ক. মুকদ্দমা
আবদুর রহমান তহা ভাষাদর্শন, যুক্তিতত্ত্ব ও নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে এ সময়কার একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক আর মুঈনুদ্দীন আহমদ খান বাংলাদেশ ইতিহাসের ব্রিটিশ পর্ব বিষয়ে একজন প্রতিনিধিত্বশীল গবেষক। এ প্রবন্ধে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এই দুজন মোহাক্কেকের কবিতার সত্যাসত্য বিষয়ক ভাবধারাকে তুলনামূলকভাবে পাঠ করার চেষ্টা করা হবে।
প্রফেসর তহা দীর্ঘ সময় নিয়ে তুরাস বা ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য অধ্যয়ন করেছেন; এদিকটি বিবেচনায়, তিনি শুধুই দার্শনিক নন।
আবার, প্রফেসর খান ইসলামের পরিসরে দার্শনিক চিন্তার পটভূমি, সে সঙ্গে যুক্তিতত্ত্ব নিয়েও কাজ করেছেন; এ অর্থে তিনি নিছকই ইতিহাসবিদ নন।
এখানে আমরা তহা ও ড. খানের লিখিত টেক্সটের কিছু নির্বাচিত অংশ পাঠের কোশেশ করব।
এই পাঠের আওতায়: ১. প্রথমত, উভয়ের এ সংশ্লিষ্ট ভাবধারা তাঁদের নিজস্ব ও অভ্যন্তরীণ যুক্তিতে তুলে ধরা হবে; ২. দ্বিতীয়ত, গুণাগুণের দিক থেকে এগুলোকে আবার পরস্পরের মোকাবিলায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার চেষ্টাও থাকবে; এবং ৩. এরূপ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক-তুলনামূলক উপস্থাপন শেষে আমাদের পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হবে।
তবে আমাদের দিক থেকে পাঠকের কাছে অনুরোধ হলো, এটিকে ব্যাখ্যামূলক ও সহানুভূতিশীল পাঠ হিসেবেই যেন বিবেচনা করা হয়।
খ. মূল সুআল এবং লেখায় ব্যবহৃত পদ্ধতি
প্রাথমিকভাবে এ লেখাকে আবদুর রহমান তহা ও মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের লিখিত কিতাবের কিছু নির্বাচিত অংশের পুনর্গঠনমূলক ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এটি করতে গিয়ে আমরা সহানুভূতিশীলতা অবলম্বন করব। এক্ষেত্রে আমাদের আলাপ নিম্নের কেন্দ্রীয় সুআলের জওয়াব অনুসন্ধানকে ঘিরে আবর্তিত হবে:
আবদুর রহমান তহার বুদ্ধির পুনর্গঠন-নির্দেশক বিন্যাসে এবং মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের জ্ঞানের প্রকারতত্ত্বে কবিতার সত্তাতাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক মর্যাদা কী?
এ সুআলের জওয়াব অনুসন্ধানে আমরা তহা ও প্রফেসর খান লিখিত কিছু টেক্সটের নির্বাচিত অংশগুলো এমনভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করব, যাতে এতে নিজের মত যোগ করতে না হয়। ফলে এ তরিকা প্রয়োজনীয়ভাবেই উপস্থাপনমূলক ব্যাখ্যা (expository) হিসেবে দৃশ্যমান হবে, ব্যাখ্যা-নির্ভর অর্থ-উদ্ঘাটন (interpretative)-সূচক হবে না।
যদিও গবেষণা-নির্দেশক ও পর্যালোচনামূলক প্রবন্ধের চরিত্র নিরিখে এতে আলাদাভাবে কবিতা, জ্ঞান, ইলহাম, সত্য ও নৈতিকতা এবং এদের পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে সম্ভাব্য আলোচনার জন্য কোনো উপশিরোনাম থাকবে না; তবে, আমাদের-কৃত উপশিরোনাম-আওতাধীন সম্ভাব্য আলাপগুলোতে উল্লেখিত সমস্যাক্ষেত্রগুলোর আলাপ গাঠনিকভাবে প্রোথিত আকারে হাজির হবে।
এ লেখাটি যে ধরনের সাময়িকীর জন্য লিখিত হচ্ছে, তার চরিত্র বিবেচনায় এ নমনীয় ও অনানুষ্ঠানিক কাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে।
গ. আবদুর রহমান তহার কবিতার জগতে ফেরা
আবদুর রহমান তহা তাঁর লিখিত কিতাবগুলোর মধ্যে ইংরেজিতে অনূদিত একমাত্র কিতাব Dialogues for the Future (حـوارات مـن أجـل الـمـستـقـبـل)-এ বলেছেন: “Perhaps I will return to the life of poetry after the completion of my intellectual project, as poetry is said to transport the spirit to the remote worlds. …” [“সম্ভবত পরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর আমি আবার কবিতার জগতে ফিরে যাব, কারণ বলা হয় কবিতা মানুষের আত্মাকে দূর-দূরান্তের জগতে নিয়ে যায়।…”][1]পৃষ্ঠা: ১০৬
এ বাক্য তহার বুদ্ধিবৃত্তিক তাগাদা সম্পর্কে কী ধরনের ভাবধারণা দেয়? ১. তহার সচেতন কর্মযজ্ঞ হলো পরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকল্পগুলো; ২. কিন্তু তাঁর ফিতরতি স্বতঃস্ফূর্ততা হলো কবিতা।
তহা খুব অল্প বয়সেই কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন এবং সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালের জুন মাসের আরব ও ইসরায়েল যুদ্ধ তাঁকে কবিতার পথ থেকে মহান চিন্তকদের চিন্তা করার ধরন রপ্ত করার পথে নিয়ে আসে এবং তিনি স্বেচ্ছায় কবিতা লেখা ছেড়ে দেন। তহা কবিতা লেখা বন্ধ করেছিলেন কোনো “অবজ্ঞা বা প্রত্যাখ্যানের কারণে নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত করার জন্য” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১০৬)-ই। তিনি মননের কার্যপ্রণালী বুঝতে চেয়েছিলেন, এ বিষয়ে দক্ষতাহীন আরবরা তাঁদের মহৎ ইতিহাস ও বিশাল জনসংখ্যা সত্ত্বেও ঐ সময় পরাজিত হচ্ছিল।[2]প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১০৬
আবার, কবিতা কেন তাৎপর্যপূর্ণ? কারণ কবিতার সম্পর্ক আত্মার সঙ্গে এবং এটিই আত্মার সফরকে ক্রমাগত করে তোলে।
কবিতা কীভাবে আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত? এ সুআলটির জওয়াব খোলাসাভাবে হাজির করার জন্য তহার দার্শনিক বিন্যাসে অন্তর্দৃষ্টি বা উপলব্ধি বা উদিত হওয়া (حدس) এবং অনুমিত যুক্তি (استدلال) কীভাবে বোধগম্য সেটা বোঝা দরকার।
গ.১ অন্তর্দৃষ্টি ও অনুমিত যুক্তি
প্রচলিত ভাবধারায় মনে করা হয়, অন্তর্দৃষ্টি দুই ধরনের: একটি হলো মানসিক অন্তর্দৃষ্টি, যার সম্পর্ক অনুমিত যুক্তির সঙ্গে; অন্যটি হলো মেটাফিজিক্যাল অন্তর্দৃষ্টি, যা প্রত্যক্ষ উপলব্ধি সূচিত করে এবং এটি অনুমিত যুক্তির অধীন নয়।
কিন্তু অধিবিদ্যাগত অন্তর্দৃষ্টিও মননশক্তিজাত, কাজেই মানসিক প্রকৃতির।[3]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা: ২৬-২৭ ফলে এটিকে বিশেষ ধরনের যুক্তির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়, যাকে তহা বলেন সংবদ্ধ যুক্তি (الاستدلال المطوي)। অর্থাৎ এমন কিছু যুক্তি আছে যেগুলোর প্রারম্ভিক ভিত্তির (premise) কিছু অংশ হাজির থাকে এবং কিছু একেবারেই অনুপস্থিত থাকে; এক্ষেত্রে গ্রহণকারী প্রেক্ষাপট থেকে নিজেই ঐ না-থাকা বা অনুপস্থিত অংশ পূরণ করে নেয়।
একইভাবে, অন্তর্দৃষ্টি নিজস্ব অর্থে এক ধরনের যুক্তিই হাজির করে, যার প্রারম্ভিক ধাপগুলো সংকুচিত অবস্থায় থাকে। আসলে যিনি অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে উপলব্ধি করেন, তিনি বিষয়টির ওপর এত বেশি অনুশীলন ও গভীর পরিচিতি অর্জন করেন যে তিনি কোনো মধ্যবর্তী ধাপ ছাড়াই সরাসরি উপলব্ধি করেন, অন্যরা তা মধ্যবর্তী ধাপ বা যুক্তি ছাড়া অর্জন করতে পারে না। ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান একে বলেছেন “ব্যাপক অভিজ্ঞতাভিত্তিক ধীশক্তি”।[4]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ২৯
মানুষের সঙ্গে জগতের সম্পর্ক লিপ্ততার এবং এভাবেই মনুষ্য প্রজাতি তার অস্তিত্ব অনুভব করে। এ সম্পর্ক ধীরে ধীরে কোনো বিষয়ের ওপর যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত করতে পারে। এই দিকটিকে আরও বিস্তারে এভাবে বলা যায়, আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়া যখন একটিমাত্র নমুনা বা বস্তু পর্যবেক্ষণে শুরু হয় তখন সংশ্লিষ্ট জানাটি সীমিত ও একদেশদর্শী থেকে যায়। এক্ষেত্রে বিষয়টির পূর্ণমান বা সামগ্রিক বোধগম্যতা ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় সম্ভব হয় না। সুতরাং জানাটিকে সামগ্রিক ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করার জন্য একই রূপের সমস্ত নমুনা বা বস্তু পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
কিন্তু মানুষ যখন কোনো কিছুতে দৃষ্টি দেয় বা পর্যবেক্ষণ করে তখন সে এক মুহূর্তে এক বিন্দুতেই নিবদ্ধ থাকতে পারে।[5]প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৬ অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টি বা পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা এক মুহূর্তে এক বিন্দুতে বা বস্তুতে নিবদ্ধ থাকে।
এমনকি এক বস্তুর বেলায়ও দেখা যায়, আমরা এক মুহূর্তে নিজেদের হাতকে চোখের সামনে ধরলে এর এক পিঠই দেখি এবং অন্য পিঠ আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে থাকে। এ কথা আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণে যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সত্য দূরবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণেও।
এ বিবেচনায় বলা যায়, মুহূর্তে মুহূর্তে বিন্দু বিন্দু করে একটি বস্তুকে বা বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে পর্যবেক্ষণ বা জানতে হলে তাতে অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন হয়। কারণ একদিকে, কেবলমাত্র পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ দ্বারা একজাতীয় বস্তুর বিশ্বজনীন জ্ঞান অর্জন সম্ভব না; অন্যদিকে, একই পদ্ধতিতে মুহূর্ত মুহূর্ত প্রবাহমানতায় বিন্দু বিন্দু করে কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয় বা বস্তুর সার্বিক জ্ঞান অর্জনও অসম্ভব।
আমরা জানি, কোনো বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধান বা জানার চেষ্টার মাত্রা আর ঐ বিষয় সম্পর্কে অর্জিত বোধগম্যতার মাত্রা পরস্পর সমানুপাতিক নয় বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। মানুষের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে প্রায়শই অর্জিত বোধগম্যতা অনুসন্ধানের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো সময় অনুসন্ধান বা পর্যবেক্ষণের ধারায় সম্পূর্ণরূপে অভাবিত ও নতুন জ্ঞান বা বোধগম্যতার উদয় হয়। আবার, অনেক সময় পর্যাপ্ত অনুসন্ধান বা পর্যবেক্ষণ ছাড়াও পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ হয় বা বোধগম্যতায় পৌঁছানো যায়।
এক্ষেত্রে, মানুষ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামষ্টিক স্মৃতি, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রজ্ঞা ও পুনরাবৃত্তিমূলক চর্চার মাধ্যমে কোনো কাজ সম্পাদন করলে বা কোনো বিষয় পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝার চেষ্টা করলে বা সামগ্রিক পর্যবেক্ষণকে অভ্যাসে রূপান্তর করলে, তখন এ সামগ্রিক কর্মযজ্ঞের ফলাফল অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়।
এক্ষেত্রে প্রথম দিকে দৈহিক বল ও মনের একাগ্রতার সংযোগে যে কাজ করে যেতে হতো, অন্তর্দৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়ে পরবর্তীতে তা যখন পুনরাবৃত্তি হতে হতে অভ্যাস আকারে সঞ্চারিত হয়, তখন স্বাভাবিক হয়ে ওঠে বা আকারে রূপায়িত হয়ে ওঠে। আরও পরে এ স্বভাব প্রকৃতিকে রদবদল করে দেয়। অনায়াসে মানুষ কম একাগ্রতা, স্থূল পর্যবেক্ষণ ও খণ্ডিত অনুসন্ধানেও গভীর ও সামগ্রিক বোধগম্যতায় পৌঁছাতে পারে।
ফলে তহা উল্লেখিত সংকুচিত অন্তর্দৃষ্টিকে যদি জৈবিক রূপকে ভাবা হয় তাহলে এভাবে বলা যায়—জিন (genes) যেমন মানুষের জীবনকে ধারণ করে রাখে, তেমনি অন্তর্দৃষ্টিও যুক্তিকে আচ্ছাদিত করে রাখে।
অনেকটা এ রকম: “ইশারা কথার চেয়েও বেশি অর্থবহ।” অর্থাৎ শব্দের অর্থের সঙ্গে এত বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় যে, সম্পূর্ণ অর্থ বোঝার জন্য কেবল একটি ইশারাই যথেষ্ট হয়ে যায়।
সুতরাং আমরা যাকে বোধগম্যতা বা বোঝাপড়া বা জ্ঞান বলছি তা ওতপ্রোতভাবে অন্তর্দৃষ্টিপরিবেষ্টিত। কাজেই অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তি একই সত্যের দুটি ভাষা বা দুটি রূপ হিসেবে কাজ করে।
তহা এভাবে বলেছেন: “If someone asks me what is intuition (ḥids), I would say ‘intuition is an encapsulated deduction’. If they ask me what is sensitivity (ḍawq), I would say ‘sensitivity is an encapsulated reason’; if by contrast, they ask me what is deduction, I would say ‘deduction is a refracted intuition (ḥids manshūr)’, and if they ask me what is reason I would say ‘reason has a prism (al-ʿaql dhū manshūr)’.” [“কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, অন্তর্দৃষ্টি (حدس) কী; আমি বলব, ‘অন্তর্দৃষ্টি হলো সংকুচিত যুক্তি।’ তাঁরা যদি এও জিজ্ঞেস করে, অনুভূতি বা স্বাদগ্রহণ (ذَوْق) কী; আমি বলব, ‘এটি সংকুচিত বুদ্ধি।’ এ জওয়াবগুলোর মোকাবিলায় তাঁরা যদি জিজ্ঞেস করে, অনুমিত যুক্তি (استدلال) কী; আমি বলব, ‘যুক্তি হলো বিকীর্ণ অন্তর্দৃষ্টি (حدس منتشر)।’ তাঁরা যদি আরও জিজ্ঞেস করে, বুদ্ধি (reason) কী; আমি বলব ‘বুদ্ধির একটি প্রিজম আছে (العقل ذو منشور)…'”][6]আবদুর রহমান তহা, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ১০৪-১০৫
উপরের আলাপ থেকে এ বিষয়টা পরিষ্কার যে, তহা ইনটুইশন বা অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তিকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যসূচক অর্থে স্বতন্ত্র বিবেচনা করেননি। তাঁর ভাবধারা অনুযায়ী, যুক্তিতে অন্তর্দৃষ্টি থাকে; আবার, অন্তর্দৃষ্টিতেও যুক্তি থাকে।
প্রশ্ন হলো: তাঁর ভাবনায়, কবিতার মুহূর্ত হিসেবে যেটি চিহ্নিত হয় তার মৌলিক প্রকৃতি কী? এটি কি অন্তর্দৃষ্টিসূচক? নাকি এটি আত্মপ্রসঙ্গ, স্মৃতি আর সংঘর্ষের মুহূর্ত নির্দেশক?
এ প্রশ্নগুলোর অনুসরণ আমরা মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের আলাপে সংশ্লিষ্ট করে করব। তার আগে বৃহদার্থে আবদুর রহমান তহার নন্দনতত্ত্বের আলাপে যাওয়া যাক।
গ.২ নন্দনতত্ত্ব
তিনি বলেন, মানুষের মানবিকতা পূর্ণতা পায় দুটি মাত্রার সমন্বয়ে। অন্যভাবে বললে, মানুষ হিসেবে তার মানবিকতা দুটি মাত্রা ধারণ করে। এক. অতুলনীয় বা জালালি মাত্রা (sublime বা جلال) দুই. নান্দনিক বা জামালি মাত্রা (aesthetic বা جمال)
জালালি মাত্রা যেসব বিষয়-আশয় নির্দেশক, যেগুলো মানুষকে অন্তর্গতভাবে ক্ষমতায়িত করে; যেমন: জ্ঞান, চিন্তা, যুক্তি, শিল্প ও প্রযুক্তি ইত্যাদি।
জামালি মাত্রা বলতে অন্তর্গতভাবে মানবীয় মূল্যবোধ নির্দেশক বিষয়-আশয় বোঝায়; যেমন: সাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক, সংগীত ইত্যাদিসহ সমগোত্রীয় মূল্যবোধগুলো, যেগুলো মানুষের চিত্তে উৎকর্ষতা ও শুদ্ধতার অনুভূতি নিয়ে আসে।
তহার মতে, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের পাবলিক ও ব্যক্তিগত পরিসরের জীবন অবশ্যই এই দুই মাত্রার সমবায়ে হবে; তাহলেই সে হবে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাভাবিক মানুষ।
সমস্ত দার্শনিকের মতো তহারও একটি জালালিয়্যতের এবং আরেকটি জামালিয়্যতের তত্ত্ব আছে।
তবে, আমরা এখানে জামালিয়্যতের তত্ত্বে নজর দেব। তাঁর জামালিয়্যতের তত্ত্ব তিনটি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
এক. সৌন্দর্য বা নান্দনিকতা একটা কল্যাণধর্মী আনন্দ নিয়ে আসে, যা নিজের বিকাশকে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্য মানুষের প্রচেষ্টাগুলোকে বাড়িয়ে দেয়। একজন যত বেশি নান্দনিকতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্তর বা পর্যায়গুলো অতিক্রম করবে, সে তত বেশি মানবিকতার পর্যায়ে নিজের অবস্থানকে ক্রমাগত উঁচু থেকে উঁচুতে উন্নীত করবে।
এ প্রথম বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বোঝা যায়, সৌন্দর্যের অনুশীলন হিসেবে কবিতা প্রয়োজনীয়ভাবেই আত্মার সফর ক্রমাগত করে তোলে; আরও মূর্ত অর্থে কবিতা লেখা মানবিকতার পর্যায়ে নিজের অবস্থানকে ক্রমাগতভাবে উঁচু থেকে উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার কর্মকাণ্ড।
দুই. নান্দনিক মূল্যবোধ কখনোই নীতি-নৈতিকতার সঙ্গে বিরোধার্থক না। সৌন্দর্যের অনেক স্তর রয়েছে। সর্বনিম্ন স্তর হলো দৃশ্যমান সৌন্দর্য এবং সর্বোচ্চ স্তর হলো দূরবর্তী ও অন্তরালের সৌন্দর্য। এই দুইয়ের মাঝে স্তরসংখ্যা অসংখ্য। একইভাবে, নীতি ও নীতিশাস্ত্রের পর্যায়েও অসংখ্য স্তর রয়েছে। সীমাবদ্ধ দৃশ্যমান নৈতিকতা আর মুক্ত ও অন্তরালের নৈতিকতার মাঝে অসংখ্য স্তর।
একজন যখন দুই ভিন্ন ভিন্ন মূল্যবোধের যেকোনো একটিতে উচ্চ স্তরে পৌঁছান, তখন অন্যটিতেও তাঁর উত্তরণ ঘটে। এভাবে কেউ যখন একটির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছান, তখন তিনি অন্যটির সর্বোচ্চ স্তরেও পৌঁছে যান। এই দুই মূল্যবোধ নির্দেশক পরিসর কেবল নিম্ন স্তরেই আলাদা আলাদাভাবে মওজুদ প্রতীয়মান হয়, কিন্তু উচ্চ স্তরে তারা একত্রে অবস্থান করে। সুতরাং যা অত্যন্ত নান্দনিক, সেটিই অত্যন্ত নৈতিক এবং একইভাবে এর বিপরীতটিও সত্য।
তহার নন্দনতত্ত্বের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে যে, কবিতায় সৌন্দর্যের দিক যে উৎকর্ষের ঘটনা ঘটে, তা একই সঙ্গে কবির নীতি-নৈতিক উৎকর্ষ তথা আত্মার পরিশুদ্ধতার সূচকও। এ অর্থে কবিতার সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক খুবই প্রত্যক্ষ।
তিন. বর্তমান অধিপতিশীল সভ্যতার এই বৈশ্বিক দশায় জালালি বা মহিমান্বিত দিক থেকে অবদান রাখার সুযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর। এক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা ও দয়াশীলতার তথা জামালি দিক থেকে অবদান রাখার সম্ভাবনা অবারিত।
সুতরাং তিনি আরব-ইসলামি বিশ্বকে সর্বোচ্চ স্তরের শক্তি ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে অবদান রাখতে না পারার ব্যর্থতাকে জামালি পথে পরিচালিত হয়ে সাফল্যের মাধ্যমে অতিক্রম করে যেতে বলেন। এক্ষেত্রে, এই সহস্রাব্দে মানুষের জন্য অমূল্য ও অপরিসীম নীতি-নৈতিক ও নান্দনিক মূল্য উপহার দেওয়া সম্ভব এবং যারা এর প্রয়োজন অনুভব করবে, তা তাঁদের জন্য সর্বোচ্চ শক্তি ও ক্ষমতার চেয়েও বেশি পরিগণিত হবে।
সুতরাং মনুষ্য প্রজাতিকে তাঁদের সমস্ত অর্জনসহ আরও অগ্রসর করে নেওয়ার জায়গায় তহা জামালিয়্যতের পরিসরকেন্দ্রিক অবদানকে কাজেই গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন।
উপরে তিন বৈশিষ্ট্যের আলাপ থেকে বোঝা যায়, তহার নন্দনতত্ত্বে কবিতাচর্চা অত্যন্ত উচ্চ মূল্যবোধ নির্দেশক। কিন্তু তিনি নিজে কেন আবার কবিতার জগতে ফিরতে চান?
গ.৩ ভাষার আদি চর্চা, অস্তিত্বের সমগ্রতা ও রুহানি পুনরুজ্জীবন
তিনি বলছেন সুন্দর ও প্রভাবশালীভাবে কথা বলার ভিত্তি তৈরি হয়েছে কবিতা থেকে। তাঁর মতে, প্রথম বলা কথা কবিতাই ছিল, গদ্য না। ফলে প্রথম কথা প্রতীকী বা রূপকধর্মীই ছিল। সত্য যেখানে মানসিক নির্মাণ, সেখানে প্রতীক বা রূপক ফিতরতে সন্নিবেশিত। রূপক কেবল তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তা কবিতায় অবস্থান করে।
সুতরাং কবিতায় ফেরা মানে ভাষার ভিত্তিতে ফেরা, ভাষার আদি চর্চায় ফেরা এবং এর মাধ্যমে নিজের মানবতাকে ধরে রেখে একে পরিপূর্ণতা দেওয়া।
অস্তিত্বের ভাষা কবিতাময়। যে অন্তর্নিহিত দশায় আমরা মওজুদ থাকি তাসহ আমাদের পরিপার্শ্বের জগৎ ও জীবনের রূপগুলো খুবই জীবন্ত ও কোলাহলমুখর। কিন্তু এটি সংকেত-আলামত-চিহ্নের জগৎ, আমাদের ভাষার জগৎ নয় মোটেও এবং আমাদের আবেগ-অনুভূতি এটা বুঝে নিতে পারে।
কবিতার সত্য হলো এই, এটির জন্মই হয় আলামত বা চিহ্নের উপলব্ধি থেকে। কবিতা সেসব আলামত বা চিহ্নকে প্রকাশ করে, যা আমাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা ও আমাদের চারপাশের জগৎও প্রকাশ করে।
কবিতার জগতে ফেরা তাই সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে সংযোগে ফেরা এবং একই সঙ্গে মানব অস্তিত্বের পরিপূর্ণতা প্রকাশের তরিকায় ফেরা।
কবিতার ক্ষেত্র বিমূর্ত যুক্তি (abstract reason বা العقل المجرد)-কে অতিক্রম করে যায়; পক্ষান্তরে, গদ্য বিমূর্ত যুক্তিরই পদচিহ্ন বয়ে চলে। যুক্তির অন্তরালের হাকিকত অনুসন্ধানের জন্য উল্লেখিত পদচিহ্নের বাইরে অন্য কোনো উপায় ব্যবহারের দরকার পড়ে এবং এ অনুসন্ধান কবিতাই সম্ভবপর করে তোলে; কারণ এটি মানুষকে স্তর থেকে স্তর ভেদ করে যেতে সাহায্য করে এবং অন্তরালের জগৎ ও অসীম দিগন্ত মানুষের সামনে উন্মোচিত করে।
সুতরাং এদিক থেকে, তহার জন্য কবিতায় ফেরা মানে ঐ অসীম সাগরে নিমজ্জিত হওয়া এবং এর মাধ্যমে তহার রুহানিয়্যাত একটি পুনরুজ্জীবনের শাহাদাতও পেশ করবে।
কীভাবে এটি সম্ভবপর? এ বিষয়টির একটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণে আমরা তহাকৃত বুদ্ধির প্রকারভেদ, মানুষের কামালিয়্যাতে জামালি ও জালালি মাত্রার ভূমিকা এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ইলহাম (إِلْهَام)-এর স্বরূপ ইত্যাদি বিষয়ের অবতারণা করব।
গ.৪ তহার সামগ্রিক দর্শনের অভিমুখ প্রসঙ্গে বুদ্ধির প্রকারভেদ, মানুষের কামালিয়্যাত ও ইলহামের স্বরূপ
তহা তাঁর আমাল আল-দ্বীন ওয়া তাজদীদ আল-আকল (عمل الدين وتجديد العقل) কিতাবে পশ্চিমা দর্শনের বিমূর্ত বুদ্ধির আধিপত্যের জওয়াবে দার্শনিক প্রতিরোধ হিসেবে এবং তত্ত্ব বনাম অনুশীলন বহুল চর্চিত দ্বন্দ্বের মীমাংসায় আকল বা বুদ্ধির তিনপ্রস্থীয় পুনর্গঠন প্রস্তাব করেন। হাল্লাকের ভাষায় এটি হলো “মুখের কথা ও কাজের মধ্যে কিংবা ঘোষিত ইচ্ছা ও আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগ ও প্রায়োগিক নীতিশাস্ত্রের যে অমিল বা দূরত্ব—তার বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি…”[7]ওয়ায়েল হাল্লাক, ২০১৯, পৃষ্ঠা: ১৫২
এক. আল-আকল আল-মুজাররাদ (العقل المجرد বা বিশুদ্ধ/বিচ্ছিন্ন বুদ্ধি): সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক, বস্তুগত এবং মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ, যা পশ্চিমা আধুনিক দর্শনের ভিত্তিকে রূপায়িত করে তুলেছে; নৈতিকতাবর্জিত, লজিক্যাল ও দার্শনিক সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত।
বিশ্লেষণী অর্থে বুদ্ধি এমন একটি কাজ বা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি কোনো বিষয়ের একটি নির্দিষ্ট দিক বা রূপকে নিজের মনে স্থান দেয় এবং স্থান দেওয়ার এই সামগ্রিক প্রক্রিয়াটিকে সত্য বলে গণ্য করে। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই ধারণাকে সত্য বলে রায়ও দেওয়া হয়। সুতরাং বুদ্ধি নিছকই একটি কাজ বা প্রক্রিয়া।
কিন্তু এভাবে সত্য বলে গণ্য করা ও সত্য বলে রায় দেওয়ার প্রবণতা আমাদের সামনের দৃশ্যমান সবকিছুকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বস্তুনিষ্ঠ করে তোলে এবং একই সঙ্গে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ততা (relativity বা اعْتِبَارِيّ)-কে টুকরো টুকরো করে ফেলে। কারণ, অতিরিক্ত বস্তুনিষ্ঠ হওয়ার এই প্রবণতা চিন্তার প্রক্রিয়াকে একটা ছাঁচে ফেলে দেয়, যা মূলত মনোভাব হিসেবে এক ধরনের স্বাধীনতা, আলাদা স্থান, নিজস্ব পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য ইত্যাদি দ্বারা চালিত। এটি মানুষকে বেশি বেশি বিভাজন ও স্বাতন্ত্র্যায়নের দিকে নিয়ে যায়। ফলে, এটি দ্বারা বুদ্ধিমান মানুষের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা আলাদা আলাদা এবং স্বাধীন কিছু অংশে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
আরও বিশ্লেষণে বলা যায়, বুদ্ধিকে মানুষের একটি মৌলিক বা অপরিহার্য গুণ হিসেবে গণ্য করলে, তা এক ধরনের কৃত্রিম বিভাজনের পথ তৈরি করে। মানুষের গড়ে ওঠার পেছনে সমতুলীয় অন্যান্য বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ গুণগুলো, যেমন: বাস্তব প্রয়োগ বা কর্ম, অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব জীবনযাপন—ইত্যাদি উপেক্ষিত থেকে যায়। বুদ্ধিকে যদি মানুষের মূল নির্যাস বলে যুক্তি দেওয়া হয়, তবে এই অন্যান্য গুণগুলোকেও একই মর্যাদা দিতে হবে। আর এটা কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় যে, মানুষের বহুমুখী রূপই মূলত তার সামগ্রিক একতাকে ফুটিয়ে তোলে।
আগেই আমরা বলেছি, বুদ্ধির চর্চা বা প্রয়োগ আসলে এক ধরনের আচরণ বা কাজ, যার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজেকে কিংবা তার চারপাশের পরিবেশকে বোঝার চেষ্টা করে। এটি ঠিক আমাদের চোখ দিয়ে দেখার মতোই একটি কাজ। এ অর্থে, নজর বা দৃষ্টিশক্তিকে যেমন সম্পর্কযুক্ততায় ক্রিয়াশীল বলা যায়, কারণ এটি চোখের সাপেক্ষে বা সম্পর্কযুক্ততায় তৈরি একটি কাজ মাত্র—ঠিক তেমনি বুদ্ধিও একটি সম্পর্কযুক্ততায় ক্রিয়াশীল ঘটনা বা প্রপঞ্চ। বুদ্ধি প্রকাশিত হয় মানুষের একটি মূল নির্যাসের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ততায়, যা ইসলামি ঐতিহ্যে কলব (অন্তর বা হৃদয়) নামে পরিচিত। কলবের সঙ্গে বুদ্ধির সম্পর্ক ঠিক তেমনই, যেমন চোখের সঙ্গে নজর বা দৃষ্টিশক্তির সম্পর্ক।
সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, বুদ্ধির ক্রিয়াশীলতা কোনো স্বাতন্ত্র্যসূচক ব্যাপার নয় বরং এটি কলবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ততায় ক্রিয়াশীল বিষয় এবং এর দ্বারা আমরা বিভিন্ন বস্তুর মধ্যকার সম্পর্ক বুঝি, কুপ্রবৃত্তি থেকে বাঁচি এবং অর্জিত জ্ঞানকে ধরে রাখি।
এছাড়া, মানুষের কাজের ভালো-মন্দের বিচার বুদ্ধির ভালো-মন্দের ওপর নির্ভর করে; যেমন চুরির মতো অপরাধও মূলত চুরির আগে তার ত্রুটিপূর্ণ চিন্তারই একটি ধারাবাহিক ও প্রায়োগিক রূপ।
কলবের হাল ও দশার গতিশীলতার কারণে বুদ্ধিও একটি আপেক্ষিক বিষয়, যা চর্চার মাধ্যমে যেমন শাণিত ও উন্নত করা যায়; তেমনি আবার এটি লক্ষ্যচ্যুত হয়ে অজ্ঞতা ও মন্দের দিকেও ধাবিত হতে পারে। এর একটি মূর্ত উদাহরণ হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং এটি প্রমাণ করে যে নিখুঁত ও দক্ষ পদ্ধতিগত বুদ্ধিও নৈতিকতাহীন হলে চরম অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে। এ দিক থেকে বলা যায়, মন্দ কাজ বুদ্ধির অভাব নয় বরং বুদ্ধিরই বিপথগামী রূপ।
এটি একই সঙ্গে এ বিষয়টিও সামনে আনে যে, তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কোনো চিরন্তন বিষয় নয়; এটি ইউরোপের নিজস্ব পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ফসল এবং ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
উপরের আলাপ এ বিষয়টি হাজির করে যে, আকল বিষয়ক তহার তিনপ্রস্থীয় পুনর্গঠনে উপরের আলাপ সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিটিই সবচেয়ে নিচু স্তরের, যাকে আমরা বাংলায় বলছি বিশুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন বুদ্ধি।
এ স্তরটিকে মানবিক পূর্ণতা বা কামালিয়্যাতের দিক থেকে বিচার করলে একে একটি বিচ্যুত বা বিকৃত জালালি মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এর পরিণতি হলো কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিকতা, প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ এবং রুহানিয়্যাতহীন শুষ্কতা। ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য হিসেবে এ স্তরটি লোকদেখানো ও অহংকার ইত্যাদিকে প্রধানভাবে সূচিত করে এবং এর ফলশ্রুতিতে মানুষের মধ্যে যে ধরনের প্রেরণা আবিষ্কার করা যায় তা প্রধানত ইসতিদরাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবেই প্রকাশিত হয়।
দুই. আল-আকল আল-মুসাদ্দাদ (العقل المسدد বা নির্দেশিত/সঠিক পথে চালিত বুদ্ধি): ফিকহ ও তুরাসি অন্যান্য পদ্ধতিগুলোর ক্রিয়াশীলতা এর ভিত্তি দিয়েছে। এটি ওহির নির্দেশনায় চালিত; তবে, আকলের এ স্তরে অন্ধ অনুকরণ (تقليد) এবং বাহ্যিক আচারসর্বস্বতার (تَظَاهُر) ঝুঁকি থাকে।
এর বিশ্লেষণে বলা যায়, বিচ্ছিন্ন বুদ্ধির তুলনায় গতিশীল ও তরক্কিমুখীন নির্দেশিত বুদ্ধি মূলত মানুষের এমন সব কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যার উদ্দেশ্য হলো নৈতিক আইন বা ইসলামি পরিভাষায় শরিয়া-নির্দেশিত পথ মেনে চলার মাধ্যমে কোনো কল্যাণ বয়ে আনা কিংবা কোনো ক্ষতি এড়ানো।
এখানে মুসাদ্দাদ (مُسَدَّد বা সঠিক পথে চালিত) শব্দটি অত্যন্ত সচেতনভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। সাধারণত প্রচলিত অন্যান্য নাম, যেমন আকল গাইর মুস্তাকিল (العَقْل غَيْر المُسْتَقِلّ বা পরাধীন বুদ্ধি) কিংবা আকল মুকাইয়াদ (العَقْل المُقَيَّد বা সীমাবদ্ধ বুদ্ধি) এক ধরনের নেতিবাচক অর্থ তৈরি করে। তাই মুসাদ্দাদ শব্দটির মধ্যে নিহিত ইতিবাচকতাকে তুলে আনতে তহা এটি ব্যবহার করেছেন।
কারণ নির্দেশিত বুদ্ধি বিচ্ছিন্ন বুদ্ধির চেয়ে অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ। কারণ এটি বৃহদার্থে নৈতিক আইন এবং বিশেষ অর্থে শরিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে যে ধরনের শক্তি ও দিকনির্দেশনা পায়, তা থেকে এমন জ্ঞান তৈরি হয় যা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না এবং মানুষের বাস্তব জীবনে এর ফলশ্রুতিতে কল্যাণ আসে।
তবে, এ সামগ্রিক কল্যাণ (المَصْلَحَة العَامَّة) বা পরম সুখ (سَعَادَةُ الدَّارَيْنِ)-কে ফলশ্রুতি-হিসেবে-নিয়ে-আসা বুদ্ধির এ স্তরকে অবশ্যই তিনটি অপরিহার্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
ক. বুদ্ধির এ ক্রিয়াশীলতা অবশ্যই নৈতিক আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে।
খ. নৈতিক আইন অনুযায়ী, প্রতিটি কাজ একেকটি কল্যাণ নিয়ে আসবে। কিন্তু দুনিয়াতে প্রচলিত আরও অনেক উপায়েও এ কল্যাণ বয়ে আনা যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে তহা বলছেন, নৈতিক আইন যে ধরনের পরিসরের ইঙ্গিতসূচক এবং যে ধরনের কাজকর্ম উৎসাহিত করে, সেগুলো তিন ধরনের প্রতিরক্ষাবলয় দ্বারা সুরক্ষিত থাকে, যা অন্যান্য উপায় অবলম্বনে কল্যাণ বয়ে আনার পরিসরে সম্ভবপর না।
১. অন্যান্য উপায়গুলো জীবনের তাৎক্ষণিক বস্তুগত বিবেচনার বাইরে যেতে পারে না। যেমন: প্রচলিত আইনি পরিসরে কোনো কিছু শাস্তিযোগ্য কি শাস্তিযোগ্য না, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো প্রপার্টি রাইট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা না হওয়া। ফলে সবসময়ই অন্তর্গতভাবেই এগুলো বস্তুবাদী রয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত তা মানুষের ভোগবাদী ও নিচু প্রবৃত্তির অধীনস্থ হয়ে এর উদ্দেশ্যই চরিতার্থ করতে থাকে।
২. অন্যান্য উপায়ে অর্জিত কল্যাণ বা সুখ সীমিত, অগভীর ও সাময়িক। কারণ এগুলো কোনো বৃহদার্থিক ব্যবস্থাপনা ও রুহানি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না। কিন্তু নৈতিক আইন মানুষের নিয়্যাত ও কাজকর্মে এমন এক ধরনের ঝোঁক ও বিন্যাস এনে দেয় যা ব্যক্তিগত কল্যাণকে গভীর ও ব্যাপক অর্থে একটি সার্বিক কল্যাণ নির্দেশক ব্যবস্থাপনা ও রুহানি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে।
৩. কল্যাণ হাসিলের অন্যান্য উপায় ব্যক্তিক, তা যতই কম বা বেশি সাধারণ মানদণ্ড ও নিয়মকানুন দ্বারা পরিচালিত হোক না। কারণ এসব উপায় প্রকৃতির দিক থেকে নিজেই পারমাণবিক অর্থাৎ স্বাতন্ত্র্যবাদী। এ বৈশিষ্ট্য স্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিকতার অভিমুখ তৈরি করে, যা প্রকৃতি ও অন্যান্য সৃষ্টির ওপর আধিপত্য বিস্তারের (anthropocentrism) ঘটনায় চালিত হয়। অন্যদিকে, নৈতিক আইন এমন একটি বিশ্ববীক্ষা (cosmology)-র দিকনির্দেশনা দেয় ও ঝোঁক তৈরি করে, যাতে নিজের কল্যাণ সাধনের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের, এমনকি প্রকৃতিতে মওজুদ সবকিছুর কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
গ. নির্দেশিত বুদ্ধির তিন নম্বর পূর্বশর্ত হলো, এটি মানুষের মূর্ত কাজকর্মগুলোকে তার আওতাধীন হিসেবে ধরে নেয়। সহজ কথায় মানুষের মূর্ত কাজকর্ম বলতে, এখানে অভ্যাসে পরিণত হওয়া অনুশীলন, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক সহ নৈতিক পরিচর্যা বোঝানো হয়েছে। এসব কাজকর্ম ও অনুশীলন মানুষকে স্রেফ তাত্ত্বিক আলোচনার গণ্ডি থেকে বের করে বাস্তব প্রয়োগ বা আমলের দিকে নিয়ে যায়। ফলে, এভাবে মূর্তায়িত হয়ে ওঠা কর্মক্ষেত্রটিকে জ্ঞান উৎপাদনের একটি উর্বর ক্ষেত্র হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।
অনেকে আবার এসব কাজকর্মের ফলশ্রুতিকে পরিমাণগতভাবে বা খালি চোখে পরিমাপ করার ব্যর্থতা থেকে এগুলোর বাস্তব উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে নৈতিক আইন নির্দেশিত এসব কাজকর্ম সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।[8]ওয়ায়েল হাল্লাক, ২০১৯, পৃষ্ঠা: ১৬৩
পরিমাণগতভাবে বা খালি চোখে পরিমাপ করার প্রবণতাধারীরা সাধারণত মানুষের কাজকর্মকে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে নিমজ্জিত করেই ভাবতে পছন্দ করেন। কিন্তু বৃহদার্থিক অর্থে সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড উচ্চতর নৈতিক মূল্যবোধের অধীনস্থ। অন্যদিকে, উপরোল্লিখিত কাজকর্ম মানুষের মননগত ও অনুশীলনমূলক পরিসরের দিগন্তকে প্রসারিত করে এবং আত্মাকে প্রবৃত্তির পরাধীনতামুক্ত করে। ফলশ্রুতিতে যখন মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি কাজেই আজাদি হাসিল হয়, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব রাজনীতি ও সমাজসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে।
বারবার একই নেক আমল বা নৈতিক আইনের আওতায় নির্ধারিত অনুশাসন অনুশীলন মানুষের শরীর ও মনে এক ধরনের ইতিবাচক অভ্যাস তৈরিতে সাহায্য করে এবং এটি সবসময় বিবেক জাগ্রত রাখে। কোনো ভুল বা অনৈতিকতার পথে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলে সে ব্যক্তিকে আবার মূল নৈতিক নীতিতে (القَاعِدَة الأَصْلِيَّة) ফিরিয়ে আনে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে, নির্দেশিত বুদ্ধি আসলে পরাধীন বা সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিরই একটি পরিমার্জিত রূপ, যেটিকে শরিয়ার আমল দ্বারা শক্তিশালী করা হয়েছে। ইসলামি তুরাসে একে জ্ঞান ও কর্মের একীভবন (المَسْمُوع) বলা হয়েছে, যেখানে একটি অপরটির অবিচ্ছেদ্য ও পারস্পরিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে (التَّلَازُم) মওজুদ থাকে এবং এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ (السَّمْعِيّ القُرْبَانِيّ)।
মানবিক পূর্ণতা বা কামালিয়্যাতের দিক থেকে আকলের এ স্তর ব্যক্তিত্বের ইতিবাচক জালালি মাত্রা তুলে ধরে। সৃষ্টি হিসেবে মানুষ খুবই নাজুক ও নির্ভরশীল।[9]অ্যালাসডেয়ার ম্যাকইনটায়ার, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা: ১-১০ তাই তার একটা সীমা বা কাঠামো দরকার হয়। শরিয়ত বা নৈতিক আইনের নির্দেশনা, হালাল-হারামের সীমা ও নফসের নিয়ন্ত্রণের আওতায় এ সীমা নিশ্চিত হয়। এর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্বে ইতিবাচক জালালি মাত্রা তৈরি হয়।
কিন্তু এতে যদি অন্তরের প্রেম ও সৌন্দর্য বা জামালি মাত্রা অনুপস্থিত থাকে, তবে মানুষের এ স্তরের প্রচেষ্টা নিছক আচারসর্বস্বতায় পর্যবসিত হয় এবং জীবন স্থবির ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
এ স্তরের আকলসম্পন্নদের ব্যক্তিত্ব সীমা বা হদের আওতায় পরিচালিত হওয়ায় ইসতিদরাজের ঝুঁকি থাকে না; কিন্তু এ স্তর ইলহামের আলোবঞ্চিত হয়।
তিন. আল-আকল আল-মুআইয়াদ (العقل المؤيد বা বর্ধিত ও তাৎপর্যধারী বুদ্ধি): বুদ্ধি, নৈতিকতা এবং সুফি অভিজ্ঞতার একীভূত রূপ; এটি সর্বোত্তম বুদ্ধি, যা মানুষকে নৈতিক পূর্ণতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক নবায়নের দিকে নিয়ে যায়।
বিশ্লেষণী পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, সমর্থিত বুদ্ধির সক্রিয়তা এমন ধরনের কর্মকাণ্ড যদ্দ্বারা বস্তু বা ব্যক্তির আসল রূপ উন্মোচিত হয়। অর্থাৎ ঐ বিষয়টির বোধ অন্তরে আসা বা হৃদয়াঙ্গম হওয়া যদ্দ্বারা সে বা বস্তুটি প্রকৃতপক্ষে যা, তাই হয়েছে (وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ)। অন্য অর্থে বুদ্ধির এ স্তরের অনুসন্ধান নিমজ্জিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু করতে হয়; এ নিমজ্জন শরিয়া বা নৈতিক নির্দেশনার পরিসরে সমস্ত বাধ্যতামূলক আমল ও কর্মযজ্ঞে নিমজ্জিত হওয়া নির্দেশ করে; পাশাপাশি সমস্ত নফল বা ঐচ্ছিক কাজকর্মগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত।
এর মাধ্যমে উবুদিয়্যাত বা দাসত্বের (العُبُودِيَّة) গভীর অর্থ সামনে আসে এবং এর মূল উদ্দেশ্যই হলো, বাস্তব আমল বা সাধনার নামে সমাজে যে সমস্ত লোকদেখানো ও গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা চালু আছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উপায়ে সুপরিকল্পিতভাবে অবস্থান নেওয়া।
তহা এই তৃতীয় স্তরটিকে বলেন জীবন্ত বাস্তব জ্ঞান (النَّظَر العَمَلِيّ الحَيّ), যা কোনো কিছু মুখে বলা বা বুদ্ধি দ্বারা স্পর্শ করার (المُلَامَسَة) মোকাবিলায় নিমজ্জিত হয়ে বাস্তব আমলের মাধ্যমে স্বাদ লাভ করা (المُلَابَسَة) নামে পরিচিত।
এতে দুটি উপাদানের সংমিশ্রণ বিদ্যমান।
(ক) নির্দেশিত বুদ্ধির নিজস্ব বাস্তবমুখী প্রবণতা।
(খ) জীবন্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই বাস্তবমুখী প্রবণতার সর্বোত্তম মেলবন্ধন, যেখানে অভিজ্ঞতার এই সংযুক্তি মনস্তাত্ত্বিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক উপায়ে বুদ্ধির স্পর্শের ঘটনা বা নিছক তত্ত্বকে বর্ধিত ও তাৎপর্যধারী বুদ্ধির স্তরে উন্নীত করে।
এই একীভূত হওয়া কৃত্রিম বা সাধারণ অর্থে কোনো ক্রমপুঞ্জিভবন বা গাণিতিক যোগফল নয়। বরং এটি একটি ধারাবাহিক এবং মানুষের ফিতরতগত আবশ্যকতার নিরিখে আত্মনিবিষ্টতা, যা জীবন্ত মানুষের জীবনশক্তি বিকাশ ক্ষমতার সমতুল্য। এ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের বাস্তব প্রয়োগ ও কর্মের মূল প্রক্রিয়া ও কার্যাবলির গভীরে প্রবেশ সম্ভব হয়। অর্থাৎ মানুষ তার মনস্তাত্ত্বিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক সত্তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
ফলে এ প্রক্রিয়ায়, বর্ধিত ও তাৎপর্যধারী বুদ্ধি এমন একটি অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক দিক ধারণ করে, যার মাধ্যমে বিশুদ্ধ বা বিচ্ছিন্ন বুদ্ধি দ্বারা অর্জিত বৈশিষ্ট্যগত জ্ঞান এবং নির্দেশিত বা সঠিক পথে চালিত বুদ্ধি দ্বারা অর্জিত কর্মের জ্ঞান, মৌলিক বা আসল সত্তার জ্ঞান দ্বারা আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়। এ উচ্চতর জ্ঞান বস্তু বা ব্যক্তির প্রকৃত রহস্যের গভীরে প্রবেশ করে মানুষের ভেতরে এমন এক অভ্যন্তরীণ প্রজ্ঞা তৈরি করে, যা পরে তার বাহ্যিক আচরণ এবং ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা বা কামালিয়্যাতের দিক থেকে বুদ্ধির এ স্তরকে একই সঙ্গে জামালি মাত্রার পূর্ণতা লাভের স্তর হিসেবেও চিহ্নিত করা যায়। যখন মানুষ নৈতিক আমল ও অন্তর পরিশুদ্ধির ক্রমাগত প্রচেষ্টার (التجديد والإصلاح = الجُهُود ← الجِهَاد + الإِجْتِهَاد) মাধ্যমে দাসত্বের গভীরতর পরিসরে তরক্কি হাসিল করে তখনই বুদ্ধির প্রকৃত নবায়ন ঘটে। এভাবে, অন্তরে বিকৃত জালালত দূর হয় এবং ইসতিদরাজের পথও বন্ধ হয়। তখন মানুষের অন্তর আল্লাহর রহমত ও সৌন্দর্যের আয়না (জামালত) হয়ে ওঠে। এ স্তরে মানুষের মনে ইলহামের বিচ্ছুরণ ঘটে, যা সর্বোচ্চ জামালি মাত্রার আলামত।
এ অর্থে কবিতার মুহূর্ত বা কাব্যিক ও সৃজনশীল কল্পনা হলো জামালি মাত্রার প্রকাশ। এটি মানুষকে জালালতের স্তরের সঙ্গে জামালতের স্তরের সংযোগ ঘটিয়ে মানুষের আত্মাকে দূর-দূরান্ত বা রুহানি জগতে নিয়ে যায় এবং এসব জগতের সৌন্দর্য আস্বাদনে সহায়তা করে। আরও বলা যায়, এ কল্পনা মানুষকে সত্যের প্রতি অনুরাগী ও দয়াশীল করে তোলে।
সুতরাং বর্ধিত ও তাৎপর্যধারী বুদ্ধির স্তরে, মানুষের ব্যক্তিত্বে জালালি মাত্রার সঙ্গে জামালি মাত্রার সংযোগে আমরা অন্তরের পরিশুদ্ধতা, ঐশী প্রেম (أَحْبَبْتُ), ইলহাম লাভ ও কবিতার মুহূর্তের উদয় ইত্যাদি ঘটনা প্রত্যক্ষ করি। এসবের ফলশ্রুতিতে ব্যক্তিত্বে সৌন্দর্য ও গভীরতা আসে, যাকে তহা বলেছেন, “মানব অস্তিত্বের পূর্ণতা”।[10]আবদুর রহমান তহা, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ১০৭
ঘ. প্রফেসর ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের বিবেচনায় ইসতিদরাজ ও ইলহাম
মুঈনুদ্দীন আহমদ খান কবিতার মুহূর্ত ও তার মাঝে প্রোথিত সত্যাসত্য বিষয়ে আলাদা করে কোনো আলাপ পাড়েননি। কিন্তু অন্বেষণকারীদের জন্য আকর হিসেবে বিবেচিত তাঁর রাষ্ট্রদর্শনশাস্ত্রে মুসলিম অবদান: মুকদ্দমা-উপক্রমণিকা (প্রথম খণ্ড), ইসলামে দর্শন চিন্তার পটভূমি (অখণ্ড সংস্করণ) এবং যুক্তিতত্ত্বের স্বরূপসন্ধান: প্রাচ্য বনাম প্রতিচ্য ইত্যাদি কিতাবগুলোতে এ সংশ্লিষ্ট আলাপের অনেক সূত্রপাত দেখা যায়। আমরা এ সংশ্লিষ্ট আলাপগুলোকে বিশেষ পদ্ধতিতে সুসংহত ও সুগঠিত আকারে পড়ার চেষ্টা করব।
ঘ.১ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও আলামত-নির্ভর গায়েবি বিশ্বাস
প্রফেসর খান যখন জ্ঞান নিয়ে আলাপ শুরু করেন, সে আলাপের ভিত্তি দুটি স্বতঃসিদ্ধ সূত্রের ওপর দাঁড়ায়। এক. আল্লাহর জ্ঞান স্বীয় এবং মানুষের জ্ঞান অভিজ্ঞতালব্ধ; এবং দুই. সত্যিকার মানবিক জ্ঞান আলামত-নির্ভর গায়েবি বা অন্তরালে বিশ্বাস দ্বারা শুরু হয় এবং আখিরাতের ইয়াকিন বা প্রত্যয়ে পূর্ণতা লাভ করে।
এই দুটি মৌলিক সূত্র মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের জ্ঞানীয় বিন্যাসে পরস্পরের পরিপূরক।
যেহেতু জ্ঞান নিছকই ধারণার যোগফল না এবং মানুষের জ্ঞান অভিজ্ঞতায় ক্রমবিকাশমান, কাজেই একে বস্তুর মতো অর্জন করা যায় না। ফলে এর পরিসর আযল থেকে আবদ (أزل – أبد) অর্থাৎ অনাদি থেকে অনন্ত। এর মাঝখানে যেকোনো দুই বিন্দুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মানুষের জ্ঞানচর্চা চলে; যেমন: জন্ম থেকে মৃত্যু, বিশ্বজগতের উৎপত্তি থেকে বর্তমান ইত্যাদি।
মানুষের জীবন ও চিন্তা সসীম, কিন্তু জ্ঞানের পরিসরে গতি অসীম থেকে অসীম। ফলে জ্ঞান-অনুসন্ধান ও জ্ঞানচর্চার প্রক্রিয়ারও শেষ নেই। কিন্তু অর্জন মানে স্থির, অচল আর বন্ধ্যাত্ব। তাই যথাযথভাবে বললে, জ্ঞান অনুসন্ধান বা অন্বেষণ করা যায় এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াকে নানাভাবে বর্ধিত করা যায় মাত্র।
অর্থাৎ ক্রমবিকাশের প্রক্রিয়ায় চলমান থাকার অর্থ হলো ইহা মানুষের অভিজ্ঞতায় লব্ধ ও অভিজ্ঞতাতেই এর অবস্থান। মানুষের অভিজ্ঞতার এগিয়ে যাওয়া মানে তাঁর জ্ঞানও মুহূর্তে মুহূর্তে সামনে এগিয়ে যাওয়া।[11]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৫
মানুষের অতি সাধারণ অভিজ্ঞতার দিকেও তাকালে বোঝা যায়, মানুষ যখন দেখে তখন চোখের পলকেই জ্ঞান লাভ করে না। চোখে দেখে, তারপর এটা নিয়ে ভাবে এবং ভাবতে গিয়ে একে তলিয়েও দেখে। এরপরই জ্ঞান আহরণ করে।
আবার, এক পলকে মানুষ একটি জিনিসই দেখে। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, ঐ জিনিসের একটা সংকীর্ণ অংশই দেখে। অর্থাৎ লোকে যখন আরেকজনের মাথা দেখে, তখন তার পা দেখে না। আবার, যখন চেহারা দেখে, তখন মাথার পেছনটা দেখে না।
এ উদাহরণ নিরিখে বলা যায়, এক পলকে মাথার এক পাশ দেখা যায়, দ্বিতীয় পলক ফেলে পুরো মাথা না দেখা পর্যন্ত পরিষ্কার হয় না ইনি মানুষ কিনা; মানুষ হলে পুরুষ না মহিলা!
অধিকন্তু তৃতীয় পলকে পুরো অবয়ব দেখার পর স্থির নিশ্চিত হওয়া যায় ইনি মানুষ! তদুপরি, ভেবে না দেখলে বোঝা যায় না, ঐ মানুষ বুদ্ধিমান নাকি বোকা, জ্ঞানী নাকি মূর্খ, তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে হবে নাকি ইংরেজিতে!
এখন আমরা যদি উপরে উল্লেখিত চোখে দেখাকে চাক্ষুষ জ্ঞান, ভেবে দেখাকে দর্শনজ্ঞান এবং তলিয়ে দেখাকে তাৎপর্যজ্ঞান বলি, তাহলে দেখা যাচ্ছে পলকের দেখা বা চাক্ষুষ জ্ঞান নয়, ভেবে দেখার মধ্য দিয়েই জ্ঞানের আরম্ভ এবং তলিয়ে দেখার মধ্য দিয়ে জ্ঞান পরিণত হয়ে ওঠে[12]প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৮
তাহলে প্রশ্ন হলো: মানবিক জ্ঞানের চূড়ান্ত রূপ কিসে? প্রফেসর খান জ্ঞান অন্বেষণ প্রক্রিয়ার দিক থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে পরস্পরের সম্পূরক চারটা ভাগে শ্রেণিকরণ করেন।
এক. অনুভূতিলব্ধ জ্ঞান। এর মাধ্যম হলো পঞ্চ ইন্দ্রিয়। এ জ্ঞানের স্বরূপকে আমরা কোনো কিছুর সাধারণ পরিচিতি হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।
দুই. চিন্তালব্ধ জ্ঞান। এর মাধ্যম যুক্তি। চাক্ষুষ বা ইন্দ্রিয়ানুভূতি দিয়ে যেমন দেখা হয়, ঠিক তেমনি চোখ বন্ধ করে যুক্তি দিয়ে দেখা হলো দর্শন। ধ্রুপদী গ্রিক অর্থে চাক্ষুষ দর্শন ফিজিক্যাল বা পদার্থিক আর চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখা মেটাফিজিক্যাল বা পদার্থাতীত।
তিন. হৃদয়াঙ্গমের মাধ্যমে অনুধাবন অর্থাৎ কোনো কিছুর অনুসরণ করা, পিছু নেওয়া ইত্যাদি। আরবিতে একে জবর ওয়া মোকাবিলার অর্থে তফক্কুরের মোকাবিলায় তদব্বুর বলা হয়।[13]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা: ১০, ২৪ সহজ কথায় এভাবে বলা যায়, চোখে দেখা অনুভূতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে ভাবধারণা তৈরি হয় এবং এ ভাবধারণাকে হৃদয়ের স্পন্দনের আবর্তে মন্থন করলে উষ্ণ বা ঠান্ডা ভাবের উদ্রেক ঘটে—এরই নাম হৃদয়াঙ্গম। এটি আরও অণুবিশ্লেষণে বিবেকের স্তর প্রতীয়মান হয়। কারণ এ স্তরে ভালো-মন্দের নিরিখ সামনে আসে এবং নৈতিকতাবোধের উন্মেষ ঘটে।
যেহেতু অনুভূতিলব্ধ জ্ঞান প্রত্যক্ষ বাস্তব জ্ঞান, সেহেতু এটি একমাত্রার জ্ঞান। আবার, চিন্তালব্ধ জ্ঞান পরোক্ষ বাস্তব জ্ঞান, যেহেতু এটি বাস্তব বা বস্তুগত অনুভূতির মাধ্যমে অর্জিত কিন্তু চিন্তার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া জ্ঞান।
অর্থাৎ এতে প্রত্যক্ষভাবে বস্তু (الوجود الخارجي)-টি অনুপস্থিত থাকে, কিন্তু চিন্তার মাধ্যমে বস্তুটি সম্পর্কে তৈরি হওয়া ভাবধারণা (الوجود الذهني)-টি উপস্থিত থাকে। ফলে এটি দুই মাত্রার জ্ঞান। অন্যদিকে, হৃদয়াঙ্গমজনিত জ্ঞান প্রত্যক্ষ বাস্তব জ্ঞান থেকে তিন মাত্রা ব্যবধানে উদয় হয় এবং এতে যেহেতু ভালো-মন্দ বিবেচনা ও নৈতিকতাবোধের নিরিখ সামনে আসে, সেহেতু এর সম্পর্ক সরাসরি আল্লাহর হুকুমের সঙ্গে। ফলে সৃষ্টিতত্ত্বের অর্থে এর অভিমুখ সত্যের দিকে; এরিস্টটলীয় অর্থে বস্তু (substance)-এর দিকে না। এটিই হাকিকত বা সত্যজ্ঞানের স্তর। এক্ষেত্রে, অনুভূতি নিরূপণধর্মী, চিন্তা মননধর্মী এবং সত্যজ্ঞান মন্থনধর্মী।[14]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৮
চার. এ ধরনের হৃদয়াঙ্গমজনিত জ্ঞান আল্লাহর সাহায্যে প্রত্যক্ষভাবে সম্মুখে উপস্থিত হলে একে দিব্যজ্ঞান বলা হয়। এ জ্ঞান সর্বদা সঠিকভাবে সম্মুখে উপস্থিত থাকে, তাই একে মুখোমুখি জ্ঞানও বলা হয়। এটি মারেফাতের স্তর। প্রফেসর খানের বিশ্লেষণে এ স্তরটিই মানবিক জ্ঞানের চূড়ান্ত স্তর।
ঘ.২ ইসতিদরাজ ও ইলহাম
আমরা মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের বিশ্লেষণে ইলহাম বনাম ইসতিদরাজ (الاستدراج) কীভাবে হাজির এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে কবিতার মুহূর্ত বা প্রেরণাকে কীভাবে স্থানিকায়িত করা যায়, সে আলাপে যাওয়ার আগে তাঁর ভাবধারায় মানব মনস্তত্ত্বের স্বরূপ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠন ইত্যাদি দিকগুলো নিয়ে আগাব।
ঘ.২.১ মানব মনস্তত্ত্বের স্বরূপ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের টানাপোড়েন
মানুষের জীবনের সক্রিয় রূপ সচরাচর তিনটা দিকের প্রভাবে কার্যকর প্রতীয়মান হয়।
এক. অনুভূতি
দুই. চিন্তা
তিন. কর্ম
এগুলোকে বৃহদার্থে মানুষের গতিশীল জীবনের তিনটি পাট বা বিভাজন বা চক্র বলা যায়। মানুষের সামগ্রিক কাজকর্ম এ তিন পাটের সমন্বয়েই সম্পন্ন হয়। এ তিন পাটের কোনোটিকে বাদ রেখে কাজ করলে কাজটি খাপছাড়া বা অপরিণত বুদ্ধির ঠেকে। সুতরাং মানুষের জীবন এ তিন পাট বা পদে চলে। ফলে, আমাদের জীবনাভিজ্ঞতার চত্বরেও এ তিন বিভাজন সুপরিচিত।
অর্থাৎ মানুষের দৈহিকভাবে সামনে অগ্রসর হওয়া বা দেহের সম্মুখস্থ গতি যেমন ডান-বাম-সামনে দৃষ্টি নিক্ষেপের তিন পাটে চলে, তেমনি মানুষের জীবনও অনুভূতি-চিন্তা-কর্মের তিন পদে চলে।
আবার, এ তিন চক্রের পেছনে মানুষের ইন্দ্রিয়ের কার্যক্রমও বিদ্যমান।
এক্ষেত্রে, প্রশ্ন হলো: ইন্দ্রিয় কী? ইন্দ্রিয়ের প্রকরণ, কার্যক্রম ও সীমা বিষয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান করা ভারতীয় বৈদিক পণ্ডিতগণের মতে, যা দ্বারা পদার্থের জ্ঞান লাভ করা যায় এবং কাজকর্ম সম্পাদন করা যায়, তাই ইন্দ্রিয়।[15]মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ৩৬
ইন্দ্রিয়কে বৃহদার্থে তিন প্রকরণে আবিষ্কার করা যায়।
(ক) জ্ঞানেন্দ্রিয়: চোখ, কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক
(খ) অন্তরিন্দ্রিয়: মন, বুদ্ধি, অহংকার ও চিত্ত
(গ) কর্মেন্দ্রিয়: কথা, হাত, পা, গুহ্যদ্বার ও জননেন্দ্রিয়
এই ইন্দ্রিয়গুলোকে সচেতন বা সক্রিয় করার পেছনে মানুষের অন্তস্থ ছয়টি প্রবৃত্তি কাজ করে। এগুলোকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসার্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোকে ভারতীয় বৈদিক ও বৌদ্ধ তুরাসে মহত্ত্ব অর্জনের পথে বাধাপ্রদানকারি রিপু হিসেবে অভিধা দেওয়া হয়েছে।
আদতে, মানুষের মননশক্তি বা মনস্তত্ত্ব তিনটি পরস্পর সম্পৃক্ত ও চলমান ধারায় বিভক্ত ও প্রবাহমান বৃত্তিরূপে প্রতীয়মান হয়। এর এক প্রান্তে অবস্থান করে উল্লেখিত (ক)-এর চত্বরে ছয় প্রবৃত্তি বা রিপুর দ্বারা সক্রিয় পশুসুলভতা, যা মানুষকে খারাপ কাজে প্ররোচিত করে, এ অবস্থা বা দশা ইসলামি তুরাসে নফসে আম্মারা নামে চিহ্নিত; অন্য প্রান্তে অবস্থান করে (খ) প্রশান্ত চত্বরে বিবেকের সান্নিধ্যে ভালো-মন্দের বিবেচনায় উদ্বুদ্ধ নৈতিক উপলব্ধি ও ধর্মবোধ; আর এই দুই বৃত্তির মাঝখানে অবস্থান করে (গ) চত্বরে বাস্তব বুদ্ধি, মননশক্তির লাভ-ক্ষতি চিন্তা ও বিবেকবুদ্ধির ভালো-মন্দ বিচার।
মানব মনস্তত্ত্বের উপরের আলাপে প্রতীয়মান যে, মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে উল্লেখিত তিন চত্বরে অনুভূতি-চিন্তা-কর্মের টানাপোড়েনে। মানুষ হয়তো নিম্নমুখী পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোর প্ররোচনায় স্বার্থান্বেষণ ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতায় ঝোঁকে অথবা বিবেকবুদ্ধির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে ঊর্ধ্বমুখী নৈতিকতা ও ধর্মের পথে অগ্রসর হয়। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের পার্থক্যকরণ তত্ত্বের আলোকে এ বিভক্তিই হলো, সওয়াব বা পুণ্যের পথ (way of virtue) বনাম গুনাহ বা পাপের পথ (way of vice)।[16]প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৬
ঘ.২.২ চারপ্রস্থীয় জ্ঞান ও মানব মনস্তত্ত্ব
প্রশ্ন হলো: প্রফেসর ড. খানের চারপ্রস্থীয় জ্ঞান প্রকরণ কীভাবে মানব মনস্তত্ত্বের এই আলাপে একীভূত?
আল্লাহর স্বীয় বা স্বকীয় জ্ঞানের বিপরীতে মানুষের জ্ঞান যেহেতু অভিজ্ঞতালব্ধ, সেহেতু এ অভিজ্ঞতা প্রাথমিকভাবেই তার ইন্দ্রিয়সহযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার, মানুষের মননশক্তি বা মনস্তত্ত্বের তিনটি পরস্পর সম্পৃক্ত ও চলমান ধারায় বিভক্ত ও প্রবাহমান বৃত্তিগুলোর চত্বরে ও ইন্দ্রিয়গুলোর সক্রিয়তার আবহে এ জ্ঞান হয় পুণ্যের সঙ্গে, না হয় পাপের সঙ্গে চিহ্নিত হবে।
অর্থাৎ হৃদয়াঙ্গমের মাধ্যমে চোখে দেখা অনুভূতি থেকে চিন্তার ভাবধারণাকে বিবেকের স্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভালো-মন্দের নিরিখ সামনে নিয়ে আসা এবং বিবেচনার পরিসরে নৈতিকতাবোধের সংযোগ ঘটানো।
এ কারণে সক্রেটিস প্রমুখ গ্রিক তুরাসের কদিম সাধকরা শুদ্ধ অর্থে “Knowledge is virtue” বলেছেন এবং একই অর্থে আধুনিক যুগের মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ (value neutral) জ্ঞানের গোলকধাঁধা খোদ মানব প্রকৃতির সঙ্গেই সাংঘর্ষিক। মানব প্রজাতিকে এর মূল্য চুকাতে হয়েছে গত শতাব্দীর দু দুটি বিশ্বযুদ্ধে আর বর্তমানে এর জের টানতে হচ্ছে দুনিয়াব্যাপী সর্বগ্রাসী পরিবেশ বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার নৈরাজ্যের ফলশ্রুতি থেকে।
প্রফেসর ড. খানকৃত জ্ঞানের চূড়ান্ত রূপটি উপরের ঘ.১ আলাপ অনুযায়ী, আল্লাহর সাহায্যে সর্বদা সম্মুখে সঠিকভাবে উপস্থিত থাকে। কার্য-কারণের দিক থেকে দেখলে, এতে কার্য-কারণ ভাব সক্রিয়তার অর্থেই অনুপস্থিত থাকে[17]ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০০১-২০০২, পৃষ্ঠা: ৯২ এবং এতে আল্লাহর রহমত, করুণা ও সাহায্যের প্রাবল্য; কাজেই এটি স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক কিংবা জ্ঞানতাত্ত্বিক ঘটনা না, বরং তহা উল্লেখিত তযকিয়ার জীবন্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে শরিয়া বা নৈতিক আইনের নির্দেশনায় কৃত আমলসমূহের সর্বোত্তম মেলবন্ধনের ঘটনা।
যদি জ্ঞানতত্ত্বীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ প্রকরণ অনুধাবনের চেষ্টা করা হয় তাহলে দরকার হবে অপরিসীম সহানুভূতি ও সুদূরপ্রসারী কল্পনা; আবার, মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এটিকে বুঝতে গেলে একে যৌথ অবচেতনের বেশি কিছু মনে হবে না, যা মূলত মানসিক অবশিষ্টাংশের একটি বিশৃঙ্খল ভাণ্ডার বৈ কিছুই নয়। তবে, মানুষের দিক থেকে দেখলে এতটুকু বলা যায়, এ মেলবন্ধন মনস্তাত্ত্বিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক জায়গায় একটা নতুন প্যারাডাইমে উত্তরণ ঘটায়।
ঘ.২.৩ অনুপ্রেরণার রূপ: ইসতিদরাজ বনাম ইলহাম
আমরা উপরে ঘ.১, ঘ.২.১ ও ঘ.২.২-এ কৃত আলাপগুলোর ওপর ভিত্তি করে বলতে পারি, মানুষের মানবিক সত্তায় একটি নিম্নমুখী পাশবিক গতি বিদ্যমান। সে যখন শরিয়া বা নৈতিক নির্দেশনায় জীবনযাপন করে জাগ্রত বিবেকের সান্নিধ্যে ভালো-মন্দ বিচারবিবেচনায় উদ্বুদ্ধ হয় সে পুণ্যের পথে নিজের জীবনকে আনয়ন করে। কিন্তু মানুষের মধ্যে কম-বেশি অনুপাতে পুণ্যবান হওয়া ও পাপবোধে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এক্ষেত্রে, ঐ মানুষের ব্যক্তিত্ব তার পাপের মোহ ও পুণ্যের তারতম্যে বিকশিত হয় এবং শরিয়ার নির্দেশনা মেনে চলা ও আমল করা এক্ষেত্রে তার প্রবণতাকে পুণ্যের পথে চলার পরিসরে একটা কাঠামো দেয় বা সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে।
ফলে, মানবিক সত্তার নিম্নমুখী পাশবিক স্তরে কিংবা সুরক্ষাবলয়ে জীবনযাপনের পরিসরেও প্ররোচনা ও রিপুর উত্তেজনামূলক অনুপ্রেরণার উদ্ভব ঘটে। ফলে এটি সরাসরি ইন্দ্রিয়সংশ্লিষ্ট বাস্তব অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ধ্রুপদী তুরাসি ভাষায় একে প্ররোচকধর্মী খন্নাস (الخَنَّاس)-এর সঙ্গে জড়িত বলা হয়েছে। ফলে এ ধরনের প্রেরণাপ্রাপ্তরা কল্পনার উপত্যকায় উদ্ভ্রান্ত ঘুরে বেড়ায় এবং তাদের এ কল্পনা, অনুমান বা ধারণা ও সংশয়ে (الظَّنّ) বিন্দুমাত্র হাকিকত নেই। প্রফেসর ড. খান বৃহদার্থে কবিরা এ অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত বলে উল্লেখ করেন।[18]ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৮ এ প্রেরণাকেই আরবিতে ইসতিদরাজ নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, উল্লেখিত আলাপগুলো থেকে এটাও স্পষ্ট যে, মানুষ যখন নিজের নফসের তযকিয়ার সঙ্গে শরিয়া বা নৈতিক আইনের নির্দেশনায় সমস্ত বাধ্যতামূলক আমল ও কর্মযজ্ঞ, পাশাপাশি সমস্ত নফল বা ঐচ্ছিক কাজকর্ম ইত্যাদিতে এমনভাবে নিমজ্জিত হয় যদ্দ্বারা দাসত্বের গভীরতর তাৎপর্য উদ্ভাসিত হয়, যা মানুষকে রুহানি অর্থে একটি ঊর্ধ্বমুখী গতি দান করে এবং এটি মনস্তাত্ত্বিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্থে একটি ভিন্ন প্যারাডাইমগত রূপান্তর হাজির করে। এ প্যারাডাইম বা জ্ঞানভাণ্ড সংশ্লিষ্ট জ্ঞান প্রকারগুলো হলো:
(ক) হাকিকত বা সত্যজ্ঞান
(খ) মারেফাত বা দিব্যজ্ঞান
আমরা প্রফেসর ড. খানের বিভিন্ন সময়ের বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষণে এ প্যারাডাইম সংশ্লিষ্ট জ্ঞান প্রকারগুলোর স্বরূপের আলাপে একটা বিবর্তন লক্ষ করি। যাঁরা ড. খানের পাণ্ডিত্য পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করেছেন, তাঁরা জানেন ইসলামে দর্শন চিন্তার পটভূমির তুলনায় A Challenging Encounter with the West: Origin and Development of Experimental Science-এর প্রথম সংস্করণে এ সংশ্লিষ্ট আলাপ একটু ভিন্নধর্মী। আবার, এই দুই কিতাবের আলাপের সঙ্গে তাঁর প্রবন্ধ দর্শন বনাম মতবাদ: একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমীক্ষার আলাপ আরেকটু ভিন্ন মাত্রার। পরবর্তীতে এ শেষোক্ত আলাপ তিনি বিস্তার করেছেন A Challenging Encounter with the West: Origin and Development of Experimental Science-এর বর্ধিত ইংরেজি সংস্করণ ও বাংলা ভার্সনে, বিশেষভাবে পরিশিষ্টগুলোতে।
তবে এতটুকুই বলা যথেষ্ট যে, অনুভূতিলব্ধ ও ধারণাগত জ্ঞান যে সামগ্রিক ধারণাগত জ্ঞানভাণ্ড বা প্যারাডাইমকে নির্দেশ ও তাৎপর্য দান করে এর মুখোমুখিতে শেষোক্ত দুই প্রকরণ প্রায়োগিক, সাধনাভিত্তিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত ভাণ্ড বা প্যারাডাইমকে নির্দেশ করে। এই দুই প্রকারকে আবার তহার আল-আকল আল-মুআইয়াদের সমগোত্রীয় বা সমতুল্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তবে, তহার ক্ষেত্রে এটি আকলের উচ্চতর তথা পূর্ণাঙ্গ রূপ এবং প্রফেসর খানের ক্ষেত্রে ঐগুলো জ্ঞান প্রকারতত্ত্বের উচ্চতর জ্ঞান প্রকরণ।
প্রফেসর খান বলছেন, হাকিকত জ্ঞানের এমন একটা প্রকরণ যা একই সঙ্গে বস্তু বা বিষয়ের মূর্তায়িত রূপ বা আসল ধারণ করে, সে সঙ্গে এটি সত্য বা বাস্তবতার জ্ঞানও। কিন্তু তাঁর সতর্কতা হলো একে উইলিয়াম ডিলথ্যাইয়ের internalization and externalization of truth ভাবাও যাবে না। কারণ মৌলিকভাবে এই শেষোক্তগুলোও ধারণাগত প্রকরণ এবং এগুলোর কোনো ইতিবাচক অস্তিত্ব নেই।
এখানে উল্লেখ্য যে, পাঁচ ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াশীলতায় আমরা কোনো মওজুদাতকে অনুভব করি; কিন্তু এর সীমাবদ্ধতা হলো এ অনুভূতি সরাসরি আমরা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে বা কাউকে বোঝাতে পারি না। অনুভূতির বার্তা পরিবহন বা তা শেয়ার করার একমাত্র বাহন হলো ধারণা (concept, idea, news, interpretation)। মানুষের যাবতীয় কথাবার্তা ধারণাবাচক। আমরা মূলত ধারণা পরিবেশনের মাধ্যমেই আমাদের অনুভূতি অন্যের নিকট ব্যক্ত করি।
তবে, অনুভূতির পরিধি ধারণা থেকে অধিকতর ব্যাপক ও বিস্তৃত। ধারণায় অনুভূতি কাটছাঁট হয়ে অভিব্যক্তি লাভ করে; ফলে এদিক থেকে, আমাদের ধারণাগুলো অনুভূতিকে যথাযথভাবে ব্যক্ত করতে অসমর্থ। তবুও ধারণা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে অনুভূতি ব্যক্ত করা যায় না।
ব্যবহারিক জীবনে বার্তা পরিবেশন করার এরূপ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা নিত্যনতুন ধারণা সৃষ্টি করি এবং তাতে কল্পনার সাহায্য গ্রহণ করি। এ অর্থে কল্পনা জ্ঞান আহরণের একটি বিকল্প উৎস। কিন্তু ধারণা যেখানে অনুভূতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ অর্থে সম্পর্কিত হয়ে অস্তিত্বশীল, সেখানে কল্পনার এ ধরনের গৌণ অস্তিত্বও অসম্ভব; তবে, কল্পনা অনুভূতির অভিজ্ঞতার বাইরে যেতে পারে না। যেমন, মানুষের অবয়ব আর পাখির পাখার সমন্বয়ে আমাদের কল্পনায় জিন-পরির ধারণা আমরা তৈরি করি।
পক্ষান্তরে, ইসলামি পরিপ্রেক্ষিতে হাকিকত হলো বস্তুর আসল ও মৌলিকভাবে এটি ইতিবাচক অস্তিত্ব নির্দেশক। শুধু তাই নয় বরং এটি এর সঙ্গে জুড়ে থাকা কোনো কিছুর বস্তুগত অস্তিত্বকে পোষণ করায়। ফলে, এটি অস্তিত্বের তৃতীয় উচ্চতর প্রকরণ এবং সে সঙ্গে ঐ স্তরের জ্ঞান নির্দেশকও; যা অনুভূতিলব্ধ ও ধারণাগত প্রকরণকে অতিক্রম করে যায় এবং এটিকে প্রচলিত অভিজ্ঞতাবাদী ক্যাটাগরিগুলোতে ধরা যায় না। প্রফেসর ড. খানের হাকিকতের পরিসর অনুপ্রেরণামূলক এবং এ স্তরের অনুপ্রেরণাই ইসতিদরাজের মোকাবিলায় ইলহাম নামে পরিচিত।[19]ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২১, পৃষ্ঠা: ২০৩ এটি অর্জন করা যায় না, বরং অন্তর থেকে প্রকাশ পায়।
এর জন্য যে ধরনের প্রশ্নমালা সাজাতে হয় তা প্রচলিত এরিস্টটলের সরল চার প্রশ্নকে অতিক্রমকারী জটিল চারমাত্রার প্রশ্নমালা (وَمَا أَدْرَاكَ مَا هِيَهْ) হিসেবেই হাজির হয়। প্রথমোক্ত প্রশ্নমালা তলব করে What ক্যাটাগরির জ্ঞান এবং শেষোক্ত প্রশ্নমালায় অনুসন্ধান চালানো হয় What of what ক্যাটাগরির জ্ঞানীয় পরিসরে।
মারেফাত ওয়াহি বা প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞানের সীমায় সত্যের প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং এতে সত্য-দ্রষ্টা সত্যময় হয়ে যান এবং সত্যের সামনাসামনি বা দিব্যে অবস্থান করেন।
উপরের ঘ.২.২ এবং এ অংশের পূর্ববর্তী আলাপের নিরিখে মুখতসরে বলা যায়, ইন্দ্রিয়ানুভূতি মন ও বুদ্ধির সমন্বিত কর্মধারা এবং এর কার্যকর হওয়ার ঘটনাকে মানুষের জৈবিক বা প্রাণীসুলভতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ জন্মসূত্রে অন্যান্য প্রাণীর মতোই এসব সক্ষমতা মানুষ প্রাপ্ত হয়। এগুলোর সমন্বিত জ্ঞানকে অভিজ্ঞতালব্ধও বলা হয়। কিন্তু এর সঙ্গে বিবেকের বিচার যুক্ত হলেই এ জ্ঞান বৈশিষ্ট্যায়িত হয়ে মানবিক হয়।
প্রাচ্যের মহান ঐতিহ্যগুলোতে আত্মার অভিব্যক্তি হলো বিবেক, যা আন্তরিকতার অর্থে সম্বিতের উদয় ঘটায়; অন্যদিকে, প্রাণীসুলভতার অভিব্যক্তি হলো যুক্তিতর্ক ও লাভ-ক্ষতি বিবেচনা, যা হুঁশ, চেতনা ইত্যাদির উদয় হিসেবে আমরা চিহ্নিত করি। তাই মানবিক অর্থই হলো বিবেকসম্পন্ন, স্রেফ জীবসত্তার চিহ্নায়ক নয়।
এজন্যই মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত ও যৌক্তিক জ্ঞানকে বিদ্যা বা কসবি জ্ঞান আকারেই বোঝা হয় এবং এ স্তরের অনুপ্রেরণা, কল্পনা ইত্যাদি প্রাথমিকভাবে এ অর্থেই অর্থাৎ খন্নাসের সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে, হাকিকত ও মারেফাত স্তরে উন্নীত হলেই অনুভূতি ও চিন্তার স্তরের বিদ্যা সত্যিকারের জ্ঞানে রূপায়িত হয়ে ওঠে। একদিকে, অনুভূতি ও চিন্তার ফলাফল হলো সূত্রগত ও ডেফিনিশন-নির্ভর তত্ত্বীয় জ্ঞান; অন্যদিকে, হাকিকত ও মারেফাতের প্যারাডাইম হলো প্রায়োগিক, সাধনাভিত্তিক ও বাস্তব অভিজ্ঞতাপ্রসূত।
কারণ এতে ওয়াহির নির্দেশনায় বাস্তব আমল ও নফসের তযকিয়ার প্রক্রিয়ায় বুদ্ধির কার্যকর রূপের আমূল রূপান্তর ঘটে। এতে, আল্লাহর সাহায্য উপস্থিত হয় এবং মানুষের অনুপ্রেরণা এবং একই সঙ্গে কল্পনাও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েই প্রকাশিত হয়। হাকিকতে মানুষ ইলহামপ্রাপ্ত হয় এবং এজন্যই এটি লাদুন্নি বা প্রাপ্ত জ্ঞান হিসেবে অভিহিত হয়।
কিন্তু উল্লেখিত প্যারাডাইমের মারেফাত কার্যকারণ ভাবসিদ্ধ নয় এবং কাজেই তা সর্বৈব ও সর্বদর্শী। পরিসরের প্রকৃতি থেকে সহজে বোধগম্য যে, একে ইলহাম বা অনুপ্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করাও বাঞ্ছনীয় নয়। এ স্তরের অভিব্যক্তি কবিতা, নাকি নুরের ঝলক (لَمَعَات), নাকি পরমের ছোঁয়া (سَطَعَات) হিসেবে চিহ্নিত হবে তা একটা দীর্ঘ আলাপের পরিসরও দাবি করে। তবে, এক বাক্যে এটা নিশ্চিত যে, এ অভিব্যক্তি কবিতার মুহূর্তের হাজিরা নয় মোটেও।
ঙ. একটি তুলনামূলক সারণি
উপরের আলাপের সারমর্ম আমরা একটা সারণিতে বোঝার চেষ্টা করব:
| বিষয় | আবদুর রহমান ত্বহা | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান |
| জ্ঞান | অন্তর্দৃষ্টি ও যুক্তির ঐক্য | অভিজ্ঞতালব্ধ |
| কবিতা | আত্মার ভ্রমণ | স্পষ্ট নয় |
| ইলহাম | জামালি পূর্ণতার ফল | হাকিকত-মারেফাত প্যারাডাইমে উদয় হয়, বিশেষভাবে হাকিকত প্রকারে |
| সত্য
|
নন্দনতাত্ত্বিক সত্য | অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত |
চ. পর্যালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ
উপরের আলাপে আমরা প্রধানত তহা ও প্রফেসর খানকে নিজেদের মতো কথা বলতে দিয়েছি। এ আলাপের সূত্রে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো ছোট আওতায় হলেও তহার নন্দনতত্ত্ব ও কবিতা বিষয়ক ভাবনার পরিচ্ছন্নতা তৈরি করার কোশেশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে, যেসব বিষয় আমাদের কাছে জটপাকানো মনে হয়েছে, ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খানকে ব্যবহার করে সেসব জট খোলা হয়েছে; এ অনুশীলনের ভেতর দিয়ে একই সঙ্গে প্রফেসর খানের জ্ঞান প্রকারতত্ত্বের ওপরও পরিচ্ছন্নতা তৈরির কোশেশ করা হয়েছে। তবে, নিম্নের আলাপে সামগ্রিক বয়ান বিষয়ে আমাদের একটি পর্যালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ উপস্থাপন করা হচ্ছে।
প্রথমত, তহা আরবি ভাষার কাব্য ও অলঙ্কারশাস্ত্রীয় সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে তাঁর দর্শনের অনুকূলে যে ধরনের নতুন নতুন পরিভাষা নির্মাণ করেছেন, তা যে neologism-এর আবহ নিয়ে আসে, সে আবহ অনেক বেশি আরবি ভাষার আদর্শকরণ হিসেবে হাজিরা নেয়।
পক্ষান্তরে, প্রফেসর মুঈনুদ্দীন আহমদ শুধু আরবি-নির্ভর না হয়ে প্রাচ্যের পুরোনো ভাষাগোষ্ঠীগুলোর শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করেন এবং এগুলো থেকে গভীরতর অর্থদ্যোতক শব্দগুলো তাঁর বিশ্লেষণে তুলনামূলকভাবে প্রয়োগ করেন।
দ্বিতীয়ত, তহার নন্দনতত্ত্ব ও কবিতার আলাপের বোধগম্যতা একই সঙ্গে উচ্চস্তরের আরবি ভাষাতত্ত্ব ও দর্শনের বোধগম্যতার প্রয়োজনকেও হাজির করে; ফলে, এ বিষয়ে দক্ষতা না থাকা বেশিরভাগ পাঠক তহার দর্শন বুঝতে হিমশিম খেয়ে যান। আবার, তাঁর লেখার যোগাযোগক্ষমতা, নান্দনিকতা ও সুরেলা আবেশ একজন আরব পাঠক যেভাবে অনুভব করবেন, তা অনুবাদে একজন অ-আরব পাঠকের কাছে পৌঁছাবে না। বরং অনুবাদে সে বৈশিষ্ট্যগুলো গ্রহণকারী ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব সক্ষমতা, ছন্দ, রূপক ও নান্দনিকতার ভেতর নতুনভাবে ও ভিন্নাকারে রূপায়িত হয়ে উঠবে। এই দিক থেকে, আন্তঃসাংস্কৃতিক জ্ঞান ও ভাব স্থানান্তরের পরিসরে তহার দর্শনকে একটা বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।
অন্যদিকে, প্রফেসর খান মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহার্য শব্দভাণ্ডার ব্যবহার করেন এবং এগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে তাঁর ভাবধারা হাজির করেন। ফলে, এক্ষেত্রে তাঁর বিশ্লেষণী বার্তার সঙ্গে পাঠক প্রাথমিক অর্থেই যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হন এবং যা একই সঙ্গে গভীরতর বা দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তাও তৈরি করে।
তৃতীয়ত, বিশেষভাবে তহার নন্দনতত্ত্ব ও কবিতা বিষয়ক ভাবনায় যেখানে কবিতার মুহূর্ত ও প্রেরণার প্রকৃতি প্রক্রিয়া হিসেবে ঐক্য নির্দেশক, সেখানে আধুনিক কবিতা মূলতই বিচ্ছিন্নতা নির্দেশক।
এ প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ (১৯৫৩) এবং পিটার বার্গার (১৯৮৪) উভয়ে বলছেন, কবিতা বৃহদার্থে শিল্প হলো এক ধরনের অনির্ধারিত আবির্ভাব (event of emergence)।
এক্ষেত্রে প্রথমোক্ত জন অস্তিত্বের হঠাৎ উন্মোচন, ভাষার অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন ও ব্যক্তি মানুষের গভীর অভিজ্ঞতার বিস্ফোরণ থেকেই কবিতা জন্ম নেওয়া বা কবিতার মুহূর্ত তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, দ্বিতীয়জন চলে আসা স্বাদ বা রুচিকে ভেঙে ফেলা, ভাষাকে নতুন সম্ভাবনায় রূপায়িত করে তোলার জায়গায় চুরমার করে দেওয়া, আখ্যানকে ভাঙা ও প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা ইত্যাদিই নতুন কবিতা, শিল্পের নতুন প্রকরণ ও সামষ্টিক শিল্প প্রবণতাগুলোকে অস্তিত্বে আনে বলে অভিমত দেন।
তহার একটি মৌলিক অনুমান হলো, কবিতার মুহূর্ত = ইলহামের মুহূর্ত। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ ও পিটার বার্গার উভয়ের আলাপ থেকে এটা পরিষ্কার যে, কবিতার জন্ম বা কবিতার মুহূর্ত না ঐক্যসূচক ইলহামের মুহূর্ত, না রুহানি তরক্কি নির্দেশক আত্মার ঊর্ধ্বমুখীন ভ্রমণ। বরং কবিতা হলো, সর্বব্যাপ্ত আধুনিকতায় আমরা যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি, সে হাল ও মকামের অভিব্যক্তি অর্থাৎ কবিতা হলো an exercise of our being-in-world in the age of fragmentation and anxiety।
এ অর্থেই নজরুলের বিদ্রোহ, জীবনানন্দে বিষণ্ণতা, বোদলেয়ারের পাপবোধ, ইলিয়টের বিচ্ছিন্নতা, শক্তির ভাঙন এবং উৎপল কুমার বসুর সাইকেডেলিক ঘূর্ণি বোধগম্য। তহার অর্থে ধরলে কোনো অর্থেই মানবীয় অভিব্যক্তি হিসেবে আধুনিক কবিতার এ বিচিত্র ও বিস্তৃত ঐতিহ্যের কোনো মূল্য দাঁড়ায় না।
চতুর্থত, কারটা ইলহামের উদয় কিংবা কারটা ইসতিদরাজ বা শয়তানি ধোঁকা, তা নির্ধারণ করার জন্য সামাজিক-ঐতিহাসিক বাস্তবতাসংলগ্ন কোনো মানদণ্ড প্রফেসর খান ও তহা কেউই সরবরাহ করতে পারেননি। পক্ষান্তরে, ওহি-নিরপেক্ষ কান্টীয় নৈতিকতা এসব ক্ষেত্রে শক্তিশালী মানদণ্ড সরবরাহ করে।
পঞ্চমত, তহার সূক্ষ্ম, পরিশ্রমী ও চিত্তাকর্ষক প্রচেষ্টা মূলত ধারণাগত ও ভাষাবিদ্যাগত সমস্যা সমাধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানবজাতির সার্বজনীন জ্ঞান-ঐতিহ্য ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রাকৃতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন। এ বিষয়ে তহার চিন্তায় পরিসরগত সীমাবদ্ধতা প্রবল। ভাষার ওপর অতিরিক্ত জোর প্রদান কিছু বিশেষ ধরনের প্রবণতা তৈরি করে। এর অন্যতম হলো, ভাষাগত দক্ষতা ও কাব্যিক অলঙ্কার নিজেই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়; কিন্তু এগুলো হওয়া উচিত ছিল প্রকৃতি ও সমাজসংক্রান্ত বাস্তব লক্ষ্য অর্জনের উপায় মাত্র।
অর্থাৎ আনুমানিক অর্থে, প্রফেসর খানের পাণ্ডিত্যে যে ধরনের পর্যালোচনামূলক-বাস্তববাদী সংশ্লেষ আঁচ করা যায়, তহার পাণ্ডিত্যে এদিকটি অনুপস্থিত। একে আমরা তহায় the lack of a critical philosophy of science নামে চিহ্নিত করতে পারি।
ছ. উপসংহার
আমরা উপরের আলাপে খুবই আপাত ও অপর্যাপ্ততার অর্থে তহা ও প্রফেসর খানের জবানে কবিতার মুহূর্ত ও প্রেরণার আলাপ করেছি। আমরা এ আলাপে দেখেছি, তহা ও মুঈনুদ্দীন আহমদ খান উভয়ের জন্য কবিতা কেবল নান্দনিক প্রকাশ নয় বরং তা মানুষের অন্তর্জগৎ, নৈতিকতা ও রুহানি অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কবিতার ভাষা, কল্পনা ও সামাজিক বাস্তবতা ইত্যাদি প্রশ্নে তাঁদের এ সংশ্লিষ্ট ভাবধারায় কিছু অমীমাংসার বিষয়-আশয় থাকলেও কাব্যতত্ত্ব ও জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় এগুলো খুবই বৈশিষ্ট্যসূচক পদচিহ্নের স্মারক।
এ লেখার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় এ পদচিহ্নগুলো খোঁজার আলাপ শুরু হলো মাত্র। কাজেই এ বিষয়ে আমাদের অভিগমন ছিল খুবই বিনীত ও সংক্ষিপ্ত পরিসরে। তাই এরিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব, হাইডেগারের কবিতা ও সত্যের আলাপ, গাদামারের অর্থব্যাখ্যার তত্ত্ব এবং রিক্যুরের রূপকতত্ত্বসহ ইত্যাদি বিষয়ের আলাপ সংগত কারণেই এ লেখার আওতাবহির্ভূত রাখা হয়েছে। একই কারণে গাজালির জ্ঞানতত্ত্ব, ইবনে আরবির খেয়াল বা কল্পনা বিষয়ক আলাপ ও রুমির কাব্যতত্ত্বের বয়ান এ লেখায় সংশ্লিষ্ট করা হয়নি।
বইপত্রের হদিস
১. আবদুর রহমান তহা
√ حوارات من أجل المستقبل
এটি বৈরুতের Arab Network for Research and Publishing ২০০৩ সালে ছাপিয়েছেন।
√ العمل الديني وتجديد العقل
এটি কাসাব্লাঙ্কার Arab Cultural Center ১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশ করেন।
√ Dialogues for the Future
এটি ২০২৩ সালে নেদারল্যান্ডসের Brill ছাপিয়েছেন।
√ ওয়ায়েল বি. হাল্লাক
Reforming Modernity: Ethics and the New Human in the Philosophy of Abdurrahman Taha
এটি নিউইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানা ২০১৯ সালে প্রকাশ করেছেন।
√ এ. জেড. ওবাইদাত
Modernity and the Ideals of Arab-Islamic and Western Scientific Philosophy: The Worldviews of Mario Bunge and Taha Abd al-Rahman
এটি প্যালগ্রেভ-ম্যাকমিলান ২০২২ সালে প্রকাশ করেছেন।
২. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান
√ ইসলামে দর্শন চিন্তার পটভূমি (অখণ্ড সংস্করণ)
এটি ঢাকার তুরাস প্রকাশনী ২০২৩ সালে ছাপিয়েছেন।
√ Origin and Development of Experimental Science: Encounter with the Modern West
এটির প্রথম সংস্করণ ১৯৯৭ সালে ঢাকাস্থ BIIT প্রথম প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ২০২০ সালে একই প্রকাশনা সংস্থা এটির বর্ধিত সংস্করণ প্রকাশ করেছেন।
√ ব্যবহারিক বিজ্ঞান: উৎপত্তি ও বিকাশ
এটি মূলত Origin and Development of Experimental Science: Encounter with the Modern West-এর বাংলা ভার্সন। এটিকে প্রফেসর খান সরাসরি মূল ইংরেজি ভার্সনের অনুবাদ আকারে না রেখে বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য স্বতন্ত্র বই আকারে প্রস্তুত করেন। এটিই লেখক-কর্তৃক সম্পাদিত হয়ে ২০২১ সালে প্রকাশিত হয়; প্রকাশ করেছেন ঢাকার একাডেমিয়া পাবলিশিং হাউস লিমিটেড।
√ যুক্তিতত্ত্বের স্বরূপসন্ধান: প্রাচ্য বনাম প্রতিচ্য
এটি সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় ছাপাখানা ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছেন।
√ রাষ্ট্রদর্শনশাস্ত্রে মুসলিম অবদান: মুকদ্দমা-উপক্রমণিকা (প্রথম খণ্ড)
এটি ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের চুনতি ডেপুটি বাড়ি থেকে প্রকাশ করা হয়।
√ দর্শন বনাম মতবাদ: একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমীক্ষা, ইতিহাস: বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ পত্রিকা, বর্ষ: ৩৫, ইস্যু: প্রথম, সংখ্যা: ৩, ১৪০৮ বঙ্গাব্দ; পৃষ্ঠা: ৮৮-৯৮।
৩. অ্যালাসডেয়ার ম্যাকইনটায়ার
Dependent Rational Animal: Why Human Beings Need the Virtues
এটি শিকাগোর ঔফেন কোর্ট ১৯৯৯ সালে ছাপিয়েছেন।
৪. আধুনিক কবিতার মুহূর্ত ও প্রেরণার তত্ত্বায়ন
√ শঙ্খ ঘোষ
কবিতার মুহূর্ত
এটি কলকাতার অনুষ্টুপ প্রকাশনী ১৯৫৩ সালে ছাপিয়েছেন।
√ পিটার বার্গার
The Theory of Avant-Garde
মূল জার্মান ভার্সনের দ্বিতীয় সংস্করণের ভিত্তিতে কৃত এই ইংরেজি অনুবাদ ১৯৮৪ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপাখানাদ্বয় যৌথভাবে প্রকাশ করেছেন।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | পৃষ্ঠা: ১০৬ |
|---|---|
| ↑2 | প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১০৬ |
| ↑3 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা: ২৬-২৭ |
| ↑4 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ২৯ |
| ↑5 | প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৬ |
| ↑6 | আবদুর রহমান তহা, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ১০৪-১০৫ |
| ↑7 | ওয়ায়েল হাল্লাক, ২০১৯, পৃষ্ঠা: ১৫২ |
| ↑8 | ওয়ায়েল হাল্লাক, ২০১৯, পৃষ্ঠা: ১৬৩ |
| ↑9 | অ্যালাসডেয়ার ম্যাকইনটায়ার, ১৯৯৯, পৃষ্ঠা: ১-১০ |
| ↑10 | আবদুর রহমান তহা, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ১০৭ |
| ↑11 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৫ |
| ↑12 | প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ২৮ |
| ↑13 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ১৯৭৭, পৃষ্ঠা: ১০, ২৪ |
| ↑14 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৮ |
| ↑15 | মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০১৩, পৃষ্ঠা: ৩৬ |
| ↑16 | প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৩৬ |
| ↑17 | ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০০১-২০০২, পৃষ্ঠা: ৯২ |
| ↑18 | ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২৩, পৃষ্ঠা: ৩৮ |
| ↑19 | ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান, ২০২১, পৃষ্ঠা: ২০৩ |