সাথিদের কাছে ফিরেন মওলানা। ওয়াজেদের পাশে দাঁড়াইয়া আছে ওরা।
‘এইভাবে দিন কাটাইলে চলবে না। আমাদের কাশ্মিরের জিহাদে যাওয়া উচিত। ওইখানে আমাদের পাঠান ভাইয়েরা কাফেরদের সঙ্গে লড়াই করতেছে। এখানে তো আমাদের কান্দাকাটি ছাড়া আর কিছুই করার নাই।’ গম্ভীর স্বরে বলেন মওলানা গিয়াস।
‘একদম ঠিক। আমি তো কয়দিন ধইরাই বলতেছি এখানে রেযাকারদের অভাব নাই। যেখানে হক-বাতিলের ফয়সালা হইতেছে, যাওয়া দরকার সেখানে।’ বলে মওলানার এক বিশালদেহী সঙ্গী।
‘নাও ভাই, এইটা পরো। তোমার কুর্তাটা ছিঁড়া ফালাফালা।’ মওলানা গিয়াস প্ল্যাটফর্মে পইড়া থাকা কাপড়ের স্তূপ থেকে একটা কুর্তা তুইলা দেন ওয়াজেদের দিকে।
ওয়াজেদ যখন কুর্তা খোলে, তার পিঠের দাগ দাগ জখম দেইখা চমকাইয়া ওঠে সবাই। এক নারী রেযাকার ফুঁপাইয়া ওঠে দুঃখে।
‘উফ, জালেম হিন্দুরা আমাদের ভাইরে কী নির্দয়ভাবে মারছে,’ ফুঁপাইতে ফুঁপাইতে বলে সে।
কিছু বলার হিম্মত হয় না ওয়াজেদের। চুপ থাকাই ভালো। এই ভালো মানুষেরা যা বোঝার বুঝুক। শায়েদ আল্লাহ আমার উপর দয়া করছেন, ভাবে সে।
দুইজন রেযাকার ওয়াজেদরে স্টেশনের বাইরে নিয়া আসে একটা তাঁবুতে। সেখানে ওষুধ-পট্টি আর কার্বলিক লোশনের বাসনা। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলাইয়া বইসা আছেন একজন মধ্যবয়সী ডাক্তার। একটা খবরের কাগজ দিয়া বাতাস দিতেছেন নিজেরে। ওয়াজেদের জখমগুলা যখন উনি স্পিরিট দিয়া সাফ করেন, যেন সারা গায়ে আগুন ধইরা যায় তার। ব্যথায় কাতরাইয়া ওঠে ওয়াজেদ।
‘ধৈর্য ধরো, ভাই।’ কেউ একজন পাশ থেকে সান্ত্বনা দেয়।
‘একটু সহ্য করো ভাই, সব ঠিক হইয়া যাবে, খোদা মেহেরবান।’ বলে আরেকজন।
মলম-পট্টি লাগানো শেষ হয়। দুইটা রুটি আর তরকারি আসে খাবার। তাতে পেটের আগুন খানিকটা নিভে। শরীর একটু আরাম দেয়।
শোয়ার জন্য জাজিম আসে একটা। তা বিছাইয়া প্লাটফর্মের একপাশে শরীর ফেইলা দেয় ওয়াজেদ। জখমের জ্বালা আর দিনভর থকানের মারে আপনা থেকে চোখ বুইজা আসে তার।
দিন গড়াইয়া সন্ধ্যা নামে। থাইকা থাইকা ট্রেন আসে একেকটা। ফের শোরগোলে গমগম করে প্লাটফর্ম। ওয়াজেদের চোখ খুইলা যায়। ট্রেন থেকে যারা নামে সবাই হিন্দুস্তানি মোহাজের আহত নির্বাক নিপীড়িত বিপর্যিত; না আছে তাদের বর্তমানের খবর, না ভবিষ্যতের। অর্ধমুদিত চোখে ওয়াজেদ দেখে রেযাকারেরা একে অপরকে ডাকতে ডাকতে ছুইটা যাইতেছে। ঝিলাম শহরবাসী যেসব খাবারপানি কাপড় শরবত চাটাই চাদর দিছে, অকাতরে বিলি হইতেছে সেসব।
মোহাজেরদের ভিড়ে সবচে বুকফাটা আর করুণ আহাজারি তাদের যারা আপনজন হারাইছে। ওয়াজেদের ঠোঁটে কোনো আহাজারি নাই, কোনো শেকায়েত নাই। কোনো ছলচাতুরি আর ফেরেববাজি ছাড়াই সে সর্বস্বান্ত একজন মোহাজের হিসাবে কেরার পাইছে। তার অতীত নিয়া কারও কোনো দিল্চসপি নাই। কাল কী হবে, কোথায় যাবে, কী করবে তা নিয়া ভাবনা নাই তারও। স্টেশনে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই আছে, দুইবেলা রুটি আছে, এবং নিরাপত্তাও। খোদাতালা তারে ত্যাগ করেন নাই। এখনও তিনিই তার হেফাজতকারী।
প্লাটফর্মে নামাজের জন্য কাতার সাজানো আছে। ওয়াক্ত হইতেই নারী-পুরুষ-শিশুরা নামাজে দাঁড়াইয়া যায়। জর্জরিত দেহে শামিল হয় ওয়াজেদও। নামাজ শেষে দরদি গলায় দোয়া করে, লাগাতার আঁসু বহায় : খোদা মেহেরবান, আমারে মাফ করেন, রহম করেন, আমারে দয়া করেন।
রাত হইয়া আসে। জ্বইলা ওঠে প্লাটফর্মের সব বিজলিবাতি। রাশি রাশি অন্ধকারের ভিতর মরা আলো ছড়ায় ওগুলা। জ্বরের ঘোরের মতন রুগ্ন সেই আলো। মোহাজেরদের ভিড় ঘুমানোর তৈয়ারি করে। দমকা হাওয়ার সাথে ভাইসা আসে কয়লার ধোঁয়া আর পচা ফলের বাসনা। থাইকা থাইকা ইঞ্জিনের আর্তনাদ শোনা যায়।
লাল-সবুজ শিশা লাগানো লন্ঠন হাতে সাদা ইউনিফর্ম পরা এক রেল কর্মচারী ওয়াজেদের পাশ দিয়া চইলা যায়। হঠাৎ ট্রেন আসে একটা, ফৌজে ভরতি। দরজা খুলতেই লাফাইয়া নামে সিপাহিরা। সবার কাঁধে কাঁধে রাইফেল ঝুলানো, হাতে হাতে বিছানাপত্রের গাঁটরি। বুটের খটরখট আওয়াজ তুইলা তারা স্টেশনের বাইরে গিয়া সার ধইরা দাঁড়ায়। আগে থেকে একটা ফৌজি ট্রাক অপেক্ষা করতেছে ওখানে।
হইচই পইড়া যায় প্লাটফর্মে। উৎসুক নারী-পুরুষের দল রেলিংয়ে আইসা দাঁড়ায়, তাকাইয়া দেখে ওইদিকে। ওয়াজেদ ওঠে না। অবসাদ আর যাতনার ভারে জর্জরিত দেহে অস্থিরভাবে এইপাশ-ওইপাশ করে শুধু। ফৌজিদের আগমন, লোকেদের হালচাল, এইসবে কোনো আগ্রহ পায় না সে। কিন্তু ওদিক থেকে হুকুমদারি আওয়াজে যেসব কথা ভাইসা আসে, ওগুলি শোনা এড়ানো যায় না।
‘অফিসারগণ! জওয়ানগণ! কাল পর্যন্ত আমরা যাদের দোস্ত মানতাম, আজ তাদের দুশমন মানা কঠিন। যাদের কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া আমরা বার্মার গহিন জঙ্গলে, সুদূর আফ্রিকা আর ইউরোপের কোন তেপান্তরের মাঠে লড়াই করছি, যাদের দুখদরদে আমরা সমান সমান শরিক হইছি, তারাই আজকে কাশ্মিরে আমাদের মোকাবেলায় আইসা দাঁড়াইতেছে। মনে রাখবেন সাথিগণ, পাকিস্তান এখন আমাদের দেশ। কাশ্মির পাকিস্তানের হিসসা। আজকে যদি আমরা দুশমনদের গোড়াতেই খতম না করি, তাহলে কালকে ওরা ঝিলাম বা রাওয়ালপিন্ডিতে থাকবে। যতই হোক আমাদের ভাই, আমাদের পড়শি, কেউ যদি আমাদের দেশের দুশমন হয় তাহলে সে আমাদেরও দুশমন। তারে খতম করা আমাদের উপর ফরজ। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’
‘জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ,’ জবাবি নারা লাগায় সিপাহিরা।
‘জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ,’ প্লাটফর্মের রেলিংয়ে দাঁড়ানো লোকেরাও লালকার দিয়া ওঠে।
‘ব্যাটেলিয়ান ডিসমিস,’ গর্জাইয়া ওঠে এক অফিসার। সিপাহিরা সারি ভাইঙা ট্রাকে উঠতে লাগে।
ওয়াজেদের পেরেশান জেহেন কিছু বুইঝা উঠতে পারে না।
‘কাশ্মিরে তুমুল লড়াই চলতেছে’, ‘ট্রাক যেদিকে গেল ওইটা মিরপুরের রাস্তা’, বলাবলি করে লোকেরা।
কাশ্মিরের জংগ আর জিন্দাবাদের নারা আর মোহাজেরদের ভিড় আর কোট ফাতাহ খানের মসজিদের উঠান আর হিমশীতল ঝরনা আর বিরান হাবেলি আর কামনার উথালপাথাল আর জালেম মজিদ আর মালিক জহিরের ফরমান আর শপাশপ চাবুকের ঘা আর ঝিলামের সবুজ জলরাশি সব একত্রে চোখের সামনে ঘুরতে থাকে আর চলতে থাকে ঘোরের ভিতরে। বেচাইন হইয়া পাশ বদলায় ওয়াজেদ। কিন্তু দিলে কারার আসে না। পুরানা জাজিমের নিচে জমিন অসহ্য শক্ত। শহরের তাবৎ মশা লাগে যেন এইখানে আইসা জড়ো হইছে। তাদের দংশন একেকটা ছোবলের মতন বিঁধে। যে পাতলা চাদর পাইছিল ওয়াজেদ তা দিয়া আপাদমস্তক নিজেরে ঢাইকা নেয়। শেষমেশ ব্যথাযাতনায় কাতর জিহ্বা নিথর হইয়া আসে। ভারী হইয়া আসা চোখের পাতা অবশেষে ঘুমের অন্ধকারে তলাইয়া যায়।
কয়েক দিন কাইটা যায় এভাবে। এরইমধ্যে ওয়াজেদের জখম শুকাইতে শুরু করছে। দুইবেলা ডাল-রুটি খাইয়া শরীর চাঙ্গা হইছে খানিকটা। কিন্তু জিভে যেন তালা পইড়া গেছে তার। কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছা হয় না। যে জিল্লতি সে সইছে, তা তার বাকশক্তি কাইড়া নিছে যেন। কেউ কথা বলতে গেলে ফ্যালফ্যাল তাকাইয়া থাকে শুধু।
দিনের বেলা প্ল্যাটফর্মের ছাদের নিচে বইসা থাকে ওয়াজেদ। রাতের বেলা এক আকাশ ভরা তারার দিকে মুখ কইরা শুইয়া থাকে। সময়ের নিরাময় তার জিল্লতির জখমগুলিরে একটু একটু কইরা যদিও ভরায় কিন্তু দিলের ভিতরটা শূন্যতায় খাঁ খাঁ করে, তনহায়ির এহসাস তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এত মানুষের ভিড়েও একাকী সে। না সে কারও আর না কেউ তার। চারপাশের বিষাক্ত শূন্যতার মাঝে নুরার স্মৃতিই যা একটু তারে উপশম দিতে পারে।
শতচেষ্টার পরেও নুরার ছবি মন থেকে সরাইতে পারে না ওয়াজেদ। রাত গভীর হইলে নুরা তার শিয়রের কাছে আইসা বসে। তার মাথা কোলে নিয়া তার চোখের তারার অতলে তাকাইয়া থাকে নিশ্চুপ। নুরার উষ্ণ আঙুলের পরশ সে অনুভব করে তার গালে, গলায় আর বুকের জমিনে। জিহ্বায় সেই মিষ্টি আমের স্বাদ আবিষ্কার করে যা নুরা কখনো কখনো নিয়া আসত তার জন্য। ওয়াজেদের মনে পড়ে কীভাবে তারা দুইজনে মিলা আম খাইত এবং সিক্ত অধর পান করত এবং মনে পড়ে উন্মোচন এবং মনে পড়ে সম্মিলন এবং মনে পড়ে সেই উত্তাল সময়ের কথা যখন কামনার শিখাগুলিরে আরও উসকাইয়া দিয়া এক অসহ্য সুখ ক্ষরণের তাড়নায় তড়পায় এবং ওয়াজেদের সব মনে পড়ে।
নুরা কোনোদিন তার কাছে কিছু চায় নাই। ওয়াজেদের সঙ্গই তার একমাত্র কামনা ছিল। তার চোখে ওয়াজেদ ছিল ফেরেশতাসম যে তার রুহে সুকুন ঢালে।
কখনো কখনো ওয়াজেদের মনে হয় নুরার তাসাব্বুর গুনাহ। কিন্তু অপারগ সে। নুরার ওজুদ সর্বত্র টের পাওয়া যায়। রাতবিরাতে নুরা হাত বাড়াইয়া ডাকলে ওয়াজেদের ঘুম ভাঙে। কোনো ট্রেন থামলে দেখা যায় যাত্রীদের ভিড়ে শাদানরে হাতে নিয়া নুরা হাঁটতেছে। মোহাজেরদের ভিড় ধীরে ধীরে কইমা আসছে কিন্তু তাদের মাঝেও এই যেন নুরা চোখের আড়ালে সইরা গেল। এই খেয়ালের দখল থেকে তার মুক্তি নাই।
যদি এভাবে একা না আইসা নুরারে সাথে নিয়া আসত, ভাবে ওয়াজেদ, তাহলে কত ভালো হইত, সুখদুখ জীবনে যাই আসুক, ভাগাভাগি কইরা নিত তারা। কয়েকবার সে ভাবছে, কোট ফাতাহ খানে যাবে, নুরারে সাথে নিয়া আসবে। কিন্তু পকেটে একটা পয়সা নাই। আর গেলেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই ভয়ও তার দুই পায়ে শিকল পরাইয়া রাখে। মজবুর হইয়া সে খোদার দরবারে মাথা ঠেকায়। আশা করে খোদা তারে মদদ করবেন, হয়তো নুরার মহব্বত দিল থেকে সরাইয়া দিবেন। খোদা মদদগার। আকছার নিজেরে বলে ওয়াজেদ।
মওলানা গিয়াস রোজদিন সাথিদের নিয়া মোহাজেরদের জন্য খাবারপানি আর কাপড়চোপড় নিয়া আসেন। সর্বহালতে তার জোশজজবা একইরকম থাকে। তার লালচে আর গম্ভীর চেহারায় কর্তৃত্বের ছাপ। কোনো রেযাকাররে অলসভাবে কাজ করতে দেখলে তিনি তিরস্কারের চোখে তাকান। কোন মোহাজেররে কোন কাপড় দেওয়া লাগবে তার হুকুম জারি করেন। তিনি প্ল্যাটফর্মের এইমাথা থেকে ওইমাথা চইষা বেড়ান এবং আহত মোহাজেরদের উপর নির্মম নিপীড়ন দেইখা হিন্দু আর শিখদের উপর ক্রোধ উগড়াইয়া দেন। তিনি নতুন মোহাজেরদের হালপুরসি করেন। তারা কোথায় যাবে কী করবে তার ব্যবস্থা করতে দফতর থেকে দফতরে চক্কর লাগান। স্থানীয় মুসলিম লিগ লিডারদের সঙ্গে তার উঠাবসা আছে। প্রায়শই তাদের সাথে নিয়া তিনি মোহাজের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুইরা বেড়ান। তার এই দরদমন্দি, এই জোশজজবা আর প্রেরণা-স্পৃহা তারে লিডার বানাইয়া দিছে। লোকেরা তার আগমনের অপেক্ষায় থাকে। রেযাকারেরা খুশি খুশি তার হুকুম তামিল করে।
মওলানা গিয়াস মাদরাসায় পড়াশোনা করছেন। দেশভাগের আগে তার খানদান কানপুরে থাকত। সেখানে বড়ো জুতার ব্যবসা ছিল তাদের। একবার ওইখানটায় যখন জিন্নাহ সাহেবের যাওয়া পড়ছিল তখন যেই ফিটনে চড়াইয়া তারে শহর ঘুরানো হইছিল, ভক্তিবশত সেই ফিটনের ঘোড়ার বন্দোবস্ত করছিলেন মওলানা গিয়াস ও তার এক বধির মামা। তারপর থেকে তিনি বাজারে বাজারে আর চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়াইয়া আগুনঝরা বক্তৃতা দিতেন। জোশে-জজবায় তার চেহারা রক্তিম হইয়া যাইত। অতি-উৎসাহী যুবকেরা তার নামে নারা লাগাইত, ‘মওলানা গিয়াস, জিন্দাবাদ।’ গিয়াস মানে ত্রাণ। মওলানা গিয়াসরে ত্রাতার ভূমিকায় দেখত তারা। সেই থেকে এই নাম।
দেশভাগের আগে লাহোর চইলা আসে তার পরিবার। আগুনঝরা বক্তৃতার জন্য রাতারাতি শহরত পাইয়া যান মওলানা। তার আসল নাম জানার জরুরত হয় না কারও। উনিও এই নামে খুশি। একুশ বছর বয়সে মওলানা হইয়া যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তার লালচে-ফরসা চেহারায় কালো দাড়ি মানায় বেশ।
লাহোরে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা তীব্র হইলে শিখ আর হিন্দুরা যখন পালাইতে শুরু করে, মওলানা গিয়াসের পরিবার সস্তায় একটা বড়ো বাড়ি পাইয়া যায় এবং দ্বীনি কিতাবাদি ছাপানোর জন্য একটা ছাপাখানা তাদের হাতে আসে। ঝিলামের আশেপাশের জমি উর্বর, খবর পাইয়া বেশ খানিকটা জমি কিনা নেয় তারা। এদিকটায় মওলানা গিয়াস যখন আসেন, কিষাণদের জানতোড় মেহনতের সবক দেন, কীভাবে তারা তাদের কাজের মাধ্যমে কওমের খেদমত করতে পারে, তার বয়ান পেশ করেন।
মোহাজেরদের ক্যাম্পে ঘুরতে ঘুরতে তার মনে হয়, তার বড়ো কিছু করা লাগবে। মাঝেমধ্যে তিনি এমনকি দেশের হাল ধরার কথাও ভাবেন এবং সেটা একেবারে অমূলক ভাবনাও নয়। এমন অনলঝরা বয়ান যার, এমন ছুরির ফলার মতন ধারদার জবান যার, মোহাজেরদের দুঃখের কাহিনিতে যার নির্ঘুম লাল শিরা-উপশিরা ভরা চোখে আঁসুর ঢল নামে, জিন্নাহ টুপি মাথায় ঘামে ভিজা শরীরে উজ্জীবিত সারাদিন যিনি ছুটাছুটি করেন, কখনো খাবার বিলি, কখনো মোহাজেরদের জন্যে তাঁবু খাটানো—এই যার দিনরাতের ব্যস্ততা, তিনি সত্যিকারের নেতা, সাচ্চা রাহবর। নয়া দেশ নয়া কওমের জন্য এমন পুরজোশ নেতাই তো চাই। মওলানা গিয়াসের অতএব বেশ নামডাক হইয়া গেছে। খবরের কাগজে কাগজে তার ছবি ছাপা হয়।