‘ইতিহাসের অংশ হতে পারাটাতো যেকোনো আর্টিস্টের জন্যই একটা বড় পাওয়া’ —আসাদ

অস্ট্রিক আর্যু

অস্ট্রিক আর্যু 

জুলাই আবার ফিরে এলো আমাদের মাঝে। যে জুলাই আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত ছাত্রদের মধ্য দিয়ে, শেষের দিকে ছাত্র-জনতার ঐক্যে যে গণ অভ্যুত্থান হলো, সেটা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি অন্যতম ঘটনা। স্বাধীনতার পরে এত বড় ঘটনা বাংলাদেশে আর হয়নি। এই ঘটনার পেছনে, এই আন্দোলনের পেছনে যে একটা বড় ভূমিকা ছিল, সেটা হচ্ছে শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভূমিকা। তার মধ্যে অন্যতম একটি বিষয় ছিল গ্রাফিতি।

আমরা দেখেছি যে যখন আন্দোলন একেবারে তুঙ্গ স্পর্শ করল, সেই সময় গ্রাফিতি এতটাই জোরালো ভূমিকা রেখেছিল মানুষের মাঝে, আন্দোলনকারীদের মাঝে, যেটা আসলে তুলনা হয় না। কারণ আমরা জানি, ইতিহাসেও আমরা দেখেছি যে গ্রাফিতির ভাষাটা এতটাই আন্তর্জাতিক—এই ভাষাটাকে বলা হয় যে, খুব দ্রুত কানেক্টেড হতে পারে আন্দোলনকারীরা, বিক্ষোভকারীরা। এটা অনেকটা ঝুঁকিবহুল। কিন্তু তারপরও যারা গ্রাফিতি করে তারা আমাদের এই আন্দোলনের মাধ্যমেই সম্পৃক্ত হতে পেরেছে এই গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে।

গ্রাফিতি চিরকালই বেশিদিন টেকে না, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কারণ এটা যেহেতু দেয়ালে করা হয়, ইনস্ট্যান্ট করা হয়, সময়ের কারণে সেই দেয়ালগুলোতে লেখাগুলোর মধ্যে একটা বিবর্তন চলে আসে, স্পষ্টতা কমে আসে, একসময় হারিয়ে যায়। তবে ইতিহাসে আমরা দেখেছি যে বিভিন্ন আন্দোলনের সময় গ্রাফিতির ইতিহাস অনেকে লিপিবদ্ধ করেছেন এবং বেশ কিছু বিখ্যাত গ্রাফিতি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। আমরা দেখেছি প্রাচীনকালেও গ্রাফিতি পাওয়া যায়—ইতালিতে প্রাচীনকালে গ্রাফিতি শুরু হয়েছিল পম্পেই নগরী ধ্বংস হওয়ার আগেও, অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্বেও আমরা এটা পাই। তখনও এই গ্রাফিতি জনগণকে আকর্ষণ করত, এবং যেহেতু এটা শহরকেন্দ্রিক, এটা নগরবাসীকে আকৃষ্ট করত। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেও আমরা দেখেছি বিভিন্ন আন্দোলনের সময়, ইউরোপে, তারপর আমেরিকায়, অর্থাৎ ইস্ট-ওয়েস্টে, এবং আমাদের ভারত বিভাগ আন্দোলনের সময়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময়ও গ্রাফিতি ছিল—কলকাতাসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোতে গ্রাফিতির উপস্থিতি আমরা দেখি।

আমরা সর্বশেষ যেটা দেখেছি, ৭১-এ আমরা দেখতে পাই। ভাষা আন্দোলনের সময় কিছু কিছু দেখা গেছে। তারপর ৭১-এ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। তারপরে যেটা দেখা গেছে সেটা আসলে ৯০-এ একটু দেখা গেল। ৯০-এর পরে আসলে গ্রাফিতি আমাদের রাজধানী ঢাকার একটা অন্যতম রাজনৈতিক ভাষা হয়ে উঠল।

গ্রাফিতি আগে যেমন রংতুলি দিয়ে করা হতো, এখনও করা হয়, কিন্তু তখন তুলিটা ব্যবহার করত, এখন স্প্রে আসার কারণে তড়িৎ গতিতে এটা করতে পারে শিল্পীরা। তো এই যে একটা বিরাট আন্দোলন, এই আন্দোলনে আপনি গ্রাফিতির ছবিগুলো তুলেছেন—এটা প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ, এই জন্য যে এটার একটা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। সেই প্রেক্ষাপটটাকে আপনি আর্কাইভাল করছেন, নিজের ছবি তোলার মধ্য দিয়ে। এই ছবি আসলে আমাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ছবি কেমন সেটা বিষয় না, ছবির যে আলাদা একটা মাত্রা থাকে, যেটাকে আমরা বলি ফটোগ্রাফির ভাষা, সেই ভাষা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ওই চরিত্রটাকে বা ওই গ্রাফিতিটাকে তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণ করা—যেটা আপনি তুলেছেন এবং সংরক্ষিত হয়ে আছে। এখন এই যে একটা বিরাট আন্দোলন হয়ে গেল, আমরা এটার চাক্ষুস সাক্ষী, আমরা দেখলাম আমাদের সময়ের মধ্য দিয়ে, এবং আপনার যে বয়স, একদম তরুণ—এই প্রথম কোনো আন্দোলনের সাথে আপনি শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে সংযুক্ত হলেন, এবং শুধু সংযুক্তই হলেন না, এর ইতিহাসের সাথে আপনি একটা পার্ট হয়ে গেলেন। এই যে আপনি ইতিহাসের পার্ট হয়ে গেলেন—প্রথমত সেই অনুভূতিটা আপনি ব্যক্ত করেন, যে গ্রাফিতি আপনি তুলেছেন সেটা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা অংশ হয়ে দাঁড়াল, তার পার্ট হয়ে গেলেন—সেই অনুভূতিটা আপনার কেমন লাগল, এই ইতিহাসের অংশ হতে পেরে?

 

আসাদ

আচ্ছা, অনুভূতির কথা বলতে গেলে আসলে আমার খুব মন খারাপ হয় প্রথমে। প্রথমে মন খারাপ হওয়ার কারণ হচ্ছে যে, আমি তো আসলে খুব কম জায়গার ছবি তুলছি। কম জায়গা বলতে ঢাকা শহর তো খুব বড় জায়গা না। গ্রাফিতি তো সারা বাংলাদেশে হইছে। সারা বাংলাদেশে হইছে বলতে ঢাকার বাইরে অনেক শহর আছে যেসব জায়গায় আরো বেশি হইছে। যেমন রাজশাহী, এরপরে হচ্ছে বরিশাল। এরপরে সিলেটেও কিছু হইছে। খুলনাতেও হইছে। কিন্তু আমি মূলত ঢাকায় তুলছি। আর গ্রাফিতি আপনি যেটা বললেন যে, গ্রাফিতিটা আসলে থাকে না। এটা হচ্ছে মুছে যায় বা মুছে ফেলা হয়। এই কারণেও সম্ভব হয় নাই। যখন এটা ভাবি তখন একটু মন খারাপটা কমে। আসলে এটা আমার হাতে ছিল না। তো ঢাকায় যখন আমি ছবি তুলতে গেছি তখন আসলে এটা আমিও জানতাম না যে, এটা এত বড় একটা আর্কাইভ হবে বা একটা ফটো বুক হিসেবে পাবলিশ হবে। এটার জন্য আমি আমার বস আরিফুর রহমান নাইম ভাইরে অনেক ধন্যবাদ দেই। তার পৃষ্ঠপোষকতা এবং তার দিকনির্দেশনা এবং আমার কলিগ যারা ছিল ঐতিহ্যের তাদের ইন্সপারেশনের মাধ্যমে এই বইটা আসলে প্রকাশ হইতে পারছে। আর আমিও সাহস পাইছি। তো অনুভূতির কথা যদি বলি, আমি আসলে ছবি যখন তুলছি তখনকার অনুভূতি বলি। দেখা যাইতেছিল যে, আমি ছবি তুলতে যাইতেছি বা যাচ্ছি, গেছি কোথাও। তখন হচ্ছে গিয়ে দেখতেছি যে, একটা গ্রাফিতির উপরে সাদা চুন। চুন মারা। যেটা হয়তো কাঁচা একটা চুন। হাত দিয়া ঘসা দিলে হাতে লাগতেছে। হয়তো ১০ মিনিট আগে কেউ এই চুনটা মাইরা গেছে। হয়তো লেখা ছিল খুব করুণ কোন একটা কথা। প্রচন্ড রকমের মন খারাপও হইছে তখন যখন আমি লেখা দেখছি ‘আমার ব্যাটাক মারলু কেনে?’ এটা আবু সাঈদের মায়ের একটা কথা ছিল। এরপরে হচ্ছে অজস্র গ্রাফিতি ছিল যেগুলা অর্ধেক লেখা। যেমন ‘খুনি হা…’। আবার হচ্ছে হয়তো লেখা যে, ‘খুনি হাসিনা গদি ছা…’। এইটা হওয়ার কারণ হইছে যে, আপনার জুলাইতে তো প্রচুর পরিমাণে মানুষ ধাওয়া খাইছে পুলিশের দ্বারা। আর যারা গ্রাফিতি করছে গ্রাফিতি তো দৌড়ের উপরে করছে। প্রচুর বানান ভুল হইছে। আমি চাইছি যে আসলে র’ একটা জিনিস। তো প্রচন্ড অর্ধেক করা গ্রাফিতি পাইছি। আমি এগুলা যখন দেখছি তখন আমার খুব মন খারাপ হইছে যে, আসলে এই গ্রাফিতিটা যে লিখতে গেছিল সে যখন পুলিশের ধাওয়া খাইছে। এমনও তো হইতে পারে যে, এই ১৪০০-র মধ্যে এমন কেউ ছিল যে, গ্রাফিতি করতে গিয়ে গুলি খাইছে। এটা আমরা জানি না। হইতে পারে বা ওই গ্রাফিতিটা কেউ করছে তারপরে সে আবার আন্দোলনে যোগ দিছে তখন সে গুলিবিদ্ধ হইছে। হইতে পারে এটা। এটা আলাদা ব্যাপার বা এটা আলাদা রিসার্চের ব্যাপার থাকতে পারে। কিন্তু আমার মন খারাপের জায়গাটা হইছে যে, মানুষ মুখ দিয়ে বলতে পারে নাই কিন্তু লিখতে গেছে। লিখতেও পারে নাই। এটা খুব কষ্টের জিনিসটা যে, আপনি কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে অর্ধেক কইরা গেলেন। আমার মনে হইছে যে, এ লোকটার তো হয়তো মাথায় ইয়ে হবে যে, গ্রাফিতিটা করলাম শেষ করতে পারলাম না। এমনও হইতে পারে যে, সে পরের দিন আবার আসছে ওখানে। পুরো গ্রাফিতিটা শেষ করবে লিখে। কিন্তু দেখা গেল যে, কেউ সাদা চুন মাইরা দিয়া গেছে। তার আরো মন খারাপ হইলো।

তো বুয়েটে প্রথম যেদিন আমি ছবি তুলতে গেছি ধরেন ৬ আগস্ট। তো বুয়েটে একটা গ্রাফিতি ছিল। এই গ্রাফিতিটা আমার খুব পছন্দের। এইটা হচ্ছে লেখা ছিল ‘আর কতবার মুছবি’। এইটারেও মুছা। এইটার উপরেও সাদা চুন দেয়া। তো কিন্তু আপছা আপছা দেখা যাইতেছিল যে, আসলে এখানে লেখা ‘আর কতবার মুছবি’। তো তখন মনে হইল যে, যখন হাসিনা ক্ষমতায় ছিল তখন কিন্তু দিনে গ্রাফিতি হইতো সন্ধ্যার পর থেকে মোছা শুরু হইতো। তখন আসলে ছবি তোলার কোনো সুযোগ ছিল না। কেউ গ্রাফিতি করছে ইনস্ট্যান্ট ওইটার ছবি তুলছে তার কাছে আছে। কিন্তু এটারে এক জায়গায় কইরা আর্কাইভ করাটা খুব মুশকিল। কারণ আপনি জানেন না যে, কার কাছে কী আছে। আবার এমনও হইছে যে, ছবিটা তুলছে বাসায় গিয়ে আবার ডিলিট করতে হইছে। কারণ পরের দিন আন্দোলনে আসতে হইলে তার মোবাইল চেক হইতে পারে। সো তার মোবাইলে যদি গ্রাফিতির একটা ছবি থাকে, কেউ লিখলো ‘ফাক হাসিনা’, তো এটা থাকা মানে তো তার আয়নাঘর অনিবার্য হয়ে যায়। এটা তো বুয়েটে দেখার পরে… আমি আসলে বুয়েটে প্রথম তুলছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি-বুয়েট এই এলাকাটা আমি প্রথম দিন তুলছিলাম আরকি, ৬ আগস্ট। আর আমার গ্রাফিতির ছবি তোলা মূলত শুরুই হইছে ৬ আগস্ট থেকে। আমি ৩ তারিখে কিছু ছবি তুলছিলাম কিন্তু ওইগুলা আসলে ওই ইনটেনশনে তুলি নাই যে, এটার একটা আর্কাইভ হইতে পারে। ওইটা আসলে তখনও আমরা জানি না যে, আমাদের আন্দোলনের ভবিষ্যৎটা কী? তো দেখা গেছে যে, হয়তো ওই ছবি ভয়ে কোথায় লুকাইছি, এটা আমি নিজেও জানি না, পাই নাই আসলে।

কিছু ছবি তুলছিলাম পরে আবার ওই ছবিগুলো তুলতে গেছিলাম। কিন্তু তখন অনেক বেশি, একটার উপরে আরেকটা গ্রাফিতি একটার উপরে আরেকটা গ্রাফিতি, হইতে হইতে প্রচুর পরিমাণে গ্রাফিতি হয়ে গেছিল। যেটা আসলে এটা ঢাকা ইউনিভার্সিটির মেডিকেল সেন্টারে এখনো, এখন খুব সম্ভবত নাই, নতুন করে রং করছে, এটা ডাকসু হওয়ার পরে হয়তো রং করছে, কিন্তু আমি খুব করে চাইছিলাম যে এই দেওয়ালটা অন্তত রং করা ছাড়া থাকুক। মানুষ দেখুক। ৬ তারিখ যখন আমি রাস্তায় ছবি তুলতেছি গ্রাফিতির, মানুষ হয়তো বুঝতেছে না যে, আসলে এটা কেন তুলতেছি, কিন্তু আমি যখন ওই রাস্তা দিয়েই হাঁটি, যখন আমি ওই দেয়ালের দিকে তাকাই যখন দেখি যে, ওই দেয়ালে কিছু নাই, তখন আমি মনে মনে হাসি যে, এই দেয়ালের ইতিহাস তো আমার কাছে আছে। আমার বইয়ে আছে। এটা অনেক বড় কিছু না। নিজেরে বড় করাও না। বাট নিজের কাছে যে ভালো লাগা, ইতিহাসের যে অংশ, আপনি যেটা বললেন, এর অংশ হইতে পারাটা, এটা আসলে এজ এ আর্টিস্ট আমার জন্য আসলে অনেক বড় কিছু।

আর এখানে আমি ফটোগ্রাফি করছি। কিন্তু আমার থেকে বড় ভূমিকা যে রাখছে সেটা হইলো আননোন আর্টিস্ট। যারে আমি জানি না। যারে আমি চিনি না। আপনিও চিনেন না। যে ছবি দেখবে সেও জানে না যে, এটা কে করছে। তো তাদের প্রতি তো সম্মানের একটা জায়গা থাকে আমার। কিন্তু এই জায়গা থেকে যারা গ্রাফিতি করে তাদের প্রতি আমার একটা আলাদা সফট ইয়ে কাজ করে। এখন তো কম হয়। এখন গ্রাফিতি হইলেও হয় জয় বাংলা, এরকম কিছু একটা! এই আরকি…।

 

ছবি : কথা বলছেন অস্ট্রিক আর্যু

ছবি : কথা বলছেন অস্ট্রিক আর্যু

 

অস্ট্রিক আর্যু

খুব ভালো বলেছেন। আপনার এই কথায় দুইটা চমৎকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চলে এসেছে। একটা হচ্ছে, আমরা শুরুতেই বলছিলাম যে, এই গ্রাফিতি জীবন বাজি রেখে অনেকেই করেছেন, অনেকে কাজ অর্ধেক রেখে, ওই যে বললেন অনেক শব্দ বাদ রেখে চলে যেতে হয়েছে—আমরা জানি না সেই গ্রাফিতি শিল্পীর ভবিষ্যতে কী হয়েছিল। এই যে আন্দোলনে আমাদের যে হাজার জন মারা গেল, সেই হাজার জনের মধ্যে তারা আছে কি নেই, এটা আসলে আমাদের একটা প্রশ্ন রয়ে গেল যে, গ্রাফিতি শিল্পীরা, ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে যে গ্রাফিতি শিল্পীরা করেছে, তারা জীবন বাজি রেখে করেছে, কিন্তু এর মধ্যে কোথাও কেউ মারা গেছে কি না আমরা ঠিক জানি না, হতেও পারে। এই ব্যাপারগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের এই নিকট ইতিহাসগুলো তো এভাবেই লেখা হয় না।

 

আসাদ

শহীদ আনাস এত সুন্দর চিঠি লিখে গেছে, ৫ তারিখে মারা গেল, তার কি মনে হয় নাই যে, আমি দেয়ালে কিছু একটা লেখি। আমি তো লিখতে পারি। মনে হইছে। আমার তো মনে হয় যে, শহীদ আনাস হয়তোবা গ্রাফিতি করছে চানখারপুলে অথবা শহীদ মিনারে। করতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

হ্যাঁ, আসলে এই আন্দোলনে গ্রাফিতি শিল্পীদের যে বিরাট ভূমিকা, তাদের প্রতি আসলে আমাদের একটু কৃতজ্ঞ থাকা উচিত—নাম না জানা সেই শিল্পীদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। তো এই যে কাজ করলেন আপনি, মূলত কাজ করেছেন কী নিয়ে? আমাদের তো ৫ তারিখে স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটল—আপনি ছবি কি পাঁচ তারিখ থেকে তুলেছেন? এই ছবি তোলার প্রেক্ষাপটটা একটু বলেন। কোন তারিখ থেকে? কোথায় কোথায় মূলত তুলেছেন আপনি?

 

আসাদ

ছবি তোলার প্রেক্ষাপটটা হচ্ছে আমি যখন ৫ তারিখ সকালবেলা, ৬ তারিখ সকালবেলা বলা ভালো, ৫ তারিখে তো আসলে আমরা জানি না যে, আসলে ৫ তারিখে কী হইতেছে। ৬ তারিখ সকালবেলা যখন অফিসে আসতেছি তো তখন আমি, আমি খেয়াল করি নাই। আমি অফিসে আসার পরে আমার বস বলল যে, অফিসে আসতে আসতে একটা জিনিস দেখলাম। দেওয়ালগুলা মনে হয় যেন কথা বলতেছে। আসাদ, একটা কাজ করবেন নাকি! আপনি তো ছবি তোলেন। ছবি তুলে আসেন। যান। সময় লাগুক। যতদিন লাগে লাগান। ছবি তুলেন। তো ঐদিনই আসলে, আমি ৬ তারিখ দুপুরে লাঞ্চের পর আমার এক কলিগসহ বের হয়ে যাই। মোসলেহ ভাইসহ বের হই। তো ৫ তারিখে মেইন শুরু, না ৬ তারিখে শুরু। কারণ হচ্ছে ৫ তারিখের আগে যেসব গ্রাফিতি হইছে, এই প্রধান বিচারপতির বাসায় গ্রাফিতি হইছে দেয়ালে। তো ওই গ্রাফিতি তো ৫ তারিখে ছিল না। ৫ তারিখ সকালে ছিল না। ওই গ্রাফিতি আমি যখন তুলতে গেছি তখন হয়তো ওইটা ৫ তারিখ দুপুরের মধ্যে কেউ করছে। এমন অজস্র গ্রাফিতি ছিল যেটা হচ্ছে যে আপনি ৫ তারিখের আগে, ৪ তারিখের আন্দোলনে যারা গ্রাফিতি করছে বা এর আগে, অনেক ভালো ভালো যে জায়গা, শাহবাগ হইতে পারে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির কিছু জায়গা, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ওভাবে মুছতে পারে নাই, এরপর হচ্ছে সরকারি যে স্থাপনা আছে, এগুলা অনেক জায়গায় মুছে ফেলছে। কিন্তু মেইনলি আমি যেগুলার ছবি পাইছি এগুলা হয়তো ৪ তারিখে তোলা, ৪ তারিখে করা অথবা ৫ তারিখে করা। আবার কিছু এমন হইতে পারে যে, আগে করা। যেগুলা ওরা মুছতে পারে নাই বা ওদের নাগালের বাইরে ছিল। তো মেইনলি ছবি তোলা শুরু করছি আমি ৬ তারিখ থেকে। ৬ তারিখ থেকে টানা ১৩ তারিখ পর্যন্ত ছবি তুলছি। এরপরে তারিখ ঠিক মনে নাই, আরো বেশ কিছুদিন তুলছি আমি। আমার ছবি তোলার এরিয়া হচ্ছে পুরা ঢাকা শহর। আমার এরকম তালিকা করা ছিল না। আমি এক এক এরিয়া ধরে যাইতাম যে, আজকে ধানমন্ডি গেছি, ধানমন্ডির এই সাইটটা পুরা আমি আজকে ছবি তুলে আসব। আবার কালকে যাত্রাবাড়ি গেছি, যাত্রাবাড়ির ওই সাইডটা একেবারে তুলে আসব। ওইদিকে আমি পুরোপুরি গেছিলাম মনে হয় শনিরআখড়া পর্যন্ত। এরপরে এদিকে তো মোহাম্মদপুর-বসিলা। এরপরে এদিকে প্রায় সাভার পর্যন্ত। আমি দুর্ভাগ্যবশত জাহাঙ্গীরনগরে ছবি তুলতে পারি নাই। আর এরপরে এদিকে ছিল মিরপুর। তারপরে এদিকে যত, আমি আমার রিকলের মধ্যে আমি যত জায়গা আসছে বা যত জায়গায় হইতে পারে, আন্দোলন হইছে বা আমরা জানি যে, এইসব জায়গায় আন্দোলন হইছে ওইসব জায়গায় আমি ছবি তুলছি। তো সব ছবি তো আর বইয়ে দেওয়া সম্ভব না। এই সব ছবির একটা আর্কাইভ আমার কাছে প্রায় আছে। ৩০০০-এরও উপরে ছবির একটা আর্কাইভ আমার কাছে আছে। যেটা আমি বিলং করি। আর হচ্ছে বইয়ে তো দেখা যায় যে, বেশি ছবি দিলে বই গিঞ্জি হয়ে যায় বা বইয়ের দাম বেড়ে যাবে। বই মোটা হয়ে যাবে, ভারী হয়ে যাবে।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আচ্ছা, কিন্তু একটা বিষয় আমাকে বলেন, আমাদের এখন ঢাকা শহরে আমরা যা দেখি—যদি আপনি প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারদের কথা বলি, এদের সংখ্যা বিপুল, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা এটা আমাদের চোখে ওভাবে পড়ে না, যে এ ধরনের ফটোগ্রাফি করেছে, বিশেষ করে গ্রাফিতি নিয়ে সেই ধরনের বই এভাবে পাবলিকেশন আমাদের সামনে হাজির হয়নি। কিন্তু ফটোগ্রাফারদের সংখ্যা তো অনেক, বিশেষ করে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের সংখ্যা অনেক, তারা হয়তো তুলেছেন, আমরা জানি না, তাদের হয়তো ব্যক্তিগত মিডিয়াতে আছে। কিন্তু আমার মনে হয় আরও যারা তুলেছেন এরকম গ্রাফিতি নিয়েও বিশাল—আমাদের এখন যেমন আবার জুলাই চলে এলো—আমার মনে হয় যারা বিভিন্নভাবে তুলেছেন, তাদের ছবিগুলো নিয়ে বিশাল একটা এক্সিবিশন হতে পারত। আপনার কী মনে হয়?

 

আসাদ

এটা তো আমার সবসময় মনে হয়। আপনি দেখেন, জুলাই নিয়ে কিন্তু তেমন কিছু ডকুমেন্টারি ছাড়া আর কিছুই হয় নাই। একটা বড় এক্সিবিশন কেউ করতে পারে নাই। একটা ভালো সিনেমা কেউ বানাইতে পারে নাই। একটা ভালো গান কেউ বানাইতে পারে নাই। তো এক্সিবিশন তো অবশ্যই হওয়া উচিত। এক্সিবিশন না হলে তো আসলে ছবির কোনো মান থাকে না। এক্সিবিশন হওয়া উচিত এবং অনেকেই ছবি তুলছে, তখন হইছে কী যে, আসলে গ্রাফিতির থেকে মানুষের সাথে কী হইতেছে, মানুষ কী ফেস করতেছে ওইটার উপরে ফোকাস ছিল ফটোগ্রাফারদের বেশি। আসলে গ্রাফিতি অনেকেই তুলছে। আমিও জানি অনেকে তুলছে। আবার হচ্ছে অনেকে এড়াইয়েও গেছে যে, আসলে এটা অত জরুরি কিছু না। মানুষ যে মারতেছে এটা জরুরি। তো ওই জায়গা থেকে আসলে…।

আমার যা মনে হয় যে, পাবলিকেশনের যে ব্যাপার বললেন যে, কেউ পাবলিশ কেন করে নাই বা কেউ কিছু করল না কেন, এটা হয়তো তাদের পার্সোনাল চয়েজ হইতে পারে। আর বাংলাদেশের মতো জায়গায় একটা ফটোবুক বের করা আসলে অনেক হ্যাসেলের কাজ। বাংলাদেশ না ঠিক, ওয়ার্ল্ডের অনেক বড় বড় ফটোগ্রাফার আছে যাদের একটা ফটোবুক নাই। বাট এটা করাটা অনেকে মনে করে যে, ৪০ বছরের আগে কোন ফটোগ্রাফার আসলে ফটোবুক করতে পারে না। কিন্তু অনেকে করে যারা এক্সট্রা অর্ডিনারি কাজ করে বা অনেকে, আমার এটা হয়তো ব্যাটে বলে মিলে গেছে বইলা পাবলিকেশন হইছে। নাইলে হয়তো হইতো না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

হাসিনা চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটা তো রিস্ক ছিল। যারা ছবি তুলেছে তারা বলছে যে, অনেকে মোবাইল থেকে চেক করে, ফটোগ্রাফারদেরও তখন রিস্ক ছিল কী ছবি তোলে না তোলে, তাদের জীবন নিয়ে একটা ঝুঁকি ছিল। কিন্তু হাসিনা যখন পালিয়ে গেল, পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার মনে হয়—আপনার কি মনে হয় না যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা একটা করা উচিত ছিল, ঢাকার অলিগলিতে যা আছে এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বড় বড় শহর, যদি আমরা চট্টগ্রামের কথা ধরি, রাজশাহীর কথা ধরি, খুলনার কথা ধরি, সিলেটের কথা, অর্থাৎ বড় বড় বিভাগীয় শহরের কথা যদি ধরি, সেখানেও কিছু না কিছু গ্রাফিতির খবর আমরা পেয়েছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এটার একটা ফটোগ্রাফ করে সংরক্ষণের দরকার ছিল আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য, পরম্পরার জন্য, আমাদের নতুন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য—সেই জায়গাটায় যে গ্যাপ ছিল, আপনার কি মনে হয় না তখনকার সরকার, ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট, ইউনূসের গভর্নমেন্ট, এটা করতে পারেনি? মনে হয় কি এই সরকারের একটা দায় ছিল এটা করার?

 

আসাদ

এটা তো মনে হয়। কিন্তু তারা করছে কী, তারা যেটা তাদের করা দরকার না বা দরকার হইতে পারে ওটা তারা করছে। তারা ওই রংচং মাইখা যেসব দেয়াল আর্ট হইছিল ৫ আগস্টের পরে, ওইটার হয়তো কিছু ডকুমেন্ট তারা করাইছিল। আমি যতদূর জানি। কিন্তু এটা কোথায় আছে বা কার কাছে আছে এটা জানি না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আমরা একটা নতুন ধারণা পাই, যে ৫ তারিখের পরপর কিছু হয়েছিল—কিছুটা ছিল আনন্দের জন্য, আবার কিছুটা কৌশলগত কারণে, সেগুলোকে পুরাতনগুলোর মধ্যে নতুন করে করার একটা প্রবণতা কাজ করেছে। গভর্নমেন্টের সময় আমরা কী দেখলাম—কোনো একটা সংগঠন, নাম বলছি না, কোনো একটা সংগঠনের মাধ্যমে আমরা শুনতে পাই এটাতে বিদেশেরও হাত আছে। সেখান থেকে তারা কী করেছে—ওই পুরাতন গ্রাফিতিগুলোকে মুছে আরবি গ্রাফিতি করা, কিংবা ওই জায়গাগুলোতে অন্য কালচারাল কিছু করা। যেমন আমি বিশেষ করে যখন যাই, দয়াগঞ্জের ফ্লাইওভার দেখি, ফুল-পাখি-লতা-পাতা দিয়ে, আরবি দিয়ে, বা কিছু হেরিটেজের এগুলো দিয়ে করেছে, কিন্তু ওখানে মূল্যবান কিছু ইয়ে ছিল। এটা হতে পারে আওয়ামী লীগের কোনো কালচারাল উইংয়ের একটা কৌশলগত অবস্থান, যত দ্রুত পারো এগুলোকে মুছে ফেলার চেষ্টা করো। আপনার কি মনে হয়, এরকম কোনো ইন্ধন কাজ করতে পারে?

 

আসাদ

সেটা তো অবশ্যই কাজ করছে। আপনি দেখেন, ঢাকা শহরে তো দেয়াল কম না। আপনার যদি অনেক সুন্দর সুন্দর আর্ট হইছে, দেয়াল আর্ট, ৫ তারিখের পর এটা তো আমিও প্রশংসা করছি যে, অনেক সুন্দর সুন্দর। যে হুজুররা কখনো কিছু বলতে পারে নাই তারা দেয়ালে গিয়ে লিখতে পারছে। সবার সাথে মিলা আরবি লিখছে। বাংলাদেশের মতো জায়গায় আপনি ক্যালিগ্রাফি করবেন দেয়ালে, এটা হাসিনার আমলে জীবনেও সম্ভব ছিল না, করছে। এটা একটা দারুণ চেঞ্জ।

কিন্তু ব্যাপার যেটা হইছে যে, ঢাকায় তো দেয়ালের অভাব ছিল না। আপনার ওই পুরনো গ্রাফিতিটার উপরে কেন আপনার চুন দিতে হবে? চুন দিয়া মুইছা কেন আপনার গ্রাফিতি করতে হবে? আপনি অন্য দেয়ালে করেন। পুরনোটাও থাকুক, পুরনোটা থাকুক, নতুনটা থাকুক, মানুষ ট্রান্সফরমেশনটা দেখুক। কিন্তু আপনি যেটা বললেন যে, এই যে কোনো একটা ফান্ড হয়তো হইছে। ফান্ড অবশ্যই হইছে। ফান্ড না হইলে এত রং আপনি কই দিয়ে পাইলেন? আপনি এত টাকা কই পাইলেন? যেসব স্টুডেন্টরা করছে রঙের দাম তো কম না। ভালো দাম। পুরো বাংলাদেশের দেয়ালে দেয়ালে আপনি রংচং মাইখা দিছেন কিন্তু আপনি পুরনোটা মুইছা করছেন, পুরনোটা তো আপনার মুছা উচিত হয় নাই, পুরানোটার মধ্য দিয়েই তো নতুনটা আসছে। তাহলে আপনি পুরানটা কেন মুছবেন। পুরনটা থাকুক। পুরানটার সাইডে যে খালি জায়গাটা আছে ওখানে করেন আপনি। ১০টা না করে একটা করেন। একটা একটার মতো করেন। অজস্র নতুন নতুন গ্রাফিতি হইছিল। গ্রাফিতি বা দেয়াল আর্ট, ‘পাতা ছেড়া নিষেধ’ ধর্মের সিম্বল দেওয়া, এটা তো ভালো। এটা তো দারুণ চেঞ্জ। আবার সুন্দর সুন্দর আপনার ক্যালিগ্রাফি হইছে। এটাও তো ভালো। কিন্তু আপনার তো এই যে মুছে ফেলতেছেন এই এখতিয়ার তো আপনার নাই। তাইলে তো আপনার আর হাসিনার মধ্যে পার্থক্য থাকল না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে আপনি কি মনে করেন না যে, আমাদের নিকট ইতিহাসে যে গ্রাফিতিগুলো হলো, যাদের গ্রাফিতি ইতিমধ্যে তুলেছেন তাদেরকে দিয়ে, এখনো যদি সরকার চায়, তাদেরকে এক ধরনের পুরস্কৃত করার একটা ব্যাপার থাকে কি না, অথবা যারা করেছে তাদের মধ্যে সবাইকে হয়তো পাবেন না, কিন্তু তাদেরকে কোনোভাবে একনলেজ করা যায় কি না—এটা কি মনে করেন সরকারের একটা দায় থাকতে পারে?

 

আসাদ

সরকার চাইলে, যেহেতু ইন্টেরিম করতে পারে নাই, কিন্তু এখন যেহেতু নির্বাচিত সরকার আছে তারা চাইলে অবশ্যই পারে। তারা চাইলে জুলাই গ্রাফিতির ছবি বলেন বা জুলাইয়ের ছবি বলেন, সব ছবি মিলায়ে একটা ভালো পাবলিকেশন করতে পারে। সরকার চাইলে মোটা বই করা কোনো ব্যাপার না। আমরা মোটা বই করতে গেলে সমস্যা। তো ভলিউম আকারে হইতে পারে যে ১০ খন্ডের একটা ফটো ভলিউম হইলো। জুলাই কেন্দ্রিক যত ছবি আছে, এটার জন্য আলাদা একটা পার্ট হলো গ্রাফিতির। আমার কিছু ছবি আছে। অন্য যারা তুলছে তাদের ছবি আছে। আমারটা, আমি বলতেছি না যে আমারটা রাখতে হবে, অন্য যারা তুলছে তাদেরটা থাকুক। আমার তো একটা পাবলিকেশন হয়ে গেছে। কিন্তু যারা এটা করতে পারে নাই নিজে থেকে তারা সরকারিভাবে একটা একনলেজমেন্ট তো অবশ্যই প্রত্যাশা করতেই পারে। তাদের একটা ক্রেস্ট দেওয়া হোক। হইতে পারে একটা আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া যাইতে পারে। এটা তো দোষের কিছু না। ৭১ সালে যদি কেউ যুদ্ধের ছবি তুইলা থাকে তবে সে টাকা পাইছে না? পাইছে। তো ২৪ এ তুললে কেন দিতে পারবে না? ফটোগ্রাফি সে তো এটা, তার শখ হইতে পারে, বাট অনেকে তো এখান থেকে কিছু একটা পাইলে তার এটা অনেক কাজে আসবে।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আচ্ছা, এই যে আপনি গ্রাফিতিগুলো তুললেন, ফটোগ্রাফটা করলেন, বই বের হলো, সেই বইটা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটা দলিল হয়ে থাকল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ছবি তোলার পরে, বই বেরোনোর পরে, আমাদের এখানে যে জিনিসটা ঘটে যে, রাজনীতিতে একটা বাইনারি আমাদের এখানে আছে—তো আপনি কি সেখান থেকে কোনো আশঙ্কা বোধ করেন কি না যে, এই ছবিগুলো তোলার কারণে আমাকে আসলে বাইনারির কোনো একটা দিকে ফেলে দিল? এরকম কোনো রাজনৈতিকভাবে শঙ্কা বা এরকম থাকে না যে…।

 

আসাদ

আমার ইয়ে ছিল সবসময় যে, আমি একটু ইয়ে থাকব, নিউট্রাল থাকব। কিন্তু আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলব। কেউ অন্যায় করতেছে সেটার বিপক্ষে কথা বলব। কিন্তু আমি একটু নিউট্রাল থাকতে চাইছি সবসময়। বইটা বের করছি। তার মানে যে, আমি এনসিপির কেউ, তা তো না। আবার আমি বই বের করি নাই। তাইলে যে আমি আওয়ামী লীগের কেউ, তা তো না।

আওয়ামী লীগ অন্যায় করছে, আওয়ামী লীগ এই কাজগুলো করছে মানুষ দেয়ালে লিখছে, আমি এজ এ আর্টিস্ট এগুলার ছবি তুলছি। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এটা আমার দায়বদ্ধতা। মানুষের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরা আমার দায়বদ্ধতা। একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে। আর হচ্ছে সবসময় আমি চাইছি যে, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলব। আর্টিস্ট মানেই যে, আমার শুধু আর্ট কালচার করতে হবে, তা না। আমার তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কথা বলা উচিত সবার। এখন শেখ হাসিনা মানুষ মারছে বইলা ভয় পাইয়া কিছু বলব না, তা তো হবে না। আমি তো ছবি তুলছি জুলাইতেও। তখন তো প্রচার করতে পারি নাই। তো হাসিনা যাওয়ার পর অবশ্যই প্রচার করছি বা তখন হয়তো ফেসবুকে পোস্ট দিছি বা ইয়ে করছি। আবার ডিলিট করছি, অনলি মি কইরা রাখছি। মানে হয় না যে, মানুষের তো ভয় কাজ করে। আবার মানুষেরই ভয় চইলা যায়। মানুষের ভয় কাজ না করলে তো হাসিনা আরো আগে পইড়া যায়। আবার হচ্ছে মানুষের ভয় চইলা গেছে বইলা সে ৫ তারিখে ১৪০০ মানুষ মাইরা তারপরে তার পালাইতে হইছে। মানুষের ভয় চইলা গেছে বলে। একটা পর্যায়ে গিয়ে আসলে আমার মনে হইছে যে, আমার অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিত। আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করছি। কিন্তু আমি আসলে কোনো রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত না। এখন পর্যন্ত। সামনে হয়তো নিজের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে কারো কোনো কিছু মিলে গেলে তখন হয়তো অন্যভাবে অন্য দিকের চিন্তা আসতে পারে। তো, এখন পর্যন্ত আমি আসলে ওরকম কোনো চিন্তা করিনি।

 

অস্ট্রিক আর্যু

ভালো বলেছেন। কারণ একটা কথা আছে, প্রকৃত শিল্পীর নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দর্শন থাকতে পারে না, ব্যক্তিগতভাবে তার কোনো পক্ষপাত থাকতে পারে, কিন্তু যখন একজন শিল্পী শিল্পীর জায়গা থেকে দেখবে তখন তার নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল ওভাবে থাকতে পারে না, যেটা আমরা ইতিহাসে বহুবার দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে। তো, এখন এই যে আপনি একটা বই করলেন, এই গ্রাফিতির বইটা—আপনার কি মনে হয় না যে, ইতিহাসটা যদি আমরা বাইরের দেশের সাথেও একটা ইয়ে করতে পারতাম, পাবলিকেশনটাকে আন্তর্জাতিকভাবে যদি প্রকাশ করা যেত, এটা কি মনে হয় না, এরকম কোনো বোধ করেন কি না যে, আমার এই পাবলিকেশনটা যদি দেশের বাইরেও প্রকাশ করা যেত তাহলে জুলাই আন্দোলনের ব্যাপারটা পৃথিবীতে ওয়েল-নোন, ডকুমেন্টেড হয়ে থাকতে পারত—এই বোধটা করেন কি না, আপনি অভাব বোধ করেন কি না?

 

আসাদ

এটা তো করি। কারণ বাংলাদেশের এত বড় একটা ইতিহাস আর এটার একটা ফটো বুক, জুলাই এক ইতিহাস গ্রাফিতি আরেক ইতিহাস। এটা আপনি আলাদা করতে পারেন। কিন্তু আপনার জুলাইয়ের, দেয়ালে তো আর আন্দোলন করে না। আন্দোলন করছে মানুষ। আমি দেয়ালের ছবি তুলছি, একভাবে কানেক্টেড। আবার আরেকভাবে আলাদা। তো এটারে যদি আন্তর্জাতিকভাবে ইয়ে করা যায় যে, রিকগনাইজ করা যায় তাইলে আসলে এটা আমি মনে করি যে আসলে এটা অনেক বড় একটা হিস্ট্রিকাল কিছু একটা হবে বা হয়ে থাকবে। হিস্ট্রি তো মানুষ কম পড়ে। কিন্তু যারা পড়ে তারা মন দিয়ে পড়ে। সো এই ছবিগুলো মানুষ দেখলে মনে হবে যে আসলে ২৪-এ মানুষ কিছু একটা করছে। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে। সে অনেক আওয়ামী লীগ ফ্যামিলির লোকজনও তো গিয়ে আন্দোলনে যোগ দিছে। দিছে না! দিছে তো। আবার কেউ কেউ ৫ তারিখেও গুলি চালাইছে। সো, আমার কাছে মনে হয় যে, এটার একটা যদি ইন্টারন্যাশনাল ভ্যালু কখনো এড করা যায় তাইলে এটা আসলে অনেক বড় কিছু হবে।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আসলেই, কারণ বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এরকম কোনো গ্রাফিতি এভাবে একচ্ছত্রভাবে—যে গ্রাফিতির একটা বিরাট ভূমিকা—এটা আমরা দেখতে পাই না। বিচ্ছিন্নভাবে আগে ছিল, ৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও কিছু কিছু ছিল, কিন্তু এই ফর্মে ছিল না, যে ফর্মটা এখন এত বেশি ব্যাপকতা পেয়েছে, স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। আমরা এই ২৪-এর আন্দোলনে শুধুমাত্র ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধেই দেখিনি, বরং গণতন্ত্রের পক্ষে এরকম কিছু দেখেছি এবং এমন কিছু গ্রাফিতিও দেখেছি মানবতার পক্ষে, অর্থাৎ মানুষের যে মৌলিক চাহিদাগুলো সেগুলোর পক্ষে, তারপরে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে দেখেছি। সবগুলো মিলে, শুধুমাত্র যদি আমরা বলি এই গ্রাফিতির ব্যাপারটা শুধু হাসিনার পতনকেন্দ্রিক না, এই যে জুলাইয়ের যে গ্রাফিতি হয়েছিল, এই আন্দোলনের মধ্যে আমরা অনেক বড় কিছু দেখতে পাই, যেটা শুধুমাত্র ফ্যাসিজমের জন্য না, অনেক ক্ষেত্রে শিল্পের জন্য হয়েছে, শিল্পের বাক-স্বাধীনতার জন্য হয়েছে, মানুষের আরও মৌলিক অধিকারের জন্য হয়েছে, তাই না? এই ব্যাপারগুলো আমরা দেখতে পাই। সেক্ষেত্রে আপনার বইটা কিন্তু অনেক কিছু রিপ্রেজেন্ট করে—ওই বইটার মধ্যে আমরা যতটুকু দেখেছি, শুধুমাত্র স্বৈরাচার-ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধেই না, আমরা আরও কিছু দেখেছি যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।

 

আসাদ

আমি যদি বইয়ের বাইরের একটা ছবি নিয়ে আলাপ করি, যে ছবিটা, ওই যে বললাম, সাদা চুন দিয়ে মুছে ফেলছে, ওভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু আমি চোখ দিয়ে পড়ছি। আমার কাছে ছবিও আছে। যেমন লেখা ছিল, ‘হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, শেখ হাসিনার ঠাঁই নাই’। তো এগুলি হাসিনা তো সবসময় চাইতো যে, ধর্মের বিভেদ বাধাইতো। কিন্তু এটা তো ও ২৪-এ আইসা পারে নাই। সে দেখছে সে বলতেছে যে, ‘হিন্দু মুসলিমের দাঙ্গা হইতে পারে’। মানুষজন গিয়া লিখতেছে যে, ‘হিন্দু মুসলিম ভাই ভাই, শেখ হাসিনার ঠাঁই নাই’। তো এই একটা ব্যাপার আছে যে, আসলে সবকিছুই বা সব ধরনের আর্টই হচ্ছে শুধুমাত্র যে হাসিনার ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে কথা বলছে, তা না। তারা অনেক কিছুর বিরুদ্ধেই কথা বলছে। ধর্ম, রাষ্ট্র, নীতি, “দেশটা কারো বাপের না”। তো নানান আঙ্গিকেই মানুষ কথা বলছে।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আমরা আবার একটু এখন ব্যক্তিগত পর্বে ঢুকি। আমি জানি আপনি মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে উঠে আসা একজন তরুণ, তো এই যে পরে ফটোগ্রাফি শুরু করলেন, এই ফটোগ্রাফি শুরু করার পেছনের গল্প যদি একটু বলেন, আসলে কীভাবে আপনি ফটোগ্রাফার হয়ে উঠলেন, পরবর্তীতে আমি আরেকটা সম্পূরক প্রশ্ন করব আপনাকে।

 

আসাদ

ফটোগ্রাফার হয়ে উঠব এটা হয়তো আমি মনে মনে জানতাম। কারণ আমি যখন হচ্ছে ছোটবেলায় হিফখানায় পড়ি তখন আমার মামা ইউএসএ থাকে। উনি প্রায় যখন আসত তখন একটা একটা করে ছোট ছোট সাইবার শর্ট ক্যামেরা নিয়ে আসত। আগের যে সব ক্যামেরা আছে। ডিজিটাল ছিল, ফিল্ম না। ২০১৪ সালের ঘটনা বা ১৩ সালের ঘটনা। তো ওইটা দিয়ে ছবিটবি তুলতাম। কী তুলতাম? জানিনা। এই পাখি উড়তেছে তুললাম। আবার হচ্ছে আজকে মাদ্রাসায় কোনো একটা অনুষ্ঠান আছে ক্যামেরাটা নিয়ে গিয়ে ছবি তুললাম। এই ছবিগুলো আসলে আমার কাছে নাই। কিন্তু ওই যে ওই সময় থেকে ছবি তোলা, আমি যে ছবি তুলতে চাই এটা আমারে ওই সময়টাই আমারে ইয়ে করছে। তখন আসলে আমার এটা মনে হয় নাই যে, আমি মাদ্রাসায় পড়ি। আমি কেন ছবি তুলব? আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আমি তো আসলে খারাপ কিছু করতেছি না। একটা ফুল, একটা পাতা, একটা পাখি তুলতেছি। এটা তো ভাই আল্লাহই বানাইছে। আমি তুলতেছি। সুন্দর লাগতেছে। মানুষ দেখতেছে। দেখুক। তখন তো আসলে এভাবে মানুষ দেখতও না। ছবি তুলতাম, থাকত। আবার হচ্ছে ওই মেমোরি কার্ড কম্পিউটারের দোকানে পাঠায়ে ওই ছবিগুলো আবার মোবাইলে নিতাম। এইভাবেই শুরু হইছিল। এরপর আস্তে আস্তে আস্তে…।

 

অস্ট্রিক আর্যু

প্রথম একটা প্রফেশনাল ক্যামেরা, যেটাকে আমরা ডিএসএলআর বলি, কীভাবে পেলেন এটা?

 

আসাদ

এটা আমি আসলে এটার একটা অনেক মজার ঘটনা… মজা না, এটা আসলে…।

 

অস্ট্রিক আর্যু

শেয়ার করেন আমাদের সাথে।

 

আসাদ

ট্রাজেডি বলব কি না জানিনা। আমি যখন ঢাকায় আসি ২০২৩, ২২-২৩-এর আগে হবে। প্রপারলি ঢাকায় থাকা শুরু করি। তো থাকে না যে ফ্যামিলি থেকে বলে তুই এইট পাস কর এটা কিনে দিব, তুই টেন পাস কর তোরে ওটা কিনে দিব। তো আমারেও মনে হয় আমার ফ্যামিলি থেকে বলছিল। বিশেষ করে আমার মেজো ভাই আমারে বলছিল যে, মেট্রিক পরীক্ষা দে তারপরে কিনে দিব। আমি হচ্ছে হেফজ পইড়া তারপরে আবার জেনারেল পড়াশোনা শুরু করি। তো এরপরে যখন মেট্রিক পরীক্ষা দেই ঢাকায় আসি। করোনা-টরোনার পরে। তো এরপরে ঢাকায় একটু থাকা শুরু করছি। একটু স্টেবল হইছি পর ভাইরে বলতেছিলাম মাঝে মাঝে, ভাই, ক্যামেরা কি কিনব না! এর আগে আমি মোবাইল দিয়ে ছবি তুলি। তখন মোটামুটি যে আমি ফটোগ্রাফার হইতে চাই এটা আমি বুঝে গেছি বা এটা মানুষও বুঝছে যে, আসলে আমি মোবাইল দিয়া অনেক এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু ছবিটবি তুলছিলাম। তখন আসলে মোবাইল আইফোন দিয়েও মানুষ তুলতে পারত না যেটা আমি এন্ড্রয়েড দিয়া তুলতাম। তো ভাইয়া দেখত হয়তোবা, তারও হয়তো মন চাইত যে, না, ওরে একটা ক্যামেরা কিনে দেই। থাকে না, ফ্যামিলি থেকে অনেক বন্ধকতা থাকে যে, না, ছবি তোলা যাবে না। কেন তুলবি? এরকম কিছু ছিল না। আমি আসলে তারা হয়তো এটা ভাবতো যে, আমি খারাপ কিছু করব না। যাই করি। এ কারণে এরকম বলতে বলতে একদিন ভাই বলল যে, তাহলে চল দেখি ক্যামেরার দাম কেমন। তো ক্যামেরার দাম দেখতে গিয়ে আসলে দেখলাম যে, আমরা অনলাইনে দেখতাম যে ১৫-২০ হাজার টাকা ক্যামেরা পাওয়া যায়। কিন্তু শপে গিয়ে দেখতেছি যে, এগুলা আসলে রিফারবিস বডি। এগুলা এই দামেই পাওয়া যায়। কিন্তু এটার কোনো গ্যারান্টি নাই যে, আসলে এটা ভালো হবে নাকি খারাপ হবে। এরপরে অনেক ঘাইটা ঘাইটা ঘাইটা ঘাইটা… তো একদিন বাইতুল মোকাররমে আসলাম। ভাই আর আমি। তখন আমি জানি না যে, ভাই আমার ক্যামেরা আজকে কিনে দিবে। আমি ভাবছি যে আজকে ওর দাম-টাম দেখব। তো আসলাম। এরপরে এক দোকানে নিকনের একটা ক্যামেরা, এটা দেখলাম। দেখে তখন মনে হইছে যে, যা পাইছি নিয়ে নেই। অত ঘাটাঘাটি করি নাই যে, এটা নিব নাকি অন্য কিছু নিব। তো, পরে ওটা নিলাম। ক্যামেরাটা নিলাম। ক্যামেরা নিছি। আমার ভাই আমারে কিস্তিতে ক্যামেরাটা কিনে দিছিল। তো কিস্তিতে ক্যামেরাটা কিনে দিছিল। আমি জানিও না যে, সে কয় মাস বসে কিস্তি দিছে, কিভাবে দিছে। সো, এটার জন্য আমি আসলে সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকি। কারণ ক্যামেরাটা আমার জন্য আসলে লাইফ চেঞ্জিং ছিল। কারণ আমি হয়তো অনেক কিছু করি নাই। আবার ক্যামেরাটা ছিল বলেই আমি কিছু না কিছু করতে পারছি। যেমন তখন ক্যামেরাটা না হইলে বা আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম যে, আমার যদি এই ক্যামেরাটা আমি করোনার সময় পাইতাম। তাইলে মনে হয় আমি আরেকটু ভালো ফটোগ্রাফার হয়ে উঠতে পারতাম। কারণ তখন তো একেবারে ফ্রি। বাড়িতে, গ্রাম অঞ্চলে তো করোনা ওইভাবে ছড়ায়ও নাই। তখন মনে হয়েছিল যে, আমি গ্রামটারে আরো অনেক বেশি করে এক্সপ্লোর করতে পারতাম। অনেক ভালো কিছু ছবি তুলতে পারতাম।

 

ছবি : কথা বলছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ

ছবি : কথা বলছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ

 

অস্ট্রিক আর্যু

সম্পূরক প্রশ্নটা আমি করি, যেটা শুরু করেছিলাম—আমি জানি আপনি একজন কোরআনের হাফেজ, ইসলামে তো ছবি তোলার ব্যাপারে কিছু বিধিনিষেধ আছে, এখন আপনি নিজে সেটা করছেন, এই যে সাংঘর্ষিক জায়গাগুলো আপনি কীভাবে ম্যানেজ করেন আসলে?

 

আসাদ

আচ্ছা, আমি আসলে জানি না যে, আমি এটা কখনো নিজে দেখি নাই যে, ইসলামে যে ছবি তোলা মানা আছে। হয়তো হইতে পারে। আমি আসলে অত ডিপলি দেখিও নাই, খুঁজিও নাই। তো যে কারণে আসলে আমার একটু ওইটা নিয়ে ট্রমাটা কম কাজ করে যে, আসলে হারাম কিছু করতেছি। ওইটা চিন্তা করলে তো আপনে ইউটিউবে হুজুররা ওয়াজ ছাড়তেছে না! এটাও তো মানুষ দেখতেছে। তো মানুষের উপকারই তো হচ্ছে। আবার আমি গ্রাফিতির ছবি তুলছি! তো এটা দিয়ে হয়তো কারো না কারো উপকার হবে। আমারও হইতে পারে। উপকার না হোক ইতিহাস তো আছে। সো, মাঝে মাঝে মনে হয় যে, আসলে ছবি তোলা, আমি এটার কোনো কনক্লুশন দিব না। আমি আসলে এটা নিয়ে খুব একটা ডিপলি চিন্তা করি নাই। যে কারণে আমার আসলে ওইটা নিয়া আমি কন্ট্রাডিক্ট হচ্ছে কি না, এটা নিয়ে আসলে ওইভাবে ভাবি না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

বেশ, সুন্দর। এই শিল্পীর জন্য আসলে অনেক কিছুই ক্লিয়ারভাবে ভাবতেও হয় না, কারণ কিছু ব্যাপার থাকে, শিল্পের জন্য শিল্পটা করতে হয় অনেক সময়। ভালো বলেছেন। তো আমরা একটু আলাদা একটা প্রশ্নে যাই, এখন আর দুই-তিনটা প্রশ্ন করব আপনাকে, বেশি দূর যাব না। আপনি তো তরুণ, এখন আমাকে বলেন তো, ফটোগ্রাফাররা অনেক সময় তরুণ বয়সে তরুণীদের ছবি তুলতে খুব আগ্রহ বোধ করে, সেক্ষেত্রে আপনার এরকম কোনো আগ্রহ কাজ করে কি না?

 

আসাদ

না, আমার আসলে এটা খুবই ইয়া লাগে। আমি মেয়েদের ছবি তুলতে পারি না। কারণ আমার প্রেমিকা প্রায়ই বলে যে, তুমি মেয়েদের ছবি তুললে মনে হয় আমি তোমার সাথে থাকতাম না। থাকতে পারতাম না।

 

অস্ট্রিক আর্যু

এটা কি, এই যে আপনি মেয়েদের ছবি তুলতে পারেন না, এটা কি ওই ধর্মীয় কোনো বোধ, সাবকনশাসলি আপনার মনের মধ্যে কোনো কাজ করে কি না?

 

আসাদ

এটা হয়তো করে। আবার ধর্মীয় বোধও না। আমি নিজে থেকেই হয়তো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কারণ এটা প্যারা আছে। মেয়েদের ছবির মধ্যে একটা প্যারা আছে যে প্যারাটা আসলে আমি নিতে চাই না। এটাই আসলে মেইন কারণ।

 

অস্ট্রিক আর্যু

আচ্ছা, তাহলে আমরা এখন আবার ফিরে আসি, একটু দুই-একটা সিরিয়াস প্রশ্নই করি। সিরিয়াস প্রশ্ন তো হলোই, কিন্তু তার মধ্যে বলছি যে, আপনি ফটোগ্রাফি নিয়ে বললেন কীভাবে আগ্রহী হলেন, কীভাবে বইটা বের হলো, তারপর বিভিন্ন জনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। তো এখন আপনি একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন ফটোগ্রাফির উপরেই, তার মানে ফটোগ্রাফি নিয়ে আপনি ভাবছেন, যেহেতু ওই বিষয়ে স্টাডি করছেন, তা আপনার কি মনে হয়, সুদূরপ্রসারী কোনো চিন্তাভাবনা আছে ফটোগ্রাফির বিষয়ে? যারা ফটোগ্রাফি করে তাদের মধ্যে অনেকের সিনেমা, শর্টফিল্ম তৈরি করারও আগ্রহ থাকে, অনেকে সেদিকেও যায়। আপনি আমাকে বলবেন, আপনার সিনেমা তৈরীর ব্যাপারে কোনো আগ্রহ আছে কি না?

 

আসাদ

হ্যাঁ আমি তো, এখন ফটোগ্রাফির পাশাপাশি মোটামুটি সিনেমাটোগ্রাফিও করি। আর টুকটাক কমার্শিয়াল কাজও করি। সো, সিনেমা নিয়ে তো আগ্রহ আছে। যেহেতু আমি মিডিয়া স্টাডিজে পড়তেছি। সিনেমা বলেন, এড বলেন এগুলো নিয়ে তো কাজ করার আগ্রহ আছে। তো, আমার একটা ইচ্ছা আছে। আমার যে রুট, আমার যে জায়গা থেকে আমি বেড়ে উঠছি হেফজখানা বলেন বা হচ্ছে… এরপরে এইসব নিয়ে আমি আমার রুট নিয়ে আমি যেভাবে বেড়ে উঠছি কী প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি বা কী পজিটিভিটি আমি পাইছি… সবকিছু তো সব জায়গায় নেগেটিভ থাকে না। পজিটিভও কিছু থাকে। আমি এটা নিয়ে একটা ফিল্ম বানাব, যদি কখনো সুযোগ হয়। হোক সেটা শর্ট ফিল্ম বা সেটা আরো বড় কিছু। ফিল্ম নিয়ে চিন্তা আছে। আমি ফিল্ম বানাইতে চাই আসলে।

 

অস্ট্রিক আর্যু

গুড। তো আমরা এই যে ফটোগ্রাফিক পাবলিকেশন, আসলে বলা হয় এটা একটা এক্সক্লুসিভ পাবলিকেশন। সারা পৃথিবীতে, এটা একটু আবার এক্সপেনসিভও, ফটোগ্রাফি প্রকাশনাটা, কারণ এটা রিস্কিও, বাংলাদেশের প্রকাশনায়, এটা আসলে খুব কমই। তো আপনি কি মনে করেন না যে, আমাদের বাংলাদেশের যে প্রকাশনা জগতে, ৫৪ বছরের প্রকাশনার জগতে, ফটোগ্রাফি নিয়ে আসলে সেভাবে যে পরিমাণ বই হওয়া দরকার ছিল, সেটা আমরা লক্ষ্য করি না, প্রকাশনায় ফটোগ্রাফির উপর বই নিতান্তই কম। আর এই ফটোগ্রাফি তো নানা ধরনের থাকতে পারে, সেক্ষেত্রে আপনি কী মনে করেন? এই প্রতিবন্ধকতা কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে? অথবা এই যে বাংলাদেশে ফটোগ্রাফির বইয়ের প্রকাশনার চর্চার অভাব, এটা নিয়ে দুই-চার কথা বলতে পারেন, এর সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন আপনি।

 

আসাদ

এটার একটা বড় কারণ হইতে পারে, ফটোগ্রাফি পাবলিশ করার চর্চা, এটা অনেক ডিমোটিভ করে। অনেক সিনিয়র ফটোগ্রাফাররা অনেক জুনিয়রদেরকে ডিমোটিভেট করে যে, কিছু একটা তুলছে। কিন্তু ওর মন চাইতেছে ও কিছু একটা করুক। ও যাই তুলুক না কেন! সো, প্রচন্ড পরিমাণে ডিমোটিভেট হয়। যে কারণে আপনার ওই আগ্রহটা হারায়ে ফেলে। আর এটার সম্ভাবনা আছে অনেক। আপনার ছবি তো মানুষ দেখতে পছন্দ করে। সো যদি আলাদাভাবে এত বছরেও একটা আলাদা ফটোগ্রাফির বই ইন্ডিভিজুয়ালি, শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির বই হচ্ছে পাবলিশ করবে বা করে এরকম কোনো পাবলিকেশন আমি জানি না। থাকতে পারে। এরকম আছে কি না আমি জানি না। তো এরকম একটা পাবলিকেশন দরকার ছিল যাদের কাজই হচ্ছে শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির বই বের করা। ওইটা করলে হইতো কি যে, আসলে মানুষ যখন দেখে আপনার চারপাশে কিছু একটা হইতেছে তখন আসলে সেও আগ্রহ বোধ করে যে, আমি এটা পার্টিসিপেট করতে চাই। তখন আসলে এই ফটোগ্রাফি বই পাবলিশের ব্যাপারটা আরো বেশ বড় সড় একটা ইয়ে হইতো। এটা একটা পর্যায়ে গিয়ে অনেক বড় ধরনের একটা ব্যবসায়িক জায়গাও হইতে পারত। তো এখন তো ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম আইসা আসলে ফটোগ্রাফির বুক যে একটা জিনিস হইতে পারে এটা আসলে মানুষ একটা ইয়ে না। তো আমার কাছে মনে হয় যে যদি কেউ চায় তাইলে সে ইন্ডিভিজুয়ালি সেলফ ফান্ডে সে পাবলিশ করতে পারে। যে আসলে…।

 

অস্ট্রিক আর্যু

খুব ভালো একটা কথা বলেছেন যে, পৃথিবীতে অন্যান্য বিশেষ করে উন্নত বিশ্বে আমরা দেখতে পারি, প্রকাশনী আছে এরকম যে, শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির বই করে, কিন্তু বাংলাদেশে এটা দেখা যায় না, এটা খুব এক্সপেনসিভও বটে এবং এটার মার্কেটিং আমাদের এখানে—শুধু ফটোগ্রাফি না, টোটাল বইয়ের মার্কেটিং বাংলাদেশে খুব বাজে অবস্থা, সেক্ষেত্রে ফটোগ্রাফির বই করে টিকে থাকা এটাই বিরাট ব্যাপার, নিশ্চয়ই নতুনভাবে তাদের ভাবতে হবে। তো আমরা একটু শেষের দিকে চলে এসেছি, আর কিছু বলার দরকার নেই। তো, ওকে, ঠিক আছে, থ্যাংক ইউ স্যার।

 

আসাদ

ঠিক আছে ভাই, থ্যাঙকিউ।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments