ছিন্নপাতাল

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

রাজশাহীর দুপুরগুলো বড় একঘেয়ে। বিশেষ করে যখন শিরোইল থেকে কোর্ট স্টেশন পর্যন্ত তপ্ত বাতাস বয় তখন মনে হয় শহরটা কোনো এক প্রাচীন অভিশাপে দাউদাউ করে জ্বলছে। এর মধ্যেই থাকে ফরহাদ। সে একটা স্কুলে বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায় আর রাত জেগে হেতম খাঁ কলাবাগান এলাকার একটা ছয়তলা পুরোনো বিল্ডিং-এর এক চিলতে চিলেকোঠার ঘরে বসে লেখালেখি করে। একাই থাকে। তার সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানা যায় না। সে নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষ মনে করে। সে মনে করে জাগতিক কোনো ঘৃণা বা প্রেম তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারে না।

একদিন বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে ফরহাদ যখন প্রাচীন এক কষ্টি পাথরের মূর্তির গায়ে খোদাই করা স্তব্ধতার পরিমাপ করছিল চোখের নিক্তিতে, সেই সময় হঠাৎ নীলার আবির্ভাব ঘটে।

নীলা। পরনে নীল জামা, চোখে কাজল আর ঠোঁটে কেমন এক তাচ্ছিল্যের হাসি। সে ফরহাদকে সরাসরি বলে, ‘পাথরের স্তব্ধতা দেখে কী হবে, মিস্টার? জ্যান্ত মানুষের পাথর হয়ে যাওয়া দেখেছেন কখনো?’

নীলা ফরহাদের চেনা সব নারীর থেকে ভিন্ন। সে এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগে পড়ত; কিন্তু এক অধ্যাপকের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে এমন এক বাজে ব্যাপার ঘটেছিল যে তাকে মাঝপথে পড়াশোনা ছাড়তে হয়। ফলে সে এক ধরনের ভয়ানক ক্লান্তি নিয়ে বেঁচে আছে।

নীলা একদিন ফরহাদকে নিয়ে যায় পদ্মার পাড়ে, যেখানে বাঁধের ওপর সূর্যাস্ত দেখতে মানুষ ভিড় করে।

‘আপনি তো লেখক। আমাকে নিয়ে গল্প লিখবেন? কিন্তু পারবেন না। কারণ আপনি তো নিজেকে পরিপূর্ণ ভাবেন। যার ভেতরে ফাটল নেই, সে অন্যের ক্ষত বুঝতে পারে না।’ নীলার কণ্ঠে বরফ শীতলতা।

ফরহাদ শান্তভাবে জবাব দেয়, ‘শৈশবে অ্যাবিউজ বা রেইপের ঘটনা এ দেশে তো কমন। আমি জানি এইসব।’

নীলা ফুঁসে ওঠে, ‘জানেন! জানলে আপনার ‘ছিন্নপাতাল’ উপন্যাসের মেয়েটাকে অধ্যাপকের ঘরে কেন পাঠালেন? কেন দেখালেন সে স্বেচ্ছায় গেল? বাস্তবে কোনো নারী ওভাবে যায় না, তাকে পরিস্থিতির গোলকধাঁধায় ঠেলে দেওয়া হয়।’

রাত নামে। আকাশে চাঁদটা দেখে কেমন বিবমিষা জাগে, চাঁদ নয় যেন জন্ডিস রোগীর চোখ। নীলা ফরহাদকে প্রস্তাব দেয় নৌকায় করে পদ্মার ওপারের চরে যাবার। মাঝিকে দ্বিগুণ টাকা দিতেই রাজি হয়ে যায়।

মাঝনদীতে পৌঁছাবার পর মনে হয় নদী আছে, কিন্তু জল নেই, মনে হচ্ছে তারা যেন রুপালি কোনো তরল পারদের ওপর দিয়ে ভাসছে। দূরে চরের বালু সমস্ত হঠাৎ করে গণিত মানুষের আকৃতি নিতে শুরু করে, পিঁপড়ের মতো আদম সন্তানের ঝাঁক।

নীলা দাঁড়িয়ে পড়ে নৌকায়। তার চুল ওড়ে জাতীয় পতাকার মতো, ‘ফরহাদ, আপনি বলেছিলেন না শৈশবের ট্রমা মানুষকে চূড়ান্ত নিহিলিস্ট করে দেয়? আমার ট্রমা শৈশবে নয়, আমার ট্রমা প্রতিদিনের এই বেঁচে থাকায়। এই দেশে সবাই ছাগল, আপনিও তাদের একজন। আপনি দেশ ছেড়ে বাইরে যেতে পারতেন, কিন্তু, কারণ আপনি আপনার পরিপূর্ণতার জেলখানায় বন্দি।’

হঠাৎ নীলা তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে। ফরহাদের প্রথম উপন্যাস, ‘ছিন্নপাতাল’। সে বইটার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নদীর স্রোতে ফেলতে থাকে আর বলে, ‘আপনার উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট নিজেকে পরিপূর্ণ বলে দাবি করে, অথচ আগাগোড়া সে মানসিক ভঙ্গুরতার চরম সীমায়। সে আসলে একটা ভীরু। আপনিও ভীরু।’

ফরহাদ নীলার হাত ধরতে যায়। কিন্তু তার মনে হয় নীলার শরীরটা ধোঁয়া দিয়ে তৈরি। সে যতই ধরতে যায়, নীলা ততই দূরে সরে যায়, ‘নীলা, থামুন! জীবন গোছাতে যে সুযোগ লাগে, হয়তো তা আপনি পাননি। কিন্তু এভাবে নিজেকে শেষ করে দেবার তো কোনো মানে হয় না।’ ফরহাদের কণ্ঠ জীবনে প্রথমবারের মতো কেঁপে ওঠে।

নীলা হাসে। ভয়ানক আর্তনাদ মেশানো সে হাসি, ‘সুযোগ? সুযোগ তো আপনিও পাননি, মিস্টার রাইটার। আপনি রাজশাহী শহরের একটা ছাদের ঘরে পচে মরছেন একতরফা আত্মত্যাগের গল্প লিখে লিখে। আপনি নিজেকে বড় করে দেখছেন। আসলে আপনি শূন্য।’

হঠাৎ নৌকাটা এক প্রবল ঘূর্ণিপাকে পড়ে। অথচ খানিক আগেও নদী ছিল শান্ত। সেই ঘূর্ণিতে নৌকার তলা ফেটে জল ঢুকতে থাকে। কিন্তু সেই জল সাধারণ জল নয়, সেই জল কালির মতো কালো, যেন নীলার চোখের সকল কাজল জলে মিশে গেছে।

নীলা নৌকা থেকে ঝাঁপ দেয়। ফরহাদ তাকে বাঁচাতে জলে নামে, কিন্তু দেখে জলটা আসলে অর্বুদ অক্ষরের সমাবেশ। তা-ই বইয়ের অক্ষর। সে সাঁতার কাটতে পারে না, অক্ষরগুলো তাকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যায়। আর ডুবে যেতে যেতে সে অপার বিস্ময়ে দেখতে পায় নীলা অদূরে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে। তার শরীর থেকে জোছনা ঝরে পড়ছে।

পরদিন ভোরে ফরহাদকে পাওয়া যায় পদ্মার পাড়ে, বালির ওপর অচেতন পড়ে আছে। তার ডান হাত নেই, কনুই থেকে। হয়তো কোনো মাছ খেয়ে গেছে কাল রাতে। লোকজন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

হাসপাতাল থেকে একদিন ফরহাদ ফিরে আসে তার হেতম খাঁ কলাবাগানের ছাদের ঘরে। সে তার ঘরের মেঝেতে ছড়ানো রং, তুলি আর সাদা ক্যানভাসের দিকে তাকায়। তারপর নিজের কাটা ডান হাতের দিকে। সে আর কখনো এই হাতে ছবি আঁকতে পারবে না। তারপর দেখে তার টেবিলের ওপর রাখা তার লেখা বই আর পাণ্ডুলিপির পাতা সব সাদা হয়ে গেছে, একটা অক্ষরও নেই।

ছয়তলা পুরোনো বিল্ডিংটার নিচের গলিতে শহরের মানুষগুলো আগের মতোই ছোটে। তারা কেউ জানে না, মানুষের সব থেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো নিজেকে বুঝতে পারার ভান করা। ফরহাদ তার বাম হাতে একটা ব্রাশ তুলে নেয়, কালো রঙের পটে ডোবায়। আর সাদা ক্যানভাসে একটা কালো বিন্দু আঁকে। তার মনে পড়ে নীলার শেষ কথাগুলো—‘দেশ ছেড়ে চলে যান…’।

ফরহাদ বিড়বিড় করে নিজের মনেই বলে, ‘আমার কোথাও যেতে মন করে না।’

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments