ভূমিকা
প্রজন্মের লালনপালনের ক্ষেত্রে শিশুসাহিত্যের গুরুত্ব অপরিসীম। শিশুসাহিত্য স্বতন্ত্র একটি ক্ষেত্র, যা বিষয়বস্তু, গঠনতন্ত্র ও উপস্থাপনের বিবেচনায় সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে আলাদা। এটা সহজ কোনো বিষয় নয়। দেখা গেছে, অনেক দক্ষ সাহিত্যিকও এ অঙ্গনে এসে কার্যকরী হতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের জায়গাটা হলো শিশুদের মনস্তত্ত্ব, তাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও উপলব্ধিগত পর্যায় নিরূপণ এবং সে অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার।
বিশ শতকে ইসলামি সাহিত্য-অঙ্গনে সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবি ছিলেন একজন প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। লেখালেখির ক্ষেত্রে তার পূর্ণতার অন্যতম একটি দিক হচ্ছে, তিনি ভারী ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো যথাযথ ভাষায় উম্মাহর সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, আবার একই সাথে শিশুসাহিত্যের মতো বিশেষ অঙ্গনেও রেখেছেন কার্যকরী অবদান। পাঠক তার ‘মা যা খাসিরাল আলাম’-এর মতো গ্রন্থে যেমন পূর্ণদীপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিকতার ছাপ দেখতে পান, তেমনি ‘কাসাসুন নাবিয়্যিন’ গ্রন্থে দেখতে পান শিশুর মনন উপযোগী যথাযথ ভাষা। চিন্তামূলক লেখাজোখায় যেমন তিনি তৎপর ছিলেন, শিশুসাহিত্যেও তার এ তৎপরতা লক্ষণীয়। পশ্চিমা আধুনিকতার ঘূর্ণাবর্তে মুসলিম যুবকদের সঠিক পথের দিশা দিতে যেমন তিনি সচেষ্ট ছিলেন, তার সমান গুরুত্ব ছিল শিশুদের প্রতিও। জীবনভর তার সজাগ দৃষ্টি ছিল, যেন মুসলিম শিশুরা সঠিক ইসলামি বিশ্বাস ধারণ করে নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
শিশুসাহিত্যের স্বরূপ
প্রখ্যাত আরব সাহিত্যিক নজিব কিলানি ‘ইসলামি শিশুসাহিত্য’কে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে: তা ‘সাহিত্যের সুন্দরতম প্রকাশ, যা অর্থ ও অনুপ্রেরণায় সত্যযোগ্য প্রভাব ফেলে; ইসলাম ধর্মের নীতি, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস দ্বারা অনুপ্রাণিত করে। এর মাধ্যমে শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং প্রেরণা ও আচরণগত দিক থেকে শিশু-গঠনের ভিত্তি তৈরি হয়। পাশাপাশি তা ধর্মজ্ঞান, শিক্ষাতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে সাব্যস্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে।’
এর ভিত্তিতে শিশুসাহিত্য হবে এমন, যা ইসলামি সাহিত্যের সমৃদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। প্রায়োগিক থেকে বলতে গেলে, কুরআনুল কারিমে এমন অনেক বিষয় আছে, যাকে শিশুদের উপযুক্ত করে উপস্থাপন করা যায়। পাশাপাশি নবিজির সিরাত, সাহাবিদের জীবনীও এ সাহিত্যকর্মের আওতায় আসবে, বিশেষত যখন সেগুলো গল্প আকারে উপস্থাপনযোগ্য। তাদের ঘটনাগুলোর বাস্তববাদী দিককে যদি যথপোযুক্ত ভাষায় বর্ণনা করা যায়, তবে তা শিশুদের মানসিকতার ওপর অর্থপূর্ণ প্রভাব ফেলবে এবং আচরণ ও চারিত্রিক দিককে শোভিত করবে।
শিশুসাহিত্যে নদবির রচিত গ্রন্থগুলো
শায়খ আবুল হাসান আলি নদবি শিশুসাহিত্যের এ বিস্তৃত পরিসরকে সামনে রেখে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার প্রত্যেকটিতেই যথেষ্ট নৈপুণ্য দেখান। এ ক্ষেত্রে তার প্রথম রচনা ‘কাসাসুন নাবিয়্যিন’ সিরিজের পাঁচটি বই। এতে তিনি একই শব্দের পুনরাবৃত্তি, সহজ প্রকাশভঙ্গি এবং গাল্পিক ধারা অবলম্বন করেন, যা শিশুদের উপলব্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথমত এ বইটি তিনি লেখেন নিজ ভাতিজা মুহাম্মাদ হাসানির জন্য। বইয়ের ভূমিকায় তিনি বলেন, ‘প্রিয় ভাতিজা! গল্প-কাহিনীর প্রতি তোমার গভীর আগ্রহ লক্ষ করছি, কিন্তু আমার আফসোস যে, আমি তোমার কচি হাতে জীবজন্তুর কল্প-কাহিনী ছাড়া আর কিছু দেখি না। অবশ্য এর জন্য আমরাই দায়ী। ইতিমধ্যেই তুমি আরবি ভাষা শিখতে শুরু করেছ। আরবি কুরআনের ভাষা, রাসুলের ভাষা, দীনের ভাষা। আর আরবি ভাষা অধ্যয়নে তোমার মাঝে আমি গভীর আগ্রহ লক্ষ করছি। কিন্তু এ কথা ভেবে আমি লজ্জা বোধ করি যে, তুমি জীবজন্তুর কল্প-কাহিনী ব্যতীত তোমার বয়স উপযোগী কোনো আরবি কাহিনী পাও না। তাই আমি তোমার জন্য এবং তোমার সমবয়সি মুসলিম শিশুদের জন্য সহজ ও শিশুতোষ শৈলীতে নবি-রাসুলদের কাহিনী সংকলনের সংকল্প করেছি। এই কাহিনী সংকলনে আমি শিশুশৈলী ও তাদের স্বভাবের অনুসরণ করেছি। তাই আমি শব্দ ও বাক্যের পুনরোক্তি, শব্দের সহজতা এবং কাহিনীর বিস্তৃতির শরণাপন্ন হয়েছি ।’
এ ছাড়া অন্য একটি স্থানে তিনি তার গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন এভাবে:
ক. শিশুদের ভাষাগত পরিধি সামান্য হলেও যখন একটি শব্দ ও বাক্যকে পুনরাবৃত্তি করা হয়, তখন সেটা মনের মধ্যে খোদিত হয়।
খ. ঘটনার বর্ণনার সাথে কুরআনের আয়াতের ব্যবহার, যা অনেকটা আংটির মধ্যে পাথর খোদাইয়ের মতো।
গ. ইসলামের মৌলিক আকিদাসমূহের এমনভাবে উপস্থাপন, যাতে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেটা বিশ্বাস করে নেয়।
ঘ. সরল ভাষায় গল্পের উপস্থাপন। এর মাধ্যমে শিশুদের কাছে কুফরি ও পাপকে ঘৃণ্য করে তোলা এবং ঈমান ও আকিদাকে প্রিয়তর করে তোলা, নবিদের মাহাত্ম্য তুলে ধরা। যাতে সহজেই তারা এই বিষয়গুলো ধারণ করতে পারে।
তাঁর এ গ্রন্থটি ভারত উপমহাদেশসহ আরবের অনেক দেশে পাঠ্যবই হিসেবে শিক্ষা সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর তিনি তিন খণ্ডে ‘আল-কিরাআতুর রাশিদা’ রচনা করেন। এখানে তার ভাষামান ‘কাসাসুন নাবিয়্যিন’ থেকে আরও উঁচুমানের। যেহেতু তা নিম্ন-মাধ্যমিক ছাত্রদের পাঠক্রম হিসেবে প্রণীত। ‘আল-কিরাআতুর রাশিদা’ মোটামুটি আটটি ঘরানার লিখন-সমষ্টি। সেগুলো হচ্ছে গল্প, জীবনী, কথোপকথন, প্রবন্ধ, ভ্রমণ-সাহিত্য, উপলব্ধি, উপদেশ ও কবিতা। এখানে তার ভাষা ছিল ধর্মীয়-সাহিত্যের অনুবর্তী, যা কুরআন-সুন্নাহর বাক্যকাঠামো থেকে চয়ন করে সহজ ভঙ্গিতে আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি প্রাথমিক ছাত্রদের সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা-পদ্ধতির সাথে পরিচিত করিয়েছেন এবং একইভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়েও অবগত করেছেন।
এ ধারায় তার আরেকটি গ্রন্থ হলো ‘কাসাস মিনাত তারিখিল ইসলামি’। এখানে তিনি আঠারো জন মুসলিম ব্যক্তিত্বের কাহিনী নিয়ে আসেন এবং তাদের ঘটনাগুলো আকর্ষণীয় ও সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেন। এ বইয়ের প্রত্যেকটি ঘটনাই এমন যে, তার মাধ্যমে শিশুরা নৈতিক ধর্মীয় শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস অর্জন করতে পারবে।
শিশুসাহিত্যে নদবির দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামি শিশুসাহিত্যে শায়খ নদবি ছিলেন পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। ইসলামি শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দান করেন এবং নিজস্ব রচনা পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তার মতে শিশুসাহিত্য ‘আদাবুত তারবিয়াহ’ বা ‘শিশু-প্রতিপালন সাহিত্য’। এ সাহিত্যের মাধ্যমে শিশুরা গঠনতান্ত্রিকভাবে ইসলামি শিক্ষার ওপর বেড়ে উঠবে। আমরা যদি শিশুদের জন্য তার রচিত গ্রন্থগুলোতে দৃষ্টিপাত করি, দেখতে পাই যে তিনি সেখানে ঈমান-আকিদার পাঠগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছেন প্রতিটি অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে; চাই সে অধ্যায় ও পরিচ্ছেদগুলো হোক মহাজাগতিক, প্রাকৃতিক, বৈজ্ঞানিক বা প্রাণীজগতের কোনো বিষয় কেন্দ্র করে। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণরূপে সতর্ক ছিলেন, যেন তার বইটি নিছক ‘ধর্মীয় বই’ না হয়ে যায়। তাই তিনি ঋদ্ধ ভাষা, শৈল্পিক ভঙ্গিমা ও উঁচুমানের সাহিত্যরীতি ব্যবহার করেন। আর এভাবে এক উৎকৃষ্ট সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে একজন শিশু পাঠক ধর্মীয় বিষয়গুলোও আত্মস্থ করতে পারে। সর্বোপরি এ সাহিত্য হয় বিনির্মাণ ও প্রতিরক্ষার সাহিত্য, যার করকমলে শিশু যুগপৎ প্রতিপালিত হতে পারে। বিনির্মাণ এ দিক থেকে, এ সাহিত্যপাঠের মাধ্যমে তার ভাষাগত দক্ষতা অর্জন হয়, ইসলামিক নৈতিকতার মাধ্যমে নিজেকে সজ্জিত করতে পারে, আল্লাহ ও রাসুলের ভালোবাসায় বেড়ে ওঠে এবং ইসলামের ইতিহাস-ঐতিহ্য লালন করতে শেখে। আর প্রতিরক্ষা এদিক থেকে যে, তার মাধ্যমে সে কুফর, শিরক ও পাপের প্রতি দ্ব্যর্থহীন ঘৃণা নিয়ে বেড়ে ওঠে। এভাবে শায়খ নদবির ইসলামি শিশুসাহিত্য খারাপ নৈতিকতা, কলুষিত বিশ্বাস ও মিথ্যা প্রবণতা থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি সঠিক মুসলিম ব্যক্তিত্ব হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি রাখতেন অর্থাৎ তিনি লেখালেখির ক্ষেত্রকে একমুখি করে রাখার সমর্থক না। শিশুসাহিত্য নিয়ে তিনি যেসব গ্রন্থ লিখেছেন সেগুলো নিছক গল্পের না; বরং সেখানে আছে প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কবিতা, কল্পকথা, উপদেশ ও কথোপকথন। গল্পের ক্ষেত্রেও তিনি নিছক গাল্পিক কাঠামোর পেছনে পড়ে থাকেননি। সেখানে কুরআনের আয়াত, হাদিস, কথোপকথন ও কবিতা এনেছেন। বিষয়টি শায়খ নদবির সুউচ্চ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি শিশুসাহিত্যকেও সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় সমৃদ্ধ করতে প্রয়াসী ছিলেন।
তিনি এ সাহিত্যের মাধ্যমে শিশুদের ইসলামি শিক্ষায় ধর্মীয়ভাবে লালনপালন করতে চেয়েছিলেন, যা তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে, তার মধ্যে উচ্চ আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চার করবে। তিনি তার লেখনীতে এবং সভা-সম্মেলনের বিভিন্ন বক্তৃতায় প্রচলিত ধর্মহীন সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনা করেন এবং তার শিকড়কে উপড়ে ফেলে বিপরীতে ইসলামি সাহিত্যের প্রসার ঘটানোর প্রস্তাবনা হাজির করেন। তিনি তার বন্ধুবান্ধব ও সুহৃদদের এ ক্ষেত্রে বৈষয়িক একটি পাঠক্রম প্রণয়ন করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।
শিশুসাহিত্যে তার শৈল্পিক রীতি
শিশুসাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে, তা কতটুকু শিশু-উপযোগী হলো, শিশু-মনস্তত্ত্বকে কতটুকু ধারণ করতে পারল—সে বিষয়টি। সুতরাং তাতে ধর্মীয়, নৈতিক ও আদর্শিক বিষয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন শৈলী অবলম্বন করতে হবে, যা তাদের মনোভাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি এরকম না হয়, তাহলে সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বরঞ্চ কখনো সেটা তাদের বি-রুচির কারণ হবে। তাই শায়খ নদবি এ ক্ষেত্রে তাদের অবস্থা বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
তিনি মনে করেন, শিশুসাহিত্যের শৈলী হবে সহজ। তার ভাষা হবে অনায়াস, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তার বাক্যগুলো হবে ছোট, সংক্ষিপ্ত ও সরল। তবে তিনি শিশুদের স্বাভাবিক বৌদ্ধিক ও ভাষাগত বিকাশকে উপেক্ষা করবেন না, যার কারণে লেখককে সহজ বাক্য ব্যবহার থেকে ক্রমান্বয়ে কাঠিন্যের দিকে যেতে হবে। আমরা যদি তাঁর রচিত ‘কাসাসুন নাবিয়্যিন’ ও ‘আল-কিরাআতুর রাশিদা’র প্রথম ও শেষ খণ্ডে দৃষ্টিপাত করি, তবে এ ক্রমান্বয়িক ধারাটি লক্ষ করব।
তিনি মনে করেন, শিশুসাহিত্যের শৈল্পিক ভিত্তি হচ্ছে শিশুদের প্রকৃতি অনুকরণ। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি তার গ্রন্থগুলোতে দৃষ্টিপাত করি, তবে কয়েকটি বিষয় ধরা পড়বে। সেগুলো হচ্ছে:
১. আকর্ষণীয় ভূমিকা তৈরি: যেমন একটি প্রশ্নবোধক বাক্যের মাধ্যমে আলোচনা শুরু করা—‘তোমরা কি এমন জাহাজ সম্পর্কে শুনেছ, যা মাটির ওপরও চলতে পারে? যদি কেউ তোমাদের এ ব্যাপারে বলে, তাহলে বিশ্বাস করবে…।’ অথবা শিশুকে পূর্ববর্তী ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া—‘অনেক অনেক দিন আগের কথা, কোনো এক গ্রামে আজর নামে খুব প্রসিদ্ধ একজন লোক বাস করত…।’ অথবা সম্বোধনমূলক শব্দ ব্যবহার করা—‘তোমরা ছবিতে একটা মসজিদ দেখতে পাচ্ছ, এটা মসজিদে নববি। এ মসজিদ সম্পর্কে তোমরা জানতে চাও…।’
২. সংক্ষিপ্ত বাক্যের ব্যবহার এবং সময়ে সময়ে তার পুনরাবৃত্তি: এর উদাহরণ হচ্ছে, ‘ইয়াকুব আ. স্বপরিবারে মিসর অভিমুখে রওয়ানা হলেন। কেননা ইউসুফ ইবনে ইয়াকুব হলেন মিসরের শাসনকর্তা। সেখানে তার আদেশ-নিষেধ কার্যকর হয়। বিপরীতে তার পরিবার কেনানে মেষ চরায়, আর মেষের দুধ ও পশম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। যেখানে ইউসুফের দাস-দাসী ও চাকর-বাকররা মিসরে ভোগ-বিলাসে জীবনযাপন করে, এমতাবস্থায় তাদের কেনানে থাকার ফায়দা কী? মিসর আসতে বাধা কোথায়…।’ এভাবে অনেক ক্ষেত্রে এক বাক্য একাধিকবার ব্যবহার করেন—‘এক গ্রামে একটি ঘর ছিল, অনেক বড় ঘর। এ ঘরে ছিল মূর্তি, বড় বড় মূর্তি…।’
৩. একাধিক সম্বোধন পদ্ধতি: এমনভাবে তিনি সম্বোধন করেন যেন তিনি তার সামনে উপস্থিত থাকা একটি শিশুর সাথে কথা বলছেন, তার সাথে একসঙ্গে চলছেন, তার অনুভব-উপলব্ধির সাথে পরিভ্রমণ করছেন। ফলে তাকে কখনো প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন, কখনো তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, কখনো কোনো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করছেন। এসবই একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায়। ফলে একজন শিশুর পক্ষে তার গ্রন্থগুলো পাঠ করা জীবন্ত হয়ে উঠছে।
সাফল্যের স্বীকৃতি
শিশুসাহিত্যে শায়খ আবুল হাসান আলি নদবির রচিত গ্রন্থগুলো প্রভাবশালী। তা পাঠ করার মাধ্যমে শিশুদের মনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রখ্যাত ভারতীয় আলেম আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদি তার কাসাসুন নাবিয়্যিন গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, ‘তা শিশুদের তাওহিদ শেখার নতুন একটি জ্ঞানমাধ্যম।’ সাইয়েদ কুতুবও এ গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘আমি শিশুতোষ অনেক বই পড়েছি, যার মধ্যে নবিদের গল্প-সংবলিত গ্রন্থও আছে। পাশাপাশি মিসরে শিশুদের জন্য ধর্মীয় গল্পের একটি প্রকল্পে অংশগ্রহণও করেছি। কোনো ধরনের কৃত্রিমতা ছাড়াই বলছি, এ ক্ষেত্রে সাইয়েদ আবুল হাসান আলির কাজ পূর্বের সবগুলো কাজকে ছাপিয়ে গেছে। এতে আছে গল্পের সহজ-স্পষ্ট বর্ণনা, নানা ধরনের দিকনির্দেশনা, ধর্মীয় শিক্ষা, ঈমানি দীক্ষা, যা সহজেই শিশুর মন দখল করে নেবে।’