দানিশমান্দ ও আহমাদ ফালুদ্দীন

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : ইবরাহিম ফাওজি

মাহদি হাসান

আহমাদ ফালুদ্দীন। মৌরিতানিয়ান এই লেখক সম্প্রতি বাংলাদেশেও বেশ নজর কেড়েছেন। তার নাম প্রথম আলোচনায় আসে যখন তিনি তার আফগানিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘হাজারুল আরদ’ বইটি লিখেছিলেন। যা বাংলা ভাষায় ‘অটুট পাথর’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। এরপর নতুন করে তার নাম আলোচনায় আসে তার রচিত ইমাম গাজালির জীবন ও দর্শনভিত্তিক ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘দানিশমান্দ’ প্রকাশিত হওয়ার পর। অনবদ্য এই উপন্যাসটি ২০২৫ সালের ‘ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিক ফিকশন’ (IPAF)—যা বিশ্বজুড়ে ‘আরব বুকার’ নামে সমধিক পরিচিত—তার সংক্ষিপ্ত তালিকায় (শর্টলিস্ট) স্থান করে নিয়েছিল। লেখকের এই কালজয়ী সৃষ্টি ও সাহিত্যিক পথরেখা নিয়েই তার মুখোমুখি বসেছিলেন মিসরীয় লেখক ও অনুবাদক ইবরাহিম ফাওজি। এখানে সেই সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ পরিবেশন করা হচ্ছে।


ইবরাহিম ফাওজি: ‘দানিশমান্দ’ সৃষ্টির প্রেরণা কোথা থেকে এলো? আর এটি রচনার রূপরেখা কেমন ছিল?

আহমাদ ফালুদ্দীন: উপন্যাসটির অবিন্যস্ত বীজ হয়তো ১৯৯৫ সালের এক নিঝুম গ্রীষ্মে আমার মনে প্রথম শিকড় গেড়েছিল। তখন আমি দক্ষিণ মৌরিতানিয়ার এক নির্জন গ্রামের খামারে দিন কাটানো এক কিশোর। সে সময়েই প্রথম হাতে আসে ইমাম গাজালির বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মানুসন্ধানের সেই কালজয়ী আখ্যান ‘আল-মুনকিজ মিনাদ দলাল’ গ্রন্থটি। ইসলামি সংস্কৃতির ইতিহাসের প্রদীপ্ততম একজন মনীষী কীভাবে অবলীলায় তার অগাধ বিত্ত আর যশ ছুড়ে ফেলে দিয়ে শুধুমাত্র আত্মিক মুক্তির সন্ধানে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেলেন, সেই হাহাকার আমার কিশোর কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। আমার তখনকার সেই অপরিপক্ব ভাবনায় আমি যেন স্পষ্ট দেখতাম, বাগদাদ, দামেস্ক আর জেরুজালেমের প্রাচীন প্রান্তর ধরে একাকী হেঁটে চলেছেন এক পথিক। তার এমন আকাশচুম্বী পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও চারপাশের চেনা নগরী তাকে চিনতে পারছে না। অবচেতনের কোনো এক গহিন কোণে সেই ভাবনার বীজটি হয়তো যুগ যুগ ধরে বেড়ে উঠছিল। অবশেষে ২০২৩ সালে এসে তা কাগজের বুকে অবাধ্য হয়ে ঝরে পড়েছে।

 

ইবরাহিম ফাওজি: আপনি ‘দানিশমান্দ’ নামটিই কেন বেছে নিলেন?

আহমাদ ফালুদ্দীন: সত্যি বলতে, আমার যেকোনো উপন্যাসের নাম ঠিক করাটা সাধারণত একটি দুঃসাধ্য কাজ। ঠিক যেন নিজের সন্তানের নামকরণের মতো। উপন্যাসের নামকরণের ক্ষেত্রে আমার মূল মাপকাঠি হচ্ছে, নামটির ভেতরে মূল চরিত্র অথবা উপন্যাসের কেন্দ্রীয় বার্তার একটা প্রচ্ছন্ন আভাস থাকতে হবে। অন্যভাবে বললে, এটি মূল ভাবটিকে এমন এক রহস্যময়তার আবরণে ইঙ্গিত করবে, যা পাঠকের কৌতূহলকে উসকে দিবে। আর ঠিক এই কারণেই, অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর আমি এই ফারসি শব্দ ‘দানিশমান্দ’ বেছে নিয়েছি। যেটি ছিল খোদ ইমাম গাজালির উপাধি। বাগদাদ এবং নিশাপুরের মানুষ যখন শিক্ষা-দীক্ষা, ফতোয়া আর লেখালেখির জগতে তাকে প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করত, তখন তারা তাকে ‘দানিশমান্দ’ বলেই ডাকত। ইমাম গাজালির সেই সময়ে ‘দানিশমান্দ’ শব্দটির মর্যাদা ছিল আজকের দিনের ‘প্রফেসর’ বা অধ্যাপকের মতোই। তবে এটি একটি বিদেশি (ফারসি) শব্দ হওয়া সত্ত্বেও, তার আরব ছাত্ররা বেশ আগ্রহের সঙ্গেই এই উপাধিটি ব্যবহার করত।

 

ইবরাহিম ফাওজি: ইসলামি ইতিহাসের এই সুনির্দিষ্ট সময়কালটি আপনাকে কোন কোন বিষয় অন্বেষণ করার সুযোগ করে দিয়েছে?

আহমাদ ফালুদ্দীন: এই সময়কালটির মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল রাজনৈতিক পতন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের এক অদ্ভুত দ্বিমুখী সহাবস্থান। ইমাম গাজালির জীবনকালটি এমন এক মহাসংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছিল, যখন একদিকে ছিল সেলজুক রাজপুত্রদের গৃহবিবাদ, অন্যদিকে ছিল ইসমাইলি বাতিনিদের তৎপরতা এবং পরবর্তীকালে চলছিল ক্রুসেডারদের সঙ্গে তীব্র সংঘাত। চারপাশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যখন যুদ্ধবিগ্রহ আর কলহে দীর্ণ, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন মুখরিত ছিল যুক্তিতর্ক আর শাস্ত্রীয় বিতর্কে। মহিমান্বিত মসজিদগুলো তখন মুখর থাকত আলিম-ফকিহদের জ্ঞানগর্ভ সমাবেশে আর সুফিদের খানকাগুলো পূর্ণ থাকত সাধক আর মরমি জিকিরের পুণ্য সুরমূর্ছনায়। সে সময়কার মহান ইসলামি রাজধানীগুলোর বুকজুড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল অসংখ্য সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। রাজনৈতিক অবক্ষয় আর বুদ্ধিবৃত্তিক এই সমৃদ্ধির যুগলবন্দি থেকে স্পষ্ট হয় যে, সে আমলের ইসলামি বিশ্বে রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝে একপ্রকার শিথিল সম্পর্ক বিরাজমান ছিল। সাধারণ মানুষ তখন রাজনীতি থেকে ঢের দূরে অবস্থান করত। কারণ আজকের দিনের মতো রাষ্ট্র তখন জীবনের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ক্ষেত্রে তার আগ্রাসী নখর বাড়িয়ে দেয়নি।

 

ইবরাহিম ফাওজি: এই বইটির পেছনে কেমন গবেষণার প্রয়োজন হয়েছিল? প্রয়োজনীয় সেই গবেষণা আপনি কীভাবে সম্পন্ন করেছিলেন? আপনার প্রাথমিক উৎসগুলোই বা কী ছিল? আর ইতিহাসের উপাদান ও আপনার নিজস্ব সৃজনশীল প্রক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখলেন কীভাবে?

আহমাদ ফালুদ্দীন: এটি অত্যন্ত চমৎকার একটি প্রশ্ন। একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি আর গভীর গবেষণার প্রয়োজন হয়। কারণ আপনি যে কালখণ্ড নিয়ে লিখছেন, তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ প্রতিটি দিকের উপর গভীর ও নিখুঁত দখল থাকতে হবে। উপন্যাসে সে সময়ের রাজনৈতিক মেজাজকে ফুটিয়ে তুলতে হবে, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশকে হতে হবে নিখুঁত, আর সামাজিক খুঁটিনাটিগুলো হতে হবে একদম বিশুদ্ধ। এই প্রামাণ্য বিবরণগুলোই একজন লেখকের প্রচেষ্টাকে প্রত্নতাত্ত্বিকের খননকাজের মতো সূক্ষ্ম শিল্পে রূপ দেয়। তাই ‘দানিশমান্দ’ রচনার সময় আমি ইতিহাসের অনেক বিশাল আকর গ্রন্থের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। যার মধ্যে ইমাম জাহাবির ‘তারিখুল ইসলাম’ এবং ইবনুল আসিরের ‘আল-কামিল’ যেমন ছিল, তেমনই ছিল বাগদাদ, দামেস্ক ও নিশাপুরের মতো নগরীগুলোর ইতিহাস গ্রন্থ এবং সেই সুনির্দিষ্ট সময়ে এই অঞ্চলগুলো দিয়ে অতিক্রম করা সমসাময়িক পরিব্রাজকদের ভ্রমণকাহিনি।

ইমাম গাজালির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, মানসিক অবস্থা এবং ভেতরের তাড়নাগুলোকে নিজের সত্তায় ধারণ করার জন্য আমি তাঁর প্রায় সব বই-ই পড়ে ফেলেছিলাম। শুধু তার ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের বইগুলো ছাড়া, যেখানে তার ভেতরের নিগূঢ় মনস্তত্ত্বটি সাধারণত আড়ালে থাকে। এই অন্তহীন অনুসন্ধিৎসাই আমাকে অন্যান্য ভাষায় তার উপর করা অতি সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও গোগ্রাসে গিলতে বাধ্য করেছিল, যাতে আমি দেখতে পারি আধুনিক বিশ্ব তার দর্শনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে। সত্যি বলতে, এটি ছিল অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া একটি যাত্রা; একইসঙ্গে এটিই ছিল আমার সমগ্র লিখনপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে আনন্দময় অংশ।

 

ইবরাহিম ফাওজি: উপন্যাসটিতে দেখা যায় চরিত্রগুলো এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে ভুগছে এবং পরস্পরবিরোধী ধারণার গোলকধাঁধায় সত্যের সন্ধান করছে। এটি ইঙ্গিত করে যে, সত্য কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়, বরং অন্তহীন এক যাত্রা। আমরা কি তবে এটিকে একটি ‘সুফি উপন্যাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি?

আহমাদ ফালুদ্দীন: অবশ্যই। যেহেতু উপন্যাসের মূল চরিত্রই একজন সুফি। যিনি তার গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সুফিবাদ বা তাসাউফের প্রতিরক্ষায়। তাই একে একটি সুফি উপন্যাস বলাই যায়। ইমাম গাজালি এটিই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, আল্লাহর নৈকট্য লাভ কোনো যুক্তি-তর্কের মারপ্যাঁচে হয় না, বরং তা অর্জিত হয় পরম সত্তার অভিমুখে জীবন্ত যাত্রার মধ্য দিয়ে। অতএব, এই উপন্যাসটি মূলত একটি নিবিড় মরমি সুফি সফর। তবে এটি এমন এক সুফিবাদ, যা ইমাম গাজালির নিজস্ব আদর্শ ও চেতনার প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত। এই কারণেই এটিকে একটি সুফি উপন্যাস হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সেই সুফিবাদ ‘সুন্নি সুফিবাদ’ (শরিয়তসম্মত তাসাউফ) নামক বলয়ের অন্তর্ভুক্ত।

 

ইবরাহিম ফাওজি: ইমাম আবু হামিদ আল-গাজালির মতো একটি জটিল চরিত্র—যিনি জীবনের নানা বাঁকে এমন প্রগাঢ় বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তাঁকে উপন্যাসের পাতায় ফুটিয়ে তুললেন কীভাবে?

আহমাদ ফালুদ্দীন: আমি তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে যে প্রশ্নগুলো তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফিরত, সেগুলোর ওপর আলোকপাত করে চরিত্রটিকে ধারণ করার চেষ্টা করেছি। জীবনের যে পর্বে তিনি জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে উন্মুখ হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছেন—তখনকার প্রশ্নগুলো আর বাগদাদে গিয়ে অগাধ খ্যাতি অর্জনের মোহে বুঁদ থাকার দিনগুলোর প্রশ্নগুলো এক ছিল না। আবার সেই পর্বের জিজ্ঞাসাগুলো নিশ্চিতভাবেই তার সংশয় ও বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত জীবনপর্বের প্রশ্নের চেয়ে ভিন্ন ছিল। একইভাবে তার সুফি সাধনার দিনগুলোর আকুতি ও প্রশ্ন ছিল পূর্ববর্তী সমস্ত অধ্যায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

 

ইবরাহিম ফাওজি: ধর্মীয় পণ্ডিত (আলিম) এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পারস্পরিক সম্পর্কটি কি একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবেন?

আহমাদ ফালুদ্দীন: ইসলামি সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই আলিম ও রাজনীতিকের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি চিরকালই বড় জটিল ও কুহেলিকাময়। একজন আলিম তার হৃদয়ে এক পরম আদর্শের ছবি লালন করেন, আর একজন রাজনীতিককে প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করতে হয় হাতের কাছের রূঢ় বাস্তবতাকে। নিজ নিজ লক্ষ্যের গভীরে দুই পক্ষ যত বেশি নিমজ্জিত হয়, তাদের মধ্যকার ব্যবধানের ফাটলটিও তত বেশি চওড়া হতে থাকে। ইমাম গাজালি যে কালখণ্ডে বেঁচে ছিলেন, তা-ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ইমাম গাজালি হয়তো তার জীবনের প্রথমার্ধে এবং কর্মজীবনের মধ্যগগনে কিছুটা সৌভাগ্যবানই ছিলেন। কারণ তিনি উজির নিজামুল মুলকের (মৃত্যু: ৪৮৫ হিজরি) সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। এই উজির আলিমদের প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা এবং সুফি ও পণ্ডিতদের সঙ্গে তার প্রগাঢ় আত্মিক সম্পর্কের জন্য বিশেষভাবে সুপরিচিত ছিলেন। ইমাম গাজালির জীবনের এই ‘নিজামিয়া’ পর্বে আলিম ও উজিরের মাঝে সুগভীর বোঝাপড়া ছিল এবং সেখানে এক অপূর্ব সম্প্রীতি বিরাজ করত। এর কারণ ছিল, ইসমাইলিদের চরম আঘাতের পর নিজামুল মুলক সুন্নি ঘরানাকে পুনর্গঠন করার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে ইমাম গাজালিও ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ আলিম। ফলে উভয়েই একই ভাবনার মোহনায় এসে মিলেছিলেন। তবে উজিরের আকস্মিক প্রয়াণ এবং ইমাম গাজালির সুফি সাধনায় আত্মনিবেদনের পর, সুলতানদের সঙ্গে তার সেই সম্পর্কে পুনরায় এক চাপা উত্তেজনা ও টানাপোড়েন ফিরে আসে। অতঃপর ৫০৫ হিজরিতে ইমাম গাজালির মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কটি চিরকাল একপ্রকার সতর্ক দূরত্বের চাদরেই ঢাকা ছিল।

 

ইবরাহিম ফাওজি: এই বইটির জন্য কি আপনি কোনো সুনির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখেছিলেন? আর পাঠক এই বই থেকে শেষ পর্যন্ত কী উপলব্ধি নিয়ে ফিরবেন বলে আপনি আশা করেন?

আহমাদ ফালুদ্দীন: আমার বিশ্বাস, এই উপন্যাসের মূল পাঠক তারাই—যারা সাধারণত সাহিত্য ভালোবাসেন, বিশেষ করে যারা ঐতিহাসিক উপন্যাসের অনুরাগী। যেহেতু এই উপন্যাসটি মূলত মুক্তিপিপাসু ব্যাকুল একটি আত্মার আত্মকাহিনি শোনায়, তাই আমি মনে করি যেকোনো মননশীল ও গম্ভীর পাঠকের জন্যই এটি ভীষণ উপযোগী। আমাদের মধ্যে এমন একজন মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি জীবনের কোনো না কোনো বাঁকে ঠিক ইমাম গাজালির মতোই এমন তীব্র অস্তিত্ববাদী সংকটের মধ্য দিয়ে যাননি।

 

ইবরাহিম ফাওজি: সাংবাদিক হিসেবে আপনার পেশাগত কাজ কীভাবে আপনার কথাসাহিত্যকে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করে?

আহমাদ ফালুদ্দীন: একজন লেখক এবং তার কাজের মধ্যকার সম্পর্কটি বেশ জটিল ও দ্বিমুখী। যেকোনো পেশাই সাধারণত সৃজনশীলতার পথে যেমন বিঘ্ন ঘটায়, ঠিক তেমনই আবার তাকে সমৃদ্ধও করে তোলে। একটি চাকরি বা পেশা সৃজনশীলতার অন্তরায় হতে পারে কারণ এটি মানুষের সময় আর মানসিক শ্রমকে শুষে নেয়। তবে সেটি আবার তার সৃষ্টিশীলতাকে কানায় কানায় ভরিয়েও দিতে পারে। এই কারণে যে, তা মানুষের সঙ্গে মেশার, তাদের সঙ্গে কথা বলার এবং জীবন থেকে অভিজ্ঞতা কুড়ানোর অবারিত দিগন্ত উন্মোচন করে দেয়। মানুষের সঙ্গে কাটানো এমন প্রতিটি মুহূর্তই একজন একনিষ্ঠ লেখকের জন্য আগামীর অবিনাশী রসদ হয়ে থাকে।

 

ইবরাহিম ফাওজি: এই উপন্যাসটি রচনার নিজস্ব যাত্রাপথ থেকে আপনি নিজে কী শিখেছেন?

আহমাদ ফালুদ্দীন: আমি শিখেছি যে, মানুষ মূলত করুণার মুখাপেক্ষী ও এক অসহায় জীব, যারা একটি শাশ্বত, বৃত্তাকার আবর্তনের মধ্যে বেঁচে থাকে। আমাদের প্রতিটি মানুষ যখন জন্ম নেয় এবং নিজের জীবনযাত্রা শুরু করে, তখন সে মনে করে তার এই পথচলা বুঝি একেবারে অনন্য ও নজিরবিহীন। অথচ বাস্তবে দেখা যায় সেই একই পথ এর আগে কোটি কোটি প্রাণ হুবহু একইভাবে মাড়িয়ে গেছে। আমরা প্রত্যেকেই সেই একই জটিল মানবিক সম্পর্কের জালে জড়াই, একই অস্তিত্ববাদী প্রশ্নের মুখোমুখি হই, আর একই সুখে হাসি কিংবা একই বেদনায় চোখের জল ফেলি। তা সত্ত্বেও, আমরা এই চেনা সফরের পুনরাবৃত্তি এমনভাবে করে চলি যেন এই ধরণী প্রথমবার তা প্রত্যক্ষ করছে। এখানেই মানুষের মস্ত বড় মাহাত্ম্য আর বিস্মরণশীলতার এক অদ্ভুত ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। আর এই চিরন্তন বিস্মৃতিই হচ্ছে সমস্ত সৃজনশীলতার মূল উৎস।

 

ইবরাহিম ফাওজি: আপনার প্রিয় ঐতিহাসিক বা সুফি উপন্যাস কোনটি?

আহমাদ ফালুদ্দীন: আমার একটি অদ্ভুত স্বভাব হচ্ছে, আমি মোটেও নিয়মিত উপন্যাস পড়া মানুষ নই। যেসব বই আমাকে সবচেয়ে বেশি আচ্ছন্ন করে রাখে, সেগুলো মূলত ইতিহাস, ধর্ম কিংবা দর্শনকেন্দ্রিক। তবে আমরা কি ইতিহাস বা দর্শনকে ভিন্ন আঙ্গিকের ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে গণ্য করতে পারি না?

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments