ফুলদের বিপ্লব-বাসনা

মূল : সাদাত হাসান মান্টো

কাজী একরাম

বাগানের ফুলগুলো প্রায় অস্থির হয়ে উঠেছে। সবার মাঝেই এক অদ্ভুত আলোড়ন। গোলাপের বুকে জ্বলে উঠেছে বিদ্রোহের আগুন। প্রতিটি শিরা-উপশিরা আবেগে থরথর করছে তার। অগত্যা একদিন, সে কাঁটায় ভরা গলা উঁচিয়ে নিজের স্বার্থচিন্তাকে পাশে রেখে ফুল-সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল—’দেখো, কারও কোনো অধিকার নেই আমাদের রস চুষে নিয়ে নিজের বিলাস-সামগ্রী জোগাড় করার। আমাদের জীবনের বসন্ত আমাদেরই জন্য। এতে অন্য কারও অংশীদারিত্ব আমরা মেনে নিতে পারি না!’

গোলাপের মুখ লাল হয়ে গেছে রাগে, গোস্বায়। পাপড়িগুলো তার থরথর, কম্পমান। চাঁপা-চামেলির ঝোপে সব কুঁড়ি এই শব্দ-শোর শুনে জেগে উঠল আর বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

গোলাপের পুরুষোচিত কণ্ঠ আবারও উচ্চকিত হলো—’প্রত্যেক প্রাণেরই নিজের অধিকার রক্ষার কর্তৃত্ব আছে। আমরা ফুলেরাও এর ব্যতিক্রম নই। আমাদের হৃদয় আরও নরম, আরও সংবেদনশীল। এক ঝলক গরম হাওয়ার ঝাপটাই আমাদের রঙ-সুবাসে গড়া জগৎকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে। আবার শিশিরের একটি তুচ্ছ ফোঁটাই পারে আমাদের তৃষ্ণা মিটিয়ে দিতে। তবে কি আমরা সেই নিষ্ঠুর একচোখা মালীর রুক্ষ হাত সহ্য করে যাব, যার ওপর ঋতুর রদবদলের কোনো প্রভাবই পড়ে না?’

জুঁই ফুলেরা প্রতিবাদের স্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘না, কখনোই না!’

লালার চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে বলল— ‘তার অত্যাচারেই আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। আমার বুক বিক্ষত হচ্ছে। আমিই হব প্রথম ফুল, যে এই জল্লাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ময়দানে নামবে!’

এ কথা বলেই সে ক্রোধে কাঁপতে লাগল।

চামেলির কুঁড়িগুলো বুঝতে পারছিল না, এই হঠাৎ শোরগোল কেন। একটি কুঁড়ি স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে গোলাপ গাছের দিকে এগিয়ে এসে ঝুঁকে বলল, ‘তুমি আমার ঘুমটা নষ্ট করে দিলে। এমন করে চেঁচাচ্ছ কেন বলো তো?’

এদিকে ডালিম ফুল খানিক ব্যবধানে দাঁড়িয়ে গোলাপের বিপ্লবী ভাষণের প্রভাব নিয়ে গভীর মনে ভাবছিল— ‘ফোঁটা ফোঁটা জল মিলেই তো স্রোতধারার জন্ম হয়। আমরা দুর্বল ফুল হলেও, সবাই মিলে যূথবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে আমাদের প্রাণের শত্রুকে পিষে ফেলতে পারব না—এমন কোনো কারণ নেই। আমাদের পাপড়িরা যদি সুরভি সৃষ্টি করতে পারে, তবে তৈরি করতে পারে বিষাক্ত গ্যাসও। ভাইয়েরা এসো, গোলাপের পাশে দাঁড়াও, এটাকেই তোমাদের বিজয় মনে করো!’

এই বলে সে ভ্রাতৃত্বের আবেগ মিশিয়ে একে একে সকল ফুলের দিকে তাকাল। গোলাপ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় চামেলির একটি কুঁড়ি তার মসৃণ তনুতে মৃদু এক শিহরণ জাগিয়ে বলল— ‘এসবই বেকার কথা। এসো গোলাপ, তুমি বরং আমাকে কবিতা শোনাও। আজ আমি তোমার কোলে মাথা গুঁজে ঘুমুতে চাই। তুমি তো কবি। কাছে এসো, এই বসন্তের মনোরম মুহূর্তগুলো এমন নিরর্থক কথায় নষ্ট করো না। চলো আমরা সেই জগতে হারিয়ে যাই, যেখানে শুধু ঘুম আর ঘুম—কী গভীর, মিষ্টি ও আরামদায়ক সেই ঘুম।’

গোলাপের বুকে জেগে উঠল তীব্র আলোড়ন। বেড়ে গেল তার হৃদস্পন্দন। তার মনে হলো, সে যেন কোনো অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। কুঁড়ির মোহন কথার প্রভাব কাটানোর চেষ্টা করে সে বলল— ‘না, আমি যুদ্ধক্ষেত্রে নামার শপথ নিয়েছি। এখন এসব রোমান্স আমার কাছে অর্থহীন।’

কুঁড়ি তার সুকোমল তনু আরও কাছে এনে আরও স্বপ্নকাতর কণ্ঠে বলল— ‘ওহে আমার প্রিয় গোলাপ, চাঁদনি রাতের কথা ভাবো। যখন আমি আমার বসনা খুলে সেই নূরঝরা আলোর ফোয়ারায় স্নান করব, তখন তোমার গালে লজ্জার যে লাল আভা খেলা করবে, তা আমার কাছে কেমন প্রিয়প্রিয় লাগবে! তুমি তখন উন্মত্ত হয়ে আমার কপোলে এঁকে দেবে এক উষ্ণ চুম্বন… তাই ওইসব অর্থহীন কথা ছাড়ো। আমার কাছে এসো, আমি তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমুতে চাই।’

চামেলির কোমল পাপড়ি গোলাপের কম্পমান গালের সঙ্গে গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। গোলাপ হয়ে পড়ল মোহাচ্ছন্ন। চারদিক থেকে অন্য ফুলদের প্রতিবাদের স্বর ভেসে আসছিল অনেকক্ষণ, কিন্তু গোলাপ আর জাগল না। সারাটি রাত সে ওভাবেই আবেশিত হয়েই রইল।

ভোর হয়ে গেছে ততক্ষণে। মালী এসে দেখল, গোলাপের ডালের সঙ্গে চামেলির কুঁড়ি জড়িয়ে আছে। একচোখা সেই মালী এরপর তার রুক্ষ হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে নিল গোলাপ-চামেলি দুটোকেই!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments