নয়া কানুন

মূল : সাদাত হাসান মান্টো

কাজী একরাম

মাঙ্গো কৌচওয়ানকে তার আড্ডাখানায় ঢের পণ্ডিত লোক বলেই মনে করা হত। যদিও তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল শূন্যের কোঠায়। কখনও স্কুলের চেহারাও দেখেনি তবুও, জগৎ সংসারের তাবৎ খবরাখবর যেন তার নখদর্পণে ছিল। আড্ডাখানার যত কৌচওয়ান, যাদের দুনিয়ার কোথায় কী ঘটছে তা জানার খায়েশ হত, সকলেই ওস্তাদ মাঙ্গোর বিপুল জ্ঞানগম্যি সম্পর্কে ভালোই অবগত ছিল।

সম্প্রতি ওস্তাদ মাঙ্গো তার এক সওয়ারির কাছ থেকে স্পেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার রটনা শুনতে পেয়ে গামা চৌধুরীর চওড়া কাঁধে হাত মেরে একটা দূরদর্শী ভঙ্গিতে ভবিষ্যদ্বাণী করছিলেন, ‘দেখে নিয়েন চৌধুরী, কয়েক দিনের মধ্যেই স্পেনে যুদ্ধ বেঁধে যাবে

গামা চৌধুরী তাকে যখন জিজ্ঞেস করলেন ‘স্পেনটা কোথায় বাপু’, ওস্তাদ মাঙ্গো তখন বেশ দৃঢ় কন্ঠেই উত্তর দিলেন, ‘বিলেতেই হবে, আর কোথায়?’

কয়েকদিনের মধ্যেই স্পেনে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আর খবরটা ছড়িয়ে পড়তেই স্টেশনের আড্ডাখানায় আসর জমিয়ে যত কৌচওয়ান হুক্কা টানছিল প্রত্যেকেই মনে মনে ওস্তাদ মাঙ্গোর বড়ত্ব স্বীকার করছিল! ওস্তাদ মাঙ্গো তখন অবশ্য মল রোডের মসৃণ পথ ধরে টাঙ্গা হাঁকাতে হাঁকাতে তার যাত্রীর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা নিয়ে আলোচনা করছিলেন

সেই সন্ধ্যায় ওস্তাদ মাঙ্গো যখন তার আড্ডার ঘাঁটিতে হাজির হলেন তার মুখ-চেহারা কেমন যেন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। হুক্কায় টান মারতে মারতে কথাবার্তার এক পর্যায়ে যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার কথা এসে পড়ল ওস্তাদ মাঙ্গো মাথা থেকে তার খাকি পাগড়িটা খুলে নিয়ে বগল-চাপা করে একেবারে চিন্তাবিদসূলভ লেহজায় বলতে শুরু করলেন—

‘এটা কোনো এক দরবেশের অভিশাপের ফল, দু’দিন না যেতেই হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ছুরি-চাপাতি চলতে শুরু করে। আমি আমার বড়দের মুখে শুনেছি, সম্রাট আকবর কোনো এক দরবেশের দিল দুঃখিত করেছিল আর সেই দরবেশ ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দিয়েছিলেন, ‘যা, তোর ভারতে সর্বদা অরাজকতা লেগেই থাকবে।’ আর তোমরাই দেখো, যখন থেকে সম্রাট আকবরের রাজত্ব শেষ হয়েছে, হিন্দুস্তানে দাঙ্গা-ফ্যাসাদ আর থামল কোথায়!’

এই কথা বলে ওস্তাদ মাঙ্গো একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন তারপর হুক্কায় গভীর একটা টান দিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন—

‘এই কংগ্রেসিরা বলে হিন্দুস্তানকে স্বাধীন করতে চায়। আমি বলছি, হাজার বছর মাথা কুটলেও কিছু হবে না। বড় জোর এই হবে যে, ইংরেজরা যাবে আর তার জায়গায় কোনো ইতালীয় এসে পড়বে নয়তো সেই রুশগুলো; শুনেছি বড়ই তাগড়া জাতের লোক। কিন্তু হিন্দুস্তান সদা গোলামই থাকবে। হ্যাঁ, আমি বলতেই ভুলে গেছি, সেই দরবেশ এ কথাটাও বলেছিল, হিন্দুস্তান চিরকাল বাইরের লেকের হাতেই শাসিত হবে।’

ব্রিটিশদের প্রতি ওস্তাদ মাঙ্গোর ছিল প্রচণ্ড ঘৃণা। আর এই ঘৃণার কারণ দেখিয়ে তিনি বলতেন, তারা তার হিন্দুস্তানের উপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয় আর নানান রকমের জুলুম চালায়। কিন্তু তার এই ঘৃণার সবচেয়ে বড় কারণ সেনা-ছাউনির শ্বেতাঙ্গরা তাকে নিদারুণ জ্বালাতন করত। তারা তার সঙ্গে এমন আচরণ করত যেন সে এক নচ্ছার কুকুর! তাছাড়া তাদের গায়ের রঙও তার পছন্দ ছিল না মোটেও। যখনই তিনি কোনো শ্বেতাঙ্গের লালচে-সাদা মুখ দেখতেন তার বমি বমি ভাব ধরত। জানি না এমন কেন হত। তিনি বলতেন, ‘ওদের ওই কুঁচকানো লাল-সাদা মুখটা দেখলে আমার সেই লাশটার কথা মনে পড়ে যায়, যার গা থেকে উপরের ঝিল্লি চামড়া খসে খসে পড়ছিল!’

যখন কোনো মদ্যপ শ্বেতাঙ্গ লোকের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়ে যেত সারাদিন তার মেজাজ খারাপ হয়ে থাকত। আর সন্ধ্যায় আড্ডাখানায় এসে সিগারেট বা হুক্কা টানতে টানতে সেই শ্বেতাঙ্গ লোকটিকে মনভরে গালাগাল শুনিয়ে দিতেন।

‘… ’ এই একখান মোটা গালি দেওয়ার পর তিনি তার ঢিলে পাগড়িসুদ্ধ মাথাটাকে একটা ঝটকা দিয়ে বলতেন—

‘ওরা আগুন নিতে এসেছিল। এখন ঘরের মালিক বনে বসেছে। এই বানরের বাচ্চারা আমাদের নাকে দম করে রেখেছে। এমন ভাব করে যেন আমরা ওদের বাপের চাকর।’

এরপরও তার রাগ ঠান্ডা হত না। যতক্ষণ না তার কোনো সঙ্গী তার পাশে বসে থাকত, তিনি তার মনের জ্বালা মিটাতেই থাকতেন।

‘তুমি যদি তার শেকেলটা দেখতে…  কুষ্ঠরোগে ধরা মানুষের মতো… একেবারে মৃত মুর্দার। এক আঘাতে, এক আঘাতে… বলে বলে এমন করে চেঁচাচ্ছিলেন তিনি, যেন তাকে মেরেই ফেলবেন। তোমার জানের কসম, প্রথমে আমার ইচ্ছে হয়েছিল এ অভিশপ্তটার মাথার খুলি উড়িয়ে দিই, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো এই মরদুদকে মারা নিজেরই অপমান—এই খেয়ালে কেটে পড়ি…’

এইসব বলতে বলতে তিনি কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে গেলেন এবং তার মলিন জামার আস্তিন দিয়ে নাকটা মুছলেন, তারপর আবার শুরু করলেন বকাবকি—

‘ভগবানের শপথ, লাট সাহেবদের নখরা ওঠাতে ওঠাতে আমি হাঁফিয়ে উঠেছি। যখনই ওদের ওই অপয়া মুখটা দেখি রক্ত ​​টগবগ করে ওঠে। যদি কোনো নয়া কানুন-টানুন তৈরি হয় তবেই বুঝি এই লোকদের হাত থেকে রেহাই পাই। জীবনটাও বাঁচে।’

এর কিছুদিন পর একদিন ওস্তাদ মাঙ্গো তার ঘোড়াযানে দরবার থেকে তুললেন দু‘জন মহিলা যাত্রী। পথ চলতে চলতে তাদের কথাবার্তা থেকে তিনি জানতে পারলেন, হিন্দুস্তানে নাকি এক নয়া কানুন জারি হতে চলেছে। এতে তার আনন্দের যেন আর সীমা রইল না।

একইদিন দুইজন মারোয়াড়ি, যারা তাদের দেওয়ানি মামলা নিয়ে আদালতে এসেছিল, বাড়ি ফেরার পথে নিজেদের মধ্যে নতুন আইন অর্থাৎ অ্যাক্ট ইন্ডিয়া নিয়ে আলাপ করছিল।

‘শুনেছি, পয়লা এপ্রিল থেকে হিন্দুস্তানে নয়া কানুন চালু হবে। সবকিছু কি তবে বদলে যাবে?’

‘সবকিছু বদলে যাবে না। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, অনেক কিছু বদলাবে এবং হিন্দুস্তানীদের আজাদি মিলবে।’

‘সুদ নিয়ে কি কোনো নয়া কানুন পাস হবে?’

‘এ তো জিজ্ঞেস করার মতো কথা কাল কোনো আইনজীবীর কাছ থেকে জানতে হবে

এই মাড়োয়ারিদের কথোপকথন ওস্তাদ মাঙ্গোর হৃদয়ে জাগিয়ে দিয়েছিল এক অবর্ণনীয় আনন্দ।

তিনি তার ঘোড়াকে গালাগাল করতেন, বেত্রাঘাত করতেন খুব বাজেভাবে—এমনই তার আদত। কিন্তু সেদিন তিনি বারবার পিছু ফিরে মাড়োয়ারিদের দিকে তাকাচ্ছিলেন আর তার প্রলম্বিত গোঁফগুলোকে এক আঙুল দিয়ে সাবধানে উঁচু করে ঘোড়ার লাগাম ঢিলা করতে করতে স্নেহের সুরে বলছিলেন, ‘চল বেটা, চল… বাতাসের সাথে একটু কথা বলে দেখিয়ে দে।’

মাড়োয়ারিদেরকে ঠিকানায় নামিয়ে দিয়ে আনারকলিতে ডিনো হালুয়ার দোকানে আধ সের দইয়ের লাচ্ছি খেয়ে ওস্তাদ মাঙ্গো বড়সড় একটা ঢেকুর তুললেন। আর মুখের ভেতর গোঁফ চেপে দিয়ে চুষতে চুষতে বুলন্দ আওয়াজে বলে উঠলেন, ‘ধুর, এইসি কি তেইসি!’

সন্ধ্যায় ঘাঁটিতে ফিরে দেখেন রোজকার মতো সেখানে তার চেনা কেউ নেই। এই দৃশ্য তার বুকের ভেতর অদ্ভুত ঝড় তুলে যায়। আজ তিনি বন্ধুদের একটা বড় খবর শোনাতে যাচ্ছিলেন, খুবই বড় খবর! সেই খবর ভেতর থেকে উগরে দিতে তিনি বড়ই মজবুর হয়ে উঠছিলেন। মুখের মধ্যে পুরে রাখার মতো ধৈর্য যেন আর কুলোয় না। কিন্তু আজ যে সেখানে কেউ ছিলই না!

আধঘণ্টা ধরে ওস্তাদ মাঙ্গো স্টেশন প্ল্যাটফর্মের লোহার ছাদের নীচে থুতনি চেপে অস্থির পায়ে টহল দিয়ে যাচ্ছিলেন কী দারুণ দারুণ সব খেয়াল তার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল আজ। নয়া কানুনের খবর তাকে যেন এক নতুন জগতে নিয়ে গেছে। তিনি তার মস্তিস্কের সবটুকু আলো রৌশন করে পয়লা এপ্রিলে হিন্দুস্তানে চালু হতে যাওয়া এই নয়া কানুন নিয়ে ভাবছিলেন। মাড়োয়ারির সেই জিজ্ঞাসা—‘সুদের উপরও কি নতুন আইন হবে?’ তার কানে বারবার বাজছিল। তার সারা শরীরে আনন্দের লহর খেলে যাচ্ছিল। বেশ কয়েকবার ঘন গোঁফের আড়ালে হেসে মাড়োয়ারিদের গালি দিয়ে বলছিলেন—‘গরীবদের খাটিয়ায় ঢুকে পড়া খটমলগুলো! নয়া কানুন ওদের জন্য ফুটন্ত জল হবে।’

তিনি যারপরনাই উচ্ছ্বসিত, বিশেষ করে সেই মুহূর্তে তার হৃদয়ে শান্তি বোধ হলো যখন ভাবলেন, নয়া কানুন আসার সঙ্গে সঙ্গেই সাদা ইঁদুরগুলোর (এই নামেই তিনি শেতাঙ্গদের ডাকতেন) থুতনি চিরদিনের মতো গর্তের ভেতর গায়েব হয়ে যাবে।

এমন সময় টাকমাথার নাথু তার পাগড়িটা বগলে চেপে আড্ডাঘরে ঢুকল। ওস্তাদ মাঙ্গো ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত নিজের হাতে নিয়ে উঁচু গলায় বলতে লাগলেন, ‘হাতটা দে এখানে, আমি তোকে এমন খবর শোনাব যে তোর মন আটখানা হয়ে যাবে। তোর টাক মাথায় চুল গজাতে শুরু করবে।’

এই বলে ওস্তাদ মাঙ্গো বেশ রসিয়ে রসিয়ে তার বন্ধুর সাথে নয়া কানুনের গল্প শুরু করে দিলেন। কথা বলতে বলতে তিনি বারবার নাথুর হাতে সজোরে চাপড় মেরে বলছিলেন, ‘এখন তুই স্রেফ দেখতে থাক কী হয়! এই রুশ-রাজ কিছু না কিছু করবেই।’

ওস্তাদ মাঙ্গো হাল আমলের সোভিয়েত ব্যবস্থার সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপ সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছিলেন। সেখানে চালু হওয়া নতুন আইন ও অপরাপর ব্যবস্থাপনা তার খুব পছন্দের ছিল। এ কারণেই তিনি রুশ রাজকে ইন্ডিয়া অ্যাক্ট অর্থাৎ নয়া কানুনের সঙ্গে এক করে ফেলেছিলেন আর পয়লা এপ্রিলে পুরনো ব্যবস্থায় যে নতুন পরিবর্তন হতে যাচ্ছে, তার মনে হয়েছিল এর সবই রুশ-রাজের প্রভাবের ফল।

বেশ কিছুদিন ধরেই পেশোয়ার ও অন্যান্য শহরে রেড রোবস আন্দোলন চলছিল। ওস্তাদ মাঙ্গো এই আন্দোলনকেও মনে মনে রুশ-রাজ আর নয়া কানুনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। আর যখনই কারও কাছ থেকে শুনতেন অমুক শহরে এত ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কিংবা অমুক জায়গায় বিদ্রোহের দায়ে এত লোকের নামে মোকদ্দমা চলছে তিনি এ সমস্তকেই নয়া কানুনের অগ্রগতি বলে ধরে নিতেন আর মনে মনে বেজায় খুশি হতেন।

একদিন দু’জন ব্যারিস্টার তার টাঙ্গায় বসে নয়া কানুনের সমালোচনা করছিলেন ওস্তাদ মাঙ্গো নীরবে কান পেতে তাদের কথা শুনছিলেন। একজন বলছিল—

‘নতুন আইনের দ্বিতীয় অংশ হলো ফেডারেশন, যা আমার মাথায় ঢুকছে না ইতিহাসে এমন ফেডারেশনের কথা না শোনা গেছে, না দেখা গেছে। রাজনৈতিক তত্ত্বের দিক থেকেও এটা সম্পূর্ণ গলদ, বরং একে ফেডারেশন বলাই ঠিক নয়!’

এই ব্যারিস্টারদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়, তার বেশিরভাগ শব্দই ইংরেজি হওয়ায় ওস্তাদ মাঙ্গো উপরের বাক্যটুকুই কিছুটা ধরতে পেরেছিলেন আর তাতেই ভেবে নিলেন এই লোকগেুলো হিন্দুস্তানে নয়া কানুনের আগমনকে ভালো চোখে দেখছে না তারা চায় না তাদের আযাদি হোক। এই ধারণার বশে তিনি এই দুই ব্যারিস্টারের দিকে বার কয়েক অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, ‘টড্ডি বাচ্চে!’

যখনই ওস্তাদ মাঙ্গো কাউকে এভাবে চাপা স্বরে ‘টড্ডি বাচ্চা’ বলতেন ভেতরে ভেতরে খুবই তৃপ্তি পেতেন। ভাবতেন ঠিক জায়গাতেই তিনি শব্দটা ব্যবহার করেছেন এবং আসল ভদ্রলোক আর উপদ্রবকারী ছোকরাদের তিনি চিনতে ভুল করেন না!

এই ঘটনার তিনদিন পর গভর্নমেন্ট কলেজের তিন ছাত্রকে তার টাঙ্গায় বসিয়ে মোজাং যাচ্ছিলেন তিনি। পথে এই ছেলেদের নিজেদের মধ্যে বলা কথাগুলো তার কানে এলো।

‘জানিস, নয়া কানুন আমার আশা বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি… যদি অমুক সাহেব, অ্যাসেম্বলির মেম্বার হয়ে যায় তাহলে আমার কোনো সরকারি দপ্তরে চাকরি জুটে যেতে পারে নির্ঘাত।’

এমনিতেও আরও সুযোগ সামনে আসবে। এই গোলমেলে অবস্থার মধ্যেও হয়তো আমাদের হাতে কিছু না কিছু লেগে যাবে।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন নয়?’

‘যতসব বেকার গ্রাজুয়েট ছোটাছুটি করে ফিরছে। কোথাও না কোথাও তো গোলমাল আছে।’

তাদের এই কথোপকথন ওস্তাদ মাঙ্গোর মনে নয়া কানুনের গুরুত্ব যেন আরও বাড়িয়ে দিল। তার কাছে এই নয়া কানুন এমনই কোনো পদার্থ বলে ঠেকল, যেন তা জ্বলজ্বল করে চমকায়।

‘নয়া কানুন’….. !

দিনে কয়েকবার তিনি এটি নিয়ে ভাবতেন। ‘নয়া কানুন’ মানে ‘নতুন কিছু!’ আর প্রতিবারই তার চোখের সামনে ভেসে উঠত তার ঘোড়ার সেই নতুন বাদ্যযন্ত্রটা, যা তিনি দুই বছর আগে চৌধুরী খোদা বখশের কাছ থেকে কিনেছিলেন বেশ বাজিয়ে নেওয়ার পর। বাদ্যযন্ত্রটির উপর নিকেল দিয়ে মোড়ানো লোহার পেরেকগুলো ভারী চকচক করত, আর পিতলের কাজগুলো তো সোনার মতো জ্বলজ্বল করত। এই বিচারেও নয়া কানুন এমন উজ্জ্বল ও চকচকে কিছুই হবে।

পয়লা এপ্রিল নাগাদ ওস্তাদ মাঙ্গো নয়া কানুনের বিপক্ষে ও পক্ষে অনেক কথাই শুনেছেন। কিন্তু তার মনে এ নিয়ে গেঁথে নেওয়া ধারণা এতটুকু বদলায়নি তার বিশ্বাস ছিল পয়লা এপ্রিল এলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে আর তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তখন তিনি যা দেখবেন তা তার চোখে অবশ্যই স্বস্তি আনবে।

অবশেষে মার্চ মাসের একত্রিশ দিন শেষ হয়ে গেল এপ্রিল শুরু হতে রাতের কিছু নীরব ঘণ্টা বাকি মাত্র। আবহাওয়া অস্বাভাবিক ঠান্ডা। বাতাসে ছিল এক ধরনের ফুরফুরে সতেজতা। পয়লা এপ্রিলের সকালে, খুব ভোরেই ওস্তাদ মাঙ্গো ঘুম থেকে উঠে আস্তাবলে গেলেন ঘোড়াকে টাঙ্গায় জুতে বেরিয়ে পড়লেন। আজ তার মেজাজ অদ্ভুত রকম প্রফুল্ল; নয়া কানুন দেখতে বেরিয়েছেন তিনি।

শীতার্ত সকালের কুয়াশায় সরু গলি আর খোলা বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু সবকিছুই তার কাছে পুরনো লাগছিল—আকাশের মতো পুরনো। তার চোখ আজকের নতুন রঙটি দেখতে চাইছিল। কিন্তু তার ঘোড়ার মাথায় লাগানো কুলিঘি (রঙিন পালক) ছাড়া আর সবকিছুই যেন পুরনো লাগছিল। নতুন আইন উদযাপনের খুশিতে এই নতুন কুলিঘিটা তিনি কিনেছিলেন ১৩ মার্চ চৌধুরী খোদা বখশের কাছ থেকে সাড়ে চৌদ্দ আনা দিয়ে।

ঘোড়ার খুরের শব্দ, কালো রাস্তা, তার আশপাশে অল্প অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুতের খাম্বা, দোকানের সাইনবোর্ড, তার ঘোড়ার গলায় পরানো ঘুঙুরের ঝনঝন, বাজারের লোকজন… এর মধ্যে কোন জিনিসটি নতুন ছিল? কোনোটিই তো নয়, তবু ওস্তাদ মাঙ্গো হতাশ হন না!

এখনও অনেক ভোর। সব দোকানই বন্ধ। এই খেয়াল ওস্তাদ মাঙ্গোকে স্বস্তি দিচ্ছিল। তাছাড়া তিনি আরও একটা কথা ভাবলেন মনে মনে হাইকোর্টে নয়টার পরেই কাজ শুরু হয়। এখন তাহলে তার আগে নতুন আইনের কী-ই বা নজরে আসবে?

তার টাঙ্গাটি সরকারি কলেজের গেটে পৌঁছলো কলেজের ঘড়িয়াল ঢের উচ্চস্বরেই ঘণ্টা বাজালো। প্রধান গেট দিয়ে বেরিয়ে আসা ছাত্ররা বেশ পরিপাটি ও খোশপোশই ছিল। কিন্তু কেন জানি ওস্তাদ মাঙ্গোর চোখে তাদের পোশাক ময়লামতো ঠাহর হচ্ছিল হতে পারে আজ তার চোখ কোনো অতি চমকপ্রদ দৃশ্য দেখার অপেক্ষায়, সেজন্য

টাঙ্গাটি ডানদিকে ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ পর তিনি আনারকলিতে ফিরে এলেন বাজারের অর্ধেক দোকানপাট খুলে গিয়েছে ততক্ষণেএখন লোকজটও বেড়েছে। মিষ্টির দোকানগুলোয় গ্রাহকদের ভীষণ ভীড়। মনোহারীদের দর্শনীয় জিনিসপত্তর কাঁচের আলমিরায় শোভা ছড়িয়ে আত্মপ্রদর্শনী করছে আর বেশ কয়েকটি পায়রা বৈদ্যুতিক তারের উপর নিজেদের মধ্যে লড়ছে। কিন্তু ওস্তাদ মাঙ্গোর এই সবে কোনো আগ্রহই ছিল না। তিনি কেবল নয়া কানুন দেখতে চান ঠিক সেইভাবে যেমন তিনি তার ঘোড়াদের দেখছিলেন।

ওস্তাদ মাঙ্গোর বাড়িতে যখন থেকে নবাগত শিশুর জন্মের কথা শোনা গেল সেই থেকে তিনি চার-পাঁচ মাস প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন বাচ্চাটি এক না একদিন পয়দা হবেই। কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহরগুলো কাটাতে পারছিলেন না তিনি। তিনি চাইতেন তার সন্তানকে এখনই একনজর দেখে নিতে, তারপর সে না হয় পয়দা হতেই থাকুক। এই অজেয় আকাঙ্ক্ষার বশে বার কয়েক তার অসুস্থ স্ত্রীর পেট টিপে কান লাগিয়ে শিশুটিকে নিয়ে কিছু জানতে চেয়েছেন; কিন্তু বরাবরই ব্যর্থ হয়েছেন। একবার তো অপেক্ষা করতে করতে তিনি এতই ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে পড়লেন যে, নিজের স্ত্রীর উপরও যাচ্ছেতাই বর্ষণ করা শুরু করলেন—

‘তুমি সারাক্ষণ মৃতের মতো পড়ে থাকো। উঠো, খানিক হাঁটো, চলো, শক্তি তো জোগাও। এভাবে তক্তার মতো হয়ে থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। কী ভাবছো এভাবে লেটে লেটে তুমি সন্তানের জন্ম দেবে?’

ওস্তাদ মাঙ্গো স্বভাবতই তরাপ্রবণ লোক। দ্রুতই প্রতিক্রিয়া জানাতেন। প্রতিটি কারণের বাস্তব রূপ দেখতে শুধু অভিলাষীই ছিলেন না, বরং রীতিমতো কৌতূহলীও তার স্ত্রী গঙ্গাবতী তার এই অস্থিরতা দেখে প্রায়শই বলেন, ‘কূপ এখনও খনন করা হয়নি আর আপনি তৃষ্ণায় বেহাল হয়ে যাচ্ছেন।’

যত যাই হোক ওস্তাদ মাঙ্গো নয়া কানুনের এন্তেজারে ততটা অস্থির ছিলেন না যতটা তাঁর স্বভাব মতে হওয়ার কথা ছিল। তিনি আজ নয়া কানুন দেখতে ঘর থেকে বেরিয়েছেন ঠিক যেমন করে গান্ধী বা নেহরুর মিছিলের দৃশ্য দেখতে বের হতেন।

ওস্তাদ মাঙ্গো নেতাদের বড়ত্ব বিচার করতেন তাদের মিছিলের কোলাহল আর তাদের গলায় পরানো ফুলের মালা দিয়ে। যদি কোনো নেতা গাঁধা ফুলের মালা দিয়ে ঢাকা পড়তেন, উস্তাদ মাঙ্গোর চোখে তিনি এক মহান ব্যক্তি। আর যদি কোনো নেতার মিছিলে জনতার ভীড়ের কারণে দুই-তিনবার গোলমাল বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয় তাহলে তার চোখে সেই নেতা আরও মহান। আজ তিনি নয়া কানুনকে তার মনের সেই পাল্লায় মেপে দেখতে চেয়েছিলেন।

আনারকলি ছেড়ে ধীরে ধীরে তার ঘোড়াগাড়ি মল রোডের চকচকে পথ ধরে চলছিল। এমন সময় একটি মোটরবাইক দোকানের কাছে সেনাছাউনির এক সওয়ারি মিলে গেল। ভাড়া ঠিক করে তিনি তার ঘোড়াকে চাবুক দেখালেন আর মনে মনে ভাবলেন:

‘যাক, তাও ভালো। হয়তো সেনা ছাউনি থেকেই নয়া আইন নিয়ে কিছু জানা যাবে।’

সেনা ছাউনিতে পৌঁছে ওস্তাদ মাঙ্গো যাত্রীকে গন্তব্যস্থলে নামিয়ে দিলেন। এরপর পকেট থেকে সিগারেট বের করে বাম হাতের শেষ দুটি আঙুলে চেপে ধরে সিগারেটটি জ্বালালেন। আর গিয়ে পিছনের সিটের গদিতে বসে পড়লেন যখনই ওস্তাদ মাঙ্গো কোনো সওয়ারি খুঁজতেন না বা অতীতের কোনো ঘটনা নিয়ে ভাবতে হত তখন সাধারণত সামনের আসন ছেড়ে পিছনের আসনে গিয়ে আরামসে বসে ঘোড়ার লাগামটি ডান হাতে জড়িয়ে নিতেন। এই ধরনের মওকায় তার ঘোড়াটি একটু হেনহেনিয়ে খুব ধীর লয়ে পা ফেলতে শুরু করত। যেন মনে হত কিছুক্ষণের জন্য ঘোড়ার বাগডোর থেকে তার ছুটি মিলে গেছে!

ঘোড়ার চলন যেমন ধীর ছিল তেমনই ধীর ছিল ওস্তাদ মাঙ্গোর মনে আসা খেয়াল-কল্পনার প্রবাহ। ঘোড়াটি যেভাবে এক পা ফেলে আরেক পা তুলছিল, ঠিক সেভাবেই তার মনের পুকুরে নয়া কানুন নিয়ে একের পর এক নতুন নতুন অনুমান ঢুকে পড়ছিল।

নয়া কানুন এলে পৌর কমিটি থেকে টাঙ্গার নম্বর পাওয়া যাবে কীভাবে তা নিয়েই ভাবছিলেন তিনি এবং বিষয়টিকে নতুন আইনের আলোকে দেখবার চেষ্টা করছিলেন। এই চিন্তায় মগ্ন তিনি সহসা তার মনে হলো কোনো আরোহী তাকে ডাকছে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখতে পেলেন রাস্তার ঐ পাশে, দূরে এক বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে একজন ‘গোরা’ দাঁড়িয়ে আছে, যে তাকে হাত নেড়ে ডাকছে।

যেমনটা বলা হয়েছে, শ্বেতাঙ্গ গোরাদের প্রতি ওস্তাদ মাঙ্গোর ঘৃণা ছিল প্রবল। যখন তিনি তার নতুন এই গ্রাহককে  শ্বেতাঙ্গের রূপে দেখলেন, তার ভেতর ঘৃণার অনুভূতি চাগিয়ে ওঠল। প্রথমে ভাবলেন তার দিকে মোটেও মনোনিবেশ করবেন না, পাত্তা না দিয়েই ছেড়ে চলে যাবেন। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো, ‘ওদের টাকা ছেড়ে দেওয়াও বোকামি হবে।’ কুলুঘির উপর যে সাড়ে চৌদ্দ আনা খামোখাই খরচ করেছি, তা ওরই পকেট থেকে উসুল করা চাই চলো, যাই।’

খালি রাস্তায় বড়ই নিপুণ কায়দায় টাঙ্গাটা ঘুরিয়ে ওস্তাদ মাঙ্গো ঘোড়াকে চাবুক দেখালেন আর চোখের পলকেই বিদ্যুতের খুঁটির কাছে এসে পড়ল। লাগাম টেনে টাঙ্গাটি থামিয়ে গোরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—

‘সাহেব বাহাদুর কোথায় যেতে চাচ্ছেন?’

প্রশ্নটায় ছিল একটা ব্যঙ্গাত্মক সুর। ‘সাহেব বাহাদুর’ বলার সময় তার উপরের গোঁফে-ভরা ঠোঁটটা নীচের দিকে খিঁচে গেল আর নাকের নথ থেকে থুতনির উপর অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত গালের যে ক্ষীণ রেখা, তা কেঁপে কেঁপে আরও গাঢ় হয়ে এলো। তার সারাটা মুখ হাসছিল আর ভেতরে ভেতরে সেই ‘গোরাকে’ বুকের আগুনে পুড়িয়ে যেন ছাই করে ফেলেছিল!

যখন শেতাঙ্গ লোকটি বৈদ্যুতিক খুঁটির আড়ালে বাতাসের রুখ থেকে সরে সিগারেট ধরিয়ে টাঙ্গার পা-দানির দিকে এগিয়ে এলো তখনই, ঠিক তখনই ওস্তাদ মাঙ্গোর চোখ আর তার চোখ চোখাচোখি হয়ে গেল; আর মনে হলো, মুখোমুখি দুটি বন্দুক থেকে একসঙ্গে গুলি বেরিয়ে একে অপরের সাথে টক্কর খেয়ে একটি জ্বলন্ত টর্নেডো হয়ে উপরের দিকে উড়ে গেছে।

ওস্তাদ মাঙ্গো ডান হাত দিয়ে দড়ি খুলে টাঙ্গা থেকে নামতে নামতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গোরার দিকে এমন করে তাকাচ্ছিলেন যেন চোখ দিয়েই তার অস্তিত্বের প্রতিটি বিন্দুকণা চিবিয়ে খাচ্ছেন আর গোরা তার নীল প্যান্ট থেকে একটা অদেখা কিছু ঝাড়ছে, যেন সে ওস্তাদ মাঙ্গোর দৃষ্টির এই আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

গোরা সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘যাবে, না কি গড়বড় করবে?’

‘এ সেই লোক’—এ কথাটি ওস্তাদ মাঙ্গোর মনে জন্ম নিল আর তার বুকের ভেতর পাক খেতে লাগল।

‘এ সেই লোক।’—মনের ভেতর এ কথাটি বারবার আওড়ালেন তিনি এবং একই সাথে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে, তার সামনে দাঁড়ানো এ শ্বেতাঙ্গটিই সেই লোক, যার সঙ্গে গত বছর ঝগড়া হয়েছিল। আর সেই অবাঞ্ছিত বিতণ্ডায় মদের নেশায় চুর হয়ে থাকা শ্বেতাঙ্গ লোকটির অনেক বকোয়াসই তাকে না-পারতে সহ্য করতে হয়েছিল। ওস্তাদ মাঙ্গো চাইলে তখন গোরার দেমাগ দুরস্ত করে ছাড়তেন, বরং রেজা করে ফেলতে পারতেন তাকে। কিন্তু কোনো এক খাস মসলতে তিনি খামোশ হয়ে গেলেন। আসলে তিনি জানতেন, এই ধরনের ঝগড়ায় আদালতের কোড়া সাধারণত কৌচোয়ানদের উপরই পড়ে।

গত বছরের সেই অপমান আর পয়লা এপ্রিলের নয়া কানুন এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওস্তাদ মাঙ্গো শেতাঙ্গ লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যেতে চান?’

ওস্তাদ মাঙ্গোর কথার স্বরে ছিল তীক্ষ্ণতা।

গোরা লোকটি উত্তর দিল, ‘হীরামণ্ডি।’

‘ভাড়া পাঁচ রুপি লাগবে।’ ওস্তাদ মাঙ্গোর গোঁফগুলো কাঁপছিল।

শুনেই গোরা অবাক হয়ে গেল। চেঁচিয়ে ওঠে বলল, ‘পাঁচ রুপি! তুমি কি … ?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, পাঁচ রুপি!’

ওস্তাদ মাঙ্গোর লোমশ হাতটা ভারী হয়ে উঠল।

‘যাবে, না বাজে কথা বানাবে?’

ওস্তাদ মাঙ্গোর স্বর আরও গম্ভীর হয়ে উঠল।

গোরা গত বছরের ঘটনাটা মনে রেখে আজও ওস্তাদ মাঙ্গোর বুকের পাটাকে উপেক্ষা করেছিল। সে টাঙ্গার দিকে উদ্ধত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো আর হাতের ছড়ি দিয়ে ওস্তাদ মাঙ্গোকে টাঙ্গা থেকে নেমে আসতে ইঙ্গিত করল। এই পাতলা, পালিশ করা উইলো কাঠির ছড়িটি ওস্তাদ মাঙ্গোর মোটা উরুতে স্পর্শ করল দুই-তিনবার। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে ওপর থেকেই বেঁটে শরীরের গোরার দিকে তাকালেন; যেন চোখের ওজনেই তাকে পিষে ফেলতে চান। হাতের ঘুষিটা ধনুকের তীরের মতো উপরে উঠে চোখের পলকেই গোরার সাদা চিবুকের নিচে বসে গেল। এরপর ধাক্কা দিয়ে তাকে সামনে থেকে সরিয়ে নিচে নেমে এসে বেধড়ক মারতে লাগলেন।

বিস্মিত বিহ্বল গোরা নিজেকে এভাবে-ওভাবে মুড়িয়ে ওস্তাদ মাঙ্গোর ভারী ঘুষিগুলো এড়াতে চেষ্টা করে। কিন্তু যখন দেখল, তার প্রতিপক্ষের উপর উন্মাদনা সওয়ার হয়ে আছে, চোখ থেকে প্রতিশোধের আগুন ঝরছে, তখন সে চিৎকার শুরু করে দিল। সেই চিৎকার ওস্তাদ মাঙ্গের বাহুর কাজকে আরও তীব্র করে তুলল। তিনি আচ্ছা মতো গোরাকে তুলোধুনো করছিলেন আর বলে যাচ্ছিলেন—

‘পয়লা এপ্রিলেও সেই দম্ভ…পয়লা এপ্রিলেও সেই ঔদ্ধত্য…এখন হলো আমাদের রাজ বেটা!’

লোকজন জড়ো হয়ে গেল দুই পুলিশ সৈন্য অনেক কষ্টে গোরাকে ওস্তাদ মাঙ্গোর খপ্পর থেকে মুক্ত করল।

ওস্তাদ মাঙ্গো দুই সৈন্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। তার চওড়া বুক ফোলায়িত নিঃশ্বাসে উঠছে নামছে, রাগে-উত্তেজনায় ফেটে যাচ্ছে তার সারা মুখ আর হাসি জড়ানো চোখে বিস্মিত ভিড়ের দিকে তাকিয়ে হাঁপানো কণ্ঠে বলছিলেন—

‘সেই দিন চলে গেছে যখন খলিল খান পায়রা ওড়াতেন… মানুষকে অকারণ ভয়ে আতঙ্কে ফেলতেন… এখন নয়া কানুন, মিয়া! নয়া কানুন!’

আর বেচারা গোরা, বাকানো মুখ নিয়ে বোকাদের মতো কখনো ওস্তাদ মাঙ্গোর দিকে দেখছিল; আর কখনো ভিড়ের দিকে।

পুলিশ সৈন্যরা ওস্তাদ মাঙ্গোকে থানায় নিয়ে গেল। পথে পথে, থানার ভিতরে, নয়া কানুন, নয়া কানুন, নতুন আইন, নতুন আইন বলে তিনি শুধু চেঁচিয়ে যাচ্ছিলেন কিন্তু কেউ এতটুকুও কানে নেয়নি।’

এ-ই… ‘নয়া কানুন, নয়া কানুন, নতুন আইন, নতুন আইন… আবার কী!

কানুন সেটাই, সেই আগেরটাই, পুরনো!

এবং অতঃপর, ওস্তাদ মাঙ্গোকে কারারুদ্ধ করে দেওয়া হলো!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments