‘শাউয়া’ শব্দের রাজনীতি : ভাষা, ক্ষমতা ও লিঙ্গবোধের সংঘাত

অস্ট্রিক আর্যু

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে শব্দ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—শব্দ নিজেই হয়ে উঠেছে ক্ষমতার অস্ত্র। সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ সমাজ ও রাজনৈতিক কথাবার্তায় যে শব্দটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা হলো ‘শাউয়া’। এটি একটি প্রাচীন বাংলা শব্দ, যার অর্থ নারীর যোনী—অর্থাৎ সরাসরি নারীর দেহসংক্রান্ত একটি শব্দ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই শব্দটি কীভাবে হঠাৎ করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলো? এর ব্যবহার নিছক অশ্লীলতা, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীরতর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকেত?

প্রথমেই দেখে নিই, শব্দটি কেন রাজনীতির অংশ হলো?

রাজনীতিতে ভাষার ব্যবহার সবসময়ই কৌশলগত। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এক ধরনের তীব্র মেরুকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—ক্ষমতা বনাম প্রতিবাদ, পুরানপ্রজন্ম বনাম নতুনপ্রজন্ম, শাসক-ভাষা বনাম বিকল্প-ভাষা। ‘শাউয়া’ শব্দটি এই বিকল্প ভাষার এক চরম রূপ। নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর,  শহীদ ওসমান হাদির বদৌলতে এই শব্দটা এখন শুধু শব্দ হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছে রাজনীতির ভাষা।

এই শব্দটি ব্যবহার করে মূলত তিনটি কাজ করা হচ্ছে— ক্ষমতাকে অপমান করা; প্রচলিত ভদ্রতার ভাষাকে ভাঙা; রাজনীতিকে শক ভ্যালু দেওয়া।

যখন তরুণরা বা রাজনৈতিক কর্মীরা এই শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন তারা আসলে বলতে চাইছেন—‘তোমাদের শালীন ভাষা আমাদের ক্ষোভ প্রকাশে যথেষ্ট নয়।’

এই যে ভাষা ভাঙার রাজনীতি দেখা যাচ্ছে, এটাকে আমরা কী বলতে পারি? প্রতিবাদ না অবক্ষয়?

রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, যখন কোনো সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দমিত থাকে, তখন তার ভাষা ভদ্র থাকে না। ফরাসি বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার গণআন্দোলন কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার ছাত্র রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই অশ্লীল, শরীরী ও আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার দেখা গেছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাকপর্বে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের গ্রাফিতিতেও আমরা এর প্রভাব ভালোভাবেই লক্ষ করেছি।

‘শাউয়া’ শব্দের ব্যবহারও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এটি একধরনের লিঙ্গ-নিষিদ্ধ ভাষা ভাঙা, যেখানে সমাজের সবচেয়ে ‘ট্যাবু’ বিষয়টিকে এনে ফেলা হচ্ছে রাজনীতির মঞ্চে।

কিন্তু এখানেই দ্বন্দ্ব—এটি কি ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ? নাকি নারীর শরীরকে আবার রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রশ্নটি এখানেই। ‘শাউয়া’ শব্দটি সরাসরি নারীর দেহকে নির্দেশ করে। ফলে শব্দটির রাজনৈতিক ব্যবহারে একটি বড় নৈতিক সংকট তৈরি হয়।

একদিকে বলা হচ্ছে—‘এটা শুধু একটা শব্দ, ক্ষমতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’। অন্যদিকে নারীবাদী ও প্রগতিশীল চিন্তকরা প্রশ্ন তুলছেন—‘ক্ষমতাকে আঘাত করতে গিয়ে কেন বারবার নারীর দেহকেই অপমানের ভাষা বানানো হবে’?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর দেহ ঐতিহাসিকভাবেই প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে—কখনো ‘মা’, কখনো ‘ভূমি’, কখনো ‘ইজ্জত’। ‘শাউয়া’ শব্দটি সেই ধারাকে উল্টে দিলেও, সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারে না। বরং এটি নারীর শরীরকে নতুনভাবে রাজনৈতিক সংঘর্ষের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

তরুণদের ভাষা ও ডিজিটাল রাজনীতি আমাদেরকে নতুন একটা বাস্তবতায় নিয়ে এসেছে। এই শব্দের বিস্তারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব—এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে তরুণরা এমন ভাষা ব্যবহার করছে যা মূলধারার রাজনীতিতে আগে কল্পনাও করা যায়নি।

এটিকে অনেকে তিনভাবে দেখছেন—ডিজিটাল অরাজকতার ভাষা, এলিট রাজনীতির বিরুদ্ধে গ্রাসরুট বিদ্রোহ, মিম-রাজনীতির অংশ। ‘শাউয়া’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ এখানে অনেক সময় গৌণ, বরং প্রধান হয়ে ওঠে তার শক, ব্যঙ্গ ও অবমাননার ক্ষমতা।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই রাজনীতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

সম্ভাব্য কয়েকটি দিক স্পষ্ট—রাজনৈতিক ভাষা আরও রুক্ষ হবে, নৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হবে, নারীবাদ ও তরুণ রাজনীতির মধ্যে নতুন সংঘাত তৈরি হবে, সবচেয়ে বড় কথা, ‘শাউয়া’ শব্দের রাজনীতি আমাদের বাধ্য করছে ভাবতে—আমরা কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি চাই? ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কি আমরা নিজেরাই নতুন নিপীড়নের ভাষা তৈরি করছি?

‘শাউয়া’ শব্দটি নিছক একটি অশ্লীল শব্দ নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির এক গভীর অসন্তোষ, ক্ষোভ ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। এটি একদিকে যেমন ভাষার বিদ্রোহ, অপরদিকে নৈতিক প্রশ্নের বোধ। এই শব্দের রাজনীতি আমাদের শেখায়—ভাষা কখনো নিরপেক্ষ নয়। ভাষা দিয়ে যেমন মুক্তি আসে, তেমনি ভাষা দিয়ে নতুন শৃঙ্খল তৈরি হয়।

আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই প্রশ্নটা শুধু ক্ষমতার নয়—বরং প্রশ্ন হচ্ছে, ভাষার দায় কার?

 

২.

এখন পুরো বিষয়টাকে যদি আমরা দার্শনিক ভিত্তিতে—দুইজন বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকো ও আন্তোনিও গ্রামশির তাত্ত্বিক ফ্রেমে—দেখি, তাহলে কী দেখবো?

দেখবো তিনটি বিষয়—ভাষা, ক্ষমতা ও হেজেমনি।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ‘শাউয়া’ শব্দকে ঘিরে যে তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক অশ্লীলতা বনাম শালীনতার দ্বন্দ্ব নয়। এটি মূলত ভাষা ও ক্ষমতার সম্পর্ক, হেজেমনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এবং দেহকে রাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্দখলের প্রশ্ন। মিশেল ফুকো ও আন্তোনিও গ্রামশির তত্ত্ব ব্যবহার করলে এই বিতর্কের গভীর কাঠামো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ফুকোর মতে, ক্ষমতা শুধু দমন করে না—ক্ষমতা জ্ঞান উৎপাদন করে, এবং সেই জ্ঞানের মাধ্যমে ঠিক করে দেয় কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না। যৌনতা ফুকোর চিন্তায় একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন, আধুনিক সমাজে যৌনতা ‘নিষিদ্ধ’ বলে যতটা চিহ্নিত, বাস্তবে ততটাই নিয়ন্ত্রিত ও নিয়ন্ত্রক।

‘শাউয়া’ শব্দটি এই ফুকোয়ান ট্যাবু ভাঙার উদাহরণ।

বাংলাদেশের ভদ্র রাজনৈতিক ভাষা দীর্ঘদিন ধরে—যৌন শব্দ নিষিদ্ধ করেছে, নারীর দেহকে আড়াল করেছে, অথচ একই সঙ্গে নারীর শরীরকে নৈতিকতার প্রতীক বানিয়েছে। ফুকোর ভাষায়, এটি হলো ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার—যেখানে সমাজ নিজেই নিজেকে সেন্সর করে।

যখন তরুণরা বা রাজনৈতিক কর্মীরা ‘শাউয়া’ শব্দ ব্যবহার করে, তখন তারা আসলে বলছে—‘যে শব্দ তোমরা নিষিদ্ধ করেছ, সেটাকেই আমরা ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করব।’ এটি ফুকোর ভাষায় কাউন্টার ডিসকোর্স—অর্থাৎ, ক্ষমতার ভাষার বিরুদ্ধে বিকল্প ভাষা।

প্রশ্ন আসে, যৌন শব্দ কেন এত শক্তিশালী?

ফুকোর মতে, দেহ কখনোই নিরপেক্ষ নয়। দেহই হলো ক্ষমতার প্রথম ক্ষেত্র। নারীর যোনীসংক্রান্ত শব্দ সমাজে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রিত, কারণ—এটি জন্ম, যৌনতা ও ক্ষমতার উৎস, এবং একই সাথে এটি পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র।

‘শাউয়া’ শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার তাই কাকতালীয় নয়। এটি সেই জায়গায় আঘাত করে, যেখানে ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। কিন্তু এখানেই ফুকোয়ান দ্বন্দ্ব— ট্যাবু ভাঙা কি মুক্তি? নাকি ক্ষমতার ভাষাকেই পুনরুৎপাদন? ফুকো নিজেও সতর্ক করেন—সব ট্যাবু ভাঙা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্তিদায়ক নয়।

অপরদিকে, গ্রামশির হেজেমনি ও ‘ভদ্র ভাষার’ রাজনীতি একটু আলাদা কথা বলে।

গ্রামশির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো কালচারাল হেজেমনি। তিনি বলতে চান যে, ক্ষমতা টিকে থাকে শুধু পুলিশ বা সেনা দিয়ে নয়, বরং মানুষের সম্মতির মাধ্যমে। এই সম্মতির অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা ও সংস্কৃতি।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি ‘ভদ্র রাজনৈতিক ভাষা’ প্রতিষ্ঠিত—যেখানে ক্ষমতাসীনরা শালীন শব্দে কথা বলে, বিরোধিতাকে নৈতিকতার ভাষায় দমন করা হয়, অশ্লীলতাকে রাজনীতির বাইরে ঠেলে রাখা হয়। এই ভদ্র ভাষা আসলে এক ধরনের বুর্জোয়া মোরালিটি—যা ক্ষমতাকে স্বাভাবিক ও বিরোধিতাকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলে।

‘শাউয়া’ শব্দের ব্যবহার গ্রামশিয়ান দৃষ্টিতে একটি কাউন্টার-হেজেমনিক অ্যাক্ট। এটি বলে—‘তোমাদের শালীন ভাষাই আমাদের নিপীড়নের ঢাল।’ অর্থাৎ, শব্দটি ক্ষমতার সম্মতিমূলক সংস্কৃতিকে ভাঙার চেষ্টা।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এটি কি সাবঅল্টার্ন ভাষা, নাকি নতুন নিপীড়ন?

গ্রামশি বলেন, সাবঅল্টার্ন শ্রেণি নিজের ভাষা তৈরি করে, কারণ শাসক শ্রেণির ভাষায় তাদের অভিজ্ঞতা ধরা পড়ে না।

এই অর্থে ‘শাউয়া’ শব্দ—প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির বাইরে জন্ম নেয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়ায়, তরুণদের ক্ষোভের ভাষা হয়ে ওঠে। কিন্তু গ্রামশির তত্ত্বেই আরেকটি সতর্কতা আছে—সাবঅল্টার্ন ভাষা যদি নিজেই অন্য সাবঅল্টার্নকে নিপীড়ন করে, তবে তা মুক্তিদায়ক থাকে না।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—নারীর শরীরকে অপমানের প্রতীকে রূপান্তর কি সত্যিই হেজেমনিবিরোধী? নাকি এটি পিতৃতান্ত্রিক ভাষাকেই আরও শক্তিশালী করছে?

নারীর দেহ নিয়ে ফুকো ও গ্রামশির মিলনবিন্দুটা কোথায় তা দেখা যাক। ফুকোর কাছে নারীর দেহ নিয়ন্ত্রণের বস্তু, গ্রামশির কাছে নারীর দেহ সাংস্কৃতিক সম্মতির প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর দেহ কখনো ‘মা’, কখনো ‘ইজ্জত’, কখনো ‘জাতির সম্মান’। ‘শাউয়া’ শব্দ সেই সম্মানজনক প্রতীক ভেঙে দেয়, কিন্তু পুরো কাঠামো ভাঙে না। বরং নারীর দেহকে আবার পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংঘর্ষের ময়দানে ফেলে। এখানেই শব্দটির রাজনীতি দ্বিমুখী—একদিকে হেজেমনি ভাঙার চেষ্টা, অন্যদিকে নতুন ভাষিক সহিংসতা।

এখন কথা হচ্ছে, এটা কি ভাষার মুক্তি না ভাষার ফাঁদ?

ফুকো আমাদের শেখান—ক্ষমতা সর্বত্র, এমনকি বিদ্রোহী ভাষার মধ্যেও। গ্রামশি আমাদের সতর্ক করেন—হেজেমনির বিরুদ্ধে লড়াই মানেই নৈতিকভাবে মুক্ত হওয়া নয়।

‘শাউয়া’ শব্দের রাজনীতি তাই এক ধরনের বিদ্রোহ—এখন কেউ কেউ এটিকে অসম্পূর্ণ বিদ্রোহও বলতে পারেন; কিন্তু এটা তো সত্য যে, এটি ক্ষমতার ভদ্র মুখোশ খুলে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে নারীর দেহকে পুনরায় রাজনৈতিক অস্ত্রও বানায়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে প্রকৃত প্রশ্ন তাই শব্দটি নয়। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন একটি বিকল্প রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করতে পারব, যা একই সঙ্গে ক্ষমতাবিরোধী এবং নিপীড়নমুক্ত? এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের রাজনীতির ভাষা নির্ধারণ করবে।

বিজ্ঞাপন

guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Syed
Syed
2 months ago

বাবারে বাবা এমন পর্যালোচনাও হয়!!!!!

Etangir khandaker
Etangir khandaker
1 month ago

vah khub vhalo likhechen vhai

তাজুল ইসলাম
তাজুল ইসলাম
30 days ago

এটাই পাওয়ার অফ উসমান হাদি, তার মুখে উচ্চারিত একটা শব্দই যেখানে এতো বিশাল তাত্ত্বিক আলোচনার জন্ম দেয়। ‘শারাল পুত’ বলে গালি দিলে তখন এই লৈঙ্গিক আলোচনা যাই কই?