দারুল ইসলাম ও দারুল হরব

মূল : মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান

মওলবি আশরাফ

[আমাদের কাছে খুব পরিচিত দুটো পরিভাষা হলো ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হরব’। অনেকেই আধুনিক রাষ্ট্রকে এই দুই পরিভাষার মানদণ্ডে বিচার করে। অথচ এই দুটো পরিভাষাই ফিকহে যোগ হয়েছে ১২০ থেকে ১৫০ হিজরির কোনো এক সময়ে, তৎকালীন শাসনব্যবস্থার ভিত্তিতে। এই পরিভাষাগুলো ‘কনস্ট্যান্ট’ বা ‘ধ্রুব’ নয়। ফকিহগণ অবশ্যই তাদের সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা কেবল কিতাবের কালো কালো হরফের ওপর সিদ্ধান্ত দেন না। সম্প্রতি মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার পরিচালক মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মদ আবদুল্লাহ সাহেবের এমন একটি মন্তব্য নতুন করে সামনে এসেছে—‘ফিকহের ইসতিলাহে যে দারুল হারব, সেই দারুল হারবটা পাওয়া অনেকটা কঠিন।’ এ নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খানের এই ছোট্ট প্রবন্ধটি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। —মওলবি আশরাফ]


আল্লাহর রসুল (স.)–এর আমলে ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হরব’—এ ধরনের কোনো পরিভাষা ছিল না। এই শব্দদুটোর প্রথম ব্যবহার হয় প্রায় দেড়শো বছর পর, আব্বাসীয় শাসনামলে। কোরআন-হাদিসের কোথাও এই শব্দদুটোর উল্লেখ নেই। তাই সঙ্গত কারণেই এ কথা বলা যায়—এই পরিভাষাগুলো আসলে ‘নবআবিষ্কৃত পরিভাষা’।

ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদদের কাছে ‘দারুল ইসলাম’ মানে সেই রাষ্ট্র, যেখানে মুসলমানরা নির্ভয়ে, স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন করতে পারে। আর ‘দারুল হারব’ মানে সেই রাষ্ট্র, যাকে মুসলমানরা ‘শত্রু রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে, অর্থাৎ যাদের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে। অর্থাৎ এই দুই পরিভাষা মূলত মানুষের ‘কিয়াস’ থেকে তৈরি। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা সরাসরি কোরআনের আলোকে তৈরি করা উচিৎ ছিল।

‘রাষ্ট্রব্যবস্থার’ পার্থক্যকরণের পরিভাষার খোঁজে আমরা যদি কোরআনের দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে ‘দারুল ইসলাম’ ও ‘দারুল হারব’–এর চেয়ে আরও উপযুক্ত পরিভাষার সন্ধান পাই। সেগুলো হলো ‘দারুল খওফ’ (ভয়ের দেশ) ও ‘দারুল আম্‌ন’ (নিরাপত্তার দেশ)।

এই মতের ভিত্তি হলো কোরআনের একটি আয়াত, যেখানে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন :

وَعَدَ اللّٰهُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡكُمۡ وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّهُمۡ فِی الۡاَرۡضِ كَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِهِمۡ ۪ وَ لَیُمَكِّنَنَّ لَهُمۡ دِیۡنَهُمُ الَّذِی ارۡتَضٰی لَهُمۡ وَ لَیُبَدِّلَنَّهُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ خَوۡفِهِمۡ اَمۡنًا ؕ یَعۡبُدُوۡنَنِیۡ لَا یُشۡرِكُوۡنَ بِیۡ شَیۡئًا ؕ وَ مَنۡ كَفَرَ بَعۡدَ ذٰلِكَ فَاُولٰٓئِكَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খেলাফত দান করবেন, যেমন তিনি খেলাফত দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে। এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির [খওফ] পরে তাদেরকে নিরাপত্তা [আম্‌ন] দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই ফাসিক। [1]সুরা নুর, আয়াত ৫৫

কোরআনের এ ই আয়াত অনুযায়ী প্রাক-ইসলামি যুগের মুসলমানরা প্রথমদিকে ভয়ের পরিবেশে ছিল। এরপর আল্লাহ তাদের সেই ভয়ভীতির অবস্থা দূর করে নিরাপত্তার পরিবেশ দান করেন। অর্থাৎ, তারা প্রথমে ছিল দারুল খওফে (ভয়ের দেশে), পরে আল্লাহ তাদের পৌঁছে দেন দারুল আম্‌নে (নিরাপত্তার দেশে)।

বৃহত্তর ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়—

  •         দারুল খওফ মূলত সেই সময়কে বোঝায়, যাকে সিরাতের ভাষায় ‘মক্কি যুগ’ বলা হয়।
  •         আর দারুল আম্‌ন বোঝায় সেই সময়কে, যাকে ‘মাদানি যুগ’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অর্থাৎ, যে পরিস্থিতিকে পরবর্তী যুগের ফকিহরা ‘দারুল হারব’ নামে উল্লেখ করেছেন, কোরআনে সেটিকে বলা হয়েছে ‘দারুল খওফ’। আর যে পরিস্থিতিকে ফকিহরা ‘দারুল ইসলাম’ বলেছেন, কোরআনে তার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ‘দারুল আমন’ শব্দ।

এই অবস্থা রসুল (স)-এর নবুওয়তপ্রাপ্তির পর প্রায় দশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এরপর আল্লাহর অনুগ্রহ নাজিল হয়। রসুল (স)-এর জীবনের শেষ সময়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়, যা কোরআনের সুরা মায়েদায় রয়েছে।

اَلۡیَوۡمَ یَئِسَ الَّذِیۡنَ كَفَرُوۡا مِنۡ دِیۡنِكُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡهُمۡ وَ اخۡشَوۡنِ ؕ اَلۡیَوۡمَ اَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِیۡنَكُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَكُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا

আজ কাফেরেরা তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেছে। কাজেই তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় করো। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [2]সুরা মায়েদা, আয়াত ৩

এই আয়াতটি এক ইলাহি ঘোষণা, যা আমাদের বলছে—হযরত পয়গম্বর (স.)-এর মিশন পরিপূর্ণ হওয়ার পর এমন এক পরিবর্তন ঘটেছে যে, দুনিয়ার আর কোনো অংশ মুসলমানদের জন্য আর কখনও দারুল খওফ (ভয়ের দেশ) হবে না।

অর্থাৎ, কেয়ামতের আগ পর্যন্ত মুসলমানরা এখন ‘দারুল আম্‌নে’ (নিরাপত্তার দেশে ও সময়ে) প্রবেশ করেছে। পৃথিবীর ইতিহাস একেবারে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মানুষের জন্য আল্লাহভীতির ব্যাপারটি প্রধান ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সারা দুনিয়ায় স্থায়ীভাবে দারুল আম্‌ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং কোনো স্থান মুসলমানদের জন্য দারুল খওফ নয়।

এ থেকে যে বাস্তব শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো—এখন মুসলমানদের কর্তব্য হলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাদের অর্জিত সুযোগগুলো কাজে লাগানো, আর কল্পিত ভয়ের নামে গোটা দুনিয়ার মানুষের সঙ্গে অনর্থক লড়াই না করা।

তাই মুসলমানদের জন্য উচিত নয় ‘দারুল ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার নামে অমুসলিমদের সঙ্গে খামোখা লড়াই চালিয়ে যাওয়া। বরং মুসলমানদের একমাত্র কাজ হওয়া উচিত—যেকোনো পরিস্থিতিতেই দারুল আম্‌নকে রক্ষা করা। মুসলমানদের সেই মূর্খতা থেকে বেঁচে থাকা জরুরি, যার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহর রসুল (স) সাবধান করে গেছেন। হযরত হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে :

‏ لاَ يَنْبَغِي لِلْمُؤْمِنِ أَنْ يُذِلَّ نَفْسَهُ‏.‏ قَالُوا وَكَيْفَ يُذِلُّ نَفْسَهُ ‏.‏ قَالَ ‏ يَتَعَرَّضُ مِنَ الْبَلاَءِ لِمَا لاَ يُطِيقُ

রসুলুল্লাহ (স.) বলেন—‘কোনো মুসলমানের জন্য উচিৎ নয় নিজেকে অপমানিত করা।’

একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীভাবে সে নিজেকে অপমানিত করে?’

তিনি বললেন, ‘যখন সে নিজেকে এমন বিপদ ও পরীক্ষার মুখে  ফেলে, যার বোঝা সে বহন করতে সক্ষম নয়।’ [3]জামিউত তিরমিজি, হাদিস নং ২২৫৪; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ২৩৪৪৪

কোরআনের ওই আয়াত অনুযায়ী এখন দুনিয়ার প্রতিটি দেশ মুসলমানদের জন্য দারুল আম্‌ন হয়ে গেছে। দারুল আম্‌ন বলতে বোঝায় এমন জায়গা—যেখানে শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করার সব সুযোগ ও নিরাপত্তা থাকে।

যখন আল্লাহ সমগ্র পৃথিবীকে মুসলমানদের জন্য দারুল আম্‌ন বানিয়ে দিয়েছেন, তাতে যে সরল পরিণতি আসে তা হলো—এখন মুসলমানদের জন্য জাতীয় ও ধর্মীয় কাজ-কর্ম পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ পদ্ধতির মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। তাদের জন্য শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি (پُر امن طریق) বাদ দিয়ে সহিংস বা উগ্রপন্থা (پر تشدد طریق) অবলম্বন করা কোনোভাবেই জায়েজ নয়।

শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি সহিহ বুখারির এই হাদিস থেকে পরিষ্কার হয়, হযরত আয়েশা (রা) বলেন—

مَا خُيِّرَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بَيْنَ أَمْرَيْنِ إِلاَّ اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا

নবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে যখনই দুটো কাজের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, তখন তিনি অপেক্ষাকৃত সহজটি বেছে নিতেন। [4]সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৭৮৬

এই হাদিস অনুযায়ী এটাই বোঝা যায়—সহিংস পদ্ধতি কঠিন পথ, আর শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি সহজ পথ। তাই রসুল (স.)-এর সুন্নত অনুসারে মুসলিমদের দায়িত্ব হলো—সহিংস পদ্ধতি থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজনগুলো শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পথে অর্জনের চেষ্টা করা।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 সুরা নুর, আয়াত ৫৫
2 সুরা মায়েদা, আয়াত ৩
3 জামিউত তিরমিজি, হাদিস নং ২২৫৪; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ২৩৪৪৪
4 সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৭৮৬

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Shoriful
Shoriful
2 months ago

অনুবাদকে খারেজি গবেষক বলে ভুল হবে না।
যেমন লেখক তেমনি অনুবাদক। কখনো তাওহীদে হ্যাকিমিয়্যাহ নিয়ে তিব্র খারেজি মানসিকতা পায়।
মুরজিয়াদের মত সবাইকে মুসলমান বানিয়ে দিতে আবার খারেজি মানসিকতা তাঁর বিপরীত। এ দুটো রোগ থেকে বের হয়ে মধ্যপন্থী মুসলিম হিসাবে আমাদের কবুল করুন। আমীন।