রাতভর পুব আকাশের ঘাড়ের ওপর এক খণ্ড কালো মেঘ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সুবহে সাদিকের আলো ফুটে উঠতেই দৃঢ় প্রতীজ্ঞ মেঘ খণ্ডটি কোথায় যেন গায়েব হয়ে যায়। মেঘের প্রস্থান কিংবা পলায়নে বনু কালবের গুচ্ছ গুচ্ছ তাঁবুর ওপর আয়েশ করে হাত-পা ছড়ায় সুবহে সাদিকের আলো। এ সময় দায়িত্বরত মুয়াজ্জিন টিলার ওপর দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে আজান ফুঁকলে চারপাশে প্রাণের সাড়া পড়ে যায়। আস্তাবলে চিঁহি করে ডেকে ওঠে এক পাল ঘোড়া। সিদর গাছের মগডাল থেকে ভেসে আসে বাজপাখির দীর্ঘশ্বাসমাখা আর্তনাদ। প্রতিটি তাঁবুর পর্দা নাড়িয়ে পুব থেকে পশ্চিমে হেঁটে যায় মিষ্টি বাতাসের ঝাঁক। আজানের শব্দ কানে পড়তেই ধড়মড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে বসেন মাইসুন। আড়মোড়া ভেঙে চামড়ার মশক হাতে তাঁবু থেকে বের হন তিনি। পুবাকাশে আলোর রেখা পরখ করে কাঠের তক্তার ওপর ব্যস্ত ভঙ্গিতে ওজু করতে বসেন তিনি। এরপর তাঁবুতে ফিরে এসে ফজরের জায়নামাজে দাঁড়ান।
ঐতিহ্যগতভাবে বনু কালব খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। খ্রিষ্টান বলেই রোমানদের সাথে তাদের মিত্রতার ইতিহাস বহু পুরনো। পরে আরবে ইসলাম ধর্ম ছড়িয়ে পড়লে গোত্রটির অনেকে নতুন এ ধর্মে দীক্ষিত হয়। হজরত ওমরের যুগে বনু কালবের যে কয়টি পরিবার সানন্দে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে, মাইসুনের পরিবার তাদের অন্যতম। এখন এই বেদুইন পল্লীতে বনু কালবের খ্রিষ্টান ও মুসলিম পরিবারের যৌথ বসবাস। ফলে এই পল্লীতে যেমন আজানের ধ্বনি শোনা যায়, শোনা যায় গির্জার ঘণ্টাধ্বনিও।
ভোরের পবিত্র মুহূর্তটায় মাইসুনের তাঁবুতে থাকতে ইচ্ছা করে না। ভোরের মতো দুর্বার সুন্দর মুহূর্তটি যদি তাঁবুতেই কাটাতে হবে, তবে দামেশকের সবুজ প্রাসাদ কেন ত্যাগ করলেন তিনি! মাইসুন নামাজ পরবর্তী দোয়া-জিকির সেরে তাঁবু থেকে বের হয়ে আসেন। দু কদম সামনে গিয়ে কী ভেবে আবার উঁকি দেন ভেতরে। দেখেন, তাঁবুর নরম বিছানায় ঘুমিয়ে আছে ইয়াজিদ। মাইসুনের বুকের ভেতর কীসের যেন তোলপাড় হয়। এগারো বছরের ছেলেটার ঘুমন্ত মুখের দিকে যখনই তিনি তাকান, চেনা তোলপাড়টা বারবার ফিরে ফিরে আসে বুকের ভেতর। তার কেবলই মনে হয়, বাবা মোয়াবিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার জন্যই তার জন্ম হয়েছে। মাইসুন ছেলের কপালে একটা চুমু খান। এরপর দরজার পর্দা ভালো করে টেনে দিয়ে যখন বাইরে বেরিয়ে আসেন, ততক্ষণে সূর্যের কোমল আলো ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে। আকাসিয়ার ঝোঁপের ওপর জমে থাকা প্রর্থনামগ্ন শিশির সূর্যের আলোয় ঝকমক করছে। সিদর গাছের নিচে ছেঁড়া ছেঁড়া বড় বড় ঘাসের আচ্ছাদন। তার এক পাশে কুয়া। মাইসুন ঘাস মাড়িয়ে কুয়াকে পেছনে ফেলে চারণভূমির দিকে কদম বাড়ান। একটি টিলার ওপর দাঁড়িয়ে লম্বা শ্বাসে ফুসফুস ভর্তি করেন তিনি। দূরে উঁচু উুঁচ পাহাড়, কোথাও পাথুরে মালভূমি, দিগন্তজোড়া ধূসর-হলুদ প্রান্তর, একদিকে কালচে আগ্নেয় পাথরের স্তূপ, আবার কোথাও নুড়ি বিছানো সমতল মাটি—প্রকৃতির এই বিচিত্র রূপ মাইসুন যতবার দেখেন, নতুন আলোয় সজীব হয়ে ওঠেন। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য তার চোখে কখনো পুরনো হয় না।
দূরে পাহাড়ের ওপর একটি ধ্যানমগ্ন বাজপাখি উড়ছে। পাহাড়ের ওপাশে পানির শীর্ণ খাল, বর্ষাকালে যা ফুলে ফেঁপে টুইটম্বুর হয়ে ওঠে। বাজপাখির অস্তিত্ব বলে—খালের পেটে পানির একটি ধারা এখনো বহমান আছে। মাইসুনের একবার মনে হয়, পাহাড়ের ওদিকে যাবেন। কিন্তু সাহসে কুলায় না। জায়গাটা এতটাই নির্জন, হঠাৎ বন্য কোনো প্রাণী বেরিয়ে এলে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। পাহাড়ে যাওয়ার ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তিনি টিলার ওপর পা ছড়িয়ে বসেন। দামেশকের সবুজ প্রাসাদকে পেছনে রেখে বাবার বেদুইন পল্লীতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত ভুল মনে হয় না তার। মরুভূমির এই বিচিত্র জীবন তার কাছে প্রাসাদের চার দেয়ালে বন্দি জীবনের চেয়ে অনেক বেশি কমনীয়। মাইসুনের মনে হয়, আরো আগেই প্রাসাদ ত্যাগ করার দরকার ছিল তার। বিশেষত এই দুরন্ত মরুচারীর জীবনটাকে ইয়াজিদ যেভাবে আপন করে নিয়েছে, এই লাবণ্য আরো আগেই ইয়াজিদের হাতে অর্পণ করার দরকার ছিল। ভবিষ্যতে যে ছেলে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে, তার মনোদৈহিক দৃঢ়তা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস একমাত্র মরুজীবনই দিতে পারে।
হঠাৎ গর্ভকালের একটি মুহূর্ত মনে করে বিচলিত হয়ে পড়েন মাইসুন। মাইসুন তখন সাত মাসের গর্ভবতী। পেটটা প্রতিদিনই একটু একটু করে বড় করছে। অনাগত সন্তানের সজোর লাথি তুমুলভাবে উদযাপন করেন তিনি। ওই সময়ই ভয়ংকর দুঃস্বপ্নটা দেখেন মাইসুন। দেখেন বিশাল এক রক্তের নদী। উত্তর থেকে দক্ষিণে বয়ে চলেছে। সেই রক্তনদীর কূলে হাঁটু গেড়ে বসে আছে এক যুবক। ধীরে ধীরে যুবক তলিয়ে যাচ্ছে রক্তের নদীতে। প্রথমে হাঁটু তারপর উরু এরপর কোমর। যুবক গলা পর্যন্ত তলিয়ে গেলে ঘুম ভেঙে যায় মাইসুনের। ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন তিনি। ঢকঢক করে পানি খেয়ে যতক্ষণে তিনি শান্ত হন, তখন তার মনে হয়, এই যুবক আর কেউ নয়, তার গর্ভের সন্তান। স্বপ্নটা মাইসুনকে এতটাই ভীতবিহ্বল করে, আজ পর্যন্ত কারো কাছে বর্ণনা করেননি তিনি। এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা কী?
চড়চড় করে গরম হতে থাকে সকালের রোদ। ধীরে ধীরে টিলার মাথাটা সোনালি আলোয় চকচক করে ওঠে। মাইসুন আর বসেন না। তিনি স্বপ্নটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে লোকালয়ের দিকে হাঁটতে থাকেন। পথের মাঝে দুই কিশোরীর সাথে দেখা হয়, তারা সিদর গাছের ফল পাড়তে এসেছে। মাইসুন নিজেও এক মুঠো সিদর পেড়ে ওড়নার প্রান্তে বেঁধে নেন। তারপর কুয়া আর লম্বা ঘাস পেরিয়ে ফিরে আসেন আপন ঠিকানায়। এতক্ষণে নীরব পল্লীটা পুরোদমে জেগে উঠেছে। কিশোর-কিশোরীরা মটকা হাতে পানি আনতে যাচ্ছে কুয়ার পাড়ে। চাকরেরা উট ও ঘোড়ার খাবার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাখালের দল ভেড়ার পাল নিয়ে চারণভূমির দিকে যাচ্ছে। প্রত্যেক তাঁবুর সামনে জ্বলছে চুলা, মাটির হাঁড়িতে তৈরি হচ্ছে সকালের খাবার। মাইসুনের তাঁবুর সামনে মাটির চুলায় রান্না চাপিয়েছে তার দাসী। ভেড়ার মাংসের গন্ধে চুলার পাশটা ম ম করছে। দাসীকে রুটি বানাতে বলে তাঁবুর ভেতর ঢোকেন মাইসুন। ঢুকেই ধাক্কা খান তিনি—বিছানায় ইয়াজিদ নেই। বাইরে এসে তিনি কয়েকবার ইয়াজিদ ইয়াজিদ বলেন ডাকেন। কিন্তু ইয়াজিদের কোনো সাড়া নেই। কোথায় গেল ছেলেটা! মাইসুন দাসীর কাছে জিজ্ঞেস করতে যাবেন, তখন দেখেন আস্তাবল থেকে লাগাম হাতে বের হচ্ছে ইয়াজিদ। পিঠে ঝুলছে তিরভর্তি তূণ ও ধনুক। চেহারায় ঝলমল করছে সকালের আলোর দীপ্তি।
মাইসুন ছেলের কাছে এগিয়ে যান। ঘোড়ার গলায় হাত বোলাতে বোলাতে বলেন, এত সকালে কোথায় চললে, বেটা?
শিকার করতে। ইয়াজিদ জিন ঠিক করতে করতে উত্তর দেয়।
যাও। তবে যাওয়ার আগে খেয়ে যাও।
খেয়ে গেলে শিকার জুটবে না। ইয়াজিদ মুখে মায়ের কথার জবাব দেয় আর হাত দিয়ে রেকাবের দৃঢ়তা পরখ করে।
জুটবে না কেন?
পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো শিকারী তারাই, যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত।
কিন্তু তুমি আজ পর্যন্ত একটাও শিকার করতে পারোনি।
পারিনি, পারব। আমি এখনো শিখছি, মা।
কিন্তু ঘোড়াটাও তো ক্ষুধার্ত।
তার খাবারের দায়িত্ব আমার। আপনি আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন না। বলতে বলতে রেকাবে পা রেখে ঘোড়ার জিনের ওপর লাফিয়ে ওঠে ইয়াজিদ। মা আরো কিছু বলতে যান, কিন্তু ইয়াজিদ সেই সুযোগ দেয় না। দূরের পাহাড়কে লক্ষ্য বানিয়ে দক্ষ ঘোড়সওয়ারের মতো সে ঘোড়া হাঁকায়। অল্পক্ষণে ঘোড়ার খুরের শব্দ মিলিয়ে যায় তেপান্তরে। মাইসুনের দৃষ্টিসীমার বাইরে হারিয়ে যায় ইয়াজিদ ও তার ঘোড়ার ছায়া।
দাসীর রান্না শেষ হতে হতে ক্ষুধা তীব্র হয়ে ওঠে মাইসুনের পেটে। কিন্তু ছেলে খালি পেটে শিকারে বেরিয়েছে, মাইসুনের তাই খাওয়া হয় না। তিনি ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। মা যখন তাঁবুর মধ্যে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছেন, ছেলে তখন নিজেকে সঁপে দিয়েছে মরুভূমির কোলে। সবুজ টিলা, বালিয়াড়ি আর কালচে আগ্নেয় পাথরের স্তূপ পেরিয়ে ছেলের ঘোড়া ছুটে চলেছে সেই পাহাড় সারির দিকে, যার ওপাশে বয়ে গেছে শীর্ণ খালের ধারা। এই পাহাড়ঘেঁষা খালটাই ইয়াজিদের সবচেয়ে প্রিয় শিকারক্ষেত্র। সে জানে, প্রতিটি সকালে একপাল গজেল এই খালে পানি খেতে আসে। গজেলের মতো চতুর ও সতর্ক প্রাণী দ্বিতীয়টি দেখেনি ইয়াজিদ। বাতাসে ঘাসের ডগা নড়ে উঠলেও ওরা ছুটে পালায়। গেল দুই মাস ধরে শিকারের চেষ্টা করছে ইয়াজিদ। কিন্তু এখনো সে সফল হতে পারেনি। প্রথম প্রথম নানার সাথে আসত সে। নানাকে সে অনায়াসে অনেক গজেল শিকার করতে দেখেছে। সেই থেকে ওর জেদ আরো বেড়েছে, নানা পারলে সে কেন পারবে না! এখন সে আর নানার সাথে না, তেপান্তর পেরিয়ে একাই সে চলে আসে এখানে। হৃষ্টপুষ্ট শিকারের জন্য ওত পেতে থাকে। কিন্তু প্রতিবারই যা হয়, ধনুকে তির সংযোগ করতে করতে পালিয়ে যায় শিকার।
আজ পাথুরে পাহাড়ের ঢালে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নামে ইয়াজিদ। তূণে সাজিয়ে রাখা তিরগুলো পরখ করে নিয়ে আকাসিয়ার ঝোঁপের সাথে ঘোড়াটাকে বাঁধে। ক্ষুধার্ত ঘোড়া আকাসিয়ার পাতা মুখ বাড়িয়ে খায়। আকাসিয়ার কষের গন্ধ নাকে গেলে ইয়াজিদ বোঝে, ঘোড়ার মতো সেও ক্ষুধার্ত। ঘোড়ার কেশরে আদর বুলিয়ে সে ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠতে থাকে। পাহাড়ের ওপর থেকে খালের দীর্ঘ অবয়ব এক নজরে দেখে ফেলা যায়। কোথায় গজেলের দল চলাফেরা করে, সেটাও খুব সহজে শনাক্ত করা যায় পাহাড়ের ওপর থেকে। ইয়াজিদ আজ দৃঢ়প্রতীজ্ঞ। যে কোনো মূল্যে শিকার নিয়ে সে তাঁবুতে ফিরবে। আজ সে একবারে গজেলের মাংস দিয়ে মায়ের সাথে রুটি খেতে চায়।
পাহাড়ে উঠতে গিয়ে রুক্ষ আগ্নেয় পাথরে বারবার পা হড়কে যায় ইয়াজিদের। পাথরের ফাটল ও খাঁজে ছোট ছোট গাছ প্রাণের উচ্ছ্বাসে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বারকয়েক পা হড়কে পড়তে পড়তে সে গাছ ধরে নিজেকে সামলে নেয়। পায়ের চাপে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে ছোট ছোট নুড়ি। মানুষের পদশব্দে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এক মরু খরগোশ, ইয়াজিদকে দেখে সে ছুটে পালায় ঝোপের ভেতর। ধনুকে তির সংযুক্ত করার আগেই ইয়াজিদের দৃষ্টি থেকে হারিয়ে যায় খরগোশটি। আত্মসান্ত্বনা দেয় ইয়াজিদ—খরগোশ নয়, তার প্রথম শিকার হবে নাদুসনুদুস গজেল।
পাহাড়ে উঠতে উঠতে পিপাসা বেড়ে যায় ইয়াজিদের। চামড়ার মশক থেকে গলা ভিজিয়ে সে সূর্যের দিকে তাকায়। আজকের সূর্যের উত্তাপ কি একটু বেশি, নাকি সে আসতে আসতে বেলা করে ফেলেছে? পরিশ্রান্ত ইয়াজিদ একটি ঝোপের ছায়ায় বসে। এখান থেকে খালের পুরো রেখাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। প্রথম যেদিন সে নানার সাথে এখানটায় এসেছিল, তুমুল উত্তেজিত ছিল। অজানা ভয়ে গা করছিল ছমছম। মনে হচ্ছিল, যে কোনো মুহূর্তে পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসবে ভয়ংকর কোনো বন্য প্রাণী। নানা তাকে সাহস দিচ্ছিলেন। আসুক না সে, তার ভবলীলা সাঙ্গ করতে আমার একটা তিরই যথেষ্ট।
নানার সাথে যতবার সে শিকারে এসেছে, প্রতিবার সফল হয়েছে। কিন্তু যতবার সে একা এসেছে, খালি হাতে ফিরতে হয়েছে। ইয়াজিদ ভাবে, শিকারে সফল হতেও কি ভাগ্য লাগে? না হলে সে কেন একদিনও সফল হতে পারল না? তার ভাগ্যটাই কি মন্দ?
পাঁচ হাত সামনের পাথরের ওপর রোদ পোহাচ্ছে একটি গিরগিটি—খেয়ালই করেনি ইয়াজিদ। গিরগিটির রঙিন পিঠের ওপর চোখ পড়তেই চমকে ওঠে সে। একটি নুড়ি ছুড়ে মারার ভান করতেই গিরগিটিটি ছুটে পালায়। সূর্য ক্রমেই মাথার ওপর উঠে আসছে। খাটো হচ্ছে ঝোপের ছায়া। আরো কিছুক্ষণ থাকলে ইয়াজিদের মাথার ওপর আর কোনো ছায়াই থাকবে না। একবার সূর্যের দিকে তাকাতেই ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। ইয়াজিদ জামার আস্তিনে চোখ মুছে খালের দিকে তাকায়। সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে পানির রেখা। হঠাৎ সে দেখতে পায়, ওপারের ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে একপাল গজেল। উত্তেজনায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় ইয়াজিদের। শিকারের প্রথম শর্তই হলো ধৈর্য। যে যতবড় ধৈর্যশীল, সে তত বড় শিকারী। ইয়াজিদ ধৈর্যশীল কি না জানে না। তবে এতক্ষণ গজেলের অপেক্ষায় চুপচাপ বসে থাকতে পেরেছে বলে নিজেকে সে ধৈর্যশীল হিসেবে মূল্যায়ন করে।
চারপাশ দেখে নিয়ে গজেলের দল ততক্ষণে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করেছে। ইয়াজিদের আর তর সহ্য হয় না। সে দ্রুত পাহাড় থেকে নেমে খালের দিকে চলতে থাকে। গজেল পালের ঠিক বরাবর খালের এপাশে একটি আকাসিয়ার ঝোপ। ঝোপটাকে ইয়াজিদের আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা আশীর্বাদ মনে হয়। ওই ঝোপের আড়ালে বসে খুব সহজেই নিশানা তাক করতে পারবে ইয়াজিদ। ইয়াজিদের মনে হয়, ভাগ্য আজ তার সাথে আছে। নইলে এই বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তরে ঝোপের ঠিক বরাবর ওদের পানি খেতে আসার কথা না। ইয়াজিদ অল্প সময়ে ঝোপের কাছে চলে যায়। তূণ থেকে তির বের করে ধনুকে লাগায়। ততক্ষণে একটি দুটি করে গজেলের দল পানিতে মুখ ডোবাতে শুরু করেছে। আল্লাহর নাম নিয়ে সে তির ছোড়ে। ভাগ্য সত্যি সত্যি আজ তার সঙ্গে আছে। খালের ওপারে তিরবিদ্ধ একটি গজেল পানির কূলে গোঙায় আর বাকিরা ছুটে পালিয়ে যায়। আনন্দে চিৎকার করে ওঠে ইয়াজিদ। সে সফল! সে সফল! মা এবং নানা আজ কত যে খুশি হবে! তখন তার বাবার কথা মনে পড়ে। মায়ের এক প্রকার জেদের কারণেই আজ সে মরুসন্তান। আজকের এই সাফল্যের কথা বাবাকে খুব বলতে ইচ্ছা করে। সে সিদ্ধান্ত নেয়, খুব শিগগিরই একদিন সে বাবার কাছে যাবে। তার শিকার-সাফল্যে বাবা নিশ্চয় খুশি হবেন।
আহত গজেলটাকে ধরতে ইয়াজিদ ধনুক ফেলে পানি ভাঙতে শুরু করে। পানির গভীরতা খুব বেশি নয়। স্বচ্ছ জলের নিচের নুড়িপাথর স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। খালের মাঝামাঝি পৌঁছানোর পর পাথরে পা ফস্কে হুড়মুড় করে পড়ে যায় ইয়াজিদ। তার পায়জামা ও আলোয়ান সম্পূর্ণ ভিজে যায় খালের পানিতে। যতক্ষণে সে নিজেকে সামলায় ততক্ষণে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য মঞ্চস্থ হচ্ছে ওই পারে। ইয়াজিদ অবাক বিস্ময়ে দেখে, কোত্থেকে উদয় হয়েছে একদল বণিক। তাদের সারা গায়ে সফরের চিহ্ন। চেহারা ধূলিমলিন। তারা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আহত গজেলটাকে জবাই করতে শুরু করেছে। পানির ভেতর থেকে চিৎকার করে ওঠে ইয়াজিদ—ওটা আমার শিকার। তোমরা কেন নিচ্ছো?
কাফেলার দলপতি ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। সাহস থাকলে এসে নিয়ে যাও।
ইয়াজিদ ভেজা চপচপে শরীরে ওদের সামনে দাঁড়ায়—এটা আমার।
ততক্ষণে জবাই হয়ে গেছে গজেল। দলপতি গজেলের উরু থেকে তির বের করে বলে, দেখ তো কিশোর, এটা তোমার তির কি না?
হতভম্ব ইয়াজিদের স্বপ্নভঙ্গ হয়। এটা তার ছোড়া তির না।
তুমি আর আমি একসাথে তির ছুড়েছিলাম। তোমারটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। দলপতি মাটি থেকে একটি তির তুলে ইয়াজিদের হাতে দেয়। কান্না পায় ইয়াজিদের। তকদির তার সাথে এই মশকরাটা না করলেও পারত।
কিন্তু তুমি কে বালক? এই নির্জন প্রান্তরে একাকী শিকার করতে এসেছো!
ইয়াজিদ একটু ভাবে। তারপর দ্বিধা নিয়ে নিজের অর্ধেক পরিচয় দেয়—আমি বনু কালবের সন্তান। শিকার আমার নেশা।
এইটুকু বয়স থেকেই?
ভালো শিকারীরা অল্প বয়স থেকেই অনুশীলন করে।
দ্বিতীয়জন এবার আলাপের ভেতর ঢোকে। বলে, কিন্তু এই বিজন প্রান্তরে এভাবে আর একাকী ঘুরে বেড়িও না, বালক।
কেন? ঘুরে বেড়ালে কী হবে?
খলিফাতুল মুসলিমীন আলীর বাহিনী দামেশক আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমি আশংকা করছি, তুমি ওদের তরবারির নাগালে না পড়ে যাও!
আপনারা কারা? কোথা থেকে এসেছেন? আপনাদের কথা আমি কেন বিশ্বাস করব? তেজি কণ্ঠে বলে ওঠে ইয়াজিদ।
আমরা বণিক দল। মদিনা থেকে এসেছি। গন্তব্য দামেশক। আমরা মদিনাবাসীকে তরবারি শান দিতে দেখে এসেছি। অচিরেই তারা দামেশকে হামলা করবে।
কিন্তু কেন হামলা করবে?
কারণ, শামের আমির মোয়াবিয়া আলীর হাতে বাইয়াত হননি। মোয়াবিয়া শর্ত দিয়েছেন, যতদিন না ওসমানের হত্যাকাণ্ডের বিচার করছেন আলী, ততদিন তিনি বাইয়াত হবেন না।
ধন্ধে পড়ে যায় ইয়াজিদ। লোকগুলোর কথায় এমন আত্মবিশ্বাস, মনে হয় না তারা মিথ্যা বলছে। আর তার মতো এক অচেনা কিশোরের কাছে শুধু শুধু তারা মিথ্যাই বা বলবে কেন! বাবার জন্য দুশ্চিন্তা ফেনিয়ে ওঠে ইয়াজিদের মনে। দামেশকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানে তার বাবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। না, বাবার এই বিপদের দিনে সে শিকারের পেছনে পড়ে থাকতে পারে না। শিকার অতি তুচ্ছ কাজ। আর এমন সময়ে সে মায়ের সাথে বেদুইন পল্লীতেও থাকতে পারে না। এখন তার একমাত্র গন্তব্য হওয়া উচিত দামেশক। হ্যাঁ, আজই সে দামেশকে ফিরবে। এবং এই কাফেলার সাথেই।
আমি আপনাদের সাথে দামেশক যেতে চাই।
দামেশক কেন? তুমি না বললে বনু কালব তোমার বসতি!
ওটা আমার নানাবাড়ি। শামের আমির মোয়াবিয়া আমার বাবা। আমি বাবার কাছে ফিরতে চাই।
তুমি মোয়াবিয়ার ছেলে! তোমার চেহারা দেখে আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম, তুমি অভিজাত পরিবারের সন্তান।
আমাকে নেবেন আপনাদের সাথে? খালের ওই পারে আমার ঘোড়া বাঁধা আছে।
কিন্তু মাকে বলতে হবে না?
দামেশক পৌঁছে আমি দূত পাঠিয়ে দেব।
তবে চলো আমাদের সাথে।
সেই ভেজা কাপড়ে অচেনা বণিক দলের সাথে ইয়াজিদ রওনা করে দামেশকের উদ্দেশ্যে। ওদিকে বনু কালবের তাঁবুতে ভেড়ার মাংস আর গরম রুটি নিয়ে অপেক্ষা করে তার মা। মায়ের অপেক্ষা ফুরায় না, তার আগেই রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে ইসলামি দুনিয়ায়।
২১ জুলাই, ২০২৬
কারবালার পথে— পুরোটাই তাহলে আসছে… ইন শা আল্লাহ