করবে।

ইকবাল যুক্তি দেন, হিন্দু ও মুসলিম দুটি পৃথক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনদর্শনের বাহক। ফলে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন বা পৃথক রাষ্ট্রের যে দাবি (যা পরবর্তীতে দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি হয়ে ওঠে), তা ছিল ইকবালের এই মতাদর্শেরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

আল্লামা ইকবালের জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত সামগ্রিক চিন্তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি জাতীয়তাবাদকে কেবল একটি রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবে দেখেননি; বরং একে নৈতিকতা, মানবজাতির ঐক্য এবং সামাজিক সুবিচারের কষ্টিপাথরে বিচার করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এক সর্বজনীন ও আত্মিক মানবসমাজ গঠনের পক্ষে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments