নতুন পানিতে সফর এবার

শামসুর রাহমান

যোগাযোগ ডেস্ক

শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ – ১৭ আগস্ট ২০০৬) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দ্রুতই দুই বাংলায় খ্যাতি অর্জন করেন। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় ‘রূপালি স্নান’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি বিশেষভাবে আলোচনায় আসেন। নাগরিক জীবন তার কবিতার মূল উপজীব্য হলেও প্রকৃতির উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে তার রচিত কবিতা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ‘মজলুম আদিব’ ছদ্মনামে কলকাতার পত্রিকাগুলোতে লেখালেখি করেন।


আমরা যখন প্রথম লিখতে শুরু করি, তখন আমাদের জিভের ডগায় নাচতো কয়েকটি নাম—শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, আবু রুশদ, গোলাম কুদ্দুস, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এবং শামসুদ্দীন আবুল কালাম। আমাদের এই জগদ্দল সমাজে লেখক হওয়ার যে কি মানে, তা আমি কাগজে কলম ছুঁইয়েই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই আমাদের সমাজের এই অগ্রগণ্য লেখকদের সাহিত্যচর্চা বরাবরই আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ঠেকেছে। তাঁদের সাহিত্য-ফসলের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞ বোধ করেছি সব সময়। তাই আমাদের আড্ডায় বারবার ঘুরে-ফিরে উচ্চারিত হতো তাঁদের রচিত কতো পদ্ধতি।

আমাদের বরণীয় এই আটজন লেখকের মধ্যে দু’জন লোকান্তরিত হয়েছেন। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ্ তিন বছর আগে মারা গেছেন প্যারিসে, ফররুখ আহমদ ইন্তেকাল করেছেন গত শনিবার আমাদের এই চিরচেনা ঢাকা শহরে। তিনি মারা গেছেন একেবারে নিঃস্ব অবস্থায়। না, ভুল বললাম। নিঃস্ব কথাটা তাঁর সম্পর্কে প্রযোজ্য নয়। তাঁর মানসিক ঐশ্বর্যের কোনো কমতি ছিল না। তিনি রেখে গেছেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ, যেগুলো পঠিত হবে দীর্ঘকাল। তাঁর বহু পংক্তি বারবার গুঞ্জরিত হবে কাব্যপিপাসুদের স্মৃতিতে। যে কবিতা তিনি আমাদের উপহার দিয়ে গেলেন, তা তাঁর স্মৃতিকে চিরদিন পাঠকদের মনে উজ্জ্বল করে রাখবে সত্য, কিন্তু কবিতা তাঁকে দেয়নি সচ্ছলতা, তাঁর পরিবারকে দেয়নি কোনো নিরাপত্তা, সারাজীবন তিনি দারিদ্র্যের সঙ্গেই ঘর করেছেন। জাহান্নামে বসে হেসেছেন পুষ্পের হাসি। দারিদ্রদ্র্য তাঁর শরীরকে ক্ষইয়ে দিয়েছিলো ভীষণভাবে কিন্তু কখনো কামড় বসাতে পারেনি তাঁর মনের উপর। তাঁর মতো অসামান্য কবি খুবই সামান্য একটা চাকরি করতেন। মাইনে পেতেন মাত্র ছ’সাতশ’ টাকা। অথচ তাঁর ঘরে বারো-তেরোজন পুষ্যি। আজকের দিনে এই ক’টি টাকায় কি করে চালানো সম্ভব এত বড় সংসার? ফররুখ আহমদের কাব্যের সংসার যত জেল্লাদারই হোক না কেন, তাঁর সংসার বরাবরই খুব নিষ্প্রভ। দারিদ্র ম্লান করে দিয়েছিল তার সংসারের সুখ। পয়সা কামানোর দিকে কখনো মন ছিল না তাঁর। পারলে তিনি হয়তো চাকরিও করতেন না কখনো। ধরা-বাঁধা চাকরি করার মানসিকতা তাঁর ছিল না। তিনি ছিলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া। তাই যখন তাঁকে রেডিও অফিসে দেখতাম একজন সামান্য চাকুরে হিসাবে, আমার কেমন যেন খটকা লাগতো। সেখানে বড় বেমানান লাগতে ফররুখ আহমদকে।

অনেক বছর আগের কথা। আমিও তখন রেডিওতে চাকরি করি। আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন দুটি বছর আমি কাটিয়েছিলাম রেডিওতে। কিন্তু আমার সেই কর্মজীবনের একমাত্র আনন্দ ছিল ফররুখ আহমদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেয়া। মতাদর্শের দিক থেকে আমরা অবস্থান করতাম দুই বিপরীত মেরুতে। আমি জানতাম তাঁর ঝাঁঝালো রাজনৈতিক মতাদর্শের কথা, তাঁর অসহিষ্ণুতার কথা—কিন্তু এর কোনোটাই সে সময় আমার আর তাঁর সম্পর্কের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। তিনিও ভালো করেই জানতেন আমার বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের কথা, আমার রাজনৈতিক মতামতের কথা। তাঁর সঙ্গে কখনো আমার কোনো রাজনৈতিক সংলাপ হয়নি। তিনি এড়িয়ে যেতেন, আমিও তাকে রাজনৈতিক তর্কে জড়াতে প্ররোচিত করিনি কোনদিন। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেতে থাকতাম সাহিত্যালোচনায়। বিশেষ করে কবিতার কথা বলতে ভালোবাসতেন তিনি, বিভিন্ন কবির পঙতিমালা তিনি আবৃত্তি করতেন তাঁর আশ্চর্য সুরেলা কণ্ঠে। ইংরেজি রোমান্টিক কবিকূল তাঁর মন হরণ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে যখন-তখন ধ্বনিত হতো শেলী, কিট্‌স এর অবিনাশী পংক্তিমালা। যখন তিনি আবৃত্তি করতেন, তাঁর দীর্ঘ এলামেলো চুল নেমে আসতো কপালে, ধারালো উজ্জ্বল চোখ হয়ে উঠতো উজ্জ্বলতর। তাঁর আরেকটি প্রিয় প্রসঙ্গ ছিল মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতা। মধুসূদনের কথা বলতে গেলেই তার কণ্ঠে বেজে উঠতো অন্য রকম সুর। মধুসুদনের কবিতা অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারতেন তিনি।

শনিবার রাতে তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে ছুটে গিয়েছিলাম কবির ফ্ল্যাটে। যে ফররুখ আহমদকে আমি বহুদিন বসে থাকতে দেখেছি আজিজিয়া রেস্টুরেন্টে, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে রেডিওর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়েছি, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে রমনার কৃষ্ণচূড়ায়ময় পথে হেঁটেছি বহুদিন, যে ফররুখ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি দিনের পর দিন, যে ফররুখ আহমদকে কাজের ক্লান্তির মধ্যেও কোনোদিন এতটুকু ঝিমুতে দেখিনি, সেই ফররুখ আহমদকেই দেখলাম শায়িত তাঁর নিভৃত শয্যায়। তাঁকে দেখলাম নির্বাক, নিথর। কী আশ্চর্য, তিনি একবারও হাসিমুখে তাকালেন না আমার দিকে, বললেন না কি চলবে নাকি এক পেয়ালা? না তিনি এই প্রথমবারের মতো আমাকে চা খেতে অনুরোধ করলেন না। অথচ তাঁর চা না খাওয়ানো ছিল অসম্ভব ব্যাপার। আমি অন্তত এমন একটি দিনের কথাও মনে করতে পারি না যে, আবন মিয়ার দোকানে গিয়ে ফররুখ আহমদের পাশে বসেছি এবং চা ও নিমকি খাইনি। চা না খাইয়ে তিনি ছাড়তেন না। কোন ওজর-আপত্তি তিনি শুনতেন না। ‘আরে খাও খাও কিসসু হবে না’, বলতেন সেই দরাজ-দিল মানুষটি।

অমন নিথর, নিঃশব্দ ফররুখ আহমদকে বড়ই বেমানান লাগছিল সেই বিছানায়। যেমন তাঁকে বেমানান মনে হতো রেডিওর কাছে। তাঁর নিস্পন্দ শরীর আর তন্ময় নিদ্রার দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়লো তাঁরই কয়েকটি লাইন—

এ ঘুমে তোমার মাঝি-মাল্লার ধৈর্য নেইকো আর,

সাত সমুদ্র নীল আক্রোশে তোলে বিষ ফেনভার,

এদিকে অচেনা যাত্রী চলেছে আকাশের পথ ধরে

নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।

বেসাতি তোমার পূর্ণ করে কে মারজানে মর্মরে?

ঘুমঘোরে তুমি শুনছো কেবল দুঃস্বপ্নের গাঁথা।

উচ্ছৃঙ্খল রাত্রির আজো মেটে নি কি সব দেনা?

সকাল হয়েছে। তবু জাগলে না?

                     তবু তুমি জাগলে না?

তিনি আর কোনোদিনই জাগবেন না। তাঁর প্রায় আসবাবহীন সেই ঘরে দেখলাম ইতস্তত ছড়ানো কিছু বই। দেখলাম, তাঁর খুব কাছেই রয়েছে তাঁর প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যগ্রন্থ। মধুসূদনের অকৃত্রিম শুভার্থী এবং উনিশ শতকী বাংলার অন্যতম প্রধান গুরু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রতিও ফররুখ আহমদের অবিচল শ্রদ্ধা ছিল। তিনি প্রায়শই বলতেন, বুঝলে শামসুর রাহমান, এই বিদ্যাসাগরের মতো, এক-দেড়জন ব্যক্তি আমাদের সমাজে জন্মালে এই পঁচা-গলা সমাজের চেহারাটাই পাল্টে যেতো।

কখনো-কখনো জীবনের দুঃখ-দুর্দশার কথা উঠতো, উঠতো জীবন-সংগ্রামের কথা। এই প্রসঙ্গে একবার তিনি রানা প্রতাপ সিংহের পলাতক দিনের গল্প বলেছিলেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে রানা প্রতাপ ঘুরছেন বনে-প্রান্তরে। শত দুঃখ-দুর্দশা সত্ত্বেও তিনি আত্মসমর্পণ করেননি আকবর বাদশাহের কাছে। কিন্তু যেদিন একটা বনবেড়াল তাঁর শিশুকন্যার হাত থেকে খাসের রুটি ছিনিয়ে নিয়ে খেলো, সেদিনই তিনি ধরা দিলেন আকবরের সৈনাদের হাতে। তিনি একাধিকবার এই গল্প আমাকে শুনিয়েছেন। কেন এই গল্প বলতেন তিনি? পুত্র-কন্যার মুখ চেয়ে চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেই এই গল্পই তিনি বলতেন, যেন নিজেকেই শোনাতেন সেই আত্মসমর্পণের অত্যন্ত মানবিক কাহিনী। হয়তো রানা প্রতাপ সিংহের সঙ্গে কোথাও নিজের একটা মিল খুঁজে পেতেন।

আমি আজ তাঁর কাব্যের গুণাগুণ বিষয়ে কিছু বলবো না। এই মুহূর্তে ব্যক্তি ফররুখ আহমদই আমার কাছে বড় হয়ে উঠেছেন বারবার। মনে জেগে উঠছেন নানা স্মৃতির ভগ্নাংশ। তবে একথা অবশ্যই বলবো, তাঁর মৃত্যুতে অনেকখানি গরিব হয়ে গেল আমাদের কাব্যক্ষেত্র। একদা তিনি লিখেছিলেন—

গোধূলি-তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল

অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ

সাত সাগরের বুকে সেই মৃদু আলোক চঞ্চল।

অন্ধকার ধনু হাতে তীর ছোঁড়ে রাত্রির নিষাদ।

কিংবা—

আমি দেখি পথের দু’ধারে ক্ষুধিত শিশুর শব,

আমি দেখি পাশে পাশে উপচিয়া পড়ে যায় ধনিকের গর্বিত আসব

আমি দেখি কৃষাণের দুয়ারে দুর্ভিক্ষ বিভীষিকা,

আমি দেখি লাঞ্ছিতের ললাটে জ্বলিছে শুধু অপমান টিকা,

গর্বিতের পরিহাসে মানুষ হয়েছে দাস, নারী হলো লুণ্ঠিতা গণিকা

এর মতো পংক্তি। তাঁর লেখনী আর কোনোদিন চঞ্চল হবে না, ভাবলেও দুঃখ হয়।

আমার এই লেখা খুবই অকিঞ্চিৎকর। তবে একটু সান্ত্বনা, অনেক বছর আগে দৈনিক ‘মিল্লাত’—এর ‘রবিবার’—এর ক্রোড়পত্রে আমি এই প্রতিভাবান কবির প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেছিলাম একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধে। একজন অর্বাচীন উত্তরসাধকের সেই প্রবন্ধ পাঠ করে তিনি অখুশি হননি, এই তথ্য আমার পক্ষে খুবই তৃপ্তিকর।

ফররুখ আহমদ কোনো ব্যাংক-ব্যাল্যান্স রেখে যাননি। রেখে যাননি কোনো জমিজমা। তাঁর চিরনিদ্রার এতটুকু ঠাঁইয়ের জন্য আমি খুঁজতে গিয়েও বিড়ম্বিত হতে হয়েছে তাঁর অনুরাগীদের। শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল উদ্ধার হয়ে এলেন কবি বেনজীর আহমদ। তিনি বললেন, আমি আমার ফররুখ ভাইকে নিয়ে যাব আমার ডেরায়। একজন কবিকে কবরস্থ করা হলো অন্য এক কবির বসত বাড়ির সীমানায়। তাঁর কবরের জমি নিয়ে যত ঝামেলাই হোক, তাঁর সন্তানরা যত বঞ্চিতই হোক, পার্থিব জমি-জমা থেকে তিনি রেখে গেছেন অন্যরকম বিঘা বিঘা জমি—যে জমির ফসল দেখে চোখ জুড়াবে, সাহিত্য-পথযাত্রীদের। এই সমৃদ্ধ জমি পেছনে রেখে তিনি নিজে যাত্রা করেছেন নতুন রহস্যময় পানিতে, নিরুদ্দেশ সফরে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments