ইসলামি হিজাব সংক্রান্ত আইন

মূল : আলাঁ বাদিয়্যু

সিদ্দিকে আকবর

আলাঁ বাদিয়্যু (Alain Badiou) সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ফরাসি দার্শনিক, গণিতবিদ ও নাট্যকার। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘এথিক্স’ ও ‘বিং অ্যান্ড ইভেন্ট’ তত্ত্বের মাধ্যমে সমকালীন চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন এনেছেন। বর্তমানে তিনি ইউরোপীয় গ্রাজুয়েট স্কুলের (EGS) ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত আছেন।


[এই লেখার একটি বড় অংশ ২২/২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখের ফরাসি দৈনিক Le Monde–এ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৫ মার্চ ২০০৪ তারিখের আইন অনুযায়ী, স্কুলে হিজাব, টুপি, স্কালক্যাপ বা অন্য কোনো ‘প্রদর্শনীমূলক’ ধর্মীয় প্রতীক পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনের যুক্তি হচ্ছে, এই কাজগুলো French Republic secular principles–এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।—অনুবাদক।][1]মূল নিবন্ধ- https://www.versobooks.com/en-gb/blogs/news/2025-alain-badiou-the-law-on-the-headscarf-is-a-pure-capitalist-law

কিছু ‘সুশীল’ রিপাবলিকান একদিন ঠিক করল—মেয়েরা মাথায় স্কার্ফ পরে, সেটাকে নিষিদ্ধ করার জন্য একটা আইন দরকার। আগে স্কুলে নিষিদ্ধ করা হোক, তারপর অন্য জায়গায়, আর সম্ভব হলে সর্বত্র। আমি বললাম-আইন? আইন! প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট যতটা অযোগ্য রাজনীতিবিদ, ততটাই অবিনাশী। তিনি ৮২ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। এই ভোটের মধ্যে সোশালিস্টরাও ছিল—যাদের মধ্য থেকেই অনেক ‘সুশীল রিপাবলিকান’ নেওয়া হয়েছে। এই নির্বাচনটি প্রায় টোটালিটারিয়ান ধরনের ছিল। নির্বাচিত হয়ে তিনি সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন : ‘আইন—হ্যাঁ, আইন—কয়েক হাজার কিশোরী মেয়ের বিরুদ্ধে, যারা তাদের মাথায় এই তথাকথিত ‘সমস্যাজনক’ স্কার্ফ পরে।’ তার দৃষ্টিতে এরা নোংরা, খসখসে বাচ্চা—আর তারা আবার মুসলিম। এভাবেই ফ্রান্স আবারও বিশ্বকে হতবাক করল। সেদাঁ-তে আত্মসমর্পণ, পেতাঁর শাসন, আলজেরিয়ার যুদ্ধ, মিতেরাঁর দ্বিমুখী নীতি, আর কাগজবিহীন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নৃশংস আইন—এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই এটি ঘটল। যেন এক ট্র্যাজেডির পর আরেকটি প্রহসন।

হ্যাঁ, ফ্রান্স যেন অবশেষে নিজের জন্য একটি ‘উপযুক্ত’ সমস্যা খুঁজে পেয়েছে—কিছু মেয়ের মাথা থেকে স্কার্ফ সরানো। বলা যায়, এ দেশের পতন এখন সম্পূর্ণ। বহু আগে ল্য পেন যে ‘মুসলিম আক্রমণ’-এর কথা বলেছিলেন, আর আজ যেটাকে কিছু তথাকথিত অকাট্য বুদ্ধিজীবী নিশ্চিত করছেন—তারও যেন একটি জবাব তৈরি হয়েছে।

পয়তিয়ে এর যুদ্ধ তো ছিল একেবারে তুচ্ছ ব্যাপার, চার্লস মার্টেল যেন কেবল একজন ভাড়াটে সৈনিক! শিরাক (ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট), সোশালিস্টরা, নারীবাদীরা, আর ইসলামভীতিতে আক্রান্ত আলোকায়নবাদী বুদ্ধিজীবীরা—এবার জয়ী হবে ‘হিজাব যুদ্ধে’। পয়তিয়ে থেকে হিজাব—যুক্তিটা নিখুঁত, আর অগ্রগতি অসাধারণ।

মহৎ উদ্দেশ্য দেখাতে এখন নতুন ধরনের যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। যেমন বলা হচ্ছে—হিজাব নিষিদ্ধ করা উচিত, কারণ এটি নাকি পুরুষের ক্ষমতার প্রতীক—বাবা বা বড় ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণ—যা মেয়েদের ও নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাই যারা একগুঁয়েভাবে এটি পরতে চায়, তাদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হবে।

অর্থাৎ যুক্তিটা দাঁড়ায় এমন—এই মেয়েরা ও নারীরা নিপীড়িত, তাই তাদের শাস্তি দেওয়া দরকার। এটি যেন এমন—‘একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাই তাকে জেলে পাঠাও।’

হিজাবের প্রশ্নটিকে এত গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে যে, এর জন্য নতুন কিছু স্বতঃসিদ্ধ(axioms) ধরে এক ধরনের নতুন যুক্তিতন্ত্র গড়ে তোলা হচ্ছে।

অথবা, অন্য দিক থেকে এই যুক্তিটা শোনা যায়: এই নারীরাই নাকি নিজের ইচ্ছায় এই অভিশপ্ত হিজাব পরে—এই বিদ্রোহিণীরা, এই দুষ্টু মেয়েগুলো! তাই তাদের শাস্তি পেতেই হবে। এক মিনিট! কিন্তু এটা না পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের প্রতীক? বাবা আর বড় ভাইয়ের কি এখানে কোনো ভূমিকা নেই? তাহলে হিজাব নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনটা আসছে কোথা থেকে? এই যুক্তি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় এখানে—হিজাব প্রকাশ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ। এই ‘দুষ্টু’ মেয়েরা তাদের বিশ্বাস দেখাচ্ছে। তাই তাদের শাস্তি—যাও, ক্লাসের কোণায় গিয়ে দাঁড়াও, মুখ ঘুরিয়ে!

সুতরাং যুক্তিটা এমনভাবে দাঁড় করানো হচ্ছে—যদি এটি বাবা বা বড় ভাইয়ের চাপ হয়, তাহলে ‘নারীবাদী’ যুক্তিতে হিজাব খুলে ফেলতে হবে; আর যদি এটি মেয়েটির নিজের বিশ্বাসের বিষয় হয়, তাহলে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ যুক্তিতে সেটি নিষিদ্ধ করতে হবে।

অর্থাৎ, কোনো অবস্থাতেই ‘ভালো হিজাব’ বলে কিছু থাকবে না। ফলাফল একটাই—খোলা মাথা, সর্বত্র।

একসময় যেমন বলা হতো—অমুসলিমরাও বলত—সবাইকে খোলা মাথায় বাইরে বের হতে হবে।

আজকের প্রজাতন্ত্রের স্লোগান যেন—টুপি নামাও!

বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো—হিজাব পরা মেয়েটির বাবা ও বড় ভাইকে কেবল সাধারণ পারিবারিক সদস্য হিসেবে দেখা হয় না। বাবাকে দেখানো হয় রুক্ষ স্বভাবের এক শ্রমিক হিসেবে—অসহায়, যেন কোনো গ্রাম থেকে এসে সরাসরি রেনোর অ্যাসেম্বলি লাইনে বাঁধা পড়ে গেছে; এক ধরনের ‘আদিম’ ও ‘বোকা’ মানুষ। আর বড় ভাইকে উপস্থাপন করা হয় মাদক-ব্যবসায়ী হিসেবে—সে আধুনিক, কিন্তু নৈতিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত।

এইভাবে তাদেরকে ‘বানল্যু’-এর অশুভ পরিবেশের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়—একটি তথাকথিত বিপজ্জনক শ্রেণি হিসেবে।

মুসলিম ধর্মকে এখানে অন্য ধর্মগুলোর ত্রুটির সঙ্গে আরও একটি গুরুতর বিষয় যোগ করে দেখা হয়—ফ্রান্সে এটিকে দরিদ্রদের ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিজাব মানে হচ্ছে-দরিদ্ররা দরিদ্রদেরই ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে, এক ‘দরিদ্র’ আল্লাহর চোখের সামনে। আর তখন ক্ষুদ্র মধ্যবিত্ত শ্রেণি—যার সমৃদ্ধি আসলে নিজের টিকে থাকা ছাড়া আর কিছুতেই বিশ্বাস করে না—ঘৃণাভরে বলে ওঠে, ‘ঘৃণ্য!’

১০

এমন একজন আছে, যে এখানে নিজেকে চিনতে পারবে—আর যার সঙ্গে কয়েক বছর আগে আমি হিজাব নিয়ে বিতর্ক করেছি। সে একবার আমাকে বলেছিল, ‘তাহলে আপনি কি চান, চুলকে একটি যৌন প্রতীক হিসেবে ধরা হোক, যা ঢেকে রাখতে হবে?’

আমি নিজে কিছু চাই না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বোদলেয়ারকে মনে রাখা যায়:

হে পশমের মতো চুল! কাঁধ জুড়ে ঢেউ খাওয়া কোঁকড়া কেশ!

অলস সুগন্ধে ভরা ঘন চুল!

কি আনন্দ! রুমালের মতো এটাকে নাড়িয়ে দেওয়া-এদিক-ওদিক;

ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকে জাগিয়ে তোলা, চুলের ভেতর দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া,

এই রাতের অন্ধকার কোণে ছড়িয়ে দেওয়া!

 

ধুর! একেবারে এক মুসলিমের কল্পনা!

১১

আমি সেই সময়টার কথা মনে করি—যখন কোনো নারী তার চুল খুলে দিত। আহ! ধীরে, অদৃশ্যভাবে কাঁধে নেমে আসত। তখন সে যেন তার প্রেমময় সম্মতি প্রকাশ করত।

এটা কি ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি আঘাত ছিল? নাকি নারীত্বকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল? হতে পারে, হতে পারে…

১২

কল্পনা করুন-একজন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, তার সঙ্গে একদল পরিদর্শক–যাদের হাতে মাপজোখের ফিতা, কাঁচি, আর আইনবিষয়ক বই–তারা স্কুলের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা করছে, হিজাব, টুপি বা অন্য কোনো মাথার পোশাক ‘প্রকাশ্যভাবে ধর্মীয়’ কিনা। ওই যে খোঁপায় বসানো স্ট্যাম্পের মতো বড়সড় হিজাবটা! অথবা দুই ইউরোর কয়েনের সমান ওই টুপিটা! সবই সন্দেহজনক! ছোটটাও হয়তো বড়টারই প্রকাশ্য রূপ। কিন্তু এখন আমি কী দেখছি? সাবধান! ওটা তো টপ হ্যাট! আহা! টপ হ্যাট সম্পর্কে একবার মালার্মে বলেছিলেন: ‘যে এটা একবার পরে, সে আর খুলতে পারে না। পৃথিবী শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু টুপিটা থাকবে।’ চিরন্তন প্রদর্শন।

১৩

ধর্মনিরপেক্ষতা। এক অক্ষয় নীতি! তিন-চার দশক আগে স্কুলে সহশিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল, মেয়েদের প্যান্ট পরার অনুমতি ছিল না, ধর্মীয় পাঠ (catechism) ছিল, চ্যাপলেনসি (chaplaincy) ছিল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান (communion) ছিল জাঁকজমকপূর্ণ—ছেলেরা সাদা বাহুবন্ধনী পরে, মেয়েরা নরম টিউল (tulle) ঘোমটা পরে থাকত।

সেগুলো সত্যিকারের ঘোমটা ছিল—শুধু হিজাব নয়। আর আপনি চান, আমি এই হিজাব পরাকে অপরাধ হিসেবে দেখি? এটাকে পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে, অতীতের স্মারক হিসেবে, সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার চিহ্ন হিসেবে দেখি? তাহলে কি আজ এখানে যারা স্বাভাবিকভাবে মিশে আছে, সেই তরুণীদের আমরা বহিষ্কার করব? করুন, চালিয়ে যান—পুঁজিবাদী যন্ত্র ঘুরতেই থাকবে। মানুষ আসুক, যাক, অনুশোচনা হোক বা দূরদেশ থেকে শ্রমিক আসুক—পুঁজিবাদ শেষ পর্যন্ত ধর্মের মৃত দেবতাদের জায়গায় পণ্যের মোটা মলক (Moloch of merchandise) বসিয়ে দেবে।

১৪

তাহলে কি আসলে ব্যবসাই সবচেয়ে বড় ধর্ম নয়? এর পাশে দাঁড়ালে, এই দৃঢ় মুসলিমরা কি এক ধরনের সন্ন্যাসী সংখ্যালঘু বলে মনে হয় না? আর এই অবক্ষয়ী ধর্মের প্রকাশ্য প্রতীকগুলো কি আমরা প্রতিদিন দেখি না—প্যান্ট, টি-শার্ট, জুতা—সব জায়গায়-নাইকি (Nike), শেভিনিয়ঁ (Chevignon), লাকোস্ত (Lacoste) ইত্যাদি নামের মাধ্যমে? একটি কোম্পানির চলমান বিজ্ঞাপন হয়ে স্কুলে ঘোরা কি আল্লাহর একজন বিশ্বাসী হওয়ার চেয়ে আরও তুচ্ছ নয়? যদি আমরা সত্যিই লক্ষ্যবস্তুর কেন্দ্রে আঘাত করতে চাই, যদি বড় করে ভাবতে চাই, তাহলে আমাদের জানা আছে কী করতে হবে: ব্র্যান্ড নামের বিরুদ্ধে একটি আইন। শিরাক, কাজে নেমে পড়ুন। পুঁজির প্রকাশ্য চিহ্নগুলো নিষিদ্ধ করুন—একটুও দমে যাবেন না।

১৫

কী আশ্চর্য! তাহলে কি নারীদের দায়িত্ব হলো নগ্ন হওয়া? উরু খোলা রাখা কি বাধ্যতামূলক? স্তন? নাভির ছিদ্র দেখানো কি অবশ্যই প্রয়োজন?

এক প্রাদেশিক শহরের একটি সুইমিং পুলে কিছু সময় শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত ছিল। সেখানে ধর্মপরায়ণ নারীরা, যারা সাধারণত নিজেদের আড়ালে রাখেন, গোসল করতেন, হাসতেন।

মেয়র জোরালো যুক্তি দিয়ে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটালেন—’নারীদের দেহ দৃষ্টির বাইরে রাখা উচিত নয়।’ অবশ্যই! সব নারী নগ্ন হবে! আর তা তাড়াতাড়ি করতে হবে!

১৬

আমাকে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলুন। সময় ও স্থানের ভিন্নতায়—নারীর শরীরের কোন অংশ দেখা যাবে আর কোনটা যাবে না—এই প্রশ্নে নারীবাদী ও রিপাবলিকান যুক্তিবোধ আসলে কীভাবে নির্ধারিত হয়? যতদূর জানি, আজও–শুধু স্কুলেই নয়–স্তন, জননাঙ্গের লোম, কিংবা পুরুষাঙ্গ—কিছুই প্রকাশ্যে দেখানো হয় না। তাহলে কি এই অংশগুলো ‘দৃষ্টির বাইরে রাখা’ নিয়ে আমার ক্ষুব্ধ হওয়া উচিত? স্বামী, প্রেমিক, বড় ভাই—সবার ব্যাপারে সন্দেহ করা উচিত?

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়–ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে, আর এখনো সিসিলি ও অন্যান্য জায়গায়–বিধবারা কালো ঘোমটা, কালো মোজা, মানতিলা পরতেন। এর জন্য ইসলামী সন্ত্রাসীর বিধবা হওয়া লাগে না।

১৭

তবে আমি বুঝতে পারি—প্রবণতা ধীরে ধীরে নগ্নতার দিকেই যাচ্ছে। লিবারাসিয়োঁ (Libération)-এর সাংবাদিকরা বরাবরই মিনিস্কার্টের আবির্ভাবকে সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থার (totalitarianisms) আসন্ন পতনের এক অচ্যুত লক্ষণ হিসেবে অভিহিত করেছে। মিনিস্কার্টের ‘গ্রীষ্মের পাখি’ (swallow of the miniskirt) নাকি মানবাধিকারের বসন্তের আগমনী বার্তা দেয়। শরীরকে অতিরিক্ত ঢেকে রাখা—সবই সন্দেহজনক। সমুদ্রতটে খোলা বুকে থাকার লড়াই নকআউট জয় দিয়ে শেষ হয়েছে। গাড়ি, খাঁচাবন্দি ক্যানারি পাখি, কংক্রিট মিক্সার কিংবা কার্লার—প্রায় নগ্ন নারীর ছবি সম্বলিত বাণিজ্যিক চিহ্ন ছাড়া কিছুই বিক্রি করা যায় না। ব্রাসঁস (Brassens), যিনি বিশ বছর আগে নিজেকে ‘গ্রামোফোনের পর্নোগ্রাফার’ বলতেন, আজ তিনি গির্জার ইঁদুরের থেকেও বেশি লাজুক মনে হয়—যদি সেটাও বলা যায়। আর এই তথাকথিত ‘ইঁদুরগুলো’ আজ একে অপরের চেয়ে বেশি জোরে দাবি করছে—তাদের পুরোহিতদের জন্য সমকামী বিয়ের অধিকার।

১৮

আমরা নারীবাদী স্লোগান—‘আমার শরীর আমার’—থেকে এসে দাঁড়িয়েছি এক প্রকার পতিতাবৃত্তিমূলক স্লোগানে—‘আমার শরীর সবার’। প্রথমটির মধ্যে নিহিত ছিল মালিকানা, আর সেই মালিকানাই–ভুল পরামর্শে–আমাদের দ্বিতীয়টির দিকে ঠেলে দিয়েছে। মালিকানা থেকে নিলামে ওঠা–চূড়ান্ত ফলাফল সত্যিই চমৎকার!

১৯

অদ্ভুত নয় কি—অনেক নারী, এমনকি কিছু নারীবাদীও—যেমন ‘এল’ (Elle) ম্যাগাজিনে—কিছু হিজাব পরা মেয়েদের বিরুদ্ধে এত তীব্র ক্ষোভ দেখায় যে তারা প্রায় সোভিয়েত ধাঁচের ৮২ শতাংশ সমর্থন এনে বৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট শিরাককে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে, তারপর আবার আইন করে ওই মেয়েদের দমন করার দাবি তোলে? অথচ একই সময়ে—নারীর শরীর বাণিজ্যের জন্য সর্বত্র ব্যবহার হচ্ছে, সবচেয়ে অপমানজনক পর্নোগ্রাফি প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে, আর কিশোর-কিশোরীদের ম্যাগাজিন ভরে আছে শরীরকে যৌনভাবে প্রদর্শন করার নানা পরামর্শে।

২০

একটি সহজ ব্যাখ্যা আছে। মেয়েটিকে দেখাতে হবে—তার কাছে কী বিক্রির জন্য আছে। তাকে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন সে কী অফার করছে তা বোঝা যায়। তাকে ইঙ্গিত দিতে হবে—এখন নারীর চলাফেরা একটি সাধারণীকৃত মডেলের অধীনে চলছে, কোনো সীমাবদ্ধ অর্থনীতির ভেতরে নয়।

দাড়িওয়ালা বাবা আর বড় ভাইদের নিয়ে তাচ্ছিল্য করো! দীর্ঘজীবী হোক বৈশ্বিক বাজার! এই সাধারণীকৃত মডেলই—‘টপ মডেল’।

২১

একসময় ধরে নেওয়া হতো—একজন নারীর অধিকার আছে, সে নিজের পছন্দের মানুষের সামনে নিজেকে উন্মোচন করবে। কিন্তু এখন যেন তা আর নয়। এখন সবসময়ই উন্মোচনের ইঙ্গিত দিতে হবে—এক ধরনের স্থায়ী উন্মোচনের অবস্থায় থাকতে হবে। যে নারী বাজারে তার যা আছে তা ঢেকে রাখে—সে যেন একজন বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী নয়।

২২

দাড়ির প্রসঙ্গে আসি। আমরা জানি-লুক ফেরি (Luc Ferry)[2]লুক ফেরি, একজন হালকা চালের দার্শনিক, ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে পরিচিত French Philosophy of the … Continue reading, সেই আড়ম্বরপ্রিয় মন্ত্রী, বড় ভাইদের দাড়ি নিষিদ্ধ করার কথাও ভেবেছিলেন। সমতার যুক্তিতে এটা ন্যায্যই মনে হতে পারে: যদি মেয়েদের চুল দেখাতে বাধ্য করা হয়, তাহলে ছেলেদের দাড়ি কাটতে বাধ্য করা হবে না কেন? যখন থেকে লোমশতা (hairiness) রাষ্ট্রের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়… তখন ইউনিয়নের লাভও কম হতো না: একেবারে নতুন এক স্তর–স্কুলের নাপিত–যারা শ্রেণিকক্ষে লুকিয়ে থাকবে, সবসময় শেভিং ক্রিম থাকবে প্রস্তুত। মেয়েদের ‘উন্মোচন’ (unveiling) থেকে তেমন লাভজনক কিছু আসে না। উন্মোচনকারীরা? কাপড় খুলিয়ে দেওয়ার কর্মীরা? স্ট্রিপ-টিজারদের ইউনিয়ন? না, একেবারেই অসম্ভব। আফসোস।

২৩

আমরা একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় ধরে রাখতে পারি—হিজাব সংক্রান্ত আইনটি আসলে এক ধরনের নিখাদ পুঁজিবাদী আইন। এটি যেন বলে—নারীত্বকে প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হতে হবে। অন্যভাবে বললে, নারীর শরীরের উপস্থিতি ও চলাচল বাজারের আদর্শের সঙ্গে মানানসই হতে হবে। এই ক্ষেত্রে—বিশেষ করে কিশোরীদের নিয়ে, যারা খুব সংবেদনশীল এক মানসিক স্তরে থাকে—যেকোনো সংযম বা নিজেকে আড়ালে রাখার প্রবণতাকে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

২৪

কিছুদিন ধরে এক সুপরিচিত পরিচালকের বক্তব্য ও চলচ্চিত্রে এক ধরনের প্রকৃত কামবিরোধিতা, তীব্র যৌন উদাসীনতা—একেবারে কবরখোঁড়ার মতো পিউরিটান নৈতিকতা—দেখা যাচ্ছে। অথচ এসবই, আজকাল যেমনটা করা হয়, উত্তেজনাপূর্ণ উসকানির আড়ালে ঢেকে রাখা হচ্ছে।

হিজাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে এই পরিচালক আসলে বলছেন—‘তাহলে আমরা কানের লতিকে একটি নতুন কামোদ্দীপক অঞ্চল বানাব!’

কেন নয়, প্রিয় ‘যৌনতার পরিচালক’? নতুন একটি কামোদ্দীপক অঞ্চল তৈরি বা আবার তৈরি করা—শেষ পর্যন্ত আমাদের মতো কামনামগ্ন মানুষের জন্য এটাও তো এক ধরনের ভালো খবর!

২৫

সর্বত্রই শোনা যায়—‘ঘোমটা’ নাকি নারীর যৌনতার ওপর নিয়ন্ত্রণের এক অসহনীয় প্রতীক। কিন্তু আপনি কি সত্যিই মনে করেন, আমাদের সময় ও সমাজে নারীর যৌনতা নিয়ন্ত্রিত নয়? এমন সরলতা নিঃসন্দেহে ফুকোকে হাসাত। নারীর যৌনতা কখনো এত সূক্ষ্মভাবে নজরদারির মধ্যে ছিল না—এত ‘বিশেষজ্ঞ’ পরামর্শ কখনো চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, কখনো এত সূক্ষ্মভাবে ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ ব্যবহারের মধ্যে ভাগ করা হয়নি। উপভোগ যেন এখন এক ধরনের অশুভ বাধ্যবাধকতা। উত্তেজনাপূর্ণ বলে মনে করা শরীরের অংশগুলোকে সর্বত্র প্রদর্শন করা—এটি যেন কান্টের নৈতিক বিধানের (moral imperative) চেয়েও কঠোর এক কর্তব্য। উপরন্তু, লাকাঁ অনেক আগেই দেখিয়েছেন—আমাদের গসিপ ম্যাগাজিনগুলোর ‘উপভোগ করো, নারী!’ (Enjoy yourselves, women!) এই আহ্বান এবং আমাদের পরদাদীদের ‘উপভোগ করো না!’ (Do not enjoy!) এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আসলে এক ধরনের গঠনগত মিল আছে। বাজারের নিয়ন্ত্রণ পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি স্থায়ী, বেশি নিশ্চিত, এবং আরও ব্যাপক। সাধারণীকৃত পণ্যায়িত শরীরের এই প্রবাহ—যেখানে সবকিছু যেন এক ধরনের বাণিজ্যিক বিনিময়ে পরিণত হয়—তা পরিবারের কঠোর নিয়ন্ত্রণের চেয়ে অনেক দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য। আর সেই পুরোনো পারিবারিক নিয়ন্ত্রণকে নিয়ে গ্রিক কমেডি থেকে শুরু করে মলিয়ের পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাস্যরস সৃষ্টি হয়েছে।

২৬

বিশ্বকে যদি এক যাযাবর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়—যেখানে শরীরের অবিরাম চলাচল ও বিনিময়কে উদযাপন করা হয়—তাহলে স্পষ্ট যে একটি মুদ্রা নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাধীন বস্তু বলে ভাবতে পারে: কারণ সেটিই সবচেয়ে বেশি ঘোরাফেরা করে।

২৭

মা এবং বেশ্যা। কিছু দেশে প্রতিক্রিয়াশীল আইন প্রণয়ন করা হয়েছে মায়ের পক্ষে এবং বেশ্যার বিরুদ্ধে; অন্য কিছু দেশে প্রগতিশীল আইন করা হয়েছে বেশ্যার পক্ষে এবং মায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু আসলে এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বৈত বিকল্পটিকেই প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন।

২৮

তবে তা ‘না মা, না বেশ্যা’ ধরণের কথা বলেও কাজ হবে না—কারণ এটি কেবল নিরপেক্ষ পাটাতনে (যেমন ফ্রাঁসোয়া বাইরু—এর মতো মাঝামাঝি) যা সমালোচনা করা উচিত, সেটাকেই চালু রাখে।

‘না মা, না বেশ্যা’ বলা নিছক করুণ। যেমন ‘না বেশ্যা, না অনুগত’[3]ফরাসিতে স্লোগানটি হলো ‘ni putes, ni soumises’। এটি ফ্রান্সে ৮ মার্চ ২০০৩ তারিখে … Continue reading—এটিও সম্পূর্ণ হাস্যকর: একটি ‘বেশ্যা’ কি সাধারণত অনুগত নয়? আর তারা কি ঠিক তেমনই নয়? ফ্রান্সে একসময় তাদের বলা হতো les respectueuses (সম্মানশীলা নারীরা)। মোটকথা, তারা ছিল জনসমক্ষে অনুগত। আর যারা ‘অনুগত’ তারা হয়তো কেবল ব্যক্তিগত পরিসরের বেশ্যা।

২৯

শেষ পর্যন্ত সবকিছু এসে দাঁড়ায় এই জায়গায়: আজকের চিন্তার শত্রু হলো সম্পত্তি। এটি বাণিজ্য, এমনকি আত্মার মতো জিনিস, কিন্তু বিশ্বাস নয়। বরং বলা উচিত-(রাজনৈতিক) বিশ্বাসই আজ সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত। ‘ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান’ আসলে সেই আয়না, যেখানে তৃপ্ত পশ্চিমা সমাজগুলো ভয়ে দেখে—মানসিকতার যে ধ্বংস তারা নিজেরাই ঘটিয়েছে, তার ফলাফল। বিশেষ করে রাজনৈতিক চিন্তার ধ্বংস—যা পশ্চিমারা সর্বত্র সংগঠিত করতে চেয়েছে, কখনো তুচ্ছ গণতন্ত্রের আড়ালে, কখনো মানবিক সহায়তার নামে সামরিক হস্তক্ষেপ দিয়ে। এই পরিস্থিতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা–যা নিজেকে জ্ঞানের বিভিন্ন রূপের সেবায় নিয়োজিত বলে দাবি করে–আসলে একটি শিক্ষিত নিয়ম মাত্র, যার কাজ হলো প্রতিযোগিতাকে সম্মান করা, পশ্চিমা মানদণ্ডে প্রশিক্ষণ দেওয়া, এবং প্রতিটি দৃঢ় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এটি ভোক্তাবাদী শীতলতা, কোমল ব্যবসা, মুক্ত মালিকানা এবং হতাশ ভোটারদের স্কুল।

৩০

ঈশ্বরের মৃত্যুর পর ধর্মগুলো এতটাই অক্ষম হয়ে পড়েছে যে—আগে যেমন তারা নিজেদের নিজ নিজ ঈশ্বরের আদেশে একে অপরকে ধ্বংস করতে চাইত (যেখানে তারা আসলে পরমার্থে একই হওয়ায় আরও ক্রুদ্ধ হতো) এখন তারা একে অপরকে সহায়তা করতে বাধ্য হয়েছে। আর্চবিশপ পছন্দ করেন না, যখন মসজিদকে উসকানি দেওয়া হয়। ইমাম, পাদ্রি এবং পুরোহিত বিষণ্ণ আলোচনায় বসেন। এমনকি রাব্বি এবং পোপও একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ধর্ম বা সভ্যতার যুদ্ধের চেয়ে—যে ক্ষমতা ও পেট্রোডলারের ষড়যন্ত্র ঢাকার জন্য এক ধরনের বিভ্রম—আমি বরং বিশ্বাস করি মরণাপন্ন বিশ্বাসগুলোর আন্তর্জাতিক সমিতিতে।

৩১

সুতরাং স্পষ্টতই মুসলিমবিরোধী হিজাব সংক্রান্ত আইনটি ডানপন্থি সেইসব ডেপুটিদের অস্বস্তিতে ফেলে, যাদের আয়ের একটি অংশ নির্ভর করে গহীন প্রদেশগুলোর ক্যাথলিক ভোটারদের ওপর। সন্দেহ অন্যদিকে ঘোরাতে তারা গল্প বানাল—রাজনীতির ‘প্রদর্শনমূলক চিহ্ন’… সেগুলোকেও নাকি নিষিদ্ধ করা দরকার! আহা, সত্যি? আদৌ কি এমন কিছু আছে? আপনি কি কল্পনা করতে পারেন—সবচেয়ে অন্ধকার গ্রামগুলোতে, কিংবা তথাকথিত ভয়ংকর শহরতলিগুলোতে—হঠাৎ করেই হাতুড়ি-হাঁসুয়া জব্দ করার অভিযান শুরু হবে? প্রকাশ্য স্টালিন, বা ‘মহান নাবিক’ (Great Helmsman)-এর প্রতিকৃতি-খচিত হিজাব? আমার তো মনে হয় না—দুপুরের বিরতিতে এমন দৃশ্য সাধারণত দেখা যায়। দুঃখের সঙ্গে বলছি, বাস্তবতা এমনই। আমি নিজেও মাঝে মাঝে আমার জনসমক্ষে বড় বড় সেমিনারে ব্যাজ পরে যেতাম—কখনো মহামতি লেনিন, কখনো আমার প্রিয় মাও-এর। অথচ, কেউ তাতে বিন্দুমাত্র মন্তব্যই করত না!

৩২

এই বিচিত্র নারীবাদের গতিপথ দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না—যা একসময় নারীমুক্তির দাবি থেকে শুরু করে আজ এসে দাঁড়িয়েছে এমন এক অবস্থানে, যেখানে এই ‘মুক্তি’ এতটাই বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে যে কেবল পোশাকের একটি অনুষঙ্গের কারণে মেয়েদের (একজন ছেলেকেও নয়!) বহিষ্কার করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিস্ময়কর!

৩৩

‘কমিউনিটি’ নিয়ে এই সমস্ত সামাজিক পরিভাষা, আর ‘প্রজাতন্ত্র’ বনাম ‘কমিউনিটারিয়ানিজম’-এর তথাকথিত তীব্র ও প্রায় অধিবিদ্যাগত লড়াই—এসবই নিছক অর্থহীন। মানুষকে তাদের মতো করে বাঁচতে দিন—যেভাবে তারা চায় বা পারে; তারা যা খেতে অভ্যস্ত, তাই খাক; পাগড়ি, গাউন, হিজাব, মিনিস্কার্ট বা ট্যাপ—ডান্সের জুতো—যা খুশি পরুক; তারা চাইলে যখন খুশি পুরোনো দেবতাদের সামনে সিজদা করুক, নিজেদের বিনয়ী ভঙ্গিতে ছবি তুলুক, কিংবা বিচিত্র ভাষা প্রয়োগ করুক। এই ধরনের ‘পার্থক্য’-এর কোনো সার্বজনীন তাৎপর্য নেই—এগুলো চিন্তাকে বাধা দেয় না, আবার এগিয়ে নিতেও সাহায্য করে না। তাই এগুলোকে বিশেষ সম্মান দেখানোরও কারণ নেই, আবার ঘৃণা করারও নয়। ‘অপর’ (Other) একটু ভিন্নভাবে বাঁচে (লেভিনাস-এর অনুসারী সূক্ষ্ম ধর্মতত্ত্ব (discreet theology) ও বহনযোগ্য নৈতিকতা (portable morality)-র অনুরাগীরা যেমন বলতে পছন্দ করেন) এই পর্যবেক্ষণ করতে খুব বেশি পরিশ্রম লাগে না।

৩৪

সর্বোচ্চ যা বলা যায়—রীতি-নীতি ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্য মানবপ্রাণীর বৈচিত্র্যের একটি টিকে থাকা সাক্ষ্য। যেমন নীল তোতা পাখি বা তিমি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তেমনি জীবনের বহুরূপী শক্তি আমাদের কৌতূহলী করে, আকৃষ্ট করে।

৩৫

আর মানুষ যে নিজেদের উৎসের ভিত্তিতে দলবদ্ধ হয় তা তাদের (ফ্রান্সে) আগমনের প্রায়শই করুণ পরিস্থিতির একটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য ফল। সাঁ-তুয়াঁ-ল’ওমোন (Saint-Ouen-l’Aumône)-এর কোনো হোস্টেলে আপনাকে স্বাগত জানাতে পারে—আপনার কোনো চাচাতো ভাই বা একই গ্রামের মানুষ—নোলেন্স ভোলেন্স, অর্থাৎ চাই বা না চাই। চীনারা যেখানে আগে থেকেই চীনারা আছে, সেখানেই যায়—এতে বিরক্ত হওয়া বোকামি, যদি না আমরা ত্রিশ বছর আগের ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি (PCF)-এর নির্দেশনায় ফিরে যেতে চাই: তারা শহরতলির সব কমিউনের মধ্যে–বাম বা ডান নির্বিশেষে–অভিবাসীদের বোঝা সমানভাবে বণ্টনের দাবি করেছিল। ‘আরবদের’-এই শ্রমিক-আন্তর্জাতিকতাবাদী কমরেডরা প্রায় এভাবেই বলত—‘সব আরবকে আমাদের কাউন্সিলগুলোতে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে!’

৩৬

আজ মুসলিমদের ‘সমন্বয়’ (assimilation) নিশ্চিত করা এবং ‘কমিউনিটারিয়ানিজম’ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে, ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি যতটা সাহস দেখিয়েছিল, তার চেয়েও এগিয়ে যেতে হবে! চলুন দাবি তুলি—প্রতিটি বড় নগরসমষ্টিতে (urban conglomeration) সর্বোচ্চ দু’টি মরোক্কান পরিবার থাকবে—তার মধ্যে একটি বড় পরিবার হতে পারবে; একটি মাত্র ‘মাঝারি’ মালিয়ান পরিবার; একজন তুর্কি অবিবাহিত পুরুষ; আর অর্ধেক একজন তামিল!

৩৭

এই ‘সাংস্কৃতিক পার্থক্য’ বা ‘কমিউনিটি’ নিয়ে আসল সমস্যা তাদের সামাজিক অস্তিত্ব, বাসস্থান, কাজ, পরিবার বা স্কুল নয়। সমস্যা হলো—যখন সত্যের প্রশ্ন আসে, তখন এই নামগুলো অর্থহীন হয়ে যায়; সেটা শিল্পের সত্য হোক, বিজ্ঞানের, প্রেমের, বা বিশেষ করে রাজনীতির। মানুষ হিসেবে আমাদের জীবন নানা বিশেষত্ব দিয়ে গঠিত—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু যখন এই বিশেষত্বের শ্রেণিগুলো নিজেকে সার্বজনীন বলে দাবি করে, তখন তারা নিজের ওপর ‘কর্তা’ হওয়ার গম্ভীরতা চাপিয়ে দেয়—আর সেখানেই বিপদ তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে আলাদা রাখা। আমি হলুদ অন্তর্বাস পরে গণিত করতে পারি, আবার ড্রেডলকস চুল রেখে নির্বাচনী ‘গণতন্ত্র’-এর বাইরে একটি রাজনীতি করতে পারি।

এতে কিন্তু এই কথা বোঝায় না যে তত্ত্বটি হলুদ (বা হলুদ নয়), যেমন এটাও বোঝায় না যে আমাদের রাজনৈতিক দিকনির্দেশ ‘ড্রেডলকস’-এর মতো। আবার এটাও নয় যে তার সঙ্গে ড্রেডলকসের কোনো সম্পর্কই নেই।

৩৮

অন্যভাবে বললে—কোনো সত্য, তা রাজনৈতিক হোক বা অন্য কিছু, নিজেকে চেনে এইভাবে : যে নীতির এটি একটি বিশেষ উদাহরণ, সেই নীতির দিক থেকে এতে আসলে কোনো বিশেষত্ব নেই। এটি এমন কিছু, যা ওই পরিস্থিতিতে প্রবেশ করা যেকোনো মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

এই কারণেই রাজনৈতিক কর্মী, গণিতের কোনো তত্ত্ব প্রমাণকারী, নাটক রচনাকারী, বা প্রেমের মোহে বেঁচে থাকা মানুষ—সবাই ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে চিন্তার বিশেষ রূপ তৈরি করে। কিন্তু এই চিন্তার রূপগুলো, তাদের শরীর ও মানসিক অবস্থা যতই আলাদা হোক, তারা একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারে। যৌন, ভাষাগত, ধর্মীয়, মানসিক বা জাতিগত বিশেষত্ব—এসব কোনো সত্যের প্রক্রিয়ার ভেতরে নিজস্বভাবে প্রবেশ করে না; আবার এগুলো কোনো বাধাও সৃষ্টি করে না। সাঁ-জ্যুস্ত-এর আগেই সাঁ-পল বলেছিলেন—যখন সত্যের প্রশ্ন আসে, তখন ব্যক্তিগত বিশেষত্বের কোনো গুরুত্ব থাকে না।

৩৯

শোনা যায়—একটি স্কুল নাকি এতটাই হুমকির মুখে পড়ে যায়, যদি কয়েকটি মেয়ের হিজাবের মতো সামান্য একটি বিষয় সামনে আসে। এতে সন্দেহ জাগে—এখানে আসলে কোনো সত্যের প্রশ্ন নেই; আছে শুধু কিছু মতামত, তাও খুব নিচু ও রক্ষণশীল ধরনের। আমরা কি দেখিনি—রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, স্কুলের প্রধান কাজ হলো ‘নাগরিক তৈরি করা’? কী বিষণ্ন কর্মসূচি! আজকের ‘নাগরিক’ যেন এক ধরনের ক্ষুদ্র, তিক্ত ভোগবাদী—যে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে লেগে থাকে, যেখানে সত্যের কোনো চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।

৪০

সমাজের নিম্নস্তর থেকে উচ্চস্তর পর্যন্ত আমরা কি এই বাস্তবতাটি নিয়ে চিন্তিত নই যে, আলজেরিয়া, মরক্কো এবং তিউনিসিয়া থেকে আগত বহু কিশোরী—যাদের চুল শক্ত করে বাঁধা, আচরণ সংযত, এবং যারা অধ্যবসায়ের সঙ্গে পড়াশোনা করে—তারা, কয়েকজন চীনা শিক্ষার্থীর সঙ্গে মিলিত হয়ে (যারা একইভাবে পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত), শ্রেণির সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী হয়ে উঠেছে?

আজকের দিনে এমন হওয়ার জন্য যথেষ্ট আত্মত্যাগ প্রয়োজন। তাহলে কি এমন হতে পারে যে ‘শিরাকের সোভিয়েত-ধাঁচের আইন’ শেষ পর্যন্ত নির্লজ্জভাবে কিছু অসাধারণ ছাত্রছাত্রীকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করে দিচ্ছে?

৪১

‘কোনো বাধা ছাড়াই উপভোগ করো’ (Enjoy unfettered)[4]ফরাসি স্লোগানটি হলো ‘jouir sans entraves’, যা মিডিয়া ও ‘মে ৬৮’-কে ‘উদার ব্যক্তি … Continue reading—১৯৬৮ সালের এই বোকামি কখনোই জ্ঞানচর্চাকে পূর্ণ শক্তিতে এগিয়ে নিতে পারেনি। বরং, এক ধরনের স্বেচ্ছাসংযম—যার মৌলিক কারণগুলো আমরা ফ্রয়েডের কাছ থেকে জানতে পারি—শিক্ষা এবং অন্তত কিছু কার্যকর সত্যের নৈকট্যের সঙ্গে অপরিচিত নয়। এমনকি এমনও হতে পারে যে একটি মাথার ওড়না (হেডস্কার্ফ) কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপকারী হয়ে ওঠে। যখন দেশপ্রেম—যা শিক্ষানবিশতার এক ধরনের তীব্র, কঠিন শক্তি—সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে, তখন যেকোনো আদর্শবাদ, তা যতই সস্তা হোক, স্বাগত হয়ে ওঠে। অন্তত তাদের কাছে, যারা মনে করে যে শিক্ষা কেবল ‘ভোক্তা-নাগরিক’ তৈরি করার জন্য নয়।

 ৪২

হিজাববিরোধী স্লোগানগুলো এমন ধরনের :

‘আমার সেক্যুলারিজম নষ্ট হওয়ার আগে স্কুল ধ্বংস হয়ে যাক’;

‘মাথা খোলা একজন অশিক্ষিত থাকলেও ভালো, কিন্তু একজন প্রতিভাবান হিজাবধারী মেয়েকে আমরা চাই না।’

৪৩

আসলে সত্যি বলতে, হিজাব আইন একটাই জিনিস প্রকাশ করে—ভয়। পশ্চিমারা সাধারণভাবে, আর ফরাসিরা বিশেষ করে, কাঁপতে থাকা ভীরুদের একটা দল ছাড়া কিছুই না। তারা কিসের ভয় পায়? বরাবরের মতোই—‘বর্বরদের’। এই ‘বর্বর’ দুই ধরনের—ভেতরের, মানে শহরতলির তরুণরা; আর বাইরের, মানে তথাকথিত ‘ইসলামি সন্ত্রাসীরা’।

কেন তারা ভয় পায়? কারণ তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও আসলে অপরাধবোধে ভোগে।

১৯৮০-এর দশক থেকে তারা ধীরে ধীরে মুক্তির রাজনীতি, বিপ্লবী চিন্তা, এবং বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করার সবরকম যুক্তিবোধকে পরিত্যাগ করেছে। তারা নিজেদের সামান্য সুবিধা-স্বার্থ আঁকড়ে ধরে আছে। তারা আসলে বড় হয়ে যাওয়া শিশু—যারা তাদের কেনাকাটার খেলনা নিয়ে খেলে।

হ্যাঁ, বলা যায়, ‘দীর্ঘ শৈশবের পর তারা বড় হতে বাধ্য হয়েছে।’

আর সেই কারণেই তারা ভয় পায় এমন কিছুকে, যা তাদের চেয়ে সামান্য হলেও নতুন। যেমন, একগুঁয়ে এক তরুণী মেয়ে।

৪৪

সবচেয়ে বড় কথা, পশ্চিমারা–বিশেষ করে ফরাসিরা–মৃত্যুকে ভয় পায়। তারা আর কল্পনাও করতে পারে না যে কোনো ধারণা এমন কিছু হতে পারে যার জন্য ঝুঁকি নেওয়া যায়।

তাদের প্রধান কামনা—‘শূন্য মৃত্যু’।

কিন্তু তারা দেখে, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ লক্ষ মানুষ আছে, যারা মৃত্যুকে ভয় পায় না। এমনকি তাদের মধ্যে অনেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ধারণার জন্য প্রাণ দেয়। ‘সভ্য’ মানুষের কাছে এই বিষয়টা গভীর এক আতঙ্কের উৎস।

৪৫

আমি জানি, আজকাল যেসব ধারণার জন্য মানুষ মরতে প্রস্তুত হয়, সেগুলোর বেশিরভাগেরই তেমন মূল্য নেই। আমি বিশ্বাস করি, সব দেবতা অনেক আগেই সরে গেছে। তাই আমি দুঃখ পাই যখন দেখি তরুণ-তরুণীরা নিজেদের শরীর উড়িয়ে দেয় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে, এমন কিছুর নামে, যা অনেকদিন ধরেই বাস্তবে নেই।

আমি এটাও জানি যে, এই ভয়ংকর ‘শহীদ’দের ব্যবহার করছে এমন কিছু ষড়যন্ত্রকারী, যারা আসলে তাদের কথিত শত্রুদের মতোই। বারবার বলতে হয়—বিন লাদেন আসলে আমেরিকান গোপন সংস্থার সৃষ্টি। আমি এতটা সরল নই যে এই আত্মঘাতী হামলাগুলোর মধ্যে কোনো পবিত্রতা, মহত্ত্ব বা বাস্তব কার্যকারিতা আছে বলে বিশ্বাস করব।

৪৬

কিন্তু আমি এটাও বলছি—যে ভয়াবহ মূল্য আজ দেওয়া হচ্ছে, তার প্রধান কারণ হলো পশ্চিমা আধিপত্যশীল শক্তিগুলো রাজনৈতিক যুক্তিবোধের সব রূপকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ধ্বংস করেছে। আর এই কাজটি সম্ভব হয়েছে—বিশেষ করে ফ্রান্সে—বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমজীবী শ্রেণির একটি বিস্তৃত অংশের সহযোগিতার মাধ্যমে। তোমরা কি নির্মমভাবে ‘বিপ্লব’-এর ধারণার স্মৃতিটুকুও মুছে ফেলতে চেয়েছিলে? তোমরা কি ‘শ্রমিক’ শব্দটির সব ব্যবহার—এমনকি প্রতীকী ব্যবহারগুলোও—উপড়ে ফেলতে চেয়েছিলে? তাহলে ফলাফল নিয়ে অভিযোগ করো না। দাঁত চেপে থাকো—এবং গরিবদের হত্যা করো। অথবা তোমাদের আমেরিকান বন্ধুদের দিয়ে তাদের হত্যা করাও।

৪৭

আমরা যে যুদ্ধ পাই, তা আমাদেরই প্রাপ্য।  এই পৃথিবীতে, যা ভয়ে অবশ হয়ে গেছে—বড় দস্যুরা নির্মমভাবে রক্তশূন্য দেশগুলোকে বোমা মারে। মাঝারি দস্যুরা টার্গেট করে হত্যা করে যাকে তারা অপছন্দ করে। আর ছোট দস্যুরা হিজাবের বিরুদ্ধে আইন বানায়।

৪৮

তারা বলবে, এটা তেমন গুরুতর কিছু না। হ্যাঁ, অবশ্যই—এটা এত খারাপও না। ইতিহাসের আদালতে আমরা বলব—‘সে তো শুধু একজন হেয়ারস্টাইলিং বিশেষজ্ঞ ছিল—ঘটনায় তার ভূমিকা ছিল খুবই সামান্য।’

৪৯

এখন কি একটু ভালো লাগছে?

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 মূল নিবন্ধ- https://www.versobooks.com/en-gb/blogs/news/2025-alain-badiou-the-law-on-the-headscarf-is-a-pure-capitalist-law
2 লুক ফেরি, একজন হালকা চালের দার্শনিক, ইংরেজি ভাষাভাষী দেশে পরিচিত French Philosophy of the Sixties: An Essay on Antihumanism–এর সহ-লেখক হিসেবে। এটি ৬৮ সালের চিন্তাধারার সমস্ত প্রকাশের বিরুদ্ধে একটি সংরক্ষণশীল-উদার আক্রমণ। তিনি ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত Jean-Pierre Raffarin সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন।
3 ফরাসিতে স্লোগানটি হলো ‘ni putes, ni soumises’। এটি ফ্রান্সে ৮ মার্চ ২০০৩ তারিখে অনুষ্ঠিত ‘Marche des femmes contre les ghettos et pour l’égalité’–এর পর উদ্ভূত একটি আন্দোলনের নাম থেকে এসেছে। আন্দোলনের লক্ষ্য হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ প্রচার করা … একমাত্র ভিত্তি যার ওপর আমরা সবাই একসাথে বাস করতে পারি’। ব্যানল্যুতে নারীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি বৈধ প্রতিবাদ আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, NPNS, SOS Racisme–এর মতো, দ্রুত প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে যায় এবং এটি হিজাববিরোধী আইন ও হিজাবের বিরুদ্ধে থাকা বামপন্থি শক্তিগুলোর অন্যতম তীব্র প্রতিপক্ষ।—অনুবাদক।
4

ফরাসি স্লোগানটি হলো ‘jouir sans entraves’, যা মিডিয়া ও ‘মে ৬৮’-কে ‘উদার ব্যক্তি স্বাধীনতার আন্দোলন’ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাওয়া লোকেরা সক্রিয়ভাবে প্রচার করেছে; অর্থাৎ, রাজনৈতিক স্বরূপকে কমিয়ে একটি মূলত হেডোনিস্টিক আন্দোলন হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টা। ফ্রান্সে মে ’৬৮–এর বিভিন্ন বিশ্লেষণ সম্পর্কে দেখুন: May ’68 and Its Afterlives।—অনুবাদক।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments