অস্তিত্বে মিশে আছে প্রতিরোধ : পশ্চিম তীরের বিভেদ প্রাচীরে ফিলিস্তিনের স্পর্ধিত শিল্পকর্ম

মূল : জাসকিরান সান্ধু

আবিদা সুলতানা উমামা

“ফিলিস্তিনে কাটানো এক গ্রীষ্মের এই স্মৃতিকথাটিতে ফুটে উঠেছে বিভেদ প্রাচীরের ছায়ায় বসবাসরত জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব আর প্রতিরোধের বয়ান। বার্ষিক ‘লকুনা রাইটিং কম্পিটিশন’-এ যৌথভাবে বিজয়ী এই গল্প লিখেছেন আইনের স্নাতক শিক্ষার্থী জাসকিরান সান্ধু।

 

গতবছর, আমি বিপ্লব দেখেছি এক দেয়ালে।

ওই “প্রাচীরটা” দাঁড়িয়ে ছিলো দানবের মতো পায়ের নিচের জমিন দু’ভাগ করে। বলছি, ইসরায়েলের বানানো বিভেদ প্রাচীরের কথা, যেটা আন্তর্জাতিক বিচারসংস্থা অবৈধ ঘোষণা করেছে। কারণ, ইসরায়েলের সাথে পশ্চিম তীর আর পূর্ব জেরুজালেমের যে ‘গ্রিন লাইন’ রয়েছে, তা না মেনেই তোলা এই প্রাচীর। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলের জায়গা জুড়ে ২২ কিলোমিটার (১৩ মাইল) দখল করেছে এই দেয়াল। ফলে বিভিন্ন এলাকা বিভক্ত হয়ে গেছে, নিজের জমি চাষের অনুমতিও ইসরায়েলিদের কাছ থেকে নিতে বাধ্য হয়েছে কৃষকেরা।

প্রাচীরটার প্রায় ৮৫ শতাংশই পড়েছে পশ্চিম তীর আর পূর্ব জেরুজালেমে। পুরোটা বানানো হয়ে গেলে এর দৈর্ঘ্য হবে ৩৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিন লাইনের দ্বিগুণ। এই প্রাচীরের ফলে সেখানে তৈরি হয়েছে এক পারমিট রেজিম, যা ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। সেই সাথে তৈরি করেছে পশ্চিম তীরকে দখল করার স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া।

ইসরায়েলের বিভাজন প্রাচীর এবং গ্রিন লাইন–সূত্র: আল জাজিরা

প্রচন্ড তাপদাহের যে দুপুরে আমি তেল আবিবের বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্টে পৌঁছাই, তখন আগস্টের শুরু। সাল ২০২৩। আমার গন্তব্য ছিলো তেল আবিব থেকে দামাস্কাস গেইট আর তারপর পশ্চিম তীরের আল খলিলে।

কানের মধ্যে সারাক্ষণ বাজছিলো পরিবার-বন্ধুবান্ধবদের ভীত-সন্ত্রস্ত সতর্কবার্তা। ওদের মতে, “এমন বিপজ্জনক জায়গায় যাওয়া মানে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা”। কিন্তু আমি বিশ বছর বয়সে এসেও পাঁচ বছরের শিশুর মত জেদ আর সংকল্প করলাম। এখানে আমি একটা লিগ্যাল ইন্টার্নশিপ করব আর আল খলিলের ‘দ্য এক্সিলেন্স সেন্টার’এ আরবি শিখব। এখানে আসার উদ্দেশ্য, নিজের দুনিয়ার চেয়ে ভিন্ন এক দুনিয়াকে আবিষ্কার করা। যে গল্পগুলো মিডিয়া কখনো প্রকাশ করে না, সেগুলো শুনতে এসেছি আমি।

যাত্রাটা কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে শুরু হয়নি। হয়েছিলো একটা ক্যাফেতে। আমার উল্টাপাশে বসে থাকা কোঁকড়া কোঁকড়া বাদামি চুলের মহিলার হাতে থাকা বইয়ের সাথে আমার বইটা মিলে যাওয়ার ঘটনা দিয়ে। যখন আমরা টের পেলাম যে দুইজনে একই জায়গায়, একই সময়ে অত-পরিচিত-না এমন একটা বই পড়ছি, আমাদের বন্ধুত্ব হয়ে গেলো।

বইটা সুজান আবুলহাওয়ার লেখা “Mornings in Jenin”। এই মন-ভেঙে চুরচুর করে দেয়া গল্পটা পড়ার সাথী হিসেবে পেয়েছি এই বন্ধুকে, যে আমার মতোই ফিলিস্তিনের ভূমি আর নিপীড়িত মানুষের ইতিহাসকে জানার আগ্রহ রাখে।

নর্দার্ন লাইটস ১১৯-এর মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি

আবুলহাওয়ার গল্পটা শুরু হয়েছে নাকবার দিনগুলোতে। নাকবা শব্দটা আরবী, যার মানে বিপর্যয়। উচ্ছেদিত হয়ে জেনিন শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া এক পরিবারের তিন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে বইটায়। ওই ক্যাম্পেই তাদের ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে, আর রেখাপাত করে আমার মনে। ফিলিস্তিনিদের মজলুমিয়ত আর উদ্বাসনের ভীষণ বাস্তব আর শক্তিশালী বর্ণনা উঠে এসেছে।

আমি বিশ্বাস করি, সরেজমিন অভিজ্ঞতাই আসলে কোনো কিছু শেখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আর ব্যক্তিগত পদ্ধতি। তাই নেমে পড়লাম এই বিষয়ক জ্ঞানের অতলে ডুব দিতে। আইনের ছাত্রী হিসেবে, আমার ইচ্ছা হয় প্রতিটা পরিস্থিতিতে আইনাধিকার আর মানবাধিকার কী বলে তা জানতে। আর দ্য এক্সিলেন্স সেন্টারে এই লিগ্যাল ইন্টার্নশিপ আমাকে সেই সুযোগই এনে দিয়েছে।

জাসকিরানের মেযবান পরিবার ও স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের বাগানে ইউএনও খেলছেন

এয়ারপোর্ট থেকে সেন্টারে পৌঁছাতে প্রায় ৫ ঘণ্টা লেগে যায়। কারণ ইসরায়েলি নাগরিক-পর্যটকদের নিরাপত্তার খাতিরে রাস্তায় একাধিক চেকপয়েন্ট ছিলো। ওরা সবাইকে সতর্ক করে “নিজের নিরাপত্তা”র কথা ভেবেই কেউ যেন ফিলিস্তিনি এলাকায় পা না দেয়।

দামেস্ক গেইট থেকে হেবরন গেলাম ফিলিস্তিনি নাম্বার প্লেট লাগানো এক শেরুত (শেয়ার্ড ট্যাক্সি) চড়ে। ইসরায়েলের দখলকৃত অঞ্চল থেকে যত দূর যাচ্ছিলাম, ততোই মনে হচ্ছিলো পুরোটা জুড়ে শুধু দেয়াল আর প্রাচীর। এরপর গাড়ি মহাসড়কে উঠে গেলো, যে সড়কও দেয়াল দিয়ে দুই ভাগ করা। এ পাশে ফিলিস্তিনি গাড়ি আর ওপাশে ইসরায়েলি।

হাইওয়ে ও আর সব রাস্তার ধারেও আরো কিছু দেয়াল দেখা যায়, সবই ওই মাটিতে পা রাখতে না দেয়ার পদ্ধতি। প্রথমে ওদেরকে আমার নিরীহই মনে হয়। নিজের বাড়ির আঙিনায় গাড়ি চলাচল কেই বা করতে দিবে? কিন্তু পরে জানতে পারি, পশ্চিম তীরে মহাসড়কের পাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সমস্ত সাদা বাড়ি আসলে ইসরায়েলি বসতি। ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করে সেখানে বানিয়েছে ওরা নিজেদের আবাস।

সেন্টারের অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে দিনের সফরে বের হলে, অজস্রবার ইসরায়েলের সবচেয়ে পরিচিত চেকপোস্ট—রাহিলার সমাধি—পার হতে হয় আমাদের। এটা বেথেলহাম থেকে জেরুজালেমে ঢোকার মূলপথ। “অসলো চুক্তি” অনুযায়ী বেথেলহাম “এরিয়া এ”তে পড়েছে। অর্থাৎ এখানে পুরোপুরি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের  বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চলে। চেকপয়েন্ট না বলে বরং একে সীমান্ত ক্রসিং বলা ভালো।

দামাস্কাস গেট থেকে হেবরন পর্যন্ত পথজুড়ে ইসরায়েলি বসতিসমূহ

শেরুতঅলা আমাদের ধাতব রিভলভিং দরজার সামনে নামিয়ে দেয়। এরচেয়ে সামনে যাওয়ার অনুমতি তার কাছে নেই। কারণ তার নাম্বারপ্লেটে ‘প্যালেস্টাইন’র ‘P’ দেয়া। সারাপথ লোকটা আমাদের সাথে তার সন্তান আর বেথেলহামের বাড়িটার গল্প করেছে। কোনো একদিন সন্তানদের নিয়ে জেরুজালেমে যাওয়ার স্বপ্ন দেখার গল্প বলেছে। ওর গল্প শুনতে শুনতে দেখি আমাদের কাছ ঘেঁষে সাইঁসাঁই করে ছুটে চলেছে ইসরায়েলি নাম্বার প্লেট ‘IL’ লাগানো গাড়ি।

এখান থেকে আমাদের হেঁটে যেতে হবে রিভলভিং দরজাটা পেরিয়ে। ভেতরের সমস্তকিছু আমাকে ভয় আর শীতলতার অনুভূতি দেয়। ওখানে সবকিছু ধাতব। দেয়াল, ছাত, দরজা এমন কি সিকিউরিটি বক্সগুলোও যেখানে নীল-সাদা পোশাকে সৈনিকদের দেখা যাচ্ছে। ওদের পাশেই রাখা এম-সিক্সটিন।

কোনো কথাবার্তা নেই। এক নজর আমাদের ব্রিটিশ, আমেরিকা আর ইউরোপিয়ান পাসপোর্টের দিকে তাকিয়েই আলাদা সারিতে দেয়া হয় আমাদের। লম্বা ব্যারিকেডের সারির একদম শেষ প্রান্তে, রাহিলার সমাধি চেকপয়েন্টের ভেতরে।

আমাদের বাঁ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র ফিলিস্তিনি নারীটি হঠাৎ আমাদের দিকে একবার তাকায়। তাকে দেখে আমার মনে পড়ে যায়, গতকাল ওয়েস্ট ব্যাংকের এক হাসপাতালে যাওয়ার কথা। ওখানকার এক চিকিৎসক বলেছিলেন,  মাঝেমাঝে তাদের কর্মীরা প্রশিক্ষণের জন্য জেরুজালেমে যায়। আবার কখনো কখনো হেবরনে যাদের চিকিৎসা সম্ভব হয় না—ওরকম রোগীদেরও জেরুজালেমে পাঠানো হয়। ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে ঢুকতে হলে প্রত্যেককেই ইসরায়েলি সরকারের কাছ থেকে সই করা ও সিল মারা একটা পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। এই অনুমতি পেতে সময় লাগে—কয়েক দিন থেকে শুরু করে কখনো কখনো কয়েক মাসও। সেই সাথে চলে দীর্ঘ  যাচাইবাছাই। বাপ-দাদার ইতিহাসও সেখান থেকে বাদ যায় না।

এত কিছুর পরেও, সীমান্ত রক্ষীরা চাইলেই যাত্রা বাতিল করে দিতে পারে।

দেশে ফেরার পথে, তেল আবিব এয়ারপোর্টে এক ইসরায়েলি সিকিউরিটি অফিসার আমাকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে। আমার বংশপদবী কোত্থেকে আসছে, আমার বাবা-দাদার জন্ম কোথায়, তাদের জীবনকালে তারা কোন কোন দেশে থেকেছে, আমার কোনো ফিলিস্তিনি আত্মীয় বা বন্ধু আছে কি না, এই যাত্রায় যাদের সাথে আলাপ হয়েছে ওদের নামধাম। ওদের নিরাপত্তার খাতিরে এই প্রশ্নগুলোর জবাব আমি আগেই ভেবে রেখেছি। বন্ধুদের ভুয়া নাম, আর ইসরায়েলের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর ভ্রমণসূচি। ভেবে রেখেছি ওদের বলব, এক মাসের সফরে কোন কোন বারে আড্ডা দিয়েছি আর বলবো ডেড সিতে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা। অথচ কথা বলতে গিয়ে তবু আমার স্বর ঠকঠক করে কেঁপেছে, হাপিয়ে গেছি।

কারণ মুহূর্তেই ওরা আমার নাড়িনক্ষত্র জেনে ফেলে। আলাদা করে নিয়ে ব্যাগ তল্লাশি করে। আমার ফিলিস্তিনি স্যুভেনিরগুলো ‘উস্কানিমূলক’ বলে দাবি করে। একটা কেফিয়াহ, জলপাই বাগানের পোস্টার, রামাল্লাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কমিশন ফর হিউম্যান রাইটস প্রকাশিত ওয়েস্ট ব্যাংকে মানবাধিকার সুরক্ষা ও লঙ্ঘন বিষয়ক একটি প্রতিবেদন—সবই বাজেয়াপ্ত করে। শেষ পর্যন্ত যে কয়টা স্যুভেনির নিয়ে ফিরতে পেরেছি সেগুলোর মধ্যে ছিলো শুধু ছোট ছোট কফির কাপ, কাচের তৈরি গয়না আর কয়েক জোড়া কানের দুল।

রাহিলার সমাধি চেকপয়েন্টে ফিরে এসে আমাদের পাসপোর্ট আর অস্থায়ী ভিসাগুলো স্ক্যান করে ব্যারিকেড খুলে দেয়। এই ধাতব গোলকধাঁধার অন্য প্রান্ত পেরিয়ে আমরা জেরুজালেমে ঢুকে পড়ি। আর পেছনে—একই জায়গায়—ফিলিস্তিনি নারীটি তখনও দাঁড়িয়ে থাকে, ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায়।

প্রথম দুই সপ্তাহে, আমার কয়েকবার বেথেলহামে যাওয়া পড়ে। এই জায়গাটা একইসাথে যিশুর জন্মস্থান, চার্চ অব দ্য ন্যাটিভিটির শহর, আর খ্রিস্টান আরবদের আবাসভূমি। এখানেই প্রথমবার খুব কাছ থেকে সেই দেয়ালটা দেখি আমি।

কংক্রিটের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে বিপ্লব আর প্রতিরোধের ভাষা। বিভিন্ন উক্তি থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির দেয়ালচিত্র। কোথাও নেলসন ম্যান্ডেলা, কোথাও ইয়াদ আল-হাল্লাক, আবার কোথাও কেকেকে-র হুড পরা এক ইসরায়েলি সৈন্য। এ যেন এক ‘দেয়াল-জাদুঘর’। অর্ধশত বছরে ধরে ক্রমাগত শেখা আর ভুলে যাওয়া মানবাধিকারের পাঠ, দমন আর প্রতিরোধের চক্র—সবই এই শিল্পকর্মগুলোর ভেতর কথা বলে।

যত দেখি ততই দেয়ালটাকে আরো বড়, আরো ঘন মনে হয়। বেথেলহামের প্যালেস্টিনিয়ান হেরিটেজ সেন্টারের পরিচালক মাহা সাকা আমাদের শোনান তাঁর শৈশবের বাড়ির গল্প—পূর্ব জেরুজালেমের সেই বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হয় ২০০২ সালে, প্রাচীরটা নির্মাণ শুরু হওয়ার সময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যেসব ফিলিস্তিনি সেই সব ঘরে বসবাস করছিলেন, ১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল ও সংযুক্ত করার পর তাদের সবাইকে সেখান থেকে উৎখাত করা হয়। তাদের জায়গায় বসতি স্থাপন করে ইসরায়েলিরা। বর্তমানে, পশ্চিম তীরের দখলকৃত এলাকায় (জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনারের মতে), অবৈধভাবে বসবাস করছে সাত লাখেরও বেশি ইসরায়েলি।

মাহা সাকা তার পরিবারের সাত প্রজন্মের বিয়ের ছবি আমাদের দেখিয়ে বলেন, “ওরা কীভাবে বলে ভূমিহীন এক জনগোষ্ঠীর জন্য জনমানবহীন এক ভূমি এটা?”

কিন্তু এ ভূমি তো কোনোকালেই “জনমানবহীন” ছিলো না। আল-খলিলে আর পশ্চিম তীরে ঘুরে বেড়ানোর সময় যাদের সাথেই দেখা হয়েছে,  আমার হৃদয়ের গভীরে জায়গা করে নিয়েছে সবাই। কারণ আমার দেখা ভীষণ সদয়, উদার আর আগ্রহজাগানিয়া মানুষদের মধ্যে ওরা ছিলো অন্যতম।

FOR-USA Fellowship of Reconciliation-এর মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি

ওদের অদ্ভুত প্রভাবিত করার ক্ষমতা আছে। এত অনায়াসে ওরা যে কাউকে কাহওয়ার (কফি) দাওয়াত দেয় ঘরে, কত কত খোশগল্প করে। সেসব গল্পজুড়ে দখলদারিত্বের কালো ছায়ায় ঘেরা জীবনের পাশাপাশি থাকে ভালোবাসার কথা, বিয়ের স্মৃতি, জলপাই গাছ কীভাবে যত্নে রাখতে হয়, কেন লেভান্ত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা, কিংবা সেদিন স্কুলে কেমন কেটেছিল—সেইসব মিঠে স্মৃতি।

প্রাচীরের পাশ ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে কংক্রিটের অনেক উঁচুতে লেখা একটা বাক্য—“তোমার কাজ দেখলে আর তোমার কথা বিশ্বাস হয় না।”

এই কথাটা জেমস বাল্ডউইনের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘A Report from Occupied Territory’-এর প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রবন্ধটা ষাটের দশকে নিউইয়র্কের বর্ণবাদ সমাজের তৈরি হারলেম বস্তির ব্যাপারে লেখা। বাল্ডউইন বলেছিলেন—সাদা পুলিশরা আফ্রো-আমেরিকানদের ডাকে “কুকুর, জানোয়ার। অথচ মার খেতে খেতে পড়ে থাকা মানুষগুলো কীভাবে ‘জানোয়ার’ হয়, আর যারা মারছে তারা কীভাবে মানুষ থাকে সেটাই আমার বুঝে আসে না।”

এই লেখাটা যখন লেখা হচ্ছে, তখন ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাজায় গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্ট বলছে, “আমরা মানুষরুপী পশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি”—অথচ সেই সময়েই একের পর এক হাসপাতাল, শরণার্থী শিবির আর আবাস ভবনগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।

নর্দার্ন লাইটস ১১৯-এর মাধ্যমে সংগৃহীত ছবি

আরেক সফরে আমরা যাই ফাওয়ার শরণার্থী শিবিরে—পশ্চিম তীরের সবচেয়ে দক্ষিণে অবস্থিত এক ক্যাম্পে। সেখানে নিখুঁত ইংরেজিতে কথা বলা এক লোক আমাকে অনুরোধ করেন ভূমধ্যসাগরের রঙটা কেমন তা যেন আমি তাকে বর্ণনা করি।

ভূমধ্যসাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করার অন্যতম জায়গা হাইফা, যেখানে আমি কয়েকদিন আগেই ঘুরে এসেছিলাম। আমি তাকে বলি, নীল আকাশের নিচে সাগরটাকে মনে হয় সেরুলিয়ান নীল, সূর্যাস্তের সময় কমলা আভায় ভরে ওঠে সবটা, পায়ের তলায় শীতল পরশ, আর রঙের এমন বাহার যেন জীবনে প্রথম দেখা সব রঙ। লোকটা তার নিজভূমির অদেখা সমুদ্রের সৌন্দর্যে বিমোহিত হওয়ার কথা বলে আমাকে। চোখ বন্ধ করে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন তার ভেতরের জগৎটা ছেয়ে গেছে নানারঙে। তারপর চোখ খুলে বলে ওঠে, সে একজন শরণার্থী—এই শিবিরের মাত্র ০.২৭ বর্গকিলোমিটার জায়গার মধ্যেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ফাওয়ার শরণার্থী শিবিরটি ইসরায়েলি দখলদারদের অধীনে, যার প্রবেশপথে রয়েছে এক বিরাট বড় ওয়াচ টাওয়ার আর একটা চেকপয়েন্ট।

লোকটা আমাকে আরো বলে, ভিটেমাটি না থাকাটা মানুষকে যতোটা না কুড়ে কুড়ে খায়, তারচেয়ে বেশি খায় অনুভূতিহীন হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকাটা। হারানো হৃদয়গুলো চাপা পড়ে থাকে সেই সব বাড়িতে, যেগুলোর প্রতিটা ইট বিদেশি সেনারা ক্রেন দিয়ে গুঁড়ো করে দিয়েছে। তিনি বলেন, বহু বছর আগে তাঁর গ্রামে ইসরায়েলি হামলা হয়। ভগ্নস্তূপের অতল থেকে নিজের মেয়েকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেও পাননি। সেই মেয়েটার সাথে লোকটার হৃদয়ও চাপা পড়ে গেছে ওই ধ্বংসাবশেষের নিচে।

ফিরে আসার পথে প্রাইভেট ট্যাক্সির পিছনের সিটে বসে সারাটা পথ আমি কেঁদেছি। পাসপোর্ট চেক করা হয়, আমাদের ছেড়ে দেয়া হয় নিজ গন্তব্যে। অথচ যাদের গল্পের ভাগ কাঁধে করে নিয়ে এসেছি, আমাদের বিদায় জানাতে এসেও তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ওই ব্যারিকেডের পেছনে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments