সমকালীন আরব-ইসলামি নীতিশাস্ত্র: একটি বিশ্লেষণাত্মক রূপরেখা (প্রথম পর্ব)

মূল : মোহাম্মদ হাশাশ ও মুতাজ আল-খাতিব

আবদুল্লাহিল বাকি

ইসলামি নীতিশাস্ত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘তত্ত্ব’ বা থিওরি আছে কি না, এই প্রশ্নটা অনেকটা ইসলামি দর্শন বলতে আদতে কিছু আছে কি না, সেই বিতর্কের মতোই। বিষয়টা প্রথম তুলে ধরেছিলেন ইয়োহান ইয়াকব ব্রুকার, ভিলহেল্ম গটলিব তেনেম্যান এবং আর্নেস্ট রেনানের মতো আঠারো ও উনিশ শতকের বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদ[1]‘Abd al-Raziq [1944] 2011, 8

দীর্ঘদিন ধরে একটা সাধারণ ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বিদ্যাশাখা হিসেবে দর্শন ইসলামি বিশ্বে একসময় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে উনিশ শতকের আগের ক্লাসিক্যাল যুগে বিভিন্ন ইসলামি প্রেক্ষাপটে—যেমন আরব, পারস্য, উসমানীয় (অটোমান), ভারতীয় এবং মালয় অঞ্চলে—মুসলিম ও অমুসলিম পণ্ডিতদের লেখা নানা পাণ্ডুলিপি যখন আধুনিক কালে সম্পাদিত ও প্রকাশিত হতে শুরু করে, তখন থেকে সমসাময়িক বেশ কিছু গবেষণায় এই বিতর্কটি নতুন করে সামনে আসে। এই নতুন গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, দর্শন আসলে কখনো হারিয়ে যায়নি[2]El-Rouayheb and Schmidtke 2017, 1–7

ক্লাসিক্যাল যুগের কুরআন মাজিদের তাফসির ও ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কুরআনের ব্যাখ্যাকারগণ কুরআনভিত্তিক কোনো নীতিবিদ্যা-সংক্রান্ত তত্ত্ব দাঁড় করানোর বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না (al-Khațīb 2017)। সামগ্রিকভাবে মুসলিম স্কলারদের মধ্যেও এই প্রবণতা দেখা যায়নি—যদিও পবিত্র কুরআন নিজেই নীতি ও নৈতিকতার শিক্ষায় পরিপূর্ণ[3]Rahman 1982, 154–155। মূলত আধুনিকতার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েই ইসলামি ঐতিহ্যের দিকে নতুন করে তাকাতে হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি দর্শন (কিংবা কেউ কেউ যেভাবে বলতে পছন্দ করেন, ‘আরব দর্শন’) খুঁজে বের করা[4]Şalībā 1989, 9–11

উনিশ শতকের আরব-ইসলামি নাহদা ও রেনেসাঁর অগ্রগামী চিন্তাবিদ, যেমন, রিফাআ রাফি তাহতাভি, জামালুদ্দিন আফগানি এবং মুহাম্মদ আবদুহ, নীতিবিদ্যার এই প্রশ্নটিকে আজকের যুগের গবেষকদের মতো করে দেখেননি। এর পরিবর্তে, তাঁরা তৎকালীন সময়ে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি ও যৌক্তিকতার ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। তৎকালীন ঔপনিবেশিক পরিস্থিতির কারণে তাঁদের পক্ষে আধুনিক কোনো নৈতিকতার তত্ত্ব গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এমনকি আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নীতিগত সমাধান খোঁজার জন্য নিজেদের সুবিশাল ঐতিহ্যের গভীরে প্রবেশ করার এবং সেখান থেকে কোনো নৈতিক প্রারম্ভিক বিন্দু খুঁজে নেওয়ার সুযোগও তাঁরা পাননি।

তবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে, বিশেষ করে আরব বিশ্বে, কুরআনকে দার্শনিক ও নৈতিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে নতুন নতুন যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসতে থাকে (Rashwānī 2017)। ১৯৭০ সালে মাজিদ ফাখরি যেমনটা দাবি করেছিলেন, পাশ্চাত্যের গবেষণায় এই বিষয়ে প্রচেষ্টা বেশ সীমিত ছিল; তবে বর্তমানে এই ধরনের উদ্যোগ দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে[5]Fakhry [1970] 2004, ix; ‘Aţiyya 1990, j–d

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আরব-ইসলামি দর্শনের ওপর ইংরেজিতে লেখা সাহিত্যগুলো খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সাম্প্রতিককালের আগপর্যন্ত ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর সুনির্দিষ্ট ও নিবিড় গবেষণা কতটা কম ছিল। এখন পর্যন্ত এই ধারার সাহিত্য মূলত চিন্তার ইতিহাসের (হিস্ট্রি অব আইডিয়াজ) ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, যেখানে সুনির্দিষ্ট ও গভীর গবেষণার অভাব এখনও স্পষ্ট। এই প্রবণতার উদাহরণ হিসেবে অঁরি করব্যা (১৯৬২), মন্টগোমারি ওয়াট ([১৯৬২] ১৯৮৫), সাইয়্যেদ হোসেইন নাসর (২০০৬), মাজিদ ফাখরি ([১৯৭০] ২০০৪), অলিভার লিম্যান ([১৯৮৫] ২০০৪), হান্স ডাইবার (১৯৯৯; ২০০৭), মোহাম্মদ আলী খালিদি (২০০৫), জন ম্যাকগিনিস ও ডেভিড সি. রাইজম্যান (২০০৭), মাসিমো কাম্পানিনি (২০০৮), আন্না-তেরেসা টাইমিনিয়েকা ও নাজিফ মুখতারোগ্লু (২০১০), রয় জ্যাকসন (২০১৪), পিটার অ্যাডামসন (২০১৫), অ্যান্থনি রবার্ট বুথ (২০১৭) এবং সুলেমান বশির দিয়ানের (২০১৮) গবেষণাকর্মগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়। ‘দ্য কেমব্রিজ কম্প্যানিয়ন টু অ্যারাবিক ফিলোসফি’ (২০০৬), ‘দ্য অক্সফোর্ড হ্যান্ডবুক অব ইসলামিক ফিলোসফি’ (২০১৭), এবং ‘দ্য রাউটলেজ কম্প্যানিয়ন টু ইসলামিক ফিলোসফি’ (২০১৬)-এর মতো সংকলনগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। অবশ্য রাউটলেজ ও কেমব্রিজের এই গ্রন্থগুলোতে কিংবা অ্যাডামসন ও বুথের কাজে “নীতিশাস্ত্র ও রাজনীতি” অথবা “নীতিশাস্ত্র ও রাজনৈতিক দর্শন” নিয়ে আলাদা অধ্যায় যুক্ত থাকতে দেখা যায়।

সামগ্রিকভাবে ইসলামি গবেষণাকে এভাবে দেখার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, রেনানের মতো ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি আঠারো ও উনিশ শতকের আরব-ইসলামি চিন্তাধারা-সংক্রান্ত গবেষণায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল। তাঁদের ধারণা ছিল যে, আরব-ইসলামি দর্শন মূলত গ্রিক দর্শনের অনুবাদ ও রূপান্তর মাত্র। ফলে এটাকে গ্রিক চিন্তা, যুক্তিবিদ্যা এবং নীতিশাস্ত্রের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন সব জ্ঞানশাখা—যেমন ইলমুল কালাম (ধর্মতত্ত্ব), ফিকহ ও উসুলুল ফিকহ (ইসলামি আইনতত্ত্ব ও এর উৎস) এবং তাসাউফ (সুফিবাদ)—এর ভেতর থেকে এর নিজস্ব মৌলিকতা খোঁজার পরিবর্তে, কেবল প্রাচীন গ্রিক বা আধুনিক ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।

এই ধরনের গবেষণার পেছনে একটা প্রচ্ছন্ন অনুমান ছিল যে, ফলিত নীতিশাস্ত্র (অ্যাপ্লাইড এথিকস)—যার বিপুল উপাদান ইসলামি ঐতিহ্যের লেখালেখিতে ছড়িয়ে রয়েছে—তা নিয়ে ভাবার আগে, এর পরিবর্তে আরব-ইসলামি দর্শনকে প্রথমে নীতিশাস্ত্রের একটি দার্শনিক তাত্ত্বিক রূপ দাঁড় করাতে হবে। এই অনুমানের মাধ্যমে তারা এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে যে, আরব ও মুসলিমদের সামনে বিবেচনার জন্য পবিত্র কুরআন ও হাদিসের মতো ঐশী বাণী বা টেক্সট ছিল, যা গ্রিকদের ছিল না।

এটা খুবই স্বাভাবিক যে, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের নৈতিক শিক্ষা ও আচরণের নির্দেশনার জন্য সবার আগে নিজেদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের দিকেই তাকাবে। আর একারণেই নীতিশাস্ত্রের প্রধান ধারাটি মূলত কুরআন ও সুন্নাহ থেকে এসেছে; পাশাপাশি আরবদের নিজস্ব সাহিত্য ও লোকশিক্ষা এবং অন্যান্য সংস্কৃতি (বিশেষ করে পারস্য ও ভারতীয় সংস্কৃতি) থেকেও তা উপাদান গ্রহণ করেছে। ‘তাহজিবুল আখলাক’ বা ‘তাহজিবুন নুফুস’ (চরিত্র বা আত্মার পরিশোধন) বিষয়ক এই ধারার লেখালেখির সন্ধান মেলে ইবনুল মুকাফফা (মৃত্যু আনু. ১৩৯/৭৫৯), আল-মুহাসিবি (মৃত্যু ২৪৩/৮৫৭), আল-জাহিজ (মৃত্যু ২৫৫/৮৬৮), ইবনে আবিদ দুনিয়া (মৃত্যু ২৮১/৮৯৪), আত-তাবারানি (মৃত্যু ৩৬০/৯১৮), আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি (মৃত্যু ৪৫০/১০৫৮), ইবনে হাজম আল-আন্দালুসি (মৃত্যু ৪৫৬/১০৬৪), রাগিব আল-ইসফাহানি (মৃত্যু ৪২২/১১০৮) এবং ইবনুল জাওজি (মৃত্যু ৫৯৭/১২০০) সহ আরও অনেকের লেখায়।

নৈতিক সাহিত্যের এই প্রভাবশালী ধারাটার ওপর অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ার ফলে ঐতিহ্যের অন্যান্য সুশৃঙ্খল ও পদ্ধতিগত বিদ্যাশাখাগুলো আড়ালে পড়ে যায়; যেমন আইনশাস্ত্র, দার্শনিক প্রবন্ধ এবং ধর্মতত্ত্ব বা সুফি যুক্তিতর্ক। এই বিদ্যাশাখাগুলোর বিশাল সাহিত্যসম্ভার খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে, নীতিশাস্ত্র সবসময়ই ইসলামি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে ও অন্যতম অংশ হিসেবে উপস্থিত ছিল; কখনো নির্দিষ্ট কিছু আকর গ্রন্থের অধ্যায় হিসেবে, আবার কখনো ইসলাম ও শরিয়াহর অন্তর্নিহিত বিশ্ববীক্ষা হিসেবে, যা ছাড়া যেকোনো চিন্তা ও কাজ অপূর্ণ বা গ্রহণযোগ্য নয় বলে বিবেচিত হতো। এই অর্থেই তোশিহিকো ইজুৎসু (১৯৬৬) এবং ওয়ায়েল বি. হাল্লাক (২০১৩; ২০১৯)-এর মতো পণ্ডিতেরা শরিয়াহর নীতিশাস্ত্রকে এমন একটি বিশ্ববীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করেন যা ক্লাসিক্যাল ইসলামি চিন্তাধারাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে; এবং একে এভাবে না বুঝলে শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্যগুলোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়। মূলত এই বিদ্যাশাখাগুলোর ভেতরেই ইসলামি নীতিশাস্ত্রের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব[6]al-Tawīl 1952, 256–387; Qābīl 1984, 7–11; ‘Aţiyya 1990, j–d

ইসলামি নীতিশাস্ত্র নিয়ে গবেষণায় অবহেলার দ্বিতীয় কারণটি ঐতিহাসিক পরিস্থিতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব বিস্তারকারী জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে জড়িত। ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশের কারণে নীতিশাস্ত্র সেখানে ক্রমশ একটি স্বাধীন ও বহুমুখী (আন্তঃডিসিপ্লিনারি) আধুনিক বিদ্যাশাখা হিসেবে গড়ে উঠেছে। তবে এর মানে এই নয় যে, ক্লাসিক্যাল যুগে আরব-ইসলামি বিশ্বে নিছক বুদ্ধিনির্ভর নীতিশাস্ত্র নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়নি। মুতাজিলাদের উদাহরণটিই প্রমাণ করে যে, ধর্মপ্রধান পরিবেশেও কীভাবে প্রবল যুক্তিবাদী প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এর ফলেই আমরা ইবনুল মুকাফফা, আল-মাআররি (মৃত্যু ৪৪৯/১০৫৮), আবু বকর ইবনে জাকারিয়া রাজি (মৃত্যু আনু. ৩১৩/৯২৫) এবং ইবনে রাওয়ান্দির (মৃত্যু আনু. ২৯৮/৯১১) মতো যুক্তিবাদী নীতিশাস্ত্রবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের দেখতে পাই। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, অন্যান্য ধর্মতাত্ত্বিক ধারা বা ব্যক্তিত্বরা অযৌক্তিক ধারার ছিলেন।

এখানে মূল কথা হলো, নীতিশাস্ত্র একটি স্বাধীন দার্শনিক ক্ষেত্র হিসেবে যে গুরুত্ব পেয়েছে, তা মূলত আধুনিকতার আবির্ভাব এবং সমাজ পরিচালনায় ধর্মের চিরাচরিত প্রভাব কমে যাওয়ার সাথে সম্পর্কিত। আধুনিকতা যখন ধর্মের বিশ্ববীক্ষাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল, তখন সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়ে আরব-ইসলামি বিশ্বও নীতিশাস্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শাখাটিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করে। আর তারা এটা করছে নানা দৃষ্টিকোণ ও চিন্তাধারা থেকে।

নিচে আমরা ইংরেজি এবং আরবি ভাষায় লেখা ইসলামি নীতিশাস্ত্রের কিছু প্রধান গবেষণার উদাহরণ তুলে ধরছি। তবে এই তালিকাটিই চূড়ান্ত নয়; কারণ ফারসি, তুর্কি, উর্দু ও মালয় ভাষার মতো মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য সমৃদ্ধ ভাষার কাজগুলো এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আরবির উদাহরণগুলোতে মূলত মিসরীয় প্রেক্ষাপটকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এর কারণ শুধু এটাই নয় যে বিশ শতকের প্রথমার্ধে সেখানে এই বিষয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে, বরং এর বড় কারণ হলো, আধুনিকতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংস্কার ও পুনর্জাগরণের বিতর্কে নীতিশাস্ত্রকে কীভাবে বিভিন্ন কোণ থেকে দেখা হচ্ছিল, মিসরের কাজে সেই বৈচিত্র্যটি খুব স্পষ্ট। এর পরপরই আমরা সংক্ষেপে মাগরেবি (উত্তর আফ্রিকা) অঞ্চলের উদাহরণগুলো নিয়েও আলোচনা করব। অন্যদিকে, ইংরেজিতে লেখা উদাহরণগুলো মূলত ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া গবেষণাকর্ম, যা ছিল মূলত নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে বোঝার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস।

এই ভূমিকায় আমরা ইসলামি ঐতিহ্যে নীতিশাস্ত্র-সংক্রান্ত গবেষণাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা করছি। প্রথম ভাগটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, যাকে আমরা “কুরআনি নৈতিক ব্যবস্থা বা চিন্তাধারা” বলতে পারি। আর দ্বিতীয় ভাগটি কেবল কুরআনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সামগ্রিকভাবে ইসলামি ঐতিহ্যের বিভিন্ন শাখা—যেমন আইনতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন এবং সুফিবাদের আলোকে “ইসলামি নৈতিক চিন্তাধারা”কে মূল্যায়ন করে।

আমরা এখানে ইংরেজিতে লেখা যেসব গবেষণার সূত্র দিচ্ছি, তার মধ্যে দাউদ রাহবার এবং সালিহ আশ-শাম্মার কাজগুলো প্রথম ভাগের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে মাজিদ ফাখরি, জর্জ হুরানি, মরিয়ম আল-আত্তার এবং আমিন বি. সাইয়ু-সহ অন্যান্যদের কাজগুলো দ্বিতীয় ভাগের অন্তর্গত। নিচে এই গবেষণাকর্মগুলোর ওপর সাধারণ কিছু আলোচনা করা হবে। এরপর, বিংশ শতাব্দীতে মিসরের প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে আরবি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিভাজন নিয়ে কথা বলা হবে। আর সবশেষে আমরা পৌঁছাব আমাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় এবং “আমানতদারী রূপরেখা” (ট্রাস্টিশিপ প্যারাডাইম)-সংক্রান্ত প্রকল্পে।

আমরা শুরু করছি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্কলার দাউদ রাহবারকে (১৯২৬–২০১৩) দিয়ে। তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভে (১৯৪৯–১৯৫৩) কুরআনের নৈতিক বার্তাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেন, যা ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। ‘গড অব জাস্টিস: আ স্টাডি ইন দ্য এথিক্যাল ডকট্রিন অব দ্য কুরআন’ শিরোনামের এ গ্রন্থে তিনি যুক্তি দেন যে, আল্লাহর ন্যায়বিচার তাঁর দয়া বা করুণার ওপর প্রাধান্য পায় এবং কুরআনের নৈতিক আহ্বান মূলত ন্যায়বিচারের এই মৌলিক বার্তা থেকেই উৎসারিত। এটা মূলত “আল্লাহর সুকঠিন ন্যায়বিচার”; যা মুমিনের বিবেকে একধরনের ভয় তৈরি করে যে সে আল্লাহর ন্যায়বিচার ও দয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এটি কোনো খামখেয়ালি অত্যাচারী ঈশ্বরের ভয় নয়, যেমনটা ঐতিহাসিকভাবে আল্লাহর নিরানব্বইটি গুণবাচক নাম বা আসমাউল হুসনার কোনো কোনোটির ব্যাখ্যায় ভুলভাবে দেখানো হয়েছে[7]Rahbar 1960, xiii; Rashwānī 2017, 169–170। মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচারের মূল্য ও ধারণাকে সামনে নিয়ে আসার জন্য ‘সত্তা’ (এসেন্স) বা ‘পরম’ (অ্যাবসোলিউট)-এর মতো প্রচলিত বিমূর্ত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণাগুলোকে নতুনভাবে খতিয়ে দেখেন রাহবার, যাতে আল্লাহ ও মানুষের মধ্যকার সরাসরি সম্পর্কটি আরও জোরালোভাবে ফুটে ওঠে[8]Rahbar 1960, xv

সমির রাশওয়ানি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পন্ন করা ইরাকি গবেষক সালিহ হাদি শাম্মার একটি পিএইচডি অভিসন্দর্ভের কথা উল্লেখ করেছেন, যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য এথিক্যাল সিস্টেম আন্ডারলাইং দ্য কুরআন: আ স্টাডি অব সার্টেন নেগেটিভ অ্যান্ড পজিটিভ নোশনস’ (১৯৫৯)। রাশওয়ানি বলেন, কুরআন আদতে কোনো নৈতিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম প্রদান করে কি না—সে বিষয়ে শাম্মা স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেননি। তবে শাম্মা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, কুরআনিক নীতিশাস্ত্র তাত্ত্বিকের চেয়ে ব্যবহারিক বা ফলিত রূপেরই বেশি অনুসারী এবং এটি মূলত কর্তব্যের নৈতিকতার (আখলাকুল ওয়াজিব) ওপর জোর দেয়[9]Rashwānī 2017, 182–184। তোশিহিকো ইজুৎসুর ‘এথিকো-রিলিজিয়াস কনসেপ্টস ইন দ্য কুরআন’ (১৯৬৬) গ্রন্থটিকেও ইংরেজিতে লেখা এই ধারার গবেষণার অন্তর্ভুক্ত করা যায়, যা এর আগে ১৯৫৯ সালে ‘দ্য স্ট্রাকচার অব এথিক্যাল টার্মস ইন দ্য কোরান’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। অবশ্য ইজুৎসুর এই প্রয়াসটি তাত্ত্বিক বা দার্শনিকের চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক (কালচারাল-লিঙ্গুইস্টিক); যদিও কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববীক্ষায় নীতিশাস্ত্র কীভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে নৈতিক শব্দাবলির ধারণা ও তাদের বিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামগ্রিকভাবে ইজুৎসুর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, “কুরআনিক স্তরে ইসলামি চিন্তাধারা ধর্মীয় এবং নৈতিক বিষয়ের মধ্যে বাস্তব কোনো পার্থক্য তৈরি করে না” (Izutsu [1966] 2002)।

আরব-ইসলামি দর্শনের লেবাননি স্কলার মাজিদ ফাখরি আরবি এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই নীতিশাস্ত্রের ওপর লিখেছেন। প্রথমত, তিনি ১৯৭৮ সালে প্রকাশ করেন ‘আল-ফিকরুল আখলাকি আল-আরাবি’ (আরব নৈতিক চিন্তাধারা)। এই গ্রন্থটি মূলত নীতিগত বিষয় নিয়ে কাজ করা কিছু প্রধান বিষয়, গবেষণাকর্ম এবং ব্যক্তিত্বের একটি সংকলন। তিনি নীতিশাস্ত্রের ওপর আরব গবেষণাকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করে আলোচনা শুরু করেন: ‘আদব খুলুকি’ (নৈতিক সাহিত্য) এবং ‘ফিকর খুলুকি’ (নৈতিক চিন্তা)। প্রথম ভাগটি মূলত বিভিন্ন ঐতিহ্য থেকে সংগৃহীত নৈতিক শিক্ষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সংকলন; আর দ্বিতীয় ভাগটি তুলনামূলকভাবে বেশি সুশৃঙ্খল, যা একটি পদ্ধতিগত ও দার্শনিক কাঠামো মেনে চলে। উদাহরণস্বরূপ, ইবনুল মুকাফফা, আবু আল-হাসান আল-আমিরি (মৃত্যু ৩৮১/৯৯২), আবু সুলায়মান আল-সিজিস্তানি আল-মান্তিকি (মৃত্যু আনু. ৩৭৭/১০০০) এবং মিসকাওয়াহ (মৃত্যু ৪২১/১০৩০) প্রথম শ্রেণির অর্থাৎ নৈতিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে আল-কিন্দি (মৃত্যু আনু. ২৫৯/৮৭৩), আল-ফারাবি (মৃত্যু ৩৩৯/৯৫০), আবু বকর রাজি, কাজি আব্দুল জব্বার (মৃত্যু ৪১৫/১০২৫), আল-মাওয়ার্দি, আল-গাজালি (মৃত্যু ৫০৫/১১১১), ফখরুদ্দিন রাজি (মৃত্যু ৬০৬/১২১০) এবং ইবনে হাজমের মতো দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিকদের বিভিন্ন কাজ ও প্রবন্ধ দ্বিতীয় শ্রেণির অর্থাৎ নৈতিক চিন্তার অন্তর্ভুক্ত। এরপর তিনি এই স্কলারদের লেখা থেকে ন্যায়বিচার, ভালো-মন্দ, মানুষের আচরণ ও বিচারবুদ্ধির মতো বিভিন্ন নৈতিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক অংশ বা উদ্ধৃতি তুলে ধরেন[10]Fakhry [1978] 1986, 9–10। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে ফাখরি ইংরেজিতে ‘এথিক্যাল থিওরিজ ইন ইসলাম’ প্রকাশ করেন। এখানে তিনি নীতিশাস্ত্রের আরও ভিন্ন এবং স্পষ্ট একটি শ্রেণিবিন্যাস তুলে ধরেন, যা তিনি নিচের ক্রমানুসারে সাজিয়েছেন:

১) ঐশীগ্রন্থ-ভিত্তিক নীতিশাস্ত্র, যেখানে মূলত কুরআনের নৈতিক আদর্শের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

২) ধর্মতাত্ত্বিক নীতিশাস্ত্র, যেখানে আশআরি ও মুতাজিলাদের মতামতের ভিত্তিতে নৈতিক যুক্তিবাদ এবং নৈতিক ইচ্ছাবাদ ইত্যাদি তত্ত্বগুলো আলোচনা করা হয়েছে।

৩) দার্শনিক নীতিশাস্ত্র, যেখানে মূলত অ্যারিস্টটল থেকে শুরু করে আল-কিন্দি, আল-রাজি, আল-ফারাবি, ইবনে সিনা (মৃত্যু ৪২৮/১০৩৭), ইবনে রুশদ (মৃত্যু ৫৯৫/১১৯৮), ইয়াহিয়া ইবনে আদি (মৃত্যু ৩৬৩/৯৭৪), মিসকাওয়াহ, নাসিরুদ্দিন তুসি (মৃত্যু ৬৭২/১২৭৩) এবং জালালুদ্দিন দাওয়ানির (মৃত্যু ৯০৮/১৫০২) মতো দার্শনিকদের গবেষণার সাহায্য নেওয়া হয়েছে।

৪) ধর্মীয় নীতিশাস্ত্র, যা তিনি ইবনে আবিদ দুনিয়া (মৃত্যু ২৮১/৮৯৪), আবুল হাসান আল-মাওয়ার্দি, ইবনে হাজম, রাগিব আল-ইসফাহানি, ফখরুদ্দিন রাজি এবং আল-গাজালির কাজের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন (Fakhry 1991)।

ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর তুলনামূলকভাবে অধিক সংশ্লেষণাত্মক ও সমন্বিত কাজ পাওয়া যায় জর্জ হুরানির সংকলিত প্রবন্ধাবলীতে, যা ১৯৮৫ সালে ‘রিজন অ্যান্ড ট্র্যাডিশন ইন ইসলামিক এথিকস’ নামে প্রকাশিত হয়। ইসলামি ঐতিহ্যে নীতিশাস্ত্র উপস্থাপনের চিরচেনা ধারায় সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু প্রধান গ্রন্থ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের চিন্তাভাবনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। হুরানি সেই চেনা পথের বাইরে গিয়ে ইসলামি নৈতিক তত্ত্বগুলোকে চারটি ধারায় বিন্যস্ত করেছেন। তাঁর এই শ্রেণিবিন্যাসটি ফাখরির কাঠামোর কাছাকাছি হলেও, এখানে তিনি মূলত দুটি তাত্ত্বিক ভিত্তির আলোকেই তাঁর যুক্তিসমূহ সাজিয়েছেন; একটি হলো সত্তাতত্ত্ব (অনটোলজি) এবং অন্যটি জ্ঞানতত্ত্ব (এপিস্টেমোলজি)। অর্থাৎ, যথাক্রমে নৈতিক মূল্যবোধের প্রকৃত রূপ এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে মানুষ কীভাবে তা জানতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে ইসলামি ঐতিহ্যের নিজস্ব ও মৌলিক অবদান কোন জায়গায়, হুরানি ঠিক সেটির ওপরই আলো ফেলেছেন। তাঁর মতে, এই মৌলিক অবদান লুকিয়ে আছে আইনের উৎস-সংক্রান্ত ফিকহের বিতর্কগুলোতে এবং কালাম ধর্মতত্ত্বে। নীতিশাস্ত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তিনি ধর্মতত্ত্বের এই পদ্ধতিটিকে সম্পূর্ণ দার্শনিক বা যৌক্তিক মনে করেন[11]Hourani 1985, 19। এর পর ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর ইংরেজিতে আরও কিছু চমৎকার গবেষণাকর্ম প্রকাশ পেতে অবশ্য বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল।

মরিয়ম আল-আত্তারের ‘ইসলামিক এথিকস’ (২০১০) গ্রন্থটিতেও ইসলামি নৈতিকতার তত্ত্বগুলোকে একটি ভিন্ন ও সমন্বিত রূপ দেওয়া হয়েছে। কুরআন ও হাদিস-ভিত্তিক নীতিশাস্ত্র এবং মুতাজিলা-পূর্ব ও আশআরি নীতিশাস্ত্র আলোচনার পর, তিনি মূলত পরবর্তী সময়ের মুতাজিলা পণ্ডিত কাজি আব্দুল জব্বারের নৈতিক তত্ত্বের ওপর আলো ফেলেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৫০-এর দশকে ইয়েমেনে কাজি আব্দুল জব্বারের বিশ খণ্ডের বিশাল আকর গ্রন্থ ‘আল-মুগনি’র সন্ধান মেলে। আল-আত্তার তাঁর দীর্ঘ আলোচনায় বিভিন্ন যৌক্তিক নৈতিক তত্ত্ব উপস্থাপনের মাধ্যমে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ইসলামি চিন্তাধারায় “ডিভাইন কমান্ড থিওরি” বা ঐশী আদেশ তত্ত্বই প্রধান, এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ নেই[12]Al-Attar 2010, 142। তবে তাঁর এই যুক্তির সাথে অনেক স্কলারই হয়তো একমত হবেন না।

অন্যদিকে, আমিন বি. সাইয়ুর সম্পাদিত সংকলন ‘আ কম্প্যানিয়ন টু মুসলিম এথিকস’ (২০১০) এই বিষয়টিকে আরও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মোকাবেলা করেছে। পরিবেশবিদ্যা, শিল্পকলা, অর্থনীতি, বিরোধ নিষ্পত্তি, সহনশীলতা এবং অহিংসার মতো বাস্তব জীবনের সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর ক্ষেত্রে ফলিত নীতিশাস্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা এখানে খতিয়ে দেখা হয়েছে। সাইয়ুর সম্পাদিত এই সংকলনটি মূলত তাঁরই আগের একটি গবেষণা গ্রন্থ ‘মুসলিম এথিকস: ইমার্জিং ভিস্টাস’ (২০০৪)-এর আরও গভীর অনুসন্ধান হিসেবে সামনে এসেছে, যেখানে তিনি ধ্রুপদী নীতিশাস্ত্রের বিভিন্ন থিম ও ব্যক্তিত্বকে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে এক সমন্বিত আলোচনা তৈরি করেছিলেন।

সাম্প্রতিক এই গবেষণাকর্মগুলোর পাশাপাশি, কম আলোচিত এই বিষয়টি নিয়ে যৌথ প্রকল্পের সূচনা ঘটেছে ‘জার্নাল অব ইসলামিক এথিকস’-এর হাত ধরে। কাতারের দোহার ‘রিসার্চ সেন্টার ফর ইসলামিক লেজিসলেশন অ্যান্ড এথিকস’ ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এই জার্নালটি চালু করে এবং এর প্রথম সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হয় “কুরআন এবং নীতিশাস্ত্র” বিষয়ের ওপর। এর ভূমিকা অধ্যায়ের উপশিরোনামেই বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে: “এটা একটা জরুরি চাহিদা এবং একটা সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র”[13]Ghaly 2017, 1–5। এছাড়া একই সেন্টার থেকে ‘স্টাডিজ ইন ইসলামিক এথিকস’ নামে একটি বইয়ের সিরিজ এবং ফলিত ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর একটি মাস্টার্স প্রোগ্রামও চালু করা হয়েছে।

আরবি ভাষায় রচিত আধুনিক নৈতিকতাসংক্রান্ত সাহিত্যের পরিমাণ এত বিশাল যে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা বা রূপরেখা তুলে ধরা সম্ভব নয়। আহমেদ আবদুল হালিম আতিয়্যাহ তাঁর সমৃদ্ধ গ্রন্থ ‘আল-আখলাক ফিল ফিকরিল আরাবি আল-মুয়াসির’ (সমকালীন আরব চিন্তাধারায় নীতিশাস্ত্র, ১৯৯০)-এ এই দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছেন। আতিয়্যাহ আরব বিশ্বে নীতিশাস্ত্র নিয়ে কাজ করা প্রধান তিনটি গবেষণাধারা চিহ্নিত করেছেন:

১) প্রথম ধারাটি ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর রচিত ক্লাসিক কিতাবাদি ও পাণ্ডুলিপিগুলোর টীকা তৈরি, সংশোধন, সম্পাদনা ও প্রকাশনার পাশাপাশি গ্রিক নৈতিক চিন্তার সাথে সেগুলোর সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে।

২) দ্বিতীয় ধারাটি নীতিশাস্ত্র-সংক্রান্ত আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তাধারার অনুবাদ এবং সেগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে।

৩) তাঁর মতে, তৃতীয় ধারাটি এখনও বিকাশমান। এটি মূলত এমন একটি আরব নৈতিক চিন্তাকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে যা সমাজ ও জীবনের আধুনিক চ্যালেঞ্জগুলোর অভিনব সমাধান দিতে পারে[14]‘Aţiyya 1990, h–kh

এই সীমিত পরিসরে আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামি নীতিশাস্ত্রের বিতর্কটিকে একটা প্রেক্ষাপটে দাঁড় করানো, এর সম্পূর্ণ ব্যবচ্ছেদ করা নয়। তাই আমরা ওপরে ব্যবহৃত “কুরআনি নৈতিক ব্যবস্থা বা চিন্তাধারা” এবং “ইসলামি নৈতিক চিন্তাধারা”র শ্রেণিবিন্যাসটি এখানেও বজায় রাখব। সেই আলোকেই মূলত মিসরীয় প্রেক্ষাপটের কিছু প্রাসঙ্গিক টেক্সট খতিয়ে দেখা হবে। এরপর আমরা আলোচনা করব মাগরেবি (উত্তর আফ্রিকা) প্রেক্ষাপট নিয়ে; কারণ এটাই সেই ক্ষেত্র যেখান থেকে “আমানতদারী নীতিশাস্ত্র” (ট্রাস্টিশিপ এথিকস) এবং “আমানতদারী মডেল” (ট্রাস্টিশিপ প্যারাডাইম)-এর জন্ম হয়েছে।

মিসরীয় প্রেক্ষাপটের কথা বলতে গেলে, প্রথম ধারার অর্থাৎ “কুরআনিক নৈতিক চিন্তাধারা”র সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল কাজ হলো আবদুল্লাহ দরাজের গবেষণাকর্ম। অন্যদিকে, বাকি কাজগুলোকে স্থূলভাবে দ্বিতীয় ধারার অর্থাৎ “ইসলামি নৈতিক চিন্তাধারা”র অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এই দ্বিতীয় ধারায় আমরা দুজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বকে দেখতে পাই: আহমেদ লুতফি সাঈদ (১৮৭১–১৯৬৩) এবং মুস্তফা আবদুর রাজিক (১৮৮৫–১৯৪৭)।

এই দুই ব্যক্তিত্ব আবার দুটি প্রধান গবেষণাধারার প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রথম ধারাটি আধুনিক ইউরোপীয় দার্শনিক স্কুলগুলোর আলোকে গ্রিক-আরব দার্শনিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ধারাটি একটি স্বাধীন নীতিবিদ্যা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধর্মকে ওহী বা ঐশীবাণী থেকে আলাদা করার পক্ষাবলম্বন করে। দ্বিতীয় ধারাটি ক্লাসিক ঐতিহ্যের সুনির্দিষ্ট কিছু জ্ঞানশাখাকে প্রারম্ভিক বিন্দু হিসেবে গ্রহণ করে; উদ্দেশ্য হলো ইসলামি নৈতিক তত্ত্বগুলোর এমন কিছু মৌলিক উৎসের সন্ধান দেওয়া, যা এই ক্ষেত্রে আধুনিক অনুসন্ধানগুলোকে সমৃদ্ধ করতে পারে[15]দেখুন al-Khațīb 2019

জুল বার্থেলমি-সাঁ-হিল্যার (১৮০৫–১৮৯৫)-এর ফরাসি সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে ১৯১৯ সালে অ্যারিস্টটলের (মৃত্যু ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ‘নিকোমেচিয়ান এথিকস’-এর প্রথম আধুনিক আরবি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। এর ভূমিকায় আহমেদ লুতফি সাঈদ বলেন, আরব ও মিসরীয় দর্শনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে আরব গবেষকদের আবারও অ্যারিস্টটলের দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করতে হবে[16]Lutfi El-Sayed [1919] 1934। লুতফি সাঈদ মূলত ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেনথাম (১৭৪৮–১৮৩২) ও জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬–১৮৭৩)-এর উপযোগবাদী নীতিদর্শনের প্রতি আগ্রহ রাখতেন। তিনি ফরাসি ও সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় দার্শনিক মডেলের প্রতি আগ্রহী একঝাঁক ছাত্র ও গবেষককে প্রভাবিত করেছিলেন; যার পর ১৯৪০-এর দশকে আরব-ইসলামি দর্শনে আগ্রহী আরও এক নতুন প্রজন্মের জন্ম হয়[17]al-Khațīb 2019, 164–169। দর্শনের প্রতি এই আগ্রহের প্রমাণ মেলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চবিদ্যালয় স্তরে দর্শনের পাঠ্যপুস্তকগুলোর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা থেকে। উদাহরণস্বরূপ, মিশরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানকারী প্রখ্যাত ইউরোপীয় পণ্ডিতদের বক্তৃতাগুলো পরবর্তীতে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, পাশাপাশি স্থানীয় স্কলারদের লেখাও প্রকাশিত হচ্ছিল।

আমিন ওয়াসিফ বেগ (১৮৬৭–১৯২৮) ১৯২১ সালে ‘উসুলুল ফালসাফা’ (দর্শনের মূলনীতি) নামে পাঁচ খণ্ডে দর্শনের প্রধান প্রধান শাখাগুলোর (মনোবিজ্ঞান, নন্দনতত্ত্ব, যুক্তিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র এবং অধিবিদ্যা) ওপর মিসরীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া তাঁর বক্তৃতাগুলো প্রকাশ করেন। এর চতুর্থ খণ্ডটি তিনি নীতিশাস্ত্রের জন্য উৎসর্গ করেন, যেখানে কোনো রেফারেন্স বা ধর্মীয় উদ্ধৃতির ব্যবহার ছিল না (Wāşif Bik 1921)। তবে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত আহমদ আমিনের (১৮৮৬–১৯৫৪) প্রাতিষ্ঠানিক কাজ ‘কিতাবুল আখলাক’ (নীতিবিদ্যা গ্রন্থ) সম্ভবত আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছিল। আহমেদ আবদুল হালিম আতিয়্যাহর মতে, বইটি মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গৃহীত হয়েছিল এবং এর প্রভাব ছিল বেশ সুদূরপ্রসারী[18]Amīn [1929] 2011; ‘Aţiyya 1990, d। বইটিতে বিবেক, নৈতিক বিচার, ভালো-মন্দ, ব্যক্তি ও সমাজ, অধিকার ও কর্তব্য, বাধ্যবাধকতার অর্থ, নৈতিক আদর্শ এবং গুণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই গুণ বা সচ্চরিত্রের অধ্যায়টি ছিল বইটির একদম শেষে—অথচ ক্লাসিক আরব-ইসলামি গ্রন্থগুলো সাধারণত সচ্চরিত্রের আলোচনা দিয়েই শুরু হতো। আমিন বলেন, মানুষ ভালো ও মন্দ চেনার জন্য তার সহজাত বোধ বা অন্তর্দৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে পারে; আর শিক্ষা, পরিবার ও ধর্ম কেবল এই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এই অন্তর্দৃষ্টিই মানুষের মূল্যবোধকে সর্বজনীন ও সবার মাঝে ভাগ করে নেওয়ার উপযোগী করে তোলে[19]Amīn 2011, 32, 43। ইসলামি সভ্যতার ওপর আধুনিক আরবি গবেষণায় তাঁর তিনটি যুগান্তকারী খণ্ড—’ফাজরুল ইসলাম’ (১৯২৯), ‘দুহাল ইসলাম’ (১৯৩৩) এবং ‘জুহরুল ইসলাম’ (১৯৪৫)—ইসলামি ধর্মতত্ত্ব ও দার্শনিকদের সম্পর্কে কথা বলার সময় নীতিশাস্ত্রের প্রসঙ্গ টেনেছে। তৃতীয় খণ্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়টি সম্পূর্ণ ছিল এই বিষয়ের ওপর উৎসর্গিত। এই অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন যে, ইসলামি ঐতিহ্যে সাধারণত দুই ধরনের নৈতিক গবেষণা রয়েছে: একটি কুরআন, সুন্নাহ, প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষা এবং নৈতিক গল্পের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে; আর অন্যটি তৈরি হয়েছে পরে, যখন এই ঐতিহ্য গ্রিক দর্শনের সংস্পর্শে আসে। এই পর্যায়ে এসে নীতিশাস্ত্র বিভিন্ন শ্রেণি ও ধারণার মাধ্যমে আরও বেশি সুশৃঙ্খল ও যুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, ইবনুল মুকাফফা এবং আল-মাওয়ার্দির নৈতিক কাজগুলো প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, যেখানে মিসকাওয়াহ, আবু বকর রাজি এবং ইখওয়ানুস সাফার কাজগুলো দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্গত। আল-গাজালিকে এই দুই শ্রেণির মাঝামাঝি স্থানে রাখা হয়েছে[20]Amīn [1945] 2013, 389–400। মাজিদ ফাখরিও তাঁর ‘আরব নৈতিক চিন্তাধারা’ গ্রন্থে একই ধরনের বিভাজন গ্রহণ করেছেন[21][1978] 1986, 9–10

এখন পর্যন্ত গবেষকেরা আরব-ইসলামি দর্শনের পঠন-পাঠনকে গ্রিক দর্শনের সাথেই জুড়ে দিয়ে এসেছেন। এর বাইরে সুনির্দিষ্ট কিছু ইসলামি জ্ঞানশাখাকে তাঁরা আলাদাভাবে এবং মৌলিক দার্শনিক বিদ্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি। মরক্কোর বিখ্যাত চিন্তাবিদ মোহাম্মদ আবেদ আল-জাবেরি (১৯৩৬–২০১০) তাঁর চার খণ্ডের ‘নাকদুল আকলিল আরাবি’ (আরব বুদ্ধিবৃত্তির ব্যবচ্ছেদ) গ্রন্থের জন্য পরিচিত। তাঁর চিন্তার ইতিহাস অনুযায়ী, আন্দালুসিয়ার শেষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ইবনে রুশদের পর থেকেই এই সংস্কৃতিতে শতাব্দীকালের পতন ও দার্শনিক স্থবিরতা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ এই স্থবিরতার পর আরব-ইসলামি দর্শনের যে পুনর্জন্ম ঘটেছে, তার পেছনে জাবেরি দুজন আধুনিক গবেষককে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন—যদিও তা এসেছে প্রসঙ্গক্রমেই, তবে তাদের অবদানের স্পষ্ট স্বীকৃতি দিয়ে। আল-জাবেরি মিশরের মুস্তফা আবদুর রাজিক এবং ইব্রাহিম মাদাকুরকে (১৯০২–১৯৯৬) গণ্য করেন এমন গবেষক-চিন্তাবিদ হিসেবে, যাঁরা—তাঁর ভাষায়—”দার্শনিক প্রাচ্যবাদ” (ফিলোসফিক্যাল ওরিয়েন্টালিজম)-এর উপযুক্ত জবাব দিতে পেরেছিলেন। উল্লেখ্য, আঠারো ও উনিশ শতকের বেশ কয়েকজন ইউরোপ-কেন্দ্রিক গবেষক এই প্রাচ্যবাদী ধারার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন[22]al-Jābrī 1991, 63–64। নীতিবিদ্যা সম্পর্কিত তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর ওপর আমরা নিচে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করব।

মুস্তফা আবদুর রাজিকের হাত ধরেই আরব-ইসলামি দর্শনে নীতিশাস্ত্রের পঠন-পাঠন নতুন মোড় নেয়। তিনি আল-আজহার থেকে পড়াশোনা শেষ করে শায়খ উপাধি পান এবং পরবর্তীতে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি এমিল ডুর্খেইমের (১৮৫৮–১৯১৭) মতো বিখ্যাত পণ্ডিতদের অধীনে পড়াশোনা করেন এবং এরপর লিওঁতে ইসলামি আইনতত্ত্ব পড়ান। পরবর্তীতে তিনি আল-আজহারের প্রধান উপাচার্য হন এবং আটবার ধর্ম ও ওয়াকফ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন; কোনো আজহারী আলেম হিসেবে তিনিই প্রথম এই পদে আসীন হয়েছিলেন। এছাড়া তিনি বিখ্যাত সংস্কারক স্কলার মুহাম্মদ আবদুহুর (১৮৪৯–১৯০৫) সরাসরি ছাত্রদের একজন ছিলেন।

মুস্তফা আবদুর রাজিক মিসর বিশ্ববিদ্যালয়ের (যা পরে কিং ফারুক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্তমানে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত) কলা অনুষদে এমিল ব্রেহিয়ে (১৮৭৬–১৯৫২) এবং আন্দ্রে লাল্যান্ডের (১৮৬৭–১৯৬৩) সাথে পাঠ্যসূচিতে “ইসলামি দর্শন” বিষয়ে পাঠদান শুরু করেন। তখন সেখানে একমাত্র অন্য মিসরীয় অধ্যাপক ছিলেন তহা হুসাইন (১৮৮৯–১৯৭৩)। এর আগে “ইসলামি দর্শন” বিষয়টা দর্শন বা সাধারণ দর্শন কোর্সের অংশ ছিল এবং এটা পড়ানো হতো “বিদেশী” দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন পড়াতেন এমন ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদরা প্রায়শই এর মৌলিক দিকগুলোকে উপেক্ষা করতেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইতালির দাভিদে সান্তিলানা (১৮৫৫–১৯৩১), কার্লো আলফনসো নালিনো (১৮৭২–১৯৩৮), ইংল্যান্ডের থমাস ওয়াকার আর্নল্ড (১৮৬৪–১৯৩০), ফ্রান্সের লুই মাসিনিওঁ (১৮৮৩–১৯৬২)[23]‘Abd al-Rāziq 2011, 45, n. 2 এবং স্পেনের কাউন্ট ডি গালারজা (১৮৭৮–১৯৩৮)[24]Reid 1987; ‘Aţiyya in De Galarza 1920, 3–4

১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ‘তামহিদ লি-তারিখিল ফালসাফা আল-ইসলামিয়্যাহ’ (ইসলামি দর্শনের ইতিহাসের ভূমিকা) গ্রন্থে আব্দুল রাজিক “ইসলামি দর্শন” এবং এর মৌলিকত্বের উৎস কোথায়, তা নিয়ে যে মতামত দিয়েছিলেন, তা ইসলামি দর্শনের বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত নতুন ছাত্র এবং পরবর্তীতে অধ্যাপকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তাঁদের মধ্যে আলী সামী নাশার (১৯১৭–১৯৮০) অন্যতম। নাশার আবার প্রভাবিত করেছিলেন তাঁর ছাত্র আহমেদ মাহমুদ সুবহিকে এবং সুবহির ছাত্ররা—যেমন আব্দুল হাই কাবিল—পরবর্তীতে ইসলামি নীতিশাস্ত্রের ওপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন[25]Qabīl 1984, 5

আলী সামী নাশার তাঁর তিন খণ্ডে রচিত ‘নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম’ (ইসলামে দার্শনিক চিন্তার বিকাশ; যা যথাক্রমে ১৯৬৬, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত) গ্রন্থে ইসলামি দর্শনের মৌলিকত্ব প্রমাণে এর ধর্মতত্ত্ব, আইনতত্ত্বের মূলনীতি এবং সুফিবাদের অবদানকে তুলে ধরেন[26]Al-Nashar [1966] 1977, 1:18। তাঁর ছাত্র আহমেদ মাহমুদ সুবহি এই চিন্তাধারাকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যান ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘আল-ফালসাফাতুল আখলাকিয়্যাহ ফিল ফিকরিল ইসলামি’ (ইসলামি চিন্তাধারায় নীতিদর্শন) গ্রন্থে।

এই গ্রন্থে তিনি মুতাজিলা এবং সুফিদের দুটি পরস্পরবিরোধী ধারা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, প্রথম ধারাটি ছিল যুক্তি ও বিমূর্ততানির্ভর এবং দ্বিতীয় ধারাটি ছিল আমল বা ব্যবহারিক চর্চানির্ভর। তবে উভয় ধারাই নীতিশাস্ত্রের ক্ষেত্রে নিজস্ব ও মৌলিক তত্ত্বের বিকাশ ঘটিয়েছিল। পাশাপাশি তিনি ইখওয়ানুস সাফা এবং মিসকাওয়াহকে এমন দুটি প্রধান স্কুলের উদাহরণ হিসেবে সামনে আনেন, যারা নীতিশাস্ত্রকে একটি সমন্বিত উপায়ে তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছিলেন; যা সম্পূর্ণ যুক্তিবাদীও ছিল না, আবার পুরোপুরি ঐতিহ্য বা অধিবিদ্যা-নির্ভরও ছিল না (Subhi [1969] 2006)।

এই দুই গবেষকেরই স্পষ্ট মত ছিল যে, ইসলামি দর্শন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং স্বভাবগতভাবেই এর অভিমুখ আধ্যাত্মিকতার দিকে। তাই স্বভাবতই এটাকে অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের আদলে সম্পূর্ণ অধিবিদ্যা-মুক্ত হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই[27]Subhi 2006, 19–20

ইব্রাহিম মাদাকুরের কথা বলতে গেলে, তিনিও ছিলেন আল-আজহারের একজন স্নাতক। তিনি ১৯৩৪ সালে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত স্কলার লুই মাসিনিওঁ-র অধীনে পড়াশোনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তহা হুসাইনের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন এবং কায়রোর ‘আরব ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাসেম্বলি’র পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুসলিম দার্শনিকদের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি সংশোধন, সম্পাদনা ও সেগুলোর ওপর লেখালেখি করেছেন এবং আরব-ইসলামি দর্শনে আগ্রহী একঝাঁক তরুণ গবেষককে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো দুই খণ্ডে রচিত ‘ফিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ: মানহাজ ওয়া-তাতবিকুহ’ (ইসলামি দর্শন প্রসঙ্গে: পদ্ধতি ও তার প্রয়োগ, ১৯৪৭)।

যদিও এই গ্রন্থের সূচিপত্রের অধ্যায়গুলোর শিরোনামে সরাসরি “নীতিশাস্ত্র” (এথিকস) শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবুও তিনি যেভাবে ইসলামি ঐতিহ্যকে পাঠ ও উপস্থাপন করেছেন, সেখানে নীতিশাস্ত্রের অস্তিত্ব একেবারেই অনুপস্থিত নয়। এর প্রথম খণ্ডে তিনটি প্রধান তত্ত্ব বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে ইসলামি দর্শনকে খতিয়ে দেখা হয়েছে: (১) সুখ, (২) নবুয়ত তত্ত্ব, এবং (৩) আত্মা ও তার অমরত্ব। দ্বিতীয় খণ্ডটিতে মূলত দুটি ধারণাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে: (১) ঐশ্বরিক সত্তা এবং (২) মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা। সমন্বিতভাবে দেখলে, এই সমস্ত ধারণার মধ্যে নৈতিকতার বিষয়টি হয়তো মূল কেন্দ্র হিসেবে স্পষ্ট নয়, তবে তা বিভিন্ন জ্ঞানশাখা ও তাদের মৌলিক ধারণার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে।

মাদাকুর বলেন যে, আবুল হুদাইল আল-আল্লাফ (মৃত্যু আনু. ২২৭/৮৪০) এবং ইব্রাহিম আন-নাজ্জাম (মৃত্যু আনু. ২৩০/৮৩৫)-এর মতো মুতাজিলা ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্বাধীন ইসলামি ধর্মতত্ত্ব (কালাম) ছিল মূলত একটি ধর্ম-ভিত্তিক দর্শন, যা ধর্ম থেকেই তার পুষ্টি উপাদান লাভ করেছিল। আর এই ধারাটি বিকশিত হয়েছিল আল-কিন্দি—যাঁকে প্রায়শই প্রথম আরব-মুসলিম দার্শনিক হিসেবে গণ্য করা হয়—তাঁর গ্রিক দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ার অনেক আগেই। মাদাকুরের মতে, ইসলামি দর্শনের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল ধর্মের ভেতরে এবং ধর্মের কল্যাণেই; আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল তৌহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদের ধারণা নিয়ে হওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কগুলো[28]Madkour, [1947] 2015, 2:277–278

তাঁর এই বক্তব্য হেনরি কর্বিনের (১৯০৩–১৯৭৮) যুক্তির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। কর্বিন বলেছিলেন যে, ইসলামি প্রেক্ষাপটে দর্শন বিষয়টি “স্বভাবগতভাবেই ইসলামের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বাস্তবতার সাথে জড়িত।” এই ধারাটিকে তিনি কখনো কখনো “নবুয়তি দর্শন” (প্রফেটিক ফিলোসফি) হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন[29]Corbin 1962, xiv–xv

আধুনিক আরব গবেষণায় নীতিশাস্ত্রকে একটি স্বতন্ত্র পাঠ্য বিষয় হিসেবে দেখার একই ধরনের প্রয়াস লক্ষ করা যায় মুহাম্মদ ইউসুফ মুসার (১৮৯৯–১৯৬৩) কাজে। তিনি ছিলেন একাধারে আল-আজহারের একজন স্কলার এবং ওপরে উল্লিখিত লুই মাসিনিওঁ ও মুস্তফা আবদুর রাজিকের অন্যতম ছাত্র। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘হিস্ট্রি অব এথিকস’ ([১৯৪০] ১৯৫৩, ১৯০)-এ তিনি বিষয়টিকে নিয়ে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করেছেন। এখানে তিনি ইসলামি নীতিশাস্ত্রকে একমাত্র মূল ফোকাস বা অনন্য বিষয় হিসেবে গড়ে তোলেননি, বরং অন্যান্য ঐতিহ্যের (প্রাচীন প্রাচ্য, মিসরীয়, গ্রিক, ইহুদি, খ্রিস্টান, ইসলামি এবং ইউরোপীয়) নীতিশাস্ত্রের পাশাপাশি একে স্থান দিয়েছেন।

তাঁর অন্য একটি ছোট বই ‘ইস্যুজ ইন দ্য ফিলোসফি অব এথিকস’ (১৯৪০) নীতিবিদ্যার মূল বিষয়বস্তু এবং এর দার্শনিক পঠন-পাঠনের ওপর জোর দেয়, যেখানে তিনি ইউরোপীয় দার্শনিকদের পাশাপাশি মুসলিম দার্শনিকদের চিন্তাভাবনাকেও সমানভাবে তুলে ধরেছেন। তবে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিপক্ক কাজটি আরও এক ধাপ এগিয়ে শুধু নীতিশাস্ত্রই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ইসলামি দর্শনকে এর মূল উৎসগ্রন্থ—পবিত্র কুরআনের আলোকেই অনুসন্ধানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত এই বইটির শিরোনাম ‘দ্য কুরআন অ্যান্ড ফিলোসফি’, যাকে এই বিষয়ের ওপর একটি যুগান্তকারী গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা যায়।

সম্প্রতি ইংরেজিতে অল্প কিছু গবেষণাকর্ম এই বিষয় নিয়ে কাজ করা শুরু করেছে; যেমন অলিভার লিম্যানের ‘দ্য কুরআন: আ ফিলোসফিক্যাল গাইড’ এবং ‘ইসলাম অ্যান্ড মোরালিটি’ (২০১৬; ২০১৯), এবং মাসিমো ক্যাম্পানিনির ‘ফিলোসফিক্যাল পারসপেক্টিভস অন মডার্ন কুরআনিক এক্সেজেসিস’ (২০১৬)। এর আগে ১৯৪৭ সালে আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ (১৮৮৯–১৯৬২) ‘কুরআনিক ফিলোসফি’ নামে একটা সাধারণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যা অবশ্য শিরোনাম অনুযায়ী প্রত্যাশিত গভীরতা ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। তবে এর উদ্দেশ্য ছিল এটা দেখানো যে—কুরআন যুক্তির পরিপন্থী তো নয়ই, বরং এমন এক গ্রন্থ যা এমন সব ধারণাকে ধারণ করে যেগুলো দার্শনিক উপায়ে বিশ্লেষণযোগ্য। এভাবে বইটি একটি সমৃদ্ধ দার্শনিক আহ্বানে রূপ নেয়। নৈতিকতাও মূলত এই ধরনের ধারণারই একটি অংশ, যা মানুষের উৎকর্ষ, পূর্ণতা ও নন্দনতত্ত্বের পথপ্রদর্শক হিসেবে ঐশী গুণাবলির রসে সিক্ত[30]Al-Aqqād [1947] 2013, 23–31

মিসরীয় পণ্ডিতদের নীতিশাস্ত্র-সংক্রান্ত আলোচনার এই পর্বটি নৈতিক ধারণার আলোকে কুরআন পাঠের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রচেষ্টার জন্ম দেয়। আর সেটা হলো আল-আজহারের স্কলার মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ দরাজের (১৮৯৪–১৯৫৮) যুগান্তকারী কাজ। দরাজ ফ্রান্সে দীর্ঘ বারো বছর পড়াশোনা করে তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্ম ‘লা মোরাল দু কোরান’ (La Morale du Koran) তৈরি করেন। এটা মূলত প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ছিল, যা তিনি ১৯৪৭ সালে সফলভাবে ডিফেন্ড করেন এবং ১৯৫০ সালে ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। এর প্রায় ১৩ বছর পর, আল-আজহারের আরেক স্কলার আবদুস সবুর শাহীন (১৯২৯–২০১০)-এর উদ্যোগে বইটির আরবি সংস্করণ (দুস্তুরুল আখলাক ফিল কুরআন) আলোর মুখ দেখে। অন্যদিকে এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় অনেক পরে, ২০০৮ সালে।

দরাজ তাঁর বইটিকে নীতিশাস্ত্রের তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক—এই দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেছেন। প্রথম ভাগে তিনি কুরআনে বর্ণিত বাধ্যবাধকতা (অবলিগেশন), জবাবদিহিতা বা দায়বদ্ধতা (রেসপন্সিবিলিটি), পুরস্কার ও শাস্তি (স্যাঙ্কশন), নিয়ত বা অভিপ্রায় (ইনটেনশন) এবং ঝোঁক ও প্রচেষ্টা (ইনক্লিনেশনস অ্যান্ড এফোর্ট) সংক্রান্ত ধারণাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এই প্রসঙ্গে প্রাচীন ও আধুনিক নৈতিক তত্ত্বগুলোর রেফারেন্স টেনেছেন।

দ্বিতীয় ভাগে তিনি ব্যক্তিগত নৈতিকতার পাশাপাশি পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নীতিশাস্ত্র এবং কুরআন কীভাবে এই বিষয়গুলোকে একটি সুসংগত ও ধারাবাহিক কাঠামোয় উপস্থাপন করে, তা বিশদভাবে পরীক্ষা করেছেন। তাঁর মতে, এর আগে কুরআনের নীতিশাস্ত্রকে যেভাবে আলাদা আলাদা আয়াত বা বিচ্ছিন্ন শিক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে উপস্থাপন করা হতো, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। গবেষণার এই ঘাটতি বা শূন্যতার জন্য তিনি মুসলিম এবং অমুসলিম, উভয় ধারার গবেষকদেরই দায়ী করেন[31]Darrāz 1973; Draz 2008; আরও দেখুন Rashwānī 2017, 159–169

আরব-ইসলামি নীতিশাস্ত্রের এই বহুমুখী পঠন-পাঠন স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, বিষয়টি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক মহলেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটা রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে এই জনপরিসরে ঠিক কেমন নৈতিকতার আধিপত্য থাকা উচিত, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সেই নীতি কাঠামো কি সম্পূর্ণ ধর্মীয় হবে, ধর্মনিরপেক্ষ হবে, নাকি উভয়ের এক সমন্বিত রূপ হবে? এটি কি সম্পূর্ণ যুক্তিনির্ভর হবে, নাকি আংশিক যুক্তিনির্ভর?

আরব বিশ্বের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজগুলো আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ বিশ্বের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করতে কীভাবে তাদের ধ্রুপদী নৈতিক ঐতিহ্যের দিকে ফিরে তাকাতে পারে এবং সেখান থেকে একটি সমসাময়িক ও যূথসই ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে, তা-ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু করে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত আরব নীতিশাস্ত্রীয় দর্শনের পঠন-পাঠন এবং এর পুনরুজ্জীবনের প্রতি যে তীব্র আগ্রহ ছিল—যা ওপরে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে—তা মূলত ইসলামি জাগরণ এবং রাজনৈতিক ইসলামের উত্থানের কারণে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ম্লান হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, “গ্লোবাল মুফতি” ইউসুফ আল-কারাদাভি (জন্ম ১৯২৬) ‘আল-কিয়াম ওয়াল-আখলাক ফিল ইকতিসাদিল ইসলামি’ (ইসলামি অর্থনীতিতে মূল্যবোধ ও নীতিশাস্ত্র, ১৯৯৫) রচনা করেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে তিনি প্রকাশ করেছেন ‘আখলাকুল ইসলাম’ (ইসলামের নীতিশাস্ত্র, ২০১৭)। এই শেষোক্ত বইটির ভূমিকায় তিনি নীতিবিদ্যাকে ইসলামের মূল বার্তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং ফলিত বা ব্যবহারিক নীতিশাস্ত্র ছাড়া ঈমানকে অকার্যকর ও ভিত্তিহীন বলে গণ্য করেছেন। তিনি এখানে নিশ্চিতভাবেই বিভিন্ন বিষয়ের অবতারণা করেছেন, তবে সেগুলোর কোনো তাত্ত্বিক বা ধারণাগত রূপরেখা দেননি। বরং তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ফলিত নীতিশাস্ত্র এই ঐতিহ্যের জন্য মৌলিক, এবং তিনি তাঁর যুক্তিগুলোকে কুরআনের আয়াত ও হাদিসের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবে, আমাদের পূর্বে প্রস্তাবিত সাধারণ শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী আমরা আল-কারাদাভির অর্থনীতিবিষয়ক প্রথম কাজটিকে “ইসলামি নৈতিক চিন্তাধারা” এবং তাঁর দ্বিতীয় কাজটিকে “কুরআনি নৈতিক চিন্তাধারা”র অন্তর্ভুক্ত করতে পারি, অথবা ফাখরির শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী একে “ধর্মগ্রন্থীয় নীতিশাস্ত্র” (স্ক্রিপচারাল এথিকস) হিসেবে গণ্য করতে পারি।

চলবে…

সমকালীন আরব-ইসলামি নীতিশাস্ত্র : একটি বিশ্লেষণাত্মক রূপরেখা (দ্বিতীয় পর্ব)

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 ‘Abd al-Raziq [1944] 2011, 8
2 El-Rouayheb and Schmidtke 2017, 1–7
3 Rahman 1982, 154–155
4 Şalībā 1989, 9–11
5 Fakhry [1970] 2004, ix; ‘Aţiyya 1990, j–d
6 al-Tawīl 1952, 256–387; Qābīl 1984, 7–11; ‘Aţiyya 1990, j–d
7 Rahbar 1960, xiii; Rashwānī 2017, 169–170
8 Rahbar 1960, xv
9 Rashwānī 2017, 182–184
10 Fakhry [1978] 1986, 9–10
11 Hourani 1985, 19
12 Al-Attar 2010, 142
13 Ghaly 2017, 1–5
14 ‘Aţiyya 1990, h–kh
15 দেখুন al-Khațīb 2019
16 Lutfi El-Sayed [1919] 1934
17 al-Khațīb 2019, 164–169
18 Amīn [1929] 2011; ‘Aţiyya 1990, d
19 Amīn 2011, 32, 43
20 Amīn [1945] 2013, 389–400
21 [1978] 1986, 9–10
22 al-Jābrī 1991, 63–64
23 ‘Abd al-Rāziq 2011, 45, n. 2
24 Reid 1987; ‘Aţiyya in De Galarza 1920, 3–4
25 Qabīl 1984, 5
26 Al-Nashar [1966] 1977, 1:18
27 Subhi 2006, 19–20
28 Madkour, [1947] 2015, 2:277–278
29 Corbin 1962, xiv–xv
30 Al-Aqqād [1947] 2013, 23–31
31 Darrāz 1973; Draz 2008; আরও দেখুন Rashwānī 2017, 159–169

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments