আমাদের বাংলা : সাধু-চলিতের সমন্বয় এবং একটি প্রস্তাবনামূলক ভাষারীতি

আরমান আল-বাঙালি

এক.

একটা ভাষা কেমনে আগাবে, তার গদ্য কেমন হবে ও তাতে কেমন শব্দ জায়গা পাবে, তার অনেকখানি নির্ধারণ করে ভাষাটার টোন। ভাষার অভিমুখিতার মধ্যে টোনের অনুগামিতা আছে, যেহেতু টোন হইল ভাষার প্রবণতা। টোনের মধ্যে একমুখিতা থাকলে, প্রান্তিকতা থাকলে, ভাষাও হইয়া পড়ে একমুখী ও প্রান্তিক।

টোন যদি হয় গুরুধর্মীয়, তাহলে ভাষাও গুরুধর্মিতায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে এবং সুযোগ পাইলেই ওইদিকে যাওয়ার কোশেশ করবে। একইভাবে যেই টোন লঘুধর্মীয়, তার সবচেয়ে কমফোর্টের জায়গা হইল লঘু আলাপ।

বলতেছি না যে গুরু টোনের ভিতর একেবারেই লঘু আলাপ করা যায় না বা লঘু টোনের ভিতর একেবারেই গুরু আলাপ করা যায় না। বরং বলতেছি যে, ভাষাটার সবচেয়ে শক্তির জায়গা কোনটা, কোথায় সে সফল হবে আর কোথায় অনেকাংশে ব্যর্থ, তা তার টোন দেইখা বুইঝা নেন। এটাও বলতেছি না যে গুরু টোনে লঘু আলাপ বা লঘু টোনে গুরু আলাপ কইরা দেখা হয় নাই। তা যথেষ্টই হইছে এবং মোটেও তা অভূতপূর্ব ঘটনা না। কিন্তু কথা হইল লঘু আলাপ গুরু টোনে করার বঙ্কিমচন্দ্রীয় প্রচেষ্টা যেমন ব্যর্থ হইছে, তেমনই গুরু আলাপ লঘু টোনে করার প্রমথ চৌধুরীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হইছে ও হইতে থাকবে।

প্রশ্ন হইল, তাহলে আমাদের নিস্তার কীভাবে? জবাব হইল, সাধু ও চলিতের সমন্বয়ের মাধ্যমে। ফের প্রশ্ন হইল, এই সমন্বয় সম্ভব কীভাবে? এটারই উত্তরস্বরূপ, আসেন, এবার আমরা আলাপ শুরু করি।

এখন পর্যন্ত আমরা বাংলা ভাষার যেই দুইটা রূপ দেখছি, তথা সাধুরূপ ও চলিত রূপ, উভয়টাই একমুখী মেজাজের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করাইছে এবং হইয়া পড়ছে প্রান্তিকতার শিকার।

গুরুত্বের জায়গায় লঘুত্ব বা লঘুত্বের জায়গায় গুরুত্ব বা সবখানে গুরুত্ব বা সবখানে লঘুত্বই হইল সমস্যা। সাধুরূপ সবখানে গুরুত্ব নিয়া বইসা ছিল, বিপরীতে চলিত রূপ বইসা আছে পাইকারি লঘুত্ব নিয়া। ফলে গুরু বিষয়ে সাধুরূপ সফল হইলেও লঘু বিষয়ে ব্যর্থ হইছে এবং লঘু বিষয়ে চলিত রূপ সফল হইলেও গুরু বিষয়ে ব্যর্থ হইছে।

সাধুরূপ যেই গুরু টোন নিয়া সামনে আসে, তার দাবিতেই সেখানে এমনসব শব্দ আর ভঙ্গি আসতে থাকে, যা ওই গুরুগম্ভীর দীর্ঘ তাল, লয় আর সুরের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে। এজন্য এই ভাষা আমাদের অবিরাম গুরুতরতার দিকে ঠেলতে থাকে এবং যেহেতু এর টোনই হইতেছে গুরু, তাই এখানে ভারী শব্দ ও জটিল ভঙ্গি বর্জিত তো হয়ই না বরং সাদরে বরিত হয়। ফলে এই ভাষা বড়ো বড়ো বাক্যে চিন্তারে সমস্তভাবে খুইলা-মেইলা ধরতে পারে এবং বর্ণনায় একদম অ্যাকুরেট হইতে পারে এবং তা আরোপিতও লাগে না যেহেতু টোনটাই ওইরকম; তবে একই কারণে ব্যর্থ হয় বৈঠকি আলাপে, সংলাপে আর কথ্য ফিকশনে।

বিপরীতে চলিত রূপ যে ছুটকি, যে কথ্য, যে আলাপি টোন নিয়া সামনে আসে, তা এমনসব শব্দ ও ভঙ্গিই দাবি করে এবং এমনসব শব্দ ও ভঙ্গিই এইখানে ভালোমতন খাপ খায় যা কথ্য, যা আলাপি, যা বৈঠকি, যা ঘরোয়া, এবং মুখের ভাষার সবচেয়ে কাছের; কেননা এর ঝোঁক ও প্রবণতা ওইদিকেই। এই ভাষায় ভারী ও দীর্ঘ উচ্চারণের শব্দ বরিত হয় না। এই কারণে এই ভাষায় বৈঠকি আলাপ, সংলাপ ও কথ্য ফিকশন সফলভাবে করা গেলেও গুরুতর বিষয় ডিল করা তুলনামূলক কঠিন হয় এবং সাধুর ভাব ও ভঙ্গির ভিতরকার অ্যাকুরেটভাব আর এই ভাষার টোনের দাবি উভয়টারে বজায় রাইখা করা তো প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে।

বলতে চাইতেছি, যেহেতু উভয় রূপ এক ক্ষেত্রে সফল হইলেও অপর ক্ষেত্রে ব্যর্থ, সেজন্যই, এই দুইয়ের অধীনে চর্চার ভিতর দিয়া বাংলা ভাষা আজকে যেইখানে আইসা দাঁড়াইছে এবং এই যাত্রায় সে তার খাজানায় যা যা জমা করছে, সম্পূর্ণটারে ঔন করার, একত্রে ধারণ করার ও সমন্বয় করার অ্যাপ্রোচ নিয়া আগাইতে হবে আমাদের।

ভাষাচর্চার অ্যাপ্রোচ যদি সমন্বয়মুখী না হইয়া বিভাজনমুখী হয়, যদি গ্রহণমুখী না হইয়া বর্জনমুখী হয়, এবং তা যদি লেখকদের একটা বড়ো অংশের ভাষিক প্রবণতা হইয়া ওঠে, তাহলে দিন দিন আমরা ভাষাহীন হইতে থাকব। কেননা ওই বর্জনপ্রবণতা একটা সংকীর্ণ পরিসর তৈয়ার করবে, ভাষার রাজপথরে প্রশস্ত করার বদলে সংকীর্ণ করতে করতে পরিণত করবে সরু গলিপথে।

যেই ভাষা তার ঐতিহ্যের ভিতরে থাকা সম্পদগুলিরে চর্চার ভিতর দিয়া স্বীকৃতি দিতে পারতেছে না, সেই ভাষা একটা সীমিত পরিসরের কমফোর্ট জোনের ভিতরে নিজেরে সীমাবদ্ধ কইরা নিতেছে কিংবা তার ঝোঁক ওইদিকেই।

সাধু তো এখন অতীত। তার জায়গা নিছে এখন চলিত ভাষা। কিন্তু আমরা পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করতেছি, আজকের এই প্রমিত চলিত কথ্য বাংলার যে প্রবণতা, সবকিছুকে একটা বৈঠকি, আলাপি ও কথ্য ঢঙে হাজির করবার যে অ্যাপ্রোচ, স্পষ্টতই তা বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে এরকম বর্জনমুখিতা নিয়াই আগাইতেছে। নির্দিষ্ট কিসিমের শব্দ, নির্দিষ্ট আবহের শব্দ, একইরকম সিনট্যাক্সের বাক্য, এবং এইসবের ফলে সৃষ্ট নির্দিষ্ট টান ও টোনের গদ্য বাংলা ভাষার এতদিনকার চর্চার ভিতর গইড়া ওঠা সম্পদরে ওই ওই নির্দিষ্ট উপাদানযুক্ত না হওয়ার দোষে বর্জন করতেছে। এর মাধ্যমে সে ভাষারে একমুখী করতেছে, ভাষার মাত্রাগত বৈচিত্র্য নষ্ট করতেছে এবং ভাষার ভিতরে এক্সপ্রেশন জন্ম নেওয়ার জন্য জরুরি ইকোসিস্টেমটা ধ্বংস করতেছে। এই প্রবণতার ভিতরে বড়ো হওয়া একজন লেখক সারাজীবনে হাতেগোনা কয়েকটা সিনট্যাক্স আর বাক্যপদ্ধতি দিয়া কাজ চালাইতেছেন এবং ভাষা যেহেতু চিন্তাপদ্ধতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে তাই বছরের পর বছর চিন্তার ক্ষেত্রেও একই মাত্রায় বিচরণ করতেছেন।

 

দুই.

ভাষার ভিতরে বর্জনমুখিতার ঘটনা তখনই ঘটছিল যখন সাধু থেকে চলিতে আসা হইছিল। এর মাধ্যমে মূলত তখনই বাংলা ভাষার একটা বড়ো সম্পদ যা সাধুর পৃষ্ঠপোষকতায় গইড়া উঠছিল তারে ডিজঔন করার উপলক্ষ্য তৈয়ার হয়। যদিও এই বিভাজন তাৎক্ষণিকভাবে সেই সম্পদগুলিরে সমূলে বর্জন করে নাই কিন্তু বর্জনমুখিতার একটা বীজ বপণ করছিল তখনই। চলিতের ভিতরেই এই প্রবণতা আছে যে তা সাধুর সম্পদগুলিরে আপনাইতে পারবে না। চলিত শুধু একটা ভাষারীতিই না, একইসাথে একটা ভাষাপ্রবণতাও; শুধু ভাষাপদ্ধতিই না, একইসাথে একটা চিন্তাপদ্ধতিও। চলিতের ভিতর নামলে সবকিছুরই চলিতায়ন ঘটে।

তাত্ত্বিক আলাপের বদলে, আসেন, বিষয়টা আমরা হাতেকলমে দেখার চেষ্টা করি। এজন্য আমরা প্রথমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গদ্য ‘বসন্তযাপন’-এর একটা অংশ পড়ব, তারপর সেটার একটা তথাকথিত ‘ঝরঝরে’ সহজ চলিত কথ্য রূপ দেখব। পড়া যাক রবিবাবুর গদ্যটা:

‘এই মাঠের পারে শালবনের নূতন কচি পাতার মধ্য দিয়া বসন্তের হাওয়া দিয়াছে।

অভিব্যক্তির ইতিহাসে মানুষের একটা অংশ তো গাছপালার সঙ্গে জড়ানো আছে। কোনো এক সময়ে আমরা যে শাখামৃগ ছিলাম, আমাদের প্রকৃতিতে তাহার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তাহারও অনেক আগে কোনো এক আদিযুগে আমরা নিশ্চয়ই শাখী ছিলাম, তাহা কি ভুলিতে পারিয়াছি? সেই আদিকালের জনহীন মধ্যাহ্নে আমাদের ডালপালার মধ্যে বসন্তের বাতাস কাহাকেও কোনো খবর না দিয়া যখন হঠাৎ হু হু করিয়া আসিয়া পড়িত, তখন কি আমরা প্রবন্ধ লিখিয়াছি না দেশের উপকার করিতে বাহির হইয়াছি? তখন আমরা সমস্তদিন খাঁড়া দাঁড়াইয়া মূকের মতো মূঢ়ের মতো কাঁপিয়াছি; আমাদের সর্বাঙ্গ ঝরঝর মরমর করিয়া পাগলের মতো গান গাহিয়াছে; আমাদের শিকড় হইতে আরম্ভ করিয়া প্রশাখাগুলির কচি ডগা পর্যন্ত রসপ্রবাহে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে। সেই আদিকালের ফাল্গুন-চৈত্র এমনতরো রসে-ভরা আলস্যে এবং অর্থহীন প্রলাপেই কাটিয়া যাইত। সেজন্য কাহারো কাছে কোনো জবাবদিহি ছিল না।’

লক্ষণীয় যে, সাধুরীতিতে লেখকের সামনে তেমন কোনো রেস্ট্রিকশন নাই। চলিত যেখানে রেস্ট্রিকশন দেয় যে, এটা ‘বাদ দিয়া’ অন্যভাবে লেখা লাগবে, ‘শব্দ অপচয়’ করা যাবে না, ‘সহজ শব্দে’ লেখতে হবে, মানে একটা শব্দরে উপযুক্ত মনে হইলেই তা লেখা যাবে না, তারে সহজও হওয়া লাগবে, সমশ্রেণিরও হওয়া লাগবে; অল্প শব্দে লেখা লাগবে, মনে চাইল আর কথারে একটু বেশি শব্দে বললাম, তা হবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি; সেখানে, বিপরীতে, সাধুর প্রবণতাটাই এমন যে এখানে ভারী শব্দ অনুমোদিত; কথারে সবিস্তারে খুইলা-মেইলা বলতে যদি দুই-চারটা শব্দ বাড়াইয়াও বলা লাগে তো এখানে তা বলা যায়, এটারে দূষণীয় ভাবা হয় না। টোনের কারণেই এখানে এইসব চলে।

কিন্তু চলিতে কি চলে? উত্তর হইতেছে, না। টোনের কারণেই চলে না। বাকিসব অক্ষত রাইখা শুধু ক্রিয়াপদ বদলাইলেই সাধু থেকে চলিতে আসা যায় না। চলিতে আসতে চলিতের মেজাজ ধারণ করা লাগে। সম্পূর্ণ লেখাটারই চলিতপ্রবণ হওয়া লাগে। আর এই পর্যায়ে দাঁড়াইয়াই আমরা আবিষ্কার করি আমাদের এমন একটা প্রবণতার ভিতরে ঢুকতে হইতেছে যা বর্জনমুখী, অনেক অনেক রেস্ট্রিকশন দিয়া ভরা, যার পথ ধইরা চলতে থাকলে রাস্তা ক্রমেই সরু ও সংকীর্ণ হইয়া আসে।

চলিতপ্রবণতা রক্ষার্থেই গুরুচণ্ডালী নামক ধারণা রক্ষা করা আবশ্যক হয়। শব্দের সমশ্রেণিতা রক্ষা করা : তৎসমের পাশে তৎসম বা তৎসমমাফিক শব্দ, তদ্ভবের পাশে তদ্ভব বা তদ্ভবমাফিক শব্দ, দেশি শব্দের পাশে দেশি বা দেশিমাফিক শব্দ, বিদেশি শব্দের পাশে বিদেশি বা বিদেশিমাফিক শব্দ বসবে—এরকম নিয়ম রক্ষা করা জরুরি হয়। ছুটকি টোনের কারণে অল্প শব্দে কাজ সারার তাড়না তৈরি হয়। বাক্য ছোটো রাখা আবশ্যক হয় বা সেটাই ন্যাচারাল লাগে। বাক্য বড়ো হইলে ভারী, কঠিন ও অস্বাভাবিক লাগে। এইসব ধারণা এমনি এমনি গইড়া ওঠে নাই, যেমনটা অনেকে মনে করেন। বরং এই প্রবণতার ভিতরে চর্চা করতে গিয়াই দেখা গেছে যে তা বিশেষ কিছু দাবি নিয়া হাজির হইতেছে, যেগুলি মানা হইলে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেছে, নচেৎ রচনারে অনাদর করতেছে।

এজন্যই, সাধুরীতিতে আমাদের ব্যবহারে—ভান্ডারে বলব না কারণ ভান্ডারে থাকা আর ব্যবহারে থাকা ভিন্ন জিনিস—যে শব্দগুলি ছিল, আমরা দেখি চলিতরীতিতে আসার পর কীভাবে সেগুলির ব্যবহার দিন দিন সীমিত হইয়া পড়তেছে, কীভাবে শব্দগুলি ‘কঠিন ও ভারী’র তকমা পাইতেছে, কীভাবে এগুলি ভাবের ব্যবহারিক পরিসরে আমাদের অবহেলা পাইয়া পাততাড়ি গুটাইয়া অভিধানের জাদুঘরে নির্বাসিত হইতেছে; দেখি কীভাবে বাক্যের মাপ খাটো হইয়া আসতেছে এবং নানারকমের মুখস্থ ধারণার উদ্ভব ঘটতেছে। এই প্রবণতার ভিতরে এইসব হওয়ারই ছিল। আজকের ছোটোবাক্যসর্বস্ব চিন্তকগণের চিন্তা যেরকম আকার নিতেছে, যেভাবে সিদ্ধান্তবাক্য দিয়া ভরতি থাকতেছে, তা এমনি এমনি ঘটে নাই। এই ভাষিক প্রবণতার ভিতরে তা ঘটারই ছিল।

প্রতিটা জিনিস তার আসলের দিকে ফিরা আসে। বাংলা ভাষা যেই মুহূর্তে চলিতের টোন সেট করল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার অভিমুখ বদলাইয়া গেল, তার চরিত্র বিশেষ রূপ ধারণ করল, ফলে তার ভাগ্যও নির্ধারিত হইয়া গেল। এখন এর লাগাম ছাইড়া দিলে তা প্রকৃতিগত কারণেই ফিরতে থাকবে আপন আলয়ে, যেখানে সে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে : ফিরতে থাকবে কথ্য এক্সপ্রেশনের দিকে, এবং সেই সূত্রে, যেটার দিকে খুব কমই ধেয়ান দেওয়া হয়, কথ্য বিষয়েরও দিকে। কারণ যেই বিষয় যত বেশি কথ্য, এই ভাষায় তা তত বেশি বরণীয়, তত বেশি পারফেক্ট; বিপরীতে যেই বিষয় যত বেশি লেখ্য, যত বেশি ভারী, যত বেশি শাস্ত্রীয় ও বিশেষভাবে পরিশীলনীয়, তা এই ভাষায় তত বেশি কষ্টার্জিত, এই ভাষা থেকে তত বেশি দূরবর্তী। তাহলে চর্চাকারী তো ওইরকম বিষয়ই বাছাই করবেন যাতে তিনি বেশি আরাম বোধ করেন। বিপরীতে অনাগ্রহী হবেন ওইসব বিষয়ে যা এই ভাষার সাথে তুলনামূলক কম যায়।

তারই ধারাবাহিকতায়, শব্দ, বাক্য, গদ্য ও বিষয়ের চলিতায়নের মধ্য দিয়া এই যে হালের প্রমথ চৌধুরীগণ সম্মিলিত প্রয়াসে একটা কট্টর কথ্যভাষার উদ্ভব ঘটাইতেছেন, যা বাহ্যিক বিচারে সহজ মনে হইলেও আসলে অত্যন্ত কষ্টার্জিত যেহেতু তা বর্জনমুখী, তা তাদের ঘটানোরই ছিল। চলিতের একদা এইদিকে আসারই ছিল।

ভাষা হইতে হবে এমন ফ্লেক্সিবল যেখানে আমি কথারে যেভাবেই বলি না কেন, তা সুন্দর বা অন্তত গ্রহণযোগ্য লাগবে। কিন্তু এই কট্টর চলিত কথ্যরীতিতে কথারে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য লাগাইতে আপনার বহু কাঠখড় পুড়াইতে হবে।

কয়েকটা হাস্যকর মুখস্থ ধারণা নিয়া আগায় এই রীতি। তন্মধ্যে অন্যতম দুইটা হইল : সহজ শব্দ, ছোটো বাক্য। তাতেই নাকি লেখা হয় ‘ঝরঝরে’। কোথায় বিষয়ভেদে শব্দের ওজনের তারতম্য আবিষ্কার, আর কোথায় বিষয়ের সাথে গদ্যের যোগাযোগ উপলব্ধি। এইসবরে কবর দিয়া হালের প্রমথ চৌধুরীগণ নামছেন লেখারে ‘ঝরঝরে’ বানাইতে। তাতে ভাষার চরিত্র কেমন দাঁড়াইল আর চিন্তার ওপর তার কেমন প্রভাব পড়ল, তা বিচারের সময় কোথায়! লেখা থেকে যাবতীয় পরিশীলিত—তাদের ভাষায় ‘কঠিন’—শব্দগুলিরে বহিষ্কার কইরা বাক্যগুলিরে ওই হাতেগোনা কয়েকটা মুখস্থ গৎবান্ধা ‘সাবজেক্ট অবজেক্ট ভার্ব’ টাইপের একমুখী রেটোরিক সিনট্যাক্সের ভিতর বসানোর পর এর বনসাই রূপ দেইখা একেকজনের কী উচ্ছ্বাস, কী আত্মগৌরব! এমনই প্রবণতার একজন শ্রদ্ধেয় সিনিয়র লেখক রবিবাবুর ওই ভাবালু টান টান গদ্যের সুর-তাল-লয়রে একদম বিনাশ কইরা দিয়া, সেটারে চলতি আলাপি বৈঠকি খাটো খাটো বাক্যের গদ্যে তরজমা করছেন এভাবে :

‘ওই মাঠের ওপারে শালবনে নতুন কচি পাতার ভেতর দিয়ে বসন্তের হাওয়া বইছে।

মানুষ আর গাছপালার সম্পর্ক আসলে খুব পুরনো। অনেক হাজার বছর আগে আমরা গাছে থাকতাম, ডালে ডালে লাফাতাম—এই জিনিসটা এখনো আমাদের রক্তে আছে। কিন্তু তারও আগে, আরও পুরনো জমানায় হয়তো আমরা নিজেরাই গাছ ছিলাম—এটা কি আমরা ভুলে গেছি?

সেই পুরনো জমানায় যখন দুপুরবেলা চারদিক ফাঁকা, তখন হঠাৎ করে বসন্তের হাওয়া এসে আমাদের ডালপালা নাড়িয়ে দিত। তখন আমরা কোনো লেখালেখি করিনি, দেশের উন্নতির কথা ভাবিনি। বরং সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপতাম, পাগলের মতো গান গাইতাম। আমাদের শিকড় থেকে শুরু করে ডালপালার ডগা পর্যন্ত রসে টইটম্বুর হয়ে উঠত।

সেই পুরনো দিনগুলোতে ফাগুন-চৈত্র মাস কেটে যেত এমনি করে—আলসেমি আর পাগলামিতে। কাউকে কিছু বোঝানোর দরকার পড়ত না।’

***

সাধুর রাজপথ হইতে চলিতের সড়ক হইয়া কট্টর কথ্যরীতির চিপাগলিতে কতটা ঘুরপথ দিয়া আসা লাগল এবং তা কতটা ভাবের বিসর্জন দিয়া আপন বনসাই রূপ রক্ষা করল, তা এবার খেয়াল করেন :

রবিবাবু লেখছেন : ‘অভিব্যক্তির ইতিহাসে মানুষের একটা অংশ তো গাছপালার সঙ্গে জড়ানো আছে।’

এর বদলে লেখা হইছে : ‘মানুষ আর গাছপালার সম্পর্ক আসলে খুব পুরনো।’ কী অহেতুক একটা সিদ্ধান্তবাক্য। রবীন্দ্রনাথের মর্যাদারে লিটারেলি জুতার বাক্সে ঢোকানো হইল। গরুর রচনার শুরুতে আমরা লেখি : গরু একটি গৃহপালিত প্রাণী। কিন্তু কতটা আলগা কথা লাগবে যদি সবখানে এভাবে শুরু করি!

‘অভিব্যক্তির ইতিহাস’ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হইল। ‘অভিব্যক্তি’ শব্দটা যদি বোধগম্য না লাগে তাহলে ‘বিবর্তন’ বলা যাইত। কিন্তু বাদ দেওয়ার কী মানে?

‘বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের একটা অংশ গাছপালার সাথে জড়ানো আছে,’—এই কথাটা যেখানে ভাবপ্রকাশের সম্পূর্ণতার বিচারে বা শাস্ত্রীয় আলাপের বিচারে উত্তীর্ণ হইতেছে, সেখানে ‘মানুষ আর গাছপালার সম্পর্ক আসলে খুব পুরনো’ অত্যন্ত আলগা কথা; তাতে ভাবসম্পূর্ণতা তো নাই-ই, শাস্ত্রীয় ইঙ্গিতের লেশমাত্র নাই।

তারপর রবিবাবু লেখছেন : ‘কোনো এক সময়ে আমরা যে শাখামৃগ ছিলাম, আমাদের প্রকৃতিতে তাহার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়।’

এর বদলে লেখা হইছে : ‘অনেক হাজার বছর আগে আমরা গাছে থাকতাম, ডালে ডালে লাফাতাম—এই জিনিসটা এখনো আমাদের রক্তে আছে।’ খুবই বাজে কথা। রবীন্দ্রনাথ এগুলার কিছুই বলেন নাই। উনি সরাসরি বলছেন ‘শাখামৃগ’, মানে বানর। কী কারণে কথাটা অ্যাকুরেটভাবে বলা হইল না?

তারপর রবিবাবু লেখছেন : ‘কিন্তু তাহারও অনেক আগে কোনো এক আদিযুগে আমরা নিশ্চয়ই শাখী ছিলাম, তাহা কি ভুলিতে পারিয়াছি?’

এর বদলে লেখা হইছে : ‘কিন্তু তারও আগে, আরও পুরনো জমানায় হয়তো আমরা নিজেরাই গাছ ছিলাম—এটা কি আমরা ভুলে গেছি?’

‘আদিযুগ’ সরাইয়া ‘পুরোনো জামানা’ আনা হইছে। কিন্তু ‘আদিযুগ’ যে প্রাগৈতিহাসিক ভাব নিয়া হাজির, ‘পুরোনো জামানা’ সেই ভাব কেমনে আনবে? আদি যতটা প্রাচীন, পুরোনো মোটেও ততটা না।

শব্দের প্রচ্ছন্নতা আর প্রকটতার মাঝে তফাত বোঝা লাগবে। অনেক সময় লেখক কথাটারে সরাসরি বলতে চান না, প্রচ্ছন্নভাবে বলেন। এটা হইতে পারে তার পলিটিক্স, হইতে পারে তার ভাবের অ্যাকুরেট প্রকাশ। মনের মধ্যে ভাবটারে তিনি যেভাবে প্রচ্ছন্ন আকারে দেখছেন, ঠিক সেভাবে, ওই প্রচ্ছন্নভাব অক্ষত রাইখা, ব্যক্ত করতে পারা তো অ্যাকুরেট প্রকাশই এবং তিনি তো সেটাই করতে চাইবেন। যেই জিনিসটা তার নিজের কাছেই প্রচ্ছন্ন, তা তিনি অযথা প্রকটভাবে বলতে যাবেন কেন?

রবিবাবু যদি ‘বানর’ না বইলা ‘শাখামৃগ’ বলেন, যদি ‘বৃক্ষ’ না বইলা ‘শাখী’ বলেন, তো সেটা তিনি সজ্ঞানেই বলছেন বইলা ধইরা নেওয়া হবে।

তা ছাড়া ‘শাখামৃগ’ আর ‘শাখী’ শব্দদুইটার মধ্যে রবিবাবু একটা বিশেষ উৎপত্তিগত ও উচ্চারণিক[1]‘উপনিবেশিক’ লেখতে পারেন, যদিও প্রমিতমতে ‘ঔপনিবেশিক’ সহিহ। যোগও দেখাইতে চাইছেন। এটা ভাবে ও আবৃত্তিতে নয়া মাত্রা আনবে। কট্টর কথ্যভাষা একটা অথর্ব ভাষা হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই এইসব নিতে পারে না।

তারপর রবিবাবু লেখছেন : ‘সেই আদিকালের জনহীন মধ্যাহ্নে আমাদের ডালপালার মধ্যে বসন্তের বাতাস কাহাকেও কোনো খবর না দিয়া যখন হঠাৎ হু হু করিয়া আসিয়া পড়িত, তখন কি আমরা প্রবন্ধ লিখিয়াছি না দেশের উপকার করিতে বাহির হইয়াছি?’

এর বদলে লেখা হইছে : সেই পুরনো জমানায় যখন দুপুরবেলা চারদিক ফাঁকা, তখন হঠাৎ করে বসন্তের হাওয়া এসে আমাদের ডালপালা নাড়িয়ে দিত। তখন আমরা কোনো লেখালেখি করিনি, দেশের উন্নতির কথা ভাবিনি।’ শেষের বাক্যটা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। এই ‘বিশাল গেয়ান’ নিয়া আমরা কী করব?

রবিবাবু কী কায়দা কইরা, যাতে এগুলা আলগা গেয়ান না লাগে সেজন্যেই হয়তো কথাটারে একটা টান টান বাক্যের ভিতর দিয়া প্রশ্নের চালে বললেন যে, তখন যদি বৃক্ষই থাকি তাহলে তো আর প্রবন্ধ লেখতে বসি নাই বা দেশের উন্নতি করতে বের হই নাই, তাই না? ও পাঠক মহাশয়, এটা তো আপনারা বুঝতেছেনই। কই সেই ভাব, আর কীভাবে সেটারে এখানে বানানো হইল একটা আলগা তথ্য।

জুমলায়ে খবারিয়্যা (তথ্যধর্মী বাক্য) আর জুমলায়ে ইনশাইয়্যা (সূত্রপাতধর্মী বাক্য)-এর ফায়দা যারা জানেন, তারা জানেন যে জুমলায়ে খবারিয়্যা তথ্যধর্মী কথা বলে, যা সত্যও হইতে পারে, মিথ্যাও হইতে পারে; বিপরীতে, জুমলায়ে ইনশাইয়্যাহ কোনো তথ্য দেয় না যারে সত্য-মিথ্যা বলা যায়, বরং সে একটা সূত্রপাতধর্মিতার জায়গা থেকে কথা বলে। সোজা কথায়, জুমলায়ে ইনশাইয়্যাহ হইল আদেশমূলক, নিষেধমূলক, জিজ্ঞাসামূলক, আকাঙ্ক্ষামূলক, আশাব্যঞ্জক, চুক্তিমূলক, আহ্বানমূলক, অনুযোগমূলক, শপথমূলক, আশ্চর্যবোধক, প্রার্থনামূলক, প্রশংসাজ্ঞাপক বা নিন্দাজ্ঞাপক বাক্য। এগুলি নিছক প্রকারভেদ না, এগুলি একেকটা এক্সপ্রেশন।

ঠিক কী কারণে এক্সপ্রেশনই চেঞ্জ কইরা ফেলব? জুমলায়ে ইনশাইয়্যারে সাদামাটা জুমলায়ে খবারিয়্যা বানাইয়া ফেলব? রবিবাবু কেন তার কথারে জুমলায়ে খবারিয়্যার আদলে একটা আলগা তথ্য আকারে বলবেন?—যে : ‘সেই পুরনো জমানায় যখন দুপুরবেলা চারদিক ফাঁকা, তখন হঠাৎ করে বসন্তের হাওয়া এসে আমাদের ডালপালা নাড়িয়ে দিত। তখন আমরা কোনো লেখালেখি করিনি, দেশের উন্নতির কথা ভাবিনি।’

এই গেল বাক্য নষ্ট করা। শব্দই বা আর বাদ থাকবে কেন? ‘জনহীন’ হইয়া যাবে ‘চারদিক ফাঁকা’। ‘কাহাকেও কোনো খবর না দিয়া’ বাহুল্য তকমায় ডাস্টবিনে যাবে। অথর্ব ভাষায় এগুলিই তো করতে হয়! একটা ভাষার টোন যদি গ্রহণধর্মী না হইয়া বর্জনধর্মী হয়, তাহলে এইসব তো অনিবার্যই!

এরপর রবিবাবু লেখছেন : ‘তখন আমরা সমস্তদিন খাঁড়া দাঁড়াইয়া মূকের মতো মূঢ়ের মতো কাঁপিয়াছি; আমাদের সর্বাঙ্গ ঝরঝর মরমর করিয়া পাগলের মতো গান গাহিয়াছে; আমাদের শিকড় হইতে আরম্ভ করিয়া প্রশাখাগুলির কচি ডগা পর্যন্ত রসপ্রবাহে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে।’

তার বদলে লেখা হইছে : ‘বরং সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপতাম, পাগলের মতো গান গাইতাম। আমাদের শিকড় থেকে শুরু করে ডালপালার ডগা পর্যন্ত রসে টইটম্বুর হয়ে উঠত।’

‘বরং’ শব্দটা এত সুন্দর ভাবচিত্রের মেজাজটাই নষ্ট করল। এআই লেখে এই টাইপের বাক্য। এর আগে বাক্য ছোটো রাখতে গিয়া ‘তখন’ দুইবার লেখা হইছে। তৃতীয়বার তো আর লেখা যায় না! তাই নিয়া আসা হইল এই ‘বরং’। মানে লেখা শ্রীহীন হইলে হোক, এক্সপ্রেশন কাটা পড়লে পড়ুক, উপবাক্য প্রধান বাক্য ও উপপ্রসঙ্গ মূল প্রসঙ্গ হইয়া দাঁড়াইলে দাঁড়াক, আমার বাক্য ছোটো রাখা লাগবে।

আগের বাক্যে ‘হু হু করিয়া বাতাস আসা’র বিষয়টা সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হইছিল। অথচ বোঝা দরকার ছিল, রবিবাবু শুধু শব্দই লেখতেছেন না, শব্দের চিত্রও আঁকতেছেন। সেজন্য হু হু কইরা বাতাস আসা, মূকের মতো মূঢ়ের মতো দাঁড়াইয়া থাকা, ঝরঝর মরমর কইরা দোলা, এগুলি বাদ দেওয়ার কোনো কারণ নাই।

‘হঠাৎ করে বসন্তের হাওয়া এসে আমাদের ডালপালা নাড়িয়ে দিত’—নিতান্ত সাদামাটা কথা। মানুষ কথারে আরও সচিত্র বানানোর উপায় খোঁজে, আর এখানে উলটা বাক্যের মাথা ধইরা ধইরা ন্যাড়া কইরা দেওয়া হইতেছে।

তারপর বলা হইছে : ‘বরং সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপতাম, পাগলের মতো গান গাইতাম।’ ‘আমি কাঁপতাম’ আর ‘আমার সর্বাঙ্গ কাঁপত’—দুইটার মধ্যকার তফাত না বুঝলে তো মুশকিল। ‘আমার সর্বাঙ্গ গান গেয়ে উঠত’ আর ‘আমি গান গেয়ে উঠতাম’ কি এক কথা?

‘সমস্তদিন’ শব্দটার মতন সুন্দর শব্দ এই কট্টর কথ্যভাষা আপনাইতে পারবে না, জানা কথা। ‘মূক’ আর ‘মূঢ়’ শুইনা তো এইভাষা নিজেই মূক ও মূঢ় হইয়া থাকবে। আবার এমন না যে ওইসব শব্দের উত্তম বিকল্প সে নিয়া আসবে। সে জাস্ট বলবেই না কথাটা।

তারপর আসি। বলা হইছে ‘রসে টইটম্বুর হয়ে উঠত।’ রবিবাবু এ কথা বলেন নাই। তা ছাড়া রসে গাছ টইটম্বুর হইয়া ওঠে না। আলবাত্তা সিক্ত হইতে পারে, নিষিক্তও হইতে পারে, গাছের সজীব চঞ্চল হইয়া ওঠাও জুতসই। কিন্তু এখানে টইটম্বুর প্রথমত অবাস্তব, দ্বিতীয়ত কল্পনা হিসাবে বৈধতা পাইলেও তাতে কোনো সৌন্দর্য নাই।

তারপর রবিবাবু লেখছেন : ‘সেই আদিকালের ফাল্গুন-চৈত্র এমনতরো রসে-ভরা আলস্যে এবং অর্থহীন প্রলাপেই কাটিয়া যাইত। সেজন্য কাহারো কাছে কোনো জবাবদিহি ছিল না।’

তার বদলে লেখা হইছে : ‘সেই পুরনো দিনগুলোতে ফাগুন-চৈত্র মাস কেটে যেত এমনি করে—আলসেমি আর পাগলামিতে। কাউকে কিছু বোঝানোর দরকার পড়ত না।’

এখানেও ‘পুরোনো দিনগুলোতে’ সেই বহু বহু আগের ভাব আনতে পারে নাই।

‘পাগলামি’র কথা রবিবাবু বলেন নাই। বলছেন ‘অর্থহীন প্রলাপ’।

‘আলসেমি’র কথাও তিনি বলেন নাই। বলছেন ‘রসে-ভরা আলস্য’। কিন্তু ‘আলস্য’ তো ভারী শব্দ। কচিকাচার ভাষা এইসব নিতে পারবে? তাই সে আলস্যকে বানাইল আলসেমি। এখন ‘রসে-ভরা আলসেমি’ তো আর বলা যায় না, তাই ওই অংশটাই বাদ। এভাবেই চলতেছে এই হামাগুড়িমূলক ভাষা।

এরপর আসতেছে ‘জবাবদিহি’ শব্দটা। এটাও কাটা পড়ছে। তার বদলে লেখা হইছে ‘বোঝানো’ : ‘কাউকে কিছু বোঝানোর দরকার পড়ত না।’ কে বোঝাবে যে স্রেফ বোঝানো আর কৈফিয়তের ভাষায় বোঝানো এক না?

‘জাহাজে জাহাজে ধংঘর্ষ’-এর ভিডিয়োটার কথা মনে পড়তেছে। বক্তা ‘সংঘর্ষ’ শব্দটা কিছুতেই বলতে না পাইরা, অনেকবার ‘ধংঘর্ষ’ বলার পরে, শেষমেশ ‘বাড়ি খাইব’ বইলা কাজ চালাইলেন। কিন্তু এটা তো কোনো গর্বের বিষয় না, লজ্জার বিষয়। কিন্তু কেমন বাজে ব্যাপার হবে যদি একদল লোক মুগ্ধ হইয়া ভাবেন, কী ওয়াও একটা ব্যাপার! সংঘর্ষের মতন এত ‘কঠিন’ শব্দ বলার কী দরকার? তার জায়গায় ‘বাড়ি খাইব’ দিয়াই তো কাজ চালানো যাইতেছে! এখন থেকে আমরা ‘সংঘর্ষ’-এর বদলে ‘বাড়ি খাইব’ বলব। অনেকটা এভাবেই চলতেছে আমাদের তথাকথিত ‘সহজ, ঝরঝরে, কথ্য’ বাংলা।

যাই হোক, কথা হইল, রবিবাবুর ওই গদ্যটাকে আমাদের বাংলায় সহজেই লেখা যায় এবং আমাদের ভাষা যেই তাল যেই লয় যেই টোন রচনা করে তাতে ভারী ভারী শব্দগুলাও অনায়াসেই বরিত হয়। আমরা কথারে সই সই বলতে পারি। অযথা ঘুরাইয়া বলা লাগে না। নমুনা :

‘এই মাঠের পারে শালবনের নতুন কচি পাতার ফাঁকে দিয়া বসন্তের হাওয়া দিতেছে।

বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের একটা অধ্যায় কিন্তু গাছপালার সঙ্গে জড়াইয়া আছে। কোনো এক কালে আমরা যে শাখামৃগ ছিলাম, আমাদের প্রকৃতিতে তার যথেষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। কিন্তু তারও অনেক আগে, কোনো এক আদিযুগে, আমরা নিশ্চয়ই শাখী ছিলাম, সেটা কি ভুলতে পারছি? সেই আদিকালে, জনহীন দুপুরে, আমাদের ডালপালার মধ্যে যখন বসন্তের বাতাস কাউকে কোনো খবর না দিয়া আচমকা হু হু কইরা আইসা পড়ত, তখন আমরা কি প্রবন্ধ লেখছি, না দেশের উপকার করতে বাহির হইছি? তখন আমরা সমস্তদিন খাঁড়া দাঁড়াইয়া মূকের মতন মূঢ়ের মতন কাঁপছি; আমাদের সর্বসত্তা ঝরঝর মরমর কইরা পাগলের মতন গান গাইছে; আমাদের শিকড় হইতে নিয়া শাখা-প্রশাখাগুলির কচি ডগা পর্যন্ত রসপ্রবাহে ভিতরে ভিতরে চঞ্চল হইয়া উঠছে। সেই আদিকালের ফাল্গুন-চৈত্র এমনিতরো রসে-ভরা আলস্যে আর নিরর্থক আলাপেই কাইটা যাইত। সেজন্য কাউকে কোনো জবাবদিহি করা লাগত না।’

বলা হইতে পারে, ‘এখানে তো তেমন কোনো বদলই করলেন না। খালি ক্রিয়াপদগুলা আর দুই-চারটা শব্দ নিজেদের মনমতন সরাইলেন।’ অতি সত্য কথা এবং এখানেই আসল কথা। আমাদের বাংলায় অহেতুক পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না। বিপরীতে কট্টর কথ্য ভাষার যে মেজাজ, যে চটুলতা, যে ছুটকি টোন, তা রক্ষার স্বার্থেই ওইসব আজেবাজে বদল ঘটাইতে হয়। আমাদের বাংলা এইসব থেকে মুক্ত। আমাদের বাংলা জায়গামতো চটুল, জায়গামতো গুরু। কারণ তা গুরুচণ্ডালী নামক অপধারণা থেকে মুক্ত।

যেমনটা উপরে বললাম, গুরুত্বের জায়গায় লঘুত্ব আর লঘুত্বের জায়গায় গুরুত্ব কিংবা সবখানে গুরুত্ব বা সবখানে লঘুত্বই হইল সমস্যা। সাধুভাষা সবখানে গুরুত্ব নিয়া বইসা ছিল। বিপরীতে চলিত কথ্য ভাষা বইসা আছে পাইকারি লঘুত্ব নিয়া। ফলে তা হইয়া উঠছে মূলত বাংলা ভাষারে অথর্ব বানানোর প্রজেক্ট। এই ভাষা আমাদের ভাষার রাজপথে নিয়া যাবে তো দূরে, ঢুকাইয়া দিতেছে সরু কুটিল গলিপথে। এই ভাষা দেওয়ার বদলে কাইড়া নিতেছে। অনুমোদন করার বদলে নাকচ করতেছে। এই ভাষা আদর্শ কিশোর সাহিত্য পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু এর ওপরে যদি নিয়া যান, তাহলে সেটা যেকোনো ভারী বিষয়রে বাছবিচারহীনভাবে কাইটাছাইটা কিশোর সাহিত্যের মাপে নিয়া আসবে।

 

তিন.

চলিতের এই যে লঘুতা, ভার নিতে না পারার চরিত্র, টোন কথ্য হওয়ার দরুন এর যে বিশেষ দাবি এবং এর ফলে সৃষ্ট যে বিশেষ টানের গদ্য, তা কাটাইয়া যেন এটারে একটা ভারবাহী ভাষা বানানো যায়, সেই লক্ষ্যে কেউ যে কাজ করেন নাই, তা না। অনেকেই করছেন। কিন্তু তা করতে গিয়া তাদের মূলধারার টোন থেকে—সেই সূত্রে স্বাভাবিক গদ্য থেকেও—সরতে হইছে। উনারা বুঝতে পারছেন, চলিতের যে মূলধারার টোন, ছুটকি ও লঘু; তা তাদের প্রত্যাশার সমান ভার বইতে পারবে না। তাই তাদের নানাজন নানাভাবে উত্তরণ খুঁজছেন : কেউ প্রতিশব্দমুখিতার মাধ্যমে যেমন আদিব হুজুর; কেউ বক্তৃতায় টোন বদলানোর মাধ্যমে যেমন মোহাম্মদ আজম; কেউ ক্রিয়াপদকে ইংরেজির অনুকরণে বাক্যের মধ্যভাগে টাইনা আনার মাধ্যমে যেমন হুমায়ুন আজাদ; কেউ নির্দ্বিধ অবলীলাধর্মী টোন গ্রহণের মাধ্যমে যেমন শহিদুল জহির; আবার কেউ বাক্যের সিনট্যাক্স বদলানোর মাধ্যমে যেমন মাসরুর আরেফিন।

আদিব হুজুর তাঁর রচনায় আমাদের যে প্রতিশব্দমুখিতার সাথে পরিচয় করাইছেন তাতে আমরা দেখি তিনি একের পর এক সমার্থক ও প্রতিসমার্থক শব্দ আনতেছেন এবং সংযোজক অব্যয় ‘ও, এবং’-এর মাধ্যমে সেগুলিরে জুইড়া দিয়া বাক্য গঠন করতেছেন। নমুনাস্বরূপ একটা অংশ পড়া যাক :

‘.. তখন যাবতীয় চাকচিক্য ও চমক-ঝলক সত্ত্বেও জাহেলি জীবন তাদের কাছে মনে হলো দুর্বিষহ। এতদিনের সুখশয্যা তাদের কাছে হয়ে গেলো কণ্টকশয্যা। এমনকি প্রাণ ও প্রাণপ্রিয় সবকিছু মনে হলো তুচ্ছ। দ্বীন ও দুনিয়ার হাকিকত এবং জীবন ও জগতের প্রকৃত সত্য তাদের সামনে তখন আলোক-উদ্ভাসিত হয়ে গিয়েছে। তাই হৃদয় ও আত্মার আকুতি উপেক্ষা করা এবং বুদ্ধি ও বিবেকের দাবি প্রত্যাখ্যান করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। পথ ও পথের মঞ্জিল যারা পেয়ে যায় ভয় ও বাধা তাদের মন থেকে মুছে যায়; সাহস ও উদ্দীপনা তখন তাদের আকাশচুম্বী হয়ে যায়।’[2]মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো; মূল : সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবি; … Continue reading

এরকম ও-এবংযুক্ত একাধিক শব্দ ও প্রতিশব্দ আনার অজস্র উদাহরণ পাওয়া যাবে তাঁর ‘মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো’ অনুবাদগ্রন্থে।

এভাবে ‘ও, এবং’ দিয়া শব্দ আনলে এবং কঠিন শব্দের পাশে একটা সহজ প্রতিশব্দ রাখলে উভয়টা একে অপরকে ব্যাখ্যা করে এবং ভারী কথার ভার নিজেদের মধ্যে ভাগ কইরা নেয়। এর ফলে যে বিশেষ টোন তৈয়ার হয়, পাঠক তাতে প্রবেশ করামাত্রই বুইঝা যান যে, লেখক এইভাবেই কথা বলবেন, এরকম ‘ও, এবং’ দিয়া সমার্থক-প্রতিসমার্থক শব্দ তার লেখায় থাকবেই, সুতরাং লেখকের কাছ থেকে তাদের চেনা স্বাভাবিক বাংলা গদ্য এক্সপেক্ট কইরা লাভ নাই। এভাবে আদিব হুজুর চলিতের লঘু টোন থেকে নিজেকে মুক্ত করেন।

কথ্য টোন থেকে বের হইয়া আসার কাজটা মোহাম্মদ আজম তাঁর বক্তৃতায় করেন বেশ ইন্টারেস্টিংভাবে। তাঁর বক্তৃতা শুনলে মনে হবে বক্তৃতা তো না যেন প্রবন্ধপাঠ। ভারী ভারী শব্দ, কি-ওয়ার্ড, পরিভাষা ও বড়ো বাক্য অনায়াসেই তিনি বলেন মুখে মুখে। এটা সম্ভব হয় তার টোন বদলানোর কারণে। শ্রোতারা যখন শুরুতেই টের পান যে বক্তার টোন স্বাভাবিক কথার মতন না, প্রবন্ধপাঠের মতন; যখন শুরুতেই বুঝতে পারেন যে বক্তা বিকালবৈঠকীয়তা করতে বসেন নাই, বরং সিরিয়াস আলাপে বসছেন; তখন তারা সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়া রাখেন।

টোন বদলানোর কাজটা হুমায়ুন আজাদ করেন বাক্যের ক্রিয়াপদের জায়গা বদলের মাধ্যমে। উনার ‘নারী’ বইটা থেকে পইড়া দেখা যাক :

‘.. আগে জন্মসূত্রেই একদল আধিপত্য করতো আরেক দলের ওপর, এখন করে না; কিন্তু এখনো, পুরোনো কাল থেকেই, চলছে জন্মাধিকারবশতই মানুষের একদলের ওপর আরেক দলের আধিপত্য; সেটা লিঙ্গের, নারীপুরুষের, এলাকায়। এখন, ও ঐতিহাসিকভাবে, নারীপুরুষের সম্পর্ক হচ্ছে আধিপত্য ও অধীনতার। পৃথিবী জুড়েই চলছে, কিন্তু চোখে পড়ে না বা স্বীকার করা হয় না যে জন্মাধিকার বলেই পুরুষেরা শাসন করছে নারীদের। এ-পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে চমৎকার একধরনের ‘আভ্যন্তর ঔপনিবেশিকতা’। এর কারণ হচ্ছে সমস্ত পুরোনো ও আমাদের ‘সভ্যতা’ পিতৃতান্ত্রিক। এটা এতো স্পষ্ট যে চোখে পড়ে না : সামরিক, শিল্পকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান, রাজনীতিক কার্যালয়, পুলিশ—সমাজের ক্ষমতার সমস্ত এলাকাই পুরুষের হাতে। রাজনীতির মূলকথা হচ্ছে ক্ষমতা। ওই ক্ষমতা পুরুষের নিয়ন্ত্রণে; আর অলৌকিক ঈশ্বর, রাষ্ট্রপতি ও তার মন্ত্রণালয়, সমস্ত নীতি ও মূল্যবোধ, দর্শন ও শিল্পকলা সবই পুরুষের তৈরি। পিতৃতন্ত্রের বড়ো ষড়যন্ত্র হচ্ছে যে পুরুষ আধিপত্য করবে নারীর ওপর। আবহমান কাল ধরে পৃথিবী জুড়ে এটা চলছে। পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর আধিপত্য করার জন্যে গ্রহণ করেছে সার্বিক পরিকল্পনা। মিলেট (১৯৬৯, ২৬-৫৮) সেগুলোকে ভাগ করেছেন : [এক] ভাবাদর্শগত, [দুই] জৈবিক, [তিন] সমাজতাত্ত্বিক [চার] শ্রেণী, [পাঁচ] আর্থ ও শিক্ষাগত, [ছয়] বলপ্রয়োগ, [সাত] নৃতাত্ত্বিক : পুরাণ ও ধর্ম, ও [আট] মনস্তাত্ত্বিক ভাগে। এগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিলে বোঝা যাবে পিতৃতন্ত্রের পুরুষাধিপত্যের ক্রূর পরিকল্পনা কতো ব্যাপক।’[3]নারী, হুমায়ুন আজাদ, পৃ. ২৭।

এভাবে ক্রিয়াপদের অবস্থান বাক্যের মধ্যভাগে আনায় একটা কাব্যিক টোন তৈয়ার হয়। উনিও ভারী আলাপের ভার বহনের একটা উপায় খুঁইজা পান।

শহিদুল জহির চলিতের টোন থেকে সরেন নির্দ্বিধ ও অবলীলাধর্মী উচ্চারণের মাধ্যমে। ওই নির্দ্বিধ টোনের কারণেই তাতে অনায়াসে আসতে পারে এমন শব্দাবলি ও অভিনব এক্সপ্রেশন যেগুলি সাধারণত ওইসব ক্ষেত্রে আসার অনুমতি পায় না কথ্য ভাষায়। তার অন্যতম সফল উপন্যাস ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু’ বইয়ে আমরা দেখি কীভাবে তিনি ফিকশন লেখতেছেন নন-ফিকশনের গদ্যে। উপন্যাসের শুরুটা পইড়া দেখা যাক :

‘সিরাজগঞ্জ শহরের কালীবাড়ি রোডে, মমতাদের বাড়ির প্রাঙ্গণে, পেয়ারাগাছতলায় শববাহকেরা যখন আবু ইব্রাহীমের লাশসহ খাটিয়া কাঁধে তুলে নেয় এবং প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে জুমা মসজিদের দিকে যেতে থাকে তখন আবু ইব্রাহীমের পৃথুলা বিধবা স্ত্রী মমতার এই শোক এবং নির্মম বাস্তবতার ভেতর বহুদিন পূর্বের এক রাত্রির কথা মনে পড়ে। সেদিন গভীর রাতে ঢাকার বেইলি রোডের সরকারি কলোনিতে আবু ইব্রাহীম মমতাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে ব্যালকনিতে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, সারস পাখির ঝাঁক উইড়া যাইতাছে, শোনো। কালীবাড়ি সড়কের উপর দিয়ে যখন শববাহক এবং অনুগমনকারীরা উচ্চ স্বরে কলেমা তৈয়বা পড়তে পড়তে অগ্রসর হয় তখন মমতার কেন যেন সেই রাতটির কথা মনে পড়ে যায় এবং তার হৃদয় বিদীর্ণ হয় এবং বর্ষার যমুনার মতো তার দুচোখ ভেসে যায়।’[4]আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু, শহিদুল জহির, উপন্যাসের শুরুর অংশ।

সিম্পলি তিনি এভাবেই গল্প বলতেছেন; যেনবা গল্প বলার কোনো ইচ্ছাই তার নাই, কথা বাড়ানোর ইচ্ছাও নাই; যত তাড়াতাড়ি পারেন খবরটা আমাদের জানাইতে পারলে বাঁচেন। এই যখন তার টোন তখন পাঠক শুরুতেই তার থেকে চলিতের চেনা গদ্য এক্সপেক্ট করতেছেন না। উনিও উনার অবলীলাধর্মিতা উদ্‌যাপন করতেছেন; রেস্ট্রিকশনের থোড়াই কেয়ার করতেছেন।

আরেক ধরনের উত্তরণ হইতেছে বাংলার চেনাজানা সিনট্যাক্সের ভিতরে না থাকা, সিনট্যাক্স ভাঙা, বদলানো, নতুনভাবে গড়া, এবং এর মাধ্যমে চলিতের নানাবিধ রেস্ট্রিকশনের ঊর্ধ্বে ওঠার চেষ্টা করা, যেমনটা করেন মাসরুর আরেফিন। তাঁর গদ্য পড়া যাক ‘আগস্ট আবছায়া’ থেকে :

‘.. সময় বয়ে গেছে বলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সব তাৎপর্যময়তা, রূপ ও তদন্তানুসন্ধানগুলোর অপচয় হয়ে গেছে বলে মার্সেল বা কথক শেষ জীবনে এসে তার হারানো সময়কে ফিরে পেতে চাইছে, নিজেকে প্রবোধ দিয়ে বলতে চাইছে যে, তার পেছনে ফেলে আসা জীবনের সব রূপমাধুর্যের অভিজ্ঞতা ব্যর্থ হয়ে যায়নি, বলতে চাইছে যে, ওরা আসলে অবিনশ্বর, তার মানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে হারানো সময়কে ফিরে পাওয়া সম্ভব, এবং হারানো সময়কে ফিরে পাওয়ার জন্য কোনো কিছু নতুন করে করতে হয় না, কোনো কিছু আবিষ্কারও করা লাগে না, শুধু অতীতের সবকিছুকে মনে করে একসঙ্গে জড়ো করে, বেছে নিয়ে, একটার সঙ্গে একটা স্মৃতির জোড়া দিয়ে, জোড়া খুলে, ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংযোগসূত্র বদলে দিয়ে, এক জীবন ভর সব দেখার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন সংযোগসূত্র তৈরি করে স্মৃতির ধারাবাহিকতাহীন, কালানুক্রমিকতাহীন উন্মোচন করে গেলেই সম্ভবত, তাহলেই সম্ভবত আলুলায়িত ও লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া এক জীবনের পুনর্নির্মাণ সম্ভব হয় যেখানে প্রুস্তের আশা যে দেখা যাবে সবকিছুর মধ্যে, জীবনের প্রতিটা ঘটনা-নাম-স্থান-কালের মধ্যে চোরাস্রোতের বহমান এক ঐক্য রয়েছে, সুষম এক বিন্যাস রয়েছে, যেমন বিন্যাস আছে আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীতে, সমুদ্রের ঢেউয়ের ডিজাইনে এবং তখন কে জানে হয়তো আরও দেখা যাবে এই তুচ্ছ-অর্থহীন-পাষাণভার মানবজীবনের—ধর্মের সুশীল হাতের ছোঁয়া ছাড়াই—এক বিশ্বজনীন তাৎপর্যও রয়েছে কোনো।’[5]আগস্ট আবছায়া, মাসরুর আরেফিন, পৃ. ৪৪।

এভাবে, আমরা দেখি, যারাই ভাবের স্বতঃস্ফূর্ত ও অবলীলাধর্মী প্রকাশে ব্রতী হইতেছেন, তারা চলিতের চেনা গদ্যে ও টোনে থাকতে পারতেছেন না; তাদের দূরে সরতে হইতেছে, মূলধারা ভাঙতে হইতেছে, টোন বদলাইতে হইতেছে; এক ধরনের অদ্ভুত বা ভালো ভাষায় বললে অভিনব ধারা নিয়া হাজির হইতে হইতেছে। মূলধারায় এইটা অসম্ভব ছিল।

 

চার.

উপরের সমস্ত আলোচনার পর, সাধু-চলিতের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে, এই পর্যায়ে, আমাদের জন্য অতএব জরুরি হইয়া দাঁড়াইছে বাংলা ভাষার পক্ষে এমন একটা ভাষারীতি খোঁজা, যার টোনটাই হবে এমন যা সাধুর গুরুতা ও চলিতের লঘুতাকে একসাথে ধারণ করতে পারে এবং যেখানে সাধু ও চলিত এ যাবৎকালে যত সম্পদ জড়ো করছে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বরিত হইতে পারে।

সেই সিলসিলায় এখন আমরা বাংলা ভাষার পক্ষে একটা ভাষারীতি প্রস্তাব করতে যাইতেছি। আশা করতেছি আরও অনেকেই তাদের নিজ নিজ চিন্তার জায়গা থেকে নিজ নিজ প্রস্তাবনা পেশ করবেন। এভাবে আলাপ-আলোচনা ও আদান-প্রদানের মধ্য দিয়া একসময় আমরা এর একটা প্রমিত রূপ দাঁড় করাইতে পারব ইনশাআল্লাহ।

 

আমাদের বাংলার পক্ষে একটা প্রস্তাবনামূলক ভাষারীতি

১. মুখের ভাষা আর লেখার ভাষা আলাদা হবেই। আমাদের লক্ষ্য মুখের ভাষায় লেখা না। বরং লেখ্য ভাষার এমন একটা প্রমিত রূপ দাঁড় করানো, যা ফ্লেক্সিবল, প্রান্তিক না, লঘুত্বসর্বস্ব বা গুরুত্বসর্বস্ব না, যেখানে লঘু-গুরু উভয়রকম এক্সপ্রেশন জায়গা পায়, যার টোনই এমন যে তা উভয়টার মধ্যে সমন্বয় করতে পারে, এবং বাংলা ভাষার এতকালের সাহিত্যসম্পদ, তা সাধুর মধ্যে থাকুক বা চলিতের মধ্যে, তারে আপনাইতে পারে।

এই কাজটা চলিতে করা সম্ভব না। সাধুতেও না। কারণ উভয়টাই প্রান্তিক টোন নিয়া আগায়। আমাদের তৃতীয় একটা টোনকে প্রমিতের মান দেওয়া লাগবে।

প্রশ্ন আসতে পারে যে এই টোন কই পাব? উত্তর হইল, এই টোন এমন না যে মাটি খুঁইড়া আবিষ্কার করা লাগবে। এই টোন অলরেডি আমাদের বাংলাদেশের মানুষের ভাষায় আছে। শুধু দরকার একটা ফ্লেক্সিবল কিন্তু সমন্বিত ভাষারীতির অধীনে জোরদার চর্চা।

সাধুর সাধুতা, ভারিক্কি ও গম্ভীরতা এবং চলিতের চপলতা, তরলতা ও লঘুতাকে একত্রে ধারণের যে চেষ্টার কথা বলা হইতেছে তা আমরা করতে পারব আমাদের ভাষার টোনের কারণে।

প্রথমত, ভাষাটা কথ্য। এজন্য এটা একটা গতিশীল ভাষা। কথ্য শব্দগুলা অলরেডি এখানে মজুদ আছে কিংবা অনায়াসে খাপ খাওয়াইতে পারবে। তাই এটা চলিতের সম্পদগুলিরে আপনাইতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, এর ক্রিয়াপদগুলি সাধুর কাছাকাছি। মানে তার টোনের ভিতরে একটা গুরুগম্ভীর লয়ও আছে। ফলে এটা সাধুর সম্পদগুলিরেও আপনাইতে পারবে। এভাবে এটা কথ্য ও লেখ্য উভয়রকম উপাদান সংবলিত একটা প্রমিত ভাষা হিসাবে দাঁড়াইতে পারবে।

২. সকল ভাষার চলনসই শব্দ বাংলায় আমদানি করা লাগবে এবং পূর্বপ্রচলিত শব্দগুলিকে রেওয়াজ দেওয়া লাগবে। এক্ষেত্রে সংস্কৃত বাংলা আরবি ফারসি উর্দু ইংরেজি—কোনো ভাষার শব্দে অশুচি রাখা যাবে না। লেখক যেটাকে অ্যাকুরেট ও মোক্ষম ভাবতেছেন সেটা লেখবেন। পরিবর্তনের এই ধারা মসৃণ হওয়া উচিত। আরোপিত জিনিস টিকবে না, যেভাবে টিকতেছে না উপনিবেশায়িত বাংলা ভাষা।

৩. প্রমিতকে যতটুকু ভাঙলে ফ্লেক্সিবিলিটি আসে ততটুকু ভাঙব। মানে, আমাদের বাংলার যে রূপটা তার গুণমান বজায় রাইখা বর্তমান প্রমিতের সবচেয়ে কাছাকাছি, সেই ভাষায় লেখব। চলনসই শব্দ ছাড়া আঞ্চলিক শব্দ লেখব না। ধীরভাবে শব্দের অন্তর্ভুক্তি জারি রাখা লাগবে। কট্টরভাবে মুখের ভাষায় লেখব না। ক্রিয়াপদগুলি প্রমিতের কাছাকাছি ও সাধুঘেঁষা রাখব। সেজন্য যামু, খামু, নিমু না লেইখা লেখব যাব, খাব, নিব বা লইব। সাধুঘেঁষা ফেয়েল ও চলিতঘেঁষা ইসমই মূলত নয়া টোন তৈয়ারের মূল উপাদান, যা গুরুচণ্ডালী ধারণার ঊর্ধ্বে।

৪. মোটাদাগে প্রচলিত বাংলা ব্যাকরণ মানা যাবে এবং যেখানে সংস্কৃত দিয়া বাংলাকে অন্যায় শাসন করা হইতেছে, সেখানে তাকে বর্জন করা যাবে। সেইসাথে চেষ্টা জারি রাখা লাগবে যাতে আমরা সংস্কৃত পরিভাষার ব্যাকরণ থেকে ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব উপলব্ধির আলোকে গইড়া ওঠা পরিভাষাভিত্তিক ব্যাকরণের দিকে আসতে পারি।

৫. একই লেখার ভিতর অসমাপিকা ক্রিয়ার দুইটা রূপই থাকতে পারবে। আবৃত্তির সৌন্দর্য আনয়নে যেটা পারফেক্ট হয়, লেখক সেটা ব্যবহার করতে পারবেন। যেমন : হয়ে ও হইয়া; দেখে ও দেইখা; বসে ও বইসা; নিয়ে ও নিয়া, বা লইয়া; দিয়ে ও দিয়া; পালটায়ে ও পালটাইয়া; বদলায়ে ও বদলাইয়া; বিছায়ে ও বিছাইয়া; বাঁচায়ে ও বাঁচাইয়া; সারায়ে ও সারাইয়া; দেখায়ে ও দেখাইয়া; ফিরায়ে ও ফিরাইয়া। ফিকশন বা ফিকশনধর্মী আলাপে প্রথম রূপ আর নন-ফিকশন বা নন-ফিকশনধর্মী আলাপে দ্বিতীয় রূপ ব্যবহার করা যাইতে পারে।

৬. জমির, ইসমে ইশারা ও ইসমে মওসুলধর্মী শব্দে ‘ই’-এর ব্যবহারও জায়গাভেদে পালটাইতে পারবে। যেমন : এটা ও এইটা; যেটা ও যেইটা; সেটা ও সেইটা; ওটা ও ওইটা; ওসব ও ওইসব। লেখক যেটা যেখানে যেভাবে লেখছেন, ধইরা নিতে হবে সেটা তার আবৃত্তির স্বার্থে।

৭. আপাতত বানানের ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম বাদে মোটের ওপর একাডেমিকে ফলো করা যাবে। যেমন ক্রিয়াপদের বানানে ‘ভাবতেসে’ না লেইখা ‘ভাবতেছে’ লেখা। কট্টর সন্ধিজনিত পরিবর্তনগুলি অ্যাভোয়েড করা যাবে। যেমন : দিগ্‌দিগন্ত না লেইখা দিকদিগন্ত; সম্পৎশালী না লেইখা সম্পদশালী। তবে যারা লেখতেছেন তাদেরটা কাটা যাবে না।

৮. ‘কে’ ও ‘রে’ এক লেখায় একটা রাখা ভালো। না-পারতে-কার সময় সুবিধামতো যেকোনোটা ব্যবহার করা যাবে। আবার বস্তু ও বিষয়ের ক্ষেত্রে ‘রে’ আর ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘কে’ ব্যবহার করা যাইতে পারে। আবার কেউ যদি ব্যক্তিকে বস্তু বা বিষয়ের পর্যায়ে নামাইতে চান কিংবা বস্তু বা বিষয়কে ব্যক্তির পর্যায়ে উঠাইতে চান, তিনি সেই স্বাধীনতা রাখেন। এক্ষেত্রে কোনো আবশ্যক বিধি নাই।

৯. পরপর দুইটা অসমাপিকা ক্রিয়া আসলে লেখক তার পছন্দমতো দুইভাবেই লেখতে পারবেন। যথা : বইসা থাইকা থাইকা আমি ক্লান্ত এবং বসে থেকে থেকে আমি ক্লান্ত; ভাইবা ভাইবা আমি কূল পাই না; ভেবে ভেবে আমি কূল পাই না।

১০. উনি ও তিনি; এটা/এইটা ও ইহা; ওটা/ওইটা ও উহা; যা ও যাহা; তা ও তাহা ইত্যাদির সাধু ও চলিত উভয় রীতিই প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যাবে।

১১. চ্ছ-ওয়ালা ফেয়েলগুলি অক্ষত রাখা যাইতে পারে। যেমন : যাচ্ছে, নিচ্ছে, দিচ্ছে ইত্যাদি।

১২. এটা বাদে ব্যবহার্য ক্রিয়াপদের নমুনা নিচে দেওয়া গেল :

 

উঠ্‌ ধাতু—

উঠতাম, উঠছিলাম, উঠতেছিলাম, উঠলাম, উঠছি, উঠতেছি, উঠি, উঠব; উঠাইতাম, উঠাইছিলাম, উঠাইতেছিলাম, উঠাইলাম, উঠাইছি, উঠাইতেছি, উঠাই, উঠাব/উঠাইব।

উঠতা, উঠছিলা, উঠতেছিলা, উঠলা, উঠছ, ওঠো (নিত্যবৃত্ত বর্তমান ও আদেশ), উঠবা (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), উইঠো (অনুজ্ঞা); উঠাইতা, উঠাইছিলা, উঠাইতেছিলা, উঠাইলা, উঠাইছ, উঠাইতেছ, উঠাও, উঠাবা/উঠাইবা (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), উঠায়ো/উঠাইয়ো (অনুজ্ঞা)।

উঠতি, উঠছিলি, উঠতেছিলি, উঠলি, উঠছিস, উঠতেছিস, উঠিস, উঠবি (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), ওঠ; উঠাইতি, উঠাইছিলি, উঠাইতেছিলি, উঠাইলি, উঠাইছিস, উঠাইতেছিস, উঠা, উঠাবি/উঠাইবি (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), উঠাস (অনুজ্ঞা)।

উঠত, উঠছিল, উঠতেছিল, উঠল, উঠছে, উঠতেছে, ওঠে, উঠবে, উঠুক; উঠাইত, উঠাইছিল, উঠাইতেছিল, উঠাইল, উঠাইছে, উঠাইতেছে, উঠায়, উঠাবে, উঠাক।

উঠতেন, উঠছিলেন, উঠতেছিলেন, উঠলেন, উঠছেন, উঠতেছেন, ওঠেন (নিত্যবৃত্ত বর্তমান ও আদেশ), উঠবেন (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), উইঠেন (অনুজ্ঞা); উঠাইতেন, উঠাইছিলেন, উঠাইতেছিলেন, উঠাইলেন, উঠাইছেন, উঠাইতেছেন, ওঠান (নিত্যবৃত্ত বর্তমান ও আদেশ), উঠাবেন/উঠাইবেন (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), উঠায়েন (অনুজ্ঞা)।

উঠে/উইঠা; উঠায়ে/উঠাইয়া।

 

কর্‌ ধাতু—

করতাম, করছিলাম, করতেছিলাম, করলাম, করছি, করতেছি, করি, করব; করাইতাম, করাইছিলাম, করাইতেছিলাম, করাইলাম, করাইছি, করাইতেছি, করাই, করাব।

করতা, করছিলা, করতেছিলা, করলা, করছ, করতেছ, করো, করবা (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), কইরো (অনুজ্ঞা); করাইতা, করাইছিলা, করাইতেছিলা, করাইলা, করাইছ, করাইতেছ, করাও, করাবা/করাইবা (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), করাইয়ো (অনুজ্ঞা)।

করতি, করছিলি, করতেছিলি, করলি, করছিস, করতেছিস, করিস (নিত্যবৃত বর্তমান ও অনুজ্ঞা), করবি (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), কর; করাইতি, করাইছিলি, করাইতেছিলি, করাইলি, করাইছিস, করাইতেছিস, করাস, করাবি/করাইবি (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), করা।

করত, করছিল, করতেছিল, করল, করছে, করতেছে, করে, করবে, করুক; করাইত, করাইছিল, করাইতেছিল, করাইল, করাইছে, করাইতেছে, করায়, করাবে, করাক।

করতেন, করছিলেন, করতেছিলেন, করলেন, করছেন, করতেছেন, করেন (নিত্যবৃত্ত বর্তমান ও আদেশ), করবেন (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), কইরেন; করাইতেন, করাইছিলেন, করাইতেছিলেন, করাইলেন, করাইছেন, করাইতেছেন, করাবেন/করাইবেন (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), করান।

করে/কইরা; করায়ে/করাইয়া।

 

কাট্‌ ধাতু—

কাটতাম, কাটছিলাম, কাটতেছিলাম, কাটলাম, কাটছি, কাটতেছি, কাটি, কাটব; কাটাইতাম, কাটাইছিলাম, কাটাইতেছিলাম, কাটাইলাম, কাটাইছি, কাটাইতেছি, কাটাই, কাটাব/কাটাইব।

কাটাইতা, কাটছিলা, কাটতেছিলা, কাটলা, কাটছ, কাটতেছ, কাটো (নিত্যবৃত্ত বর্তমান ও আদেশ), কাটবা (ভবিষ্যৎ ও অনুজ্ঞা), কাইটো (অনুজ্ঞা); কাটাইতা, কাটাইছিলা, কাটাইতেছিলা, কাটাইলা, কাটাইছ, কাটাইতেছ, কাটাও, কাটাবা/কাটাইবা, কাটায়ো/কাটাইয়ো।

কাটতি, কাটছিলি, কাটতেছিলি, কাটলি, কাটছিস, কাটতেছিস, কাটিস, কাট, কাটবি; কাটাইতি, কাটাইছিলি, কাটাইতেছিলি, কাটাইলি, কাটাইছিস, কাটাইতেছিস, কাটাস, কাটা, কাটাবি/কাটাইবি।

কাটত, কাটছিল, কাটতেছিল, কাটল, কাটছে, কাটে, কাটুক, কাটবে; কাটাইত, কাটাইছিল, কাটাইতেছিল, কাটাইল, কাটাইছে, কাটাইতেছে, কাটায়, কাটাক, কাটাবে/কাটাইবে।

কাটতেন, কাটছিলেন, কাটতেছিলেন, কাটলেন, কাটছেন, কাটতেছেন, কাটেন, কাটবেন, কাইটেন; কাটাইতেন, কাটাইছিলেন, কাটাইতেছিলেন, কাটাইলেন, কাটাইছেন, কাটাইতেছেন, কাটান, কাটাবেন/কাটাইবেন।

কেটে/কাইটা; কাটায়ে/কাটাইয়া।

 

খা ধাতু—

খাইতাম, খাইছিলাম, খাইতেছিলাম, খাইলাম, খাইছি, খাইতেছি, খাই, খাব/খাইব; খাওয়াইতাম, খাওয়াইছিলাম, খাওয়াইতেছিলাম, খাওয়াইলাম, খাওয়াইছি, খাওয়াইতেছি, খাওয়াই, খাওয়াব।

খাইতা, খাইছিলা, খাইতেছিলা, খাইলা, খাইছ, খাইতেছ, খাও, খাইয়ো, খাবা/খাইবা; খাওয়াইতা, খাওয়াইছিলা, খাওয়াইতেছিলা, খাওয়াইলা, খাওয়াইছ, খাওয়াইতেছ, খাওয়াও, খাওয়াইয়ো, খাওয়াবা/খাওয়াইবা।

খাইতি, খাইছিলি, খাইতেছিলি, খাইলি, খাইছিস, খাইতেছিস, খাস, খাবি, খা; খাওয়াইতি, খাওয়াইছিলি, খাওয়াইতেছিলি, খাওয়াইলি, খাওয়াইছিস, খাওয়াইতেছিস, খাওয়াস, খাওয়াবি, খাওয়া।

খাইত, খাইছিল, খাইতেছিল, খাইল, খাইছে, খাইতেছে, খায়, খাবে, খাক; খাওয়াইত, খাওয়াইছিল, খাওয়াইতেছিল, খাওয়াল, খাইওয়াছে, খাওয়াইতেছে, খাওয়ায়, খাওয়াবে/খাওয়াইবে, খাওয়াক।

খাইতেন, খাইছিলেন, খাইতেছিলেন, খাইলেন, খাইছেন, খাইতেছেন, খান, খাবেন, খাইয়েন; খাওয়াইতেন, খাওয়াইছিলেন, খাওয়াইতেছিলেন, খাওয়াইলেন, খাওয়াইছেন, খাওয়াইতেছেন, খাওয়ান, খাওয়াবেন/খাওয়াইবেন, খাওয়াইয়েন।

খেয়ে/খাইয়া; খাওয়ায়ে/খাওয়াইয়া

 

দি ধাতু—

দিতাম, দিছিলাম, দিতেছিলাম, দিলাম, দিছি, দিতেছি, দেই, দিব; দেওয়াইতাম, দেওয়াইছিলাম, দেওয়াইতেছিলাম, দেওয়াইলাম, দেওয়াইছি, দেওয়াইতেছি, দেওয়াই, দেওয়াব/দেওয়াইব।

দিতা, দিছিলা, দিতেছিলা, দিলা, দিছ, দিতেছ, দাও, দিয়ো, দিবা; দেওয়াইতা, দেওয়াইছিলা, দেওয়াইতেছিলা, দেওয়াইলা, দেওয়াইছ, দেওয়াইতেছ, দেওয়াও, দেওয়াইয়ো, দেওয়াবে/দেওয়াইবে।

দিতি, দিছিলি, দিতেছিলি, দিলি, দিছিস, দিতেছিস, দিস, দিবি, দে; দেওয়াইতি, দেওয়াইছিলি, দেওয়াইতেছিলি, দেওয়াইলি, দেওয়াইছিস, দেওয়াইতেছিস, দেওয়াস, দেওয়াবি/দেওয়াইবি, দেওয়া।

দিত, দিছিল, দিতেছিল, দিলো, দিছে, দিতেছে, দেয়, দিবে, দিক; দেওয়াইত, দেওয়াইছিল, দেওয়াইতেছিল, দেওয়াইল, দেওয়াইছে, দেওয়াইতেছে, দেওয়ায়, দেওয়াবে/দেওয়াইবে, দেওয়াক।

দিতেন, দিছিলেন, দিতেছিলেন, দিলেন, দিছেন, দিতেছেন, দেন, দিবেন, দিয়েন; দেওয়াইতেন, দেওয়াইছিলেন, দেওয়াইতেছিলেন, দেওয়াইলেন, দেওয়াইছেন, দেওয়াইতেছেন, দেওয়াবেন/দেওয়াইবেন, দেওয়ান, দেওয়াইয়েন।

দিয়ে/দিয়া; দেওয়ায়ে/দেওয়াইয়ে।

 

দৌড়া ধাতু—

দৌড়াইতাম, দৌড়াইছিলাম, দৌড়াইতেছিলাম, দৌড়াইলাম, দৌড়াইছি, দৌড়াইতেছি, দৌড়াই, দৌড়াব/দৌড়াইব।

দৌড়াইতা, দৌড়াইছিলা, দৌড়াইতেছিলা, দৌড়াইলা, দৌড়াইছ, দৌড়াইতেছ, দৌড়াও, দৌড়াবা/দৌড়াইবা, দৌড়ায়ো/দৌড়াইয়ো।

দৌড়াইতি, দৌড়াইছিলি, দৌড়াইতেছিল, দৌড়াইলি, দৌড়াইছিস, দৌড়াইতেছিস, দৌড়াস, দৌড়াবি, দৌড়া।

দৌড়াইত, দৌড়াইছিল, দৌড়াইতেছিল, দৌড়াইল, দৌড়াইছে, দৌড়াইতেছে, দৌড়ায়, দৌড়াবে/দৌড়াইবে, দৌড়াক।

দৌড়াইতেন, দৌড়াইছিলেন, দৌড়াইতেছিলেন, দৌড়াইলেন, দৌড়াইছেন, দৌড়াইতেছেন, দৌড়ান, দৌড়াবেন/দৌড়াইবেন, দৌড়াইয়েন।

দৌড়ায়ে/দৌড়াইয়া।

 

যা ধাতু—

যাইতাম, গেছিলাম, যাইতেছিলাম, গেলাম, গেছি, যাইতেছি, যাই, যাব/যাইব; যাওয়াইতাম, যাওয়াইছিলাম, যাওয়াইতেছিলাম, যাওয়াইলাম, যাওয়াইছি, যাওয়াইতেছি, যাওয়াই, যাওয়াব/যাওয়াইব।

যাইতা, গেছিলা, যাইতেছিলা, গেলা, গেছ, যাইতেছ, যাও, যাইয়ো, যাবা/যাইবা; যাওয়াইতা, যাওয়াইতেছিলা, যাওয়াইলা, যাওয়াইতেছ, যাওয়াও, যাওয়াবা/যাওয়াইবা, যাওয়ায়ো/যাওয়াইয়ো।

যাইতি, গেছিলি, যাইতেছিলি, গেলি, গেছিস, যাইতেছিস, যাস, যাবি, যা; যাওয়াইতি, যাওয়াইছিলি, যাওয়াইতেছিলি, যাওয়াইলি, যাওয়াইছিস, যাওয়াইতেছিস, যাওয়াস, যাওয়াবি/যাওয়াইবি, যাওয়া।

যাইত, যাইতেছিল, গেল, গেছে, যাইতেছে, যায়, যাবে, যাক; যাওয়াইত, যাওয়াইতেছিল, যাওয়াল, যাওয়াইছে, যাওয়াইতেছে, যাওয়ায়, যাওয়াবে/যাওয়াইবে, যাওয়াক।

যাইতেন, গেছিলেন, যাইতেছিলেন, গেলেন, গেছেন, যাইতেছেন, যান, যাবেন/যাইবেন; যাওয়াইতেন, যাওয়াইছিলেন, যাওয়াইতেছিলেন, যাওয়াইলেন, যাওয়াইছেন, যাওয়াইতেছেন, যাওয়ান, যাওয়াবেন, যাওয়াইয়েন।

গিয়া/যাইয়া; যাওয়ায়ে/যাওয়াইয়া।

 

শিখ্‌ ধাতু—

শিখতাম, শিখছিলাম, শিখতেছিলাম, শিখলাম, শিখছি, শিখতেছি, শিখি, শিখব; শিখাইতাম, শিখাইছিলাম, শিখাইতেছিলাম, শিখাইলাম, শিখাইছি, শিখাইছি, শিখাইতেছি, শিখাই, শিখাব/শিখাইব।

শিখতা, শিখছিলা, শিখতেছিলা, শিখলা, শিখছ, শিখতেছ, শেখো, শিখো, শিখবা; শিখাইতা, শিখাইছিলা, শিখাইতেছিলা, শিখাইলা, শিখাইছ, শিখাইতেছ, শিখাও, শিখাইয়ো, শিখাবা/শিখাইবা।

শিখতি, শিখছিলি, শিখতেছিলি, শিখলি, শিখছিস, শিখতেছিস, শিখিস, শিখবি, শেখ; শিখাইতি, শিখাইছিলি, শিখাইতেছিলি, শিখাইলি, শিখাইছিস, শিখাইতেছিস, শিখাস, শিখাবি/শিখাইবি, শিখা।

শিখত, শিখছিল, শিখতেছিল, শিখল, শিখছে, শিখতেছে, শেখে, শিখবে, শিখুক; শিখাইত, শিখাইছিল, শিখাইতেছিল, শিখাইল, শিখাইছে, শিখাইতেছে, শিখায়, শিখাবে/শিখাইবে, শিখাক।

শিখতেন, শিখছিলেন, শিখতেছিলেন, শিখলেন, শিখছেন, শিখতেছেন, শেখেন, শিখবেন, শিখেন; শিখাইতেন, শিখাইছিলেন, শিখাইতেছিলেন, শিখাইলেন, শিখাইছেন, শিখাইতেছেন, শিখান, শিখাবেন/শিখাইবেন, শিখায়েন।

শিখে/শিখা; শিখায়ে, শিখাইয়া।

 

শু ধাতু—

শুইতাম, শুইছিলাম, শুইতেছিলাম, শুইলাম, শুইছি, শুইতেছি, শুই, শুব; শুয়াইতাম, শুয়াইছিলাম, শুয়াইতেছিলাম, শুয়াইলাম, শুয়াইছি, শুয়াইতেছি, শুয়াই, শুয়াব/শুয়াইব।

শুইতা, শুইছিলা, শুইতেছিলা, শুইলা, শুইছ, শুইতেছ, শোও, শুইয়ো, শুবা/শুইবা; শুয়াইতা, শুয়াইছিলা, শুয়াইতেছিলা, শুয়াইলা, শুয়াইছ, শুয়াইতেছ, শুয়াও, শুয়াইয়ো, শুয়াবা/শুয়াইবা, শুয়াইয়ো।

শুইতি, শুইছিলি, শুইতেছিলি, শুইলি, শুইছিস, শুইতেছিস, শুস, শুবি/শুইবি, শো; শুয়াইতি, শুয়াইছিলি, শুয়াইতেছিলি, শুয়াইলি, শুয়াইছিস, শুয়াইতেছিস, শুয়াস, শুয়াবি/শুয়াইবি, শুয়া।

শুইত, শুইছিল, শুইতেছিল, শুইল, শুইছে, শুইতেছে, শোয়, শুবে/শুইবে, শুক; শুয়াইত, শুয়াইছিল, শুয়াইতেছিল, শুয়াইল, শুয়াইছে, শুয়াইতেছে, শুয়ায়, শুয়াবে/শুয়াইবে, শুয়াক।

শুইতেন, শুইছিলেন, শুইতেছিলেন, শুইলেন, শুইছেন, শুইতেছেন, শোন, শুবেন/শুইবেন, শুয়েন; শুয়াইতেন, শুয়াইছিলেন, শুয়াইতেছিলেন, শুয়াইলেন, শুয়াইতেছেন, শুয়ান, শুয়াবেন/শুয়াইবেন, শুয়াইয়েন।

শুয়ে/শুইয়া; শুয়ায়ে/শুয়াইয়া।

 

হ ধাতু—

হইতাম, হইছিলাম, হইতেছিলাম, হইলাম, হইছি, হইতেছি, হই, হব; হওয়াইতাম, হওয়াইছিলাম, হওয়াইতেছিলাম, হওয়াইলাম, হওয়াইছি, হওয়াইতেছি, হওয়াই, হওয়াব।

হইতা, হইছিলা, হইতেছিলা, হইলা, হইছ, হইতেছ, হও, হইয়ো, হবা/হইবা; হওয়াইতা, হওয়াইছিলা, হওয়াইতেছিলা, হওয়াইলা, হওয়াইছ, হওয়াইতেছ, হওয়াও, হওয়াইয়ো, হওয়াবা/হওয়াইবা।

হইতি, হইছিলি, হইতেছিলি, হইলি, হইছিস, হইতেছিস, হোস, হবি/হইবি, হ; হওয়াইতি, হওয়াইছিলি, হওয়াইতেছিলি, হওয়াইলি, হওয়াইছিস, হওয়াইতেছিস, হওয়াস, হওয়াবি/হওয়াইবি, হওয়া।

হইত, হইছিল, হইতেছিল, হইল, হইছে, হইতেছে, হয়, হবে, হোক; হওয়াইত, হওয়াইছিল, হওয়াইতেছিল, হওয়াইল, হওয়াইছে, হওয়াইতেছে, হওয়ায়, হওয়াবে/হওয়াইবে, হওয়াক।

হইতেন, হইছিলেন, হইতেছিলেন, হইলেন, হইছেন, হইতেছেন, হন, হইয়েন, হবেন/হইবেন; হওয়াইতেন, হওয়াইছিলেন, হওয়াইতেছিলেন, হওয়াইলেন, হওয়াইছেন, হওয়াইতেছেন, হওয়ান, হওয়াবেন/হওয়াইবেন, হওয়াইয়েন।

হয়ে/হইয়া।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 ‘উপনিবেশিক’ লেখতে পারেন, যদিও প্রমিতমতে ‘ঔপনিবেশিক’ সহিহ।
2 মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হলো; মূল : সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবি; তরজমা : আবু তাহের মিসবাহ; পৃ. ১৫৭।
3 নারী, হুমায়ুন আজাদ, পৃ. ২৭।
4 আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু, শহিদুল জহির, উপন্যাসের শুরুর অংশ।
5 আগস্ট আবছায়া, মাসরুর আরেফিন, পৃ. ৪৪।

বিজ্ঞাপন

guest
5 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মুহাম্মদ উমর ফারুক
মুহাম্মদ উমর ফারুক
6 months ago

ভাই, লেখাটা খুব ভাল্লাগছে।

চলিতের টোন থেকে বের হবার ক্ষেত্রে যে কটা উদাহরণ টানছেন আপনি, লেখাগুলো খুব ভাল্লাগছে। আদীব হুজুরের বইটি তো আবার পড়তে মনে চাইতেছে।

তবে সত্য বলি, রবিবাবুর লেখাটার চলিতরূপ দিতে গিয়ে সেটার তরজমা করে ফেলা, এবং তরজমাটাও কাঁচা হাতের হওয়া, সুরতাললয় ঠিকঠাক না থাইকা যেমন খারাপ লাগছে, তেমনি আপনি খুব সামান্য পরিবর্তন করে যে রূপটা দেখাইছেন, সেটাও আমার কাছে ভালো লাগে নাই। আমার কাছে মনে হচ্ছে রবিবাবুর লেখাটা অপরিবর্তনীয়, এবং এতেই অনেক সুন্দর ও সুপাঠ্য। সেই তখন, যখন আমার বইপাঠ ততটাও আগায় নাই, তখন আমি গল্পগুচ্ছ পড়েছিলাম, অনেক কিছুই বুঝি নাই, মানে, সাহিত্যটারে ঠিক উপলব্ধি করতে পারি নাই; কিন্তু গল্পগুলোর স্বাদু গদ্যের রস যেন আজও লেগে আছে জিহবায়।

ক্রিয়াপদগুলো অচেনা লাগল, কঠিনও লাগছে নতুন হওয়ায়, তাই পড়ি নাই।

সার্বিকভাবে, চলিতের গণ্ডি পেরোনোর মেসাল হিসেবে আপনি যাদের উদ্ধৃত করছেন, তাদের লেখাগুলোই বরং দারুণ লাগছে আপনার প্রস্তাবিত গদ্যের থিকা।

আরমান আল-বাঙালি
আরমান আল-বাঙালি

আপনি লেখছেন, “সার্বিকভাবে, চলিতের গণ্ডি পেরোনোর মেসাল হিসেবে আপনি যাদের উদ্ধৃত করছেন, তাদের লেখাগুলোই বরং দারুণ লাগছে আপনার প্রস্তাবিত গদ্যের থিকা।”

তুলনাটা হয় নাই আসলে। কারণ আমাদের প্রস্তাবিত গদ্যের কোনো নমুনা নাই এখানে। ফলে তুলনা করলেও তা যথাযথ হবে না। আলবাত্তা আমাদের প্রস্তাবিত গদ্যে যখন সাহিত্য রচিত হবে তখন তুলনা দিতে পারবেন।

খুব প্রতিভাবান যারা, তারা তো নিজেদের জন্য একটা না একটা উত্তরণ খুঁইজাই নিবেন এবং অভিনবত্বের বিচারে তাদের উত্তরণ দুর্দান্তই হবে। কিন্তু সেটা কি স্বাভাবিক ভাষার ভিতরে সম্ভব ছিল? নাকি প্রতিভার জোরে উতরাইতে হইছে? কথা এখানে।

ভাষা-প্রবণতা যদি নষ্ট হয় তাহলে হাতেগোনা কয়েকজনের প্রতিভায় মুগ্ধ হওয়াতে আমাদের কোনো লাভ নাই।

...
...
6 months ago

হজরত আরমান কি হুজুর এবং কওমিয়ানদের জন্যই ‘আমাদের বাংলা’ বা পুব বাংলা নিয়া আগাইতেছেন, যেহেতু বুঝানোর কতক খেতাব সেই ঘরানার নিজস্ব আবহ থিকাই নিতেছেন, যেমন ইসিম, ফেয়েল, মওসুল ইত্যাদি?

অভারল এইটা বিশ্লেষণে, প্রস্তাবনায়ায়, মুকারানায়, ভ্যেলু এড ও প্রবলেম সলভিংয়ে, একটা মাশাল্লাহ লেখাই হইছে।

Last edited 6 months ago by ...
আরমান আল-বাঙালি
আরমান আল-বাঙালি
Reply to  ...
5 months ago

লেখাটা পড়ার জন্য শুকরিয়া আপনারে।

শুধু হুজুর ও কওমিয়ানদের জন্যই বাংলাভাষা নিয়া আগাইতেছি তা না, আমি ভাষাচিন্তায় ও সাহিত্যসমালোচনায় এইসব পরিভাষারে রেওয়াজ দেওয়ার কোশেশ করতেছি মাত্র। আমি যেহেতু কওমি থেকে উইঠা আসা, তাই আমার লেখাপত্রে সেটাই বারবার হাজির করব। আমার লেখা যদি জরুরি হয়, তাহলে জামানা আমার লেখাপত্র পাঠ করতে বসবে। আমার জামানার ভাষায় লেখা লাগবে না। জামানা আমার ভাষা শিখা আমারে পাঠ করবে।

মোহাম্মদ শরীফ
মোহাম্মদ শরীফ
Reply to  ...
5 months ago

হজরত আরমান শুধুমাত্র কওমিয়ানদের জন্য এই প্রস্তাব সীমাবদ্ধ করেন নাই। কিন্তু কাজ চালানোর স্বার্থে এইসব পরিভাষা ব্যবহার করছেন—যেহেতু বাঙলাভাষার ব্যাকরণ এখনো প্রমিন্যান্ট কিছু হয়ে উঠতে পারে নাই।