হিন্দুস্তানের ভূমিতে ইলম ও উলামায়ে কেরাম

মূল : হাবিবুর রহমান আজমি

আরব-হিন্দুস্তান সংযোগ 

ইসলামের নবীর নবুওয়াতপ্রাপ্তির বহু শতাব্দী আগে থেকেই আরব ও হিন্দুস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো, যা অব্যাহত ছিলো ইসলামের আবির্ভাবের পরেও। আরবরা সিন্ধু ও মালিবার (বর্তমানে মালাবার) থেকে গুজরাট পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিলো, যার মাধ্যমে ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে ইসলাম ও  ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও  সংস্কৃতির রশ্মি। [1]কিছু কিছু পণ্ডিত লিখেছেন, আরব ব্যবসায়ীরা ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে … Continue reading

ফারুকী যুগে হযরত হাকাম বিন আবুল আস-এর নেতৃত্বে তৎকালীন বিখ্যাত ভারতীয় বন্দর ‘থানা’য় অবতরণ করে মুজাহিদীন ও ইসলাম প্রচারকদের প্রথম কাফেলা। এরপর ভারতের উপকূলীয় এলাকা পরিণত হয় মুজাহিদীন ও ইসলাম-প্রচারকদের একটি স্থায়ী ক্যাম্পে। ইসলামী কাফেলাগুলো অল্প সময়ের ব্যবধানে আসতে থাকে, যার মধ্যে ছিলেন মহানবীর সাহচর্য লাভে ধন্য ব্যক্তিবর্গও। তাদের বিশেষ মিশন ছিলো এটাই─তারা যে-দেশেই পৌঁছেন সেখানেই ‘আল্লাহ তাআলা এই বলেছেন’ ‘আল্লাহর রাসূল এই বলেছেন’এর প্রাণসঞ্চারী ধ্বনিতে নবজীবন দান করা।  এভাবে ইসলামের শুরু থেকেই হিন্দুস্তানের ভূমি পরিচিত হয়ে উঠেছিলো ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে।

 

উমাইয়া যুগের হিন্দুস্তানি উলামায়ে কেরাম 

খেলাফতে রাশেদার পর যখন খেলাফতের বাগডোর আসে উমাইয়া খলিফাগণের হাতে তখন তারাও এই অঞ্চলগুলোর ওপর নজর রাখে। ৯৩ হিজরিতে (খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সময়) মুহাম্মদ বিন কাসিম সাকাফীকে এই অঞ্চলের শাসক হিসেবে পাঠানো হয়। তিনি নিজের শক্তিশালী সেনাবাহিনী সঙ্গে নিয়ে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চলে উড়িয়ে দেন ইসলামের পতাকা। এ সময় থেকে এই অঞ্চলটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ২৫০ হিজরি পর্যন্ত এটি থাকে সরাসরি বাগদাদ ও দামেস্কের সিংহাসনের সাথে সম্পর্কিত।[2]বিস্তারিত জানতে দেখুন, ফুতুহুল বুলদান, ইমাম বালাজুরী; আল-ইকদুস সামিন, কাজী … Continue reading

এটা স্পষ্ট যে, এই দীর্ঘ সময়ে মুসলিম ইতিহাসের নীতি অনুসারে বিজিত জাতির জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী জাতির প্রভাব অবশ্যই ছিলো। উপরন্তু, এই স্থিতিশীল সম্পর্কের কারণে এটা নিশ্চিত যে, এই দুই দেশের মধ্যে জনমানুষের একটি বড় আকারের আবাদি তৈরি হয়। এভাবেই হিন্দুস্তানি মুসলমানরা ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতা শিখেছে সরাসরি সাহাবী, তাবেয়ি, তাবে-তাবেয়ি ও আরব শিক্ষকগণের কাছ থেকে। আর এ কারণেই জীবনী ও রিজালশাস্ত্রের বইগুলোতে হিজাযী, সিরিয়ান ও ইরাকি আলেমদের পাশাপাশি দেখা যায় হিন্দুস্তানি বংশোদ্ভূত আলেম ও মুহাদ্দিসদের। এদের মধ্যে সেই বরকতময় ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যারা সাহাবাদের সাক্ষাত লাভ করেছেন এবং তাদের থেকে গ্রহণ করেছেন ফয়েজ ও বরকত। যেমন─

(১) শায়খ আবদুর রহমান বিন আবু জায়েদ বায়লামানী, (বায়লামান অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত) যিনি হযরত উসমান গনি, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে উমর, আমীর মুয়াবিয়া, আমর ইবনে আউস, আমর ইবনে আবাসা, নাফে বিন জুবায়ের, আবদুর রহমান বিন আরজ রা. থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। শায়খ আবদুর রহমান থেকে হযরত আমর ইবনে আবাসা রা.এর ইসলাম গ্রহণের হাদিস সুনানে নাসাঈ গ্রন্থে এবং তাওয়াফে বিদা সংক্রান্ত হাদিস রয়েছে সুনানে তিরমিজী গ্রন্থে।[3]আল-ইকদুস সামিন: ২৮৭

(২) আব্দুর রহমান সিন্ধী। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘তিনি আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে এই হাদিস শুনেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশত খেয়ে ওজু করতেন না।’[4]তারিখে কাবির: ৩:২৯৫

(৩) ইমাম আবু মি’শার নাজিহ ইবনে আবদুর রহমান সিন্ধী রহ. (ওফাত: ১৭০ হি.)। তিনি মদিনায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তার পুত্র শায়েখ মুহাম্মদ ইবনে আবু মি’শারের বক্তব্য হলো─ ‘আমার বাবা ছিলেন একজন সিন্ধী। তার কান বিদ্ধ ছিলো। তিনি পেশায় ছিলেন একজন দর্জি।’

খতিব বাগদাদী লিখেছেন, ‘নাজিহ বিন আব্দুর রহমান সিন্ধী হাদিস শ্রবণ করেছেন হযরত আবু উমামাহ সাহাল বিন হানিফ, মুহাম্মাদ বিন কাব কুরাযী, নাফে (ইবনে উমর রা.এর গোলাম), সাঈদ মাকবুরী প্রমুখের কাছ থেকে।

তিনি ছিলেন মাগাজী’র বড় ইমাম। মাগাজী নিয়ে তার সংকলিত একটি গ্রন্থও রয়েছে।[5]তাযকিরাতুল হুফফাজ:১:২১২

৪. হারেস বায়লামানী। তিনি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. প্রমুখের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করেন।

এরা হলেন হিন্দুস্তানি বংশোদ্ভূত উলামায়ে কেরাম, যারা সরাসরি সাহাবীদের থেকে হাদীস শুনেছেন এবং তাদের থেকে লাভ করেছেন ফয়েজ ও বরকত।[6]বিস্তারিত জানতে পড়ুন, আল-ইকদুস সামিন, কাজী আতাহার মুবারকপুরী

তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সিন্ধুতে আরবদের আধিপত্যের অবসান ঘটলেও সেখানের দুটি শহরে─মানসুরা ও দেবল (ভাকার ও টাট)─ যথাক্রমে ৪১৬ হিজরি থেকে ৭৫২ হিজরি পর্যন্ত কায়েম ছিলো ইসলামী শাসনব্যবস্থা। এভাবে হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে এই ভূমি হয়ে থাকে ইসলাম ও ইসলামী জ্ঞানের সুরক্ষাকারী ও সুরক্ষিত কেন্দ্র। এই সময়ের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে রয়েছেন─ খালাফ বিন সালেম সিন্ধি (ওফাত:২৩১ হি.), মুহাম্মদ বিন আবু বাশার মুশইর নাজিহ সিন্ধি (ওফাত: ২৪৪ হি.), আবদ বিন হামিদ কিসাই (আব্দুল হামিদ) (ওফাত: ২৮২হি.) (কিস অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য, যারা তৃতীয় শতাব্দীতে ইলমী কার্যক্রমের মাধ্যমে পৃথিবীর এই অঞ্চলকে করে রেখেছিলেন ‘দারুল উলূম’ তথা ইলমের বাড়ি। সর্বশেষ উল্লিখিত বুজুর্গ সহীহ মুসলিমের হাদিসগুলোর ‘তাখরীজ’ও করেছিলেন। মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহিম দেবীলী (ওফাত: ৩২২ হি.) আহমাদ বিন আবদুল্লাহ দেবীলী (ওফাত: ৩৪৩ হি.) আবুল ফাওয়ারেস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ সিন্ধি (ওফাত: ৩৪৯ হি.) মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মদ দেবীলী (ওফাত: ৩৫৪হি.), আবুল আব্বাস আহমাদ বিন মুহাম্মাদ মনসুরী (ওফাত: ৩৭৪ হি.) প্রমুখ ছিলেন চতুর্থ শতাব্দীর ইলমী ব্যক্তিত্বদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের কাছ পাঠ গ্রহণ করেছিলেন হিজাজ, ইরাক, দামেস্ক ও সিরিয়ার উলামায়ে কেরাম।

এই প্রথম যুগে সিন্ধু, দেবল ও মুলতান ছিলো ইসলামী ইলম ও সংস্কৃতির কেন্দ্র।

 

গজনবী যুগের উলামায়ে কেরাম 

উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ইসলামী আধিপত্যের অবসানের পর ইসলাম তার প্রভাব বিস্তারের জন্য খুঁজে পায় নতুন পথ; সমুদ্রপথের বদলে এবার খাইবার পাসকে নির্বাচন করে নিজের প্রবেশের মাধ্যম হিসেবে। তাই আমরা দেখতে পাই, হিজরি পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে সুলতান মাহমুদ গজনবী লাহোরকে তার ঘাঁটি হিসেবে গ্রহণ করে সূচনা করেন ইসলামি ভারতের একটি নতুন যুগ। প্রকৃতপক্ষে এ সময় থেকেই ইসলাম ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রবেশ ঘটেছিলো ব্যাপক ও সুগঠিতভাবে। কেননা প্রথম যুগে ইসলামের রশ্মি উপকূলীয় অঞ্চল থেকে অগ্রসর হতে পারতো না। কিন্তু এবার তা ধীরে ধীরে সমগ্র হিন্দুস্তানকে নিজের রশ্মি দিয়ে করে তোলে আলোকিত ভূমি।

যে-সময়ে পাঞ্জাবের উপর গজনি সুলতানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সে-সময় সমস্ত ইসলামী ইলম, যেমন তাফসীর, হাদিস, ফিকহ, কালাম, তাসাওউফ সম্পূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। আর গজনী─যা সুলতান মাহমুদের যুগে ছিলো ইসলামী অনারব বিশ্বের বৃহত্তম জ্ঞানকেন্দ্র─হয়ে উঠে এই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থান। এজন্য পাঞ্জাব─যা গজনি সাম্রাজ্যের একটি অংশ হয়ে উঠেছিলো─রাজধানীর পরিবেশ ও প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া ছিলো অসম্ভব।

এই যুগে পাঞ্জাবের যে শহরটি জ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলো, তা হলো লাহোর। গজনবীদের বিজয়ের পর আমরা দেখি যে, মাশায়েখ ও আলেমদের কাফেলা একের পর এক অগ্রসর হচ্ছে লাহোরের দিকে। এই সময়ের উলামা-মাশায়েখের মধ্যে শায়েখ ইসমাইল লাহোরি হয়ে উঠেন (ওফাত: ৪৪৮ হি.) ভারতবাসীর জন্য বিশেষ ফয়েজ ও বরকত। তিনি হাদিস ও তাফসিরের সাগরসম আলেম হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন প্রভাবক বক্তা ও ওয়ায়েজ। তাঁর হাতে ইসলামগ্রহণ করেন বহু মানুষ।[7]তাযকিরায়ে উলামায়ে হিন্দ: ২৩, মাকালাতে সুলাইমান: ২: ৪

এই যুগের লাহোরি আলেমদের মধ্যে রয়েছেন শায়খ আবদুস সামাদ বিন আব্দুল রহমান লাহোরী (মৃত্যু: ৪২৯ হি.), যার জ্ঞানের ঝর্ণা সমরকন্দে নববী জ্ঞানের তৃষ্ণাকে করে রেখেছিলো পরিতৃপ্ত।[8]রিজালুস সিন্ধ ওয়াল হিন্দ: ১৭০ এছাড়াও ছিলেন শায়খ আলী বিন উসমান হাজওয়ারী (ওফাত: ৪৬৫ হি./ ১০৭২ খ্রি.)─দাতা গঞ্জ বখশ নামে পরিচিত─ যিনি লাহোরে ইলম ও মারেফাতের প্রদীপ এতোটাই আলোকিত করেছিলেন, যার প্রভাব অনুভূত হয় আজও। তিনি বেশ কয়েকটি কিতাবও লিখেছেন, কিন্তু সেগুলোর মধ্যে এখন কেবল কাশফুল-মাহজুব পাওয়া যায়। এই কিতাব সম্পর্কে দারাশিকওয়াহ লিখেছেন,

‘এই গ্রন্থটি নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নেই। এটি একটি কামেল মুর্শেদ। ফারসি ভাষায় তাসাওউফের ওপর এ ধরনের কোনো গ্রন্থ লেখা হয়নি।’

এসব প্রতিভা ছাড়াও শায়েখ আবুল হাসান আলী বিন লাহোরিও এ যুগের একটি স্মৃতিচিহ্ন। তার সম্পর্কে মাওলানা আব্দুল হাই হাসানী লিখেছেন, ‘এই আলেম মুহাদ্দিস ছিলেন একজন শায়েখ, একজন সাহিত্যিক, একজন কবি ও অত্যাধিক মুখস্থকারী। তার ফয়েজ ও বরকত বিস্তৃত ছিলো বাগদাদেও। ইমাম সামআনী লিখেছেন, ‘আমি নিজে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারিনি, কিন্তু আমি হাফেজ আবুল ফজল মুহাম্মদ বিন নাসির সালামী বাগদাদীর মাধ্যমে তার ছাত্র। তিনি ৫২৯ হিজরিতে লাহোরে ইন্তেকাল করেন।’[9]নুজহাতুল খাওয়াতির: ১:৮২ লাহোরের আরেকজন আলেম ও মুহাদ্দিস হলেন মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ─ যিনি ছিলেন হাদিসের সাথে ফিকহ তথা আইনশাস্ত্র ও বিতর্কশাস্ত্রে পারদর্শী। ইমাম আবুল মুজাফফর সামআনি, আবুল ফাতাহ আব্দুল রাজ্জাক আল-মানিয়ী, আবু বকর বিন খালাফ শিরাজী, আবু ইসহাক ইব্রাহিম বিন উমর ইস্পাহানী প্রমুখের শিষ্যত্ব তিনি অর্জন করেছিলেন। আর ইমাম আবু সাঈদ আবদুল করিম সামআনি ‘আনসাবুল আশরাফ’ গ্রন্থের লেখকের মতো ‘যুগশ্রেষ্ঠ আল্লামা’র তিনি ছিলেন উস্তাদ। তিনি ৫৪০ হিজরির কাছাকাছি সময়ে ইন্তেকাল করেন।[10]রিজালুস সিন্ধ ওয়াল হিন্দ: ২৩৫

এই সমস্ত আলেম হলেন এমন─ যাদের ইলমী ফায়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হয়েছে হিন্দুস্তানের চেয়ে বেশি অন্যান্য ইসলামি দেশগুলো। অবশেষে হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে ইমাম সানআনী ‘মাশারিকুল আনওয়ার’ গ্রন্থের লেখক হয়ে উঠেন হিন্দুস্তানের জন্য গর্বের উৎস। তাঁর পূর্ণ নাম হাসান বিন মুহাম্মদ। ৫৭৭ হিজরিতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন নিজের পিতার কাছ থেকে। তারপর ইয়েমেন, হিজাজ, ইরাক ইত্যাদি অঞ্চলে ইলমী সফর করে সেখানের বড় বড় আলেমের থেকে ইলম হাসিল করেন এবং লাভ করেন ‘লুগাত ও হাদিসের ইমাম’ উপাধি। মাশারিকুল আনওয়ার ছাড়াও মিসবাহুদ দুজা ফী হাদিসিল মুস্তফা, আশ-শামসুল মুনিরাহ, শরহে বুখারি এবং মাওযুআতে হাদিস সম্পর্কে দুটি পুস্তিকা তাঁর ইলমী স্মৃতিচিহ্ন। হাদিসশাস্ত্রের পাশাপাশি লুগাত তথা ভাষা ও সাহিত্যে আল্লামা সানআনী রহ.এর রচনাগুলো হলো─

(১) আল-উবাবুজ-জাখের, ২০ খণ্ডে প্রকাশিত (২) মুজামুল-বাহরাইন ১২ খণ্ডে প্রকাশিত (৩) আল-শাওয়ারিদ (৪) কিতাবু আসমাইল আসাদ (৫) কিতাবু আসমাইজ জি’ব (৬) কিতাবুল আফআল (৭) কিতাবুল মাফউল (৮) কিতাবুল-আসফার (৯) কিতাবুল উরুজ (১০) শরহে আবয়াতুল মুফাসসাল (১১) বুগইয়াতুস সাইদান ও (১২) শারহুল কিলাদাতিস সামতিয়্যা ফি তাওশিহিল দুররিয়্যা ইত্যাদি। তিনি বাগদাদে ৬৫০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন।

মুসলিম সালতানাতের রাজধানী দিল্লী হওয়ার পর  লাহোরের এই সমস্ত ইলমী জাঁকজমক ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে। শাসনব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি বিপ্লব সত্ত্বেও এর ইলম ও উলামায়ে কেরামের মাহফিল কেবল দীর্ঘকাল অব্যাহতই থাকেনি, বরং দিন দিন এর আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পায়।

দিল্লি সাম্রাজ্য এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো, যখন তাতাররা ক্রমাগত আক্রমণের মাধ্যমে মধ্য-এশিয়াকে তছনছ করে সেখানকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও ইলমী ব্যবস্থাকে করেছিলো ব্যাহত ও বিশৃঙ্খল। এতে বিপুল সংখ্যক আলেম ও শিক্ষার্থী বাধ্য হয় তাদের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে। বুখারা ও বাগদাদের এই বিচ্ছিন্ন নক্ষত্রগুলো হিন্দুস্তানের জ্ঞান-আকাশে চন্দ্র ও সূর্য হয়ে জ্বলজ্বল করে উঠে। দিল্লি সালতানাতের যাত্রার শুরুতেই এমন একদল উলামায়ে কেরাম লাভ হয়, যারা তাদের উদ্ভাবনে সমগ্র দেশকে করে তোলেন সমৃদ্ধ।

দিল্লির সুলতান শামসুদ্দিন আলতামাশ আলেম-ওলামার সঙ্গ খুব পছন্দ করতেন। কোনো বুজুর্গ বা আলেমের আগমনের খবর পেলেই তিনি তাদের স্বাগত জানাতে মাইলের পর মাইল যেতেন এবং ভক্তি ও সম্মানের সাথে তাদের অতিথি‌ করে রাখতেন শাহী মহলে![11]ফুতুহুস সালাতীন: ১০৯-১০ সুলতান আলতামাশের এই ইলমপ্রিয়তা ও উলামায়ে কেরামের আতিথেয়তার প্রভাবে এদেশে বসতি স্থাপন করেন শত শত উলামা, মাশায়েখ ও সাহিত্যিক।

এই যুগে নিজেদের জ্ঞানগত ও আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভারতবর্ষের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন, এমন কয়েকজন বুজুর্গ হলেন─

১. শায়খ কুতুবুদ্দিন ২. বখতিয়ার কাকি আওশী ৩. কাজী হামিদুদ্দিন নাগুরি ৪. শায়খ বদরুদ্দিন ইসহাক ৫. শায়েখ জালালুদ্দীন তাবরিজি ৬. শায়েখ সাইয়েদ নুরুদ্দিন মুবারক গজনবী ৭. কাজী সাইদউদ্দিন কুর্দি ৮. শায়েখ নিজামউদ্দিন আবুল মাওঈদ ৯. শায়েখ বদরুদ্দিন গজনবী ১০. নিজামুল মুলক কামালউদ্দিন জুনাইদি ১১. শায়খুল ইসলাম নজিবুদ্দিন।

কাজী হামিদুদ্দিন নাগুরী ছিলেন লেখক ও বুজুর্গ। তার অধ্যয়ন ছিলো গভীর। বিশেষ করে তাসাওউফ সম্পর্কে তাঁর ছিলো ব্যাপক পড়াশোনা। রিসালায়ে ইশকিয়া, তাওয়ালিউশ শুমুস, লাওয়াইহ ও শরহে আসমায়ে হুসনা গ্রন্থগুলো তার তাসাওউফশাস্ত্রের স্মৃতিচিহ্ন।

এই যুগে দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ও আধ্যাত্মিক খানকাগুলোও প্রচুর পরিমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়; যেগুলোর মধ্যে মাদরাসায়ে মুইজ্জি ও মাদরাসায়ে নাসারি পরিচালিত হতো সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়। এছাড়াও উলামায়ে কেরাম এককভাবে নিজেদের স্থানে গড়ে তোলেন খানকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাশায়েখে  চিশতীর খানকাগুলোতে মাদরাসা থাকা যেন ছিলো বাধ্যতামূলক। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী তরিকার খানকা সংলগ্ন কোনো মাদ্রাসা ছিলো বলে জানা যায় না। তবে এই তরিকার প্রসিদ্ধ বুজুর্গ শায়েখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মুলতানি ছিলেন লেখাপড়ার প্রতি খুবই অনুরাগী। তিনি তার খানকা সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা চালু করেছিলেন, যেখানে তিনি নিজেও দরস দিতেন এবং অন্যান্য শিক্ষকদেরও যথেষ্ট বেতন ধার্য করে রেখেছিলেন পাঠদানের জন্য।

এ যুগে মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসা ছিলো প্রচুর পরিমাণে। প্রতিটি মসজিদে অবশ্যই চালু ছিলো কোন না-কোন আলেমের দরস ও পাঠদান।

 

সুলতান বলবনের যুগে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান

আমরা উল্লেখ করে এসেছি, যে-সময়ে দিল্লির সালতানাত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিলো, সে-সময় বেশিরভাগ ইসলামী দেশ পরিণত হয়েছিলো তাতারদের কর্তৃক রক্তপাত ও ধ্বংসের ঠিকানায়। সুলতান বলবনের যুগে হালাকু খান এই রক্তপাত ও হাঙ্গামার আগুনে আরও ইন্ধন যোগায়, যা তছনছ করে দেয় বাগদাদের ইলমী, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা। এজন্য এই অঞ্চলের বাকি আলেমগণ সেখান থেকে হিজরত করে নিরাপদ ভূমি হিন্দুস্তানের পথ ধরেন, যাদেরকে সুলতান বলবন গ্রহণ করেন উদারভাবে, সম্মানের সঙ্গে। এভাবে হিন্দুস্তানের ইলমী-যিন্দেগীতে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয় এবং দিল্লি পরিণত হয় বাগদাদ ও কর্ডোবার ঈর্ষায়।

এই সময়ের বিখ্যাত কিছু আলেম-উলামা হলেন─

১. শায়েখ শামসুদ্দিন খাওয়ারেজিমী, হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহ.এর উস্তাদ ২. শায়েখ বুরহানুদ্দীন বলখী ৩. শায়েখ বুরহানউদ্দিন বাজাজ ৪.  শায়েখ নাজমুদ্দিন দামেশকী ৫. কাজী রুকনুদ্দীন সামানা ৬. শায়েখ সিরাজুদ্দীন সাজযী ৭. শায়েখ শরফুদ্দিন দিলওয়ালজি ৮. কাজী জহিরউদ্দিন ৯. কাজী রফিউদ্দীন গাজরুনি[12]বিস্তারিত জানতে দেখুন, তারিখে ফিরোজশাহী: ৬৭

 

আলায়ি যুগে ইলমী উৎকর্ষ

সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি নিজে অক্ষরজ্ঞানহীন ছিলেন, কিন্তু ইলম ও উলামায়ে কেরামের প্রাচুর্যের কারণে তাঁর যুগকে বলা যায় ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। সমসাময়িক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারানি’র মতে, ‘সে-সময় সালতানাতের রাজধানী দিল্লিতে ছিচল্লিশজন আলেম ছিলেন এমন, যাদের উদাহরণ বিশ্বে খুঁজে পাওয়া ছিলো দুষ্কর। তাদের মধ্যে কয়েকজন আলেম ছিলেন ইমাম গাজ্জালী ও ইমাম রাজীর সমমর্যাদার।’

এ সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলেম-ওলামার নাম উল্লেখ করা হলো─

১. শায়েখ জিয়াউদ্দিন সুনামী, ‘নিসাবুল ইহতিসাব’ গ্রন্থের লেখক ২. শায়েখ জহিরুদ্দিন ভাকরি ৩. শায়েখ ফরিদউদ্দীন শাফেয়ি ৪. সুলতানুল মাশায়েখ হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া বাদায়ুনী ৫. কাজী মুগীসুদ্দিন বায়ানভী ৬. শায়েখ শামসুদ্দিন ইয়াহিয়া অযোধ্যী ৭. শায়েখ হামিদুদ্দিন মুখলিস ৮. শায়েখ কামালউদ্দিন কোয়েলি ৯. শায়েখ আলাউদ্দিন সদরুশ-শরিয়া ১০. শায়েখ ফখরুদ্দিন হানসাভি ১১. শায়েখ নাসিরুদ্দিন কারভি প্রমুখ।

 

সুলতান তুঘলকের শাসনামলে আলেম ও মাদ্রাসা

এই সময়কালে যদিও খিলজি শাসনের মতো ইলমী শান ও শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো না, তবু সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ইলমী-আগ্রহের কারণে এটি ছিলো একটি স্মরণীয় যুগ। অন্যান্য শহরগুলো ছাড়াও সে-সময়ে শুধু দিল্লিতে─কিছু আরব পর্যটকের মতে─এক হাজার মাদ্রাসা ছিল, যার মধ্যে ফিরোজ শাহের মাদ্রাসা ছিলো ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চতর মাদরাসা, যা পরিদর্শন করতে আসতেন দূর-দূরান্তের মানুষ। একইসাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিখ্যাত আলেম ও শায়েখ উপস্থিত ছিলেন, যাদের ইলমী অবদান এই যুগকে দারুণ জাঁকজমকতা দিয়েছে। যেমন, ১. শায়েখ মঈন উদ্দিন ইমরানী। তিনি শিক্ষকতা ছাড়াও কানযুদ-দাকায়েক, হুসসামি ও মিফতাহের উপর হাশিয়া লিখেছিলেন। ২. শায়েখ আলাউদ্দিন ইন্দরপতি ৩. শায়েখ জিয়াউদ্দিন নাজশী, যাঁর নিম্নোক্ত গ্রন্থগুলো তাঁর বিস্তৃত জ্ঞানের সাক্ষ্য দেয়─

১. চাহাল নামুস ২. সালাকুস-সুলুক ৩. গুলরিজ ৪. লাজ্জাতুন-নিসা ৫. শরহে দুয়ায়ে শারয়ানী ৬. তুতিনামা

৪. শায়েখ আবদুল মুক্তাদির দেহলভী, ‘কাসিদায়ে লামিয়া’র লেখক ৫. মাওলানা খাজগি ৬. শায়েখ আহমেদ থানসিরী, যিনি তৈমুরের আক্রমণের সময় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাকে তৈমুরের দরবারে আনা হলে সেখানে শায়খুল ইসলাম শায়েখ বুরহান উদ্দিন মারগিনানি হেদায়া গ্রন্থের লেখকের সাথে তর্ক হয়। ফলে শায়েখ আহমদ থানসিরী তাঁর শিষ্যদের আদেশ দেন, তারা যেন হেদায়া গ্রন্থের লেখকের ভুলগুলো তুলে ধরে।

সুলতান বলবন ও আলায়ীর যুগের মতো এ যুগেও  ইসলামী দেশগুলো থেকে অনেক আলেম ও কবি আগমন করেন এবং তাদের ইলমী ও সাহিত্যের অবদান এ যুগকে করে তোলে মহিমান্বিত।

অতঃপর জ্ঞান-আকাশের সেই অর্ধচন্দ্র, যা সিন্ধু ও মুলতানের দিগন্তে উদিত হয়েছিলো এবং হিজরী অষ্টম শতাব্দীতে এসে দিল্লির আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে সমস্ত হিন্দুস্তানি ভূমিকে আলোকিত করেছিলো, তার উপর হঠাৎ ‘গ্রহণ’ লেগে যায়। সুলতান মাহমুদ শাহের শাসনামলে তৈমুর লং ছোটখাটো কেয়ামত হয়ে আসে দিল্লীতে এবং তিন দিন ধরে এই ইলম ও শান্তির শহরের রাস্তা-ঘাট ও বাজারে এমনভাবে খুন-খারাবি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, যাতে ধ্বংস হয়ে যায় জ্ঞান ও ফয়েজের প্রায় সকল মাহফিল। আলেম ও তালেবে ইলমগণ দিল্লি ছেড়ে অন্য শহরে গিয়ে আশ্রয় নেন। অন্যান্য উলামায়ে কেরাম প্রাণভয়ে আত্মগোপন করেন। কেউ একজন সত্য বলেছেন,

خدا شرے برانگیزد کہ خیر مادراں باشد

 

জৌনপুরে শিক্ষাগত উৎকর্ষ 

দিল্লির এই ভাঙা নক্ষত্রগুলো জৌনপুরের জ্ঞান-উদয়াচলে চন্দ্র ও সূর্য হয়ে উদিত হয়। অর্থাৎ একই সময়ে─যখন দিল্লির ইলমী, সাংস্কৃতিক ও  রাজনৈতিক বাগানে বিষের দমকা হাওয়া চলছিলো─পূর্বাঞ্চলের একটি শহর জৌনপুরে জ্বলে ওঠে ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতির আলো। পূর্বীয় সালতানাতের সুলতান ইব্রাহিম শাহ শার্কীর ন্যায়বিচার, ইলমপ্রিয়তা ও উলামাদের আতিথেয়তার কারণে জৌনপুর হয়ে উঠে জ্ঞানী ও কামেল মানুষের সমাগমস্থল।

তৈমুরের জুলুম ও অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দিল্লির আলেম-ওলামা জৌনপুরের দিকে অগ্রসর হন। তন্মধ্যে ‘তাফসীরে বাহরে মাওয়াজ’ ইত্যাদি গ্রন্থের লেখক কাজী শাহাবুদ্দিন দৌলতাবাদী, ‘ফাতওয়ায়ে ইব্রাহিম শাহিয়া’র সংকলক কাজী নিজামুদ্দিন, শায়েখ আবুল ফতেহ, কাজী নাসিরুদ্দিন গানবাদী, শায়েখ আবুল জালাল ইসমাইল আব্বাস, শায়েখ ঈসা বিন তাজ প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[13]ফায়েজে মাআছিরুল কিরাম: ১: ২২২

জৌনপুরের এই শিক্ষাগত উৎকর্ষতা মুহাম্মদ শাহের শাসনামলের শুরু ১১৩১ হিজরি পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিলো। অতঃপর শিয়া বুরহানুল মুলক সাদাত আলী খান নেশাপুরী প্রাদেশিক গভর্নর থাকাকালীন এখানকার মাদ্রাসা ও আলেম-ওলামার জন্য ওয়াকফকৃত সম্পত্তি দখল করে এই ইলমী-বাগানকে করে দেয় জনশূন্য।

এই সুদীর্ঘ সময়ে এ ভূমি থেকে এমন এমন আলেম ও বুজুর্গদের আবির্ভাব ঘটে, যাদের অর্জন ও অবদানের জন্য মুসলিম জাতি আজও গর্বিত। উল্লিখিত বিশিষ্ট বুজুর্গগণ ছাড়াও (১) শায়েখ মুহাম্মাদ বিন ঈসা জৌনপুরী (২) মোল্লা আব্দুল মালিক জৌনপুরী (৩) মোল্লা ইলাহদাদ জৌনপুরী, হেদায়া ও বায়যাভীর ব্যাখ্যাকার ৪. সাইয়েদ মুহাম্মদ জৌনপুরী ৫. কাজী খান জাফরাবাদী, শায়খ আব্দুল আজিজ চিশতীর পীরসাহেব (৬) মোল্লা মাহমুদ জৌনপুরী, :শামসে বাজেগা’ ইত্যাদির লেখক (৭) দেওয়ান মুহাম্মাদ রশিদ জৌনপুরী, ‘মানাজিরে রশিদিয়্যা’ ইত্যাদির লেখক ৮. শায়েখ বাহাউদ্দীন চিশতী মুহাদ্দিস জৌনপুরী (৯) শায়েখ হামিদ আব্বাসী চরয়াকোটী, ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’র একজন সংকলক (১০) ফতওয়ায়ে আলমগীরী’র একজন সংকলক কাজী মুহিউদ্দিন জৌনপুরী প্রমুখের মতো স্ব স্ব যুগে শত শত আলেম ও মাশায়েখ, যারা ছিলেন যাহেরী ও বাতেনী উভয় জ্ঞানে প্রাজ্ঞ। এই বুজুর্গদের অস্তিত্বের কারণেই এদেশে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের লাভ হয় ব্যাপক প্রসার ও বিকাশ।

পূর্বাঞ্চলের মতোই সে-সময় উপকূলীয় অঞ্চলেও ইলমী মাহফিল বসে। আলেম ও মুহাদ্দিসগণ সম্পূর্ণ তৃপ্তি ও শান্তির সাথে নিয়োজিত থাকেন ইলম সাধনায়। (সংক্ষিপ্ততার জন্য বিস্তারিত আলোচনা উপেক্ষা করা হচ্ছে)

তৈমুরের ফেতনার পর দিল্লী সালতানাত প্রায় অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত বিশৃঙ্খল থাকে। অবশেষে ৮৫৫ হিজরিতে বাহলুল লোদী দিল্লীর সিংহাসন ও মুকুট দখল করেন এবং নিজের দৃঢ় সংকল্প, ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শীতার মাধ্যমে দিল্লীর মৃত রাজ্যকে করেন পুনরুজ্জীবিত। তার উত্তরসূরি সিকান্দার লোদীর শাসনামলে প্রায় একই স্থিতিশীলতা তৈরি হয়, যা তুঘলক বংশের শাসনামলে ছিলো। দিল্লি আবারও উলামা, মাশায়েখ, সুফি ও কবিদের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

মোল্লা বাদায়ুনী সিকান্দার লোদীর যুগের বিজ্ঞ আলেমদের উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘শায়েখ আবদুল্লাহ ও শায়েখ আজিজুল্লাহ ছিলেন মহান আলেম, যারা মুলতান থেকে দিল্লিতে এসে যুক্তিবাদী বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করে তোলেন। শায়েখ আজিজুল্লাহ’র জ্ঞানের বিশালতা এমন ছিলো যে, তিনি সবচেয়ে কঠিন কিতাবগুলো মুখে মুখে পড়াতেন। মিয়া কাসিম সাম্ভলী ছিলেন তার ছাত্রদের একজন। এই দুই ভাই ছাড়াও ১. শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক ঝানঝাআনায়ী ২. মাওলানা সামাউদ্দিন মুলতানি (৩) শায়েখ ফাতহুল্লাহ উধী (৪) সৈয়দ জালালুদ্দীন বদায়ুনী (৫) মাওলানা শোয়াইব দেহলভী (৬ ) মিয়া হামিদ জামালী (৭) শায়েখ রিজকুল্লাহ দেহলভী (৮) শায়েখ হাসান তাহির দেহলভী প্রমুখ এ যুগের বিখ্যাত আলেম ও মাশায়েখ।

শেষোক্ত বুজুর্গ স্বয়ং সুলতান সিকান্দার কর্তৃক আমন্ত্রণে জৌনপুর থেকে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হন।  শায়েখ সৈয়দ রফিউদ্দীন শিরাজীও একই যুগের একজন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন, যিনি যুক্তিনির্ভর ইলম সরাসরি মুহাক্কিক দাওয়ানী থেকে এবং হাফেজ সাখাভী থেকে লাভ করেন হাদীসের জ্ঞান। সুলতান সিকান্দার তাকে গুজরাট থেকে দিল্লীতে ডেকে পাঠান। এখান থেকে তিনি চলে যান আগ্রায়, যেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস অবধি নিয়োজিত ছিলেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদানে। শায়েখ আবুল ফাতাহ মুহাদ্দিস থানসিরী ছিলেন তাঁর শিষ্য ও উত্তরসূরি।

 

মুঘল যুগে ইলমী কার্যক্রম

৯৩২ হিজরিতে সম্রাট বাবর পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম শাহ লোদীকে পরাজিত করে প্রতিষ্ঠা করেন মুঘল সাম্রাজ্য। বারব নিজে ছিলেন তুর্কি ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শী। একইসাথে ছিলেন কবি ও সাহিত্যিক। ‘তুযুকে বাবর’ তার জ্ঞানের বিশালতার স্মৃতিচিহ্ন। তিনি আলেম ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খুব মূল্য দিতেন। নিজের সাথে সর্বদা নির্দিষ্ট সংখ্যক আলেম রাখতেন। এ যুগের বিখ্যাত আলেমদের মধ্যে রয়েছেন─ (১) শাইখুল ইসলাম সাইফুদ্দিন (২) শায়েখ হাসান মুতকাল্লিম (৩) মীর জামালুদ্দীন মুহাদ্দিছ (৪) শায়েখ আতাউল্লাহ মাশহাদি (৫) মাওলানা শাহাবুদ্দিন মা’মায়ী (৬) শায়েখ আবুল ওয়াজেদ ফারগী (৭) শায়েখ জয়নুদ্দিন প্রমুখ।

সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনিও ছিলেন ইলমপ্রিয় এবং আলেম-ওলামার খুব পছন্দ করতেন। জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যামিতিশাস্ত্রে তার বিশেষ আগ্রহ ছিলো। সম্রাট হুমায়ুনের শাসনামলে দুটি মাদরাসা বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ ছিলো। একটি হলো আগ্রায় শায়েখ যাইনুদ্দিনের মাদরাসা। দ্বিতীয়টি দিল্লির মাদরাসা, যার শিক্ষক ছিলেন শায়খ হাসান তাবরিজি।

৯৬২ হিজরিতে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তার পুত্র জালালুদ্দিন আকবর রাজ্যের শাসক হন। তিনি নিজে শিক্ষিত ছিলেন না, তবে তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো তিনিও বিভিন্ন জ্ঞান ও শাস্ত্র সম্পর্কে খুব আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু এই আগ্রহে ধর্মীয় জ্ঞানের অংশ ছিলো নিতান্তই কম।

এই সময়ের আলেমদের মধ্যে ছিলেন─ (১) শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দিছ দেহলভী (২) শায়েখ আহমদ সেরহিন্দী ওরফে মুজাদ্দিদে আলফে সানী (৩) ‘মুনতাখাবুত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থের লেখক মোল্লা আবদুল কাদির বাদায়ুনী (৪) মীর ফতহুল্লাহ শিরাজী (৫ ) মাখদুমুল মুলক মোল্লা আবদুল্লাহ সুলতানপুরী (৬) মোল্লা নিজামুদ্দিন নাজশী (৭) আবুল ফাতাহ গিলানি (৮) শাহ রফিউদ্দিন রঞ্জভী (৯) আমরি মুর্তজা শরীফী (১০) শায়েখ মুবারক নাগুরী (১১) আবুল ফজল (১২) আবুল ফয়েজ ফাইযী প্রমুখ। এ যুগে বিভিন্ন মেজাজের আলেম ও ফাজেল ছিলেন। তাদের মধ্যে আবুল ফজল ও ফয়েজী প্রমুখ সম্রাট আকবরের মন-মেজাজ কলুষিত করে ‘দীনে মুহাম্মদী’র বিরুদ্ধে ‘দীনে ইলাহী’ নামে খুলে দেয় যিনদিকী ও নাস্তিকতার দুয়ার। একই সময়ে প্রথম উল্লিখিত দুই বুজুর্গ অর্থাৎ হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী ও শায়েখ মুহাদ্দিসে দেহলভী নিজেদের নিরন্তর ইলমী ও আমলী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই নতুন ধর্মের সামনে খাঁটি তাওহীদ ও সঠিক দীনের এমন সুদৃঢ় ও শক্তিশালী প্রাচীর নির্মাণ করেন, ‘দীনে ইলাহী’ আকবরের তৈরি ঘরে বন্দী হয়ে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

শায়েখ মুহাদ্দিসে দেহলভীর এই কৃতিত্বটিও স্মরণীয় যে, তিনি হাদীসের জ্ঞানকে─যা উত্তর-ভারত থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো─নতুন জীবন দান করেন এবং হাদীসের জ্ঞানের মাধ্যাকর্ষণ কেন্দ্র গুজরাট থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আবারও স্থান গাড়ে দিল্লিতে।

শায়েখ দেহলভী হাদিস শিক্ষাদানের পাশাপাশি তাফসির, তাজবীদ, আকাইদ, ফিকহ, তাসাওউফ, আখলাক, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে প্রায় পাঁচ ডর্জন গ্রন্থও রচনা করেছেন।

আকবরী আমলের একজন বড় মুহাদ্দিস হলেন শায়েখ মুহাম্মাদ বিন তাহির পাটনী রহ.। তিনি গুজরাটে বসে অলংকৃত করেন নবীজির হাদিসের মসনদ এবং হাদিস শিক্ষাদানের পাশাপাশি রচনা করেন মাজমাউল বিহার, মুগনি, তাজকিরাতুল মাওজুয়াত ও কানুনুল মাওজুয়াতের মতো উচ্চ স্তরের গ্রন্থও।

আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর ১০১৪ হিজরিতে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার শাসনামলে তিনি দীনি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেন, যা ছিলো আকবরের ধর্মহীনতা ও উদাসীনতার কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জাহাঙ্গীর শিক্ষাগত উন্নয়নের জন্য আদেশ জারি করেন যে, কোনো অজ্ঞাত ব্যবসায়ী কোথাও মারা গেলে বা শহরের কোনো সম্পত্তির বেওয়ারিশ মালিক মারা গেলে, তাদের মালামাল ও সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না করে মাদ্রাসা ও মসজিদ নির্মাণে ব্যয় করা হবে। জাহাঙ্গীরের এই বিশেষ দৃষ্টির কল্যাণে অনেক বিরান মাদরাসা পুনরায় চালু হয়।

এ যুগের বিখ্যাত আলেমরা হলেন─(১) শায়েখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী (২) শায়েখ মুজাদ্দিদে আলফে সানী আহমদ সেরহিন্দী (৩) মীর সৈয়দ তৈয়্যব বালগ্রামী (৪) ‘গুলজারে আবরার’ গ্রন্থের রচয়িতা শায়েখ মুহাম্মদ গাওসী (৫) শায়েখ নূরুল হক মুহাদ্দিস বিন শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (৬) শায়েখ মুজাদ্দিদে আলফে সানী রহ.এর পুত্রদ্বয় শায়েখ মুহাম্মদ সাঈদ সেরহিন্দী ও (৭) শেখ খাজা মুহাম্মদ মাসুম সেরহিন্দী।

অতঃপর সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলেও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচুর বিকাশ ঘটে। দিল্লিসহ অন্যান্য শহরেও ইলমী কেন্দ্র গড়ে উঠে, যেগুলোর মধ্যে জৌনপুর, লাহোর, আহমাদাবাদে বিশেষ ইলমী চর্চা ছিলো। হিন্দুস্তানের বাইরে হেরাত ও বাদাখশানের ছাত্ররাও এখানে এসে পড়াশোনা করতো।

শাহজাহানী যুগের আলেমদের মধ্যে (১) মোল্লা ইউসুফ লাহোরি (২) মোল্লা আবদুল লতিফ (৩) মোল্লা আবদুল সালাম দেবী (৪) মোল্লা কামাল কাশ্মীরি (৫) মোল্লা আবদুল হাকিম শিয়ালকোটি (৬) মোল্লা মুহাম্মদ মাহদেবগামী (৭) মোল্লা মুহম্মদ আরশাদ জৌনপুরী প্রমুখ ইলমী অঙ্গণে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। দিল্লীতে শায়েখ আব্দুল হকের উত্তরপুরুষ শায়েখ নূরুল হক ‘হাদ্দাসানা’ ও ‘আখবারানা’র ধ্বনিতে দিল্লীকে করেছিলেন পুনরুজ্জীবিত।

শাহজাহানের পর আওরঙ্গজেব আলমগীর দিল্লির মসনদ অলংকৃত করেন। তিনি নিজে ছিলেন গভীর ইলমের অধিকারী একজন আলেম, গবেষক,‌ ফকিহ ও সাহিত্যিক। তিনি কেন্দ্রীয় শহরগুলো ছাড়াও ছোট ছোট শহর ও গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেই সমস্ত আলেমের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা-দীক্ষা দানের কাজে নিযুক্ত ছিলেন এবং যারা যুক্ত ছিলেন সরকারি মাদ্রাসার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেককে বিশাল সম্পত্তি দেওয়া হয় এবং মুক্ত করা হয় জীবিকার চিন্তা থেকে। সম্রাট আলমগীর প্রায় ৫০ জন বিশিষ্ট আলেম নিয়ে একটি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের মাধ্যমে সংকলন করান ‘ফাতওয়ায়ে আলমগিরী’। এটি সম্রাট আলমগীরের এত বড় ফিকহি কীর্তি, যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত।

 

ফাতওয়ায়ে আলমগীরী’র সংকলকগণ 

(১) শায়েখ নিজামুদ্দিন বুরহানপুরী (মজলিসের প্রধান)  (২) কাজী মুহাম্মদ হুসাইন জৌনপুরী (হিসাবরক্ষক) (৩) শায়েখ আলী আকবর হুসাইনী বিন সাদুল্লাহ খান  (৪) শায়েখ হামিদ চারিয়াকোটি (৫) মুফতি মুহাম্মদ ইকরাম হানাফী লাহোরী (৬) শায়েখ রাজিউদ্দীন ভাগলপুরী (৭) শায়েখ আব্দুল রহিম দেহলভী (৮) মুফতি ওয়াজিহুদ্দিন গোপামায়ী (৯) শায়েখ আহমাদ বিন মনসুর (১০) আবুল বারাকাত বিন হুসামুদ্দিন দেহলভী (১১) মুফতি মুহাম্মদ জামিল বিন আব্দুল জলিল জৌনপুরী (১২) মোল্লা আবুল ওয়াইজ বিন কাজী সদরুদ্দীন (১৩) শায়েখ আবুল খায়ের থাথভী (১৪) শায়েখ নিজামুদ্দিন বিন নূর মুহাম্মদ থাথভী (১৫) শায়েখ মুহাম্মদ সাঈদ বিন কুতুবুদ্দিন সাহালভি (১৬) মুফতি আব্দুল সামাদ জৌনপুরী (১৭) মুফতি জালালউদ্দিন মিছলিশাহরী (১৮) কাজী ইসমাতুল্লাহ বিন আব্দুল কাদির লাখনভী (১৯) কাজী মুহাম্মদ দৌলত বিন ইয়াকুব ফতেহপুরী (২০) শায়েখ মুহাম্মাদ গাউস কাকরভি (২১) শায়েখ সাইয়্যিদ আব্দুল ফাত্তাহ বিন হাশিম সামাদী (২২) শায়েখ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ কানৌজি (২৩) শায়েখ মুহাম্মদ শফী (২৪) শায়েখ মুহাম্মদ ফায়েক (২৫) শেখ ওয়াজিহুর রব (২৬) আল্লামা আবুল ফারজ সৈয়দ মা’দান (২৭) শায়েখ গোলাম মুহম্মদ (২৮) কাজী সৈয়দ এনায়াতুল্লাহ মঙ্গিরি (২৯) সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর (আস-সাকাফাতুল ইসলামিয়া, তাকমিলায়ে তাজকিরাতু উলামায়ে হিন্দ, জফরুল মুহসিলীন ইত্যাদি গ্রন্থ থেকে তালিকাটি প্রস্তুতকৃত)

ফাতওয়ায়ে আলমগীরী’র সংকলক ছাড়াও এ যুগের উলামায়ে কেরামের মধ্যে রয়েছেন─ (১) শায়েখ গোলাম নকশবন্দ ঘোসভী লাখনোভী (২) শায়েখ মোল্লা আহমদ ওরফে মোল্লা জিওয়ান আনবেতভী (৩) মোল্লা আসগর কাতভী (৪) মোল্লা জাহিদ হারভি (৫) শায়েখ হাজী সিবগাতুল্লাহ খায়রাবাদী (৬) শায়েখ ঈসা মুহাদ্দিস গোপামায়ভী (৭) শায়েখ কুতুবুদ্দিন সাহলভী (৮) শায়েখ লতিফ সুলতানপুরী (৯) কাজী মহিবুল্লাহ বিহারী (১০) হাফেজ আমানুল্লাহ বানারী (১১) কাজী আবদুল বাকী জৌনপুরী (১২) শায়েখ কলিমুল্লাহ জাহানাবাদী প্রমুখ অনেক খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন এবং তাদের ইলমের ফয়েজ ও বরকতও ছিলো ব্যাপক।

আলমগীরের মৃত্যুর পর শাহ আলম ১১১৮ হিজরিতে সিংহাসনের মালিক হন। তিনিও ছিলেন তাঁর পিতার মতো একজন আলেম, ফাজেল ও জ্ঞানপ্রিয় শাসক। এই সময় মীর গাজিউদ্দিন সালতানাতের রাজধানী দিল্লিতে একটি নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সৈয়দ আহমদ মুহাদ্দিস হারভী, মাওলানা মামলুক আলী নানুতুবী, মাওলানা জিয়াউদ্দিন প্রমুখ ছিলেন এই মাদ্রাসার নামকরা উস্তাদ। আর হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী, হযরত মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ., মুন্সী জাকাউল্লাহ, ডেপুটি নাজির আহমদ প্রমুখ উলামা ও শিক্ষাবিদগণ ছিলেন এই মাদ্রাসার ছাত্র। পরবর্তী সময়ে এই মাদ্রাসাটিকে ব্রিটিশরা দিল্লি কলেজে পরিবর্তিত করে এবং তারপর এটিও ১৮৭৭ খ্রি./১২৯৪ হিজরিতে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আলমগীরের পরে যদিও মুঘল রাজকুমাররা প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক কূটকৌশলের কারণে সাম্রাজ্যের ব্যবস্থপনায় দিন দিন অবনতি ঘটতে থাকে। এমনকি নাম ছাড়া সালতানাতে তাদের কোনো কর্তৃত্ব ছিলো না; যার প্রভাব পড়ে শিক্ষাব্যবস্থাও। ফলে দিল্লির মাদ্রাসাগুলোর জাঁকজমকের ওপর অন্ধকার নেমে আসে; বন্ধ হয়ে যায় অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

 

শাহ ওয়ালীউল্লাহ ও তার সন্তানদের কৃতিত্ব

কিন্তু এই অধঃপতনের সময়ে হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষয়িষ্ণু শাখাকে বাঁচিয়ে রাখতে মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান। একদিকে ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ গ্রন্থের মতো বিপ্লবী গ্রন্থ রচনা করে আলেমদেরকে তাদের কর্তব্যের দিকে অভিমুখী করেন এবং তৈরি করেন বর্তমান পরিস্থিতি সংস্কারের মানচিত্র। অপরদিকে পিতা শায়েখ আব্দুল রহিমের মাদ্রাসায় তিনি কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা দেন এবং ধীরে ধীরে আবারও বিরান দিল্লি হয়ে ওঠে হাদীসের জ্ঞানের এক বিশাল কেন্দ্র। শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভীর (ওফাত: ১০৫২ হি.) পর হজরত শাহ সাহেবের কৃতিত্ব যে, তার মাধ্যমে হাদিসশাস্ত্র পুনর্জীবন লাভ করে হিন্দুস্তানে।

ওয়ালীউল্লাহী ‘দরসগাহ’ চার পুত্র হযরত শাহ আব্দুল আজিজ, হযরত শাহ রফিউদ্দীন, হযরত শাহ আব্দুল কাদির ও হযরত শাহ আব্দুল গনিসহ কাজী সানাউল্লাহ পানিপতি, শাহ মুহাম্মদ আশিক ফলতী, আখুঁ মুহাম্মদ সাঈদ, খাজা মুহাম্মদ আমিন, তাজুল উরুস গ্রন্থের লেখক আল্লামা সৈয়দ মুর্তজা বিলগ্রামী, মাওলানা রফিউদ্দীন মুরাদাবাদী প্রমুখ এমন এমন বিদগ্ধ উলামায়ে কেরামের জন্ম দেয়, যারা ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন’ ‘আল্লাহর রাসূল বলেছেন’ ধ্বনিতে সাড়া ফেলে দেন সমগ্র হিন্দুস্তানে।

হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ.এর  ইন্তেকালের পর তার পুত্র হযরত শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী হাদীসের দরসের ভার গ্রহণ করেন এবং তার পিতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ইলমের বাগানকে এত যত্নসহকারে চাষ ও পরিচর্যা করেন যে, এটাকে করে তোলেন চিরসবুজ।

এই অধঃপতনের যুগে মোল্লা নিজামুদ্দিন সাহানভী ফেরঙ্গীমহল লাখনৌতে বসে সেই পাঠ্যক্রম সংকলন করেন, যা ইলমী জগতে ‘দরসে নিজামী’ নামে পরিচিত এবং সংক্ষিপ্ত সংযোজন-বিয়োজনের পর যা আজও আরবি-বিদ্যালয়গুলোতে প্রচলিত। মোল্লা নিজামউদ্দিনের দরসগাহ থেকেও হাজারো আলেম জন্ম নিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন─বাহরুল উলূম আবদুল আলী, মাওলানা আবদুল হালিম, মোল্লা হাসান, মুফতি মুহাম্মদ ইউসুফ, মাওলানা আব্দুল হাই প্রমুখ। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে আল্লামা জহিরুল হাসান শওক নিমভী সাহেব, মাওলানা জাহির আল হাসান শওক নিমভী, মাওলানা মুহাম্মাদ হাসান ইসরাঈলী, মাওলানা হাফিজুল্লাহ আযমী প্রমুখ ছিলেন তাদের যুগের প্রসিদ্ধ ও মানিত উস্তাদ।

হযরত শাহ আব্দুল আজিজ রহ.এর ইন্তেকালের পর তার পৌত্র হযরত শাহ ইসহাক মুহাদ্দিস দেহলভী হাদীস শিক্ষাদানের ভার গ্রহণ করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকেও তার পূর্বসূরিদের মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা দান করেন এবং তার দরসগাহ থেকে বের হয়ে আসেন বড় বড় আলেম। যেমন, শাহ আবদুল গনি মুজাদ্দেদী, মাওলানা আহমদ আলী মুহাদ্দিসে সাহারানপুরী, নবাব সদরুদ্দীন খান দেহলভী, নবাব কুতুবুদ্দিন খান দেহলভী, শায়েখ মুহাম্মাদ মুহাদ্দিস থানভী, মাওলানা ফজলুর রহমান গঞ্জমুরাদাবাদী, মাওলানা ক্বারী আবদুল রহমান পানিপতি, মাওলানা আলী আলম মোরাদাবাদী, মাওলানা সৈয়দ মিয়া নাজির হুসাইন মুহাদ্দিসে বিহারী দেহলভী রহ. প্রমুখ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সর্বশেষ উল্লিখিত বুজুর্গের দরসগাহ থেকে ‘গায়রে মুকাল্লিদ’ গোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে হিন্দুস্তানে। এই গোষ্ঠীতেও বড় বড় আলেমের জন্ম হয়। তাদের মধ্যে নবাব সিদ্দিক হাসান খান কানৌজি ভূপালি, মাওলানা আবদুল্লাহ আজমি গাজীপুরী, মাওলানা শামসুল হক দায়ানভী, মাওলানা আব্দুল রহমান মুবারকপুরী, মাওলানা আব্দুল মান্নান ওয়াজিরাবাদী প্রমুখ গায়রে মুকাল্লিদ গোষ্ঠীর বড় আলেম হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকেন।

 

শাহ ইসহাক ও শাহ আব্দুল গণির অবদান 

হযরত শাহ ইসহাক মক্কায় হিজরত করার পর হযরত শাহ আব্দুল গনি মুজাদাদী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। শায়েখ মুজাদ্দেদীর শিক্ষাদানও অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আল্লাহ তাআলা হযরত শাহ ইসহাক মুহাজিরে মক্কী ও হযরত শাহ আব্দুল গনি মুজাদ্দিদী মুহাজিরে মাদানীকেই এই মহান মর্যাদা দিয়েছেন যে, সমগ্র ইসলামি বিশ্ব তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আজ যেখানেই কারো কণ্ঠে ‘আল্লাহর রাসূল বলেছেন’ ধ্বনিত হয়, এই দুই বুযুর্গ মাধ্যম হিসেবে অবশ্যই তার সাথে যুক্ত আছেন।

হযরত শাহ আব্দুল গনি রহ.এর ছাত্রের সংখ্যা অগণিত। তবে তাদের মধ্যে এই ধারার দুইজন বুজুর্গের ফয়েজ ও বরকত সবচেয়ে ব্যাপক।

 

হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম ও কুতুবুল ইরশাদ মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী’র  ঐতিহাসিক অবদান

তাদের একজন হলেন, হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা মুহাম্মাদ কাসেম নানুতুবী আর দ্বিতীয়জন হলেন কুতুবুল ইরশাদ মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.। এই দুই বুজুর্গের একটি বড় অবদান হলো, তারা দেওবন্দের একটি ছোট্ট মক্তবের পৃষ্ঠপোষকতা ও তত্ত্বাবধান করে সেটাকে উন্নীত করেন একটি মহান ইলমী আন্দোলনের মর্যাদায়। আজ বিশ্ব একে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ নামে চেনে। দারুল উলূম দেওবন্দের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও দীক্ষা লাভ করে আজ পর্যন্ত দশ হাজারেরও বেশি আলেম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে একাই একটি মাদ্রাসার মর্যাদা রাখেন!

অতঃপর দারুল উলূমের এই অবদান শুধু ভারতবর্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর ব্যাপক প্রভাব বার্মা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কাবুল, বুখারা, ইরান, তুর্কিস্তান, আফ্রিকা প্রভৃতি, এমনকি ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎসস্থল হিজাজ অঞ্চলকেও সিঞ্চিত করেছে। দারুল উলুম দেওবন্দের বিপুল সংখ্যক আলেম ও ফাজেল থেকে নমুনা হিসাবে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হচ্ছে, যা থেকে উপলব্ধি করা যাবে  দারুল উলূমের ব্যাপক অবদান─

(১) হযরত শায়খুল-হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (২) হযরত মাওলানা আহমদ হাসান আমরুহভী (৩) হযরত মাওলানা ফখরুল হাসান গাঙ্গুহী (৪) হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (৫) হযরত মাওলানা সৈয়দ মুর্তজা হাসান চাঁদপুরী (৬) হযরত মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার শাহ মুহাদ্দিসে কাশ্মীরী (৭) হযরত শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হুসাইন আহমদ মাদানী ফয়জাবাদী (৮) হযরত মাওলানা মুফতি কিফায়াতুল্লাহ শাহজাহানপুরী দেহলভী (৯) হযরত মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি (১০) হযরত মাওলানা সৈয়দ আসগর হুসাইন মুহাদ্দিস দেওবন্দী (১১) হযরত মাওলানা সৈয়দ মানাজির আহসান গিলানী (১২) হযরত মাওলানা মুফতি আজিজুর রহমান দেওবন্দী (১৩) মুফাসসির মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানী (১৪) শায়খুল-আদব মাওলানা ইজাজ আলী আমরুহভী (১৫) মাওলানা ফখরুদ্দীন মুহাদ্দিস মুরাদাবাদী (১৬) মাওলানা সৈয়দ বদরে আলম মিরাঠী (১৭) মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলভী (১৮) মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ ইউসুফ বানুরী (১৯) মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ শফী দেওবন্দী (২০) মাওলানা আবদুল আজিজ মুহাদ্দিসে পাঞ্জাবী (২১) আল্লামা মুহাম্মদ ইব্রাহিম বালিয়াবী (২২) মাওলানা হাবিবুর রহমান মুহাদ্দিসে আজমী (২৩ ) মাওলানা মুহাম্মদ মনজুর নোমানী (২৪) শামসুল হক আফগানী প্রমুখ। তারা তাদের ইলমী ও দীনি কর্মকাণ্ড ও মূল্যবান লেখনীর মাধ্যমে উপমহাদেশকে পরিণত করেছেন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চিরসবুজ বাগানে। আজ দারুল উলূমের অধীনে শত শত নয়, হাজার হাজার মাদরাসা দীনি ইলমের খেদমতে নিয়োজিত রয়েছে, যা প্রকৃতপক্ষে দারুল উলূমের ফয়েজ ও বরকত।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 কিছু কিছু পণ্ডিত লিখেছেন, আরব ব্যবসায়ীরা ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আগ্রহী ছিলেন না এবং তারা ভারতের সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রভাবিত করতে পারেননি। কিছু ঐতিহাসিক এমনও লিখেছেন, এই ব্যবসায়ীদের দ্বারা একটি হিন্দুগোষ্ঠিও ইসলামে দীক্ষিত হয়নি! অথচ এই ধারণাটি জ্ঞান-গবেষণার সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা অধিকাংশ ইতিহাসবিদ সিন্ধু, মালাবার, গুজরাট প্রভৃতি সম্পর্কে বলেছেন, এই অঞ্চলগুলোতে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন মুসলিম ব্যবসায়ীরা। বিস্তারিত জানতে দেখুন, আরব ও হিন্দ আহদে রিসালাত মে: কাজী আতহার মুবারকপুরী
2 বিস্তারিত জানতে দেখুন, ফুতুহুল বুলদান, ইমাম বালাজুরী; আল-ইকদুস সামিন, কাজী আতাহার মুবারকপুরী
3 আল-ইকদুস সামিন: ২৮৭
4 তারিখে কাবির: ৩:২৯৫
5 তাযকিরাতুল হুফফাজ:১:২১২
6 বিস্তারিত জানতে পড়ুন, আল-ইকদুস সামিন, কাজী আতাহার মুবারকপুরী
7 তাযকিরায়ে উলামায়ে হিন্দ: ২৩, মাকালাতে সুলাইমান: ২: ৪
8 রিজালুস সিন্ধ ওয়াল হিন্দ: ১৭০
9 নুজহাতুল খাওয়াতির: ১:৮২
10 রিজালুস সিন্ধ ওয়াল হিন্দ: ২৩৫
11 ফুতুহুস সালাতীন: ১০৯-১০
12 বিস্তারিত জানতে দেখুন, তারিখে ফিরোজশাহী: ৬৭
13 ফায়েজে মাআছিরুল কিরাম: ১: ২২২

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments