কাউসার আহমাদ
দারুল উলুম দেওবন্দে যাওয়ার প্রেরণা কোত্থেকে পেলেন? কীভাবে আসলো?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
মালিবাগ জামিয়ার তৎকালীন আসাতিজায়ে কেরামের সবাই এমন ছিলেন—তাঁদের সান্নিধ্য, তাঁদের দরস, তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা; এগুলোই আপনা-আপনি একজন তালিবুল ইলমের অন্তরে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে দিত। আমি আমার ব্যাপারটা আলাদা করে যদি বলি, তাহলে বলব—মাওলানা কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহু, আল্লামা নুর হুসাইন কাসেমি রহিমাহুল্লাহ এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক দামাত বারাকাতুহু; এই চারজনই ওই একই চিন্তা-চেতনা লালন করতেন। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্যে দারুল উলুম দেওবন্দ ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া, এটা তাঁদের সান্নিধ্যে থাকা কোনো তালিবুল ইলমের কলবে আসতোই না; বরং কোনো কোনো তালিবুল ইলমকে তাঁরা নিজেরা খরচ বহন করে দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠাতেন। কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহিমাহুল্লাহর তো এমন মাকাম ছিলো—দারুল উলুম দেওবন্দে কোনো ছাত্র নিতে বাংলাদেশের যে দু-চারজনের সার্টিফাইকে মূল্যায়ন করা হতো, তার মধ্যে একজন ছিলেন কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাদানি রহিমাহুল্লাহর শেষ বছরের শাগরেদ। এরপর তিনি আর দরস দিতে পারেননি। পরপারে পাড়ি জমান।
দেওবন্দ ও দেওবন্দিয়্যাতের ব্যাপারে গভীর সমঝ ও আপসহীন মানসিকতার অধিকারী ছিলেন কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ। আমি যেহুতু এই উস্তাদগণের কাছেই পড়েছি, তাঁদের সান্নিধ্যেই বড়ো হয়েছি; তাঁদের চিন্তা-চেতনা অটোমেটিক আমার ভেতরেও লালিত হয়েছে। মূলত এ কারণেই দারুল উলুম দেওবন্দ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্পই মাথায় আসেনি। দেওবন্দে পড়াশোনার পরেও অন্য কোথাও গিয়ে উচ্চ ডিগ্রি নেবো—এমন কোনো চিন্তা মাথায় আসেনি। মানে অনেক সময় এমনটা হয় না যে, আমি বলতে পারবো—আমি দেওবন্দেও পড়েছি, অমুক বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছি! আমার ভেতরে কখনোই এমন কোনো জযবা আসেনি, এমন তাড়না অনুভব হয়নি। আমার ভেতরে সবসময় এই চিন্তাই কাজ করেছে—দারুল উলুম দেওবন্দে পড়ার পর, এখানকার আসাতিজায়ে কেরামের সামনে বসার পরও পৃথিবীর আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়াটা আমার জন্যে মুনাসিব না। তাঁদের জন্যে বেহুরমতি, বেইজ্জতির কারণ, তাঁদেরকে ছোটো করা হবে, দারুল উলুম দেওবন্দকে হেয় করা হবে যদি আমি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে যাই। তাই আমি ওখানেই আটকে আছি।
কাউসার আহমাদ
দারুল উলুম দেওবন্দে কীভাবে গেলেন? কাদের সঙ্গে গেলেন?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
আমাদেরকে দারুল উলুম দেওবন্দে পাঠালেন আল্লামা নুর হুসাইন কাসেমি রহিমাহুল্লাহ এবং কাজি মুতাসিম বিল্লাহ রহিমাহুল্লাহ। অন্যরা আগেই রওনা হয়ে গিয়েছিলেন। মাওলানা আফসারুজ্জামান কাসেমি, মাওলানা আবদুর রাজ্জাক হুসাইনি-সহ আমার আরও সাথীরা আগেভাগেই রওনা দিয়ে দেন। আমি মালিবাগ জামিয়ার মসজিদে তারাবি পড়াতাম। ওখানে তারাবিতে কুরআন খতম হয় রমজানের পঁচিশ তারিখে। খতম শেষে সাতাইশ রমজানে আমি দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্দেশে রওনা হই। তখন আমার কোনো সফরসঙ্গী ছিলেন না। আমি একাই এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি। তবে রওনার সময় আমাকে কাজি সাহেব রহিমাহুল্লাহ মাদরাসা থেকে বেশ কিছু দূর এগিয়ে দিয়েছিলেন, আর নুর হুসাইন কাসেমি রহিমাহুল্লাহ মৌচাক রেলগেইট পর্যন্ত গিয়ে আমাকে গাড়িতে ওঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমার সাথিদের সঙ্গে দেখা হয় কলকতায় গিয়ে। তাঁরা সেখানেই অবস্থান করছিলেন। তারপর আমরা সেখান থেকে ‘তুফান মেল’-এ করে দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়েছি। মজার ব্যাপার হলো—এই ট্রেন নামে তুফান, কাজে একদম ঠেলাগাড়ি! দেওবন্দে গিয়ে আমরা ঈদের নামাজ পড়ি।
কাউসার আহমাদ
যাওয়ার পথে কোনো বাধাবিপত্তি কিংবা কোনো ঝামলা হয়েছিলো কি!
ইয়াহইয়া মাহমূদ
না, না। তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি। এমনিতে আমাদের ভেতরে ভয়-ভীতি কাজ করেছে—যাওয়ার পথে কী হবে, না হবে! কে কী জিজ্ঞেস করবে, না করবে! এতটুকুই।
কাউসার আহমাদ
দাখেলা ইমতিহানের প্রস্ততি সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন!
ইয়াহইয়া মাহমূদ
দাখেলা ইমতিহানের আলাদা কোনো প্রস্তুতি আমি নিইনি। দেওবন্দে যাওয়ার পরে রুমটা যে কীভাবে পেয়ে গেলাম—এটা আজও আমার বোঝে আসে না। মানে ওখানে গেলাম, রুম পেয়ে গেলাম! সদর গেটের আট নম্বর রুমটি ছিলো আমার নামে। কে কীভাবে ঠিক করে দিয়েছেন, আল্লাহু আ’লাম। সেই রুমেই কোনো সাথি ভাই থেকে দু-একটি কিতাব নিয়ে একটু চোখ বুলিয়েছি। আমার ভেতরে এমনটা কাজ করছিল—‘এখানে পড়বো দাওরায়ে হাদিস, বাংলাদেশ থেকে একবার পড়ে এসেছি, এখানে পরীক্ষা হবে মিশকাতের কিতাবাদি; ও তো একবার পরীক্ষা দিয়েছিই আগে। এঁরা আর নতুন কী জিজ্ঞেস করবেন!’ এমন একটা ভাবসাব ছিলো ভেতরে।
কাউসার আহমাদ
ফলাফল কী হয়েছিলো? তখন আপনার মানসিক অবস্থা কেমন ছিলো?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
হ্যাঁ, দারুণ প্রশ্ন। পরীক্ষা তো হলো। ফলাফলও টানানো হলো। দাখেলা পেয়েছেন যাঁরা, তাঁদের নামের তালিকাই সাঁটা হয়ে থাকে সাধারণত। আমার ভেতরে খুব ভয় কাজ করছিলো। জীবনে দু’বার ফেল হওয়ার আশঙ্কা করেছিলাম। একবার বাংলাদেশে দারুল হাদিসের সেমাহী পরীক্ষায়, দ্বিতীয়বার এই যে দারুল উলুম দেওবন্দের দাখেলা ইমতিহানে। তবে সেমাহী পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অর্জন করি, আলহামদুলিল্লাহ! দারুল উলূমের দাখেলা যদি না পাই, তাহলে তো আর কাউকে মুখ দেখাতে পারবো না। ব্যাগও রেডি করে রেখেছিলাম। দুচোখ যেদিকে যাবে, চলে যাবো সেদিকেই—এমন একটা কল্পনা করে রেখেছিলাম মনে মনে।
ফলাফলের দিন আমি রুমেই ছিলাম। ভয়ে আর তালিকা দেখতে যাইনি। রুমেই কান্নাকাটি করছিলাম রবের দুয়ারে। এর মধ্যে একজন এসে জানালেন—‘আরে! তোমার নাম এসেছে!’ আমি তড়িঘড়ি ওঠে গেলাম। নিজের নাম খুঁজতে থাকলাম নিচের দিকে। বললেন—‘ওই তো তোমার নাম।’ আমি একটু উপরে তাকিয়ে নিজের নামখানা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে রবের শোকরে বললাম—‘আলহামদুলিল্লাহ!’
কাউসার আহমাদ
ফলাফল পরবর্তী বিশেষ কোনো স্মৃতি…
ইয়াহইয়া মাহমূদ
না, তেমন বিশেষ কোনো স্মৃতি নেই। সাধারণভাবেই ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে দরসে উপস্থিত হই। কেননা, সেখানে দাখেলা পাওয়ার পর বাড়তি তেমন কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না।
কাউসার আহমাদ
দরসের বিশেষ কিংবা সুখ-দুঃখের কোনো স্মৃতির কথা মনে পড়ে কি!
ইয়াহইয়া মাহমূদ
দারুল উলুম দেওবন্দের দরসে বেশ কিছু স্মৃতি আছে। বাংলাদেশে থাকতে নিয়মিত ইবারত পড়তাম। ওখানেও ইবারত পড়ার খুউব ইচ্ছে ছিল মনে মনে। দারুল উলুম দেওবন্দে সবচাইতে মায়েনাস দরস ছিলো বুখারি শরিফ ও তিরমিজি শরিফ। তিরমিজি শরিফ পড়ান মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহিমাহুল্লাহ। উনি দরসের খুউব এহতেমাম করতেন। উনার দরসে ইবারত পড়ার আমার খুব জযবা ছিলো। আল্লাহ তাআলার কী ইচ্ছে, উনার দরসে পড়ার জন্যে শওকত ভাগলপুরী নামক এক সাথীকে জিজ্ঞেস করলাম—‘ভাই, কোথা থেকে পড়া শুরু হবে?’ তো উনি আমাকে বলে দিলেন—
وأبو هريرة اختلفو في اسمه…
‘এখান থেকে পড়া শুরু।’ আমি তাঁর দেখানো জায়গা থেকেই পড়া শুরু করি। তো পালনপুরী রহিমাহুল্লাহ বললেন—‘তুঝে ইয়ে নেহি পাতা পড়হায়ি কাহাঁ সে হোগা অর তু পড়নে আ গায়া হ্যায়, চল্ উঠ্, ওহাঁ জা কার বায়ঠ, ওহ কালা সা লাড়কা পড়ে গা।’ এই বাক্যটি বললেন একশ্বাসে। আমিও হুবহু মনে রেখেছি। আমি উঠে চলে গেলাম। তিনি এসে বসলেন এখানে। তাঁর নাম উবাইদুল্লাহ, তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের। এই ছিলো খুব কষ্টকর এক স্মৃতি।
সুখস্মৃতি দুটো। মানে খুউব মনে পড়ে এই দুই সুখস্মৃতির কথা। একটি হলো—বুখারি শরিফের দ্বিতীয় খণ্ডে মাওলানা আবদুল হক আজমি রহিমাহুল্লাহর দরসের এক স্মৃতি। দ্বিতীয় খণ্ডের শুরুর দিকে একটি লম্বা হাদিস আছে। ওই হাদিসটিই আমার ভাগে পড়ে গেল। আমি পড়লাম। তখন পড়ায় সুরও ছিলো, রঙও ছিলো। দুটো মিলিয়েই আমি যখন ইবারত পড়া শেষ করি, সব ছাত্র একসাথে বলে উঠলো—‘আল্লাহ!’ আমি খেয়াল করলাম, হজরত চশমার উপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এরপর এই দরসে আমার খুব নাম ছড়িয়ে গেল। মানে বুখারির ‘কারি সাহেব’ হিসেবে।
দ্বিতীয় সুখস্মৃতি হলো খান সাহেব রহিমাহুল্লাহর দরস। তিনি বছরের লম্বা সময় অসুস্থ থাকতেন। কিন্তু তাঁর কিতাব কাউকে পড়াতে দিতেন না, নিজেই পড়াতেন। আমাদের বছরও তিনি বেশ লম্বা সময় অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার পর যখন ফিরেন, তখন খুব কমই তাকরির করতেন। তাঁর দরস হতো দিনে এবং রাতে, দুইবেলা। একদিন দিনে আমি ইবারত পড়ি। রাতের দরসে ইবারত পড়েন আমাদের সেরা কারিদের—মানে যাঁরা ইবারত পড়তেন খুব সুনামের সাথে তাঁদের—একজন। তাঁর নাম ‘লুকমান আসামী’। তিনি যখন পড়া শুরু করেন, সাথে সাথে খান সাহেব গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন—‘আজ সুবাহ মৌলভি ইয়াহইয়া নে জিস তরাহ পড়হি থি, উস তরাহ পড় হো।’ তাঁর এই এক বাক্যে আমি হয়ে গেলাম হিরো। বুখারি প্রথম খণ্ডের ইবারত পড়ার জন্যে ‘মডেল’ হয়ে গেলাম সব ছাত্রের কাছে। এটাও একটি সুখস্মৃতি।
কাউসার আহমাদ
আর কোনো বিশেষ স্মৃতির কথা মনে পড়ে?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
হ্যাঁ, একবার মাওলানা আরশাদ মাদানি দামাত বারাকাতুহুম তাঁর বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাইয়েছিলেন। এ কথা মাঝেমধ্যে মনে পড়ে। আরও একটি স্মৃতি আমি কখনোই বিস্মৃত হতে পারি না—দারুল উলুম দেওবন্দে গরমের মাঝে রুমে থাকতাম একা একা। একদিন ফজরের সময় আমি ঘুমে ছিলাম। সময় পার হওয়ার পরও আমার ঘুম ভাঙেনি। আরশাদ মাদানি দামাত বারাকাতুহুম টর্চলাইট দিয়ে আমাকে একটি বাড়ি মারলেন। আমি লাফ দিয়ে উঠলাম। তিনি বললেন—‘কিয়া নাম হেঁ?’ বললাম—‘ইয়াহইয়া মাহমূদ।’ জিজ্ঞেস করলেন—‘কাহাঁ কা রেহনে ওয়ালে হো?’ জবাব দিলাম—‘বাংলাদেশ কা।’ তারপর হজরত বললেন—‘তুঝে শরম নেহি আতি? নামাজ কা ওয়াক্ত হো গায়ি হে অর তো সো ড়াহা হে? চল্, উঠ্!’ সেদিনের পর থেকে আমাকে আর কখনোই জাগাতে হয়নি। নিজে নিজেই ওঠে যেতাম।
খান সাহেব রহিমাহুল্লাহর সঙ্গে এক বিশেষ স্মৃতি আছে আমাদের। তিনি অসুস্থ। আমরা কিছু সাথী ভাই দেখতে গিয়েছিলাম তাঁকে। তিনি আমাদেরকে বরণ করলেন। চেয়ার এগিয়ে আমাদেরকে বসতে বললেন। আমরা হুজুরকে বসতে বলায় তিনি বললেন—‘নেহি, আপ মেহমান হেঁ, আপ পেহলে বাইঠিয়ে, ফের মে বাইঠুঙ্গা।’ আমাদেরকে আগে বসিয়ে পরে বসেছেন তিনি। মেহমানের এমন তাজিম সত্যিই বেশ উপলব্ধি করেছি।
আবদুল হক আজমি রহিমাহুল্লাহ আখেরি দরস করতেন রাতে। তাহাজ্জুদের সময় ছাত্রদেরকে সাথে নিয়ে মাকাবারায়ে কাসিমিতে যেতেন৷ এটা তাঁর আদত ছিলো। কিন্তু তাঁর এই অভ্যাস পালনপুরী রহিমাহুল্লাহ পছন্দ করতেন না৷ আমাদের আমির ‘মাওলানা শফিক’ দিনেই শেষ করার পরামর্শ দিলেন। আমি এটা জানতে পেরে হুজুরের কাছে গেলাম। গিয়ে বললাম—‘হুজুর! আপ শাইখুল হাদিস হেঁ অর হজরত তো মুহাদ্দিস হেঁ; আপকি জু রায় হ্যায়, আপ উসি পার চাল্ ইয়ে। আজ তাক জু হোতা রাহা, ওহি কারনা চাহিয়ে, রাত কো খাতাম কী জিয়ে।’ আমার পরামর্শ অনুযায়ী রাতেই শেষ করে মাকবারায়ে কাসিমিতে গিয়েছিলেন। সবার প্রতিকূলে এই পরামর্শে আমিই বিজয়ী হয়েছিলাম।
রিয়াসত আলম বিজনুরী রহিমাহুল্লাহর কাছে যখন বিদায় নিতে গিয়েছিলাম, তখন তিনি একটি উপদেশ দিয়েছিলেন—‘তোমরা যখন নিজ নিজ দেশে যাবে, অবশ্যই কোনো না কোনো মুরব্বির অধীনে থাকবে। মনে রেখো, মুরব্বির প্রকার তিনটি। প্রথম প্রকার মুরুব্বির বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি মুখলিস তবে সতর্ক নন, ভালো পরামর্শ দিতে পারেন না। তো এমন মুরব্বির কাছে আসা-যাওয়া করবে, তিনি কিছু বললে মাথা ঝুলাবে, কিন্তু সাবধান! তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আমল করবে না। দ্বিতীয় প্রকারের মুরুব্বির বৈশিষ্ট্য হলো—সতর্ক আবার ভালো পরামর্শদাতাও, কিন্তু মুখলিস না। তাহলে তাঁর ধারেকাছেও যেও না। তৃতীয় প্রকার মুরব্বির বৈশিষ্ট্য হলো—যদিও এঁদের সংখ্যা কম, কিন্তু পেয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ! তাঁরা হলেন মুখলিস, সতর্ক আবার ভালো পরামর্শদাতাও। এমন মুরুব্বির সন্ধান যদি পাও, তাহলে তাঁর সঙ্গে লেগে থাকবে। তাঁর সান্নিধ্যে থাকবে। তাঁর পরামর্শে চলবে।’
এখান থেকেই আমি জেনেছিলাম মুরব্বি আসলে তিন প্রকারের হয়ে থাকেন।
কাউসার আহমাদ
কোনো উস্তাদের খেদমত করার সৌভাগ্য হয়েছিলো কি?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
আসলে আয়োজন করে কিংবা একান্ত কারও খেদমত তেমনভাবে করা হয়নি আমার। কারও কাছে তেমন যাতায়াতও ছিলো না। যাতায়াত ছিলো মাদানি মঞ্জিলে। ফলে কারও খাদেম হওয়া, কারও কাছে আসা-যাওয়া করা হয়নি আমার। তবে বাংলাদেশে যেমন সবার নেক নজর ছিলো আমার উপরে, ওখানেও সবার নেক নজর ছিলো আমার প্রতি। বিশেষ করে আবদুল হক আজমি, খান সাহেব রহিমাহুমাল্লাহর। কোনো মেহনত ছাড়াই বড়োদের নজরে ধন্য হয়েছিলাম।
প্রসঙ্গ পাল্টে যদি ওখানে পড়াশোনা করার ব্যাপারে একটু বলি, আমি মনে করতাম—‘আমি তো বরকত নেয়ার জন্যে এসেছি এখানে। একবার তো পড়েই এসেছি। এখন শুধু দরসে বসে থাকবো, বরকত নেবো।’ ওভাবে আয়োজন করে পড়েনি, এটা আমার সাংঘাতিক খারাপ একটি কাজ হয়েছে। তবে এমন মনোভাব এমনে এমনে আসেনি। আমার এই মনোভাব সৃষ্টির পেছনে আসজাদ মাদানি সাহেব রহিমাহুল্লাহ। তিনি সকালে হাঁটতে বের হতেন, আমিও সঙ্গী হতাম। আর সকালে মুসলিম শরিফ প্রথম খণ্ডের দরস দিতেন নেয়ামতুল্লাহ আজমি সাহেব। আসজাদ মাদানি সাহেব হাঁটা শেষে আমাকে বলতেন—‘চলো, আমার সাথে নাস্তা করবে।’ আমি বলতাম—‘সকালের দরস তো শুরু হয়ে যাবে। দরসে উপস্থিত হতে হবে।’ তখন তিনি বলতেন—‘তুমি তো একবার পড়েই এসেছো। এখানে তো এসেছো কেবল বরকত নিতে।’ তো এখান থেকেই আমার ভেতরে এমন একটি মনোভাব সৃষ্টি হতে লাগলো, যেটা নিঃসন্দেহে আমার জন্যে কল্যাণকর ছিলো না।
কাউসার আহমাদ
কোন কিতাব কোন উস্তাদের কাছে পড়েছেন?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
আমাদেরকে বুখারি শরিফ প্রথম খণ্ড পড়িয়েছেন খান সাহেব রহিমাহুল্লাহ, দ্বিতীয় খণ্ড পড়িয়েছেন আবদুল হক আজমি রহিমাহুল্লাহ, তিরমিজি প্রথম খণ্ড পড়িয়েছেন মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহিমাহুল্লাহ, দ্বিতীয় খণ্ড পড়িয়েছেন আরশাদ মাদানি দামাত বারাকাতুহুম, শামায়েলে তিরমিজি পড়িয়েছেন আবদুল খালেক মাদরাজি রহিমাহুল্লাহ, আবু দাউদ শরিফ পড়িয়েছেন আল্লামা বিহারি রহিমাহুল্লাহ, নাসাঈ শরিফ পড়িয়েছেন মাওলানা যুবায়ের রহিমাহুল্লাহ, ইবনে মাজাহ পড়িয়েছেন রিয়াসত আলি বিজনুরী রহিমাহুল্লাহ।
কাউসার আহমাদ
দেশের বাহির থেকে যেসব ছাত্র ছিলেন, তাঁদের সাথে কেমন সম্পর্ক ছিলো?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
আমাদের বছর খাস কোনো বড়ো মনীষীর আগমন ঘটেনি দেওবন্দে। আসাম, কেরালা-সহ অন্যান্য অঞ্চলের সাথীদের সঙ্গে ভালোই ভাব ছিলো আমার। ছোটোখাটো কোনো অনুষ্ঠান হলে আমরা একত্রে খুব উপভোগ করতাম। আমার বাংলাদেশি সাথীরা ছিলেন বেশ মিশুক। আমাদের বছর আল্লামা নুর হুসাইন কাসেমি রহিমাহুল্লাহ দেওবন্দে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন বহু কারণে তবে অন্যতম কারণ ছিলাম আমি। আমার ব্যাপারে তাঁর কাছে সংবাদ পৌঁছেছে—আমি উপন্যাস পড়ি। আমি যাতে এই কাজ না করি, সে লক্ষ্যে আমাকে কিছু নসিহতও করেছিলেন হুজুর।
কাউসার আহমাদ
দরসে আসাতিজায়ে কেরামের বিশেষ কোনো নসিহতের কথা যদি বলতেন…
ইয়াহইয়া মাহমূদ
সর্বশেষ দরসে খান সাহেব রহিমাহুল্লাহ মাত্র একটি কথাই বলেছেন—‘তুম দারুল উলুম দেওবন্দ কে ফারযান্দ হো, তুমহে দারুল উলুম কি লাজ রাখনি চাহিয়ে।’ এ কথার মাঝে কী রুহানিয়াত ছিলো, আল্লাহ জানেন, তিনিই জানেন; পুরো দারুল হাদিসে ছাত্রদের কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিলো।
আল্লামা বিহারি রহিমাহুল্লাহ কোনো এক দরসে বলেছিলেন—‘মে বড়ে আল্লামা নেহি হো, গোল টুপি নেহি হে, লম্বা কুড়তা নেহি হে, পাগড়ি নেহি হে; মাগার মে মানহুস হো। আহার কিসি কো মেরি নুহুসাত লাগ গায়ি তো উসকা খায়ের নেহি।’ উনার এই কথায় পুরো শরীর কেঁপে ওঠেছিলো। তিনি এ কথা কোনো এক দুষ্টু ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। জানি না, ওই ছাত্রের অবস্থা কী হয়েছে পরে।
কাউসার আহমাদ
কবে, কীভাবে ফিরেছেন? ফেরার পথে সফরসঙ্গী ছিলেন কেউ? নাকি এবারও একা ছিলেন?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
না না, আমরা কয়েকজন একসাথেই ফিরেছি। তার মধ্যে মাওলানা আফসারুজ্জামান কাসেমি, আমি, ওয়াহিজ্জামান, আর নোয়াখালীর একজন ছিলেন। দেওবন্দে পৌঁছার পরেই তো পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। ফিরার সময় তো এলাহি ভিসা! রওনা দিলাম। পুরো পথই ভালোভাবে আসলাম। সাতক্ষীরা বর্ডারে এসে পৌঁছুলাম। বর্ডার পারও হয়ে গেলাম সহজে। বাংলাদেশে এসে পড়লাম ভারি বিপাকে। বিডির পুলিশ আমাদেরকে ভালোভাবেই ইস্তিকবাল করেছেন! ব্যাগের জামাকাপড়, কিতাবপত্র সব এলোমেলো করে অবস্থা কাহিল। আমাদের কাছে কোনো অবৈধ মালামাল আছে কিনা, সেটাই যাচাই করা হচ্ছে আরকি! আমি একটি শাল কিনে ব্যবহার করেছিলাম সেখানে। দারুণ পছন্দের ছিলো শালটি। আমার শালটি পুলিশ নিয়ে নেয়। মাওলানা আফসারুজ্জামানের জামাকাপড়, শালও নিয়ে নেয় তারা। ওহ হ্যাঁ, পুলিশগুলো ছিলো নোয়াখালীর। আমাদের নোয়াখালীর সাথী ভাই গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে জামাকাপড়ের সামনে এগিয়ে গেল। বললো—‘আপনার শাল কোন গা?’ কাসেমি বললো—‘এ গা।’ তারপর সে বললো—‘হুরান, নিয়া যান।’ এই দৃশ্য দেখে আমিও বললাম—‘আর গাও হুরান।’ জিজ্ঞেস করলো—‘কোন গা?’ আমি আমার শালটি দেখালাম। সে তাড়াহুড়ো করে বললো—‘না, এ গা নতুন।’ আমি আর শালটি পেলাম না৷ পরে এসে বলেছিলাম—‘আহারে, আজকে যদি বাড়িটা নোয়াখালী হতো, তাহলে শালটি পেয়ে যেতাম!’ ওখানেই রাত যাপন করলাম। সাধারণ জনগণ আমাদের বেশ খাতিরযত্ন করলো। সকালে আমাদেরকে বলা হলো—হেলিকপ্টারে চড়িয়ে দেবো। হেলিকপ্টারের কথা শোনে দিলটা খুব খুশি হয়ে গেল। হেলিকপ্টার যেহুতু বলেছে, তাহলে সাংঘাতিক বড়ো কোনো গাড়ি হবে হয়তো! আকাশে উড়ার হেলিকপ্টার যে না, তা তো বুঝছিই। তো পরে দেখি কি, সাইকেলের পেছনে কাঠ দিয়ে সীট বাঁধা! অগত্যা সে হেলিকপ্টারে চড়ে সেখান থেকে আসলাম। ওই সময় একটি ব্যাপার বেশ উপলব্ধি হয়েছে, এই যে ইন্ডিয়ায় আসলাম-গেলাম, কোত্থাও কোনো হট্টগোল নেই, প্রশাসনিক অবস্থাও বেশ ভালো; এরপরও মনের ভেতর একটি ভয়, শঙ্কা, অসহায়ত্ব সবসময়ই কাজ করেছে। অথচ বাংলাদেশে এসেই দেখলাম মারামারি, কত উল্টাপাল্টা; তবুও মনের ভেতর এক শান্তি বিরাজমান। এ থেকে সেদিন আমি বুঝেছিলাম স্বাধীনতা কতটা দামি আসলে! নিজের দেশ, নিজের মাতৃভূমি। এক অন্যরকম শান্তি অনুভূতি হয়েছিলো তখন।
কাউসার আহমাদ
এসে সর্বপ্রথম কোথায় অবস্থান করেছিলেন?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
খুব সম্ভবত মালিবাগ জামিয়ায় এসে অবস্থান করেছিলাম। কেননা, তারাবির নামাজ পড়াতে হবে। তারপরে বাড়িতে গিয়েছিলাম।
কাউসার আহমাদ
দেওবন্দে কাটিয়েছেন কোন সাল?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
৮৭-৮৮, এই এক বছরই ছিলাম।
কাউসার আহমাদ
বাংলাদেশে এসে আপনার মানসিক অবস্থা কেমন ছিলো? দারুল উলুম দেওবন্দের স্মৃতি আপনাকে কতটুকু বিষণ্ণ করতো?
ইয়াহইয়া মাহমূদ
এটা তো অনস্বীকার্য—দারুল উলুম দেওবন্দ এক নুরানি পরিবেশ। ওখানকার দরস, উস্তাদদের সান্নিধ্য—সবকিছুই বেশ ঢেউ তুলে চোখের পাতায়। এখানের সময়টা স্বপ্নের মতোই কেটেছে। কিন্তু এটা কঠিন বাস্তবতা—আমি ওখানে থাকার জন্যে যাইনি, ওখান থেকে চলে আসার জন্যেই গিয়েছি। পৃথিবীর বুকে মক্কা মুআজ্জমা ও মদিনা মুনাওওয়ারা থেকে সেরা কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সেখানে কেউ গেলে ফিরতি টিকিট কেটেই যায়। হ্যাঁ, আল্লাহ পাক কাউকে কবুল করলে, কেউ সেখানে হিজরত করে থাকলে; তার কথা ভিন্ন। বাদ বাকি নিরানব্বই ভাগ মানুষ ফিরতি টিকিট কেটেই যায়। আসার সময় খারাপ লাগে, কিন্তু ফিরে আসাটাই বাস্তবতা। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ফিরে আসাটাই বাস্তবতা। তবে ওখানকার সেই পরিবেশে যেতে ইচ্ছে করেছে, কতবার যে মন চেয়েছে—ওই দারুল হাদিসে, ওই ছাত্রদের সাথে মিশে পড়ে আসি। মাকবারায়ে কাসিমিতে যাওয়ার স্মৃতি, মাদানি মঞ্জিলে আসা-যাওয়ার স্মৃতি, আসাতিজায়ে কেরামের মুখলেসানা সাদেগি—এ সবকিছু বারবার মনে পড়ে, কড়া নাড়ে। আসলে দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে কোথাকার তুলনা চলে না।
কাউসার আহমাদ
সংক্ষেপে দারুল উলুম দেওবন্দ সম্পর্কে আপনার অনুভূতিটুক যদি বলতেন…
ইয়াহইয়া মাহমূদ
দারুল উলুম দেওবন্দ একটি চেতনার নাম, একটি আন্দোলনের নাম৷ দারুল উলুম দেওবন্দ কোনো একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। একাডেমিক প্রতিষ্ঠান হলো আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়। দারুল উলুম দেওবন্দ একটি চেতনার বাতিঘর। আজাদির চেতনার বাতিঘর। এক নীতি, আদর্শে আপসহীন থেকে সহিহ চিন্তা-চেতনা নিজের ভেতরে লালন করে অন্যের ভেতরে কীভাবে তা প্রোথিত করা যায়, ইসলামের দুশমনের মোকাবেলায় কী কী কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যায়—এই তালিমের এক মারকাজ হলো দারুল উলুম দেওবন্দ। আকাইদের সাথে সাথে আমল-আখলাকের উন্নতি সাধন, তাআল্লুক মাআল্লাহ, ইনাবাত ইলাল্লাহর এক জযবা পয়দা করার প্রতিষ্ঠান হলো দারুল উলুম দেওবন্দ। এ দেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়িত কখনোই হতো না, যদি দারুল উলুম দেওবন্দ এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা না রাখতো। এই ইতিহাস আজকাল সবারই জানা, সবাই উলামায়ে দেওবন্দের এই ত্যাগ-মহিমা স্বীকারও করেন। এ আর নতুন করে কিছু বলার নেই।