হাকিমিয়া-তত্ত্ব ও উগ্রবাদী প্রবণতা

মূল : ড. আল-হাসান আল-আলামি

মওলবি আশরাফ

‘হাকিমিয়া’ শব্দটি ইসলামি ঐতিহ্যে একটি নবসৃষ্ট পরিভাষা। আরবিভাষায় প্রাচীনকালে এর ব্যবহার পাওয়া যায় না। তবে এর শিকড় আমরা কোরআন ও সুন্নাহতে খুঁজে পাই—যেমন ‘হুক্‌ম’, ‘হাকিম’, ‘তাহকিম’, ‘হাকাম’—এই শব্দগুলো কোরআনে আছে, তবে ভিন্ন অর্থে।

হাল আমলে নতুন অর্থে ‘হাকিমিয়া’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন হিন্দুস্তানি চিন্তাবিদ মওলানা আবুল আলা মওদুদি। পরে এই তত্ত্বের প্রসার ঘটান সাইয়িদ কুতুব, বিশেষ করে তার ‘মাআলিম ফিত তরিক’ ও ‘ফি যিলালিল কোরআন’ গ্রন্থে। তার থেকে একদল মানুষের মাঝে, কলোনিয়াল শাসন থেকে মুক্তির পর ‘শাসন ও আইন প্রণয়নের কর্তৃত্ব কার’—এই প্রশ্নের ভিত্তিতে, এই তত্ত্বটির জনপ্রিয়তা বাড়ে। বহু মানুষের কাছে নতুন অর্থের এই শব্দটি কোরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত ‘হুকুম’ শব্দের সমার্থক হয়ে ওঠে। এই শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়—একমাত্র আল্লাহকেই সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ও বিধানদাতা হিসেবে বিশ্বাস করা এবং যাবতীয় ফয়সালার ভার তার ওপর ন্যস্ত করা—যেমন কোরআনের এই আয়াতে আছে :

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ

হুকুম একমাত্র আল্লাহর। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন—তোমরা কেবল তারই এবাদত করবে। [1]সুরা ইউসুফ, আয়াত ৪০

ইসলামের প্রথম যুগেও একদল লোক এই ‘হুক্‌ম’ শব্দের অপব্যবহারের মাধ্যমে সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করেছিল, যাদেরকে খারেজি (বিচ্ছিন্নতাবাদী) বলা হতো। তাদের ব্যাপারে নবী করীম (স) সতর্ক করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:

‘শেষ জমানায় নতুন দাঁত গজানো (অল্পবয়সী) ও মোটাবুদ্ধির এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হবে। তারা মানুষকে ভালো ভালো কথা বলবে, কোরআন পাঠ করবে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করবে না। তারা ইসলাম থেকে এত দ্রুতবেগে বের হয়ে যাবে, যেমন ধনুক থেকে তীর দ্রুতবেগে শিকারের দিকে ছুটে যায়।’ [2]ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৮

এরপর যা হওয়ার তাই হলো—ইতিহাসে তাদের ফেতনা অনেক রক্ত ঝরিয়েছে। বর্তমানে তারা আবার নতুন করে ফিরে এসেছে। মদ পুরানো, কিন্তু বোতল নতুন—অবশ্য সহস্র বছরে সেই মদ আরও ঝাঁঝালো আর ঝটকা-লাগানো হয়ে উঠেছে।

 

কোরআন-সুন্নাহয় ‘হাকিম’ শব্দের অর্থ

কোরআন ও সুন্নাহয় যেখানে আল্লাহ তাআলার সাথে ‘হাকিম’ বা হুকুমদাতা গুণ যোগ করা হয়েছে, সেখানে একই সাথে দুটো অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে :

১. তাকবিনি : এর মানে আল্লাহ তাআলা এমন হুকুমদাতা সত্তা, এই মহাবিশ্বে কিংবা তার বাইরে যত সৃষ্টি আছে, সবই তার কুদরত ও ইরাদায় (ইচ্ছায়) সৃষ্টি হয়েছে, আর তার কোনো শরিক নাই। এই বিশ্বজগতে যা কিছুই ঘটে, প্রতিটি জিনিসই তার হুকুমে চলে। তার হুকুমের বাইরে কিছুই নাই।

২. তাশরিয়ি : এর মানে আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবন কীভাবে পরিচালিত হবে, মানুষ কীভাবে মানুষকে শাসন করবে, তার সব নিয়মকানুন তৈরি করে দিয়েছেন। প্রাত্যহিক ও সামাজিক জীবনযাপনের জন্য আল্লাহ শরিয়ত দিয়েছেন, মানুষকে পরিচালনা করতে নবী-রসুলদের প্রেরণ করেছেন, এবং আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (স)-এর পরে ‘উলুল আমর’কে সেই দায়িত্ব বর্তিয়েছেন। এছাড়া মানুষের মাঝে অন্য কোনো মানুষ ফয়সালা করলে সে যেন ইনসাফের সাথে করে, সেই নির্দেশ দিয়েছেন—এই সবই তার ‘তাশরিয়ি’ হুকুমদাতা গুণের অংশ। যেমন তিনি এরশাদ করেন—

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الأمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ

নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে। তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য (হুকুম) পরিচালনা করবে তখন ইনসাফের সাথে বিচার করবে। [3]সুরা নিসা, আয়াত ৫৮

এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে ‘হুকুম’ করার স্বাধীনতা দিয়েছে, তার মধ্যে এবাদতসংক্রান্ত বিষয় ও হুদুদ-কিসাস ছাড়া প্রায় সবই অন্তর্ভুক্ত। যেমন—বিচারব্যবস্থা, স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ মীমাংসায় সালিশ পাঠানো। খোদ রসুল (স) তার পক্ষ থেকে অন্য সাহাবিকে দিয়ে ফয়সালা করিয়েছেন এমন উদাহরণও আছে। আবার ওমর (রা) দুর্ভিক্ষের বছর চোরের হাত কাটার বিধান প্রয়োগ না করার ওপর ইজতেহাদ করেছিলেন, যেখানে কোরআনে কোনো ‘ব্যতিক্রম’ রাখা হয়নি। সোজা কথায় আল্লাহর যে ‘তাশরিয়ি হাকিমিয়া’, এর মাঝে মানুষকে কর্তৃত্ব দেওয়ার জায়গাও আছে। হ্যাঁ, যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা সরাসরি বিধান নাজিল করেছেন, মানুষ সেই বিধান অনুযায়ী ফয়সালা করতে বাধ্য। কিন্তু তা না করলে সে অবশ্যই গোনাহগার হবে, কিন্তু কাফের হবে না—যদিও এই নব্য-খারেজিরা তাদের সরাসরি তাকফির করে।

 

হাকিমিয়া-তত্ত্বের দলিল ও তার বিশ্লেষণ

হাকিমিয়া-তত্ত্বের অনুসারীরা যে আয়াতকে কেন্দ্র করে তাদের মতবাদ ও সংগঠন দাঁড় করিয়েছে, সেই আয়াতের আগে-পরের বক্তব্য থেকেই এটাই স্পষ্ট হয় যে—আয়াতটি নাজিল হয়েছিল ইহুদিদের উদ্দেশ্যে, এবং আল্লাহ তাআলা সেখানে স্পষ্টই বলে দিয়েছেন তারা মুখে ঈমান আনার কথা বললেও মনে মনে কাফের। একদল ইহুদি ব্যভিচারীর হদ বিষয়ে রসুল (স)–এর কাছে ফয়সালার জন্য এসেছিল, অথচ নিজেদের তওরাতে লিপিবদ্ধ রজমের বিধান গোপন করেছিল। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন—

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

আর যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দ্বারা ফয়সালা করে না—তারাই কাফের। [4]সুরা মায়িদা, আয়াত ৪৪

তফসিরের কিতাবে আছে—তাওস (রহ) বলেন : ‘ইবনে আব্বাস (রা)–কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন—এটি একটি কবিরা গুনাহ।’ অন্যদিকে ইবনে তাওস বলেন—‘এই কুফর আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ও রসুলদের প্রতি অবিশ্বাসের মতো কুফর নয়।’

তফসিরে বাগাবিতে আছে, ‘আবদুল আজিজ ইবনে ইয়াহইয়া আল কানানিকে এই আয়াতগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন—এই হুকুম আল্লাহর নাজিলকৃত সমস্ত বিধানের ওপর প্রযোজ্য, কিছু অংশের ওপর নয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাজিলকৃত সব বিধান দ্বারা ফয়সালা করে না—সে কাফের, জালিম, ফাসিক। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে, শিরক করে না, অন্যদিকে শরিয়তের সব বিধান মানে না—তার ওপর কুফরের হুকুম প্রযোজ্য হবে না।’

এ থেকে বোঝা যায়—হাকিমিয়ার বিষয়টির সঙ্গে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার শর্ত অপরিহার্যভাবে যুক্ত নয়; কেবল তখনই যুক্ত হবে, যখন কেউ সমগ্র শরিয়তকে অস্বীকার করবে এবং প্রকাশ্যে তা প্রত্যাখ্যান করবে, অথবা আল্লাহর শরিয়তকে বদলে মানুষের তৈরি শরিয়ত চালু করবে। কিন্তু যদি তা হয় নফসের খাহেশের অনুসরণ বা যুগের স্রোতের সাথে চলার কারণে—তাহলে সেটি গোনাহ হবে, এর জন্য তাকে তওবা করতে হবে। তবে এর কারণে সে কোনো অবস্থাতেই ইসলাম থেকে খারিজ হবে না। কেননা, যেখানে বলা হয়েছে ‘হুকুম একমাত্র আল্লাহর’, এর দ্বারা একমাত্র রাষ্ট্রীয় হুকুম উদ্দেশ্য নয়। আর যেহেতু রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব মানুষের ওপর ন্যস্ত, মানুষ যদি সেখানে আল্লাহর শরিয়তের প্রয়োগ না ঘটায়, এর কারণে সে কাফের হবে না। একমাত্র খারেজি ও মুতাজিলিদের মতো বিভ্রান্ত দল ছাড়া সমস্ত মুসলমান একমত—কবিরা গোনাহের কারণে কেউ কাফের হয় না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী হুকুম দেয় না, তাদের খোদ আল্লাহর রসুল (স) তাকফির করেননি, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেও বলেননি। হুজাইফা ইবনে ইয়ামান (রা) বর্ণনা করেন—আল্লাহর রসুল (স) আমাদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন :

يَكونُ بَعْدِي أَئِمَّةٌ لا يَهْتَدُونَ بهُدَايَ، وَلَا يَسْتَنُّونَ بسُنَّتِي، وَسَيَقُومُ فيهم رِجَالٌ قُلُوبُهُمْ قُلُوبُ الشَّيَاطِينِ في جُثْمَانِ إنْسٍ

আমার পরে এমন কিছু শাসক (আমির) আসবে, যারা আমার দিকনির্দেশনা মেনে চলবে না, আমার সুন্নতের অনুসরণও করবে না। তাদের মধ্যে এমন লোক থাকবে, যাদের হৃদয় হবে শয়তানের মতো, যদিও বাহ্যিক রূপ হবে মানুষের।

আমি জিজ্ঞেস করলাম : হে আল্লাহর রসুল, আমি যদি সে সময় উপস্থিত হই, তাহলে কী করব?

তিনি (স) বললেন :

تَسْمَعُ وَتُطِيعُ لِلأَمِيرِ، وإنْ ضُرِبَ ظَهْرُكَ، وَأُخِذَ مَالُكَ، فَاسْمَعْ وَأَطِعْ

তুমি তোমার শাসকের কথা শুনবে ও মানবে। যদি সে তোমার পিঠে আঘাত করে, তোমার ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, তবু শুনবে ও আনুগত্য করবে। [5]সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৪৭

এখানে সুন্নতের অনুসরণ না করা দিয়ে কোরআন না মানাও উদ্দেশ্য, এমন হতে পারে না যে একজন কোরআন মানে কিন্তু সুন্নতের অনুসরণ করে না। এই হাদিস স্পষ্ট করে দেয় :

  •       মুসলিম শাসক যদি কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ না করে, তবু তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কাফের ঘোষণা করা যাবে না।
  •       বরং তার অন্যায় ও জুলুম সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নষ্ট না করার তাগিদে তার আনুগত্য বজায় রাখতে হবে—যদি না সেই শাসক নিজেকে স্পষ্ট ‘কাফের’ ঘোষণা করে।

 

খারেজি মতবাদের পুনরুত্থান

এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ‘তাওহিদুল হাকিমিয়া’ একটি নতুন আকিদা। বিশ শতকের আগে ইসলামের ইতিহাসে কখনও এমন আকিদার কথা শোনা যায়নি। তবে শুধু নতুন হওয়ার কারণে এটি আপত্তিকর হতো না, যদি এর মধ্যে দীনবিকৃতির উপাদান না থাকত। কিন্তু এই আকিদায় এমন কিছু আছে যা উম্মতকে গৃহযুদ্ধ ও আত্মধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে, চাই সে যত নেক নিয়তেই এই আকিদাকে গ্রহণ করুক না কেন।

খারেজিরা যখন প্রথম এই স্লোগান তুলেছিল—‘আল্লাহ ছাড়া কারও ফয়সালা মানি না’, তখন হযরত আলী (রা) বলেছিলেন—‘তাদের কথা সত্য, কিন্তু এর দ্বারা তা যা চাচ্ছে, সেইটা খারাপ।’  এর মানে যদিও খারেজিরা সরাসরি কোরআনের আয়াত ব্যবহার করেছিল, কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য ছিল ফেতনা সৃষ্টি করা। মানে এটা সম্ভব যে—কোরআনের আয়াত ব্যবহার করেও মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। শুনতে হবে তারা তো আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের দাবিতেই এই আয়াত সামনে আনছে, কিন্তু তাদের মতলব হলো সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা।

মওদুদি ও সাইয়িদ কুতুবের মাধ্যমে আধুনিক যুগে যে ‘হাকিমিয়া’র ধারণা সামনে এসেছে, তা কোনোদিক থেকেই খারেজি মতবাদ থেকে ভিন্ন নয়। সেই একই দলিল, একই উদ্দেশ্য। বরং হাকিমিয়া-তত্ত্বের মধ্য দিয়ে খারেজি মতবাদকেই আরও শক্তিশালী ও আত্মবিধ্বংসী বানিয়ে সামনে আনা হয়েছে। খারেজিদের একটি মূল বৈশিষ্ট্য ছিল যারাই তাদের মতবাদের অনুসারী নয় তাদের তাকফির করা। হালের তাওহিদুল হাকিমিয়ার অনুসারীদের মধ্যে খুব প্রবলভাবেই এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

কোরআন-হাদিসে ব্যবহৃত অনেক শব্দেরই একাধিক অর্থ আছে, ফিকহের ইমামগণের মধ্যে শব্দের অর্থ নিয়ে মতবিরোধ দেখা যায়, এবং এর কারণের হুকুমের মধ্যেও পার্থক্য আসে। যেমন কোরআনে ‘সামুদ্রিক শিকার’-কে হালাল বলা হয়েছে, কিন্তু এই শব্দ দিয়ে আসলে কী বুঝানো হয়েছে এ নিয়ে ইমামগণ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ)-এর কাছে এর মানে শুধুই মাছ, কিন্তু ইমাম মালেক (রহ)-এর মতে সমুদ্রে যত প্রাণী আছে সব। এ কারণে দেখা যায় সমুদ্রের কুমির হানাফিদের কাছে হারাম হলেও মালেকিদের কাছে হালাল। এই ব্যাপারটা তো স্বীকৃত, চার মাযহাবের অনুসারীরাই একে অপরকে ‘হক’ বলে, কারও দৃষ্টিতেই কেউ ‘কাফের’ নয়। কিন্তু তাওহিদুল হাকিমিয়ার অনুসারীদের দেখা যায়—তারা হাকিমিয়্যা শব্দকে যেই অর্থে ব্যাখ্যা করছে, অন্য কেউ সেই অর্থ না মানলেই তাকে কাফের বলে দিচ্ছে। তারা গণতন্ত্রকে সরাসরি কুফর বলছে, অন্য কেউ দলিলের ভিত্তিতে ‘কুফর নয়’ বললেও তাকে হয় তাগুতের গোলাম, নয়তো কাফের ফতোয়া দিচ্ছে। কাউকে আবার ‘মুরজিয়া’ বলছে। কোনো বিজ্ঞ আলেমই তাদের রোষানল থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

বর্তমানে হাকিমিয়াতত্ত্ব এমন এক মতবাদে রূপ নিয়েছে—যা কেবল রাজনৈতিক বিতর্কে সীমিত থাকেনি, বরং এর কারণে রক্ত ঝরছে, প্রাণহানি ঘটছে, এবং মুসলিম উম্মাহ একের পর এক বিপদে পড়েছে। ইসলামের ইতিহাসে এমন ভয়ানক মতবাদ খুব কমই সামনে এসেছে।

 

হারুরি খারেজি থেকে মওদুদি-কুতুবি ধারা

খারেজিরা যখন বিদ্রোহ করে, তখন চতুর্থ খলিফা আলী (রা) থেকে শুরু করে সকল মুসলিম শাসক ও সাহাবিগণকে তারা কাফের ঘোষণা করে। শুধু তা-ই নয়, তারা এই দাবিও করে—‘যারা কাফেরকে কাফের বলবে না, তারাও কাফের।’ তারা হারুরা অঞ্চলে গিয়ে ডেরা বাধে, তাই তারা ‘হারুরিয়াহ’ নামেও পরিচিত হয়। তাদের অধিকাংশই ছিল মরুভূমির কঠোর জীবনযাপনে অভ্যস্ত যাযাবর আরব—কষ্টসহিষ্ণু, এবাদতে মনোযোগী, রাত্রি জেগে নামাজ পড়ত, দিনের বেলা রোজা রাখত। রসুলুল্লাহ (স) তাদের সম্পর্কে বলেছিলেন—‘তোমাদের নামাজ তাদের নামাজের তুলনায় তুচ্ছ মনে হবে’। কিন্তু এবাদত তাদের কোনো উপকারে আসেনি—কারণ তাদের বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ভিত্তি ছিল বিকৃত। তারা শরিয়তের বিধানসমূহের স্তর ও প্রয়োগের পার্থক্য বুঝত না; টেক্সট ও বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ করতে অক্ষম ছিল। ফলে তারা এমন এমন ব্যাখ্যা দিত যা ইসলামকে কলঙ্কিত করত। তারা নিরপরাধের রক্ত ঝরাত, সম্পদ লুট করত, নারীদের বন্দি করত, গর্ভবর্তী নারীকেও হত্যা করত, খেলাফতের শক্তি দুর্বল করত এবং দীর্ঘ সময় উম্মতকে গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত রাখত।

সিফফিনের যুদ্ধ থেকে ফেরার পর তারা হযরত আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। বারো হাজার যোদ্ধা হারুরায় সমবেত হয়। আলী (রা) তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন, ফলে তাদের নেতা ইবনুল কাওয়া দশজন অশ্বারোহীসহ ফিরে আসে, কিন্তু বাকিরা নাহরওয়ানে গিয়ে জড়ো হয়। আলী (রা) তাদের সাথে লড়াই করে তাদের কচুকাটা করেন। পরে এই খারেজিদেরই একজন আলী (রা)-কে গুপ্তহত্যা করে, আর এটাকে সে ‘সওয়াবের কাজ’ মনে করেছিল। এভাবেই তারা উম্মতের ভেতরে এক অমীমাংসাযোগ্য গৃহযুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল, যা আজ অবধি চলমান।

ফাতেমি আমলে, আল মুইজ লিদিনিল্লাহ যখন ক্ষমতায়, তখন এই ধরনের আরেকটি ফেতনার জন্ম হয়েছিল। ফাতেমি শিয়ারা ইমামতের আকিদার ওপর ‘ইমামদের হাকিমিয়া’ নামে একটি মতবাদ দাঁড় করিয়েছিল, যাকে তারা নাম দিয়েছিল—খেলাফতে তাকবিনিয়া। এর মানে ইমামদেরও এক ধরনের খোদায়ি শক্তি আছে, যা কোনো পয়গম্বর বা ফেরেশতারও নেই। তারা এই উদ্ভট আকিদা কেবল নিজেরা বিশ্বাস করত না, বরং এটাও বলে বেড়াত—যারাই এই আকিদা মানবে না, তারা সবাই কাফের, তাদের রক্ত হালাল।

শিয়াদের ‘ইমামিয়া’ গোষ্ঠী তো এসব ক্ষেত্রে সব সীমা পার করেছিল। তারা মালিকি মাযহাবের দুজন ফকিহ—আবু বকর ইবনুল হুযায়ল ও আবু ইসহাক ইবনুল বারদুনকে টেনে-হেঁচড়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে তিনদিন ঝুলিয়ে রেখেছিল, শুধু এই ‘অপরাধে’—তারা ইমামিয়া রাফেজিদের মতবাদ অনুসারে উত্তরাধিকারে মেয়েদের পূর্ণ অংশ দেওয়ার ফতোয়া দেননি। ইমামিয়ারা দাবি করে হযরত ফাতেমা (রা) নবী (স)-এর সমগ্র উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন, কিন্তু হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর (রা) তাকে বঞ্চিত করেছিলেন। (মাআযাল্লাহ) এরই সূত্রে তারা ফতোয়া জারি করেছিল—কারও শুধু মেয়ে থাকলে সে-ই সব সম্পদ পাবে, স্ত্রী ও মা কিছুই পাবে না! আর তাদের এই দলিল ছাড়া ফতোয়া না মানার কারণে বড় বড় আলেমদের জান দিতে হয়েছিল।

এই সময়ের নব্য-খারেজিরা একই সাথে সেই হারুরি খারেজি ও বিভ্রান্ত শিয়াদের সহিংসতার ঐতিহ্য ধারণ করে। এই গোঁড়া তাকফিরপন্থিদের উত্থান এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন আবেগী তরুণদের মাঝে এলেমের ঘাটতি আর জাহালতের আধিপত্য স্পষ্ট; আর সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ চিন্তাগত বিকৃতি, যা ইসলামি কর্মপদ্ধতির সংযমী ধারা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। তারা পুরো সমাজকে কাফের ঘোষণা করে, মসজিদে নামাজরত মানুষের ওপর আত্মঘাতী হামলা চালায়, এমনকি বড় বড় আলেমদের টার্গেট করে তাদের হত্যা করে। তাদের সামনে আল্লাহর জমিনের কেউ নিরাপদ না, যে কাউকে যেকোনো সময় তারা হত্যা করতে পারে। কারণ তাদের এই আকিদা তাদের একটা জিনিসই শেখায়—রক্তপাত ঘটাও।

হাকিমিয়া মতবাদ অবশ্য প্রথমদিকে এমন ছিল না। এটি এমন আত্মবিধ্বংসী মতবাদে রূপ নেয় মিশরের  কারাগারে—যখন মিশরি ও সিরিয়ান মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতাকর্মীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করা হয়। তখন কয়েকজন বন্দি, যেমন মুস্তফা শোকরি ও করম জুহদি প্রমুখের জবান থেকে এই ‘প্রতিক্রিয়া’ ছড়িয়ে পড়ে—‘শাসকেরা কাফের, আর যারা চুপ করে আছে তারাও কাফের।’ পরে এই ধারণার অনুসারীরা কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের মাঝে ভীতি, উগ্রতা ও তাকফিরের আগুন ছড়িয়ে দেয়। বহু মুসলিম দেশে তাদের বিস্তার ঘটে। এভাবেই তারা ইসলামের নামে, হয়তো নেক নিয়তেই মানুষের মাঝে ইসলামবিরোধী এই চিন্তার প্রসার ঘটায়—যা কেবল মানুষকে বিভ্রান্তিতে নয়, বরং নিরপরাধ মানুষের রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেয়।

 

হাকিমিয়াপন্থিদের কয়েকটি মৌলিক ধারণা

১. কেবল নিজেদের ‘নাজাতপ্রাপ্ত’ ভাবা : তারা কিছু বাহ্যিক সুন্নত আঁকড়ে ধরা আর আক্ষরিক ব্যাখ্যায় গোঁড়ামিকে ইসলামের চূড়ান্ত রূপ ভাবে। ফলে তাদের কাছে কেবল তারাই ‘নাজাতপ্রাপ্ত দল’, বাকিরা গোমরাহ। এমনকি যে আলেম কেবল ফিকহি বা রাজনৈতিক শাখাগত বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাকেও তারা ‘তাগুতের গোলাম’ ট্যাগ দিয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত থেকে খারিজ করে দেয়।

কিছু মানুষ তো তাদের জন্য এমন নিয়ম বানিয়ে নিয়েছে—‘যে বা যারাই তাওহিদুল হাকিমিয়ার আকিদা মানে না, তাকে বর্জন করতে হবে, তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করা ওয়াজিব।’ ফলে কাণ্ডজ্ঞান, চিন্তাবুদ্ধি এবং কোরআনি ও ফিকহি সমঝ—সব বিসর্জন দিয়ে তাদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য ও তাকলিদ করা ছাড়া তাদের ‘কুফরি ফতোয়া’ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই। হয় তাদের গলায় গলা মিলিয়ে তাওহিদুল হাকিমিয়া মানতে হবে, নয়তো কাফের বা মুরজিয়া ট্যাগ খেতে হবে, মাঝামাঝি কোনো পথ নাই।

তারা নিজেদের বিভ্রান্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে আল্লাহর হুকুম সংক্রান্ত আয়াতগুলোর অপব্যাখ্যা করে। একই সাথে তারা উম্মতের ৭৩ ভাগ হওয়াটা খুবই আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করে, এবং নিজেদের একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত দল ঘোষণা করে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—তাদের দলে ঢোকার কিংবা দল থেকে খারিজ হয়ে যাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক বা ফিকহি মানদণ্ড নেই! একজন তাওহিদুল হাকিমিয়ায় বিশ্বাসী হয়েও অন্য কোনো নেতার আনুগত্যের কারণে কাফের হয়ে যেতে পারে, এমনকি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘কাফের’ না বলার কারণেও কাফের হতে পারে!

তাদের আসল রোগ হলো নস (টেক্সট) ও দলিল গভীরভাবে বোঝার যোগ্যতা না থাকা। এর ওপরে আছে ফিকহি বোধের অভাব, ভুল বোঝা, এবং অনুমাননির্ভর গোঁড়ামি। ফলে তাদের মধ্যেও রয়েছে অনেকগুলো দল, যারা আবার একে অপরকে তাকফির করে, ‘খারেজি’ ট্যাগ দিয়ে ‘জাহান্নামের কুকুর’ বলে! এসব কী কারণে হয় তার রহস্য উদ্ঘাটন মুশকিল।

২. সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের তাকফির করা : এরা সমাজের প্রতি এমন এক হতাশাজনক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে, যেখানে কোনো কল্যাণের সম্ভাবনা বা সংস্কারের আশা তারা দেখে না। ফলে তাদের কাছে গিয়ে ‘একাকিত্ব’ ও ‘ফেতনা থেকে দূরে থাকার’ হাদিসের অর্থ বিকৃত হয়ে যায়। তারা মনে করে—তাওহিদুল হাকিমিয়ার আকিদা গ্রহণ না করে উম্মত সামগ্রিকভাবে শরিয়ত পরিত্যাগ করেছে, তাই হিজরত ও বিচ্ছিন্নতা অপরিহার্য। এর পেছনে তারা ভুলভাবে প্রমাণ হিসেবে আনে আবু সাঈদ খুদরি (রা)–এর বর্ণিত রসুলুল্লাহ (স)–এর হাদিস—‘অচিরেই বকরি হবে মুসলিমদের উত্তম সম্পদ। তা নিয়ে তারা পাহাড়ের চূড়ায় ও বৃষ্টির পানি এলাকায় চলে যাবে, তাদের দীনকে ফেতনা থেকে রক্ষার জন্য পালাবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস ৪২৬৭)

এই হাদিসগুলো মূলত বিশেষ পরিস্থিতির জন্য, যখন সমাজ থেকে কল্যাণ হারিয়ে যাবে, চারদিকে হারাম উপার্জন ছড়িয়ে পড়বে, ফেতনা ও অস্থিরতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে এবং অন্ধ ও পক্ষপাতদুষ্ট পতাকার নীচে একত্র হয়ে এক মুসলমান আরেক মুসলমানের রক্ত ঝরাবে।

কিন্তু এরা এই ব্যাপারগুলোকে সাধারণ নিয়ম বানিয়ে নিয়েছে। যার কারণে তাদের চোখে সরকারি চাকরি নেওয়া হারাম, যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা হারাম। কেননা এসব তাদের ভাষায় ‘তাগুত’দের অধীন। এর ফলে তাদের মধ্যে অজ্ঞ ও নিরক্ষরের সংখ্যা বেড়েই চলছে। অনেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রাম-গঞ্জে চলে গেছে, এমনকি নিজেদের সব সরকারি কাগজপত্রও নষ্ট করে ফেলেছে—কারণ এগুলো নাকি ‘কুফরি রাষ্ট্রব্যবস্থার দলিল’। কেউ কেউ জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে মসজিদের সামনে ঔষধি গাছ বিক্রি করা—কারণ এটিই নাকি একমাত্র হালাল উপার্জন, যা ‘জাহিলি’ কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত নয়। কিন্তু পরে যখন তারা দারিদ্র্যে নিপতিত হয়, তখন কিছু লোক সেই পথ ছেড়ে দেয়। তবু তাদের চিন্তা এখনও সামাজিকভাবে নিগৃহীত ও অশিক্ষিত মানুষের মাঝে প্রভাব বিস্তার করছে।

গোঁড়া তাকফিরপন্থিদের মধ্যে অনেকেই মনে করে—তাদের বিরোধী যে সাধারণ মুসলিম, বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী, তারা সবাই কাফের ও ইসলামের শত্রু, কারণ তারা নাকি ‘আল্লাহ যা নাজিল করেছেন’ তা ছাড়া অন্য আইনের শাসন মেনে নিয়েছে; আর যে কুফরি শাসন মেনে নেয়, সে কাফের এবং তার রক্ত হালাল।

তাদের হাস্যকর চিন্তাভাবনার উদাহরণ হিসেবে এই কাহিনি বলা হয়—

জনৈক হাকিমিয়াপন্থি কয়েকজন সাথিসহ জেলে ছিল। প্রতিদিন পাহারাদাররা তাদের কিছু সময়ের জন্য খোলা জায়গায় হাঁটাহাঁটি করতে দিত। একদিন সে তার এক সাথিকে বলল—‘শোন, মাহমুদ, এই যে এখানে যাদের দেখছো, তারা সবাই কাফের; সরকারি লোকেরা কাফের; আজ মিশরে আমি, তুমি আর আমার এক বন্ধুকে বাদ দিয়ে কোনো মুমিন নেই। তবে সেই বন্ধুকেও আমি সাবধানতার জন্য কাফের ধরে নিচ্ছি—যদি সে আসলে কাফের হয়, আর আমি তাকফির না করি, তাহলে তো আমি ধ্বংস হয়ে যাব!’

তাদের কাছে মুসলিম দেশগুলোর সব অসহায় ও নিরুপায় মানুষ কুফরি শাসনব্যবস্থার অধীন, এবং প্রতিটি দেশই ‘দারুল হরব’। ফলে রাষ্ট্রের যেকোনো সরকারি সম্পদ, জনসাধারণের জন্য নির্মিত প্রতিষ্ঠান তাদের কাছে ‘গনিমতের মাল’, যা দীন কায়েম ও ‘জেহাদের ঝান্ডা’ উঁচু করার নামে তারা যখন-তখন লুট করতে পারবে।

তাদের এই বোঝাপড়া মারাত্মক সমস্যাজনক। তারা ইসলামের নামে মুসলমানের সম্পদ চুরি করাকে হালাল বানিয়ে নিয়েছে। যেখানে ইসলাম মানুষের ধনসম্পদ ও ইজ্জতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক, সেখানে তারা রাষ্ট্রের গায়ে মনগড়া ‘দারুল হরব’ ট্যাগ লাগিয়ে সবার রক্ত ও সম্পদ হালাল করে নিয়েছে।

এইসব মানুষ কোরআন-সুন্নাহর বিধানকে কলঙ্কিত করছে, আর ইসলামের ভাবমূর্তিকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে যে, যারা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝে না, তারা সহজেই ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা পোষণ করতে শুরু করে।

৩. পরিবর্তনের উপায় হিসেবে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া : এই হতাশাগ্রস্ত গোষ্ঠী কোরআন-হাদিস থেকে যেন একটি জিনিসই শিখেছে—সহিংসতা। তাদের পছন্দ কেবল বিরোধীদের সঙ্গে যুদ্ধ করা। একমাত্র রক্তপাতই সমাধান। তারা মনে করে—রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই ইসলামকে বিজয়ী করার একমাত্র উপায়। দাওয়াত, তালিম এবং ধীরে ধীরে তাজকিয়া ও তরবিয়ত করার পথ তাদের কাছে দুর্বলতা ও ভীরুতা। তাদের মতে জেহাদের আয়াত নাজিলের পর দাওয়াত ও তাবলিগের বিধান রহিত হয়ে গেছে, আগে রাষ্ট্রে শরিয়তি শাসন জারি করতে হবে, এর আগে কিছুই নাই।

তারা কোরআন ও হাদিসের কিতাব থেকে তলোয়ার ও যুদ্ধসংক্রান্ত আয়াত ও হাদিসগুলো বেছে বেছে, সেগুলোকে প্রকৃত অর্থ ও প্রেক্ষাপটের বাইরে গিয়ে অন্যত্র প্রয়োগ করে। যেমন—সুরা তওবার ‘তলোয়ারের আয়াত’, আর এই হাদিস : ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে, আমি মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করব, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয়—আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।’

তারা কোরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান (মুহকাম) পরিত্যাগ করে অস্পষ্ট (মুতাশাবিহ) অংশ আঁকড়ে ধরে। তারা এই আয়াত-হাদিসগুলোকে আসল প্রেক্ষাপট ও ঘটনার ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে চরমপন্থি আক্ষরিক অর্থে টেনে নেয়—যেন এগুলো যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে মুশরিকদের হত্যা, তাদের অনুসরণ, অপহরণ ও পথে পথে ওঁৎ পেতে হামলা করার সাধারণ আদেশ। আর যেসব মুসলমানদের তারা কাফের ঘোষণা করেছে, তাদেরও এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত করে!

এটাই সেই অজ্ঞ ও আবেগপ্রবণ লোকদের পথ, যারা জনগণের অসুস্থতা নিরাময়ে কোনো দাওয়াতি বা সংস্কারমূলক প্রকল্প দিতে পারে না। তারা মনে করে—উম্মাহর বিজয় হবে কেবল ভয় ও ত্রাসের মাধ্যমে, আল্লাহ যে দাওয়াত ও ধাপে ধাপে সংস্কারের পথ নির্দেশ করেছেন, তা দিয়ে নয়। তাদের দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে কাজ করে দীন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

কিছু লোকের অজ্ঞতা ও গোঁড়ামি এতটাই বেড়েছে যে, তারা শাসক ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নামে নারী ও শিশুদের হত্যাকেও বৈধ ঘোষণা করেছে। অথচ শরিয়তে মুসলিম না হলেও নারী ও শিশুদের হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে তাওহিদুল হাকিমিয়ায় বিশ্বাসী একজন ‘নারী ও শিশুদের হত্যার বৈধতা’ শিরোনামে একটি বই লিখেছে। এ ব্যাপারে আর কী বলা যায়!

মোদ্দাকথা, এই আকিদাটাই সব সমস্যার মূল। কেউ এই আকিদা লালন করলে, সে যতই নিরীহগোছের হোক না কেন, মুখে যতই বলুক আমরা তাকফিরপন্থি নই, ‘তাওহিদুল হাকিমিয়া’ তাকে উগ্রতার দিকে নিশ্চিত ঠেলে নিবেই।

 

দ্রষ্টব্য : সংক্ষেপিত ও ঈষৎ সংযোজিত

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 সুরা ইউসুফ, আয়াত ৪০
2 ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬৮
3 সুরা নিসা, আয়াত ৫৮
4 সুরা মায়িদা, আয়াত ৪৪
5 সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৪৭

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মুনশি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
মুনশি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ
5 months ago

পুরো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। মওলবি আশরাফ ভাই চমৎকার অনুবাদ করেছেন। এবং মূল লেখক বিচ্ছিন্নবাদী ইসলামপন্থীদের মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।