কবি ফররুখকে বারবার ‘দাবিয়ে রাখা’র রাজনীতিটা কী এবং কেন

অস্ট্রিক আর্যু

ফররুখের একটা অগ্রন্থিত কবিতা ছিল, পরে অবশ্য সেটি গ্রন্থভুক্ত হয়, তার ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’য় আছে, কবিতাটির শিরোনাম ‘জালিম ও জুলুম’; তো সেখানে কবি বলেন, “ঐ দেখ, সেই ঘৃণা, সেই ঘনায়িত ধোঁয়া, সে লেলিহ মানবতা ক্ষুধাতুর বিষাক্ত প্রভাতে, মাথা তোলে জুলুমের ফাঁদে”।

হ্যাঁ, ‘সেই ঘৃণা, সেই ঘনায়িত ধোঁয়া আর জুলুমের ফাঁদে’ই বারবার পড়েছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। কিন্তু কেন?

ফররুখকে তিন তিনবার দাবিয়ে রাখা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে একবার আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দুইবার। তো সেটা কীভাবে?

কবি ফররুখ আহমদ [১৯১৮–১৯৭৪] ছিলেন একাধারে বাংলা ভাষার মুসলিম কবিতা ধারার অন্যতম প্রধান কবি এবং রাজনৈতিকভাবে একটি জটিল সময়ে অবস্থান করা চিন্তাশীল ব্যক্তি। পাকিস্তান আমলে তাঁকে মূল্যায়ন করা হয়েছিল আংশিকভাবে; কিন্তু শর্তসাপেক্ষে। তো, কী সেই শর্ত?

ফররুখ যদিও ইসলাম-ভিত্তিক চেতনার কবি ছিলেন, কিন্তু অন্ধ-পাকিস্তানপন্থী ছিলেন না।

পাকিস্তান রাষ্ট্র যখন ক্রমে উর্দু-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক একচেটিয়াকরণ শুরু করল, তখন ফররুখ তাঁর কবিতায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে অবস্থান নিতে থাকেন। এই জায়গায় এসে সরকার তাঁকে আর ‘প্রচারযোগ্য’ মনে করেনি। অর্থাৎ এখান থেকেই তাঁকে দাবিয়ে রাখার শুরু। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকের পর, তাঁকে ধীরে ধীরে প্রান্তিক করা হয়— সরকারি বৃত্তিতে, মিডিয়ায়, সাহিত্য আলোচনায়।

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ফররুখ আহমদ সরাসরি অংশ নেননি সত্যি, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন; তবু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাঁকে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়, কারণ পাকিস্তান আমলে তিনি ইসলামিক কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এই ভুল ধারণাটাই তাঁকে দীর্ঘদিন প্রাপ্য মর্যাদা থেকে দূরে রাখে।

এখন প্রশ্ন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে কবি ফররুখ আহমদের পুনর্মূল্যায়ন কীভাবে হলো?

একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে ওঠে নতুন রাষ্ট্রচেতনার মূলভিত্তি। এই নতুন আদর্শের চোখে ফররুখ আহমদের ‘ইসলামী কবি’ পরিচয়টা একধরনের সন্দেহ বা বিতর্কের জায়গায় পড়েছিল। ফলে ৭০-এর দশকে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয়, পাঠ্যপুস্তক, সরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্য ইতিহাসে তাঁর স্থান অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত করা হয়।

তো, কেন তাঁকে ভুলভাবে ‘পাকিস্তানপন্থী’ বলা হলো?

পাকিস্তান আমলে ফররুখকে ‘ইসলামী আদর্শের কবি’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল—স্বাধীনতার পর সেই ট্যাগটাই তাঁকে বিপদে ফেলে। অনেকেই ভুল করে ধরে নেয়, তিনি নাকি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে, ফররুখ আহমদ ইসলামকে রাজনীতির হাতিয়ার নয়, নৈতিক ও মানবিক জাগরণের উৎস হিসেবে দেখেছিলেন।

সাংস্কৃতিক রাজনীতির কারণে তাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। স্বাধীনতার পর সাহিত্য ইতিহাস রচনায় একটি ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক পক্ষপাত কাজ করে—যেখানে ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহৃত কবিদের যেমন ফররুখ, গোলাম মোস্তফা বা আরেকটু এগিয়ে আহসান হাবীবের মতো কবিদেরও গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। উল্টোদিকে আধুনিকতাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ কবিদের যেমন শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে ফররুখ আহমদ হয়ে পড়েন একপ্রকার ‘অস্বস্তিকর প্রতীক’—যিনি একদিকে মুসলিম কবি, অন্যদিকে গভীর বাঙালি।

তো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই যেমন তাঁকে দাবিয়ে রাখা হয় ঠিক অমন করে দাবিয়ে রাখা হয় ফ্যাসিবাদী হাসিনা রেজিমের পুরো সময় জুড়ে।

২৪–এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলা ভাষার মুসলিম আধুনিকতার অনন্য প্রতিনিধি কবি ফররুখকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা শুরু হয়েছে।

পুনর্মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, ফররুখের কবিতা কেবল ধর্মীয় নয়, বরং উপনিবেশ-উত্তর মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। এখন অবশ্য ফররুখ আহমদকে ‘দ্বৈত চেতনার কবি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে—একদিকে ইসলামী ঐতিহ্যের মানবতাবাদ, অন্যদিকে বাংলা জাতিসত্তার কাব্যিক প্রকাশ। ফররুখ আহমদকে পাকিস্তান আমলে ‘ইসলামী কবি’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল; আর স্বাধীন বাংলাদেশে ‘ধর্মীয় কবি’ বলে অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণিত হয়েছেন যে, তিনি হলেন বাংলা ভাষার কবিতায় ইসলামী চেতনা ও মানবতাবাদের এক অনন্য কণ্ঠ।

কবি ফররুখ আহমদকে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ‘দাবিয়ে রাখা’ বা ‘অবমূল্যায়ন করা’র পেছনে কেবল তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নয়, বরং একটি জটিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক প্রেক্ষাপট কাজ করেছে। ফররুখ আহমদ মূলত সক্রিয় ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগ, পাকিস্তান যুগ ও স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর সময়টায়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ইসলামী ভাবধারার একজন প্রতীক। তাঁর কবিতায় ইসলাম, ন্যায়ের প্রতিরোধ, আত্মমর্যাদা, উপনিবেশ-বিদ্বেষ ও মানবতাবোধের বিষয় বারবার উঠে এসেছে। উপরের এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই তাঁর আদর্শিক অবস্থান বুঝতে হবে। সে সময়টা ছিল ইসলামি চেতনা বনাম ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের একটা বহুমাত্রিক লড়াই। বাংলাদেশের সাহিত্য-রাজনীতি বুঝতে হলে এই দিকটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রচেতনা ও সাহিত্যচেতনা দ্রুত “ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী বাঙালি পরিচয়”–এর দিকে মোড় নেয়।

অন্যদিকে ফররুখ আহমদ ছিলেন ইসলামী পুনর্জাগরণের কণ্ঠস্বর, মুসলিম ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার কবি, এবং পাকিস্তান-পূর্বকালীন মুসলিম রেনেসাঁর ধারার উত্তরসূরি; অনেকটা আকরাম খাঁ, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের মতো। তো, এই অবস্থান তাঁকে বাংলাদেশের নতুন জাতিরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মূলধারা থেকে কিছুটা আলাদা করে দেয়।

রাজনৈতিক অভিঘাত শুরু হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানপন্থার অভিযোগ উঠে আসে; যদিও ফররুখ আহমদ সরাসরি রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তবে তিনি পাকিস্তানকে মুসলিম জাতিসত্তার প্রতিফলন হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি ইসলামি ঐক্যের ধারণায় বিশ্বাস করতেন। অনেক লেখায় পাকিস্তানকে মুসলিম বিশ্বের আশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন ‘পাকিস্তানবিরোধী’ জাতীয়তাবাদকে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করে, তখন ফররুখের মতো মুসলিম আইডেন্টিটি-ভিত্তিক কবিদের ওপর ‘পাকিস্তানপন্থী’ বা ‘ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল’ তকমা আরোপ হয়। ফলে তাঁর নাম পাঠ্যক্রম, সাহিত্যচর্চা ও মূলধারার মিডিয়া আলোচনায় দীর্ঘদিন প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

তখন সাহিত্যরাজনীতিটা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে; একভাগে ‘প্রগতিশীল’, অন্য ভাগে ‘আধ্যাত্মিক’। বাংলা সাহিত্যে ষাট ও সত্তরের দশকে বামপন্থী বা মার্ক্সবাদী লেখকগোষ্ঠী অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিল। তারা মানবমুক্তি, শ্রেণিসংগ্রাম, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজবদলের কণ্ঠস্বর বহন করত। ফররুখের কবিতা, যেখানে আধ্যাত্মিকতা, ইসলামি নৈতিকতা ও ‘ঈশ্বরকেন্দ্রিক মানবতাবাদ’ প্রকাশ পেত, সেই চেতনা তাদের চোখে ছিল রক্ষণশীল ও পশ্চাৎপদ। ফলে তিনি ‘প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলন’–এর কেন্দ্রে জায়গা পাননি।

পাকিস্তান  হওয়ার পরের এক-দেড় দশকজুড়ে ছিল রাষ্ট্রীয় নীরবতা। ফররুখ আহমদের কবিতা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেওয়া হয়, সাহিত্য একাডেমিক আলোচনায় তাঁর নাম উল্লেখ করা হয় না, রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বা সম্মানও দীর্ঘদিন তাঁকে এড়িয়ে চলে। এই বর্জনের পেছনে এক ধরনের আদর্শিক হেজিমনি কাজ করছিল—‘বাঙালি মানেই ধর্মনিরপেক্ষ’, এমন ধারণাকে একমাত্র বৈধ রূপ দিতে চাওয়া। কেবল মুসলিম বলেই নয়—‘অন্যধর্মী বাঙালিত্বের’ কারণে। তাঁকে শুধু মুসলিম বলেই নয়, একটি বিকল্প বাঙালিত্বের ধারক বলেই দাবিয়ে রাখা হয়েছিল। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, “একজন বাঙালি একই সঙ্গে মুসলমান ও বিশ্বমানব হতে পারে, এবং এই তিন পরিচয় একে অন্যের বিপরীতে নয়।” এই ধারণা তখনকার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।

আশির দশক থেকে শুরু হয় ফররুখ আহমদের পুনর্মূল্যায়ন। ইসলামী সাহিত্য আন্দোলনের উত্থান, তখন থেকে শুরু হয় জাতীয় পরিচয়ের পুনঃআলোচনা, এবং সাহিত্যে বহুমাত্রিকতার চর্চা—এসবের ফলে তাঁর প্রতি আগ্রহ ফিরে আসে।

ফররুখ এখন বাংলাদেশের একজন ক্লাসিক কবি, যদিও এখনো পুরোপুরি ‘মেইনস্ট্রিম স্বীকৃতি’ পান নাই তিনি। তাঁকে বরং সেই স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments