ওয়াসিফ হুসাইন নাদিম আল-ওয়াজিদি (মাওলানা নাদিম আল-ওয়াজিদি নামে বিখ্যাত)। ১৯৫৪ সালের ২৩ জুলাই দেওবন্দে জন্ম, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আমেরিকার শিকাগোতে মৃত্যু। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় ইসলামিক স্কলার, কলামিস্ট, সমালোচক এবং লেখক, যিনি উর্দু এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি মাসিক তরজুমানে দেওবন্দ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি তরুণ লেখক ও চিন্তক ইয়াসির নাদিম আল-ওয়াজিদির পিতা। তাঁর বাবা মাওলানা ওয়াজিদ হুসাইন রহ. দেওবন্দী জামিয়া ইসলামিয়া তালিমুদ্দিন, ডাভেল-এর সাবেক শাইখুল হাদিস। দাদা মাওলানা আহমাদ হাসান দেওবন্দী রহ. ছিলেন জামিয়া মিফতাহুল উলুম জালালাবাদ-এর শাইখুল হাদিস। দারুল উলুম দেওবন্দ-এর সাবেক শাইখুল হাদিস মাওলানা শরীফ হাসান দেওবন্দী রহ. তাঁর মামা। তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন।
গত শতকে ভারতবাসীর চোখের সামনে দুই মহৎ ব্যক্তিত্বের উত্থান ঘটেছিল—মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী এবং স্যার সাইয়িদ আহমদ খান। দু’জনেই মুসলিম শাসনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভাঙতে ভাঙতে ধ্বংসের দিকে গড়িয়ে পড়া ইতিহাসকে সামনে থেকে দেখেছেন। জাতির অবনতি তাদের হৃদয়কে ব্যথিত করেছিল, কিন্তু সংকটকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন।
মাওলানা নানুতবীর জীবনযাত্রার সূচনা হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারী প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। যে শিক্ষালয় থেকে তিনি নববী-সুন্নাহর আলোয় দীপ্ত শিক্ষা নিয়েছিলেন, সেই শিক্ষালয়ই পরবর্তীতে ব্রিটিশ আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান তোলে। ১৮৫৭ সালে থানাভবনের কাছে শামেলির যুদ্ধে মাওলানা কাসিম নানুতবী তাঁর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। ইসলামী শাসনের পুনরুত্থানের আশায় পরিচালিত সেই লড়াই ছিল ভবিষ্যতের আরও বিস্তৃত প্রতিরোধের প্রাথমিক সুর।
অন্যদিকে, একই শিক্ষালয় থেকে বিদ্যা লাভ করলেও স্যার সাইয়িদ আহমদ খানের ভাবনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন—অস্ত্রধারী বিদ্রোহ নয়, বরং মিতব্যয়ী পথ, সমঝোতা ও শিক্ষাই পারে জাতিকে পুনর্গঠনের দিকে নিয়ে যেতে। তাই যখন দেওবন্দের আলেম সমাজ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ব্যস্ত, সেই সময় স্যার সাইয়িদ ব্রিটিশ সরকারের অধীনে মুনসিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর মতে, বিদ্রোহ ফলহীন; মুসলিম সমাজকে আবার শক্তিশালী করে তুলতে হলে দরকার শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং মননের সংস্কার।
দুই মনীষীর লক্ষ্য ছিল অভিন্ন—মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণ; তবে পথ আলাদা, চিন্তার ধরন আলাদা। আর এই ভিন্নতাই তাদের দু’জনকে ইতিহাসে নিজস্ব আলোয় দীপ্ত করেছে।
১৮৫৭ সালের ঘটনাকে ব্রিটিশরা ‘বিদ্রোহ’ বা ‘বিপ্লব’ নামে উল্লেখ করলেও, প্রকৃত অর্থে এটি ছিল মুসলিমদের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার লড়াই—একটি জিহাদ। বহু শতকের ঐতিহ্য, সম্মান ও শাসনক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার ক্ষত হৃদয়ে বহন করে মুসলিম সমাজ তখন অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নেমেছিল। স্যার সাইয়িদ আহমদ খান এ ঘটনাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেন এবং তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রিসালা আসবাব-এ-বাগাওয়াত-এ-হিন্দ-এ এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের মূল কারণগুলো তুলে ধরেন।
মাওলানা কাসিম নানুতবী ও স্যার সাইয়িদ—দুজনেই ছিলেন বিরলপ্রজ মনীষী, কিন্তু কর্মপন্থা ছিল ভিন্ন। মাওলানা নানুতবী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্রবাহিত প্রতিরোধের পথে এগিয়েছিলেন—ইসলামী শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিশ্বাস নিয়ে। অন্যদিকে স্যার সাইয়িদ মনে করতেন, যুদ্ধ নয়, বরং শিক্ষার আলোয় মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণই হতে পারে টেকসই পথ।
স্যার সাইয়িদ আহমদ খানকে নিয়ে প্রায়শই ভুল ধারণা তৈরি হয়—তিনি নাকি ব্রিটিশপন্থি ছিলেন। কিন্তু তাঁর চরিত্র ছিল গভীর সাহস, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও সত্য বলার অদম্য শক্তিতে ভরপুর। আসবাব-এ-বাগাওয়াত-এ-হিন্দ গ্রন্থটি তাঁর সেই দুর্ভীকতার প্রমাণ। ব্রিটিশ শাসনের কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি নির্দ্বিধায় শাসকদের ভুল নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—ব্রিটিশদের নীতিগত ভুল আচরণই ভারতীয়দের ক্ষোভ ও প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল।
তিনি দেখিয়েছিলেন কীভাবে পূর্বপুরুষদের সম্পত্তি নানা অজুহাতে বাজেয়াপ্ত করা হয়, যার ফলে মানুষ আর্থিক দেউলিয়াত্বে পড়ে; কীভাবে একটি সমৃদ্ধ দেশ এক নিমেষে সংকটে ডুবে যায়। তিনি লিখেছেন—“বিদেশি পণ্যের আগমনে আমাদের শিল্পী ও কারিগররা কাজ হারিয়ে ফেলেছিল… বয়নশিল্পীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। যারা একসময় হাজার হাজার টাকা আয় করতেন, তারা আজ অভাবের তীব্র কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।” [1]পৃষ্ঠা ২৮, ৩৬
শুধু অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই নয়, সমাজে আইনশৃঙ্খলার অবনতিও তিনি তুলে ধরেছেন। ইউরোপীয় ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ভারতীয় অভিজাতদের প্রতি অপমানজনক আচরণও ছিল ক্ষোভের অন্যতম উৎস। তাঁর স্পষ্ট ভাষায়—“এতে সন্দেহ নেই, ভারতীয় জনগণ ক্ষুব্ধ, কারণ আমাদের সরকার তাদের সম্পূর্ণ অবহেলা করেছে।” [2]পৃষ্ঠা ৪২
স্যার সাইয়িদ আহমদ খান খুব ভালো করেই বুঝতেন যে, ব্রিটিশরা শুধু একটি দেশ দখল করেনি—তারা ভারতের মানুষকে রাজনৈতিকভাবে অধীনস্থ এবং অর্থনৈতিকভাবে শোষিত এক অধীন জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। তারও চেয়ে ভয়াবহ ছিল তাদের ধর্মীয় উদ্দেশ্য। স্যার সাইয়িদ দেখেছিলেন—ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তাদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করছে। তিনি খোলাখুলি লিখেছেন—“নিঃসন্দেহে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, অভিজাত-বুদ্ধিজীবী—সকলেই বিশ্বাস করতেন যে, সরকারের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করা এবং তাদের—হোক তা ভারতীয় বা মুসলিম—খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা।” [3]পৃষ্ঠা ৩৩
স্যার সাইয়িদের রচনাবলি ও পত্রিকাগুলোতে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তাঁর নরম মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বারবার “আমাদের সরকার” বলতেন এবং নানা বিষয়ে প্রশাসনকে পরামর্শ দিতেন। এতে বোঝা যায়, তিনি ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন না; বরং তাদের সঙ্গে সমঝোতার পথেই বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর বইকে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা কোনো বিদ্রোহী পুস্তক হিসেবে দেখেননি—বরং বন্ধুসুলভ পরামর্শের মতো গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এই ইতিবাচক সম্পর্কই তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা এনে দেয়—নাইটহুড উপাধি, রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ এবং নানা সম্মান। এমনকি তাঁর ছেলে সাইয়িদ মাহমুদ ইংল্যান্ডে পড়াশোনার জন্য সরকারি বৃত্তিও পেয়েছিলেন, এবং স্যার সাইয়িদ নিজে তাঁকে নিয়ে প্রায় বিশ মাস লন্ডনে অবস্থান করেছিলেন।
অন্যদিকে, দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম ব্রিটিশ শাসনের প্রতি কোনো সমঝোতা দেখাননি। তাঁরা দেশের বুকে ব্রিটিশদের উপস্থিতিকেই অসম্মান মনে করতেন। কারও কারও অবস্থান এতই কঠোর ছিল যে, তারা সাদা মানুষের মুখ দেখতেও রাজি ছিলেন না। প্রথমে তারা অস্ত্র হাতে স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরাজিত হওয়ার পরও তারা ভেঙে পড়েননি; বরং মুসলিম সমাজকে ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য নতুন পথ নির্মাণ করেন। এই নতুন পথের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতবী—যিনি একনিষ্ঠ বিশ্বাস, ত্যাগ, সাহস এবং আত্মমর্যাদার মহাপ্রতীক হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
মাওলানা মুহাম্মদ মিয়া এই প্রসঙ্গে এক হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন—“হাজার হাজার মানুষকে শুধুমাত্র বিদ্রোহে অংশগ্রহণের অভিযোগে অথবা সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যা করা হয়েছে। ভারতীয়দের মনে ভীতি সৃষ্টি করতে অমানবিক সব কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। তবুও সেই শক্তিমান সত্তা—যিনি মূসাকে ফেরাউনের প্রাসাদে লালন করেছিলেন—আজও তাঁর পথের সংগ্রামীদের রক্ষা করছেন। আর মাওলানা কাসিম নানুতবীও সেই নির্বাচিত যোদ্ধাদের একজন, যিনি ব্রিটিশ ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসার মতো লড়াই করেছেন; শুধু মূসার মতোই নন, তিনি ছিলেন একজন মূসা-গড়ার মানুষও।” [4]উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী, ৪/২৯৬
স্যার সাইয়িদ ও মাওলানা নানুতবী—এ দুই ধারার ভাবনার সংঘর্ষই উনিশ শতকের ভারতীয় মুসলিম সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। একদিকে সমঝোতা ও শিক্ষার পথ, অন্যদিকে আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামের পথ—এই দুই প্রবাহ একসঙ্গে মিলেই আমাদের ইতিহাসের বৃহৎ অধ্যায়কে রূপ দিয়েছে।
যুদ্ধের ময়দানে পরাজিত হলেও দেওবন্দের উলামাগণ আদর্শ ও আত্মিক সংগ্রামে পূর্ণ বিজয় অর্জন করেছিলেন। ব্রিটিশরা যে মানসিক-ধর্মীয় আগ্রাসনের সূচনা করেছিল, সেই সংগ্রামে তারা দৃঢ় অবস্থানে সফল হন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—১৮৬৬ সালে মাওলানা কাসিম নানুতবী ও তাঁর দৃঢ়চেতা সাথীদের প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম দেওবন্দ সশস্ত্র লড়াইয়ের চেয়েও শক্তিশালী ও স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই শান্ত কিন্তু গভীর আন্দোলন ছিল অন্তর থেকে উদ্ভূত; ধীরে ধীরে তা এমন জাগরণ সৃষ্টি করে যে, শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের ভারত ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আল্লাহপ্রদত্ত একটি আন্দোলন।
এই সময়ের আলেম ও মনীষীরা অন্তর থেকে কামনা করতেন—ভারতে ইসলামের রক্ষার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা যেন গড়ে ওঠে। দেওবন্দি উলামাদের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও এই আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্ব হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কী যখন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সংবাদ শুনলেন, আনন্দে উচ্চারণ করলেন—“সুবহানআল্লাহ!” তিনি বললেন, “আমরা মাদ্রাসা স্থাপন করেছি, কিন্তু আমরা জানিই না—প্রভাতের নিস্তব্ধতায় কত অসংখ্য মুমিন সেজদায় লুটিয়ে পড়ে আল্লাহকে ডাকছিলেন—‘হে আল্লাহ! ভারতে ইসলামের রক্ষা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে দাও।’ এই মাদ্রাসা সেই আহাজারির জবাব।” [5]সাওয়ানেহে কাসেমী, ১/২২৩
অন্যদিকে স্যার সাইয়িদ আহমদ খানও সমকালীন ভারতীয় সমাজের দুরবস্থা নিয়ে গভীর চিন্তায় ব্যস্ত ছিলেন। তবে তাঁর পথ ছিল ভিন্ন। তিনি প্রথম থেকেই শিক্ষার প্রসারকে জাতির উন্নতির মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখতেন। ১৮৬৩ সালে তিনি গাজীপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সায়েন্টিফিক সোসাইটি, যার লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান পৌঁছে দেওয়া। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সক্রিয় সমর্থন ছিল এ প্রতিষ্ঠানের পেছনে। পরে এটি আলীগড়ে স্থানান্তরিত হয়ে আরও শক্ত ভিত্তি পায়। সে সময় স্যার সাইয়িদের শিক্ষা-আন্দোলন ছিল হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের জন্য সমানভাবে নিবেদিত। সোসাইটির পত্রিকায় দেশজুড়ে দুটি সম্প্রদায়েরই শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা হতো। তিনি ভারতকে কল্পনা করতেন—এক সুন্দরী কনে, যার এক চোখ হিন্দু, অন্য চোখ মুসলমান। তখন তিনি ছিলেন সমাজ-সংস্কার ও জাতীয়তাবাদের অন্যতম মুখ।
কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন সম্পর্কে শাইখ মুহাম্মদ ইকরাম তাঁর মওজে কাওসার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—এই সময় পর্যন্ত স্যার সাইয়িদের সব প্রচেষ্টাই ছিল যৌথ ও সামষ্টিক; হিন্দু–মুসলমান উভয়ই সমানভাবে তাঁর উদ্যোগের সুফল পেয়েছিল। কিন্তু বেনারসে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয় এবং সম্ভবত দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনা সম্পর্কে মাওলানা আলতাফ হুসাইন হালী তাঁর হায়াতে জাভেদ-এ লিখেছেন—“১৮৬৭ সালে বেনারসের কয়েকজন প্রভাবশালী হিন্দু সিদ্ধান্ত নেন যে, আদালত থেকে উর্দু ও ফারসি লিপি মুছে ফেলে দেবনাগরী লিপিকে প্রচলিত করা হবে। এই ঘটনাই প্রথম স্যার সাইয়িদের চিন্তায় ফাটল সৃষ্টি করে। তিনি উপলব্ধি করেন—হিন্দু ও মুসলমানদের এক জাতি হিসেবে একসঙ্গে থাকা ও যৌথভাবে সমাজকল্যাণে কাজ করা বাস্তবে সম্ভব নয়।”
এই একটিমাত্র ঘটনার অভিঘাত পরবর্তী ইতিহাসে কত বড় পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে, তা আজও বিস্ময়ের বিষয়।
একদিন তৎকালীন বেনারসের কমিশনার মিস্টার শেকসপিয়ারের সঙ্গে মুসলমানদের শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বিস্মিত হয়ে বললেন, “আজ প্রথম আপনাকে বিশেষভাবে মুসলমানদের কথা বলতে শুনলাম! এর আগে তো আপনাকে সর্বভারতীয় জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিয়েই কথা বলতে দেখেছি।” উত্তরে স্যার সাইয়িদ বলেছিলেন, “এখন আমি নিশ্চিত হয়েছি—দুটি সম্প্রদায় কখনোই একসঙ্গে মনের মিল ঘটিয়ে কোনো উদ্যোগে অংশ নেবে না। এর মধ্যেই সব শেষ নয়; আগামীতে বিরোধ ও দূরত্ব আরও বাড়বে, বিশেষত তথাকথিত শিক্ষিতদের কারণেই। তখন যারা জীবিত থাকবে, তারাই তা চোখে দেখে বুঝবে।” [6]মওজে কাওসার, ৮৫–৮৬
এই ভাবনার পরিবর্তনই তাঁকে একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনের দিকে নিয়ে যায়। প্রথমে যার নাম ছিল ‘মাদরাসাতুল উলূম’, পরবর্তীতে যা ‘আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে সুপ্রসিদ্ধ হয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৬ সালে—দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার ঠিক দশ বছর পর।
এই দুই প্রতিষ্ঠানের মূল প্রেরণা ছিল একই—ভারতের মুসলমান সমাজকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেওয়া। পরবর্তী সময়ে উভয় প্রতিষ্ঠানই শুধু শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং শক্তিশালী সামাজিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে ওঠে এবং মুসলমানদের সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব রেখে যায়।
দেওবন্দ ও আলীগড় : মুসলিম পুনর্জাগরণের দুই স্তম্ভ
দেওবন্দ ও আলীগড়—এই দুটি নাম উপমহাদেশের মুসলমানদের পুনর্জাগরণের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উভয় আন্দোলনের সূচনা প্রায় একই সময়ে আর তাদের বিকাশ ও পরিপক্বতাও একই সময়পর্বে ঘটে। মুসলমান সমাজের কল্যাণ, শিক্ষাগত উন্নতি ও আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনে উভয়ই অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে।
সাধারণভাবে যে ধারণা প্রচলিত—এই দুটি আন্দোলন নাকি একে অন্যের বিরোধী ছিল বা একে অন্যের ক্ষতি করেছে—তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সত্য হলো, উভয় আন্দোলনই বিভিন্ন পক্ষের বিরোধিতা মোকাবিলা করেছে, তবে সেই বিরোধিতার উৎস ও প্রকৃতি ছিল পরস্পর ভিন্ন।
দেওবন্দ আন্দোলন ছিল মূলত একটি ধর্মকেন্দ্রিক পুনর্জাগরণ, যা সাধারণ মুসলমানদের বিস্তৃত সমর্থন পেয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এটিকে তাদের অস্তিত্বের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল। ফলে তারা নানা কৌশলে এই ধারার উলামাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল এবং কিছু মুসলমানকেও ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় মুসলমান সমাজের একটি অংশে ভিন্নধর্মী মতবাদের জন্মও ঘটে।
অন্যদিকে, স্যার সাইয়িদের শিক্ষামুখী আন্দোলনও একই ধরনের শত্রুতা থেকে মুক্ত ছিল না। প্রচলিত বিশ্বাস—উলামায়ে কেরাম স্যার সাইয়িদের বিরোধিতা করেছেন—এ ধারণা সঠিক নয়। বিশেষ করে দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম তাঁর বিরোধী ছিলেন—এ কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম কখনো স্যার সাইয়িদের বিরোধিতা করেননি
দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম কোনোদিনই স্যার সাইয়িদের শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন না। বরং তাঁর সত্যিকারের বিরোধী কারা ছিলেন—সেটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন শায়খ মুহাম্মদ ইকরাম তাঁর মওজে কাওসার গ্রন্থে। তিনি জানান—স্যার সাইয়িদের কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সমাজের সব প্রগতিশীল ও সম্মানিত মুসলমানই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তবু নানা বিশেষ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তির ঝড় ওঠে। এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—উলামায়ে কেরাম নাকি তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন শুধু এ কারণে যে তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন। যারা স্যার সাইয়িদের জীবন-দর্শন গভীরভাবে পড়েননি, তারাই সাধারণত মনে করেন যে, প্রাচীনশৈলী ও রক্ষণশীল উলামারাই তাঁর বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ তাঁদের মতে ভারত ছিল ‘দারুল হারব’ এবং তাই তাঁরা ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রতি স্বভাবতই অনাগ্রহী ছিলেন। কিন্তু আসল সত্য এ ধারণার ঠিক উল্টো—ঘটনার ভেতরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
মাদ্রাসাতুল উলূম বা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবল বিরোধিতা কারা করেছিলেন?
মাদ্রাসাতুল উলূমের সবচেয়ে প্রবল বিরোধী ছিলেন তৎকালীন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—ডেপুটি কালেক্টর মৌলভী ইমদাদ আলী এবং সাব জজ মৌলভী আলী বখশ।
শায়খ মুহাম্মদ ইকরাম মওজে কাওসার গ্রন্থে লিখেছেন—“ভারতের যে কোনো প্রান্ত থেকে মাদ্রাসাতুল উলূমের বিরুদ্ধে যে সমস্ত বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে, তার মূল উৎস ছিল এই দুই ব্যক্তির লেখনী।” [7]মওজে কাওসার, পৃ. ৯০, ৯৩
এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্যার সাইয়িদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করেছিলেন সরকারি উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা; উলামায়ে দেওবন্দ কখনোই এ ধরনের বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
স্যার সাইয়িদের বিশ্বাস ও উলামায়ে দেওবন্দের অবস্থান
অবশ্যই, স্যার সাইয়িদ আহমদ খান তাঁর কিছু লেখায় সতর্কতার অভাব দেখিয়েছেন এবং পাশ্চাত্য দর্শনের প্রভাবে কিছু ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেছেন। বিশেষত ধর্মীয় বিষয়ে তাঁর কিছু মত কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বর্ণনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। যেমন—
- তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীরগত মেরাজ অস্বীকার করেছিলেন।
- আকাশ ও মহাকাশ সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীতে মত পোষণ করেছিলেন।
- জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছিলেন।
এসব কারণে জনসাধারণের মধ্যে একটি ধারণা জন্ম নেয় যে, তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক বিশ্বাস পোষণ করেন না। এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছে তাঁর বিরোধীদের চালানো প্রচারণা। এমনকি কিছু অসতর্ক ব্যক্তি তাঁর বিরুদ্ধে কুফর বা অবিশ্বাসের ফতোয়া জারি করেন। কিন্তু উলামায়ে দেওবন্দ এ ধরনের চরম অবস্থানের সঙ্গে একমত হননি।
একবার আম্বেটারের পীরজী মুহাম্মদ আরিফ এসব ফতোয়া নিয়ে মাওলানা কাসিম নানুতবী রহ.-এর সঙ্গে আলোচনা করেন। পরবর্তীতে তিনি স্যার সাইয়িদ আহমদ খানের কাছে একটি চিঠি লিখে তাঁর বিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান। স্যার সাইয়িদও জবাবে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন।
এরপর মাওলানা নানুতবী নিজে স্যার সাইয়িদের লেখা পড়েন এবং বিস্তারিত উত্তর রচনা করেন, যা পরে তাসফিয়াতুল আকায়েদ নামে প্রকাশিত হয়।
এই গ্রন্থে তিনি পীরজী মুহাম্মদ আরিফকে সম্বোধন করে লেখেন—“পীরজী সাহেব! এই অধম কখনো কারো সঙ্গে তর্কে জড়ায় না। আর কেনই বা জড়াবে? এমন কী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যার জন্য আমাকে কারো সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ঝগড়ায় সময় নষ্ট করতে হবে? আমার কল্যাণকর কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে নিজের স্বার্থপর বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার প্রয়োজন কী? তবে আমি স্যার সাইয়িদ সাহেবের উচ্চমার্গীয় চিন্তা ও মুসলমানদের কল্যাণের জন্য তাঁর অন্তরের উদ্বেগ ও দরদ শুনে তাঁকে শ্রদ্ধা করি। তাই এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করাও যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর কিছু ভুল বিশ্বাস শুনে আমি গভীরভাবে দুঃখিত ও সংশয়ে আছি।” [8]তাসফিয়াতুল আকায়েদ, পৃ. ৫
এ থেকে স্পষ্ট হয়, উলামায়ে দেওবন্দ কখনো অন্ধ বা শত্রুভাবাপন্ন বিরোধিতার পথে যাননি। বরং তাঁরা যথাযথ আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্যার সাইয়িদের ভুল নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন এবং তাঁর শিক্ষাগত অবদানের স্বীকৃতিও দিয়েছেন।
আলীগড় ও দেওবন্দ : সহযোগিতার এক অধ্যায়
উপরের আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মাওলানা কাসিম নানুতবী রহ. স্যার সাইয়িদের শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে সচেতন ছিলেন। একদিকে তিনি স্যার সাইয়িদের চিন্তাধারাকে উচ্চমার্গীয় ও সুদূরপ্রসারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের কল্যাণে তাঁর আন্তরিক উদ্বেগ ও দরদকে প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, স্যার সাইয়িদের কিছু ভুল বিশ্বাস তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তবু তিনি কখনো আলীগড় আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি।
আলীগড়ে ধর্মতত্ত্ব বিভাগে উলামায়ে দেওবন্দের ভূমিকা
আলীগড় কলেজ প্রতিষ্ঠার পর যখন ধর্মতত্ত্ব (Theology) বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় তখন স্যার সাইয়িদ আহমদ খান উলামায়ে কেরামের সহযোগিতা চান। উলামায়ে দেওবন্দ এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখালেও একটি শর্ত নির্ধারণ করেন—সদস্যদের মধ্যে স্যার সাইয়িদ বা তাঁর কমিটির কেউ ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।
সৈয়দ তুফায়েল আহমদ মঙ্গলোরি তাঁর মুসলমানোঁ কা রৌশন মুস্তাকবিল গ্রন্থে লিখেছেন—“যখন মাওলানা কাসিম নানুতবীকে কলেজে ধর্মতত্ত্ব বিভাগ পরিচালনার জন্য অনুরোধ করা হয় তখন তিনি স্পষ্ট শর্ত দেন যে, স্যার সাইয়িদ নিজে কলেজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। তবেই ধর্মীয় শিক্ষার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা করা সম্ভব।”
এই শর্ত মেনে স্যার সাইয়িদ আহমদ খান নিজেকে কমিটি থেকে দূরে সরিয়ে নেন। উলামায়ে দেওবন্দ এ নিশ্চয়তা পেয়ে ধর্মতত্ত্ব বিভাগ গঠনের কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং মুসলিম শিক্ষার স্থায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
দেওবন্দের প্রতিনিধি আলীগড়ে
উলামায়ে দেওবন্দের পক্ষ থেকে মাওলানা কাসিম নানুতবীর জামাতা মাওলানা আবদুল্লাহ আনসারীকে আলীগড় কলেজের প্রথম ধর্মতত্ত্ব বিভাগের প্রধান (নাজিম) হিসেবে পাঠানো হয়।
স্যার সাইয়িদ আহমদ খান তাঁর নিয়োগপত্রে লিখেন—“মৌলভী আবদুল্লাহ সাহেব হলেন মৌলভী আনসার আলী সাহেবের পুত্র, মৌলভী মামলুক আলী সাহেবের নাতি এবং মৌলভী কাসিম নানুতবী সাহেবের জামাতা। আমি তাঁদের পূর্বপুরুষদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তাই আমি মনে করি, তাঁর মাদ্রাসায় আসা এবং সেখানে অবস্থান করা একটি শুভ লক্ষণ।” [9]মওজে কাওসার, পৃষ্ঠা ১৯৩-১৯৪
স্যার সাইয়িদ ও উলামায়ে দেওবন্দ : পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতা
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, স্যার সাইয়িদ আহমদ খান ও উলামায়ে দেওবন্দের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল গভীর। যদি দেওবন্দের উলামায়ে কেরাম স্যার সাইয়িদের বিরোধী হতেন তবে তিনি কখনো মাওলানা আবদুল্লাহ আনসারী-এর সুপারিশে এত আন্তরিকতা দেখাতেন না।
স্যার সাইয়িদের দেওবন্দের উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ
স্যার সাইয়িদ আহমদ খান শুধুমাত্র মাওলানা আবদুল্লাহ আনসারী-এর সুপারিশপত্রে উলামায়ে দেওবন্দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেননি, বরং ব্যক্তিগত চিঠিপত্রেও তাঁর এই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
পীরজী মুহাম্মদ আরিফ-এর কাছে প্রেরিত এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন—“যদি মৌলভী কাসিম সাহেব আমার কাছে আসেন, তবে তা আমার জন্য সম্মানের বিষয় হবে। তাঁর আতিথেয়তা করতে পারা আমার জন্য এক বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় হবে।” [10]মাওলানা কাসিম: হায়াত আওর কারনামে, পৃষ্ঠা ৩৭১
মাওলানা কাসিম নানুতবী ও স্যার সাইয়িদ আহমদ খান : পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মূল্যায়ন
মাওলানা কাসিম নানুতবী (১৮৩২-১৮৭৯) ও স্যার সাইয়িদ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮) একই যুগের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, যাঁরা ভারতীয় মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের জীবনপথ ও কাজের ধরন আলাদা হলেও তাঁরা পরস্পরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
স্যার সাইয়িদের শোকবার্তা ও মাওলানা নানুতবীর প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা
মাওলানা কাসিম নানুতবীর ইন্তেকালের পর স্যার সাইয়িদ আহমদ খান গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁর লেখা শোকবার্তাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইন্সটিটিউট গেজেট-এ (২৪ এপ্রিল ১৮৮০, পৃষ্ঠা ৪৬৭-৪৬৮)। পরবর্তীতে এটি ‘মওজে কাওসার’, ‘তারিখে দারুল উলূম দেওবন্দ’ এবং ‘মাওলানা কাসিম নানুতবী: হায়াত আওর কারনামে’ গ্রন্থেও সংকলিত হয়।
স্যার সাইয়িদ লিখেছেন—“সময়ের পরিক্রমায় বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, কিন্তু এমন ব্যক্তির মৃত্যু, যাঁর কোনো যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যাওয়া দুষ্কর, তা গভীর শোকের বিষয়। একসময় দিল্লির উলামায়ে কেরামদের মধ্যে এমন কিছু মহান ব্যক্তি ছিলেন, যাঁরা তাঁদের তাকওয়া, জ্ঞান ও বিনয়ের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। সাধারণ ধারণা ছিল যে, মাওলানা ইসহাকের পর আর কেউ তাঁর সমকক্ষ হবেন না। কিন্তু মাওলানা কাসিম নানুতবী তাঁর অসাধারণ ধর্মনিষ্ঠা, পবিত্রতা ও বিনয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃতি আবারও এমন একজন ব্যক্তিকে জন্ম দিয়েছে, বরং কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে গেছে। এমনকি যাঁরা তাঁর মতাদর্শের বিরোধী ছিলেন, তাঁরাও স্বীকার করতেন যে, এই যুগে তাঁর কোনো তুলনা নেই। হয়তো জ্ঞানে তিনি শাহ আবদুল আজিজের সমপর্যায়ের ছিলেন না, কিন্তু অন্যান্য গুণাবলীতে তাঁকে অতিক্রম করেছিলেন। তাকওয়া, বিনয় ও সাধুতার ক্ষেত্রে যদি তিনি মাওলানা ইসহাকের চেয়ে উচ্চতর না-ও হন, তবে তিনি তাঁদের থেকে কোনো অংশে কমও ছিলেন না। তাঁর চরিত্র ছিল ফেরেশতাদের মতো, তাঁর গুণাবলী ছিল ফেরেশতাসুলভ। এমন একজন ব্যক্তির মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং আমাদের জন্য এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।”
এই শোকবার্তা প্রমাণ করে যে, মাওলানা কাসিম নানুতবী ও স্যার সাইয়িদ আহমদ খান উভয়েই ছিলেন মুসলিম সমাজের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব, যদিও তাঁদের পথ ভিন্ন ছিল। তাঁরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল অভিন্ন—উম্মাহর উন্নতি ও ভবিষ্যৎ কল্যাণ।
(এ প্রবন্ধটি দিল্লি ভিত্তিক উর্দু দৈনিক ‘জাদিদ খবর’ (১৭-১০-২০১১)-এ প্রকাশিত হয়েছিল।)
তথ্যসূত্র: