আমাদের অসমাপ্ত আলাপসমগ্র

আরমান আল-বাঙালি

১.

লেখা সংক্রান্ত

আমাদের সমগ্র অসমাপ্ত আলাপজুইড়া দেখবেন, একরকমের প্রচ্ছন্নভাব ছড়াইয়া আছে; কোনোকিছু স্পষ্ট হইতেছে না; কিংবা স্পষ্ট একটা জিনিসের ডেপথে যাইতে থাকলে তা আর স্পষ্ট থাকতে পারতেছে না।

আমাদের আলাপসমগ্র—অবশ্যই অসমাপ্ত—অতিমাত্রায় দ্ব্যর্থবোধকতা, ইঙ্গিতবোধকতা আর সুডো কথাবার্তা দিয়া ভরা, আবার এইসবের দাবি রক্ষার্থেই হয়তো আমরা কথারে আরও ব্যাপক আর সামগ্রিক বানাইতে পারি।

আমাদের আলাপে প্রচুর ‘বোধহয়, হয়তো, মনে হয়’ ইত্যাদি অনিশ্চিত শব্দের দেখা পাবেন। কালামরে সমালোচনা-অযোগ্য বানাইতে, গা বাঁচাইতে ও দায় এড়াইতেই এইসকল ধারণাবাচক শব্দের আমদানি। আমরা জানি, আমাদের অনেক দাবি, অনুসিদ্ধান্ত এবং সেগুলার ওপর ভিত্তি কইরা রচিত সিদ্ধান্ত, ভিত্তিহীন ও অমূলক হইতে পারে, কিংবা অপ্রমাণিত। এইজন্য আমরা সেই সকল দাবি, সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্তরে, যেন ওইসব অনেকটা স্বতঃসিদ্ধই বটে, যেন অনেকটা শাশ্বতই বটে, যেন সর্বস্বীকৃত কথাই বটে, এরকম একটা টোন থেকে অবিরাম সংগোপনে পাচার করতে থাকি বাক্যের ভিতরে ভিতরে, গদ্যের ভাঁজে ভাঁজে, একেকটা অনুবাক্য হিসাবে; যাতে বেশিরভাগ পাঠক আমাদের এই ভেকটা, এই ছলটা, এই ভোলটা না ধরতে পাইরা ভুল-শুদ্ধ-প্রমাণিত-অপ্রমাণিত সমস্ত কিছু জড়াইয়া-পলটাইয়া-মিলাইয়া-মিশাইয়া একসাথে গিলতে থাকে, এবং তারা বিষয়গুলারে আলাদাভাবে চিহ্নিত না করতে পারে এবং সেটার বিপক্ষে ফাইট না দিতে পারে; আর আমরাও যেন পুরা সিদ্ধান্ত ও দাবিটারে স্বতন্ত্র একটা বাক্যে বইলা বিপদে না পড়ি; এবং যেন সেটার পক্ষে পর্যাপ্ত দলিল-প্রমাণ হাজিরের দায় এড়াইতে পারি। এইটা আমরা করি নিজেদের মতের পক্ষে জনমত গঠনের স্বার্থে, এইটা আমাদের পলিটিক্স।

এইসব এইসব করতে যাইয়া, এইটা বোধগম্য যে, আমাদের নানা ক্ষেত্রে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় দ্বিমুখী হইতে হয় এবং নিজেদের দ্বিচারিতারে সেলিব্রেট না করলেও সময়ে সময়ে আমাদের ওই বোধটারে রাখতে হয় দাবাইয়া, ভোঁতা বানাইয়া এবং মস্তিষ্কের ওই রাডারটারে বিকল কইরা, যেটাতে আমাদের যাবতীয় কুযুক্তি আর অমূলক বিষয় ধরা পড়ে।

এই সকল স্বঘোষিত অর্থহীনতার পরেও আপনি সামনে পড়তে পারেন। আমরা কোনোরূপ দায় নিতে পারব না যে এইসব পাঠের পর আপনার বিশেষ কোনো ফায়দা হবেই হবে। দায় এড়াইতেই এই লেখা; এবং দোষ স্বীকারের জন্য, নিজেদের ভিতরকার সকল জারিজুরি ফাঁস করার জন্য। এর উদ্দেশ্য, নিজেদের চতুর হিসাবে জাহির করা, নিজেরা কতটা সচেতন তার প্রচার করা, একইসাথে নিজেদের যৌক্তিক অবস্থান ব্যাখ্যা করা এবং অন্যরা আপনাদের থেকে কী লুকাইতেছে তা খুইলা দেখানো।

এটারে আক্ষরিক অর্থেই দোষচর্চা বলতে পারেন। আর একটু ভালো ভাষার প্রলেপ দিয়া যদি বলতে চান যে, এইটা সমালোচনা, যেহেতু সম্যক আলোচনা, তাহলে এর ফলে পাঠকের একটু গুড ফিল হবে এবং তারা আমাদের একটু ভালো মানুষ ভাবতে পারবে, দিনশেষে যা মূল ফোকাস থেকে দৃষ্টি সরানোর নামান্তর এবং ভালো ভাষা ব্যবহারের কাজই এইটা এবং তাতে বাস্তবতা মোটেও বদলায় না।

দোষচর্চার—বা সমালোচনার—উদ্দেশ্য, অবিরাম বিদ্ধ করা। এতকাল তারাই বিদ্ধ হইয়া আসছে, যারা যা করছে, ঘোষণা দিয়া করছে এবং তাদের কাজগুলার শিরোনাম হাইড করে নাই। এইরকম একটা সময়ে, যখন আপনার গর্বের সহিত করা কাজগুলা আপনার ওপর দোষ আকারে বর্তাইতেছে এবং যখন একই কাজ নিঃশব্দে করার কারণে একদল বিদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচতে পারতেছে, তখন তাদেরটার উন্মোচনসহ নিজেদেরও সকল কার্যক্রমের অগ্রীম দায় স্বীকার করা ছাড়া, স্বঘোষিত হওয়া ছাড়া, আমাদের মতে দ্বিতীয় কোনো অপশন নাই।

সন্দেহ নাই, আমাদের বেশিরভাগ বলাই এমন বলা যা ‘বলার অপেক্ষা রাখে না’। মূলত দুনিয়ার শুরু হইতে অন্ত পর্যন্ত এই একই কাজ, কমনসেন্সের কথা স্মরণ করানোর কাজ, বারবার কইরা যাওয়ার দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে বর্তাইছে, যেহেতু মানুষ ভোলে অতিশয়।

আর এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নাই যে, নিজেদের অবস্থানের পক্ষে আমাদের যুক্তি আছে, যেমনটা এর বিপক্ষেও আছে। এটা হয়তো আমাদের দুর্ভাগ্যই যে, আমাদের সামনে চিরকাল দুইটা পক্ষ আছে; আর এই ‘দুই’-এর সংখ্যা অসংখ্য, কারণ আমাদের বিষয়ের সংখ্যাও অসংখ্য।

 

২.

জ্ঞানার্জন ও তার প্রকাশনা সংক্রান্ত

জ্ঞানচর্চার বেলায় সবপক্ষরে পইড়া দেখারে দূষণীয় ভাবি না। খুব সম্ভব সেটাই করা উচিত। তবে যা জরুরি ভাবতেছি তা হইল, যেই পক্ষরেই পড়ি না কেন, তার চিন্তারে নিজের ভিতর পুইরা নেওয়ার আগে এবং সমালোচনা করার আগে তার ও আমার চিন্তার বুনটটা ধরতে পারা লাগবে। নয়তো উভয়টাই ভুল ডিরেকশনে যাইতে পারে।

প্রথমটা, মানে পুইরা নেওয়াটা, এই অর্থে ভুল যে, আমি যা নিজের ভিতর পুইরা নিলাম তা অবিন্যস্ত, খণ্ডিত ও দলছুট একটা চিন্তা বা ভাব আকারে মনের মধ্যে থাইকা গেল; ওই পক্ষের চিন্তার বুনটটা ধরতে না পারার কারণে সেটার স্বরূপ চিহ্নিত করতে পারলাম না এবং নিজের চিন্তার বুনটটা ধরতে না পারার কারণে সেটারে নিজস্ব কোনো বুনটের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলাম না। মানে, উভয় পক্ষের চিন্তার বুনট আমার জেহেনে বিদ্যমান থাকলে সেটারে যেভাবে বিচার কইরা তার স্বরূপ উদ্ধার করতে পারতাম এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ সংস্কার কইরা নিজের চিন্তার জগতের কোথাও উপযুক্ত জায়গা দিতে পারতাম, তা আর করা হইল না। এরকম ‘অজান্তেই’ নিজের ভিতর পুইরা নেওয়া জিনিস সমন্বিত চিন্তার বেলায় আমার কাজে আসবে না কারণ আমি তারে কোনো বুনটের সাথে জুইড়া দিতে পারি নাই। ফলে খুব সম্ভব এরকম জিনিস চিন্তার প্রকাশনার বেলায় হুটহাট কোনো জিনিসের ‘রেফারেন্স’ হিসাবে আসতে চাইবে এবং যেকোনো সময়, যেকোনো খানে উপস্থিত হওয়ার মওকা খুঁজবে; ফলে বড়ো আশঙ্কা যে সেটা এমন বিষয়ের রেফারেন্স না হইয়া বসে যেটার রেফারেন্স হওয়ার সে অযোগ্য। আর যদি সেটারে সমন্বিত চিন্তার সাথে জুইড়া দিতে পারতাম, তাহলে সে চাইলেই এভাবে রেফারেন্স হওয়ার দাবি নিয়া হুটহাট হাজির হইতে পারত না, বরং আসতে হইলে তাকে আমার সমন্বিত চিন্তার সঙ্গে বোঝাপড়া কইরা, তার অনুমোদন নিয়া আসতে হইত।

এবং দ্বিতীয়টা, মানে সমালোচনা করাটা, এই অর্থে ভুল যে, আমি সেটার যে সমালোচনাটা করলাম, তা বিচ্ছিন্ন আকারেই থাইকা গেল। প্রতিপক্ষের ওপর যদি আমি এমন ক্রিটিক হাজির করি, যেটার জবাব তার চিন্তাকাঠামোর মধ্যে আছে অথচ আমি সে ব্যাপারে অজ্ঞ, তাহলে আমার ক্রিটিকটা যথেষ্ট ভিত্তি পাইল না, সেটা একটা খণ্ডিত ও আংশিক সমালোচনা আকারে থাকল। অন্যদিকে যদি আমি তার ও আমার চিন্তার বুনটটা ধরতে পারতাম, তাহলে ক্রিটিক করার সময় সরাসরি সেটার সম্ভাব্য জবাবগুলিরেও বিদ্ধ করতে পারতাম এবং তার সম্ভাব্য জবাবগুলির বিষয়ে একেবারে অজ্ঞ থাকতাম না এবং আমার সমন্বিত চিন্তার তরফ থেকে প্রস্তাবনামুখী সমাধান হাজির করতে পারতাম যদি চাইতাম।

এটা মাথায় রাখা লাগবে যে, আকলভেদে চিন্তার ধরন ও প্রবণতা আলাদা হবে, তাই তার পরিণতি বা উপসংহারও আলাদা হবে। উদাহরণত, পশ্চিমা আকল কীভাবে চিন্তা করে, তার চিন্তার ধরন ও প্রবণতাটা কী, এটা ধরতে পারলে বোঝা সম্ভব হবে যে সম্ভাব্য কী কী উপসংহার আসতে পারে ওই তরফ থেকে। পশ্চিমা আকলের কাছ থেকে পশ্চিমা উপসংহারই আসবে। সেই আকলকে বিদ্ধ না কইরা উপসংহারের সমালোচনা নিয়া পইড়া থাকাতে খুব একটা লাভ নাই। একই বিষয় অন্য পক্ষের জন্যও সত্য।

কাউরে বা কোনো পক্ষরে বিদ্ধ করার আগে চিন্তা করতে পারা লাগবে যে সে বা তারা যেই চিন্তাকাঠামোর লোক তার বাস্তবতায় কী কী সম্ভাব্য জবাব আসতে পারে এবং সেইসব জবাবের অগ্রীম উত্তরও নিজের প্রকাশনার ভিতরে দিয়া রাখা লাগবে।

 

৩.

সংবাদপত্র পাঠ সংক্রান্ত

আগামী প্রজন্মের উন্নত শিক্ষার জন্য প্রতিটা পরিবারে সংবাদপত্র পাঠের প্রচলন থাকা জরুরি ভাবতেছি। এতে সংবাদপত্রের ভাষার স্তরটা একজন শিক্ষানবিশ দ্রুতই পার করতে পারবেন এবং পরের ভাষাস্তরের দিকে দ্রুত যাওয়ার সুযোগ পাবেন।

আগে সংবাদপত্র পাঠ করতে পারা ছিল শিক্ষিত হওয়ার প্রমাণ। কিন্তু এখন দুঃখজনকভাবে আমার চারপাশে এমন অনেক শিক্ষানবিশ দেখি, যারা সংবাদপত্রের বাংলাটাকেও বশে আনতে পারেন নাই। অথচ সংবাদপত্রের ভাষা একটা গণমুখী ভাষা। সর্বোচ্চ বোধগম্য ভাষায় লেখার চেষ্টা করা হয় সংবাদপত্রে। এরকম ভাষাস্তরে একটা দেশের প্রতিটা নাগরিকের বিরাজ করা উচিত। একটা দেশের আমজনতার ভাষার স্তর যদি সংবাদপত্রের ভাষাস্তরের চাইতেও নিচে হয় তাহলে উনাদের যেকোনো সিরিয়াস কিছু বুঝাইতে আমাদের অত্যন্ত বেগ পাইতে হবে এবং উনারা সস্তা তাড়নায় তাড়িত হওয়ার জন্য সর্বদা উন্মুখ হইয়া থাকবেন।

এই ক্ষতি শুধু উনাদের না, উনাদের পরবর্তী প্রজন্মরেও গ্রাস করবে। এরকম একটা নিম্ন পর্যায়ের ভাষাস্তরের ভিতরে বড়ো হওয়ার দরুন পরের প্রজন্ম চিন্তার অক্ষমতায় ভুগবে এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হবে।

আমি নিজে বহু শিক্ষার্থীকে আরবি-ইংরেজি ভাষা পড়া শিখতে স্ট্রাগল করতে দেখছি শুধু এই কারণে যে উনারা প্রয়োজনীয় পরিমাণ বাংলাটা, অন্তত সংবাদপত্রের স্তরের বাংলাটা, জানেন না। তো যেই ‘ভাব’ বাংলাতেই তার ভিতরে মজুদ নাই, বাংলাতেই যিনি বিষয়টা বোঝেন না, তিনি ওইটাকে একটা বিদেশি ভাষায় কেমনে বুঝবেন আর কেমনেই বা রিলেট করবেন?

এটা যে শুধু ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ তা না। শাস্ত্রীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। একজন শিক্ষার্থী যিনি বাংলা রিডিংয়ে অভ্যস্ত না, মানে বাংলাটা পড়ামাত্র অনায়াসে বোঝেন না, বিরতি নিয়া তার চিন্তা করা লাগে, তিনি পরিভাষায় ঠাসা একটা শাস্ত্রীয় বই খুইলা কী বুঝবেন?

একদিকে এই তাদের অবস্থা, অন্যদিকে যেকোনো বিষয়ের গভীরতম জ্ঞান অর্জনের জন্য আবার পড়ারও বিকল্প নাই। কারণ রচনার ভিতরেই চিন্তার গূঢ়তম প্রকাশ ঘটছে। এই মাধ্যমে যেভাবে জ্ঞান সঞ্চয় করা গেছে তা আর অন্য কোনো মাধ্যমে যায় নাই। রচনায় যেভাবে একটা বড়ো চিন্তার সংগঠন সম্ভব হইছে, শব্দের পর শব্দ জুইড়া দিয়া একজন ফিকশন রাইটার যেভাবে উনার কল্পনার দুনিয়া তৈয়ার করতে পারছেন কিংবা একজন দার্শনিক যেভাবে উনার নিজস্ব জগৎ নির্মাণ করতে পারছেন, তা কোনোদিনই সম্ভব হয় নাই অন্য কোনো মাধ্যমে।

তো যেই প্রজন্ম পড়তে অভ্যস্ত না, একটা জিনিস পড়ামাত্র বোঝে না, মানে উপর লেভেলের কথাবার্তাই অনায়াসে পইড়া বোঝে না, তারা কীভাবে ওইসব গূঢ় চিন্তার ভিতরে ঢুকবে?

সমস্যা আরও গুরুতর সংকটে রূপ নেয়, যখন এরকম নিম্ন পর্যায়ের ভাষাস্তরে থাকা আমজনতার জন্য লেখকেরা কম্প্রোমাইজ করেন এবং ‘সহজ’ কইরা লেখতে বসেন। তখন মূলত যা ঘটে তা হইল সবকিছুকে উনাদের ওই সংবাদপত্রের বাংলাটাও না জানা আমজনতার মাপে খাটো কইরা আনতে হয়।

দুষ্টচক্রটা দেখেন—আমজনতার মধ্যে পাঠের অভ্যাস নাই, উনারা খালি ভিডিয়ো দেখেন, ফলে উনাদের ভাষিক জ্ঞান সংবাদপত্রেরও নিচের পর্যায়ের, ফলে উনারা বাংলা বই হাতে নিলেই বলেন ‘কঠিন লাগে’, এভাবে একটা গণভাবশূন্য দশার ভিতর বইসা একজন লেখক তাদের জন্য সহজ ভাষায় লেখতেছেন, সেইসব পইড়া যে পাঠকশ্রেণি গইড়া উঠতেছে, তাদের চাহিদার মাপে আবার লেখা উৎপাদন করতেছেন পরের প্রজন্মের লেখকেরা, অন্যথায় পাঠকদের তরফ থেকে তারা অনাদরের শিকার হইতেছেন। তাহলে প্রশ্ন আসে যে উনারা আসলে কী লেখতেছেন? একটা দেশের সামগ্রিক জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলে এটা কি আদর্শ অবস্থা যে পাঠকশ্রেণি একটা নিম্ন ভাষাস্তরের মধ্যে থাকবেন এবং তাদের বিচারে যা সহজ, তাদের চিন্তার মাপে যা হজমযোগ্য, তার দিকে আসার জন্য লেখকসম্প্রদায়কে অনবরত ঠেলতে থাকবেন?

জ্ঞানচর্চার অনুকূল পরিবেশ তৈয়ারের লক্ষ্যে, অতএব, আমাদের আমজনতার পাঠাভ্যাস নিয়া সিরিয়াসলি ভাবার প্রয়োজন দেখা দিতেছে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় সংবাদপত্র পাঠ হইতে পারে একটা কার্যকর সমাধান। সংবাদপত্র আমজনতার ভাষাজ্ঞানকে একটা স্ট্যান্ডার্ডে রাখবে; তাদের ভাবের বড়ো একটা অংশকে ভাষা দিবে; যেইসব কথা তারা আমতা আমতা কইরা বলত, শব্দের সঙ্গ পাওয়ায় এবার সেগুলিতে জোর আসবে; তাদের মধ্যে একটা অংশ হয়তো ভবিষ্যতে পাঠক ও লেখকও হইয়া উঠতে পারে কিংবা ওইসব যদি নাও হয় অন্তত তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপর এর একটা ছাপ অবশ্যই পড়বে।

আমার নিজের কথাই বলি। ছোটো থেকে বাসায় পত্রিকা রাখা হয় দেইখা আসছি। আমি বাংলা পড়া শিখছিই পেপার থেকে। দৈনিক যুগান্তরে খুব সম্ভব শুক্রবার ছোটোদের জন্য সাহিত্যপাতা থাকত একটা। নাম যদ্দূর মনে পড়ে ‘আলোর নাচন’। সেই ‘আলোর নাচন’ পড়ার জেদ থেকেই শিখছিলাম বাংলা রিডিং পড়া। তারপর ওই অর্ধপাতার গল্প-কবিতায় যখন আর মন ভরতেছিল না তখন হাত বাড়াইছিলাম আস্ত বইয়ের দিকে। ক্লাস ওয়ানের আগেই শেষ করছিলাম ভূতের গল্প, ঈশপের গল্প, মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্পসহ আরও শিশুতোষ যা যা। আজকে যদি দুই পাতা পড়তে পারি আর দুই কলম লেখতে পারি, তার পিছনে ওই ‘আলোর নাচন’-এর ভূমিকার কথা অস্বীকার করি কেমনে?

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments