এক.
আওরঙ্গজেব বা ঔরঙ্গজেব। সুলতানে আজম ওয়াল খাকান আবুল মুজাফফর মুহিউদ্দিন মুহাম্মাদ আওরঙ্গজেব তাঁর পুরো নাম। তিনি বাহাদুর আলমগীর, বাদশাহ গাজী, প্রথম আলমগীর ইত্যাদি নামেও পরিচিত।
১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৪৯ বছর মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর ফতোয়ায়ে আলমগীরীর শরিয়া আইন এবং ইসলামি অর্থনীতির মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ষষ্ঠ মুঘল সম্রাট। তিনি প্রথম মুঘল সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর-এর প্র-প্রপৌত্রের ছেলে তথা নাতির নাতির ছেলে, দ্বিতীয় সম্রাট নাসিরুদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুন-এর প্র-প্রপৌত্র তথা নাতির নাতি, তৃতীয় সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর-এর প্রপৌত্র, চতুর্থ সম্রাট নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর-এর পৌত্র এবং পঞ্চম সম্রাট শাহাবুদ্দিন মুহাম্মদ খুররম শাহজাহান-এর পুত্র। তাঁর মা শাহজাহান-এর সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী বেগম মমতাজ মহল।
তিনি একজন দক্ষ সামরিক নেতা ছিলেন—যার শাসন প্রশংসার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও ইদানীং তাঁকে ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত শাসক হিসেবেও বর্ণনা করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। ইঙ্গ-মুঘল যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের পরাজিত করেছিলেন।
দুই.
আওরঙ্গজেব ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেজ। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপশালী সম্রাট হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাধারণভাবে জীবনযাপন করেছেন। তিনি টুপি এবং নিজের হাতের লেখা কুরআন বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ব্যক্তিগত কাজে রাজ্যের সম্পদ ব্যবহার করতেন না।
মুঘল সম্রাট হিসেবে আওরঙ্গজেবের শাসনকালে বিভিন্ন যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের সীমানা বহুদূর বিস্তৃত হয়। তাঁর আমলে দক্ষিণাঞ্চলে ৪০ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার ভূখণ্ড মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৫ কোটি ৮৯ লক্ষ প্রজা তাঁর শাসনাধীন ছিল। তাঁর সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বাৎসরিক করের পরিমাণ ছিল ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, যা তাঁর সমসাময়িক চতুর্দশ লুইয়ের আমলে ফ্রান্সের বাৎসরিক কর এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি ছিল।
তাঁর শাসনামলে ভারত চীনকে ছাড়িয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল—যার পরিমাণ ছিল ৯০ বিলিয়ন ডলার, ১৭০০ সালে সমগ্র পৃথিবীর মাথাপিছু আয়ের এক চতুর্থাংশ।
তিন.
আওরঙ্গজেব তাঁর শাসনামলে ভারতে জিজিয়া করের প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি মারাঠা রাজ্যের শাসক শম্ভুজি ও নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। কারও কারও মতে, তাঁর আমলে অনেক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁর হিন্দু মন্দির ধ্বংসের বিষয়টি অতিরঞ্জিত। বরং তিনি মন্দির নির্মাণে অর্থ অনুদানও করেছিলেন। তাঁর আমলে তাঁর পূর্বসূরীদের তুলনায় প্রশাসনে মুঘল প্রশাসনের সর্বোচ্চ সংখ্যক হিন্দু কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছিল। তিনি শিয়া মুসলিম এবং হিন্দুদের ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধচারণ করেন। ভারতীয় দার্শনিক আল্লামা শিবলী নোমানী ‘আওরঙ্গজেব পর এক নজর’ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে তাঁর উপর উত্থাপিত সকল অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।
চার.
১৬৮৯ সালের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ ভারত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বিশেষ করে গোলকুন্ডা বিজয়ের পর মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটারে উন্নীত হয়। এর জনসংখ্যা ছিল ১৫৮ মিলিয়ন। কিন্তু এই আধিপত্য ক্ষণস্থায়ী ছিল। আওরঙ্গজেব তাঁর পূর্বসূরিদের মতো রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে নিজের সম্পত্তি মনে না করে জনগণের আমানত হিসেবে মনে করতেন। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তিনি নিজ হাতে টুপি বানাতেন এবং কুরআন নকল করে তা বিক্রি করতেন। যদিও একের পর এক যুদ্ধ বিশেষ করে মারাঠাদের সাথে তাঁর দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধ সাম্রাজ্যের রাজকোষকে প্রায় নিঃশেষ করেছিল।
মৃত্যুশয্যায়, অত্যন্ত পীড়িত অবস্থায়ও সম্রাট আওরঙ্গজেব চেয়েছিলেন যেন তাঁর মৃত্যুর খবরটি প্রকাশিত না হয়। কারণ তাঁর সন্তানদের মধ্যে সিংহাসনের জন্য লড়াই অবশ্যম্ভাবী ছিল। ২০ ফেব্রুয়ারি ১৭০৭ সালে যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক তাঁবুতে ৮৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে আওরঙ্গজেবের সমাধিটি খুব অনাড়ম্বর। সমাধিটি প্রখ্যাত আউলিয়া শেখ বোরহানউদ্দিন গরিব রহ.-এর কবরের পাশে অবস্থিত, যিনি ছিলেন দিল্লির শায়েখ নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহ.-এর শিষ্য।
পাঁচ.
ফতোয়ায় আলমগীরী বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দীয়া সম্রাট আলমগীরের একটি কালজয়ী কীর্তি। এটি ইসলামি আইনশাস্ত্রের একটি অনবদ্য সংকলন—যা ৫৪ বছর ধরে অধিকাংশ ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রশিল্প, সাধারণ নৈতিকতা, সামরিক কৌশল, অর্থনৈতিক নীতি, ন্যায় বিচার এবং শাস্তির উপর আইন সংকলন ছিল।
মুঘল সম্রাট মুহিউদ্দিন মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আলমগীরের নির্দেশে এই সংকলনটি প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে এ গ্রন্থটি ‘ভারতে তৈরি মুসলিম আইনের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, এ সংকলনটি ব্যাপকভাবে ফিকহ তথা ইসলামি আইনশাস্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুসংগঠিত কাজগুলির মধ্যে অন্যতম মনে করা হয়ে থাকে। সুন্নি হানাফি মাজহাবের ভিত্তিতে শরিয়া আইন এতে সংকলিত হয়েছে। হযরত মোল্লা নিজামউদ্দিন রহ. সহ অনেক আলেম এই গ্রন্থ প্রণয়নে অবদান রেখেছেন। এ গ্রন্থ প্রণয়নে কুরআন, সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ ও জামে তিরমিযী ইত্যাদির সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। গ্রহণযোগ্য অনেক ফতোয়ার কিতাব থেকে অসংখ্য শাখাগত মাসআলা সুবিন্যস্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ৬ খণ্ডের এ গ্রন্থটি বিভিন্ন কুতুবখানা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এটি খুব সুলভ একটি ফতোয়াগ্রন্থ।
ফতোয়ায়ে আলমগীরী প্রণয়নের উদ্দেশ্যে আওরঙ্গজেব ৫০০ ফকিহ নিয়োগ দেন। তাঁদের মধ্যে ৩০০ জন দক্ষিণ এশিয়া, ১০০ জন ইরাক এবং ১০০ জন হেজাজ থেকে এসেছিলেন । দিল্লি ও লাহোরে সংকলন কর্মে শাইখ নিজামউদ্দিন বুরহানপুরি রহ. দলের নেতৃত্ব দিয়েছন। তাঁদের কয়েক বছরব্যাপী পরিশ্রমের মাধ্যমে ফতোয়ায়ে আলমগীরী প্রণীত হয়। এই গ্রন্থে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির সাপেক্ষে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, দাস, যুদ্ধ, সম্পদ, আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক, বিনিময়, কর, অর্থনীতি ও অন্যান্য আইন এবং আইনি নির্দেশনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি নামে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করলেও কিতাবটির আসল নাম ফতোয়ায়ে হিন্দিয়াহ। প্রায় ১০০ হানাফি আলেম কিতাবটির সম্পাদনায় অংশগ্রহণ করেন। সম্পাদনা পর্ষদের সভাপতি ছিলেন শাইখ নিজামুদ্দিন রহ.। তাঁর জন্ম তারিখ পাওয়া যায় না। তাঁর মৃত্যু ১১০৩ হিজরিতে বলে জানা যায়। ফতোয়ায়ে আলমগিরি লেখা হয় ১১০৩ হিজরিতে অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফা রহ. এর মৃত্যুর (১১০৩-১৫০)= ৯৫৩ বছর পর। এ কিতাবটি বিন্যাসের ক্ষেত্রে হানাফি মাযহাবের আরেকটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘হেদায়া’কে অনুসরণ করা হয়েছে। প্রণয়নের পর ফতোয়ায়ে আলমগীরী হানাফি মাযহাবের একটি রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে গণ্য ও ব্যবহৃত হতে থাকে। হানাফি মাযহাবের আমলযোগ্য ও রাজেহ মাসআলা বের করার জন্য ফতোয়ায়ে আলমগীরী একটি গ্রহণযোগ্য উৎসগ্রন্থ। ফতোয়ার সঙ্গে মুনাসাবাত তৈরি এবং মাসআলা ইস্তিহযারের জন্য উলামায়ে কেরাম ও মুফতি সাহেবগণের উচিত এ কিতাবের আদ্যপান্ত গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে মুতালাআ বা অধ্যয়ন করা।
তথ্যসূত্র :
১. আওরঙ্গজেবের ভেতর-বাহির, অড্রে ট্রসকি
২. ফতোয়ায়ে আলমগীরি কা মুছান্নিফিন
৩. ফতোয়ার কিতাব পরিচিতি, মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ খান আরমান