জুলাই রেকর্ডস : আপনার ছেলে শহীদ জুবায়েরের সম্পর্কে বলেন। তার বেড়ে ওঠা, শিক্ষাজীবন, তারপর আন্দোলনে কীভাবে যোগ দেয়?
আনোয়ার উদ্দিন : আমার ছেলে শহীদ জুবায়ের হোসেন গাওরহাঁটা বিদ্যালয় থেকে ৮ম শ্রেণি পাশ করে। তারপর গৌরীপুর ভোকেশনাল কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনারত ছিলো। মোবাইল-মোটর ইত্যাদি সাবজেক্ট ছিলো তার। তারপর মোবাইল সার্ভিসিং শিখে একটা দোকান দেয়। ভারত থেকে কাঁচামাল আনতো। ময়মনসিংহ শম্ভুগঞ্জে ছিলো ওর দোকান। এই দোকান করে একটা বড় অর্থের জোগান সে দিতো পরিবারে। বোনদের পড়াশোনা করাইতো। সৎ সাহসী মানুষ ছিলো। সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতো।
জুলাই রেকর্ডস : আপনার সাথে জুবায়েরের সম্পর্ক কেমন ছিলো?
আনোয়ার : জুবায়ের দোকান থেকে এসেই আমি খাবার খাইছি কিনা জিজ্ঞেস করতো। ওর মা খাইছে কিনা, আমাদের ঘুম ঠিকঠাক হইছে কিনা। আসার পর ১০-১৫ মিনিট আমার চৌকিতে শুয়ে আমাদের খোঁজ খবর নিতো। দোকানের ব্যবসার খবর দিতো। কত টাকা আয়-ব্যয়, কতো টাকা মুনাফা সব বলতো। কখনো কিছু গোপন করতো না। ওর ছোটভাই কাউসার আউটসাইডে কম্পিউটার শিখে, সেটার খোঁজ নিতো। ওর কলেজের খরচ দিতো। সব খরচ বহন করতো। অমায়িক একটা মানুষ ছিলো। পথে-ঘাটে যে যেভাবে চাইতো, দিতো। আল্লাহ ওকে টাকাপয়সা দিছিলো সাথে দিছিলো একটা উদার দরাজ দিল।
পাড়ার, বাজারের সবাই এখনো ওর অমায়িকতা সততার কথা বলে। যতদিন ও ছিলো আমরাসহ আরো আশেপাশের মানুষরা একটা সুবিধায় ছিলাম। কোনখানে টাকা-পয়সা লাগলে ও দিছে। ৫০-১০০ মানুষরে দান করছে। খাওয়াইছে।
কিশোরগঞ্জ, নান্দাইল, ভালুকা আরো আশেপাশে যে কয়টা জায়গা আছে সবখানে মোবাইলের পার্টস বিক্রি করতো সে। সে এই ব্যবসায় এত অভিজ্ঞ ছিলো, তার সত্যায়নে সাক্ষর করছে কলেজের টিচাররা। এই যে এই কাগজটা দেখেন, এটা সত্যায়নপত্র। কলেজ থেকে দিছে।
জুলাই রেকর্ডস : মায়ের সাথে কেমন সম্পর্ক ছিলো।
আনোয়ার : অনেক ভালো। ওর মা একটু অসুস্থ হইলে ও পাগল হয়ে যাইতো। তৎক্ষনাৎ ডাক্তার দেখায়ে ওষুধ কিনে পরে দোকানে যাইতো। এর আগে না। এমন অমায়িক ছিলো আমার ছেলে।
জুলাই রেকর্ডস : আপনার কয় ছেলে মেয়ে? ছেলেদের মধ্যে জুবায়ের কয় নাম্বার ছিলো?
আনোয়ার : আমার ৩ ছেলে ৫ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে জুবায়ের ২ নম্বর ছিলো।
জুলাই রেকর্ডস : উনি আন্দোলনে কীভাবে যায়, কখন যায়, আপনারা জানতেন কিছু?
আনোয়ার : হ্যাঁ। এমনে ছাত্রদল করতো ও। আমাদের ইউনিয়ন মেম্বার বিএনপির। গ্রামের সবাই বিএনপি করতো। সেই হিসেবে সব আন্দোলনে যাইতো-ও। আমি ওরে মানা করতাম, বলতাম তুমি ছাত্র মানুষ, করো ব্যবসা। রাজনীতি আলাদা জিনিস। এতে জড়াইয়ো না।
যেদিন শহীদ হয় সেদিন ও যাবে কলতাপাড়া। ওর মারও ওষুধ আনতে যাওয়ার কথা ময়মনসিংহ। মাকে বলছে, মা যাইয়ো না আজকে গন্ডগোল বেশি ওইদিকে। এই কথা বইলা বাড়ির পাশের দোকানের সামনে বসছে কতক্ষণ। আমার সাথে দেখা হইছে। জিজ্ঞেস করছি, কই যাও। কয় কলতাপাড়া। আমি কই, যাইয়ো না, আজকে তো গন্ডগোল চলে। কয় সাইড দিয়া যামু। তারপর বাসে চলে গেছে। যেই দেখছে মিছিল, একেবারে সামনে গিয়ে পুরা নেতৃত্ব সে দিছে। ভিডিও আছে। গুলি লাগছে মনেহয় ১:৩০ এর দিকে।
জুলাই রেকর্ডস : আন্দোলন কয়টা থেকে করছে জানেন?
আনোয়ার : আমি তো জানি না, আমি ছিলাম না। মানুষের কাছ থেকে এতটুকু শুনলাম।
জুলাই রেকর্ডস : আর কী কী শুনছেন?
আনোয়ার : শহীদ বিপ্লব হোসেনের বাপ-ভাইদের সাথে ওর পরিচয় ছিলো অনেক। চা-টা খাইতো, আড্ডা দিতো। এই গ্রামের চাইতে কলতাপাড়ার মানুষের সাথে বেশি পরিচয় ছিলো ওর। তারপর শম্ভুগঞ্জ। ওখানকার মানুষ অনেক ভালোবাসতো ওরে। লাশ ওইখানে নেওয়ার পর ওরা মৃত্যুসংবাদ মাইকিং করছে। সেখান থেকে হুন্ডায় করে মানুষ আসছে এদিকে। পরে মাগরিবের পর জানাজা হইছে।
জুলাই রেকর্ডস : আপনারা কখন জানছেন?
আনোয়ার : একজন ফোন করে বলছে জুবায়ের মারা গেছে।
জুলাই রেকর্ডস : ফোন করেই এটা বলছে?
আনোয়ার : না, বলছে যে গুলি খাইছে। বুঝছি আর কি যে হয়তো মারা গেছে।
জুলাই রেকর্ডস : এটা কখন?
আনোয়ার : আমি যোহরের নামাজ পড়তে ঢুকতেছি মসজিদে এমন সময়।
এরপর আমি শম্ভুগঞ্জ যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। কারণ হাসিনা পাওয়ারে, কোনসময় কি না কি করে। আর লাশ নিয়া বার্গেটিং যাতে না করতে পারে তার জন্যও যাওয়া লাগবে। দরকার হইলে আমি মরব কিন্তু ছেলের লাশ নিয়ে আসব। যেহেতু গুলি চলতেছে তখনো।
জুলাই রেকর্ডস : আপনি তখন কি শিওর যে মারা গেছে?
আনোয়ার : শিওর না। কিন্তু আশঙ্কা করতেছিলাম। এরমধ্যে ওইখানের লোকজন ওরে নিয়া ময়মনসিংহ মেডিকেল চলে গেছে। ওখান থেকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে রক্তের গ্রুপ কি ওর। আমি বললাম, জানি না। বাসায় আছে কার্ড। খুঁজতে হবে। এর দুই সেকেন্ডের মাথায় আবার কল দিছে, বলে যে, লাগবে না রক্ত, আমরা চলে আসতেছি। তখন শিওর হয়ে গেছি যে ও মারা গেছে।
জুলাই রেকর্ডস : মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর আপনার কেমন লাগছে?
আনোয়ার : আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে তখনি ২ রাকাত নামাজ আদায় করছি। যে আমার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিছে। ও ছিলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে আমানত, যেই পথ জান্নাতের আল্লাহ সেই পথে নিয়ে গেছে। সেটাই উত্তম।
জুলাই রেকর্ডস : কিছুটা কি ভেঙে পড়েন নাই?
আনোয়ার : তা তো হবেই। কিন্তু আল্লাহ আমারে শক্তি দিছে। আমি ওর জানাজা পড়াইছি। নিজ হাতে কবরে নামাইছি। পশ্চিম দিকে ফিরায়ে মুখের গিঁট খুলে দিছি। এতটুকু করার শক্তি আল্লাহ না দিলে আমি পারতাম না। কোন বাপ তার ছেলের জানাজা পড়াইতে পারে না যদি খোদা সেই শক্তি না দেয়। কবর দেওয়া সম্ভব হইতো না নিজ হাতে যদি খোদা তৌফিক না দিতো।
হাসিনার ক্ষমতা তখন। এতসব কারফিউ ভেঙে হাজার হাজার মানুষ আসছে আমার জুবায়েরের জানাজা পড়তে। দশ গ্রামের মানুষ আসছে অন্তত মোটরসাইকেলে করে। এত অমায়িক, আর মানুষের কাছে এত প্রিয় ছিলো আমার জুবায়ের। ও এতো গুণী ছিলো, ওর কথা বলতে গেলে দিন ফুরায়ে যাবে আমার। আমি তো বেশি বলতে পারবো না, অন্যান্য মানুষ আরো বেশি গুণ বলবে তার। বাবা হিসেবে আমি পছন্দ করতাম আমার শহীদ ছেলেটারে।
জুলাই রেকর্ডস : উনার মাকে কীভাবে সামলাইছেন?
আনেয়ার : আমি তো বুঝাই সারাদিন। এখনো ঘুমের মধ্যে জুবায়ের জুবায়ের বলে কান্না করে। জুবায়েরের সাথে ভিডিও আছে একটা। ছেলে মায়ের কাঁধে হাত রেখে ভিডিও করছে। আমার মেয়েগুলি দেখাইছে মারে এটা। এসব দেখে আর কান্না করে। আমি তারে নবীদের কথা বলি। ইতিহাসের কথা বলি। বলি দেশের জন্য জীবন দিছে তোমার ছেলে, এটা গর্ব তোমার জন্য। আমাদের ইউনিয়নে ৪ হাজার পোলাপান আছে, কই কেউ তো দেশের জন্য জীবন দিতে পারে নাই। আল্লাহ তোমার জুবায়েররে কবুল করছে। আল্লাহ ওরে সম্মানিত করছে। বলি, দেখো পুরা প্রশাসনের বড়ো বড়ো অফিসাররা এসে তোমার ছেলের কবর জিয়ারত করে। কতো পড়াশোনা করা মানুষ তারা, বিসিএস ক্যাডার, কতো কি। তারা আসে তোমার ছেলের কবর দেখতে। ছেলে যদি শহীদ না হইতো এরা আসতো? আর কারো কবরে আসে? এসব বলে সান্ত্বনা দেই। একটু বন্ধ করে কান্না। ঘর থেকে বের হয়ে গেলে আবার শুরু করে। এই এক বছর এমনি চলতেছে। আরো দুই ছেলে, পাঁচ মেয়ে আছে। কিন্তু জুবায়েরের জন্যই কাঁদে।
জুবায়ের আমার কর্মঠ কামাই করা সন্তান ছিলো। দেশের জন্য জীবন দিয়ে দিছে। হাসিনারে দেশছাড়া করছে। গনতন্ত্র তো লুট করে রাখছিলো হাসিনা। ওরে না সরাইলে চেয়ারে বসতে পারতো আর কেউ! সাড়ে সাত কোটি মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করছে রক্ত আর অর্থ দিয়ে। এদেশে গনতন্ত্র আনছে। সেটা আবার লুট করছে হাসিনা। সেই হাসিনা মানুষ খুন করছে, গুম করছে, অবৈধভাবে সম্পদ পাচার করছে। তার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য জীবন দিছে আমার ছেলে।
যেই সরকারের চুর-ডাকাতি থেকে কিছু রক্ষা পায় নাই, যে নির্বিচারে গুলি করে মারছে মানুষ। আমাদের কলতাপাড়ায় মারছে আমার ছেলেকে। উত্তরায় কলেজ ছাত্রদের মারছে, গণকবর হইছে। আবু সাঈদরে মারছে। সেই হাসিনারে সরাইছে এই শহীদেরা। গনতন্ত্র ফিরায়ে আনার জন্য। তাদের জীবনের মূল্য কেউ দিতে পারবে না। আল্লাহ তাদের কবুল করছে এই কোরবানির জন্য।
জুলাই রেকর্ডস : আপনার আরো ৭ সন্তান আছে। তারপরও কি ওর শূন্যতা অনুভব হয়?
আনোয়ার : ও আমার সবচাইতে ভদ্র, কর্মঠ ছেলে। মানুষ ওকে অনেক ভালোবাসতো। আমরা সবাই। ওর শূন্যতা আমাদের কাছে সীমাহীন।
জুলাই রেকর্ডস : আপনি আপনার ছেলের জন্য গর্ববোধ করেন?
আনোয়ার : না, গর্ব বা অহংকার না। আমার ছেলেসহ আরো শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বিশ কোটি বাঙালির যে ভাগ্যের পরিবর্তন হইছে এটা কল্পনা করে শান্তি পাই। এখন আমি যদি অহংকার করি তাইলে হয়তো আমার ছেলের উপর, আমার উপর খোদা নারাজ হবে। আমি শুকরিয়া আদায় করি শুধু। আর আশা করি আমার ছেলে শহীদ জুবায়েরের সুপারিশে ৭০ জন মানুষ জান্নাতে যাবো আমরা। এটাই আশা করি আল্লাহর কাছে। তারা শহীদ হয়ে ৭০ টা মানুষকে জান্নাতে নেওয়ার সুযোগ করে দিছে। আবার আমাদের রিজিকের ব্যবস্থাও করে গেছে, যেমন সরকার বলছে এই পরিমাণ বরাদ্দ দিবে শহীদ ফ্যামিলির জন্য। এইটার বিনিময়ে তাদের তো কিছু দিতে পারবো না দোয়া ছাড়া। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর আমি দোয়া করি আমার ছেলেসহ সকল শহীদের জন্য। এবং এটাই উচিত বলে মনে করি।
জুলাই রেকর্ডস : এক বছরের বেশি হয়ে গেছে, এখনো কি বিচারের কোন আলামত দেখতে পান আপনি?
আনোয়ার : না, কই? শুধু শুনলাম দুইটা পুলিশ গ্রেফতার হইছে। আর তো কিছু পাই নাই। যারা দেশে অরাজকতা করছে তারা তো কেউ গ্রেফতার হয় নাই তেমন। বহাল তবিয়তে আছে অনেকে। হাসিনার লোক যারা সরকারে ছিলো তারা সেখানেই আছে।
জুলাই রেকর্ডস : দুইজন পুলিশ তো শুধু গৌরীপুর (ময়মনসিংহে) গ্রেফতার হইছে, সারাদেশের খবর কি জানেন?
আনোয়ার : সারাদেশের খবর তো তেমন জানি না। কিন্তু বিচারের কোন অগ্রগতি তো দেখি না। এত গুন্ডামি, অরাজকতা যারা করছে তাদের গ্রেফতার করলে দেশের চিত্রই পরিবর্তন হয়ে যাইতো। কই তা তো দেখি না।
জুলাই রেকর্ডস : আপনি কি বিচার দাবি করেন?
আনোয়ার : হান্ড্রেড পার্সেন্ট বিচারের দাবি করি। সমস্ত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি। ডাক্তার ইউনূস যেন বিচার করে তারপর নির্বাচন দেন সেই দাবি করি। উনি চাইলে তো তাড়াতাড়িই বিচার কার্যক্রম করতে পারেন, আসামি ধরতে তো আর বছর বছর লাগে না। উনি তো আদেশ করেন না গ্রেফতারের। করলে এতদিনে বিচার হয়ে যাইতো। তবুও শেষ ভরসা হিসেবে তার কাছে জুলাইয়ের সমস্ত খুনির বিচার ও ফাঁসির দাবি করি আমি। আমার ছেলের খুনের বিচার চাই।