লেখক কাজী আমানত উল্লাহ মারা গেছেন।
এটা কত বড় খবর তা নিয়ে আলোচনার বিস্তর অবকাশ রয়েছে। রোজ কত মানুষই তো মারা যায়! কয়টা মৃত্যু নিয়েই বা আলোচনা হয়! বিশেষ কোনো ব্যক্তি না হলে মানুষের বাঁচা-মরায় সাধারণের মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা যায় না। দু-একজন হয়তো আহ্-উহ্ করে—এ পর্যন্তই শেষ। আলোচনা অবধি গড়ায় না। কাজী আমানত উল্লাহ একজন লেখক ছিলেন, গড়পড়তা মানের লেখক হিসেবেই বিবেচিত হয়ে এসেছেন জীবদ্দশায়। তার মৃত্যু নিয়ে হইচই হবে এমনটা ভাবাও আদিখ্যেতার পর্যায়ে পড়ত। অথচ মৃত্যুর পর যা ঘটছে তা আগে থেকে আন্দাজ করা কঠিন ছিল বৈ-কি!
তার হাতেগোনা ভক্তদের অনেকেই শোক জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তাদের দেখাদেখি যারা ভক্ত নয় কিন্তু ‘সহমত ভাই’ গোত্রভুক্ত; তারাও উৎসাহী হয়ে পোস্ট দিচ্ছেন। প্রায় সবার পোস্টেই শোকবার্তার নিচে একই ধরনের ছবি। যেখানে আমানত উল্লাহর মুখে চওড়া হাসি। মৃত্যুর পর কোনো এক বিশেষ কারণে মানুষের হাসিমুখের ছবির কদর বেড়ে যায়। অথচ জীবিত থাকতে তার মুখের হাসি-কান্নায় তেমন কিছু যায়-আসে না! অল্প কিছু পাঠক যারা জীবদ্দশায় ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তার বই কিনেছেন, বইয়ে লেখকের অটোগ্রাফ নিয়েছেন, তার সঙ্গে ছবি তুলেছেন; বেঁচে থাকতে সেই বই, অটোগ্রাফ, ফটোগ্রাফ অবহেলায় ফেলে রেখেছিলেন—তারা এখন সেসব খুঁজে বের করে ফেসবুকে পোস্ট করে স্মৃতিচারণ করছেন। একজনের পোস্ট দেখে আরেকজন উৎসাহী হচ্ছেন, তাকে দেখে আরেকজন—অন্তত একটা পোস্ট বাড়ানোর জন্য হলেও আমানত সাহেব ফেসবুকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। আহা, আজ যদি তিনি এসব নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতেন, কী খুশিই না হতেন!
মূলত মারা যাওয়াটাই শাপেবর হয়েছে কাজী আমানত উল্লাহর জন্য। খারাপ শোনা গেলেও এটাই সত্য। মৃত আমানত উল্লাহ ফেসবুক গরম করে ফেলেছেন। সাহিত্যপাড়ার অনেকেই নতুন করে তার নাম জানছে। কেউ কেউ আগ্রহী হয়ে তার বইও কিনছে। প্রকাশদের কেউ কেউ মানুষটার জন্য হা-হুতাশও করছে। অথচ জীবদ্দশায় তাকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে এই প্রকাশকরাই। বই প্রকাশের জন্য এক প্রকাশনী থেকে আরেক প্রকাশনীতে ঘুরে ঘুরে তিনি জুতোর তলা ক্ষয় করেছেন। কেউ তার সঙ্গে আগ্রহভরে কথা পর্যন্ত বলেনি। বসিয়ে চা খাওয়ানো দূরে থাক। তিনি অতটা প্রত্যাশাও করতেন না। কারণ তার বই সাকুল্যে ৫০-৬০ কপি বিক্রি হতো। দু-একজন প্রকাশক যে নিতান্ত অনিচ্ছায় বা তার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে বই প্রকাশ করত এটাই অনেক বেশি ছিল তার জন্য। এই বই প্রকাশের জন্য তিনি প্রকাশকের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছেন। পুরো জীবনে ডাক্তারের কথা না মানলেও প্রকাশকের কথা মানতে ভুল হয়নি তার। প্রকাশকের পরামর্শে কবি পরিচয় বুড়িগঙ্গার কালো জলে ছুঁড়ে ফেলেছেন। গল্প লিখেছেন। তবে এটাও বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেননি। কারণ ততদিনে চাওর হয়েছে, পাবলিক উপন্যাস ভালো খায়। তাই কবিতা-গল্প ফেলে উপন্যাস লেখায় মন দিয়েছেন। উপন্যাস লেখার ফলে তার বইয়ের বিক্রি কিছু বেড়েছিল, কয়েকজন নতুন প্রকাশক বই করার আগ্রহ দেখিয়েছিল—জীবনে এটাকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেছেন কাজী আমানত উল্লাহ। তবে বুড়ো বয়সে এসেও প্রকাশকের কথা মেনে রোমান্টিক উপন্যাস লেখার জন্য বেশ বিব্রতও হতে হয়েছে তাকে। সবচেয়ে অস্বস্তি লাগত ছেলে-মেয়েদের সামনে গেলে। তারা যে বাবার লেখার এই ধরনটা পছন্দ করে না—এটা মুখে না বললেও তিনি বুঝতে পারতেন। তিনি ছিলেন নিরুপায় লেখক, নিজের ইচ্ছের চেয়ে প্রকাশকের ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দিতে হয়েছে।
কাজী আমানত উল্লাহ ঘরের অস্বস্তি কাটাতে প্রায়ই উচ্চৈঃস্বরে বলতেন—আমি সস্তা লেখা লিখি না, প্রেম-ভালোবাসা ছাড়া জীবন চলে নাকি! বই আর জীবন আলাদা হবে কেন! সস্তা লেখা লিখলে প্রকাশরা আগ্রহ করে বই ছাপাত না! কখনো দেখেছো টাকা দিয়ে বই করতে! অথচ দেখো গিয়ে প্রকাশনীতে পাতি লেখকরা কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে বসে আছে বই করার জন্য।
তার কথা আংশিক সত্য, তিনি কখনো টাকা দিয়ে বই করেননি।
তিনি সস্তা লেখেন না—এটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। কারণ মরহুম কাজী আমানত উল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার পাচ্ছেন! হ্যাঁ তিনিই পাচ্ছেন। বেশ নামি একটা পুরস্কার, টাকার অঙ্কও বেশ মোটা—দুই লাখ! লেখকরা জাতে ওঠার জন্য পুরস্কার চায়। এর-ওর কাছে ধর্ণাও দেয়, অথচ তিনি না চাইতেই পাচ্ছেন এই পুরস্কার! তবে কি তিনি এবার জাতে উঠছেন!
পুরস্কারের জন্য তার নাম আসার ঘটনাটা বেশ নাটকীয়। সিলেকশন কমিটির প্রধান ছিলেন শরাফত আলী। বলা চলে কমিটির বাকিরা তার সিন্ধান্ত নত মস্তকে মেনে চলেন। না চলেই বা কী করবেন। এ পুরস্কার যে তার দাদার নামে! তবে তিনি কায়দা জানেন। টাকা-পয়সা খরচ করে পুরস্কারের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছেন। এখন এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ বই জমা পড়ে তা দেখে তিনি প্রশান্তি অনুভব করেন। এবার সিলেকশন কমিটি যেসব লেখকের নাম প্রস্তাব করেছিল তাদের বেশিরভাগই নতুন লেখক। বাকিরা মিলে একজন নতুন লেখককে প্রায় চূড়ান্ত করেই ফেলেছিল! বয়সে ছোট হলেও লেখার হাত পক্ক। তিনি ‘হ্যাঁ’ বলতে গিয়েও থেমে গেলেন স্ত্রীর প্রতি প্রকট ভালোবাসার কারণে।
শরাফত আলীর স্ত্রী জাবরুন নাহার পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। স্কুল-কলেজে থাকতে গল্প-উপন্যাসের পোকা ছিলেন। কত রাত জেগে লুকিয়ে-চুরিয়ে গল্পের বই পড়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। নায়িকার বিরহে কেঁদেছেন। ব্যর্থতার দায়ে নায়ককে গালিগালাজ করার স্মৃতি পর্যন্ত এখনো আনকোরা। অন্য নারীরা বিয়ের পর পারতপক্ষে নব-পুস্তক হাতে তোলে না। তুলনায় সহজ পানিতে নামে। টেলিভিশনের রিমোর্ট নিয়ে এ-চ্যানেল সে-চ্যানেলে দৌড়াদৌড়ি করে। মুঠোফোনে রিলস বা টিকটক ভিডিও দেখে সময় পার করে। তিনি সে স্রোতে গা ভাসাননি। এ নিয়ে শরাফত আলীর গর্বের অন্ত নেই। সিলেকশন কমিটির এমন কোনো মিটিং নেই যেখানে তিনি স্ত্রীর প্রসঙ্গ তুলে গর্ব করেন না, তাকে স্তুতিতে ভাসান না। অনেকেই তার কথা বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। তাদের চোখের সে অবিশ্বাসকে তিনি উপেক্ষা করে স্ত্রী-বন্দনা চালিয়ে যান।
জাবরুন নাহার প্রায়ই বই পড়ে বইয়ের সে গল্প শরাফত সাহেবকে শোনান। স্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে বেশ মিষ্টি লাগে। স্ত্রীর এ কাজটা তার কাজেও দেয়। তিনি না পড়েও বইয়ের এসব গল্প শুনিয়ে অফিসের বাকিদের কাছে নিজের অবস্থান কিঞ্চিৎ উঁচু করতে পারেন। অন্যরা তাকে ‘বইপড়ুয়া’ হিসেবে সমীহ করে। পুরস্কার কমিটির প্রধান হয়ে নিয়মিত বই না পড়লে কি গুরুত্ব থাকে!
দিনকতক আগে জাবরুন নাহার একটা বই পড়ে সে গল্প তাকে শুনিয়েছিলেন। নিখাদ প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর কাহিনি। স্ত্রীর বর্ণনামতে, লেখক তাকে হারানো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। কলেজের সেইসব দিন, হঠাৎ কাউকে ভালোলাগা, তার প্রতি গোপন টান তৈরি হওয়া… এসব তার স্ত্রীকে স্পর্শ করেছিল ভীষণভাবে। শরাফত আলী ততটা মনোযোগ না দিয়ে শুনলেও লেখকের নামটা ভোলেননি। স্পষ্ট মনে আছে— কাজী আমানত উল্লাহ। স্ত্রীর মনকে ছুঁয়ে দেওয়া সেই লেখকের নামটা হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে যায়। তিনি কমিটির কাছে লেখকের নামটা পাড়তেই সবার চোখ কপালে ওঠে! এ লেখককে মনোনয়ন দিলে তাদের পুরস্কারের মান কোথায় নেমে যাবে! এমন সস্তা লেখকের হাতে পুরস্কার দেখলে নিশ্চিতভাবে বোদ্ধা মহলে প্রশ্ন উঠবে এ পুরস্কার নিয়ে। কিন্তু কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি। শরাফত সাহেব যে সিদ্ধান্ত নিবেন সেটাই চূড়ান্ত। তার একটা সুপ্ত ইচ্ছাও আছে, পুরস্কার বিতরণের দিন লেখকের সঙ্গে একান্ত একটা সেশনের আয়োজন করবেন। যেখানে তিনি তার সহধর্মিণীকে এনে চমকে দিবেন। স্ত্রী তার দেওয়া এ উপহারের কথা আজীবন মনে রাখবে।
আজ সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণা হচ্ছে। পূর্বনির্ধারিতভাবেই এ বছর পুরস্কার পাচ্ছেন কাজী আমানত উল্লাহ। তবে আজ এ পুরস্কার নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন তুলছে না। কারণ পুরস্কার যিনি পাচ্ছেন, তিনি এ ধরাধামে নেই। মরণোত্তর পুরস্কার নিয়ে সাধারণত কেউ কথা বলতে চায় না। মৃত মানুষের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। বরং সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই আমানত উল্লাহকে পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্তকে বাহবা দিচ্ছে। এটাকে ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ বলছে কেউ কেউ। সিলেকশন কমিটির সবাই উল্টো এখন শরাফত আলীর বিচক্ষণতার তারিফে ব্যস্ত। একমাত্র শরাফত সাহেবেরই মন খারাপ। তার স্ত্রীকে শেষপর্যন্ত চমকটা দিতে পারলেন না। একটা সুন্দর মুহূর্তের ছবি তিনি কল্পনা করে রেখেছিলেন, সেটি মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই ‘ছবি’ হয়ে গেলেন কাজী সাহেব।
ওপার থেকে মুচকি হাসছেন কাজী আমানত উল্লাহ। মৃত্যুর পর বাস্তবিকই তিনি ‘লেখক’ হয়ে উঠেছেন। বেঁচে থাকলে তার এ ‘লেখক’ হওয়াটা কষ্টকল্পনা ছিল। পুরস্কার-টুরস্কার তো আরও পরের ব্যাপার। তবে তিনি ভাগ্যবান এটা মানতেই হবে। শেষপর্যন্ত তিনি পেরেছেন। জাবরুন নাহার নামক এক বিশেষ পাঠিকার মন জয় করে পুরস্কার পর্যন্ত পৌঁছে যেতে। এমন ভাগ্য কজন লেখকের হয়! আফসোস এটুকুই, জাবরুন নাহারকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে যেতে পারলেন না!