মোটা কাগজের বাকশোগুলো দুমড়ানো মোচড়ানো, কোনাগুলো একেবারে দেবে গেলেও ভেতরের ওষুধগুলো অক্ষতই দেখতে পাই। হাতে ধরতেই শীতল পরশ লাগে। শিশুদের জন্যে আসা এ্যাসিটামিনোফেন সিরাপের বোতল আমি বুকে জড়িয়ে ধরি। বাচ্চাদের জ্বরে একটুখানি স্বস্তি এবার আমরা দিতে পারব।
“আমাদের নাকি নতুন স্টক আসছে?” দরজার দিক থেকে আওয়াজ ভেসে আসে। পেছনে তাকিয়ে দেখি নূর। আনন্দে ওর গোলগাল চেহারাটা জ্বলজ্বল করছে। নূর আগে তিন বছর কাস্টোডিয়াল স্টাফদের একজন হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু যেবার প্রথম শহীদদের হাসপাতালে আনা শুরু হলো, তখনই ওকেও টুপ করে নার্সের দায়িত্ব ঘাড়ে তুলে নিতে হলো। নূরের কাছেই আমি ক্ষত সেলাই করা, ব্যান্ডেজ দেয়া আর রোগীর ফুসফুস থেকে তরল পদার্থ বইয়ে দেয়ার প্রথম পাঠ নিয়েছি। ওর স্নায়ু যেন লোহায় গড়া। অথচ হৃদয়টা পালকের চেয়েও কোমল।
ফ্লুক্লোক্সাসিলিনের একটা বক্স নেড়ে বলি, “হ্যাঁএএএ!”
ও আনন্দে চিৎকার করে, শুনে আমি হাসতে থাকি। এই আনন্দটুকু ভীষণ অদ্ভুত লাগে কানে, তবু স্বাগত জানাই।
“এক রোগীর কাছে যাইতে হবে। কিন্তু এই অলৌকিক কারবার আমি নিজে দেখতে চাইসি বলে আসছি।” বলে সে হাসে।
“তোমার কিছু লাগলে বইলো।”
“বলবোনে।” নূর চলে যায়। খালি তাকগুলো আমি ভরাতে ব্যস্ত থাকি বেশ কিছুক্ষণ। তারপর ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ১০ : ১৩ বাজে।
কেনান!
ওকে আমি নয়টায় আসতে বলেছিলাম। কিন্তু এখনো খবর নেই। উদ্বেগের ছটাটুকু কাটানোর জন্য আমি হাসপাতালে এক টহল দিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিই। হতে পারে ও এসে আমাকে খুঁজে পাচ্ছে না। সাধারণ ভঙ্গিতে সব রুমে ঘুরেও ওকে কোথাও না পেয়ে স্টকরুমে ফিরি আবার। ওর বোন এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়নি, হয়ত ভাইয়ের সহযোগিতা এখনো প্রয়োজন ওর। মুহূর্তেই আল্লাহর কাছে দুআ করি মেয়েটার সুস্থতার জন্য। আর ভাবি, শিফট শেষে এক পাতা প্যানাডল নিয়ে একবার ওদের বাসা থেকে ঘুরে আসব কি না। আমার ভেতরে কোথায়—আমার ভীষণ বোকা, আশাবাদী মনটা—একটুখানি খুশি হয়ে ওঠে কেনানকে দেখতে পাওয়ার কথা ভেবে।
জোর করে মাথা নাড়া দেই। নিজের সেই না হওয়া জীবন আর ওই জ্বলজ্বলে, উষ্ণ সবুজ চোখী লম্বা ছেলেটার কথা ভাবার সঠিক সময় আমার জীবনে আসেনি।
“গুড মর্নিং!” পেছন থেকে কেনান বলে ওঠে। বজ্রপাতের মতো কেঁপে ওঠে আমার ভেতরটা। নিজেকে শান্ত দেখানোর জন্য আমি ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাই। যাতে আমার চেহারায় ভেসে থাকা চিন্তাগুলো ও পড়ে না ফেলে।
সকালের শীতের প্রকোপ ওকেও বাধ্য করেছে পুরানা সোয়েটারের উপর আরেকটা জ্যাকেট চাপাতে। চৌকাঠে ভর দিয়ে দাঁড়ায় ও, দুই হাত বুকের কাছে বাঁধা। এলোচুল জড়িয়ে আছে ওর কানদুটোয়। শীতে চেহারা লাল হয়ে আছে। আর কাঁধে ঝুলে আছে একটা পুরনো ক্যানন ক্যামেরা।
“গুড মর্নিং,” জবাব দিয়ে গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি, আকুলতাটুকু যেন ঢেকে যায়। “দেরি হইলো যে? সব ঠিকঠাক? লামার কী অবস্থা?”
কেনানের হাসি দেখে আমার পেটের ভেতর প্রজাপতি ওড়ে। “সঅঅব ঠিক। লামার জ্বর চলে গেছে, আলহামদুলিল্লাহ। ইউসুফও এখন ভালো আছে। সকালে ওরা ঘুমায়ে ছিল, না উঠা পর্যন্ত আমি বের হইতে পারতেসিলাম না।”
এন্টিবায়োটিকের বক্সের উপর আমার আঙুল বেহালা বাজায়। “যাক, ভাল্লাগলো সবাই ভালো আছেন শুনে।”
“তা আছি,” বলে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে থাকে ও। আমার মনে হয় যেন ওর চাহনির ছোঁয়া সবখানে লেগে যাচ্ছে।
আবার মনে হয় দাঁড়িয়ে আছি সেই না হওয়া জীবনে, যখন আমাদের বিয়ের আলাপ হচ্ছে। ও দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, সকালের ঝটপট নাস্তা হাতে নিয়ে। দুটো তাজা হালুমি মানাকিশ—কাগজে মোড়ানো, পনিরমাখা গরম গরম রুটি। আর দুই কাপ যুহুরাত চা। চায়ে দেয়া পুদিনা পাতার সুবাসে সবটুকু বাতাস তাজা হয়ে গেছে। ও হয়ত খানিক ঠাট্টা করবে, গতরাতের স্বপ্নটা বলবে। কিন্তু চলে যাওয়ার আগে হাতে বা গালে চুমু খেতে পারবে না ও, কারণ আনুষ্ঠানিক বাগদান-বিয়ে সবই বাকী। তবু ওর হাসিতে ফুটে থাকবে পরিতৃপ্তি।
আনমনে ভাবি, ওরও কি এসব খেয়াল জাগে?
গলা ঝেড়ে প্রশ্ন করে ও, “আচ্ছা, যে ডাক্তারের অনুমতি লাগবে উনি কই?”
পলক ফেলে বাস্তব জগতে ফিরে আসি, “ও, হ্যাঁ!” এন্টিবায়োটিকের বাকশো নামিয়ে রেখে ওকে ইশারা দেই আমাকে অনুসরণ করতে। হলওয়ে ধরে আমরা মূল হলে যাই, ডাক্তার যিয়াদ সকালে সাধারণত এখানেই থাকেন।
“আচ্ছা, শোনেন,” একটা গভীর দম নিয়ে আমি বলতে শুরু করি। “যদিও এই কাজের আইডিয়াটা আমিই আপনাকে দিসি, তবে এখানে কিন্তু রিস্ক অনেক। এই সময়টা খুবই ভয়ংকর আর এইটা যে কিভাবে আপনারে এফেক্ট করবে আপনি কিন্তু তা জানেন না।”
ভ্রু কুঁচকে বলে, “যেমন? কেউ ধরায়ে দিবে?”
মাথা নেড়ে ওকে বলি, “এখানে সবাই— আমি যতদূর জানি—আপনার মতাদর্শই ধারণ করে। কিন্তু সেটা শুধু মুখের কথাও হইতে পারে। সেজন্য আপনার যদি মনে হয় যে আপনি করবেন না, তাহলে—”
“আমি করবো।” বাগড়া দেয় আমার কথায়। “আমি অনেক গভীরভাবে ভেবে দেখছি। আপনাকে আগেই বলছিলাম, কেউ রেকর্ড করতেছে কি করতেছে না, কাউকে চিকিৎসা দিচ্ছে কি দিচ্ছে না সেটা মিলিটারির কাছে বিষয় না। আমাদের সবাইকেই ওরা নির্যাতন করবে—মানে সবার কপালে পরিণতি কিন্তু একই। তাই আপনি যতটুকু রিস্কের মধ্যে আছেন, আমারও বিপদ অতটুকুই।”
গা শিউরে উঠে আমার। ওর কথায় ভুল নেই। হামযার যে পরিণতি হয়েছিল, একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে আমারও তাই হবে। ডাক্তার যিয়াদের হয়তো আরো মন্দ কিছু হবে, যেহেতু উনি এখানে হেড সার্জন।
“তাই, লড়াই করে যাওয়ার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প আমাদের কাছে নাই।” কেনান কথা শেষ করে, “ওদের থেকে আমি ভীতুর মতো পালায়ে বেড়াব না।”
কথাটা আমার ভেতরে কোথাও টুং করে বাজে, সেই ভাবলেশ লুকাতে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে ফেলি।
আমি ভীতুর মত পালায়ে বেড়াব না।
ডাক্তার যিয়াদকে পাওয়া গেলো এক রোগীর বিছানার পাশে। লোকটার হাত-পা সব ভারী ব্যান্ডেজ করা। বাম চোখটা ফুলে গিয়ে বুজে গেছে। একা বিছানায় শুয়ে শূন্য দৃষ্টি মেলে রেখেছে সামনে কোথাও। ডাক্তার যিয়াদের চেকআপ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করি।
কাজ শেষে আমাদের দিকে ফিরে তাকালেন চেহারায় দুঃখী হাসি মেখে।
“আ..ম.. ডাক্তার যিয়াদ, একটু কথা ছিল।” আহত লোকটার দিকে না তাকানোর চেষ্টা করে বলি।
দুইজনকে এক নজর দেখে নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ, বলো!” মাথা নেড়ে আমাদেরকে এক রুমে নিয়ে যান। এটা এখন উনার হেড অফিস আর হাইরিস্ক রোগীদের জন্য আলাদা রুম হিসেবে ব্যবহার চলে। আসবাব বলতে দেয়ালের গা ঘেঁষে দুইটা রোগীর বিছানা। আর বাতিল কাগজে ভরা ডাক্তার যিয়াদের ডেস্ক। হলদে জানালার ফাঁক গলে ভেতরে আলো এসে আছড়ে পড়ছে।
“বলো, কী করতে পারি?” দরজা লাগিয়ে বললেন।
আমার হাতে হিজাবের কোনা ধরা। “ডাক্তার যিয়াদ, ওর নাম কেনান। ওই যে সেদিন যার বোনকে বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসতে হইল।”
“ও এখন কেমন আছে?” কেনানকে জিজ্ঞেস করেন।
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। সালামার কাছে কৃতজ্ঞ আমরা। ওর কাজ খুবই চমৎকার।” ও হাসিমুখে আমার দিকে তাকাতেই আমার ভেতরে যেন কয়েক ডিগ্রী তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
ডাক্তারও সায় দেন, “আমাদের সৌভাগ্য, ওকে পেয়েছি।”
“তা আপনাদের বড়ো মনের পরিচয়,” নিচুগলায় বলি। তারপর, আরেকটু উঁচুস্বরে, “ডাক্তার, কেনান এখানে”—বলে কেনানের দিকে তাকাই, ও মাথা নাড়ে—“ও আন্দোলন রেকর্ড করে। তাই আমি ভাবতেসিলাম ওকে দিয়ে হাসপাতালে রোগীদের আসাযাওয়া রেকর্ড করানো যায় কি না, তাহলে ওদের গল্পগুলো ডকুমেন্টেড থাকবে যাতে বাইরের পৃথিবী অন্তত জানতে পারে এখানে কী ঘটতেসে।”
“আর সেজন্য আপনার অনুমতি দরকার, স্যার।” কেনান বলে ওঠে।
ডাক্তার যিয়াদকে আগ্রহী দেখায়। চিন্তিত ভঙ্গিতে উনি গাল চুলকে নেন। “আমার অনুমতি তো আছেই,” জবাব দিলেন। “কিন্তু ইন্ডিভিজুয়াল স্টোরি করার জন্য তো ওদের অনুমতি আগে দরকার। আবার ধরো যদি, বড়সড় বোমা হামলা হইছে, আহতদের নিয়ে আসতেসে, ওইটা সবটা দেখাইতে পারবা।”
স্মিত হাসিমুখে কেনান ডাক্তার যিয়াদের সাথে হাত মেলায়, ধন্যবাদ দেয়। আমাদেরকে বিদায় দিয়ে ডাক্তার যিয়াদ আবার তার রাউন্ড শেষ করতে ছোটেন।
“লোকটাকে ভাল্লাগসে আমার।” কেনান মুগ্ধতা নিয়ে বলে।
“উনি আসলে সুপারহিরো।” ডাক্তার যিয়াদের পরিচয় দেয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই। “ইয়াল্লা, আপনারে তো হাসপাতাল ঘুরায়ে দেখানো হয় নাই। আসেন।”
কেনানের চোখে একইসাথে আনন্দ-বেদনার আলো খেলা করে। আর সেই আলো এসে আমার বোকা মনে জমা করে আশা। সেই না হওয়া জীবন! কেনান আমার প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনে যায়। হাসপাতালের প্রতিটা বিভাগের কাজ, কিভাবে রোগীদের অবস্থা অনুযায়ী বিভাগ দেই সেগুলো শোনাই। সাধারণ ঘটনাগুলোই বেশি বলি। কারণ রক্তমাখা দেহগুলো, বিশেষ করে স্নাইপার শট লাগা শিশুদেরগুলো মাঝেমাঝে এমন ধাক্কা দেয়, আমার ভেতরটা ভেঙেচুরে আসে। তাই ওগুলো ওকে তেমন একটা বলি না। এড়িয়ে যাই ওই সংখ্যাটাও, কতবার আমার হাসপাতাল থেকে ছুটে বেরিয়ে বমি করে আসতে হয়েছে।
মূল হলে ফিরে আসার পথে মাতৃসেবা বিভাগ পড়ে। “এখানে প্রেগন্যান্ট নারীদের নিয়ে আসা হয়। সার্জারির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সিডেটিভ থাকবে না ওই ভয়ে এই নারীদের আমরা সিডেটিভ দিতে পারি না। কতজন প্রাণ হারিয়ে, ছেড়ে চলে গেছে! বেশি খারাপ লাগে যখন মা মরে যায় কিন্তু বাচ্চাটা বেঁচে থাকে। ওই বাচ্চাদের আবার ওই পাশে রাখা হয়।” হল লাগোয়া আরেকটা রুমের দিকে হাত তুলে দেখাই।
সহানুভূতির রেখা ফুটিয়ে চেহারায়, কেনান বাচ্চাগুলোর দিকে ঘুরে তাকায়, “ওদেরকে ইনকিউবেটরে রাখে?”
“হ্যাঁ, আমার আসলে এখানে আসতে ভালো লাগেনা। ওদের ক্ষুদ্রতা আর এমন অসহায়ত্ব নেয়া যায় না। কিছু বাচ্চাকে মায়ের পেট থেকে উদ্ধার করা হইছে, ওদের বেঁচে থাকার জন্য ইনকিউবেটর দরকার। আর কয়েক মাস বয়সী বাচ্চারাও আছে যারা অসুস্থ তাই এখানে রাখা।”
“ওরা সুস্থ হয়ে গেলে পরে ওদেরকে কী করে?”
“কপাল ভালো হইলে পরিবারের কাছেই যায়। আর বাকিরা কোনো এতিমখানায় আশ্রয় পাওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকে,” গা কাঁপে আমার। “বাচ্চাদের মৃত্যু মেনে নেয়া অসম্ভব মনে হয় আমার।”
বুক ধুকপুক করতে থাকে।
লোটাস। গোলাপি পাপড়ি। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রদাহ নিরাময় করে। লোটাস লোটাস লোটাস।
ও কিছু না বলায় আমি ঘুরে তাকাই। ওর চোখ এখনো ওই ধাতব বাকশোগুলোর দিকে যেখানে শিশুদের জিইয়ে রাখা হয়েছে। “আমি জানি, তোমার অসহায় লাগে, সালামা।” বিষাদমাখা স্বর কেনানের, “এমন পরিণতি তো কারো প্রাপ্য না। বাচ্চারা এখানে না খাওয়া, অথচ দামেশকের মতো শহরগুলোয় মানুষ পেট ভরে গেলে খাবারের বাকিটুক ছুঁড়ে ফেলে দিতেসে।”
দূর থেকেই বুঝতে পারছি ওর গা কাঁপছে। দামেশকের কথা আমি অত একটা ভাবি না। ওখানে বিচ্ছিন্ন কিছু আন্দোলন সরকারি বুটে দলিত হয়ে থেমে গেছে। তারপর যে যার “স্বাভাবিক” জীবনে ফিরে গেছে। দামেশক থেকে যদি স্বৈরাচারের থাবা সরানো যায়, তাহলে পুরো সিরিয়া দখলমুক্ত হয়ে যাবে। রাজধানী দামেশকেই তো সব সিদ্ধান্ত হয়, যার ভুক্তভোগী হয় সারা দেশ। ওই শহরটাই তো ক্ষমতার কেন্দ্র। ওই মাটির ইতিহাসেই লেখা আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের বিজয়গাঁথা। তবু, যারা আজ দামেশক মুক্ত করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করছে, তারাই এই মাটির সবচেয়ে বড়ো দাবিদার।
আমারও অদ্ভুত লাগে, হোমস থেকে দামেশক মাত্র আড়াইঘন্টার রাস্তা। অথচ এক শহরে মানুষকে বোমাবিধ্বস্ত ভবন থেকে টেনে বের করা লাগে প্রতিনিয়ত, আর পাশের শহরেই মানুষ ক্যাফেতে বসে কফি খায়, মেতে ওঠে হাসি-গানে। কিন্তু এসব না ভেবে থাকার চেষ্টা করি। আমারও তো দূরসম্পর্কের আত্মীয় আছে ওখানে। হোমসের সবারই আছে। দিনশেষে তো আমরা সবাই কোনো না কোনো ভাবে সম্পর্কের সুতায় বাঁধা।
“এই পার্থক্য নিয়ে রাগ করে কী হবে?” মন খারাপি স্বরে বলি। “যার যার পথ সে বেছে নিতে হয় বলে আমাদের রাস্তাগুলো আলাদা। তবু স্বস্তি এইটুকু যে, অন্তত আমরা ভুল কিছু করতেসি না।”
“যখন দেখি পথেঘাটে মিলিটারিরা মানুষ পিটাইতেসে সমানে, টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাইতেসে, মেরে ফেলতেছে। ছোটো ছোটো ভাইবোনগুলো চোখের সামনে সারারাত কাঁপতে কাঁপতে একটু আরাম খুঁজতেসে—তখন মনে হয়, এর চেয়ে খারাপ পরিণতি আর কী হইতে পারে? কিন্তু সালামা, এই জায়গায় এসে আমার আশারা মরে যায়। কারণ এই দুধের শিশুগুলা তো বুঝতেসে না কী ঘটতেছে—আর বুঝবেই বা কীভাবে? ওরা তো শিশু। ওদের তো এসবের সাথে কোনো দেয়া-নেয়া নাই।”
আহমাদের কথা মনে পড়ে যায়। একটা খোলের মতো হয়ে গেছিল ওর ছোট্ট ওর শরীরটা। ওর ভারী নিঃশ্বাস। চোখে ভাসছিল মৃত্যুকে মেনে নেয়ার শীতলতা। আহমাদও তো একটা ছোট্ট শিশুই ছিল।
কেনানের কথা ফুটতেই থাকে। “সালামা, এরচেয়ে খারাপও হয় বাস্তবতা। এমন কোনো গ্যারান্টি তো নাই যে ওরা হাসপাতালে বোমা ফেলবে না। আ—”
“চুপ করেন!” আমি বলি। আমার দিকে তাকিয়েই ও চেহারায় ফুটে থাকা আতঙ্কের রেশ পড়ে ফেলে। “ওই কথা বইলেন না।”
মাথা নাড়ে ও।
এই মুহূর্তে আমাদের দুইজনের মাথায়ই একই চিন্তা, একই আতঙ্ক।
আমরা জানি, হাসপাতালের দিনগুলাও ক্ষণস্থায়ী। মিলিটারির বিরুদ্ধে আমাদের হয়ে শুধু পুরান হোমসে ফ্রি সিরিয়ান আর্মিই লড়ছে। উপরে-নিচে চারদিক থেকে আমরা আবদ্ধ। যেকোনো মুহূর্তে সামরিক বাহিনী শুধু একটা বোমা ফেললেই আমাদের এই নড়বড়ে আশ্রয়টা মুহূর্তে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আর যদি—আল্লাহ না করুন—লায়লার প্রসব এখানেই, কোনো হাসপাতাল ছাড়াই হয়, তাহলে ওর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। সেটাও, যদি এর আগেই অন্য কিছু ওকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে না নেয় তবে।
খওফের খোঁজে আমার চোখ চারদিকে ছুটে বেড়ায়। আজ সকালে আ’মকে খুঁজে না পাওয়ার শাস্তি হিসেবে না জানি কখন এসে হাজির হবে আমার আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিতে। কিন্তু ও নেই আশপাশে। কেনান আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে, ওর চেহারায় মাখা বিষাদ ধীরে ধীরে বিভ্রান্তিতে বদলে যায়।
“কী খুঁজতেছেন?”
“কাউকে না,” একটু বেশিই তাড়াতাড়ি বলে ফেলি।
“কা-উ-কে না?” ওর পুনরাবৃত্তি শুনে বুঝতে পারি ভুল হয়েছে।
“কিছু না,” শুধরে বলি। “মানে, কিছু না সেটা বলতে চাইসি।” ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই আবার বলি, “রোগীরা কোথায় সেটা তো জানেনই। আমার এখন যাওয়া লাগবে।”
কিছু একটা বলতে চেয়ে মুখ খোলে ও, তারপর কী যেন ভেবে শুধু মাথা নাড়ে।
ওর ভ্যাবাচেকা চেহারার উল্টাদিকে আমি দ্রুত হাঁটা ধরি। স্টকরুমের দিকে ফিরে না গিয়ে আ’মের খোঁজে হাঁটি আট্রিয়ামের দিকে। যেভাবে বের হয়ে গিয়েছিলাম, একদম সে অবস্থায়ই আছে। চারদিকে রোগীর ছড়াছড়ি, পরিবার বলতে যারা বাকি আছে তারা ঘিরে আছে তাদের। যাদের কেউ নেই, দেখে বুক ভেঙে আসে আমার। প্রতিটা ক্লান্ত চেহারা খুঁটে খুঁটে দেখি, আ’মকে কোথাও দেখা যায় না।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে একটা। ভাবি বাকিরুমগুলোয় দেখা দরকার। ঠিক তখনই বন্ধ দরজার ফাঁক গলে চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। সারা শরীরজুড়ে কাঁটা দিয়ে উঠতেই আমি মুহূর্তেই সজাগ হয়ে যাই।
সহসা দরজাগুলো ঠাস করে হা হয়ে যায়। মানুষের ঢল নেমে আসে, সবার গায়ের কাপড় রক্তে ভিজে চুপচুপ করছে, ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে পড়ছে মেঝেয়। উদ্ধারকারীদের কোলের ওপর নিথর দেহ, চারপাশে চিৎকার, আর্তনাদ ছাতে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। কারো হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়নি, বরং ঝর্ণার মত রক্ত পড়ছে দেখে বুঝতে পারি স্নাইপার হামলার শিকার। আর সবগুলোই শিশুদেহ।
ভিড়ের ভেতর থেকে আ’ম দৌড়ে আসে, কোলে রক্তাক্ত একটা ছোট্ট মেয়ে। ওর মুখজুড়ে যন্ত্রণা আর ভয়ের ছাপ। “আমার মেয়েরে কেউ দ্যাখেন!” ভীড়ের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে ও। “একটু সাহায্য করেন আমারে!”
তখনই খওফ পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার কপালে আঙুল চেপে ধরে, কিন্তু আমি কোনো স্পর্শই টের পাই না। মুহূর্তের মধ্যে একটা নিষ্ঠুর চিন্তা জেগে ওঠে আমার মগজে।
“এটাই করতে হবে।” খওফ বলে দেয় আমাকে। আর আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে ভাসে লায়লার কান্নাভেজা মুখখানা।
(চলবে…)