মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীর ভাষ্যে শাইখুল হিন্দের শিক্ষা দর্শন

মূল : মাওলানা আবু আম্মার যাহেদুর রাশেদী

সালমান আদীব

২০ ডিসেম্বর ২০১১ লাহোরের আল হামরা হলে শাইখুল হিন্দ একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত ‘শাইখুল হিন্দ সেমিনার’ এ চলতি বছর ১৪৩৩ হিজরিকে ‘শাইখুল হিন্দ বর্ষ’ হিসেবে পালনের ঘোষণা করা হয়েছে। এ উপলক্ষে তারা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে—বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন শহরে ‘শাইখুল হিন্দ সেমিনার’ আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে পূর্ববর্তী প্রজন্মের সংগ্রামী সাধকদের সংগ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। পাশাপাশি সমসাময়িক পরিস্থিতি ও উদ্ভূত সমস্যার প্রেক্ষাপটে হযরত শাইখুল হিন্দের চিন্তা ও শিক্ষাকে প্রসারের জন্যে সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চালানো হবে।

শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের স্মরণে এ সেমিনারটি আল হামরার দুটি বৃহৎ হলে অনুষ্ঠিত হয়—যা সকাল প্রায় এগারোটার দিকে শুরু হয়ে মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত চলতে থাকে। এর তিনটি অধিবেশনে মাওলানা ফজলুর রহমান, ডা. আবু সালমান শাহজাহানপুরী, মুফতী মুহাম্মদ রফি উসমানী, মাওলানা মুহাম্মদ খান শিরানী, মাওলানা আবদুল গফুর হায়দারী, জনাব মুজিবুর রহমান শামী, হাফেজ আকিফ সাঈদ, ডা. কিবলা আয়াজ, মুহাম্মদ ফারুক কুরেশী, মাওলানা মুহাম্মদ আমজাদ খান, হাজী সাইয়্যেদ সালমান গিলানী, হাফেজ নাসির আহমদ আহরারসহ অন্যান্য শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।

মুফতী মুহাম্মদ রফি উসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবশনে  মাওলানা আবদুল গফুর হায়দারী, জনাব মুজিবুর রহমান শামী, জনাব হাফেজ আকিফ সাঈদ, মাওলানা মুহাম্মদ আমজাদ খান, প্রফেসর ডা. কিবলা আয়াজ, ডা. ক্বারি আতীকুর রহমান এবং এ লেখক বক্তব্য রাখেন। সে বক্তব্যের সারসংক্ষেপই পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে—

হামদ ও সালাতের পর।

আজ ‘শাইখুল হিন্দ একাডেমি’ আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করল। আমি যেহেতু একজন উপদেষ্টা হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত, তাই সবার আগে এ কথা বলে নিতে চাই—এ একাডেমি একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। কিছুকাল আগে আমাদের কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল—নয়া প্রজন্মের আলেমগণ ও দীনদার মুসলমানদেরকে তাদের পূর্বসূরি আকাবিরদের রাজনৈতিক, জ্ঞানভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবার জন্যে কাজ করা  অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্যে তাদের মাঝে চিন্তাগত সমন্বয় সৃষ্টি করাও সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

আমাদের সেই আলোচনায় এ বিষয়টি সামনে আসে—শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের ব্যক্তিত্ব এমন এক কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে—যার ভিত্তিতে দীনদার মুসলমান ও আলেমদের এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা সম্ভব। কারণ, তিনি ছিলেন অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজনৈতিক সিলসিলার ঐতিহাসিক ও আধুনিক ধারার মাঝে এক মিলনবিন্দু।

তিনি ইসলামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী ও জাতীয় রাজনৈতিক কর্মীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে একসঙ্গে কাজ করবারর পথ দেখিয়েছিলেন। একইভাবে তিনি দেওবন্দ ও আলীগড়ের  মতো আপাতদৃষ্টিতে ভিন্নধর্মী দুটি শিক্ষাব্যবস্থার মাঝে সংযোগ স্থাপন করেছিলেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র অধ্যায় শেষ হওয়ার পর স্বাধীনতার জন্যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের সূচনা তাঁর  হাতেই হয়েছিল। তিনি সশস্ত্র সংগ্রাম ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে এক সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্বের ফলে ‘দেওবন্দি স্কুল অফ থট’ এর সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক, আন্দোলনমূলক ও রাজনৈতিক পরিসরও তাঁর মাঝে একত্রে ভাস্বর হয়ে উঠেছে।

সুতরাং আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছি—হযরত শাইখুল হিন্দের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাকে ভিত্তি করে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আদর্শিক সংগ্রাম শুরু করা হবে। এ উদ্দেশ্যে ১৪৩৩ হিজরিকে ‘শাইখুল হিন্দ বর্ষ’ ঘোষণা করে দেশব্যাপী সমন্বিত ও সুসংগঠিত প্রচেষ্টা চালানো হবে। সে লক্ষ্যেই আয়োজন করা হয়েছে আজকের এই সেমিনার ।

এ সূত্রে আজকের সেমিনারে আলোচনার জন্যে আমাকে যে বিষয়টি দেওয়া হয়েছে তা হলো ‘শাইখুল হিন্দের শিক্ষাদর্শন’। আলোচনার শুরুতেই বলে রখা ভালো—শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসানের জীবনের দুটি পর্যায় রয়েছে। একটি পর্যায় হলো—যখন তিনি মুসলিমবিশ্বের বিখ্যাত দীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলূম দেওবন্দের শাইখুত তাফসীর ও হাদীস এবং প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আর দ্বিতীয় পর্যায়টি মাল্টার বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের সময়কাল। দ্বিতীয় পর্যায়টি খুবই সংক্ষিপ্ত। এর সময়কাল মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এ সংক্ষিপ্ত সময়েই তিনি সবার সামনে একটি মৌলিক ও বৈপ্লবিক দর্শন উপস্থাপন করেন। যার সারকথা হলো—জনসাধারণের মাঝে পবিত্র কোরানের প্রাক্টিক্যাল উপস্থাপনের মাধ্যমে কোরানকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার  মাঝে সমন্বয় সাধন করা।

তিনি শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মাঝে সংযোগ স্থাপন করেননি, বরং শিক্ষা ক্ষেত্রেও এ দুইয়ের মাঝে তিনি সমন্বয় সাধন করেছেন। তিনি নিজে আলীগড়ে গিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন ও ধারাবাহিক যোগাযোগের সূচনা করেন। তাঁর হাতে সূচিত সে যোগাযোগ ও সম্পর্কের ভিত্তিতেই ন্যাশনাল মুসলিম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠিত হয়—যা পরবর্তীতে ‘জামিয়া মিল্লিয়া’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

হযরত শাইখুল হিন্দের এ যুগান্তকারী  শিক্ষা দর্শন ও এর ভিত্তিতে সূচিত কাজকে তাঁর প্রখ্যাত শিষ্যরা নিজ নিজ পরিসরে এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর সেই প্রখ্যাত শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন—সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী, সাইয়্যেদ মুহাম্মদ আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী, মাওলানা উবাইদুল্লাহ সিন্ধী, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী, মুফতি কিফায়তুল্লাহ দেহলভী, মাওলানা মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভী, মাওলানা মুরতাজা হাসান চাঁদপুরী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এ সকল মহান  মনীষীদের জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মপরিধি ছিল ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু তাঁরা সকলেই ছিলেন চিন্তা-দর্শন ও শিক্ষার ক্ষেত্রে শাইখুল হিন্দের মানসপুত্র, তাঁর পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধি।

তাই শাইখুল হিন্দের শিক্ষাগত রুচি পরিচয় তুলে ধরবার জন্যে আমি তাঁর এ মহান শিষ্যদের মধ্য থেকে শাইখুল ইসলাম মাওলানা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানীর উদাহরণ দেওয়াটাকে যথেষ্ট মনে করি। তিনি শাইখুল হিন্দের ইন্তেকালের পর একটি সুবিন্যস্ত শিক্ষা সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার নকশা লিখিত আকারে উপস্থাপন করেন—যা শাইখুল হিন্দের রুচি ও চিন্তার প্রতিনিধিত্ব করে।

ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে আমি সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানীর এ সিলেবাসটাকে শাইখুল হিন্দের শিক্ষাগত রুচি, পদ্ধতি ও চিন্তা-দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়া জন্য সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম মনে করি। কারণ, তিনি ছিলেন হযরত শাইখুল হিন্দের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ শিষ্য। বিশেষত তাঁর জীবনের শেষ সময়গুলোতে তিনিই ছিলেন শাইখুল হিন্দের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

এটি সে সময়কার কথা, যখন মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী দারুল উলূম দেওবন্দে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেননি, বরং বাংলাদেশের সিলেটে অবস্থান করছিলেন।

এমনকি দারুল উলূম দেওবন্দে প্রধান শিক্ষক থাকার সময়েও তিনি প্রতি বছর রমজান মাস সিলেটের ওই মসজিদেই কাটাতেন। মাওলানা মাদানীর অবস্থানস্থল সিলেটের সেই মসজিদে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রচিত এ সিলেবাসটি সিলেটের দরগাহ শরীফ মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা রহমতুল্লাহ নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেছিলেন। মাদরাসা মদিনাতুল উলূম সিলেটে উপস্থিত থাকাকালীন আমি এর লাইব্রেরী থেকে সিলেবাসটির একটি কপি সংগ্রহ করে ফটোকপি করিয়ে নিয়েছিলাম—যা আজও আমার কাছে  সংরক্ষিত আছে।

সিলেবাসটি ষোলো বছরের একটি  পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম—যা দীনী মাদরাসাগুলোর  প্রাথমিক স্তর (ইবতেদাইয়্যাহ) থেকে  শুরু করে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত সবগুলো শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে প্রচলিত দীনী শিক্ষাব্যবস্থায় বহু সংশোধন ও সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন আধুনিক শাস্ত্র ও বিষয় এতে সংযোজন করা হয়েছে। সময়ের স্বল্পতার কারণে আজ আমি কেবল সিলেবাসটির শুরুতে মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী যে ভূমিকা লিখেছেন,  আমি সেটাই আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

আমার মতে ভূমিকাটি কেবল হযরত মাদানী নয়, বরং হযরত শাইখুল হিন্দের শিক্ষাগত চিন্তা ও দর্শনেরও পরিচয় বহন করে। তাই আজকে আমার আলোচ্য  বিষয় অনুযায়ী আমি এটিকে শাইখুল হিন্দের শিক্ষাগত রুচি, পদ্ধতি ও দর্শনের ভাষ্যকার হিসেবে তুলে ধরছি।

শাইখুল ইসলাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী ভূমিকায় বলেন—

“যুগের পরিবর্তনে মানুষের স্বভাব ও চাহিদার পরিবর্তন ঘটে। খাদ্য ও জীবনযাপনের ধরণ বদলায়। একই সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের স্বভাবগত বৈচিত্র্য মানুষের অবস্থা ও অভ্যাসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এটি এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

আরেকটি বাস্তবতা হল—উপকারী জ্ঞানভাণ্ডার থেকে জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে “আল আনফা ফাল আনফা” (অর্থাৎ অধিকতর উপকারীকে গ্রহণ করা) নীতিটাই সর্বজনস্বীকৃত। এ নীতি অনুসারে তালখিস (কোনো বড় গ্রন্থের সার সংক্ষেপ), নতুন পুরাতন শুরুহাত (বিস্তারিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ) ও হাওয়াশীর (টীকা)  ক্রমবর্ধমান ভান্ডার সালাফের রচিত স্বীকৃত মুতূনগুলোর (মূল টেক্সট) চেয়েও অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবার নজির সর্বযুগেই প্রতীয়মান হয়েছে। সুতরাং এ উভয় বাস্তবতা অনুযায়ী বর্তমান যুগ ও ভারতীয় উপমহাদেশে স্থান কাল পাত্র ভেদে উদ্ভুত প্রয়োজন উপেক্ষা করার কোনো কারণ নেই। বরং সে সব উপকারী ও অধিক ফলদায়ক গ্রন্থকে শিক্ষার্থীদের অপরিহার্য বিদ্যার আবশ্যকীয় অংশ মনে করা উচিত—যেগুলো উপকারের বিবেচনায় প্রাচীন পাঠ্যগ্রন্থগুলোর চেয়েও অগ্রগামী।

আমরা কোনোভাবেই এই মতকে কার্যকর  ও বাস্তবসম্মত মনে করতে পারি না—পুরনো শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলো শুধু এ কারণে অপরিহার্য যে সেগুলো পূর্বসূরিদের রচনা বা তাঁদের পাঠ্য ছিল, আর নতুন রচিত গ্রন্থগুলো শুধু এ কারণে বর্জনীয় যে সেগুলো সমকালীন বা সাম্প্রতিক রচনা, অথবা পূর্বসূরিরা সেগুলো থেকে উপকার গ্রহণ করেননি। কারণ আমরা দেখি—ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসানের অনেক গ্রন্থের চাইতে একই বিষয়ে রচিত সাদরুশ শহীদের রচনাগুলো অনেক ক্ষেত্রে অধিক  ভাস্বর হয়ে ওঠেছে। হেদায়া গ্রন্থের লেখক ইমাম মারগিনানী ও শরহুল বেকায়া গ্রন্থের লেখক সাদরুশ শরিয়াহ প্রমুখের রচনাগুলো পূর্ববর্তী রচনাগুলোকে অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে। সিবাওয়াইহ, মুবাররিদ প্রমুখের গ্রন্থের ওপর ইবনে হাজিব ও মালিকের রচনাগুলো কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। এদিকে ফারাবি ও ইবনে সিনার রচনাগুলোর ওপর মীর জাহিদ ও মুহিব্বুল্লাহ বিহারী প্রমুখের রচনা প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে।

যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবনের দিকে আমরা তাকাই, তাহলে দেখি—তিনি হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইবরানি ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অনারব দেশের রাজারা সিলমোহরবিহীন চিঠিকে গ্রহণযোগ্য মনে করত না, তাই তিনি আংটি ও সিলমোহর বানিয়ে নিয়েছিলেন। এ থেকে আমরা এ শিক্ষাই পাই—হালজামানার বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে বিদেশি ভাষা ও বিভিন্ন কলা-বিদ্যা শেখা ও শেখানো একেবারে পরিত্যাগ করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও একথা স্বীকৃত—বিশ্বের বিভিন্ন জাতির ভাষা, তাদের রীতি-নীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিভিন্ন বিদ্যা-কলা সম্পর্কে আমাদের অবগত হওয়া উচিত।

উক্ত বিষয়গুলো এবং এ ধরনের আরও  বিভিন্ন যুক্তি ও বাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরে আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল। আমাকে এ কথা উপলব্ধি করিয়ে দিচ্ছিল—বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা সিলেবাস সময়ের দাবি অনুযায়ী অবশ্যই সংশোধন ও সংস্কারের দাবি রাখে। কিন্তু চিন্তাকে কাজে রূপান্তরিত করবার সে সময়-সুযোগ আমার হয়ে উঠছিল না।

আমি আমার শিক্ষাজীবনে দরসে নিজামির ধারাবাহিকতায় বিন্যস্ত দারুল উলূম দেওবন্দের নেসাব বা সিলেবাসকে নিজের উন্নতির শিকড় ও মুসলিম শিক্ষার্থীদের আদর্শ মনে করেছি এবং নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুযায়ী তা থেকে অনেক উপকারও লাভ করেছি। কিন্তু মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থানকালে মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় সহ ইস্তাম্বুল, বুখারা প্রভৃতি অঞ্চলে প্রচলিত সিলেবাসের সঙ্গে  আমার পরিচয় ঘটে। একই সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবার সুযোগও আমার সামনে আসে। এসময় বিভিন্ন দেশ, সেগুলোর সার্বিক অবস্থা ও শাসনব্যবস্থাও আমি পর্যবেক্ষণ করি। এদিকে স্কুল ও কলেজের সিলেবাস সম্পর্কে আগেই আমার যথেষ্ট জানাশোনা  ছিল। আবার সমকালীন বিভিন্ন ইসলামী ভাব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন, জামিয়া উসমানিয়া দাক্কান, জামিয়া মিল্লিয়া দিল্লি, নাদওয়াতুল উলামা লখনৌ সম্পর্কেও পর্যালোচনার সুযোগ হয়। এসব অভিজ্ঞতা ও জানাশোনাকে সামনে রেখে বন্ধু-বান্ধব, বিজ্ঞজন ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে বারবার পরামর্শের পর অবশেষে খুব চিন্তাভাবনা করে বর্তমান শিক্ষাক্রমটি জাতির সামনে উপস্থাপন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি।

এতে কোনো সন্দেহ নেই—প্রচলিত শিক্ষা ধারার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোকপাত করা ও সে অনুযায়ী সিলেবাস সংস্কার করা আমার মতো অনভিজ্ঞ ও সামান্য যোগ্যতার মানুষের কাজ নয়। কিন্তু ‘اكابر قوم’ তথা জাতির প্রবীণ ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা এ বিষয়ে যেহেতু যথাযথ মনোযোগ দিচ্ছেন না, তাই বাধ্য হয়ে কম যোগ্য লোকদেরই এগিয়ে আসতে হচ্ছে।

দেশে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী রয়েছে—যারা কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয়কে নিজেদের লক্ষ্য বানিয়ে অন্যান্য মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে। তাই এ সিলেবাসে নিজস্ব বোধ ও অভিজ্ঞতার আলোকে সে সঠিক পথটাই গ্রহণ করা হয়েছে—যা মুসলমানদের প্রকৃত ও বাস্তব সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

যদিও কোনো সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য এই নয়—শিক্ষার্থীদের মাঝে সব ধরনের বিদ্যা ও কলার পূর্ণ যোগ্যতা সৃষ্টি করা, বরং সিলেবাসের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাদের মাঝে এতটুকু যোগ্যতা সৃষ্টি করা—যার মাধ্যমে তারা চাইলে প্রয়োজনীয় যেকোনো বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করতে পারে। যেন শিক্ষা সমাপনের পর ও প্রয়োজনের সময় কোনো প্রতিবন্ধকতা তাদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। তাই তাদের বহু বিদ্যা, বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এবং নানাবিধ কার্যাবলির সঙ্গে পরিচিত হওয়া অপরিহার্য। যাতে তাদের মধ্যে দৃঢ় দক্ষতা ও পাকা যোগ্যতা গড়ে ওঠে।

এখনও পর্যন্ত আমি অনুভব করছি—আমাদের হিন্দুস্তানি মুসলমানদের রচনা ও গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন অনেক গ্যাপ রয়ে গেছে, তেমনি  বিদ্যমান সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত পাঠ্যবই সমূহ আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় ও আমাদের নিজস্ব ভাষার বিবেচনায় অপর্যাপ্ত থেকে গেছে। তবে ইনশাল্লাহ, যদি জাতির গুরুজনেরা আমার এ সিলেবাসকে পছন্দ করে গ্রহণ করে নেন, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস—ভবিষ্যতে আমাদের দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক ভালো ও যোগ্য মানুষ গড়ে উঠবে।”

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Israk
Israk
2 months ago

আপনি যে বিষয় আলোচনা করেছেন সেটি বর্তমান সময়ে আসলেই অনেক গুরুত্ব বহন করে।