তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে
আমরা কি তিমিরবিলাসী?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ’তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।
— জীবনানন্দ দাশ
চারিদিকে অন্ধকার। নিকষকৃষ্ণ অন্ধকার। কোথাও কোনো আলো নেই! নেই কোনো আশা ও ভালোবাসার ধ্বনি! পদার্থের মৌলিক কণা থেকে শুরু করে মানবজীবনের সর্বত্রে যেন অন্ধকার ঢুকে গেছে! অন্ধকারের ফাতহধ্বনিতে মুখরিত চারিদিক। তাই, এ সত্য ইনকারের সুযোগ নেই যে, পৃথিবী তার অস্তিত্বের অধিকাংশ সময় অন্ধকারের হুকুমতে দিন-গুজার করেছে এবং করবে। মাঝে মাঝে কতিপয় কামেল আত্মার আগমনে এই ধরণী কিঞ্চিত আলোর সন্ধান পেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী-মুকাম্মাল হয়নি! অন্ধকারই যেন এ জগতের নিয়তি হিশেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে সর্বদা। কবি লর্ড বায়রনের একটি কবিতার লাইন মনে পড়ছে, “Darkness had no need Of aid from them—She was the Universe.”
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির অজস্র যেখানে বিপ্লব-অভ্যুত্থান ইত্যাদির নামে নতুন পৃথিবী বিনির্মাণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হলেও পারিপার্শ্বিকতা ও বিভিন্ন জটিলতায় আদর্শ ও ন্যায়ের পথ থেকে দুনিয়া বিচ্যুত হয়েছে! অন্ধকার দূর করতে গিয়ে নতুন অন্ধকারের প্রবর্তন হয়েছে। দুনিয়া-নন্দিত ফরাসি বিপ্লবের কথা ধরা যাক। রাজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে যখন জ্যোকোবিনরা মসনদে বসল, তখন তাদের হাতেই নতুন সন্ত্রাসের জন্ম হল। ৪০ হাজারের অধিক মানুষকে গিলোটিনে হত্যা করা হল। গির্জা ভেঙে ফেলা হল, যাজকদের হত্যা করা হল, হাজার হাজার নারী-শিশু-গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হল। সমাজতন্ত্রের লাল সন্ত্রাসের হাতে লাখো জনতা কতল হল বিপ্লবের নামে। মানবতার ধ্বজাধারী আমেরিকার হাতে লেগে আছে নেটিভ আমেরিকানদের রক্তের দাগ, তাদের উৎখাত করেই আজকের নতুন আমেরিকা; সন্ত্রাস নির্মূলের নামে অজস্র ধর্মপ্রাণ মুসলমানের আর্তনাদ ঘিরে রেখেছে আধুনিক আমেরিকার ইতিহাসকে। এভাবেই মানবতার ধারক মানবতার ঘাতকে পরিণত হয়েছে।
মানবতার মুক্তির দূত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুক্তির যে পয়গাম নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন, সমস্ত জীবন উৎসর্গ করে যে সত্য-শান্তি-ন্যায়ের বৈভব তিনি আরবভূমিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানেও ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসে; তাঁর মৃত্যুর পর ত্রিশ বছরের মধ্যেই তাঁর খলিফাদের শহিদ করা হয়, অসংখ্য সাহাবীকে হত্যা করা হয়। তাওহিদের ভূমিতেই ফেতনার দানা বৃষ্টির মতো ঝরতে শুরু করে। ইতিহাসের এই নির্মম শিক্ষা থেকে আমার উপলব্ধি এই যে, পৃথিবীর ইতিহাস মূলত অন্ধকারের ইতিহাস। তবে, আলোও ক্ষণে ক্ষণে উঁকি দিয়ে উঠবে এবং মানুষের মাঝে নতুন করে বেঁচে থাকার খায়েশ তৈরি করবে। এবং অন্ধকার হটিয়ে আলো নিয়ে আসার সংগ্রামই মানব-ইতিহাসকে মশগুল করে রাখবে; যদিও তা ক্ষণস্থায়ী, স্বল্প সময়ের আবর্তনে হারিয়ে যাবে।
শরিফ ওসমান হাদি (১৯৯৩-২০২৫) ছিলেন এমনই একজন আলোর পথের দিশারী। তিনি ছিলেন জুলাইয়ের সম্মুখ যোদ্ধা। কোনো দেশে বিপ্লব ঘটলে বিপ্লবের পর সাধারণত বিপ্লবীদের নীতিভ্রষ্টতা দৃষ্টিগোচর হয়। জাতি তখন মর্মাহত হয় এবং বিপ্লবের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পয়দা হয়; জুলাই বিপ্লবের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন এমন এক নেতা যিনি ক্ষমতার মোহকে তুচ্ছজ্ঞান করে জুলাইয়ের চেতনাকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করেছিলেন। এবং তাঁর সফলতার অন্যতম ক্ষেত্র হল, তিনি এই জমিনের মানুষের সংগ্রামকে, তাদের ঐতিহাসিক লড়াইকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইনকিলাব মঞ্চ নামের একটি সাংস্কৃতিক প্লাটফর্ম; যার উদ্দেশ্য ছিল জুলাইয়ের চেতনা এবং বাঙালি মুসলমানের চিরায়ত লড়াইকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরিচালনা করা। ওসমান হাদি এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের খোয়াব দেখতেন, যেখানে মানুষ ইনসাফের সাথে জীবনযাপন করবে, কারো উপর জুলুম করা হবে না, কারো বিশ্বাস-ধর্ম-গোত্রগত বৈশিষ্ট্যের কারণে কাউকে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে না এবং স্বচ্ছতা ও সততার সঙ্গে দেশের সকল ব্যবস্থা পরিচালিত হবে।
ওসমান হাদি যে পথে হেঁটেছিলেন তা অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ। এ পথ শাহাদাতের পথ। তিতুমীর থেকে ওসমান হাদি পর্যন্ত রয়েছে শহিদদের দীর্ঘ তালিকা। এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত উজ্জ্বল নাম শরিফ ওসমান বিন হাদি। ওসমান হাদি তাঁর একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, “A person can die but the idea can’t.” ব্যক্তি মারা যেতে পারে কিন্তু চিন্তার মৃত্যু হয় না। বাঙালি মুসলমানের প্রায় হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একথার যৌক্তিকতা স্পষ্ট হয়। অনেক বিপ্লবী-বীর শহিদ হয়েছেন কিন্তু তাদের অনুসৃত চেতনার সবক আজো বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ে জাগরুক হয়ে আছে। এজন্য ওসমান হাদি এবং তার সাংস্কৃতিক লড়াইকে বুঝতে হলে বাঙালি মুসলমানের চিরায়ত লড়াই ও তার ইতিহাসকে উপলব্ধি করা জরুরি।
বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়
পরিচয়ের রাজনীতি উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভ্যান স্খেনডেল বলেন যে, “বাংলাদেশের রাজনীতির একটি চরিত্রগত দিক হল পরিচয়ের রাজনীতি যা খুবই সাফল্যের সাথে রাজনৈতিক স্বার্থ আদায়ের মধ্য দিয়ে প্রথমে পাকিস্তান ও তারপর বাংলাদেশ নামের দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে”।[1]A History of Bangladesh Willem VAN SCHENDEL আমরা দেখতে পাই যে, বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় নিয়েই রয়েছে বুদ্ধিজীবী মহলে বিপুল বিতর্ক। কারণ, এই বিতর্ককে পুঁজি করেই এদেশের সাংস্কৃতিক মোড়লরা মুসলমানদের নতজানু করে রাখতে চেয়েছে দীর্ঘকাল। বার্ট্রান্ড রাসেলের মতে, ক্ষমতা মূলত বলপ্রয়োগের পরিবর্তে বিশ্বাস-চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষার হেরফেরের মাধ্যমে সুসংহতভাবে কাজ করে। ক্ষমতা মানুষের ভাবনা এবং আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রকে পরিগঠন করে তার অধীনতার পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করে। এজন্য স্থায়ী আধিপত্যের জন্য প্রয়োজন অধীনস্থ গোষ্ঠীকে এটা বিশ্বাস করানো যে, তাদের অধীনতা বৈধ-স্বাভাবিক এবং অনিবার্য। ক্ষমতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে এমনভাবে প্রতিস্থাপন করে যে, এটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ পূরণ করার পাশাপাশি এমন বিভ্রম সৃষ্টি করে যে, অধীনস্থদের কাছে এই রূপান্তর স্বেচ্ছাকৃত ও প্রগতিশীল মনে হয়। বাঙালি মুসলমানদের পরিচয় নির্ধারণে অনুরূপ কর্মতৎপরতার নজির লক্ষ্য করা যায়। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরে মুসলমানরা উপমহাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়, এবং বিপরীতে হিন্দু জনগোষ্ঠী বিট্রিশদের আনুকূল্য লাভ করে। বিট্রিশদের ভাষা ও চিন্তাকাঠামোকে আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে হিন্দুরা জাতে উঠে যায় কিন্তু মুসলমানদের তকদিরে বৈষম্য ও নিপীড়নের দুর্দশা স্থায়ী হয়ে ওঠে এবং ক্ষমতার পরিকাঠামোকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন মুসলমানরা নিজেরদের ভূমিতেই অপরের মতো জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়।
বাঙালি মুসলমানদের অপর করে রাখার অন্যতম অস্ত্র হল বাঙালি বনাম মুসলিম বিতর্কটি। এর উদ্দেশ্য হল বাঙালি মুসলমানদের এমন এক অদ্ভুত কাশমাকাশে ধাবিত করা, যেখানে সে নিজের বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্বের মাঝে বিস্তর ফারাক অনুভব করে। তাকে বলা হয়, ইসলাম বহিরাগত, অ-বাঙালি উপাদান; বিপরীতে বলা হয় বাঙালি সংস্কৃতি মূলত হিন্দু রীতিভুক্ত বিষয় (hindu coded)। ফলে একজন মুসলমানের পক্ষে কোনোভাবেই পুরোপুরি বাঙালি হওয়া সম্ভব হয় না, যতই সে বাঙলায় কথা বলুক কিংবা বাঙলার নদী-জলে তার জীবনের নাও প্রবাহিত হোক, সে প্রকৃত বাঙালি নয়। এই বাঙালি হতে না পারার মধ্য দিয়েই মুসলমান ও তাদের বিশ্বাস-রীতি-নীতিকে বহিরাগত প্রমাণ করা হয় এবং তাদের উপর সাংস্কৃতিক আধিপত্য স্থাপন করা হয়। উনিশ দশকে বঙ্কিমচন্দ্র, যদুনাথ, রমেশচন্দ্র প্রমুখ এবং নিকট অতীতের আহমদ ছফাদের জবানে বাঙালি মুসলমান সম্পর্কে পক্ষপাতদুষ্ট এই ধরণের বয়ান আমরা পাই, তার সারকথা হল—বাঙালি মুসলমান প্রকৃতপক্ষে নিচুজাতের হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত। তারা গ্রাম্য-খ্যাত এবং অতীতের কুসংস্কার আঁকড়ে থাকা একটা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী; যাদের রীতি-বিশ্বাস প্রগতিশীলতা ও আধুনিকতার অন্তরায়। এজন্য বিট্রিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসলাম ও মুসলমানদের চিহ্নযুক্ত সমস্তকিছুকে উতরাতে হবে, দাবিয়ে রাখতে হবে। তাদের এই কর্মতৎপরতার একটি নজির পেশ করা যাক। যেমন, উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও হিন্দু পণ্ডিতদের প্রচেষ্টায় বাংলা গদ্য ভাষা থেকে আরবি-ফারসি শব্দের অপসারণ করা হয় এবং অযৌক্তিকভাবে বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের সন্তান হিশেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বিট্রিশ ভারতে মুসলমানরা কোনো প্রান্তিক গোষ্ঠী ছিল না। প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে মুসলমানরা ভারতের রাজনীতি, শিক্ষা, ভাষা, আইন ও সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু পলাশী যুদ্ধে সিরাজুদ্দৌলার পরাজয় ও ১৮৫৭ এর সিপাহি বিদ্রোহের পরে মুসলমানদের উপর সামষ্টিক ক্ষোভ ও নির্যাতন আপতিত হয়। তাদেরকে পশ্চাৎপদ, বিশ্বাসঘাতক, চরমপন্থী ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত করা হয়। মুঘল সাম্রাজ্যের বিলোপন এবং মুসলিম এলিটদের হত্যা ও নির্বাসন দেয়া হয়। ১৮৩৭ সালে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিকে প্রশাসনিক ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়। কিন্তু মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ফারসি-আরবি নির্ভর। বিপরীতে ভারতীয় হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হতে শুরু করে। ফলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে তারা নিয়োগ পায় এবং মুসলমানরা ব্রিটিশ সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি নেতিবাচক থাকায় তুলনামূলক পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি ব্রিটিশদের ডিভাইড অ্যান্ড রুল নীতির মাধ্যমে তারা হিন্দু-মুসলিমকে একে অপরের জন্মশত্রু বানিয়ে ফেলে। এভাবে উপমহাদেশে মুসলমানরা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে মাইনোরিটিতে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে কিছু বাইনারি অবস্থানের সূত্রপাত হয়।
আধুনিক = ইংরেজি শিক্ষা
পশ্চাৎপদ = মাদরাসা শিক্ষা
সভ্য ভাষা = ইংরেজি/সংস্কৃত
অচল ভাষা = ফারসি
স্থানীয় = হিন্দু
বহিরাগত = মুসলমান
ভারতীয় সংস্কৃতি = উচ্চবর্ণ হিন্দু রীতি
বিদেশি সংস্কৃতি = মুসলিম সংস্কৃতি
হিন্দু = অনুগত ও সংস্কারপন্থী
মুসলমান = রাষ্ট্রবিরোধী ও বিদ্রোহী
হিন্দু সমাজ = প্রগতিশীল ও উদার
মুসলিম সমাজ = প্রতিক্রিয়াশীল ও কট্টর
স্বাধীন নারী = ব্রিটিশ নারী
পরাধীন ও নিপীড়িত নারী = মুসলিম নারী
এরকম আরো অনেক বাইনারি সিদ্ধান্তের অভিষ্যন্দ বিট্রিশ ভারতে লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক ভারতের রাজনীতির দিকেও যদি তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, মুসলিম শাসনকে তারা বর্বর, বহিরাগত এবং ভারত বিরোধী হিশেবে দেখাচ্ছে। মুসলমানদেরকে ঘুসপেটিয়া, বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ইত্যাদি বলে তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অর্থাৎ, বিট্রিশ ভারত ও আধুনিক ভারতে মুসলিম পরিচয়টাই সমস্যাজনক।
এরপর ১৯৪৭-এ দেশভাগের পরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। যার দুইটি অংশ—পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালি মুসলমানরা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হতে পারলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূলধারায় আসতে পারেনি। তাদের বাঙালিত্বকে কম মুসলমানিত্ব হিশেবে গণ্য করা হয় এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে এবং নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বিট্রিশ ভারতে বাঙালি মুসলমানরা তাদের মুসলমানিত্বের কারণে বৈষম্যের শিকার হয় এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রে তাদের বাঙালিত্ব প্রবলেমেটিক হয়ে ওঠে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রের জন্ম হল, তা কালক্রমে বাঙালি মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মে ভারতের অংশীদারত্ব এবং ইসলামপন্থীদের একটি অংশের পাকিস্তান ভাঙার বিরোধিতা করার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্র শুরুতেই ইসলামবিরোধী শক্তির হস্তগত হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিশেবে সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সিলেক্টিভ সেক্যুলারিজমের চর্চা হতে শুরু করে যেখানে ইসলাম-প্রশ্নে রাষ্ট্র ক্রিটিক্যাল অবস্থান গ্রহণ করে। এই অবস্থান আরো বেশি বেগবান ও আগ্রাসী হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগের (২০০৯-২০২৪) দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে। ব্রিটিশ ভারত ও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের তৈরি বাইনারি পুনরায় বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যাকে বলা হয় শাহবাগিজম। শাহবাগ হল বাংলাদেশের কালচারাল ফ্যাসিস্ট শক্তি।
শাহবাগ
শাহবাগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের প্রতীক। শাহবাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়েও শক্তিশালী। এজন্য ক্ষমতার পালাবদলে যারাই রাষ্ট্রের মসনদে উপনীত হোক না কেন, শাহবাগের প্রভাববলয় থেকে তারা মুক্ত হতে পারে না। ২৪-এর জুলাই আন্দোলনের পরেও বাংলাদেশে শাহবাগের ক্ষমতাপ্রভাব বিন্দুমাত্র হ্রাস হয়নি! কারণ, শাহবাগ হল বাংলাদেশের এলিট, তথাকথিত সংস্কৃতিমনাদের দর্শন। বাঙালি গরীব মুসলমানদের অধিকারকে ভূলুণ্ঠিত করেই শাহবাগ তার ক্ষমতা কায়েম করেছে। মিডিয়া থেকে শুরু করে ক্ষমতাবলয়ের সকল বিন্দুতে শাহবাগের মনন ধারণকারী ব্যক্তিরা বসে আছে।
শাহবাগ (২০১৩) কেবল যুদ্ধাপরাধের বিচারকেন্দ্রিক কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণআন্দোলন ছিল না। বরং, একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক শ্রেণির হেজেমনি তৈরির প্রকল্পে শাহবাগের জন্ম হয়েছিল। এই প্রকল্পের কেন্দ্রে ছিল ইসলামকে সন্দেহের জায়গায় রাখা, এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের রাজনৈতিকভাবে অবিশ্বস্ত হিশেবে চিহ্নিত করা। শাহবাগ ইসলামকে মৌলবাদ হিশেবে চিহ্নিত করে এবং মৌলবাদীরা সবাই রাজাকার এরূপ রেটরিকের জন্ম দেয়। শাহবাগ তাদের ডিসকোর্সে তিনটি আলাদা জিনিসকে কৌশলে এক করে ফেলে—ইসলামি পরিচয়, রাজনৈতিক ইসলাম ও ১৯৭১-এর রাজাকার। ফলস্বরূপ, দাড়ি, টুপি, মাদরাসা, ইসলামি ভাষা—সবকিছু রাজনৈতিক অপরাধের চিহ্ন হয়ে ওঠে। জঙ্গী দমনের নামে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এবং আওয়ামীলীগ বিরোধীদের হেনস্তা, হত্যা ও নিপীড়ন করা হয়। তালাল আসাদের ভাষায় ইসলাম এদেশে Bad Religion হিশেবে চিহ্নিত হয়। আধুনিক সেক্যুলার ব্যবস্থা কেবল সেই ধর্মকেই “ভালো” বলে মনে করে যা ব্যক্তিগত, ব্যক্তিনির্ভর এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার জন্য হুমকিহীন। শাহবাগের চোখে ইসলাম হল সেই ব্যাড রিলিজিয়ন যা তার ক্ষমতার বলয়কে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
শাহবাগ নিজেকে উপস্থাপন করেছে মুক্তমনা, প্রগতিশীল, উদার ও প্রকৃত বাঙালি সংস্কৃতির ধারক হিশেবে এবং এর বিপরীতে মুসলমানদের দেখানো হয়েছে—রক্ষণশীল, অশিক্ষিত, গ্রাম্য, অ-বাঙালি (আরবীয়/পাকিস্তানি) হিশেবে। যার ফলে ইসলাম এদেশে কালচারাল ইনফেরিওরিটির চিহ্নে পরিণত হয়। শাহবাগের প্রতিষ্ঠিত এই রেটরিকই পরবর্তীতে মুসলমানদের এদেশে হত্যাযোগ্য করে তোলে। শাহবাগ সরাসরি অস্ত্র ধরেনি কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার পক্ষে নৈতিক বৈধতা উৎপাদন করেছে। শাপলা গণহত্যা, মোদি বিরোধী আন্দোলন, কোটা আন্দোলনসহ জনসাধারণের ন্যায্য সকল আন্দোলনকে দমনের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করেছে শাহবাগ। পাঠ্যবই, মিডিয়া, নাটক সর্বত্র শাহবাগ তার সেক্যুলার এন্থেটিক চাপিয়ে দিয়েছে। রাজাকার বললেই দাড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি পরা কোনো হুজুরের দৃশ্য আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। কিন্তু ৭১-এর প্রকৃত রাজাকারদের শরীরে ইসলামের কোনো চিহ্নই ছিল না। এভাবেই আধিপত্যবাদী শক্তি আমাদের চিন্তা-মননে অবচেতনভাবে আপন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
হাসিনার পতনের পর শাহবাগ টিকে আছে কারণ—শহুরে মিডিয়া এলিট, ইংরেজিভাষী এনজিও ডিসকোর্স, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা; এই তিনে মিলে শাহবাগ একপ্রকারের সংস্কৃতিগত একনায়কত্ব নির্মাণ করেছে এদেশে। যার মোকাবেলায় প্রয়োজন ধীশক্তিসম্পন্ন সাহসী মানুষের নিবিড়-নিমগ্ন কর্মতৎপরতা। শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি ছিলেন এই কর্মপ্রেরণার অন্যতম লড়াকু সৈনিক। যিনি তার শাহাদাতের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।
শহিদ ওসমান বিন হাদি ও ইনকিলাব মঞ্চ
পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ের পর এবং ১৮৫৭-এর সিপাহি বিপ্লবের পর ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের উপর সীমাহীন মুসিবত নাজিল হতে শুরু করে। মুসলমানদের জন্য ঈমান টিকিয়ে রাখাও দুষ্কর হয়ে যায়। ফরায়েজী আন্দোলন, আহমদ শাহ বেরেলভীর জিহাদি তৎপরতা, দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা, নওদাতুল উলামার স্থাপন, খেলাফত আন্দোলন, সিপাহী আন্দোলন ইত্যাদি মুসলমানদের প্রতিরোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মুসলমানরা সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল।
বিট্রিশ ভারতের ইতিহাসে অনেক কর্মবীর ব্যক্তিত্বদের আবির্ভাব হয়েছে, যারা মুসলমানদের হক ও দাবি আদায়ে নিজেদের সমস্ত কর্মপ্রেরণাকে উৎসর্গ করেছেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম একাই মুসলিম মানসের অসাধারণ প্রতিনিধিত্ব করেছেন। সাংস্কৃতিক ময়দানে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রাসঙ্গিক রাখার প্রচেষ্টা সহজ ছিল না। কারণ, একাজের জন্য গভীর প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আমরা পেয়েছি ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদসহ আরো অনেক অসাধারণ প্রতিভাকে।
সমস্যার গুরুতর দিকটি হচ্ছে, সাংস্কৃতিকভাবে বাঙালি মুসলমানের পরাজয়ের ব্যাপারটি খোদ মুসলমানদের কাছেই স্পষ্ট নয়! তারা ক্ষমতার বিভিন্ন পর্যায়ে এক্টিভিজম করছে কিন্তু সাংস্কৃতিক ময়দানকে কর্মযজ্ঞ হিশেবে বিবেচনা করছে না! কেন দুর্গা পূজা বাঙালি সংস্কৃতির সার্বজনীন উৎসবের স্বীকৃতি পাচ্ছে, সংস্কৃতির মর্যাদা পাচ্ছে কিন্তু শতকরা ৯০ জন মুসলমানের উৎসব ঈদ সংস্কৃতির মর্যাদা পাচ্ছে না, গোষ্ঠীগত উৎসবের তকমা পাচ্ছে, এ বিষয়ে মুসলমানরা ভাবুক হচ্ছে না! গান সাংস্কৃতিক উপকরণ কিন্তু কুরআন তিলাওয়াত নয়! শাড়ি, টিপ বাঙালি পোশাক কিন্তু বোরকা-টুপি-হিজাব নয়! এই বাইনারি আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আজও শক্তিশালীভাবে বলবৎ আছে।
মুসলমানদের এই সাংস্কৃতিক পরাজয়কে চিহ্নিত করতে পেরেছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা খুবই নগণ্য। যারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন, কিন্তু উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নিতে পেরেছেন এমন মানুষের সংখ্যা আরো নগণ্য। সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য অর্জনের কমতি থাকার কিছু কারণ হল: মুসলমানদের একটি বড় অংশ এদেশের সংস্কৃতিকে ওন করতে পারে না এবং ইসলাম ও মুসলমানী চিহ্নকে প্রাসঙ্গিকভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। আরেকটি সমস্যা হল, মুসলমানদের সাংস্কৃতিক তৎপরতায় অতি ইসলামী অবয়ব থাকায় শুরুতেই তা অপরায়নের রাজনীতিতে শ্রেণিভুক্ত হয়ে যায়। ফলে অন্যদের উৎসব বা সাংস্কৃতিক চর্চায় যে ভ্যালু সংযুক্ত হয়, মুসলমানের সাংস্কৃতিক চর্চায় তা অর্জিত হয় না এবং সাংস্কৃতিক মোকাবিলায় মুসলমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপূর্ণতা হল আধিপত্যবাদী শক্তিকে প্রতিরোধের মতো যথেষ্ট যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতাবোধ না থাকা। শতকরা ৯০ জন হয়েও কেন মুসলমানরা ১০০ জনের তৈরি সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে মোকাবেলা করতে পারে না, ওসমান হাদি বারংবার ইসলামপন্থীদের চিরায়ত সেই অযোগ্যতাকেই এজন্য দায়ী করেছেন।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে যায়, আওয়ামীলীগকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করা হয়, আন্দোলনাকারীদের নেতিবাচকভাবে মিডিয়া ফ্রেমিং, ন্যায্য দাবিকে মব হিশেবে চিহ্নিত করা, এজেন্সির সক্রিয় প্রচেষ্টায় ফ্যাসিবাদ ও গণবিরোধী সেক্যুলার আধিপত্যবাদী শক্তি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এসময় এমন একটি সাংস্কৃতিক প্লাটফর্মের প্রয়োজন ছিল যা শাহবাগ ও আধিপত্যবাদীদের তৎপরতাকে মোকাবিলা করবে। তবে, এধরণের প্রতিষ্ঠানকে আওয়ামের মাঝে সার্বজনীন করে তোলার জন্য সেক্যুলার অবয়ব ধরে রাখা জরুরি।
কালচারাল ফ্যাসিস্টদের আধিপত্য ও পক্ষপাতকে রুখে দেয়ার জন্য শরিফ ওসমান হাদি শুরু করেন তার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ইনকিলাব মঞ্চ। শরিফ ওসমান হাদির স্বপ্ন ছিল একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সূচনা করা। যেখানে এলিট-সেক্যুলার আধিপত্যবাদীদের রোষানলে চাপা পড়া বাঙলার আপামর জনসাধারণের কৃষ্টি-কালচারকে তুলে ধরা এবং একটি ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম করা।
শরিফ ওসমান হাদি কোনো ইসলামী বিপ্লব করতে চাননি। কারণ, ইসলামী বিপ্লবের জন্য বর্তমান বাঙালি মুসলমানদের কোনো প্রস্তুতি ও যোগ্যতা নেই বললেই চলে। দীর্ঘ সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ হয়ত একদিন সেই অবস্থায় উপনীত হবে ইনশাআল্লাহ। তবে ইসলামবান্ধবতার দিকে আমাদের ঝুঁকতে হবে। এজন্য শরিফ ওসমান হাদি ইনসাফভিত্তিক মুলুকিয়াতে বিশ্বাসী ছিলেন। প্রকৃতঅর্থে এটাই ইসলামী বিপ্লবের পূর্বশর্ত। ইনসাফের রাষ্ট্র কায়েম হলে ইসলাম তার আপন আদর্শ ও নীতির ভিত্তিতেই সকল মতবাদের উপর বিজয় অর্জন করবে। এজন্য ইসলামি বিপ্লবই যদি কারো কাছে একমাত্র আরাধ্য বিপ্লব হয়ে থাকে, তবে ওসমান হাদি ছিলেন সে পথেরই পথিক। আল্লাহ তাঁর প্রচেষ্টা কবুল করুন।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কিত সকল উপাদান নিগৃহীত অবস্থায় আছে। আধিপত্যবাদী শক্তি এটাকে আরো অবদমন করে রাখে। তারা ‘ও তে ওড়না’ বলাকে সমস্যাজনক মনে করে। দাড়ি-হিজাবকে প্রগতিশীলতার বিপরীত মনে করে, মাদরাসার ছাত্রদের পশ্চাৎপদ ও অযোগ্য মনে করে, কুরবানীকে তারা পশুর সাথে সহিংসতার উৎসব মনে করে, গরুর গোশত খাওয়াকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিশেবে বিবেচনা করে, আল্লাহু আকবর বলাকে জঙ্গিবাদের নারা মনে করে।
এভাবেই বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলমানী চিহ্নকে সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদীরা অবদমন করে রেখেছে এবং তাদের প্রভাববলয় এতটাই শক্তিশালী যে, কেউ যদি ইসলাম ও মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচারকে প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করে তাকেই মূলধারা থেকে অপ্রাসঙ্গিক বানিয়ে দেয়া হয়, মিডিয়া কাভারেজ দেয়া হয় না। শিল্প-সাহিত্য-কালচারের আলাপে তাকে/তাদের অচ্ছুত বানিয়ে রাখা হয়। নজরুল ইসলামকে অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা হয়েছে, তাকে যুগের সৃষ্টি হিশেবে তকমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার প্রতিভার প্রতাপ ও সাহিত্যের প্রবাদতুল্য অবদানের কারণে তাকে অপ্রাসঙ্গিক বানানোর প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ফররুখ এবং আল মাহমুদকে নিচে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তাদের যোগ্যতা ও অসামান্য কবিশক্তির কারণে তাদেরকে অস্বীকার করা সম্ভব হয়নি।
এই সত্য অনস্বীকার্য যে, যোগ্যতা ও গভীর অধ্যাবসায় ব্যতীত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে টিকে থাকার লড়াই সহজ নয় এবং নিখাদ ধর্মীয় অবয়বে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ১৯২০ সালের কলকাতায় কাজী নজরুল ইসলাম ও মুজফ্ফর আহ্মদ যখন এ কে ফজলুল হকের কাছে পত্রিকা করার নিয়ত নিয়ে সলা-পরামর্শ করতে গেলেন, ফজলুল হক চেয়েছিলেন পত্রিকার নামটি হোক মুসলমানি শব্দে। ‘হিন্দুরা তোমাদের কাগজ কিনবেন না। পক্ষান্তরে মুসলমানরাও বুঝতে পারবেন না যে কাগজখানা মুসলমানদের।’ মুজফ্ফর ও নজরুলের বুঝ ছিল আলাদা। তারা পত্রিকার নামে আলাদা করে মুসলমানি চিহ্ন প্রকটিত না করে, এমন নাম দিতে চেয়েছিলেন যেন দুই সম্প্রদায়ের গ্রাহকই পত্রিকা কেনেন। তখন তারা পত্রিকার নাম দিলেন ‘নবযুগ’।[2]https://www.prothomalo.com/onnoalo/prose/pqb02t7dtn
আমাদের মূলত প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান যা মানে ও গুণে আধিপত্যবাদীদের সমপর্যায়ের হবে এবং বাঙালি সংস্কৃতির সকল উপাদানকে আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে আধিপত্যবাদীদের অবদমনের শিকার ইসলাম ও মুসলমানী চিহ্নকে প্রাসঙ্গিক করবে। ওসমান হাদি তার ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে এমন কিছুই করার চেষ্টা করেছেন। মিডিয়ার অনেক ফ্রেমিং এবং আমাদের সাংস্কৃতিক জড়তাকে তিনি ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেছেন।
উদাহরণস্বরূপ, ইনকিলাব মঞ্চে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের নাম—কবিতার অক্ত। অক্ত আরবি শব্দ, অর্থ সময়। আমাদের সাংস্কৃতিক জড়তা হল আধিপত্যবাদীরা মুসলমান ও আরব বিষয়কে বর্বর ও বেদুঈন হিশেবে উপস্থাপন করে, এদের সাথে শিল্প-সাহিত্যের মতো কোমল বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই, এই তাদের প্রস্তাবনা! সেখানে ‘কবিতার অক্ত’ নামটা আমাদের সাংস্কৃতিক জড়তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়।
এরকম আরো উদাহরণ রয়েছে, যেমন ‘ফোক রাইত’। প্রমিতভাষী এলিট বাঙালি কি ‘রাইত’ শব্দটিকে গ্রহণ করতে পারবে? ‘জুলাই জমায়েত’, ‘বিক্ষুব্ধ আজাদী মিছিল’, ‘চাঁদ রাতে ঈদের মিছিল’, ‘শহীদ ও আহতের স্মরণে দোয়া ও গণইফতার’, ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহিদের কবর জেয়ারত ও ফাতেহা পাঠ’, ‘শবে বরাতের রাত্তিরে নাত, কবিতা ও গজলের মজমা: ঝরে আবে জমজম’, ‘জযবা জমায়েত’, ‘গণদোয়া ও মর্সিয়া মিছিল’, ‘মাওলিদ মিছিল’, ‘গণসিজদা ও দ্রোহের গান’। উল্লিখিত সকল কার্যক্রম আধিপত্যবাদীদের রেটরিক ও সাংস্কৃতিক জড়তাকে চ্যালেঞ্জ করে। পাশাপাশি নতুন ধরণের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিনির্মাণেও ওসমান হাদি তৎপর ছিলেন। তবে ওসমান হাদি সংগ্রামের যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। অজস্র বীর এ পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন। ওসমান হাদির মতো কর্মবীরদের মস্তিষ্ক আধিপত্যবাদীদের মাথাব্যথার কারণ। তবে আশংকার বিষয় হচ্ছে, ওসমান হাদিদের লড়াইকে যদি জাতি হিশেবে আমরা উপলব্ধি করতে না পারি, তাহলে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে নিরঙ্কুশ দাসত্ব যা কবি সীমান্ত শরিফ (ওসমান হাদি) নিজেই বলে গিয়েছেন,
দোহাই, শুধু মস্তিষ্কটা খেয়ো না আমার
তা হলে শীঘ্রই দাস হয়ে যাবে তোমরাও!
তথ্যসূত্র: