উদিত দুঃখের দেশ (চতুর্দশ পর্ব)

মূল : জুলফা কাতু’

আবিদা সুলতানা উমামা

“আচ্ছা, আ’মের তাহলে এমনই দয়ার শরীর যে ও মাত্র এক হাজার ডলার আর একটা সোনার হারের বিনিময়ে রাজি হয়ে গেছে?” দুই হাত বুকে বেঁধে লায়লা আমার পথরোধ করে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। “তাও আবার দুইজনের জন্য? এটা কি ‘একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি’ অফার নাকি?”

“আমি কী জানি! ওকে আমি শুধু তোমার পা ফোলা আর খাওয়ার কষ্টের কথা বলছি। শুনেই রাজি হয়ে গেছে।”

“তাহলে আমার প্রেগন্যান্সির কথা ও জানে?” ওর চোখে এখনো সন্দেহ। “তাইলে তো ও আরো চড়া দাম চাওয়ার কথা।”

“হ্যাঁ, ও তো জানেই।” জবাব দেই আমি। “কিন্তু প্রেগনেন্সির জন্য অতিরিক্ত দাম ও চায় নাই। আর এখন আর কোনো বোকামি আমি করব না। আগামীকালই ওরে আমি পাঁচশ ডলার দিতেসি, বাকিটা নৌকায় উঠার পর দিব।”

“জানিনা, সালামা। আমার অনেক চিন্তা হইতেছে। মানে, নৌকায় করে রিফিউজিরা যারা যায়, ওদের কত গল্পই তো শুনি। অনেকে ধোঁকা খায়, কেউ কেউ ডুবে যায়। পুরাটা একটা ফাঁদের মতো মনে হয় আমার।”

“কিন্তু ব্যাপারটা এরকম না।”

“এত নিশ্চিত কীভাবে হও? তোমার মতো প্যারানয়েড ক্যামনে এই কথা বলে?”

উষ্ণ মোজাজোড়া পায়ে আমি বিছানার উপর বসি। ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে হিমহিম সন্ধ্যাবাতাস ঢুকে পড়েছে, সে শীতলতা পোঁছে যাচ্ছে আমাদের হাড়ের ভেতর। “মানুষের সহি-সালামতে পৌঁছানোর প্রমাণ আমি দেখছি। ওর কাছে ঐসব মানুষের ইউরোপে যাওয়ার পরের ছবি আছে। ব্যাপারটা ধোঁকাবাজি না। সবাই যদি মরেই যাইত, তাইলে তো আর ওর কাছে নৌকার জন্য কেউ আসত না।”

কথাগুলো যে সত্য না তা আমিও জানি, কিন্তু লায়লাকে এই মিথ্যাই বিশ্বাস করাতে হচ্ছে।

“তাও ব্যাপারটা আমার ভাল্লাগতেছে না।” জেদিস্বরে বলে ও।

“আমারও না লায়লা। কিন্তু আমাদের যাইতে হবে।” আমার গলা দুর্বল হয়ে আসে। আজকে আমি যে কান্ড ঘটিয়েছি, এরপরেও যদি না যাই, সবই বৃথা। হিপোক্রেটিক শপথ ভেঙেছি আমি আজ। নিজের নীতি-নৈতিকতা ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছি। সামার আর আহমাদের চেহারা চোখে ভাসছে। আর কোনো শিশুর দূরাবস্থা আমি দেখতে পারব না। হাতের দাগগুলো পিনপিন করছে, ঘষে সেটা কমানোর চেষ্টা করলেও আমি জানি এগুলো সবই আমার মস্তিষ্কের বানানো। অপরাধবোধ আমার ভেতরে একটা অলীক বেদনার জন্ম দিচ্ছে।

“আমি এখানে থাকতে চাই না।” যত নিচু গলায় বললে লায়লা না শোনার ভান করে এড়িয়ে যেতে পারবে, ঠিক ততটা আস্তে কথাটা বলি। কিন্তু ও শোনে। আমার হাত দুটো মুঠোয় পুরে নেয়। ওর স্পর্শের কোমলতায় বেদনারা মুছে যায়।

“আমি আর পারতেছি না,” আমাদের জোড়া হাতের দিকে তাকিয়ে আমি ওকে বলতে থাকি। নিজের ঘরে এই আমার চিন্তাগুলো নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারি। আমার বোন ছাড়া এখানে আর কেউ নাই। “এইটুকুন একটা ছেলে… আমি ওকে বাঁচাইতে পারি নাই…” কাঁপা কাঁপা নিশ্বাসে কান্না গিলে ফেলি। “সবাই মরে যাচ্ছে, আমার কোনো চেষ্টাই কাজে দিতেছে না। এখন তো ব্রেইনেও যন্ত্রণা শুরু হইছে। একটা বছর ধরে আমি ঠিকমতো ঘুমাইতেও পারি না। মনে হইতেসে, আমি কোনো এক অন্ধকূপে চিল্লায়েই যাইতেসি, যেখানে সবকিছু হাওয়ার পেটে চলে যায়। মনে হয় আমাকেও একদিন গিলে ফেলবে।”

এইটুক বলে মাথা তুললে লায়লা আমার হাত ছেড়ে দিয়ে চুলে বিলি কাটতে শুরু করে। মৃদু হেসে ও মাথা নাড়ে, “গিলে খাইতে পারবে না তোমাকে।”

“তুমি আমার উপর যতটূকু ভরসা করো , এত তো আমি নিজেও করি না। লায়লা, কিছুই না করার দিনগুলা আমি অনেক মিস করি। সারাটাদিন শুয়ে শুয়ে শুধু মুভি দেখতাম।  আর নয়ত ঘন্টার পর ঘন্টা তোমার সাথে ফোনে কথা বলতাম। মনে আছে তোমার?”

ও মাথা নাড়ে। “অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার আগে স্বৈরতন্ত্রই আমাদের বয়স বাড়ায়ে দিছে। আমার তো এখন নিজেরে নব্বই বছরের বুড়া মনে হয়।

“আই উইশ, আমারও নব্বই মনে হইত। আমারে তো হাজার বছরের বুড়া মনে হয় দেখতে।”

লায়লা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকায়, “মোটেই না!”

জামার হাতায় আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে ওকে জিজ্ঞেস করি, “আচ্ছা, নেকলেস কোনটা দিবা ওরে ভাবসো? আমি ভাবতেসি মাঝখানে বো দেয়াটার কথা।”

ওর নাক কুঁচকে যায়। “নেকলেস নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নাই। যেটা ইচ্ছা দিয়ে দাও। আমার কাছে তো তুমি আর সালামা বাবুর চেয়ে দামী কিছুই না।”

ওর কণ্ঠে নেমে আসে বিষাদের সুর। ভালো লাগে না আমার। আমাদেরও তো কিছু সহজতা পাওনা আছে জীবনের কাছে, এইসব বিষাদের আনাগোনা থেকে পালিয়ে আমি সেসব সহজ দিন ফেরত চাই। তাই ওকে বললাম, “আজকে কেনান আমাকে বাসায় দিয়ে গেছে।”

লায়লা হা হয়ে যায়, “কিইইহ! এই খবর তুমি আমাকে এখন দিতেসো!”

বিংগো!

দু হাতে আমার গাল চেপে ধরে ওর দিকে তাকাতে বাধ্য করে আমাকে।

“কেনান!” আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ও কথাটা বলতেই সারা গাল গরম হয়ে যায় আমার।

“হা! তুমি ওরে পছন্দ করো!” এবার সজোরে বলে ও।

ওর হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিই আমি। “কী ভাই! আমার জীবনে কোনোদিন—ওয়াও, মানে তুমি—ভাই তুমি জানোই সব—চুপ করো।”

আমার বিছানার উপর শুয়ে পড়ে ও, সবগুলো দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখো একবার, পুরা পাকা টমেটো হয়ে আছে একটা!”

“মোটেই না।” প্রতিবাদ জানিয়ে আমি আয়নার দিকে ছুটে যাই।

“তোমাকে এত নার্ভাস আমি কখনো দেখি নাই।” হাসির দমকে ওর স্ক্রাঞ্চি থেকে চুল খুলে যায়। “ভার্সিটিতে ডেন্টিস্ট্রির ঐ কিউট ছেলেটার বেলায়ও না।”

জবাবে আমার আর্তনাদ শুনে ও জ্বলজ্বলে চোখে আমার দিকে তাকায়।

“দাঁড়াও, ওর নামও আমার মনে আছে। সামি।” চিবুকে আঙুল রেখে ও ভাবছে এমন ভান করে, “ছেলেটা তোমাকে পছন্দ করত। তুমিও টুকটাক করতা কিন্তু এখনকার মতো অবস্থা হয় নাই। তোমার মন তো কেনানের অপেক্ষাই করতেছিল, তাই না?”

আমাকে বালিশে মুখ লুকিয়ে ফেলতে দেখে লায়লা হাসে।

“এই অনুভূতিগুলোকে আপন করে নাও।”

“অনুভূতি থাকলেই না,” বালিশের আড়ালে থেকেই জবাব দেই, “থাকলেও কিছুই হইত না। ও এখানে থাকতে চায়, আর আমি চাই চলে যাইতে।” লায়লাকে দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত মনে হয় না। বরং, ওর চেহারায় বিরাজ করে একটা সবজান্তা ভাব।

“আমরা চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সময়টুকুতে অনেক কিছুই হইতে পারে।” বলতে বলতে ও ঘরজুড়ে ঘুরে বেড়ায়। “অনেক অনেক যদি, কিন্তু এবং সম্ভাবনা।”

হঠাৎ থেমে ও নিজের বুকে হাত রাখে। গোধূলির কমলা-গোলাপি আভা ওর উপর এমনভাবে ছড়িয়ে আছে, ওকে সে কোমল আলোয় হুরপরী মনে হয়।

“আবেগ-অনুভূতি মানুষের বুকে আশা জাগায়, সালামা।” হাসে ও। “তোমার কি মনে হয় না এখন আমরা এক আধটু আশার আলো দেখতেই পারি?”

আমি মাথা নাড়ি।

ওর নীলাভ চোখজোড়া উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “কেনানকে তোমার ভাল্লাগে?”

আমার হাতে গায়ের সোয়েটারের পাড়। “কিন্তু এখন ঠিক রোমান্সে ভেসে যাওয়ার সময় না, লায়লা।”

জবাবে ও আমার নাক টেনে দেয়।

“আউ! মারো কেন?”

“আমি তোমাকে কী বলছি? বলছি, অনুভূতি মানুষকে আশার আলো দেখায়। যা কিছু হইতেছে, এসবের মধ্যে সামান্য স্বস্তি খুঁজে নিতে তো সমস্যা নাই, সালামা।”

“ধরো, আমি ওরে পছন্দ করি। আমাদের অপশনই বা কী আছে। আমরা কোথায় যাব, লায়লা? ভাঙাচোরা মার্কেটে ঘুরে বেড়াব? নাকি ওল্ড হোমসের বাইরে গিয়ে, বুলেট থেকে গা বাঁচিয়ে ওরোন্টোস নদীর তীরে পিকনিক করতে যাব? তার উপর আমাদের কোনো অভিভাবকও নাই। আম্মা-বাবা, হামযা কেউ নাই।”

ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করে ও।

“কী হইছে?” প্রতিবাদের স্বরে বলি।

হাসতে হাসতে ও চোখ মোছে। “কিছু না। তুমি আসলে অনেক কিউট। এরপর আমার পাশে এসে বসে। “ওর ব্যাপারে আরো বলো, শুনি।”

ওর নজরের সামনে আমার অস্বস্তি হয়। “ও আসলে… চিন্তায়, কাজে অনেক সৎ একটা মানুষ। খুব রহমদিল। খুবই অন্য রকম মন ওর, লায়লা। আমার বিশ্বাস, ও এখনো স্বপ্ন দ্যাখে। জানিনা, এই পুরো শহরে ওর মতো আর কেউ এখনো স্বপ্ন দ্যাখে কি না। আর ও যখন আমার দিকে তাকায়, আমার মনে হয়… যেন সত্যিকার আমিটাকে দেখতেছে কেউ, যেন এখনো কোথাও একটু খানি আশার জায়গা আছে।”

লায়লা এ গাল ও গাল হেসে আমার হাতটা ধরে। “এই যে, ঠিক এইখানেই আমি তোমাকে দেখতে চাই। যত কিছুই হোক, মনে রাখবা এই পৃথিবীটা শুধু যন্ত্রণার ভেতর বেঁচে থাকার জন্য না। আমাদেরও সুখী হওয়ার অধিকার আছে, সালামা। হয়ত সেটা নিখাদ কোনো সুখ হবে না, কিন্তু ছড়ানো ছিটানো সুখের টুকরাগুলা কুড়ায়ে নিয়েই আমরা নিখাদ সুখ বানাব।”

ভেতরের জখমি হৃদয়টা কাঁপে আমার।

“সালামা,” হাতের চাপ আরো দৃঢ় করে ও বলতে থাকে, “তোমার সুখী হওয়ার অধিকার আছে। এই এখানেই তুমি সুখ ডিজার্ভ করো। কারণ, সিরিয়াতেই যদি তুমি সুখের খোঁজ না করো, জার্মানিতে গিয়েও পারবা না। ইউরোপে পৌঁছে গেলেই তোমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না।”

ওর কথাগুলো আমাকে থমকে দেয়। এভাবে তো কখনো ভাবিনি।

“আমাকে কথা দাও, সুখটুকু তুমি খুঁজে নিবা।” মুখে ওর বিষাদমাখা হাসি। “স্মৃতির মধুরতা এভাবেই আসে।”

ওর কথা শুনে বুঝি, হামযাকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে এই কায়দা করেই বেঁচে আছে ও। এটা ভেবেই দিন গুজরে যাচ্ছে যে, ওর ভালোবাসার মানুষটা খুব অল্প বয়সেই জীবনে এসেছিল, আর তার সাথে কাটানোর ছিল গোটা একটা হায়াত। হামযার স্মৃতিগুলো আঁকড়েই বেঁচে আছে ও, নয়ত এ যন্ত্রণার খপ্পরে পড়ে কবেই শেষ হয়ে যেত।

“ক… কথা দিলাম,” শব্দ দুটো ভীষণ ভারী অনুভূত হয়।

 

চলবে…

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments